Home The Silent Manor The Silent Manor part 62

The Silent Manor part 62

The Silent Manor part 62
Dayna Imrose lucky

মায়া বিমর্ষ হয়ে চারদিকে তাকাল।দূর থেকে একটা অশ্বে কাউকে ছুটে চলে যেতে দেখা গেল।মায়া চোখ সরিয়ে মীর এর কাছে ছুটে এল।মীর দাঁড়িয়ে হাতটা চেপে ধরে রেখেছে।চোখে জেদ ফুটে উঠল।সেও দেখার চেষ্টা করল আক্র’মণকারীকে।চলে গেছে অনেক দূরে লোকটি।মীর একবার হাতের দিকে আরেকবার, আক্র’মণকারীর দিকে চেয়ে বলল “আমাকে কি জেনে বুঝে আ’ঘাত করল!নাকি অন্য কাউকে ভেবে।”
“হয়ত অন্য কাউকে ভেবে।নয়ত, আপনার তো এখানে কোন শ’ত্রু থাকার কথা না। আপনার বাবা বিদেশি নাগরিক,আপনিও। এখানে বেড়াতে এসেছেন।”

মায়ার রেশ ধরে মীর বলল “হুঁ। বোধহয় অন্য কাউকে ভেবেই আমায় তীর ছুঁড়েছে। এইজন্যই আমার গ্রাম পছন্দ নয়। চারদিকে শুধু শ’ত্রু।কে কখন কাকে খ’তম করবে সে-ই চিন্তাভাবনা।”
“আপনার হাত থেকে র’ক্ত ঝড়ছে।” মায়া বলল।
মীর ঘুরে তাকাল হাতের দিকে। সাদা শার্টটা লাল হয়ে গেছে।হাতের উপরিভাগটা ক্ষত হয়েছে খানিকটা।এখন হাল্ক র’ক্ত ঝড়ছে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“ঝড়ুক। থেমে যাবে একটু পর।”
মায়া শুনল না মীর এর কথা। তাঁর গলায় পেঁচানো ছিল সুতির ওড়না। ওড়নার এক অংশ ছিঁড়ে তৈরি করল লম্বাটে টুকরো ব্যান্ডেজ কাপড়।সেটি বেঁধে দিল মীর এর হাতে। আপাতত ধীরে ধীরে থামছে র’ক্ত ঝড়া।
“চলুন বাড়ি ফিরে যাই।পড়ে আপনার শরীর খারাপ করবে।” মায়া বলল ব্যথিত কণ্ঠে।
“এত সহজে মীর এর শরীর খারাপ হয় না।আমি হলাম বাঘ।বাঘকে কখনো দেখেছো দুর্বল হতে?”
“বাঘ দুর্বল না হলেও তাকে কিন্তু কৌশলে কাবু করা যায়।”
“মীর এর কাছে কৌশল ও হার মানে।ধরে ফেলি অন্যর কৌশল।”
“ছাই।” মায়া তোয়াক্কা না করে মীর এর প্রসঙ্গ উড়িয়ে দিল। “হরিণ শিকার হল। চলুন, জঙ্গলের ভেতরে যাই।”
“জঙ্গলের ভেতরে জঙ্গলি থাকতে পারে। সুন্দরী মেয়েদের দেখলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে। এরপর ওঁরা যদি তোমাকে আক্র’মন করে।”

“আপনি আছেন কি করতে! আমাকে বাঁচাবেন।”
“বয়েই গেছে।” বলে মীর একটা সিগারেট ধরাল। সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে জঙ্গলের ভেতরের পথে এগোয়।মায়া পিছু নিল।পিছ থেকে মীর এর দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে “এত বেশি সিগারেট খান কেন?বদ অভ্যাস ত্যাগ করুন।নয়ত পড়ে ক্ষতি হবে।”
“কত ক্ষতিই তো না চাইতে হয়।জেনেও না হয়, কিছু ক্ষতি বয়ে আনা যাক।”
“আপনার বাবা তো ভালো মানুষ,উনি তো ধুমপান করেন না। আপনি করেন কেন?”
“বাবা, আমার মা-কে পারিবারিক ভাবে বিয়ে করেছিল।প্রেম করে নয়। কিন্তু আমিত বিয়েই আগে থেকেই আমার হবু বউকে ভালবাসি।”

মায়া মীর কে মনে মনে শেয়ানা বলল।মীর ঘুরে মায়ার দিকে চেয়ে বলল “পেছনে কেন,পাশে এসে হাঁটো।”
মায়া অনুমতি পেয়ে মীর এর পাশে হাঁটা শুরু করল। দুজনের হাতে অশ্বের লাগাম ধরা। যেদিকে যাচ্ছে, অগ্নিলও পিছু পিছু হাঁটছে।ঘন জঙ্গলের মধ্যে মায়া আজ প্রথমবার প্রবেশ করল।এর আগে শুধু হাত কয়েক পথ পর্যন্ত এসে তাঁকে থামতে হয়। বিষাক্ত সা’পের জন্য।
জঙ্গলের ভেতরের অংশে বেশিরভাগ মৃ’ত গাছ। ছোট্ট ছোট্ট গাছ। কিছু বড় মোটা জাতীয় গাছ গুলো কাঠের জন্য নিশ্চয়ই কাঠুরী’রা কে’টে নিয়েছেন। সে-ই চিহ্ন এখনো রয়ে গেছে।দূরে হরিণ ছুটছে। কিছুক্ষণ আগে একটি হরিণ শিকার হতেই বাকিদের মধ্যে যেন ভয় জমে গেছে।
মীর সিগারেট ফেলে দেয়‌।মায়া বলল “এত সিগারেট খেলে বিয়ের আগেই আপনার বউ বিধবা হয়ে যাবে।”

“হোক,তাই বলে তাঁর জন্য নিজের অভ্যাস ত্যাগ করতে পারব না।”
“সে আপনার অভ্যাস নয়?”
“হুঁ।যেদিন তাঁকে বিয়ে করব,বিয়ের প্রথম রাতে সে যদি আমার শর্ত মানতে রাজি হয়, তবে শর্ত অনুযায়ী আমিও সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দেব।কারণ সেও সিগারেট খাওয়া পছন্দ করে না।”
“কোন মেয়েই সিগারেট খাওয়া পছন্দ করে না।”
“যে মেয়ে সিগারেট খাওয়া ছেলেদের পছন্দ করে না,সে কোন মেয়ে জাতের মধ্যেই পড়ে না।”
কিছুদূর তারা হেঁটে গেল।একটা কূপের সামনে গিয়ে দু’জনে থামে।মায়া চারদিকে একবার তাকায়। ক্লান্ত ভঙ্গিতে বলল “শুধু শুধু এতদূর হেঁটে আসলাম। না,জঙ্গলিদের দেখলাম, না সুন্দর কোন দৃশ্য!”
মীর কিছু বলল না।দীর্ঘক্ষণ পথ হাঁটার পর শরীরের এক অনিবার্য তাগিদ থামতে বাধ্য করল তাঁকে। চারপাশে শুধু গাছগাছালি আর পাখির ডাক।মানুষের কোনো চিহ্ন নেই। সে একটু ঘন পাতার আড়ালে সরে যেতে চাইল।সে পা বাড়াতেই মায়া বলল “ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন?

“দাঁড়াও।এক মিনিট আসছি।”
“না।এক মিনিটে অনেক কিছু হয়ে যেতে পারে,কোন জ’ন্তুজানো’য়ার এসে আমাকে যদি আক্র’মন করে? আপনার সাথে নিয়ে চলুন।”
মীর ঠোঁট কামড়ে আবার ছেড়ে বিড়বিড় করে বলল “মেয়ে মানুষ নিয়ে কোথাও বের হওয়া মহা মুশকিল!”
“কিছু বললেন?
“না। অদৃশ্য ভূতের সাথে কথা বলছিলাম।আমি একটু হালকা হতে যাচ্ছিলাম।” মীর আঙ্গুলের ইশারায় মায়াকে বোঝাল।মায়া বুঝতে পেরে নাক কুচকে ফেলে।
মীর ফের বলল “তুমি নাকি সুন্দর কোন দৃশ্য দেখোনি,তো আমার সাথে চলো। কঠিন দৃশ্য দেখাই।”
“দরকার নেই। আপনি যান।” বলে মায়া অন্যদিকে ঘুরতেই মীর আঙুল তুলে মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল “এসে যেন তোমার মুখ না দেখি।”

মীর ছোট ছোট গাছের পাতার আড়ালে থেকে কয়েক মুহূর্ত পর ফিরে আসল। কিন্তু তাঁর চোখ যখনি মায়াকে খুঁজল সে থমকে যায়। আকস্মিক হকচকিয়ে গেল। কোথাও মায়া নেই। শুধু তাঁর অশ্ব একাকী দাঁড়িয়ে আছে।মীর উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল। ঘুরেঘুরে এদিক ওদিক তাকাল। যতদূর চোখ যায় ততদূর পর্যন্ত তাকায়। কোথাও মায়াকে দেখা গেল না।মীর ডাকা শুরু করল চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে। তাঁর সাথে অগ্নিলও যোগ দিল।ও হ্রেষাধ্বনি তুলল।যেন বলতে চাইছে মায়া কে ও দেখেছে।

মীর ডেকে ডেকে একদিকে ব্যস্ত পায়ে হাঁটতে শুরু করে। কণ্ঠে তাঁর একটি শব্দ বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।মায়া।
মীর মায়াকে কোথাও দেখল না। ক্ষুদ্র সময়ে তাঁকে আ’তঙ্কে জড়িয়ে নিল। ঘন ঘন দম ফেলছে। এখুনি এখানে ছিল মেয়েটি,এক থেকে দুই মিনিট এর মধ্যে মেয়েটি কোথায় যেতে পারে?হয়ত ইচ্ছে করে কোথাও চলে গেছে, কেননা -কোন জন্তু জানো’য়ার আক্র’মন করলে চিৎকার করত।অশ্ব হ্রেষাধ্বনি তুলত। সেরকম কিছুই ঘটেনি।তবু মীর খানিকটা চিন্তিত হল। শরীরের শক্তি ছেড়ে ফিরে গেল অশ্বের কাছে। শেষবারের মত আশেপাশে তাকিয়ে অশ্বের পৃষ্ঠায় উঠতেই দূরে বড় একটা গাছের গোড়া থেকে গোলাপি রঙের ওড়নার অংশ দেখা গেল।মীর অশ্ব থেকে নেমে সেদিকে গেল ধীরস্থির পায়ে হেঁটে।গাছটির পেছন থেকে উঁকি দিয়ে দেখল মায়া মুখ ভার করে বসে আছে।মীর আড়ালে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।এরপর মায়ার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।মায়া চোখ তুলে মীর কে দেখে আবার নামিয়ে ফেলল দৃষ্টি।

মীর হাঁটু ভাঁজ করে বসে বলল “ভালোই আমার সাথে লুকোচুরি খেললে। এখানে লুকিয়ে কেন বসে আছো?”
“আপনিই তো আমাকে বললেন,ফিরে এসে যেন আমাকে না দেখেন।”
“আমিত মজা করে বলেছি।তাই বলে তুমি সত্যি সত্যি লুকিয়ে পড়বে। যদি তোমার কিছু হয়ে যেত!”
“হলে হত, তাঁতে আপনার কি?”
“আমার কিছু্ই না।এখন চলো,এখান থেকে চলে যাই।”
মায়া আর কিছু বলল না।মীর হাত বাড়িয়ে দেয়।মায়া তাঁর হাত ধরে উঠে আসল।অশ্বের কাছে পৌঁছে মায়া বলল “আমাকে এখানে নিয়ে আসার উদ্দেশ্য কি ছিল?
“তেমন কিছু না। তোমার বিয়ের বাকি আর মাত্র বাহাত্তর ঘন্টা। এরপর তো তোমাকে আর পাব না।তাই একটু স্মৃতি তৈরি করলাম।খালাতো বোনের সাথে।” বলে একগাল হাসল মীর।

অন্যদিকে মুখে হাঁসি নেই আহির মির্জা’র। মিলন খু’নের সময়টা আজ দীর্ঘদিন হয়ে গেছে।এখনো সঠিক কোন তথ্য সে জোগাড় করতে পারেনি।আজ যাবে কামার ওসমান আহমেদ এর বাড়ি।লোকটি বেঁচে নেই। ছেলেপেলে নিশ্চয়ই কেউ আছে। জিজ্ঞাসাবাদ করলে কোন না কোন তথ্য ঠিক মিলবে বলে আশাবাদি আহির।সাথে তাঁর সহকর্মী অরুণ।অরুণ আহির কে ছেড়ে আর শহরে যাবে না।বলেছে মিলন হ’ত্যার রহস্য, এবং মায়ার বিয়ের পড়েই যাবে।আহির অরুণ কে জোর করল না শহরে ফেরার জন্য।

তাঁরা কামার ওসমান আহমেদ এর বাড়িতে আসল আধঘণ্টার ভেতরে।আলিমনগর বাজারের কিণারায় দাঁড়িয়ে থাকা কাঠের বাড়িটা যেন সময়ের হাত এড়িয়ে যাওয়া এক স্মৃতি। গাঢ় বাদামি কাঠের দেয়ালগুলো বিকেলের রোদে ঝলমল করলেও কোথাও কোথাও বৃষ্টির দাগ আর বাড়ির দীর্ঘদিন এর বয়সের ছাপ স্পষ্ট। ঢালু ছাদে শুকনো পাতার স্তূপ জমে আছে।বাতাস বইলেই সেগুলো হালকা শব্দে নড়ে ওঠে। সামনে ছোট বারান্দা, বারান্দার কাঠের খুঁটিগুলোতে হাত বুলোলেই উষ্ণতা টের পাওয়া যাবে, যেন বাড়িটা নিজেই জীবন্ত।
বারান্দায় ঢুকল তাঁরা ।কাঠের গন্ধে বুক ভরে গেল। মেঝে কড়কড় শব্দ করছে, প্রতিটি শব্দে অতীতের গল্প লুকিয়ে আছে যেন। বারান্দার পাশেই ছোট্ট বাগান থেকে নরম আলো এসে পড়ছে দেয়ালে, আলো-ছায়ার খেলায় ঘরটা আরও গভীর হয়ে উঠল।

অরুণ দ্বিধাবোধ না করেই গলা পরিষ্কার করে খোলা কণ্ঠে ডাকল। “কেউ আছেন? আমরা দরকারে এসেছি।বিনা কারণে আপনাদের বিরক্ত করতে আসিনি। তাড়াতাড়ি আসুন।” বলে দাঁত গুলো বের করে আহির এর দিকে তাকাল।আহির কটমট চোখে তাকিয়ে আছে অরুণ এর দিকে।চাপ গলায় বলল “অচেনা বাড়িতে এসে কিভাবে একজন কে ডাকতে হয় তাই জানো না!আগেই বলছো আমরা বিরক্ত করতে আসিনি।শোনো,যখন কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তখন তাঁকে বিরক্তই করা হয়।বুঝেছো?

“বুঝেছি।” অরুণ বলে মাথানত করে ফেলল। পুনরায় মাথা উঁচু করে ওসমান আহমেদ এর ঘরের মূল ফটকের দিকে তাকিয়ে বলল “আমরা অল্প কিছুক্ষণ কথা বলেই চলে যাব।এখন আসুন।” কথাগুলো অরুণ মিনমিনিয়ে বলল।আহির অরুণের কাণ্ডকারখানা দেখে নিজের কপাল নিজেই চামড়ায়।
ঘরের ভেতর থেকে একজন তরতাজা যুবক বেরিয়ে এল। গায়ের রং কুচকুচে কালো।পরনে সাদা রঙের লুঙ্গি। ময়লা জমে সাদা থেকে ধোঁয়াশা হয়ে গেছে। ফতুয়ার রংটাও কালচে।বয়স দেখে বোঝা যাচ্ছে ত্রিশ এর উর্দ্ধে। যুবকটি লুঙ্গি ধরে আহির এর সামনে এসে দাঁড়ায়। বলল “ডাকছেন,কির লইগা?”
অরুণ আহির কে সরিয়ে দিয়ে বলল “আমি ডেকেছি।আমি গোয়েন্দা। আপনার বাবার হ’ত্যার তদ’ন্ত করতে এসেছি।”

যুবকটি প্রথম অরুণ কে পর্যবেক্ষণ করল। বলল “আপনারে দেইখা তো গোয়েন্দা মনে হয় না।চ্যালা চ্যালা লাগে।”
আহির এহেন কথা শুনে আড়ালে হাসল।অরুণ অপমানিত বোধ করল।ঘাড় ঘুরিয়ে একবার আহির কে দেখল। পুনরায় যুবকটির দিকে তাকিয়ে টান টান গলায় বলল “আমাকে চ্যালা চ্যালা মনে হচ্ছে! আপনার সাহস তো কম নয়।” অরুণ থেমে গেল।রাগে গজগজ করতে করতে পুনরায় বলল “জানেন এই পর্যন্ত আমি ক’টা কে’স সমাধান করেছি? মিনিমাম পঞ্চাশ টা।”
যুবকটি স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল “বলেন, কেমনে সাহায্য করবার পারি?”

“আপনার বাবা কিভাবে মা’রা গেছে?” অরুণের প্রশ্ন শুনে কিঞ্চিত আশ্চর্য হল যুবকটি।আহির এবারও হাঁসি ধরে রাখতে পারল না।
আহির অরুণের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল “এভাবে প্রশ্ন করলে তোমাকে জনগণ পেটাবে।”
“কেন স্যার?”
“তুমি প্রথম বলেছো আপনার বাবার হ’ত্যার তদন্ত করতে এসেছি। দ্বিতীয়বার আবার জিজ্ঞেস করলে আপনার বাবা কিভাবে মা’রা গেছে?এটা থেকেই বোঝা যায় কে আসল গোয়েন্দা আর কে চ্যালা!”
“স্যার আপনিও আমাকে চ্যালা বললেন!” অরুণের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে আহির যুবকটির সম্মুখে অগ্রসর হয়।
“আমি ডিটেকটিভ আহির মির্জা। কিছুদিন আগে মিলন নামে একজন খু’ন হয়। সে-ই খু’নের ত’দন্ত করতে গিয়ে আপনার বাবার খোঁজ পাই। জানতে পারি,উনিও খু’ন হয়েছিল।”
যুবকটি কিছু বলল না।মাথা নিচু করল। লুঙ্গিটা দু ভাঁজ করে কোমরে গিট্টু দিল। এরপর চোখ তুলে বলল “হুঁ,ঠিক হুনছেন।বহেন।সব কইতাছি।”

আহির দৃঢ় আগ্রহ নিয়ে বসল।পাশে বসে অরুণ। যুবকটি কাঠের একটি ভাঙ্গা চেয়ার টেনে বসে।আহির আগ বাড়িয়ে বলল “আপনার নাম কি?”
যুবকটি জবাব দিল “আমি আকবর। ওসমান আহমেদ – যার খোঁজে আইছেন, তাঁর পোলা।”
‘মিলন যেদিন খু’ন হইছে, আমার আব্বাও ওদিন খু’ন হইছে। আব্বার ওদিন কামের ব্যাপক চাপ আছিল।রাত কইরা বাড়ি ফিরতে আছিল।অমন সময় জমিদার বাবুর তাঁতশালা দিয়ে মেয়েদের কণ্ঠ পায়। ছুটে যায় আব্বা।ভাবছে হয়ত,কোন মাইয়া মানুষ বিপ’দে পড়ছে। কিন্তু যাওয়ার পর উনারেও ছু’রিঘাত করে। আব্বা কোনরহম জান লইয়া বাড়ি অবধি আইছিল। অস্পষ্ট কইরা এই কথাগুলোই কওয়ার সুযোগ হইছে। এরপর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।’
আকবর এতটুকু বলে থামে।আহির এর কৌতুহল আরো বেড়ে গেল। গতকাল এর দোকানির বক্তব্যর সাথে আজকে আকবর এর বক্তব্য এর বেশ ফারাক।

“ আপনি মিথ্যে বলছেন, আপনার বাবা বেশ অনেকদিন আগেই খু’ন হয়েছেন।মিলন হ’ত্যার আগে।” আহির হ্যাট খুলতে খুলতে বলল।
আকবর নরম গলায় নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে বলল “না সাব, আমার আব্বার খু’নের সংবাদ হয়ত বাজারের চা দোকানদার মজিবুর চাচায় দিছে।উনি ঠিক মতন সবকিছু মনে রাখবার পারে না।”
আহির মেরুদণ্ড সোজা করে বসল। আকবর এর কথায় কিছুটা সত্যতা পাওয়া গেল। ওসমান এর তথ্য দেয়া দোকানির হালচাল ঠিক ছিল না।গলা পরিষ্কার করল আহির। “আপনার বাবার কোন শ’ত্রু ছিল?
“না সাব। আপনার কাছে অনুরোধ, আমার আব্বার খু’নিরে আপনি নিজ হাতে শা’স্তি দিবেন।ওরে খুঁইজা বাইর করেন।” আকবর এর চোখে জল জমল বিন্দু বিন্দু।
আহির বলল “ আপনার বাবা নিশ্চয়ই এমন কিছু দেখেছিল যা উনার দেখা মোটেই ঠিক ছিল না। যা দেখার বিনিময়ে উনাকে প্রাণ দিতে হয়েছে। আচ্ছা,উনি মৃ’ত্যুর আগে আর কিছু বলে যেতে পেরেছিল? মানে কে বা কারা উনাকে হ’ত্যা করেছে!”

আকবর বিমোহিত চেহারায় কিছু ভাবল।ভেবে সেকেন্ড কয়েক পর জবাব দিল “জমিদার বাড়ির’ এইটুকু শুধু কইতে পারছিল।”
আহির গভীর চিন্তায় ডুবে দিল। বা হাতের তালুতে ভর রেখে ঠোঁটের ফাঁকে কণিষ্ঠ আঙুল প্রবেশ করাল। মুহুর্তে হাত সরিয়ে জি এস লেখা ছু’রিটি বের করল।সেটি আকবর এর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল “ভালো করে দেখুন তো,এটা আপনার বাবা বানিয়েছিল কিনা?’
আকবর সময় নিয়ে বলল “হুঁ।এই ধরণের ছু’রি আব্বাই বানাইতো।এইডা আব্বা ম’রণের কয়দিন আগেই বা’নাইছে।”

“কে বানাতে দিয়েছিল এটি, বলতে পারবেন?’
“কোন ভদ্রমহিলা।আমি ঠিক চিনতে পারি নাই ওদিন। বোরখা পড়া আছিল।রুপোর ছু’রি বানাইতে তো একমাত্র টাকাওয়ালারাই পারবে।কোন সাধারণ মানুষ না।”
“কোন সাধারণ মানুষ যদি মুখোশের আড়ালে থেকে অন্যায় কাজ করে, সে-ই কালো টাকা দিয়ে স্বর্ণের ছু’রিও বানানো যায়।”
“আপনি ঠিক কইছেন সাব।” বলে আকবর পরপর কয়েকবার পলক ফেলল চোখের।মাথা নুইয়ে লুঙ্গি দিয়ে ঘাম মুছল।কোন কারণে ভয়ে পেয়ে গেছে হঠাৎ যেন।
“আর কিছু জানার আছে সাব”

আহির মুখের অভিব্যক্তি পরিবর্তন করে ফেলল। কঠিন করল দৃষ্টি।কর্কশ শব্দে গলা থেকে শব্দ বের করল “আপনি এতক্ষণ মিথ্যা বলেছেন। আপনি আপনার বাবাকে হ’ত্যা করেছেন, আপনি এক সময় আমজাদ চৌধুরীর কারখানায় কাজ করতেন, এরপর একদিন তাঁর সাথে ঝগড়া হয়, আপনাকে বের করে দেয়া হয় তাঁর কারখানা থেকে।তাই উনার উপর প্রতি’শোধ নিতে,নিজেই নিজের বাবাকে উনার গুদামঘরে আটকে মে’রে ফেলেছেন।আর এই কাজে আপনার সঙ্গী ছিলেন আপনার স্ত্রী।এইজন্য সেদিন রাতে আশরাফ আলী ও পথ থেকে ফিরতে আপনার স্ত্রীর কণ্ঠ পান।”
আকবর এর শরীর কেঁপে উঠল থরথর করে। চোখ দুটো রক্তিম হয়ে গেল।বসা থেকে উঠে আহির এর সামনে বসে বলল “কি বলছেন সাব এসব?আমি ক্যান আমার আব্বারে মা’রমু!”

আহির রহস্যময় হাঁসি দিল।
“কারণ ঐদিন রাতে আপনার মূল প্রথম লক্ষ্য ছিল মিলন।মিলন কে সেদিন রাতে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন আপনি। এরপর আপনি তাঁকে হ’ত্যা করেন।কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে-ই দৃশ্য দেখে ফেলে আপনার বাবা। এরপর যখন আপনার বাবা আপনাকে বাঁধা দিতে যায়,তখন তাঁকেও উপরে উঠিয়ে দিলেন।আর এতক্ষণ মিথ্যা বয়ান দিচ্ছেলেন।আমি আহির মির্জা কোন কাঁচা গোয়েন্দা না। সবকিছু আমি গতকাল রাতেই হিসেবে হিসেবে মিলিয়ে পেয়ে যাই।”

মীর ইজি চেয়ারে বসে বসে দোল খাচ্ছে।নিচে থেকে অতিথিদের কো’লাহল এর শব্দ ভেসে আসছে। জয়ন্তন বেগম এর আত্মীয়-স্বজন,শালুক, শাহানারা সহ সবার আত্মীয়রা ইতিমধ্যে এসে হাজির হয়েছে।সবাই মেহেন্দী পড়ছে হাতে। তবে মেহেন্দী অনুষ্ঠানে মায়া তখনও হাজির হয়নি।মন তাঁর ভীষণ ভার।মীর কে বলেছিল সেখানে উপস্থিত থাকতে।থাকেনি।কোন কারণে সেও উদাসীন।

বুলবুল আসে তাঁর ঘরে।তখন এক কাপ চা চেয়ে এসেছিল। বুলবুল চা এনেছে।মীর কে দিল এগিয়ে।মীর নিল না। বুলবুল পাশের টেবিলে রাখে।মীর কে চুপচাপ দেখে প্রশ্ন ছুঁড়ল “আপনার মন খারাপ?” প্রশ্নটা করার পর জবাবের আশায় অনেকটা সময় পাড় হয়। বুলবুল তাঁরপরও বেহায়ার মত অপেক্ষা করছে। জবাব মিলছে না।
বুলবুল পুনরায় বলল “মীর বাবু,মন খারাপ!সবাই নিচে মজা করতেছে,আর আপনি এখানে একা, চুপচাপ!’
এতক্ষণ পর যেন প্রশ্ন শুনল সে। নড়চড়ে বসে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় বুলবুল এর দিকে।বলল “জানিস বুলবুল, কখনো আমি বাজে কিছু চিন্তা করি না।যা হবে ভালো হবে, সবসময় সু-ধারণা রাখি। কিন্তু তারপরও কেন এতটা কঠিন দুঃস্বপ্ন দেখলাম?”

“ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন নিয়ে ভাববেন না। এগুলো সারাদিনের কাজবাজ, চেতনা থেকে আসে।”
“কিন্তু আমিতো খা’রাপ কিছু ভাবি না। তবে কেন সেসব দেখলাম!”
“কি দেখলেন!
‘এখন এসব বলতে ভালো লাগছে না। চলে যা’
“বলুন।হালকা লাগবে। একাকী ভাবলে মন ভার হবে।মাথা ব্যথা হবে।”
মীর বলার জন্য প্রস্তুত হল। বুলবুল তাঁর সামনে এগিয়ে দাঁড়াল।মীর বলল “ বাড়িতে সবাই বিয়ের আয়োজন করছে। কিন্তু আমি স্বপ্নে দেখলাম অন্যকিছু।”

“অন্যকিছু কি?’
“কারো শেষ বিদায়ের আয়োজন করছে।” মীর এর অভিব্যক্তি পরিবর্তন হয়ে গেল।মলিন হল চোখ দুটো।
বুলবুল কিছুক্ষণ মাটিতে এরপর মীর এর দিকে চেয়ে বলল “বাবু,আমিও ক’দিন যাবত একই স্বপ্ন দেখতেছি।হয়ত শয়তান দেখায়।”
মীর ব্যস্ত কণ্ঠে বলল “রাফিদ কোথায়?

The Silent Manor part 61

“নিচে।কাজ করছে হয়ত। বোনের বিয়ে বলে কথা।”
“ওকে উপরে পাঠাও।বলো আমি ডাকছি।”
বুলবুল মাথা কাত করে সম্মতি জানিয়ে ছুটে গেল নিচে। আবার এক দৌড়ে ছুটে এল। মীর কে জানালো ‘বাবু,রাফিদ দাদা নাকি সে-ই কখন বেরিয়েছে। মালকিন বলল একজন এসে দরকারি কথা আছে বলে ডেকে নিয়ে গেল।” বলে দম ছাড়ে বুলবুল।
মীর মর্মাহত কণ্ঠে বলল ‘ও শিট।যা ভয় পেয়েছিলাম তাই হল।’ এরপর সেও ছুটে ঘর থেকে বের হয়ে যায়।

The Silent Manor part 63