The Silent Manor last part
Dayna Imrose lucky
টেলিফোন এর ক্রিং ক্রিং শব্দ পেয়েই মায়া বিছানা থেকে উঠে এসে রিসিভার তুলল। কাঁপা কাঁপা গলায় হ্যালো বলল।ওপাশ থেকে তৃষ্ণার কণ্ঠস্বরটি ভেসে আসে।সে পুনরায় রিসিভার রেখে দিল।এক বুকভরা দীর্ঘ নিঃশ্বাস না চাইতেও চলে আসল।প্লাস পাওয়ার চশমাটা খুলে চোখে জমা বিন্দু বিন্দু জল মুছে ফেলল।মাহির তখন দৌড়ে এল মায়ের কাছে।মায়া দ্রুতই নিজেকে সামলে হাঁসি ফোটাল মুখে। মাহির আদো আদো কণ্ঠে বলল “মা, দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটির দ্বিতীয় খণ্ডের পুরো ঘটনা বলো।” কথাগুলো মাহির থেমে থেমে ছোট্ট ছোট্ট শব্দে উচ্চারণ করছিল। বিছানার উপর থেকে ফারিয়ান বলল “মা, তুমি রাত হলেই কেন কান্না করো! আমি দেখেছি, তুমি মাত্রই চোখের জল মুছেছো।”
মায়া দু’ সন্তানের এহেন প্রশ্নের জবাব দিতে পারল না।গলায় বিঁধে শব্দ গুলো।সে মাহির কে কোলে তুলে বিছানায় বসিয়ে দেয়।দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটির দ্বিতীয় খণ্ড হাতে তুলে বলল “তারপর থেকে সে-ই হতভাগী মায়া আর তাঁর স্বামীর কল পায়নি।সে রাতের পর রাত, দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, সবশেষে সাতটি বছর কেটে যায়,আর তাঁর স্বামীর খোঁজ পায়নি।ফিরে আসবে বলে আর ফিরে আসেনি।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ফারিয়ান মায়ের দিকে আর একটু চেপে বসে বলল “মা,দ্য সাইলেন্ট ম্যানর প্রথম খণ্ড পড়ার সময় তুমি যখন বললে, সে-ই রাখাল বাঁশিওয়ালা কিছু বলতে চেয়েছিল!কি কথা বলতে চেয়েছিল মা!” ফারিয়ান এর কথাগুলো বেশ স্পষ্ট। মাত্র ছয় বছর বয়সে দু’জমজ ভাই-বোন বেশ কথা শিখেছে। এতটুকু বয়সে বেশিরভাগ বাচ্চাদের শব্দ উচ্চারণে অস্পষ্টতা থাকে। কিন্তু, ওঁদের নেই।মায়া জানালা ধরে বাইরে তাকাল।মনে পড়ে সে-ই দিনগুলোর কথা!মীর জাফান শন ওরফে মীর হায়দার এর সাথে কাটানো মুহূর্তগুলোর কথা। কতশত স্মৃতি জমেছিল!আজ যে তা কেবলই ধূলিকণার মত চারপাশে উড়ছে।মনে পড়ে আজ থেকে সাতটি বছর আগের কথা – সন্ধ্যে নামার পড়ে তাঁকে কল করবে বলে টেলিফোন এর কাছে বসে থাকা মেয়েটি আজ দু’সন্তানের জননী!মায়া যেদিন জানতে পারে সে অন্তঃসত্ত্বা! সেদিন খুব আগ্রহ নিয়ে কল করে মীর কে!কলটি আর থাইল্যান্ডে পৌঁছায়নি। একজন ভয়েস প্রম্পট বলে লাইনটি বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। কিছুদিন পর সে-ই কলের শব্দটি পরিবর্তিত হয়ে বলে ‘আপনি যে নম্বরে কল করেছেন, সে-ই নম্বরটি আর ব্যবহৃত হচ্ছে না!’ ব্যস! সেদিন থেকেই জীবন্ত পাথর বুকের উপর চেপে বেঁচে আছে মায়া।মরে যেত,বেশ অনেকবার চেয়েছিল গলায় ফাঁস লাগিয়ে দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করবে।ঠিক তখনই মনে পড়ে তাঁর অনাগত সন্তানের কথা! ওদের কি দোষ!আসুক না ওঁরা দুনিয়ায়! দেখুক হতভাগী মাকে।আজ দেখছে মাকে।দ্য সাইলেন্ট ম্যানর প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড বইটি পড়ে পড়ে সে-ই বিকেল থেকেই শোনাচ্ছিল ওঁদের।মায়া বইটি পড়ে শোনাতে শোনাতে হারিয়ে গিয়েছিল সে-ই অতিতের বাহুডোরে।ফিরে গিয়েছিল কয়েক মুহুর্তের জন্য সাতটি বছর আগের স্মৃতিতে। স্মৃতির বিষাদময় ছায়া থেকে পূর্বের মতই টেলিফোনের ধ্বনিতে সে প্রকম্পিত হয়ে ফিরে আসে সে-ই জগত থেকে।
মায়া বারান্দায় আসে।আজ বারান্দার দেয়াল গুলো পুরাতন হয়ে গেছে। ধোঁয়াশা হয়ে গেছে।আগের..আগের মত আর রঙিন, চাকচিক্য করছে না।হইচই এ ভরা, আনন্দে ভরা, সারাদিন মানুষের কোলাহলে ভরা বাড়িটি আজ নিস্তব্ধ! নীরব!এ যেন নীরব জমিদার। আলোকিত অন্তরটা আজ মায়ার বড্ড কাঁদে।খুব কাঁদে। সারাদিন কোন না কোন বাহানায় টেলিফোনটির আশেপাশে ঘুরঘুর করে। যখনি রিং বেজে উঠে সে ছুটে যায় রিসিভ করতে। কিন্তু ওপাশ থেকে আর মীর এর কণ্ঠটা ভেসে আসে না। তাঁর অনুরাগী কণ্ঠটা আর ফিরে আসে না। কেবল আসে সুনসান নীরবতা।অন্যর কথা আর মায়ার ভালো লাগে না,অন্যর দেখানো দরদ আর তার ভালো লাগে না।কথা আজকাল হারিয়ে যাচ্ছে।সেও হারায় কখনো কখনো। কিন্তু যখনই ফারিয়ান,মাহির এসে মা ডাকটি কানে বিঁধে দেয়,সে আবার বেঁচে থাকার আশা জন্মায়। ওঁরা জিজ্ঞেস করে,আজও করেছে!বাবা বিদেশ থেকে কবে ফিরবে?’ এই প্রশ্নের জবাব যে তাঁর কাছে নেই। ওঁরা যখন কথা বলতে শিখেছে ঠিক তখন থেকেই মায়ার একটি ভয়,আতঙ্ক, সংকোচ, ‘বাবা কোথায়!’ জিজ্ঞেস করলে কি জবাব দিবে!নেই যে আর জবাব!তবু বলে, আসবে!কাজে ফেসে গেছে! অপেক্ষা করো আর কিছুদিন! কিছুদিন পাড় হয়,সময় গড়ায়,তবু তাঁদের বাবা আর ফিরে আসে না।
মায়া অশ্বশালার দিকে তাকিয়ে আছে।আজও অগ্নীল কোন কারণে হ্রেষাধ্বনি তুললে মায়া বারান্দায় ছুটে আসে।এই বুঝি মীর আসল! অগ্নীল নিশ্চয়ই তাঁকে দেখে হ্রেষাধ্বনি তুলছে। ধারণা ভুল হচ্ছে গত সাত বছর যাবত।অগ্নীল বোধহয় তাঁর মহাজন কে না দেখেই চিৎকার করে মাঝেমধ্যে।ও খুঁজে তাঁকে!আর পায় না। যেমনটি মায়াও পাচ্ছে না। নীরবে সৃষ্টিকর্তার নিকট তাকায়।দেখা যাচ্ছে নীলাকাশটা।গত দীর্ঘ বছর ধরে কতশত করে আল্লাহর কাছে চাইছে, প্রার্থনা করছে!কই! সে-ই ভোরের মত মীর তো আর ফিরে এল না।আর কি আসবে না!
মায়ার চোখের জলে গাল ভিজে।গলা বেয়ে শাড়ির ভাজেও পড়ল যে! বাচ্চারা দেখে ফেলবে ভয়ে মুছে ফেলল!নয়ত আবার জিজ্ঞেস করবে, কাঁদছো কেন!’এত মিথ্যে বলে পাপ আর অর্জন করতে চাইছে না মায়া।
মায়া কারো পায়ের আওয়াজ পেয়ে সাবধান হল। চশমাটা ঠিকঠাক করে পড়ে নিল।পেছন ঘুরে আহির মির্জা কে দেখল।আজ আলিমনগর তার আসার কথা ছিল। বাচ্চাদের দেখতে আসবে!গত দু মাস আগে এসে গিয়েছিল! গতকাল বলেছিল আসবে! ঘন্টাখানেক আগে পৌঁছেছে চৌধুরী বাড়ির দুয়ারে এসে। আমজাদ, শালুক এঁদের সাথে বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়েছে।
মায়া মসৃণ হেঁসে বলল “কখন এলেন?
‘জোসনার আগমন দেখছিলে নিশ্চয়ই,এসে বিরক্ত করলাম বুঝি!”
“একদমই না ভাইয়া। বাচ্চাদের সাথে গল্প করছিলাম। আগামীকাল ওদের স্কুল ছুটি।তাই গল্প করে সময় পাড় করছিলাম।কোমর ব্যথা হয়ে গেছে,তাই একটু হাঁটছিলাম। বাচ্চাদের সাথে দেখা হয়েছিল!”
“হুম।ঘরে ঠুকতেই ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিছু উপহার নিয়ে এসেছিলাম।পেয়ে খুব খুশি হয়েছে।”
“এসবের তো দরকার ছিল না ভাইয়া!”
“আমার একটামাত্র বোনের সন্তান, আমার ভাগ্নি, উপহার ছাড়া কিভাবে দেখি ওদের!” বলে হেসে উঠল।মায়াও জোরপূর্বক হাসে।
আহির রেলিং এর পাশে ঘেঁষে দাঁড়াল। ঘুরেফিরে ফের শীতের রাজ্যে এসে পড়েছে ধরণীতে।আহির শালটা জড়িয়ে ধরে বলল “দেখতে দেখতে সাতটি বছর কেটে গেল।সময় খুব দ্রুত গড়িয়ে যায়!যেন সন্ধ্যা নামার পূর্বেই দিনের আগমন।’ বাক্যগুলো বলে থামে।মায়ার দিকে ঘুরে তাকাল। তাঁর চোখের জলটা চিকচিক করছে।আহির সে-ই জলটুকু দেখে বলল “আজও চোখের জল ফেলছো!”
“এই জল বোধহয় চিরদিন গড়াবে। আমি কি অপরাধ করেছিলাম!আজও সে-ই অপরাধ এর ব্যাখ্যা খুঁজে পাই না।কতই না খোঁজার চেষ্টা করলাম। পেলাম কই! আসবে বলে চলে গেল,এল না। সন্ধ্যে নামার পর কল করবে!কত কল এল,কই! তার কল তো আর এল না। আমার সন্তান দুটো কি সারাজীবন এতিম এর পরিচয় নিয়ে থাকবে! ওঁরা যে আজ ওঁদের বাবা সম্পর্কে বলতে পারছে না! সেদিন এক প্রতিবেশী এতিম বলে সম্বোধন করেই ফেলেছিল!বলে, বাপ ফেলে রেখে গেলেও সে সন্তান এতিম!আর মরে গেলেও এতিম!” মায়া ফ্যাসফেসে কেঁদে উঠল।আহির এর দুঃখবিচারণ করল মায়ার কান্না দেখে।বোন বলে ডেকেছে যে, চোখের সামনে বোনকে কাঁদতে দেখতে ভাইয়ের ভালো লাগে বুঝি!
কিন্তু এখানেও একটা দেয়াল! রক্তের ভাই নয় বলে আজ তাঁর চোখের জলটুকুও মুছে দিতে পারছে না।
“এভাবে কেঁদো না। বাচ্চারা দেখবে। ওঁদের কষ্ট হবে।”
মায়া ঘরের দিকে একবার তাকাল।মাহির ও ফারিয়ান আহির এর আনা খেলনা গুলো দিয়ে খেলা করছে।মাহির ফাঁকে ফাঁকে দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটি খুলে গভীর মনোযোগ দিয়ে অক্ষরগুলো যেন দেখছে।মাহির খুব গল্প শুনতে পছন্দ করে।দ্য সাইলেন্ট ম্যানর – অসমাপ্ত এবং সমাপ্ত বইয়ের গল্পটা অবাস্তব মনে করে ফারিয়ান না বুঝে ক’বার হেসে উঠেছিল। কিন্তু মাহির বারবার জিজ্ঞেস করছিল ‘এসব কি বাস্তবে হয়েছে মা!”
মায়া জবাবে হ্যাঁ বলেছিল। এরপর নিস্তব্ধতা বিরাজ করে।
আহির ঘরের ভেতরে এল।মায়া বইটি বাচ্চাদের হাত থেকে নিয়ে রেখে দেয়।আহির কে পেয়ে আপাতত আর কিছু খুঁজছে না বাচ্চারা।মামা-মামা বলে মাতিয়ে রাখে।আহির ও ওঁদের বেশ আদর করে।মায়া বিছানা থেকে খেলনা গুলো সরাতে সরাতে আহির কে লক্ষ্য করে বলল “প্রকাশনা কেমন চলছে?
“বেশ ভালো। গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে প্রকাশনীতে এসে যেন নতুন নতুন জীবনের সাথে পরিচিত হচ্ছি!”
“কোন বইটা ভালো চলছে?!
“দ্য সাইলেন্ট ম্যানর অসমাপ্ত কাহিনী যিনি সমাপ্ত করেছেন, সে-ই লেখিকার বইটি! অর্থাৎ দ্য সাইলেন্ট ম্যানর দ্বিতীয় খণ্ড। লেখিকা মায়া”
মায়ার হাত দুটো থেমে যায় পাথরের মতন। উদ্বিগ্ন হয়ে তাকাল আহির এর দিকে। পরক্ষনেই দৃষ্টি সরিয়ে ফেলল।খেলনা গুলো নিয়ে একটা বাক্সের কাছে এগোয়। ভাবে সে-ই দিনটির কথা – মীর চলে যাওয়ার পর কত রাত সে নির্ঘুম কাটিয়েছে। নীরবে নিভৃতে কেঁদে, উদাসীনতায় ভুগেছে।ঠিক সেই সময়ে হাতে তুলে নিয়েছিল একটি কলম। লিখতে শুরু করে সুফিয়ান হায়দার ও ফারদিনার শেষ পরিণতি থেকে শুরু করে,মীর হায়দার ও তাঁর জীবনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা গুলো। অবশেষে সে সম্পুর্ণ করেছিল অসম্পূর্ণ বইকে। আহির তখন কলকাতা ফিরে প্রকাশনী দাঁড় করিয়েছিল।আর তাঁর প্রথম প্রকাশিত বই ছিল দ্য সাইলেন্ট ম্যানর দ্বিতীয় খণ্ড-! যাকে বলা হয় সমাপ্ত খণ্ড।
আহির বলল “এভাবে নিজেকে একটু আধটু করে শেষ করে দিও না মায়া। নিজের সন্তান দুটোকে নিয়ে ভাবো। ওঁদের দিকে তাকালে যেন মীর কে দেখতে পাই।মাহির ঠিক এর বাবার মতন। সে-ই চোখ,সে-ই নাক, চঞ্চলতা।”
“ওদের জন্যই বেঁচে আছি ভাই।”
মাহির ও ফারিয়ান ছোয়াছুয়ি খেলতে খেলতে বৈঠকখানায় চলে যায়।আহির ওঁদের দিকে চেয়ে বলল “মীর এর স্মৃতি যেন ওঁরা! কিন্তু দুর্ভাগ্য আমার দেখো, গৌরী সে-ই চলে গেল,আর দেখা দিল না! জানি না ও কোথায় আছে কেমন আছে!মীর অন্তত যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিল! ফিরে আসবে বলে আশ্বাস দিয়েছিল!আজ হোক বা কাল আসতেও পারে।”
মায়া চাপা কষ্ট চেপে বলল “হয়ত দ্বিতীয় বিয়ে করে সংসার করছে।”
আহির গাল বাঁকিয়ে হেঁসে বলল “না!মীর নিজেকে কোরবান করবে, কিন্তু তোমাকে ঠকাবে না।ওর ভালোবাসা নিয়ে আমার কোন সন্দেহ নেই।”
মায়া জানালার পাশে গিয়ে বলল “তবে রাফিদ ভাই থাইল্যান্ডে গিয়ে তাঁদের বাড়িটি কেন তালাবদ্ধ পেল!বেন হো থেকে তাঁরা কোথায় গেছেন!আর কেনই বা গেছেন!শুনেছি তাঁর বাবা একটা কেসে লকআপে গিয়েছিল! তিনি ছাড়া পাওয়ার পর তাঁরা বেন হো থেকে কোথাও চলে যায়! কিন্তু কেন!কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেছে?কেন আজ আমার বাচ্চারা বাবা বলে ডাকতে পারে না!”
আহির মায়ার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। “আমি গৌরী কে হারিয়েছি! কষ্ট হচ্ছে! রাফিদ মোহিনী কে হারিয়েছে।মেনে না নিলেও নিতে হচ্ছে। কিন্তু তুমি,সব পেয়েও, পূর্ণতা ছুঁয়েও, পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হয়েও শেষে কি-না অসমাপ্ত রয়ে গেল তোমাদের সংসার! কথাগুলো বলে তোমার কষ্টগুলো বাড়িয়ে দিচ্ছি হয়ত,তবু বলতে ইচ্ছে করছে!কি হবে আর অতিতের মাঝে পড়ে থেকে! ফিরে এসো। সন্তানদের ঘিরে বাঁচো।একটু হাসো। যদি সে ফিরে আসার হয় তবে নিশ্চয়ই ফিরে আসবে!”
“সে ফিরে আসবে আমার বিশ্বাস!”
“তাই যেন হয়!”
আহির বৈঠকখানায় আসল।মাহির ও ফারিয়ান আমজাদ এর দাড়ি ধরে টানছে। আমজাদ চৌধুরী দুই নাতিকে দু দিক দিয়ে জড়িয়ে ধরে রেখেছেন।ফারিয়ান নানার দেখা পেলেই শুধু মাহির কে নিয়ে অভিযোগ করে। মাহির বিকেলের দিকে মেরেছিল ওকে।খেলনার ভাগাভাগি করতে গিয়ে।এখন নালিশ করছে ফারিয়ান।মাহির ফারিয়ান এর কথা শুনে দূরে গিয়ে দাঁড়ায়।দু কোমরে হাত দিল।রাগ করেছে সে।নানার দিকে চেয়ে চেঁচিয়ে বলল ‘আমি ওকে মারিনি।ও মিথ্যা কথা বলছে।’
আমজাদ মাহির কে লক্ষ্য করে বলল “অপরাধ করলে স্বীকার করতে হয়।” বলে ফারিয়ান কে কোলের ভেতরে নিলেন। মাহির বলল “আমি মাহির মিথ্যে বলি না।’ বলেই দৌড়ে দোতলার দিকে চলে যায়।মায়া শুনল মাহির এর কথাটা। সে-ই তেজ, সে-ই কথা বলার ভঙ্গিমা,যা সবকিছু মীর এর ছিল।মীরও তো সেদিন বলেছিল, আমি মিথ্যে বলি না! আমি ফিরে আসব!আসেনি!
আমজাদ চৌধুরী মায়ার মুখটি দেখেন। তাঁর কষ্ট হয় মেয়ের জন্য। সেদিন মীর থাইল্যান্ডে চলে যাওয়ার পর যখন আর খোঁজ পাওয়া গেল না,তিনিও দ্বিতীয়বার তখন খোঁজ পাঠান। কিন্তু কোন হদিস মিলেনি মীর এর। থমাস শন এর।
জয়ন্তন বেগম বেঁচে নেই।১৯৫৪ সালের প্রথম দিকে মা’রা যান। তৃষ্ণার বিয়ে হয়েছে। কলকাতা শহরে ওঁর শশুর বাড়ি। শাহানা বেগম গেছেন গতকাল মেয়ের শশুর বাড়ি। শালুক বেশ কিছুদিন থেকে অসুস্থ।সোফার অপর পাশে বসে তাসবিহ পড়ছেন। পড়তে পড়তে দু’নাতির ঝগড়া দেখছিলেন। মাহির কে দেখছিলেন প্রাণভরে।বাবার মতন হয়েছে। ঘুরে তাকান মেয়ের দিকেও। চুলগুলো খোঁপা করা। চোখে চশমা। মাইগ্রেন সমস্যা দেখা দিয়েছে মায়ার। চোখের নিচে হালকা কালো দাগ। শরীর কিছুটা রোগা হয়ে গেছে।মা হিসেবে এমন দৃশ্য দেখতে তাঁর হৃদয়ে বাঁধে যে।মায়া চেয়েছিল শহরে গিয়ে থাকবে। শালুক যেতে দেননি। এখানে সবাই আছে,শহরে সে থাকবে নীরবে। নিস্তব্ধতায়। ভেবে বাঁধা দেন সেদিন মেয়েকে।
আহির, আমজাদ বসে প্রকাশনী নিয়ে কথা বলছে। রাফিদ ও তাঁদের সাথে যোগদান করেছে।মায়া ফারিয়ান কে নিয়ে ঘরে চলে যায়।মেয়ের মাথায় তাঁর মতই চুল হবে ভাবছে।।মায়া ফারিয়ান এর মাথার চুল গুলো বেঁধে দেয়।ফারিয়ান আয়নায় মায়ের প্রতিবিম্ব দেখে বলল ‘মা, তুমি বাবার কাছে আমাদের নিয়ে যাবে না!’ মায়া ওঁর চুলগুলো বেনুনি করে প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলল। নিত্যদিন একই প্রশ্নের জবাব যে তাঁর নিকট নেই।এমন প্রশ্নে যে তাকে নাড়িয়ে তুলে ভেতর থেকে। নীরবে কতই না চোখের জল ঝড়ছে! সমুদ্রের নোনোজল যেন সবটুকু তাঁর জন্য বরাদ্দ ছিল বলেই আজ এত কাঁদতে হচ্ছে।
বুলবুল আসে তার ঘরে। সন্ধ্যের পর বাচ্চাদের জন্য নাস্তা খাওয়া হয়নি। বুলবুল ছিল না।সবে বাজার থেকে ফিরে ওদের জন্য নাস্তা বানিয়েছে।আদর করে কাছে ডেকে ওদের নাস্তা দিল।
মায়া ক্যালেন্ডার এর সামনে গিয়ে দাঁড়াল।১৯৫৯ সাল-ডিসেম্বর ৩০ সময়ে দাঁড়িয়ে আছে সে।আর দু’দিন পর তার আর মীর এর বিবাহ বার্ষিকী। দেখতে দেখতে কিভাবে সময় পাড় হয়ে গেল।গত সাত বছর ধরেই প্রতি বিবাহ বার্ষিকীর দিন সে উৎসুকতা নিয়ে পথের বাঁকে চেয়ে থাকে মায়া।এই বুঝি মীর ফিরে আসবে। টেলিফোন এর রিং টি বেজে উঠবে। রিসিভার তুলতেই বোধহয় অপরপ্রান্তে থেকে মীর এর কণ্ঠটা ভেসে উঠবে ভাবে! কিন্তু,আর আসে না তাঁর শব্দ।আর আসে না তাঁর কল।
মায়া বাচ্চাদের দিকে একবার তাকিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে ছাদে চলে যায়। খণ্ডিত একখান চাঁদ উঠেছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে মায়া।মীর নামক মানুষটি আজ সঙ্গে নেই।তবু ভাবে,এক আকাশের নিচেই দুজনের দুই প্রান্তে বসবাস।সে কেমন আছে?খুব জানতে ইচ্ছে করে! কোথায় আছে! মায়াকে মনে পড়ছে তো!নাকি সব ভুলে স্বার্থপর এর মত বেঁচে আছে!
মায়া মীর কে স্বার্থপর ভেবে নিজেই আঁতকে উঠল।তাঁর স্বামীর সাথে যে স্বার্থপরতার শব্দটি বেমানান।
ঘাড় সোজা করে তাকায় সরু চোখে সোজা দিকে। যতদূর চোখ যায় শুধু রাতের নিস্তব্ধ অন্ধকার, কোথাও কোথাও গাছের ডালের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো। গ্রামের কিছু মুরুব্বিরা হাতে টর্চ নিয়ে দল বেঁধে কোথাও যাচ্ছে।কেউ কেউ যাচ্ছে চৌরঙ্গী হাট বাজারে। বাজারে একটা টেলিফোন এসেছে।সেখান থেকে দূরের আত্মীয় স্বজন, আপনজনদের সাথে সবাই কথা বলার উত্তম সুযোগ পেয়েছে।আলিমনগর আগের থেকে অনেক টা উন্নত হয়েছে। কেবল থমকে গেছে চৌধুরী বাড়ি। সে-ই সাথে নীরব হয়ে গেছে চঞ্চল সে-ই মায়াবতী।
আহির আসে ছাদে। সিগারেট খাওয়ার জন্য।এসেই মায়াকে দেখায় আড়ালে সিগারেট ফেলে দেয়। মায়াকে একা সময় কাটাতে দিবে ভেবে আবার চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই মায়া দেখে ফেলল।সে ডাকে আহির কে।আহির পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।মায়া বলল “কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন শুনেছি।আপনিও তো লিখছেন।একটা কবিতা শোনান।”
“উমম,একটা কবিতা লিখেছি।”
“নাম কি কবিতাটির?!
‘অপেক্ষা’
“শোনান”
আহির সুরেলা কণ্ঠে বলল কবিতাটি।
‘আমি অপেক্ষা করি,
ঘড়ির কাঁটার শব্দের ভেতর,
যেখানে প্রতিটা টিকটিক শব্দে
তোমার নাম উচ্চারণ করে।
অপেক্ষা মানে শুধু থেমে থাকা না,
অপেক্ষা মানে,
নিজের ভেতরকে প্রতিদিন
একটু একটু ভেঙে ফেলা।
জানালার পাশে বসে
আলো নিভে যেতে দেখি,
তোমার আসার কথা ভেবে
অন্ধকারটাকেও আপন ভাবি।
সবাই বলে—
“এত অপেক্ষা কোরো না,”
কিন্তু কেউ জানে না
এই অপেক্ষার মাঝেই
আমি এখনো তোমাকে বাঁচিয়ে রেখেছি।
যদি একদিন আসো,
হয়তো আমাকে আগের মতো পাবে না,
তবু এই অপেক্ষা,
আমার সবচেয়ে গভীর ভালোবাসা হয়ে
তোমার দিকেই তাকিয়ে থাকবে।
এক পুড়ে যাওয়া হৃদয়ের শুধু,
অক্ষয় থাকবে।
মায়া দীর্ঘ নিঃশ্বাস টেনে ফেলে বলল ‘অপেক্ষা আমরা মৃত নয়,বরং জীবন্ত মানুষের জন্য করতে করতেই এক সময় আমরাই মরে যাই।সব অপেক্ষার প্রহর শেষ হয় না, কিছু অপেক্ষা মানুষকে বদলে দেয়।অপেক্ষা করতে করতে আমরা মানুষটার চেয়ে তাঁর স্মৃতিটাকেই বেশি ভালোবাসতে শিখি।যার জন্য অপেক্ষা করি, সে না এলেও-অপেক্ষাটা থেকে যায়।অপেক্ষা হলো ভালোবাসার নীরব প্রমাণ।এক নীরব মৃত্যু। দেহের মৃত্যু সবাই দেখে। যদি প্রিয় মানুষগুলো আত্মার মৃত্যুর যন্ত্রনাটা দেখত, তবে ছেড়ে যাওয়ার আগে বোধহয় একটাবার ভেবে নিত।”
(সমাপ্তির প্রথম অংশ)
সময়টা ছিল ১৮৭০ সাল। রাতটি ছিল অস্বাভাবিক নীরব। চারপাশে সঙ্গী ছিল চাদের আলো।একটি শিমুল গাছ।শিমুল গাছটির স্পর্শে আলগোছে বসে ছিলেন এক ছদ্মবেশী রাখাল বাঁশিওয়ালা- সুফিয়ান হায়দার। হায়দার বংশের একটি নক্ষত্র। শ্যামবর্ণে ঘেরা এক সুদর্শন পুরুষ।যার রাজ্যে জুড়েই ছিল রহস্য। অসমাপ্ত বানি। অসমাপ্ত প্রেম।
সে-ই রাতে রাখাল জমিদার কণ্যা কে আকৃষ্ট করে তাঁর বাঁশির সুরে। মুগ্ধকর সুরে ছুটে এসেছিল ফারদিনা সেদিন। কিন্তু রাখাল বাঁশিওয়ালা ছিলেন প্রতিশোধের নেশায় মোড়ানো এক মানব। কিন্তু কে জানত, রাখাল সেদিন জমিদার কণ্যার রুপেই মুগ্ধ হবেন! রাখাল বাঁশিওয়ালা – সুফিয়ান হায়দার কে দেখে সেদিন জমিদার কণ্যা ফারদিনাও প্রেমে পড়ে।সময় গড়াতে গড়াতে এক পর্যায়ে শুরু হয় তাঁদের প্রেম কাহিনী। জমিদার কণ্যার স্বপ্নের সাম্রাজ্যে ছিল একটি ক্ষুদ্র সংসার। রাখাল বাঁশিওয়ালা আর সে গড়বে সেই সংসার! কিন্তু ভাগ্য আর সেই সুযোগ,দিল কই! তাঁদের মাঝে বাঁধা হল তালুকদার বংশের নরখাদক – পাষান সন্তান গুলো। যাদের মস্তিষ্ক জুড়ে ছিল কুসংস্কার!কত মানুষ ধরে বেঁধে বাঘের খাদ্য বানিয়েছে!এক সময়ে বোনকে বাঁচাতে শিশুদের রক্ত সংগ্রহ করে খালি করেছে অপর মায়ের বুক।
পাষান খেয়াল ফেসে যায় সুফিয়ান হায়দার। চক্রে পা পিছলে পড়ে ফারদিনা।একটি গ্রাম,একটি ব্রিটিশ দল,একটি ভয়ংকর ডিল- পরিবর্তন করে দেয় সুফিয়ান হায়দার এর জীবন। ধ্বংস করে ফারদিনা ও তাঁর ভালোবাসার বাঁধন। পূর্ণতার ছোঁয়া পেতে পেতে ফারদিনা মৃত্যুবরণ করে তাঁর প্রিয় মানুষটার হাতে। সুফিয়ান হায়দার এর সেদিন বুক কেঁপেছে,হাত কেঁপেছে, হৃদয়টা ভেঙ্গে চুরমার হয়েছে। সমুদ্র আঁচড়ে পড়েছিল মাথার উপর। যেদিন নিজ হাতে ফারদিনাকে মেরেছিল।একটি গ্রাম আর শতশত গ্রামবাসীকে বাঁচাতে কোরবান দিয়েই ছিল সেদিন নিজের ভালোবাসাকে। কিন্তু কে জানত, তাঁর ভালোবাসার মানুষটি বেঁচে আছে! সৃষ্টিকর্তা তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে।অথচ সে মরেছিল ঠুকরে ঠুকরে।একটি ভুলের কারণে শেষ হয় নওয়াব বংশ। ধ্বংস হয় হায়দার বংশ। আলিমনগর থেকে হারিয়ে যায় তালুকদার বংশের সন্তানরা। একতরফা ভালোবেসে আজমাত নুরবেক বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছে।এক তরফা ভালোবেসে হেলেনা বেঁচে ছিল মৃত্যুর স্বাদ নিয়ে।
ফারদিনা! মর্মাহত অবস্থা থেকে ফিরে এসে প্রথম খুঁজেছিল তাঁর ভালোবাসা সুফিয়ান হায়দার কে। পায়নি! কিভাবে পাবে! বেঁচে ছিল না যে! গুলিবিদ্ধ হয়ে মানুষটি দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেছিল।আর ফারদিনা বেঁচে ছিল তাঁর রয়ে যাওয়া স্মৃতিগুলো আঁকড়ে ধরে। নিজের সন্তানকে ঘিরে।
অমর ছদ্মবেশী রাখাল বাঁশিওয়ালার হাতের ছোঁয়ায় তৈরি হয়েছিল একটি বই।দ্য সাইলেন্ট ম্যানর!সে কি জানত,বইটি অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে!তাকদির তাঁকে বইটি সম্পুর্ন করতে দিল না যে।সে সাজিয়েছিল বইটি নিজের সবটুকু আবেগ দিয়ে। লিখেছিল না হওয়া মানুষটি কে ঘিরে। সবশেষে বইটি প্রকাশিত হয়,বইটি ঘিরে শতশত মানুষের একটাই প্রশ্ন – সুফিয়ান হায়দার শেষ কি বলে যেতে চেয়েছিল?কি ছিল তাঁর মনের মধ্যখানে লুকিয়ে!এমন কি বাক্য,যা তিনি ব্যতীত কেউ জানতেন না!আগাম দিনেও কি সে-ই অপ্রকাশিত সত্যটা অপ্রকাশিতই রয়ে যাবে!
জেবুন্নেছা বেগম। তিনি কেন তাঁর স্বামী কে নিজ হাতে মেরেছিল,তা যে আজও অজানা।
হিংসে, প্রতিশোধ, দ্বন্দ্ব, কুসংস্কার কখনো শান্তি বয়ে আনে না।বরং উপহার দেয় ধ্বংস।
১৯৫২ সালের শীত ভেজা উদাস দুপুরে মায়া ছুটে যায় জঙ্গলে। বাঁশির সুর পেয়ে। সেদিন তাঁর প্রথম দেখা হয় মীর জাফান শন ওরফে মীর হায়দার এর সাথে। বেঁচে থেকেও মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করার সময়টা যেন ঠিক সেদিন থেকেই শুরু হয়েছিল। বেদনা, হাহাকার, আ’র্তনাদ,সব যেন শুরু হয় সে-ই জঙ্গলের মধ্যে থেকেই।বাবার মুখে এক মায়াবতীর বর্ণণা শুনে ব্যাকুল হয় মীর। জানতে পারে সে-ই মেয়ের সাথেই বিয়ে ঠিক হয়ে আছে তাঁর। অতঃপর ছুটে আসে থাইল্যান্ডের রাজ্য থেকে ভারতে। দেশের মাটিতে। হাজারো বাঁধা বিপত্তি পাড় হয়ে পূর্ণতা মিলেছিল তাঁদের। কিন্তু সেদিন পূর্ণতা মিলেও যেন মিলেনি। তাঁদের মাঝে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় নওয়াব শেহজাদা। অপহরণ করে মীর কে।বি’ষ পানে করিয়ে মেরে ফেলে তাঁর জমজ ভাই নীড় কে। ভালোবাসা, দ্বন্দ্ব, হিংসে সেদিন নওয়াব শেহজাদা কে জড়িয়ে ধরেছিল। অত্যাচার করেছিল অমানবিক ভাবে মীর কে।তবু শেষ পর্যন্ত নিজের ভুল বুঝতে পারে মায়ার দেয়া তাঁকে প্রথম ও শেষ চিঠির মাধ্যমে।কে জানে, সে-ই চিঠিতে কি ছিল।
শত বাধা পেরিয়েও সেদিন মীর জাফান শন ওরফে হায়দার বংশের বংশধর ছুটে আসে তাঁর মায়াবতীর কাছে। বাকরুদ্ধ হয়ে যাওয়া নারীর কণ্ঠে ফের শব্দ ফিরে আসে মায়ার। স্বামীকে মৃত ভেবে নিজেকে তিলে তিলে শেষ করতেই পুনরায় হাঁসি মিলে সেদিন। কিন্তু,সেই হাঁসি আর বেশিদিন স্থায়ী হল না।
এডওয়ার্ড এর চক্রে পড়ে মীর ফিরে থাইল্যান্ডে। এরপর আর আসি বলেও আসেনি। তাঁর মায়াবতী যে আজও সন্ধ্যে নামার পড়ে একটা কলের জন্য অপেক্ষা করে।পথ চেয়ে থাকে। তাঁর সন্তান’রা যে বাবার অপেক্ষায় চেয়ে থাকে।
দ্য সাইলেন্ট ম্যানর অসম্পূর্ণ বইটি অবশেষে সম্পুর্ন করে মায়া। প্রকাশিত করে বইটি!
প্রকাশক আহির মির্জা!নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে হারিয়ে আহির মির্জা গোয়েন্দা নামক শব্দটি মুছে ফেলে নিজের নামের অংশ থেকে।আজও যে সে পথ চেয়ে থাকে- তাঁকে ফেলে রেখে যাওয়ার মানুষটির জন্য।
সব হারিয়ে আহির মির্জা শূন্য। শূন্য পথিকের মতন সেও অন্ধকার পথে চেয়ে রয়।
১৯৫৯ পহেলা জানুয়ারি। দিনটি প্রতিদিন এর মতই শুরু হয়। একাকীত্ব এর ছায়ামূর্তিরা চারপাশে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। তৃষ্ণা গতরাতে ট্রেনে উঠে।সাথে তাঁর মা ছিলেন। আজকের দিনে মায়াকে তৃষ্ণা শুভেচ্ছা জানায়।তাই গতকালই চলে এসেছে। ছোট্ট বেলা থেকেই মায়াকে চাচাতো নয় বরং নিজের মায়ের পেটের বোনের মতোই দেখছে সে। সারাদিন মরার মত পড়ে থাকে মায়া,এই দৃশ্য তাঁর ও যে ভালো লাগে না। অনেকবার বলেছে শহরে চল। আমাদের সাথে থাকবি।মায়া প্রথমবার রাজি হয়েও পড়ে আর যেতে চাইল না।বলে,উনি যদি বাড়ি ফিরে আমাকে না দেখেন, তবে যে কষ্ট পাবেন। উনাকে দেয়া টেলিফোন নম্বরটি আমাদের।কল করলে এই নম্বরে করবেন, যদি কল দিয়ে আমাকে না পান”
মায়ার মুখে সেদিন এমনটি শুনে তৃষ্ণা খুব কেঁদেছিল।তবু এই কথার বিপরীতে জবাব দেয়ার মত শব্দ তাঁর কাছে ছিল না।
মাহির ও ফারিয়ান তৃষ্ণার সাথে খেলা করছে উঠোনে।মায়া দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছে আর মৃদু হাসছে। তাঁর সন্তান দুটো সারাজীবন এইভাবে হেঁসেযাক তাই প্রার্থনা করছে।তাঁর মতন ভাগ্য যাতে ওঁদের না হয়!মনে মনে এহেন প্রার্থনা শেষে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করল।আহির ও রাফিদ বসার ঘরে বসে আছে। শালুক বেগম এর পায়ের দিকের শক্তিটা হঠাৎ লোপ পাচ্ছে। মায়াকে বলেন ‘আমার জন্য একটু সরিষার তেল গরম করে নিয়ে আয়। এরপর পায়ে মালিশ করে দে।’
মায়া মাথা কাত করে সম্মতি জানিয়ে রান্নাঘরে চলে যায়। রান্নাঘর থেকে চৌরঙ্গী হাটের রাস্তাটা দেখা যায়।মায়া উঁকি দিয়ে ওদিক পানে দেখছে। আসছে না নতুন কেউ। নতুন গাড়ি নিয়ে কেউ প্রবেশ করছে না। অগ্নীল এর মত অশ্ব নিয়ে কেউ ছুটে আর আসছে না।
মায়া শালুকের পায়ে তেল মালিশ করছে। শালুক মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলেন ‘আজকে তোর বিয়ের সাত বছর পূর্ণ হবে। ভাবতেই অবাক হচ্ছি, আমার সেই ছোট্ট মায়া কত বড় হয়েছে,মা হয়েছে।দুই সন্তানের জননী। দোয়া করি,যেন আদর্শ মা হতে পারিস”
“মা, উনি ফিরে আসুক সে-ই দোয়া করলে না!”
শালুক থ’হয়ে গেলেন। অসহায় এর মত তাকায় ঘুরে মেয়ের দিকে।মায়ার গাল ছুঁয়ে বললেন “সবসময় দোয়া করিরে মা,যেন তোর হাসিখুশি জীবনটা আবার ফিরে আসে।মীর যেন ফিরে আসে।”
“আমার মন বলছে উনি ফিরে আসবে।” বলল মায়া।খুব আত্মবিশ্বাস এর সাথে।
শালুক অন্যদিকে চোখ সরান। তিনি কিছু ভাবেন। তাঁর ভাবনার জগতে মীর।মায়া শালুক এর অভিব্যক্তি দেখে বলল ‘কি ভাবছো মা!”
“কিছু নয়!” শালুক এর কণ্ঠ ভাঙ্গা।
‘বলো মা!”
শালুক সময় নিলেন। বললেন ‘মীর বেঁচে আছে তো!কোন দুর্ঘটনা বা কোন কারণে…! এখানে এসে শালুক থেমে যান।মায়ার চোখ জোড়া ফুলে উঠে। টলমল করে জল জমে। বুকের ভেতর এক প্রকার বিস্ফারিত সৃষ্টি হয়।বলল ‘না মা! উনি যেখানেই আছেন ঠিক আছেন।হয়ত ফিরেও আসবে।”
“ফিরুক আমিও চাই। কিন্তু তুই ধরে নে আর ফিরে আসবে না।গত সাত বছর ধরেই তো অপেক্ষা করে করে শেষ করছিস নিজেকে।এবার একটু সামাল দে নিজেকে।”
মায়া হেসে বলল “নিজেকে সামলে নিয়েছি তো মা। কিন্তু তারজন্য অপেক্ষা আমি করেই যাব। ভালোবাসার বিপরীত শব্দ যেন অপেক্ষা। সে-ই অপেক্ষায় রইলাম আমি তাঁর। ফিরে আসবেন আমার জন্য, আমাদের সন্তানের জন্য।”
“আমি প্রতিনিয়ত বলি,মাহির ফারিয়ান যেন ওঁদের বাবাকে একবার হলেও নিজের চোখে দেখতে পারে।বাবা বলে ডেকে জড়িয়ে ধরতে পারে।”
“তোমার দোয়া বেফলে যাবে না।”
মায়া তেলটা নিয়ে উঠে দাড়াতেই নওয়াব শেহজাদা হাজির হয়। নওয়াব শেহজাদা নিজেকে আত্মসমর্পণ করেছিল চৌধুরী পরিবার এর কাছে। ক্ষমা চেয়েছিল সবার কাছে। শালুক, আমজাদ এবং মায়াও সেদিন তাঁকে ক্ষমা করে দেয়। এরপর থেকে মাঝেসাঝে আসা হয় চৌধুরী বাড়িতে তাঁর। মাহির, ফারিয়ান এর সাথে এসে কখনো কখনো খুনসুটি করে।
তাঁর হাতে একটি ফুলের তোড়া। শেহজাদা শালুক কে সালাম দিল।মায়া কিছু না বলে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়।সেখানে তেলটা রেখে উঠোনে বাচ্চাদের কাছে চলে গেল। শেহজাদা তাঁর পিছু পিছু গিয়ে দাঁড়ায়।মায়া তাঁর সম্মুখে এসে বলল “আমার প্রতি বিবাহ বার্ষিকীতে এসে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানান, কিন্তু কেন!
“এই দিনটি তোমার জন্য বিশেষ দিন।” বলে তোড়াটা তাঁর দিকে এগিয়ে দেয়।মায়া ধন্যবাদ জানায়। মাহির এসে ফুলের তোড়াটা নিয়েও খেলতে শুরু করে।
শেহজাদা মায়ার দিকে চেয়ে উশখুশ করতে করতে বলল “একটা কথা বলার ছিল!”
“বলুন”
“আমিও সবসময় চাই মীর ফিরে আসুক। এরপর একদিন এই বিষয়ে রাফিদ এর সাথে কথা বলি। রাফিদ আমার কথামত থাইল্যান্ডে পাড়ি জমায়। কিন্তু, রাফিদ জানতে পারে মীর ওরা আর বেন হো তে থাকে না। এবং কি ওদের কম্পানিতেও রেস্ট্রিকশন সিল দেয়া ছিল। আশেপাশের প্রতিবেশী, এবং কম্পানির অন্যান্যদের থেকে খোঁজ নিলেও আর তাঁরা কেউ মীর এর হদিস দিতে পারে না। জানি না ও কোথায়। কিন্তু এত বছর পড়েও যখন আর ও ফিরে আসল না,তবে বোধহয় আর আসবে না।”
থেমে একবার ঢোক গিলে বলল “আমি তোমাকে ভালোবাসি মায়া।আজও। কিন্তু তোমাকে চেয়ে আর নিজেকে কষ্ট দিচ্ছি না। শুধু একটাই প্রার্থনা করি, সৃষ্টিকর্তা যেন তোমার সব প্রার্থনা কবুল করেন। তোমার মীর কে ফিরিয়ে দেন।এটাই আমার শেষ চাওয়া।আর আজকের পর আমি আর কোনদিন তোমার সামনে আসব না।এই দেখাই তোমার সাথে আমার শেষ দেখা।”
চোখ ভেজা শেহজাদার। মাটিতে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে শেষ বলল “ভালো থেকো আমার না হওয়া ভালোবাসা।” বলে শেহজাদা এক পা দু পা করে পেছনে সরে এরপর দিক বদলে চলে যায় চোখের জল মুছতে মুছতে। বিড়বিড় করে একবার সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্য বলল “মীর যদি বেঁচে থাকে,আর যদি মায়ার হয়েই থাকে সে, তবে তুমি ফিরিয়ে দিও”
(শেষ অংশ)
দিন ফুরিয়ে রাতের আধার নেমে আসে ধরণীতে। বৃষ্টি বইছে বাইরে।হালকা গুঁড়িগুড়ি বৃষ্টি।আলিমনগর শীতের দিনে হঠাৎ বৃষ্টি,এটা আশ্চর্যজনক কিছুই নয়। স্বাভাবিক।বাইরে নিশুতি পরিবেশ। ঘড়ির সময় এখন ঠিক রাত এগোরাটা। তৃষ্ণা মায়াকে শুভেচ্ছা জানায়নি এখনো।মীর নেই।তবু তৃষ্ণা মায়ার একটুখানি খুশির জন্য তাকেই শুভেচ্ছা জানায়।আর বলে,মীর ভাইয়া ফিরে আসবে।মায়া এহেন কথায় খুব খুশি হয়।মাহির , ফারিয়ান ঘুমিয়ে পড়েছে।ফারিয়ান এখনো আধঘুমে। নড়েচড়ে।মায়া ওঁর শিয়রে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।হাত বোলাতে বোলাতে বারবার তাকায় ঘড়ির দিকে।সময় বেড়ে বারোটা ছুঁইছে।
মায়া বিছানা থেকে উঠে বারান্দায় গেল। বাইরে অজানা কারো আগমন নেই।সে ঘরে ফিরে আসে। পায়চারি করতে শুরু করে। প্রতিদিনের অপেক্ষার চেয়েও প্রতি বিবাহ বার্ষিকীর অপেক্ষায় যেন মায়ার ভরসাটা একটু বেশি ধারাল হয়। তাঁর আত্মবিশ্বাসে আজকের দিনে বেশি জোড় থাকে।মীর বোধহয় ফিরে আসবেই।নয়ত কল করবে।
মায়া ঘুরে ঘুরে টেলিফোনটির আশেপাশে যায়। বেজে উঠে না কল।
মায়া দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ঘড়ির দিকে ফের তাকাল।এগোরাটা ছাপ্পান্ন মিনিট। বিবাহ বার্ষিকীর সময়টা এখনো শেষ নয়।মায়া আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে।ঠিক সেই মুহূর্তে টেলিফোনটি বেজে ওঠে।মায়া হকচকিয়ে গেল। টেলিফোন এর কাছে গিয়ে রিসিভারটা তুলে নেয়।হাতটা কাঁপছে।ওপাশ থেকে কোন শব্দ নেই।মায়া কাঁপা গলায় আগ বাড়িয়ে বলল “হ্যালো!কে?
“আমি”
The Silent Manor part 81
(দ্য সাইলেন্ট ম্যানর এর অসম্পূর্ণ এবং সম্পুর্ন বইয়ের কাহিনী পুনরায় সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে।আর দ্য সাইলেন্ট ম্যানর – উপন্যাসটি পুরোটাই ছিল একটি ফ্ল্যাশব্যাকে মোড়ানো।মায়া – দ্য সাইলেন্ট ম্যানর প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডের কাহিনী তাঁর সন্তানদের পড়ে শোনাচ্ছিল। অর্থাৎ পুরোটাই ছিল সাত বছর আগের এবং রাখাল বাঁশিওয়ালার ফ্ল্যাশব্যাকের কাহিনী। তোমাদের বোঝার সুবিধার্থে বললাম।
বিঃদ্রঃ : আমার লেখনী, আমার গল্পের বিষয়বস্তু যাদের সাথে মিলেনি, তাঁদের নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই। শুধু বোঝালাম, কুসংস্কার, প্রতিশোধ,একটা ভুল কখনোই আমাদের জীবনকে সুন্দর করে না। উপন্যাস – কাল্পনিক।আমরা হারাই কল্পনার রাজ্যে।
আশাকরি তোমরা সবাই জানো,দ্য সাইলেন্ট ম্যানর বইটি নবকথন থেকে আসবে ইনশাআল্লাহ।বইয়ে এই সাত বছরের পূর্বে মীর জাফান শন ওরফে মীর হায়দার এর সাথে কি ঘটেছিল তা তুলে ধরলেও ধরতে পারি। রেখে দেওয়া রহস্য উন্মোচন হলেও হতে পারে।আর টেলিফোন এর ওপারে কে ছিল?সেটাও বইয়ে থাকলেও থাকতে পারে।
যদি বলো এই সমাপ্তের নাম কি! আমি বলব অর্ধ সমাপ্ত।_
শুরু থেকে এই পর্যন্ত যারা যারা দ্য সাইলেন্ট ম্যানর এর সাথে ছিলে সবাইকে আমার অশেষ ভালোবাসা। আমি কৃতজ্ঞ।এত এত ভালোবাসা দ্য সাইলেন্ট ম্যানর কে দেয়ার জন্য।দ্য সাইলেন্ট ম্যানর শুরু-০৩/১০/২০২৫
শেষ ০১/০২/২০২৬!
যারা শেষ পর্যন্ত ছিলে স্মৃতির সাথে তোমার বক্তব্যও রেখে যেও।সবাই ভালো থাকবে।দেখা হবে নতুন কোন উপন্যাস নিয়ে ইনশাআল্লাহ)-

APU ETAO OSOMAPTO?
Ami ei sopmati mani…naaa.
😅💔
apu eto osomapto golpo r kokhono pori nai khub kste hocche eta ses kore tobe jodi telifoner oparer lokta mir eta ullekh thakto tahole kstota kom hoto 😅💔
Priyo writer,prothomei amar valobasa o shroddha neben. 100 ta pora golper majhe bishesh kokhono na volar moto ekti osomapto kahini “The silent manor” Golpo. Sufian ar fardinar golpo hridoy chuyeche. Protita muhurto ami nije ke tader majhe onubhob korechi. Jeno ami oi somoyta te tader samnei chilam. Fardinake mere sufiyaner hahakar, bintir kole matha rekhe sufiyaner mrityu, vai ke seshbarer moto jol khayoate na parar koshto, char chorer malik ke ar phire na payoar koshto, ma ke jariye gourir etim hoye jaoya ei sobkichu amake eto poriman kadiyeche bole ba likhe prokash korte parbo na. Biswas na korleo amar bhogoban janen ami proti ta shobdo sotti likhchi. Mohinir mrityu ar shehejadar shorbosso haranor jontronatao amar khub koshto legeche. Ahir mirja ke rekhe Gourio hotat hriye gelo. Mohini ke hariye Rafid eka theke gelo songihin. Golpo ta eto sundor bhabe lekha hoyeche proti ta line jeno ek notun rohosser unmochon. Oshadharon upanyaas. Kintu er season 2 berale besi khusi hobo. Jekhne thakbe jeherunnesa tar husband ke keno mere chilo? Sufiyan mrityur age ki sotti bolte cheyechilo? Bintir ki holo? Amjad chowudhurir sathe binti kibhabe jorito? Sufiyaner sonar bashi ke churi korechilo? Sufiyaner ghore or nijer mrityu kibhabe hobe sei painting gulo sotti ki sufiyan nijei ekechilo na onnokeu? Eta ki coincident na onno karor kaj? Mirer ar shehejadar asol ma baba ke chilo? Gouri beche ache na mrito? Mirakkeler moto mohni beche jaye ni to? Talukdar bari sotti puro sesh hoyechilo to? Ek chokh wala loker ki holo? Maya ke last call ke kore chilo? Sat bochore mir keno elo na? Ei sob proshner uttor jeno pai pls pls. Mone korun eta apnake lekha ekti chithi amar torof theke. Jodi apni eta kono din poren tahole pls amar nam ar date soho pls eta apnar page e post korben. Ami apnar theke eta upohar hisabe asha korlam. Pls nirash korben na asha rakhchi. Future ei rokom sundor sundor aro holpo amader upohar deben pls. Good night. 12/2/2026, 4:19a.m.