Home The Silent Manor The Silent Manor part 79

The Silent Manor part 79

The Silent Manor part 79
Dayna Imrose lucky

মায়া শালুক এর কোলঘেঁষে বসে আছে বসার ঘরে। শালুক অনেকবার তাঁকে বলেছেন,পরনের সাদা কাপড়টা বদলে রঙিন শাড়ি পর।উনার এ দুটো কথা বলতে ভীষণ গাল কেঁপেছে।মীর নেই,মায়ার স্বামী জীবিত নেই, সে-ই প্রতীকচিহ্ন মায়ার শরীর জড়িয়ে আছে।যা দেখতে শালুক এর, আমজাদ এর ভালো লাগছে না। আমজাদ কিছু এ বিষয়ে বলেন না।তবু নিজের আদরের কন্যা কে চোঁখের সামনে এত কম বয়সে বিধবার সাজটা বড্ড যন্ত্রণা দিচ্ছে তাঁকে।মায়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল।সে পরিবর্তন করবে না এই শাড়ি,এই রং।এটাই যেন তাঁর জীবনের সাথে মিশে যাওয়া বাস্তব এক অধ্যায়। শালুক মায়ার মাথায় বিলে কেটে দিচ্ছিলো।মায়া এক মনে ভাবছিল মীর এর কথা। এক পর্যায়ে চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ল। শালুক দেখেন ঐ জল।উনার বুকটা ছ্যাত করে উঠে।

রাফিদ বসে আছে অপর পাশের সোফায়। সাথে আহির।আজ ফিরে যাবে আহির কলকাতায়। সেদিন রাফিদ এর অনুরোধে থেকে গিয়েছিল।আজ আর সময় অবশিষ্ট নেই যেন।শহর থেকে তাঁর মায়ের কল এসেছিল।আহির তাঁকে জানায় আজই ফিরছে সে।আহির এর হাতে দৈনিক পত্রিকা। রাফিদ সারারাত ঘুমোয়নি। মাথাটা যন্ত্রনায় ফেটে যাচ্ছে। বুলবুল এর কাছে এক কাপ চা চেয়েছে। বুলবুল সবেই চা হাতে হাজির হয়। রাফিদ কে একবার ডাকে ও। রাফিদ সাড়া দেয়নি। দ্বিতীয়বার রাফিদ এর কাছে ঘেষে বলল “ছোট বাবু!
রাফিদ ধ্যান ভেঙ্গে তাকাল।হাত বাড়িয়ে চা’টা নেয়। আহির পত্রিকায় নজর রেখেই রাফিদ কে লক্ষ্য করে জিজ্ঞেস করল “মনটা ভীষণ ভার বুঝি!”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

রাফিদ দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে বলল “পৃথিবীতে সবচে কষ্টকর মুহূর্ত কোনটি জানিস!”
আহির পত্রিকাটা রেখে বলল “নিজের প্রিয় বন্ধুর লা’শটা খাটিয়া করে কাঁধে বহন করা।এই ভার যে সহ্য করার মত নয়।”
রাফিদ আড়ালে চোখ মুছে। মায়াকে লক্ষ্য করে তাকাল।আদরের বোনটা আজ নিঃস্ব।ভাই হিসেবে এই দৃশ্য মর্মাহত করছে তাকে।
আহির বলল “আমি তাহলে এখন বের হই।”
তাঁর কথাটা শালুক এবং মায়ার কানে গেল।মায়া ঠিক হয়ে বসে। শালুক বললেন “আজই চলে যাবে!
“হুঁ আন্টি!আর থেকে কি হবে! মিলনের হ’ত্যাকারী কে আজও খুঁজে পেলাম না। গোয়েন্দা হিসেবে আমি ব্যর্থ।” সত্যটা স্বীকার করল না আহির।সে চায় না তাঁর ভালোবাসার মানুষটি তাঁর অনুপস্থিতিতেও অসম্মানী হোক।আজ হোক বা কাল যদি ফিরে আসে! তবে তাঁকে যেন কেউ খু’নি না বলতে পারে।
রাফিদ আহির কে দেখে বুলবুল কে বলল “উপর থেকে আহির এর ব্যাগ নিয়ে এসো।” বুলবুল ছুটে চলে যায় ব্যাগ নিতে।

অরুণ এসেছে গাড়ি নিয়ে।বাড়ির চৌকাঠ এর ওপার অপেক্ষা করছে।আহির ধীর গতিতে এগিয়ে যায় চৌধুরী বাড়িটি ছেড়ে। তাঁর সাথে সাথে আমজাদ চৌধুরী, শালুক, জয়ন্তন,মায়া তৃষ্ণা সহ সকলে আসেন এগিয়ে দিতে। রাফিদ শুধু তাঁদের সুন্দরতম মুহূর্তগুলো মনে করছিল। না চাইতেও চোখের সামনে সব চিত্র গুলো ভেসে উঠছে। তাঁর চারপাশে স্মৃতির দলগুলো যেন হাতরাচ্ছে।এই অনূভুতির নাম কি সে জানে না। খোঁজার চেষ্টাও করছে না।
আহির পৌঁছে গাড়ির কাছে। অরুণ ব্যাগ গাড়িতে তুলে।আহির ঘুরে একবার নীড় এর কবরের দিকে মীর ভেবে
তাকায়। দৃষ্টি সরিয়ে চৌধুরী বাড়ির সকলের পানে দেখল। শেষ পলকটি এসে থামে রাফিদ এর দিকে।বলল

“আসছি..!”
রাফিদ নিরুত্তাপ ভঙ্গিতে শেষ একবার আহির কে জড়িয়ে ধরে। বন্ধু নামক মানুষটির সাথে এটাই বোধহয় শেষ আলিঙ্গন। শেষ দেখা। শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। আলিঙ্গন এর সময়টাতে রাফিদ চোখ মুছে।সবটা জুড়ে শূন্যতা ঘিরে ধরছে ধীরে ধীরে।
আহির গাড়িতে চেপে বসে।তাকায় একবার মায়ার দিকে।ফের সবার থেকে বিদায় নিয়ে শেষ শব্দটি বলল ‘ভাগ্যে থাকলে কোন একদিন কোন এক কারণে আবার আমাদের দেখা হোক।’
বলে চলে যায় সে। রাফিদ কয়েক কদম এগিয়ে যায় ছুটে যাওয়া গাড়িটির দিকে চেয়ে চেয়ে।ভাবে,সময় কেন এত দ্রুত যায়।সময়রা কেন ছুটে পালায়! প্রিয়-আপন মানুষ গুলোকে কেন কেড়ে নেয়া হয়!ভাবে, নিজেকে প্রশ্ন করে,অথচ,জবাব মিলে না।

দিন ফুরিয়ে রাতের আধার নেমে আসে। গতকাল মীর অন্ধকার কুঠুরি থেকে বের হতে পারেনি।আজ মাহফুজ বলেছে আজ বেরোতে পারবে।কাবির নেই। শেহজাদা আসবে বলে কেউ নিশ্চিত নয়।কাবির এর ধারণা অনুযায়ী শেহজাদা আলিমনগর।তবু আসতে পারে কোন না কোন কারণে বলে মীর এখনো অপেক্ষা করছে। তাঁকে এক নজর দেখবে।এখনো তাঁকে দেখার সুযোগ হয়নি।
ঘড়ির কাঁটা এসে রাত এগোরোটায় থেমেছে।চারপাশটা নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেছে।মীর পায়চারি করছে। পায়চারি করতে করতে এক পর্যায়ে মাহফুজ বেশ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে।বলল “আপনি এখুনি বের হয়ে যান, শেহজাদা শুনছি আজ আইবো।”

মীর বলল “আসুক।ওকে একবার দেখতে চাই।”
“না। ঝামেলা হইবো। আপনি যাইতে পারবেন না আর।গেলেও হয়ত আরো সময় অপেক্ষা করতে হইবো।তারচে অহনই যান।”
মীর ভাবতে শুরু করে। তাঁর ভাবনাজড়িত মুখটি দেখে মাহফুজ ফের বলল “এত কি ভাবতেছেন,পালান এখুনি! আমার পিছু পিছু আসুন!”
মীর ঠোঁট কামড়ে কিছু ভেবে মাহফুজ এর কথায় রাজি হয়ে ওঁর পিছু পিছু গেল।মাহফুজ এ গলি,ও গলি পার হয়ে একটা গুহার মত স্থান থেকে বের হয়। চাঁদনী রাত জুড়ে এক নিশুতি পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। বাদুড়ের আলাপ আলোচনা শোনা যায়। সুনসান চারদিক বেশ।মীর গোলাকার ঘাড়ে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করে। মাহফুজ মীর এর হাতে একটা টর্চ ধরিয়ে দেয়। সামনের দিকে হাত বাড়িয়ে দেখায় একটি অশ্ব।কালো রঙের।বলে ও “অশ্বটা নিয়ে চলে যান,ওর সাহায্যে রাতের মধ্যে পৌঁছাইতে পারবেন।”

মীর মাহফুজ কে দেখে।ঝট করে উঠে মাহফুজ কে জড়িয়ে ধরে বলল “তোর ঋণশোধ আমি কোনদিন করতে পারব না।যত দ্রুত সম্ভব তুই ও পালিয়ে যা।”
“আমায় নিয়া ভাবতে হইবো না।আপনে পালান।”
মীর আর কিছু না ভেবে অশ্বের পৃষ্ঠায় চেপে বসে।অশ্বের লাগাম টেনে নিল। মাহফুজ হাতের ইশারায় দিক বলে দেয়।যেদিকে আলিমনগর এর পথ।মীর মাহফুজ কে দেখে শেষ মৃদু হেঁসে চলতে শুরু করে তাঁর অশ্ব নিয়ে।

রাত বাড়ছে।অশ্ব ছুটছে ওঁর সবটুকু গতিবেগ কাজে লাগিয়ে।প্রায় ঘন্টা তিনেক পথ চলার পর থামে সে।মীর বড্ড ক্লান্ত হল।জল তেষ্টা পেয়েছে। আশেপাশে জলের সন্ধানে চোখ বুলায়।দেখা গেল দূরে কিছু লণ্ঠন এর আলো দেখা যাচ্ছে। সেখান থেকে একতারার শব্দ ভেসে আসছে। নিশ্চয়ই সেখানে গেলে জল পাবে ভেবে মীর এগোয়।
চাঁদনী রাত।একটা পুরোনো গাছের নিচে মাটিতে গোল হয়ে বসে আছে ক’জন গ্রামবাসী আর একজন বাউল। কারও কোলে একতারা, কারও হাতে খোল, কারও কণ্ঠে গভীর দরদ। গান ভেসে যাচ্ছে ধীরে ধীরে,হাওয়ার সাথে, পাতার ফাঁক গলে। চাঁদের আলো গাছের ডাল ছুঁয়ে নেমে এসেছে তাদের মুখে, চোখে-মুখে এক ধরনের শান্ত উজ্জ্বলতা। আশেপাশে নীরবে বসে আছে কিছু মানুষ,কেউ চোখ বন্ধ করে গান শুনছে, কেউ চুপচাপ তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। এই রাতে যেন সময় থেমে আছে। গান, চাঁদ আর মানুষের নিঃশ্বাস মিলেমিশে একটাই অনুভূতি। শান্তি আর গভীর ভাব। এত রাতেও এরকম একটি পরিবেশ মীর কে মুগ্ধ করল। থাইল্যান্ডে বসে সংগ্রহ করে বাঙালিদের লালনগীতি, লোকগান তাঁর শোনা হত। আজ নিজ কানে শুনছে। তাঁদের সৃষ্ট গানের সুরে মায়াকে ভীষণ রকম ভাবে মনে পড়ছে। গভীর দম টেনে ভেতরে নিল। আবার ছাড়ল।

বাউল থামেন। লম্বা লম্বা চুল গুলো মেলে রাখা।একটা অশ্বের অবয়ব চোখের কর্ণিয়ারে ভেসে ওঠায় ঘুরে তাকাল।মীর কে দেখলেন।উনার চাহনির সাথে সবাই তাকায়। বাউল কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে মীর কে ডাকল ইশারায়।মীর অশ্ব থেকে নেমে ধীরে এগোয়।
বাউল মীর কে জিজ্ঞেস করলেন “এত রাইতে কই যাও?
মীর সবার দিকে চোখ বুলিয়ে বলল “খুব দূরে একটা কাজে গিয়েছিলাম।এখন বাড়ি ফিরছি।রাতেই ফিরতে হবে। অনেকক্ষণ যাবত ছুটছি। জলতেষ্টা পাওয়াতে এখানে দাঁড়িয়েছি।”
মীর এর মুখে জলের কথা শুনে একজন জল নিয়ে আসে। বাউল মীর কে তাঁর পাশে বসতে বলে।মীর সময়ের অভাব বলে বসতে চাইল না।তবু উনি জোর করে বসালেন।জলটা এগিয়ে দিলেন।মীর খেল।বাউল মীর কে ভালো করে দেখে বললেন “দেইখা তো ভালো ঘরের পোলার মত লাগতেছে। শরীরে আঘাত ক্যান!ঘটনা কি! যেদিক দিয়ে আইছো ওদিকে তো কেউ সচরাচর যায় না।”
মীর নিশ্চুপ থাকল কিছুক্ষণ। এরপর মানুষগুলো কে বিশ্বস্ত মনে হওয়ায় সমস্ত ঘটনা খুলে বলে।উনারা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন মীর এর দিকে।

মুহুর্তটা স্তব্ধতায় ঘেরা। মীর বিদায় নিতে চাইল তাদের থেকে। যাওয়ার আগে বলল “আমার লালনগীতি, লোকগান বেশ ভালো লাগে।”
বাউল বললেন “তুমি একটা গেয়ে শোনাও!যে যা পছন্দ করে সেও তা পারে।একটা সুর তোলো।আমরা বাদ্যযন্ত্র ধরতেছি।দেখবা মনটা ভালো হয়ে গেছে।” উনার সাথে সবাই হইহইই করে উঠল। একজন খোল হাতে বললেন “একটা সুর ধরো বাজান, কাউরে উৎসর্গ কইরা।”
মীর যেন বিপাকে পড়ল।দুই দিকের দু’ পথের দিকে দেখে।অশ্ব কে দেখল একবার। এরপর শ্বাস ফেলে বলল

“একটা লালনগীতি মনে পড়ছে।গানটা আমার শেষ জীবন কে উৎসর্গ করলাম।”
বলা শেষে উনারা একতারা,খোল বাজাতে শুরু করে।
মীর গলা ছেড়ে গাইতে শুরু ক
“আমি যেদিন যাইবো রে মুর্শিদ, আমার নিজের বাড়ি,
আমার জন্য কিনা আইনো সাদা মার্কিন শাড়ি।
আমি যেদিন যাইবো রে মুর্শিদ, আমার নিজের বাড়ি,
আমার জন্য কিনা আইনো সাদা মার্কিন শাড়ি।
তুমি নিজ হাতে নববধূ সাজাইও রে..
হে লালচাঁদ বাবা রে,
তুমি ধীরে ফিরে চইলা ফিরে চাইও রে।
আমায় দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধরিল,
প্রসব বেদনা মা কতই না সইল।
আমায় দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধরিল,
প্রসব বেদনা মা কতই না সইল।
তুমি ধীরে ধীরে ধীরে যাইও রে মুর্শিদ,
আমার নিজের বাড়ি,
আমার জন্য কিনা আইনো সাদা মার্কিন শাড়ি।
আমি যেদিন যাইবো রে মুর্শিদ আমার নিজের বাড়ি,
আমার জন্য কিনা আইনো সাদা মার্কিন শাড়ি।”

মীর এর গলায় গানটা শুনে সবাই মুগ্ধ হয়।সুরেলা, স্নিগ্ধ কণ্ঠ।মীর আড়ালে চোখের জল মুছে। বাউল দেখে ফেললেন মীর এর চোখের জল। বললেন “কাঁদলে যে,কি মনে কইরা কাঁদলা?
মীর শোক আচ্ছন্নের নিবিড় কণ্ঠটা মিশিয়ে বলল “মৃত্যু খুব কাছে হয়ত। সবসময় আমার ভেতরে মৃত্যু ঘোরপাক খায়। এতটুকু জীবনে কত জল্পনা কল্পনা।কত পাপ,কত দ্বন্দ্ব! এতটুকু ছাড় দিতে চাই না কাউকে।”
থেমে মীর করুণ গলায় বলল “আমার মা বাবা নেই। জন্মের পর থেকে উনাদের আদর পায়নি। শুনেছি উনারা বেঁচে নেই,যখন ভাবি আমার মা বাবা আর দুনিয়ার বুকে বেঁচে নেই,তখন পুরো দুনিয়াটা শূন্য শূন্য লাগে। কখনো কখনো বেঁচে থাকার ইচ্ছাটাও মরে যায়।”

বাউল বললেন “এই কষ্ট আমি বুঝি! আমার ও মা বাবা নাই।খুব ছোডকাল থেইকাই আমি এতিম। তোমার প্রতিটা সময় ভালো কাটুক। দোয়া রইল।”
মীর অস্পষ্ট ভাবে বলল “আর ভালো কোথায়, বাঁধা পড়েই আছে সুখের দুয়ারে। ভেতরে আর ঠুকতে পারছি কই!”
বাউল বললেন “আজ রাইত আমগো লগে থাকলে ভালো হইতো, কিন্তু ওদিকে যে তোমারে সবাই মৃত ভাবতেছে।যাও,বাড়ি ফিরো, তোমার বউরে লইয়া আর একদিন আইসো।”
মীর নিঃশব্দে হেসে বিদায় নেয়।

পথে যেতে যেতে শেহজাদার কথাও ভাবছে। এতক্ষণে ও নিশ্চিত সংবাদ পেয়ে গেছে সে পালিয়েছে। খুঁজতেও নেমেছে। কিভাবে কোথা থেকে হানা আনে বলা যাচ্ছে না।হোক সামনে বা পিছে কোথাও থেকে কেউ ওত পেতে আছে বলে মীর এর মন বলছে।তবুও সে না থেমে চলতেই থাকল। কিন্তু পথ যেন শেষ হচ্ছে না।কে যেন বলেছিল,বিপদ, আতঙ্ক,ও ঝুঁকির পথ খুব সহজে এগোয় না।মীর যেদিন কথাটা শুনেছিল সেদিন হেসে উড়িয়ে দিলেও আজ তার সত্যটা প্রমাণ পাচ্ছে।

রাতের শেষ তৃতীয়াংশে পড়েছে।চাঁদটা ঢলে পড়ছে।মীর টর্চ জ্বালাল না। যতটুকু পথ এসেছে চাঁদের মসৃণ আলো ধরেই।এখন সে আছে খোলা মাঠের মতন একটা সুনসান জায়গায়।অশ্ব ছোটার সাথে সাথে শো শো শব্দে বাতাস কানে বিঁধছে।খোলা মাঠটা পার হলেই আলিমনগর।মীর হাঁফ ছেড়ে বাঁচার চেষ্টা করল, তাৎক্ষণিক মুহূর্তে একটা তীরফলক এসে তাঁর অশ্বের পায়ে বিঁধে।অশ্ব সহ মীর ছিটকে দূরে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে যায়।অশ্বটা মাটিতে পড়ে যেতে যেতে আবার উঠল।মীর উবু হয়ে পড়ে।হাতের কণুই তে আঘাত পেয়ে কঁকিয়ে উঠল।চোখ দুটো মেলে তাকাল। সামনে তিন চারটে অশ্ব। শেহজাদা আক্র’মন করেছে মীর নিশ্চিত হল।সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।শার্টে ময়লায় ভরে গেছে। নিজের দিকে একবার তাকিয়ে শেহজাদাকে দেখল।শেহজাদা অশ্ব থেকে নেমে দাঁড়াল। পাগড়ির আঁচল দিয়ে ঢেকে রাখা মুখটি প্রদর্শন করল।হাতে একটি তলোয়ার। তলোয়ারটা মাটির সাথে টেনে টেনে ধীর পায়ে হেঁটে মীর এর দিকে এগোলো।মীর রুষ্ট চোখে তাকিয়ে আছে। শেহজাদার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখল মীর।পুরো শরীরে তেজ এর একটা আবির্ভাব। যেমনটি ছিল সুফিয়ান এর।কাবির এর দেয়া বর্ণণার সাথে মিল পাচ্ছে।শেহজাদা মীর এর শার্ট এর ময়লা ঝেড়ে বলল “পালাচ্ছিস কেন?

“শয়তান এর হাত থেকে বউকে রক্ষা করতে!”
“ভালো ওকে আমি আগে বেসেছি।”
“তুই যেদিন ওকে প্রথম দেখেছিস, তাঁর আগে থেকে আমি ওকে ভালোবাসি, এবং বিয়েও ঠিক ছিল। অবশেষে ও আমার স্ত্রী।”
“আমি মায়াকে গত দীর্ঘ সময় ধরেই ভালোবেসে আসছি।ওর বর্ণণা শুনেই ওর প্রেমে পড়েছিলাম।এক বন্ধুর থেকে ওর বর্ণনা শুনে।তখন মায়া বিদেশে ছিল।যখন বিদেশ থেকে ফিরল,তখন ওকে জঙ্গলে বসে প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলেছি।”
“ও তোর তাকদিরে ছিল না।” বলল মীর।

“ছিল ঠিকই, কিন্তু কবুল করার আগেই তুই ওকে বিয়ে করে নিস।এটা কেন পেরেছিস জানিস,কারণ তুই ওর সাথে এক ছাদের নিচে থাকতে পেরেছিস।তোর একটা পরিবার ছিল। সবকিছু তোর জন্য সহজ ছিল।যে সুযোগ টা আমার হয়নি। আমি শেহজাদা সবসময় সর্ব দিক দিয়েই ঠকে গেলাম জানিস তো, সে-ই ছোট বেলা থেকেই সবকিছু থেকে বঞ্চিত।মা বাবার আদর থেকে বঞ্ছিত হয়েছি।আমায় মা বাবা দশ বছর বয়সেই আমায় এতিম করে চলে গেছে পরপারে।তুই..তুই তো অট্টালিকায় বড় হয়েছিস, আমি পারিনি রে।মা বাবা দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার পর তাঁর আর আপন বলতে কেউ থাকে না। আমার ও কেউ ছিল না। খেয়ে না খেয়ে বড় হয়েছি। লোকের কথা শুনেছি।কি পেলাম এ জীবনে বল? কিছু না! না কারো আদর ভালোবাসা, না একটা মাথার উপর ছায়া।” শেহজাদার কণ্ঠ শীতল শোনায়।কণ্ঠে জোর নেই।ঠিক কিছুক্ষণ আগেও ছিল।মীর ভেবেছিল শেহজাদা নির্ঘাত তার সাথে লড়াই বাঁধাবে।সেও প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু এখন তাঁর ভাবনা ভুল প্রমাণিত হল।অবাকও হচ্ছে।

শেহজাদা জলক্রান্ত চোখে বলল “মা বাবা ছাড়া বেঁচে থাকা বি’ষের মতই বি’ষাক্ত। সে-ই বিষে’র যন্ত্র’না নিয়েই বেঁচে ছিলাম। একাকীত্ব কে মেনে নিয়েছিলাম। আঁকড়ে ধরেছিলাম আমার শূন্যতা কে। বাস্তবতা কে।আর ঠিক তেমন সময়ে আমার জীবনে মায়ার আগমন ঘটে।এক বর্ণনার মাধ্যমে। ওঁর দেখা পাওয়ার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে যাই। একজন বন্ধু জানায়, মায়া বিদেশ। আমি দেশে আসা পর্যন্ত ওঁর জন্য অপেক্ষা করি।আর যেদিন প্রথম দেখা হচ্ছিলই সেদিন তুই এসে মাঝখানে বাঁধা হয়ে দাড়াস।রাগ হয়, প্রচন্ড, ঘৃণা হয় তোকে।সব পেয়ে আসছিস তুই,তাই সিদ্ধান্ত নেই ওকে আর পেতে দেব না। সে-ই ভাবনা ধরে কত কিছুই না করলাম, ভালোবাসার লোভে তোর জমজ ভাইকে মারলাম।তোকে বন্দি করলাম।”

থেমে শেহজাদা সেকেন্ড কয়েক চুপ থেকে পুনরায় বলল “এই দুনিয়াতে সবচেয়ে ক্ষতিকারক লোভ হচ্ছে ভালোবাসার লোভ। ভালোবাসার লোভ মানুষকে ধ্বংস করে দেয়। আমি সে-ই লোভে পড়ে তোদের ধ্বংস করতে চেয়েছিলাম। অর্ধেকটা পেরেও উঠছিলাম, বাকিটা বোধহয় মায়াকে বিয়ে করলে হত। এতে করে তুই ধ্বংস হতিস। কিন্তু মীর, আমার ভাই,তুই ভাগ্যবান।তুই তোর ভালোবাসায় জিতে গেছিস।মায়া একমাত্র তোকেই ভালোবাসে।তোর মৃত্যুর মত হারিয়ে যাওয়া শূন্যতায় ও তোকে ভালোবাসছে। আমি আজ ওঁদের বাড়ি যাচ্ছিলাম। বিয়ের প্রস্তাব আর নিজের আসল পরিচয় জানাতে আমজাদ চৌধুরী কে।ঠিক সে-ই মুহূর্তে পথে তৃষ্ণার সাথে দেখা হয়। ওঁর কাছে চিঠি পাঠিয়ে পরিষ্কার জানিয়ে দেয়!যাতে আমি আর ওঁর পথে বাধা না হই।যদি হই, তবে নাকি ও নিজেই শেষ হয়ে যাবে।তুই বল ভাই, নিজের ভালোবাসার মানুষের মুখে কেউ এরকম টা শুনতে পারে!সহ্য হয়! নিশ্চয়ই না। আমার ও হয়নি। চাইলে হয়ত আমি ওকে জোর করে বিয়ে করতে পারতাম, কিন্তু জোর করে আর সব হলেও ভালোবাসা হয় না।”

মীর নিরুত্তাপ হয়ে শেহজাদার কথাগুলো শুনছে।হাতটি তাঁর মুষ্টিবদ্ধ ছিল।খুলে ফেলেছে এখন। শেহজাদা মীর এর শার্টটা ঝেড়ে বলল “জানিস, জীবন্ত কবর কাকে বলে! একতরফা ভালোবেসে ঠকে যাওয়া হৃদয় কে জীবন্ত কবর বলে!- আমি সে-ই কবরটাকে না হয় সাথে নিয়ে ঘুরব।বয়ে বেড়াব সমাধির ভারকে বহন করে।চলে যা,যা!তুই জিতে গেছিস! আমি হেরে গেছি! আমি শেহজাদা আজ পর্যন্ত কারো কাছে হার মানিনি।আজ মেনেছি নিজের ব্যর্থ ভালোবাসার কাছে।নারী! আল্লাহর সৃষ্টি এমন এক নিয়ামত যেখানে হিংস্র পুরুষ কে চোখের একফালি ইশারাতে হারিয়ে দিতে পারে।আমিও হেরে গেছি।তবে তুই তোর নিয়ামত কে যত্নে রাখিস।আগলে রাখিস। কষ্ট দিস না কখনো।নারী হচ্ছে কাঁচের মত, ঝাপটে ধরলেই ভেঙ্গে যাবে।” থেমে শেহজাদা মৃদু হাসে।

এরপর অনুতপ্তের স্বরে বলল “ ভালোবেসে এক নারীকে পাওয়ার জন্য পাপ করেছি। নিজের রক্তের আরেক ভাইকে মেরেছি। আমি আজ জ্বলছি মীর।এই নে, তলোয়ার ধর, আমার গলাটা কেটে ফেল।মরে যাই। বেঁচে থাকার অধিকার নেই আমার।আর বেঁচে থেকেই বা কি হবে!মেরে ফেল আমায়।” বলে তলোয়ার টা মীর এর হাতে ধরিয়ে দেয়।মীর কিছুক্ষণ তলোয়ার টা দেখে ফেলে দেয়।বলল “যে নিজের পাপের অনুশোচনা উপলব্ধি করতে পারে, তাঁকে মেরে ফেলা আরো বড় পাপ। সর্বদা প্রতিশোধের বদলে প্রতিশোধ নিতে হয় না।আজ তোর পরিবর্তন আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। অনেক পাপ করেছিস! আমার জমজ ভাইকে মেরে আরো বড় ভুল করেছিস!”

“ও যেমন তোর ভাই ছিল, তেমনি আমারও ভাই ছিল। ওকে মেরে আমিও অনুতপ্ত।”
মীর বাকরুদ্ধ।দু কোমরে হাত রেখে গভীর দম ফেলল।বলল “মায়ার সাথে দেখা করেছিলিস,ওটাই যেন শেষ দেখা হয়! চললাম” ‌বলে মীর অশ্বের কাছে এগোয়। অশ্বের পা থেকে র’ক্ত ঝড়ছে।তীরটা লেগে চলে গেছে। তীব্র গতিতে ছুটতে পারবে না।তবু ধীরে পারবে।মীর ওঁর পৃষ্ঠায় চেপে বসে।শেহজাদা পেছন থেকে বলল “তোকে আজ মুক্ত করতেই এসেছিলাম। কিন্তু তাঁর আগেই তুই পালিয়ে এসেছিস।” মীর কিছু বলল না। অশ্বের লাগাম ধরে ঘুরে একবার তাকাল শেহজাদার দিকে। শেহজাদা মীর এর দিকে তাকিয়ে এক রহস্যময় হাঁসি দিল।মীরও একই ভঙ্গিতে হাসল।যেন তাঁরা শেষ দেখায় চোখে চোখে কথা বলছিল।

শেহজাদা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে খোলা মাঠের উপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। তাঁর সাথে থাকা এক বিশ্বস্ত অনুচর এসে পাশে দাঁড়ায়।সে বলল “ওস্তাদ, তাঁরে এমনে ছাইড়া দিলেন!
শেহজাদা আকাশের দিকে একমনে তাকায়। কণ্ঠের রাগ বিসর্জন দিয়ে বলল ““কাউকে ভালোবাসার মতো ক্ষমতা যদি থাকে, তবে তাকে অন্যের পাশে হাসতে দেখার শক্তিটাও থাকতে হয়।ভালোবাসা শুধু কাছে পাওয়ার নাম নয়,কখনো কখনো তাঁকে দূর থেকে সুখী দেখতে পারার সাহসও ভালোবাসা-যাকে সত্যি ভালোবাসি, তাকে আঁকড়ে ধরার চেয়ে তার সুখকে ছেড়ে দিতে পারাটাই সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা। আমি না হই সে-ই পরিক্ষাই দিলাম।” থেমে চোখের জল মুছে সেকেন্ড কয়েক পর আবার বলল “কাউকে ভালোবাসা মানে এই নয় যে সে আমারই হবে,ভালোবাসা মানে সে ভালো থাকুক,যেখানেই থাকুক, থাকুক না অন্যর হয়ে।সবচেয়ে নিঃশব্দ ত্যাগ হলো, প্রিয় মানুষটাকে অন্যের জীবনে নিজের জায়গা খুঁজে নিতে দেখা। আমি দেখেছি মীর এর অনুপস্থিতিতেও কিভাবে মায়া ওকেই ভালোবাসছে।”

অনুচর বলল “আমি আজকে একটা জিনিস খেয়াল করছি,মায়ার চিঠিটা পড়ার পর থেকে আপনে কেমন যেন আচরণ করতেছেন।কি লেখা ছিল,সে মীর কে ভালোবাসে সেটা তো আপনি আগে থেকেই জানেন। এমন কিছু কইছে যে কথায় আপনে থ’হয়ে গেছেন।কি কইছে।”
শেহজাদা ওঁর প্রশ্ন এড়িয়ে বলল “ভালোবাসা মানে ত্যাগ,এক তরফা ভালোবাসা মানে হৃদয়টা মৃত।আজ থেকে আমিও মৃত। হারাতে হারাতে আমি শূন্য। শেষ এসে শূন্য বিত্তের মধ্যে এসেও আবার শূন্য হলাম।সব হারালাম। হারানোর মত অবশিষ্ট আমার জীবন ব্যতীত আর কিছুই রইল না।”

ভোর পাঁচটার দিকে মায়া ঘুম থেকে জেগে উঠে। কিছুক্ষণ আগে ফজরের আযানের ধ্বনি তে ঘুম ভাঙ্গে তাঁর। নামাজ আদায় করে জায়নামাজেই বসে আছে।কি যেন কি ভেবে হাত দুটো আল্লাহর দরবারে পুনরায় তুলে আবেগী হয়ে মনে মনে বাঁধ ভাঙার মতন কান্নায় ভেঙে বলল “কি অপরাধ করেছিলাম,যার শাস্তি এভাবে দিলে‌! বিয়ের রাতে বিধবা করলে, স্বামীকে বি-ষ খাইয়ে তোমার জিম্মায় নিয়ে নিলে!এই দুনিয়াতে বোধহয় আমি এক হতভাগী।যে কিনা তিলে তিলে মরছি!” থেমে ভাঙ্গা হৃদয়ে পুনরায় প্রার্থনা করল নিঃশব্দে “তুমি আল্লাহ চাইলে সমস্ত অসম্ভব কে সম্ভব করতে পারো, তুমি কি পারো না আমার স্বামী কে ফিরিয়ে দিতে!” এতটুকু বলে হুহু করে কেঁদে উঠে। আল্লাহ শুনছে তাঁর প্রার্থনা। তিনি যে অন্তরজামি। মুখে শব্দ নয়,মনে মনে বলাও যে উনার কাছে পৌঁছায়।

মায়া থামে।ভাবে, আল্লাহর সিদ্ধান্ত এর বাইরে যাওয়া যে পাপ।মৃত মানুষ কে ফিরে চাওয়া যে পাপ। মায়া আল্লাহর দরবারে দ্বিতীয়বার মাফ চাওয়ার আগেই বাড়ির সামনে থেকে অশ্বের টকটক শব্দ আসে।সাথে হ্রেষাধ্বনি। হ্রেষাধ্বনিটা এসেছে মীর এর অশ্বের।যেটা অশ্বশালায় বাঁধা।মায়ার কানে পৌঁছায় শব্দ।মাফ আর চাইল না। সেজদার স্থানে চুমু খেয়ে উঠে এল।ঘরের বারান্দায় গিয়ে দেখল অশ্ব থেকে নেমে কেউ ঘরের মূল দরজার দিকে এগোচ্ছে।মায়া মীর কে ঠিক নিশ্চিত করতে পারল না। হ্যালুসিনেশন ভেবে চোখ সরিয়ে নেয়।চোখ কচলে তাকাতেই দরজায় টোকা পড়ল। মায়া তাঁর ভাবনা ভুল না, সঠিক প্রমাণিত করার জন্য ছুটে নিচে গেল।সদর দরজা খুলে দিল।মীর তাঁর সামনে দাড়িয়ে আছে।মায়া কয়েক মুহুর্তের জন্য থমকে যায়‌।সে সত্য দেখছে নাকি এটাও ভুল!সে পুরোপুরি নিস্তব্ধ হয়ে যায়।চোখ দুটো টলমল করছে। ঠোঁট দুটো কাঁপছে অনবরত।মীর মায়াকে বিধবা শাড়িতে দেখল। তাঁর পৃথিবীটা বদলে যায় হঠাৎ। চোখের জল আর বাঁধল না। কাঁপা কণ্ঠে বলল “আমি মীর! তোমার স্বামী। বেঁচে আছি। তোমার ভালোবাসা এতটাই তীক্ষ্ণ যে আল্লাহ আবার আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে।এত ঝড় ঝাপটার পর তোমাকে আবার পেয়েছি।”

মায়া চোখের জল, হাঁসি সব মিলেমিশে একটা শব্দ উচ্চারণ করতে সক্ষম হল ‘আপনি’ মীর মাথা উপর নিচ করে বোঝাল। হুম!সে!মায়া ঝাপটে জড়িয়ে ধরল মীর কে। তাঁর কান্নার শব্দ দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।বাড়ির বাকিরা যার যার ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।মীর কে দেখে সবাই আশ্চর্য হলেন।
শালুক বেগম সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে দেখল মীর কে।সে শেষ সিঁড়িতে এসে ধব করে বসে পড়েন।মায়া ও মীর তাঁর দিকে ঘুরে তাকাল।মীর শালুক কে তুলে জড়িয়ে ধরে।বাকিরা একে অপরের সাথে চোখাচোখি করলেন। কেউই কিছু বুঝে উঠতে পারছেন না।সবটা সত্য না,সব স্বপ্ন ভাবছে। তৃষ্ণা নিজের শরীরে নিজে চিমটি কাটছে। রাফিদ দোতলা থেকে দৌড়ে আসে।মীর কে দেখে সে কথা হারিয়ে ফেলে।নিজেকেও ভুলে যায় কয়েক মুহুর্তের জন্য।মীর এর পা থেকে পুরো শরীর দেখল। আঘাতের চিহ্ন এর শেষ নেই।সে কি বলবে ভেবে পেল না। শালুক মীর এর আঘাতের চিহ্ন গুলো ছুঁয়ে দেখছে।

সময় গড়ায়।ভোর কেটে নতুন দিনের রোদ নিয়ে হাজির হয়েছে।মীর এবং বাড়ির সকলে বৈঠকখানায় বসে আছে। তাঁর সাথে ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা খুলে বলে।এবং এও বলে সে চৌধুরী বংশের প্রতিটি মানুষকে ভালোবাসে।বাবা থমাস-শনকেও ভালোবাসে।যা কিছু হয়েছে সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছায়।সে শেহজাদাকে ক্ষমা করে দিয়েছে। চাইলে ওকে মেরে নিজের রাগ,জিদ, প্রতিশোধ মেটাতে পারত। তবে এহেন কাজে পশু আর মানুষের মধ্যে পার্থক্য থাকবে না বলে সিদ্ধান্ত বদলে নেয়। শেহজাদাকে ওর মত থাকতে দেয়।

সবাই মীর এর মুখে সত্য শোনার পর নিরুত্তাপ। কেউই কিছু বলতে পারছে না।মীর বসা থেকে উঠে গিয়ে শালুক এর পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে।বলল “ছোট মা! আমার তোমাদের প্রতি কোন অভিযোগ নেই, অভিমান নেই। হ্যাঁ, সন্তান হিসেবে এতটুকু আক্ষেপ আমার চিরদিন রয়ে যাবে, আমি আমার নিজের গর্ভধারিনী মাকে দেখিনি, বাবাকে দেখিনি। ভাইকে দেখেনি। কিছু আক্ষেপ না থাকলে এ জীবনের মানে হয় না। তুমি মন ভার করে থেকো না।” মায়া শালুকের পাশেই বসা।মীর দুজনের পায়ের মাঝামাঝি স্থানে বসে তাঁদের দুজনের দুটি হাত এক করে চুমু খেয়ে বলল “তোমরাই আমার শান্তি, পূর্ণতা, ভরসা, ভালোবাসা।”

The Silent Manor part 78

বুলবুল একপাশে দাঁড়িয়ে আছে।ও কেঁদে কেঁদে ভাসিয়ে গামছা দিয়ে জল মুছতেছিল।মীর সবার পড়ে ওর কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। বুলবুল এর পেটে রসিকতা হাতে আঘাত করে বলল “দুইশো টাকার জন্য আমাকে ব্লাক’মেইল করবি কখন?”
শুনে বুলবুল হেসে উঠল। সে-ই সাথে সবাই হাসল। বুলবুল বলল “আর টাকা চাই না, আপনাকে আর জ্বালাব না,শর্ত দেব না, পিছু লাগব না, শুধু আপনি আমাদের সাথে চিরদিন এভাবেই থেকে যান।”

The Silent Manor part 80