স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩৩
সানজিদা আক্তার মুন্নী
রুমভর্তি ফুলের কড়া সুবাস। গোলাপ আর রজনীগন্ধার মালায় সাজানো বিছানাটা কোনো নববধূর লাজুক স্বপ্নের মতো সেজে আছে। সেই ফুলের বিছানায় বসে আছে ইকরা। পরনে ওর টকটকে লাল বেনারসি, গা ভর্তি গয়না, আর চোখে-মুখে এক অলাদা কৌতুক তার। সচরাচর বাসর রাতে মেয়েদের যেমন আড়ষ্ট বা জড়সড় হয়ে থাকার কথা, ইকরার মধ্যে তার লেশমাত্র নেই। সে বরং দরজার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছে, কখন ধ্রুব আসবে।
বেশ কিছু মুহুর্ত কাটার পর দরজা খুলে রুমে ঢোকে ধ্রুব। তার চোখেমুখে ক্লান্তির চেয়ে বিরক্তিই বেশি স্পষ্ট। ইকরার দিকে একনজর তাকিয়েই সে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এই সুসজ্জিত বিছানা আর বধুবেশে বসে থাকা ইকরা সবকিছুই তার কাছে অর্থহীন। ধ্রুব সোজা আলমারির দিকে যায়, নিজের শেরওয়ানি আর পাঞ্জাবি খুলে ছুঁড়ে ফেলে ফ্লোরে। তারপর একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে শুয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিতে থাকে।
ইকরা সব দেখছে। ধ্রুবর এই হাবভাব দেখে সে মনে মনে হাসে। সে তো জানত এমনই হবে। সবার মতো রোমান্টিক বাসর এই জন্মে তার কপালে নেই। ধ্রুব আলমারি থেকে একটা বালিশ আর কাঁথা বের করে বগলে চাপে। তারপর বিছানায় বসে থাকা ইকরার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে চরম নিস্পৃহ গলায় ঘোষণা করে,
“তোকে মা আমি বউ-টউ মানি না। তুই তোর মতো বিছানায় থাক, আমি সোফায় গেলাম।”
স্বামীর মুখে বাসর রাতে এমন প্রত্যাখ্যান শুনছে! কিন্তু ইকরা কি কাঁদছে? একদমই না। উল্টো ধ্রুবর কথা শুনে সে খিলখিল করে হেসে ওঠে। মনে হচ্ছে ধ্রুবর এই ‘বউ না মানা’র ডায়লগটা তার কাছে কোনো জোকসের চেয়ে কম কিছু না। ইকরা কোনো ভাবান্তর না দেখিয়ে নিজের স্মার্টফোনটা ধ্রুবর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে
হাসি মুখে বলে, “বউ তো মানবি না জানি, তুই তো একটা আস্ত হারামি! যা, এত কষ্ট করে সেজেছি, মেকআপ করেছি… আমার সুন্দর করে কয়েকটা পিক তুলে দে তো।”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
ধ্রুবর চোখ কপালে ওঠে যায় এ শুনে । সে তো ভেবেছিল ইকরা হয়তো সিনক্রিয়েট করবে, কান্না করবে, কিন্তু এ তো উল্টো ছবির আবদার করছে! বিরক্তি নিয়েই এগিয়ে গিয়ে সে ইকরার হাত থেকে ফোনটা ছোঁ মেরে নেয় ধ্রুব আর কর্কশ গলায় বলে, “পোজ দে।”
ইকরা সঙ্গে সঙ্গে মিষ্টি হেসে পোজ দেয়। কখনো চিবুকে হাত রাখে, কখনো শাড়ির আঁচলটা ঠিক করে নেয়। ধ্রুব অনিচ্ছা সত্ত্বেও খচাখচ চার-পাঁচটা ছবি তুলে দেয় ইকরার। তারপর ফোনটা ইকরার হাতে গুঁজে দিয়ে জানতে চায়, “আর কিছু?”
ইকরা ফোনের স্ক্রিনে ছবিগুলো জুম করে দেখতে দেখতে বলে, “হ্যাঁ, আরেকটা জিনিস জানার আছে।”
ধ্রুব ভুরু কুঁচকে তাকায়, “কী?”
ইকরা এবার ধ্রুবর দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়,তেমন ভাবে যেমন ভাবে পাওনাদার তার পাওনা চাইছে। হাত বাড়িয়ে সে বলে, “আমার সালামি দাও। যেগুলো আমার পক্ষের আত্মীয়রা তোমায় দিয়েছে।”
টাকার কথা শুনে ধ্রুবর মেজাজ আরও বিগড়ে যায় ও দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “তাহলে তুইও দে সালামি, যেগুলো তোকে আমার পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে।”
ইকরা মুখ বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে জবাব দেয়, “ব্যাঙ দেওয়া হয়েছে! তোর পক্ষের আত্মীয়রা এত কিপ্টা কেন রে? মাত্র পঁচিশ হাজার টাকা উঠেছে, এই দেখ!” বলে সে বালিশের নিচ থেকে টাকার একটা ছোট বান্ডিল বের করে দেখায়। তারপর ঝটকা দিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
ধ্রুব অপমানটা গায়ে মাখে না, বরং পালটা তাচ্ছিল্য ছুঁড়ে দেয়, “ওরে বাপরে! তোর আত্মীয়রা মনে হয় সব মহান দানবীর? আমার মাত্র চল্লিশ হাজার উঠেছে। আর ওগুলো আমি তোকে কেন দেব? ওগুলো আমাকে দিয়েছে।”
ইকরা এবার কোমর বেঁধে তর্কে নামে। সে ধ্রুবর চোখের দিকে তাকিয়ে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়, “অ্যাঁ! আমাকে যখন তুই বউ-ই মানিস না, তাহলে তুই আমার আত্মীয়র টাকা নিবি কেন? দে টাকা। দে আমার সালামি আমায় দে।”
ধ্রুব বুঝতে পারে যুক্তিতে এখন আর পারা যাবে না। সে বিরক্তি নিয়ে হাত নেড়ে বলে, “সর এখান থাইকা। এই সালামি আমার, তোরে দিমু কেন? যাহ্ হারামজাদি!”
বলেই ধ্রুব আর এক মুহূর্ত দাঁড়ায় না। বালিশ আর কাঁথা বগলে চেপে গটগট করে সোফার দিকে চলে যায়। ধপাস করে শুয়ে পড়ে সোফায়, যেন ইকরার ছায়া থেকেও সে দূরে থাকতে চায়।
ইকরা কিছুক্ষণ ধ্রুবর যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। বাসর রাতটা হয়তো ফুলের মতো কোমল হলো না, কিন্তু ইকরার কাছে এই ঝগড়াটা বেশ উপভোগ্যই মনে হলো। ইকরা ড্রেস চেঞ্জ করার জন্য ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ায়।
রাত্রির চতুর্থ প্রহর। শিকদার কুঠিরজুড়ে চলছে মহোৎসবের প্রস্তুতি। বিশাল ডেকচিতে ফুটছে আগমীকালকের অনুষ্ঠানের জন্য শাহী খানা, বাতাসে ভাসছে ঘি আর মশলার লোভনীয় সুবাস। কিন্তু এই সুগন্ধি ধোঁয়ার আড়ালে, কুঠিরের উঠোনের এক অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে কোণে বাতাসের ভারি হয়ে আছে পচা মাংস আর জমাট রক্তের উৎকট গন্ধে। সেখানে মুখোমুখি বসে তৌসির আর রুদ্র। তাদের সামনে গড়িয়ে আছে দুটো সদ্য কাটা নরমুণ্ডু। মাথার ভেতরে পচতে শুরু করা মগজগুলো কালচে আর থকথকে হয়ে গেছে। ওরা কোনো ঘৃণা ছাড়াই খালি হাতে সেই পিচ্ছিল মগজগুলো খামচে বের করে আনছে টেনে টেনে খুলি হতে। ওদের আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে পড়ছে চটচটে তরল, যা সপসপ শব্দে জমা হচ্ছে একটা পুরোনো প্লাস্টিকের বালতিতে মগজগুলো। মগজ বের করা শেষ হতেই রুদ্র একটা ভারী হাতুড়ি দিয়ে আঘাত হানে খুলিগুলোর ওপর। ‘মট-মট’ শব্দে কংক্রিট ভাঙার মতো চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় মানুষের শক্ত হাড়। সেই হাড়ের গুঁড়ো আর মজ্জাগুলোও ওরা নির্লিপ্ত হাতে ভরে নেয় বালতিতে। কাজ শেষে রুদ্র উঠে দাঁড়ায়। তার হাতে-পোশাকে লেগে আছে মগজের কণা। সে বালতিটা হাতে নিয়ে নিচু কিন্তু ভারী গলায় বলে,
“তৌসির ভাই, চলো তাইলে… মালটা দিয়া কামটা সাইরা আই।”
তৌসির রক্তমাখা হাতটা ধুতে ধুতে উঠে দাঁড়ায়। কণ্ঠে ঠান্ডা স্বাভাবিকতা নিয়েই বলে,
“হ চল। পরে আবার বাড়িতেও যাওয়া লাগব, তোর ভাবিরে একা রাইখা আইছি।”
কুঠিরের জীর্ণ মেঝের তলে লুকানো এক গুপ্ত প্রকোষ্ঠ। তৌসির আর রুদ্র সেই পাতালমুখের কাছে এসে দাঁড়ায় বালতি নিয়ে। কপাটের পাল্লা সরাতেই এক ঝলক ভ্যাপসা উষ্ণতা আর জমাটবাঁধা রক্তের উৎকট আঁশটে গন্ধ নাসিকারন্ধ্রে আঘাত করে। স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে ওরা নেমে যায় মাটির গভীর জঠরে এক গোপন নরকে। আবছা ছায়ার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে অতিকায় তিনটি লৌহ-পিঞ্জর। খাঁচার ওপাশে অস্থিরতায় ফুঁসছে তিনটি কদাকার অবয়ব আর তারা হলো তৌসিরের পোষা নরখাদক। এরা লালসার ক্রীড়নক নয়, বরং তৌসিরের জিঘাংসা চরিতার্থ করার জীবন্ত হাতিয়ার। একদা মানুষ থাকলেও, এখন তারা আদিম ক্ষুধা আর পাশবিকতার মূর্ত প্রতীক। তাদের অন্ন-জল তুচ্ছ তাদের চাই উষ্ণ রক্ত, ঘিলু আর গলিত পশুর পচা মাংসের অবশিষ্টাংশ।
রুদ্র হাতের বালতিটা কাত করে দেয় জং-ধরা ফিডিং পাইপের মুখে। মগজ, হাড় আর থকথকে কাঁচা মাংসের সেই বীভৎস কাই ‘পলপল’ শব্দে নর্দমার মতো খাঁচার ভেতর গড়িয়ে পড়ে।
খাবারের ঘ্রাণে খাঁচাবন্দি প্রেতাত্মাগুলোর মধ্যে শুরু হয় এক পৈশাচিক তান্ডব। খাবারের গন্ধে মুহূর্তেই খাঁচার ভেতর শুরু হয় পৈশাচিক উন্মাদনা। নরখাদকগুলো পশুর মতো চারপায়ে নেচে ওঠে, ঝাঁপিয়ে পড়ে খাবারের ওপর। নিস্তব্ধ ঘরটা ভরে ওঠে হাড় চিবোনোর হাড়হিম করা ‘কুড়-কুড়’ শব্দে। তৌসির ভাবলেশহীন চোখে তাকিয়ে থাকে এই বীভৎস ভোজের দিকে।
খাঁচার ভেতর একেকটা অবয়ব বোধহয় দুঃস্বপ্নের জীবন্ত রূপ। প্রথমজন, যাকে সীমানার ওপার থেকে পাচার করে আনা হয়েছে, তার একটা চোখের কোটর সম্পূর্ণ ফাঁকা। ভেতরটা দগদগে ঘায়ে ভরা, সেখান থেকে হয়তো এখনো চুইয়ে পড়ছে পুঁজ।
দ্বিতীয়জনের অবস্থা আরও করুণ। তার কান দুটো গোড়া থেকে এমনভাবে কাটা যে মাথার দুপাশে শুধুই দুটো কালো গহ্বর দেখা যায়।
তবে তৃতীয়জনের চেহারা সবচেয়ে ভয়াবহ। তার ঠোঁট চিরে একদম কান পর্যন্ত ফাড়া। খাবার চিবোনোর সময় তার মাড়ি আর হলুদ দাঁতগুলো বেরিয়ে আসে এক বিকৃত হাসির মতো।
এদের কারোরই শরীরে চামড়ার স্বাভাবিক রং নেই ধুলো, ময়লা আর জমাট রক্তের আস্তরণের নিচে উঁকি দিচ্ছে অসংখ্য দগদগে ক্ষত। তৌসিরের দেওয়া চাবুকের দাগ আর নির্যাতনের চিহ্নগুলো শরীরজুড়ে দগদগ করছে, কিন্তু সেদিকে ওদের কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। সমস্ত যন্ত্রণা ভুলে ওরা এখন মত্ত মানুষের হাড় চিবিয়ে মজ্জা শুষে নেওয়ায়।
তৌসির আর রুদ্র কিছুক্ষণ সেখানে থেকে তারপর বাড়ির উদ্দেশ্যে পথ ধরে। তৌসির বেশ দ্রুত হাঁটতেছে বাড়ি যাওয়ার জন্য তৌসিরকে এত তাড়াহুড়ো করতে দেখে রুদ্র বলে, “এত তাড়া কিসের তোমার? আস্তে আস্তে হাঁটো না।”
তৌসির অস্থির গলায় জবাব দেয়, “তাড়া আছে রে! আমার বউ যেই খন্নাস, যদি দেখে ঘুম থাইকা উঠিয়া আমি নাই, তাইলে আমার লুঙ্গি খুইল্লা নিব।”
রুদ্র মুচকি হেসে ওঠে। এমন রূপকথার মতো গল্পে আর কী-ই বা হবে! তৌসিরের মতো বাঘও বউয়ের ডরে মরে। রুদ্র কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করে, “আচ্ছা তৌসির ভাই, বউরে কেন সবাই ভয় পায়? বউরা কি এতই ভয়ংকর হয়?”
তৌসির গম্ভীর মুখে বলে, “বউ হইলো ভয় পাওয়ার চিজ। বউ মানেই আতঙ্ক!”
রুদ্র আঁতকে উঠে বলে, “তাইলে তো বিয়া করুম না আমি। এত বড় আতঙ্ক নিয়া বাঁচা যায় না।”
তৌসির এবার একটু নরম হয়ে রুদ্র কে বলে, “বউয়ের যেমন আতঙ্ক, তেমন চমৎকারও বটে। চোখের শান্তির জন্য হইলেও একটা বউ ঘরে থাকা দরকার।”
“তাইলে তুমি বলতে চাচ্ছো বিয়া করা মন্দ না?”
“মন্দ না, যদি খন্নাস কপালে না জুটে।”
এদিকে নাজহা জায়নামাজে বসে আছে। ফজরের নামাজ শেষে। ঘুম থেকে উঠে তৌসিরকে না দেখে সে ভীষণ ভয় পেয়েছিল। সিমরানকে জিনে ধরার পর থেকে নাজহা একা থাকতে পারে না মনে হয় ওর তার পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে, কেউ তাকে অনুসরণ করছে। এক অজানা আতঙ্কে সে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। পুরো ঘরজুড়ে সে একা, মনের ভেতর জিনের আতঙ্ক। অনেক কষ্টে নিজেকে বুঝিয়ে ওযু করে তাহাজ্জুদে বসেছিল। তৌসির তো তাকে একটাবার বলে যেতে পারত! এই লোকটা এমন কেন? এত রাতে সে কোথায় গেল?
নাজহার মনে বারবার একটা কথাই উঁকি দিচ্ছে সে নিশ্চিত কোনো বেগানা নারীর কাছে গেছে। কিন্তু পরক্ষণেই নাজহা সেটা মানতে চায় না। তৌসির এমন নয় তার চোখের চাহনিতে নাজহা কখনো চরিত্রহীনতার ছোঁয়া পায়নি। সে যদি তেমনই হতো, তবে বিয়ের এত দিন পরেও নাজহা কুমারী থাকত না। নাজহা নিজেকে সান্ত্বনা দেয়, তৌসির হয়তো অন্য কোনো অপকর্মে গিয়েছে। সে যেখানে ইচ্ছে যাক, তাতে নাজহার সমস্যা নেই কিন্তু বলে তো যাবে! জিনের ঘটনার পর সে ভয় পায় জেনেও তৌসির তাকে এভাবে একা রেখে যায় কোন আক্কেলে?
আরোকিছু সময় পার হয় তারপর তৌসির ঘরে প্রবেশ করে। ও প্রবেশ করে দেখে নাজহা জায়নামাজ ভাঁজ করে আলমারিতে রাখছে। এখন বাইরে ভোরের আলো পুরোপুটো ফুটে উঠেছে। পাখির কিচিরমিচির শব্দ আসছে চারপাশ বয়ে।। বেলকনির পাশের গাছটিতে একদল টুনটুনি বাসা বেঁধেছে, তাদের কিচিরমিচির শব্দ বেশি কানে ভাসছে। তৌসির নাজহার দিকে আড়চোখে একপলক তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে অতঃপর অপলক দৃষ্টিতে নাজহার দিকেই তাকিয়ে থেকে তার দিকে এগিয়ে যায়। তৌসিরকে আসতে দেখে নাজহা মাথা নিচু করে সরে যেতে চায় তৌসিরের থেকে দুরত্ব বজায় রাখা-ই শ্রেয়। নাজহার এই নীরব অভিমান দেখে তৌসির ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে , “কী হইলো? আমি কাছে আসলেই এমনে পিছনে দৌড়াও ক্যান?”
নাজহা তৌসিরের মুখের দিকে মুখ তুলে তাকায় আর রাগ সংবরণ করে বলে, “আমার সমস্যা, তাই আমি দৌড়াচ্ছি।”
তৌসির এ শুনে কর্কশ স্বরে বলে, “এই ছিনাল, এমনে ফ্যাতফ্যাত করিস না। কাছে আয়, আদর করি একটু।”
তৌসিরের কথায় নাজহা বিষাক্ত চোখে চেয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, “সরুন বলছি আমার সামনে থেকে! স্বার্থপর পুরুষ কোথাকার!”
তৌসির নাক-মুখ কুঁচকে জিজ্ঞেস করে , “তোমার সাউয়ায় আমি কোন স্বার্থের লাইগা খুঁচা মারছি যে আমারে এই তকমা দিলা?”
নাজহা এবার ঝাঁজ ছেড়ে বলে, “তো কী বলব আর? এই জিনের জন্য ভয়ে থাকি, তারপরও আপনি কোন বিবেকে আমাকে একা রেখে যান?”
তৌসির অভিমানের কারণ শুনে মেকি হেসে হাত বাড়িয়ে নাজহার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের বুকের কাছে টেনে আমে তারপর তার কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলে, “তো এই কথা সরাসরি কস না ক্যান? কইলে তো আমি বুঝতাম। আমি তোর জামাই, তোর যখন যা মনে হইবো আমারে তখন তা ফট করে কইয়া দিবি। এই জিলাপির প্যাঁচের মতো কথা চুদাইস না ছিনাল!”
তৌসিরের মুখের এই ‘মধুর’ বাণী শুনে নাজহা বিতৃষ্ণা নিয়ে বলে, “নির্জলজ্জের মতো গালাগালি করছেন কেন? লজ্জা-শরম নেই?”
“না নাই। জন্মের সময় কাপড় ছাড়াই জন্মাইছি, তাই লজ্জা নাই।”
এটা বলে তৌসির নাজহাকে আর কিছু বলার সুযোগ দেয় না। তার নরম ঠোঁট জোড়া নিজের আয়ত্তে নিয়ে নেয়। নাজহাও আর বাধা দেয় না, আবেশে চোখ বুজে নেয়। তার নরম গালে তৌসিরের খোঁচা খোঁচা দাড়ি গেঁথে যেতে থাকে। তৌসির দাড়ি সবসময় ক্লিন শেভ করে না বলেই নাজহাকে বারবার এমন খোঁচা খোঁচা দাড়ির আঘাত সইতে হয়।
তৌসির নাজহার ঠোঁট আঁকড়ে ধরা অবস্থায় অত্যন্ত ধীরহাতে তার কামিজের কাঁধ নামিয়ে দেয়। এরপর বক্ষবন্ধনীর ফিতে সরিয়ে নিয়ে নাজহার উন্মুক্ত কাঁধ ও গলায় নিজের মুখ নামিয়ে এনে প্রগাঢ়ভাবে চুমু খায়। তৌসিরের তপ্ত ওষ্ঠ যখন নাজহার কোমল গ্রীবায় ঠেকে, নাজহা মুহূর্তেই স্থির হয়ে যায়। তার শরীরের প্রতিটি স্নায়ু এক অদ্ভুত বিদ্যুৎ তরঙ্গ বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সে ধীরে ধীরে চোখ বুজে ফেলে এই অবর্ণনীয় অনুভূতিটাকে সে নিজের অন্তরে বন্দী করে রাখতে চায়। এক অজানা শিহরণ তার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে যাচ্ছে, আর সে অনুভব করছে তৌসিরের নিশ্বাসের উষ্ণতা। নাজহা চোখ বুজে তৌসিরের কোমরে দুই হাত রেখে তার পাঞ্জাবি খামচে ধরে জোরে শ্বাস নেয়। তৌসির ভেবেছিল নাজহা হয়তো তাকে সরিয়ে দেবে, কিন্তু সে তা না করে বরং সায় দেয়। তৌসির এটা অনুভব করে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না। অনুমতি যখন পেয়েই গেছে, তখন বাধা কিসে? আজ এই অবেলায় নাহয় অবহেলা আর দূরত্বের সমাপ্তি হোক। এই সিধান্তে পৌঁছে তৌসির নাজহার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করে,
”কামিজ টা খুলে নেই কৈতরি?”
তৌসিরের এই প্রশ্নে নাজহার শরীরের লোম খাড়া হয়ে যায় এই অনুভূতি একেবারেই অন্যরকম। ভয়ে, লজ্জায় আর সংকোচে তার বুক ধড়ফড় করতে থাকে নাজহার মনে হচ্ছে একঝলক তপ্ত হাওয়া আচমকা তার শরীরে বিদ্যুৎ খেলে দিয়ে যাচ্ছে। তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে কেন জানি ক্ষণিকের জন্য লজ্জায় আর আবেশে নাজহার গাল দুটো রক্তিম হয়ে উঠেছে, ঠিক যেমন গোধূলির আকাশ সূর্যকে বিদায় জানানোর সময় রাঙা হয়ে ওঠে।। নাজহা নিজেকে সংযত করে তৌসিরের কথার জবাবে মাথা নেড়ে উত্তর দেয়,
”খুলে নিন।”
তৌসির হেসে ওঠে, এই উত্তরে সে পরম তৃপ্তি পায়। বিয়ের এতদিন পর আজ বউকে নিজের মতো করে পাবে এই আনন্দ সে কোথায় রাখবে? কোথায় যায় এই আনন্দ? তৌসির যখনই আলিঙ্গনে আরও এক ধাপ এগোতে যাবে, তখনই খোলা দরজার চৌকাঠে এসে দাঁড়ান তাদের রোমান্সের দুশমন অর্থাৎ বিবিজান। উনি দাঁড়িয়েই তৌসিরকে আওয়াজ দেন,
”তৌসির বাইরে আয় পরে বউয়ের লগে লটকালটকি করবি।”
তৌসির এতটুকু শুনে স্তব্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘদিনের জমানো উষ্ণতা ঝাড়তে নিচ্ছিল সে, কিন্তু মুহূর্তেই বুক ধুকপুক করা সেই টনটনানি আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়। তৌসির স্তব্ধতা কাটিয়ে নাজহার কামিজটা পুনরায় তার কাঁধে তুলে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,
”যাই এখন পরে নাহয় এই কাজ চলমান রইবে।”
নাজহা তৌসিরের কোমর ছেড়ে দেয়। তৌসির নতদৃষ্টি নিয়ে বিবিজানের সাথে চলে যায়। নাজহা তার দিকে আর তাকায় না। তার মনে হতে থাকে, তৌসিরের কাছে সে মূল্যবান নয় তৌসির তার সঙ্গ পাওয়ার জন্য মোটেই আকুল নয়। নাজহা কী করবে? সে যা-ই মেনে নিতে চায়, তা-ই ধ্বংস হয়ে যায়। সে তৌসিরকে নিজের নিয়তি ভেবে মেনে নিয়েছিল। ভেবেছিল তৌসিরের সাথে সাধারণ একটা সংসার শুরু করলে হয়তো সে ‘তালহা’ নামক মিঠা বেদনাকে ভুলতে সক্ষম হবে। কিন্তু তৌসিরের এই সিদ্ধান্ত তাকে শান্তি দিল না। নিজের অনিচ্ছায় সে তৌসিরের কাছাকাছি যাচ্ছিল এই ভেবে যে, ঘৃণা থেকে নাহয় একটু ভালোলাগা জন্ম নিক মহাপ্রলয়ের ন্যায় ভালোবাসা না হোক, একটুখানি তো হোক! তবে তা বোধহয় সম্ভব নয়। নাজহা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঘরের চারদিকে তাকায়। নিজের বোকা বোকা ভাবনাগুলোর জন্য নিজেকে বড্ড তুচ্ছ মনে হতে থাকে তার।
সে ঠিক করে, সে আর তৌসিরের কাছে যাবে না তার সাধ মিটে গেছে। নিজেকে খুব ‘বেহায়া’ মনে হচ্ছে আজ। নাজহা বুঝল তার আসলে কোনো গতি নেই যাকেই আপন ভাববে, সেই তাকে এভাবে অবহেলা আর তাচ্ছিল্য করবে। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ওড়নাটা গায়ে টেনে নিয়ে নাজহা বিছানা গোছাতে শুরু করে। অন্যদিকে, বিবিজান তৌসিরকে ডেকে আনলেও তার মনটা নাজহার কাছেই পড়ে আছে। এতদিনে একটু সুযোগ পেল আর সব কিছু হওয়ার আগেই বিনষ্ট হয়ে গেল। বিবিজান তৌসিরকে নিয়ে সোজা কুঠিতে যান একদল মাফিয়া এসেছে তাদের সাথে সাক্ষাৎ করাতে।
মাফিয়াদের সাথে আলাপ-আলোচনা শেষে তৌসির বাড়ি ফিরে দেখে রুমে নাজহা নেই। তৌসির হতাশ হয়ে বিছানায় বসে পড়ে। তারপর পা ঝুলিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ে তিক্তকণ্ঠে বলে,
”সাওয়ার কাম বউয়ের লগে একটু ঘষাঘষি করারও দেয় না বগা।”
এটা বলে তৌসির শুয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পর নাজহা রুমে এক কাপ রং চা নিয়ে প্রবেশ করে। বিবিজান তাকে চা নিয়ে তৌসিরের কাছে যেতে বলেছেন বলেই সে এলো। তৌসিরকে বিছানায় ছন্নছাড়া হয়ে শুয়ে থাকতে দেখে সে এগিয়ে এসে পাশে দাঁড়ায় এবং বলে,
”নিন চা টা খেয়ে নিন।”
এতটুকু বলে চা-টা খাটপাসীর উপর রেখে সে চলে যেতে উদ্যত হয়। তাকে চলে যেতে দেখে তৌসির তৎক্ষণাৎ উঠে বসে নাজহার ওড়নার কোণ টেনে ধরে তাকে আটকায়। নাজহা থেমে গিয়ে বিরক্তি নিয়ে ঘাড় হেলিয়ে তৌসিরের দিকে তাকায় এবং বিতৃষ্ণা নিয়ে শুধায়,
”কি হলো?”
তৌসির উঠে দাঁড়িয়ে নাজহার ওড়নার কোণ আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে তার নিকট এগিয়ে গিয়ে বলে,
”আমার কাছে এসে বসো না একটু।”
”এখন এসব বিরিং করতে পারব না রান্নাঘরে অনেক কাজ ছাড়ুন।”
এটা বলে নাজহা ঝাড়ি মেরে ওড়না নিয়ে চলে যেতে চাইলে তৌসির পেছন থেকে ডেকে ওঠে,
”এই ছিনাল কই যাস একটু কাছে আয় না কৈতরি।”
তৌসিরের মুখে গালি শুনে নাজহা থেমে গিয়ে তার দিকে ফিরে দাঁড়িয়ে বলে তীক্ষ্ণ সুরে বলে ওঠে,
”এখন কিন্তু আমার শরীর জ্বলছে তৌসির!”
তৌসির নাজহার এই কথার জবাবে টিটকারি মেরে জবাব দেয়,
”জলবই তো যেই শরীরে জামাইর ছুয়া থাকে না সেই শরীর তো জুইল্লা চারখার হইয়া যাইবই।”
এমন যুক্তি শুনে নাজহা দাঁত চেপে তৌসিরের দিকে কটমট করে তাকিয়ে তেড়ে আসতে আসতে বলে,
”আপনার মুখ আমি আজ ছিড়ে নিব খবিস ইতর অভদ্র পুরুষ লজ্জা করে না বউকে এভাবে গালাগালি করতে নির্লজ্জ পুরুষ।”
স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩২ (২)
এই সুযোগেই তৌসির নাজহার দিকে এগিয়ে গিয়ে তার রক্তিম ওষ্ঠদ্বয় আঁকড়ে ধরে। ব্যাস, নাজহার মুখের বুলি হারিয়ে যায়। তৌসির নাজহার কোমরে হাত রেখে তার ঠোঁটে একের পর এক চুমু খেতে থাকে। নাজহা তৌসিরকে বাধা দেয় না, তবে সায়-ও দেয় না সে নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে তৌসিরের তৃপ্ত হওয়ার অপেক্ষা করে। আর সে তৌসির কে সঙ্গ কখনোই দিবে না।।

৩৩ এর পরের পর্ব গুলা চাই
Apu next part please please 🥺❤️
কামিজ টা খুলে নেই কৈতরী-)🤣😿😐
Next part taratari din please ❤️