Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩২ (২)

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩২ (২)

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩২ (২)
সানজিদা আক্তার মুন্নী

সিতুজা ওয়াসেমের জন্য খাবারের ট্রে-টা তৃষ্ণার হাতে তুলে দেন। ছেলেটা তার এখনো কিছু খায়নি ভালোমতে উঠে গেল রাগ দেখিয়ে। তৃষ্ণা যে এ বাড়িরই বউ, এই পরিচয়টা জানার পর এরশাদরা বেশ লজ্জা আর বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন। অবশ্য সিতুজা পরিস্থিতি সামাল দিতে চটজলদি প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলেন।
কম্পমান হাতে খাবারের ট্রে নিয়ে ধীরপায়ে ঘরে প্রবেশ করে তৃষ্ণা। বুকের ভেতরটা মনে হচ্ছে কামারশালার হাপরের মতো ওঠানামা করছে অজানার ভয়ে হৃৎপিণ্ডে হাতুড়ি পেটার শব্দ হচ্ছে । তৃষ্ণা ঘরে ঢুকে দেখতে পায় ওয়াসেম বিছানায় বসে আছে, দৃষ্টি তার স্থির সামনের দিকে। চোখে এক অদ্ভূত লালচে আভা ফুটে উঠেছে কিন্তু তা রাগের, নাকি কষ্টের, বোঝা দায় তৃষ্ণার পক্ষে।
তৃষ্ণা কাঁপাকাঁপা হাতে খাবারের ট্রে-টা ওয়াসেমের পাশে রাখে কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে কোনোমতে বলে,

“খে… খেয়ে নিন। সারাদিন তো কিছুই পেটে পড়েনি আপনার।”
তৃষ্ণার কথায় ওয়াসেম ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, চোখের চাউনি দিয়েই ভস্ম করে দেবে। কিন্তু আচমকাই, অদ্ভুত এক শান্ত আর ঠান্ডা গলায় সে আদেশ করে বসে,
“খাইয়ে দে।”

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

এই হুকুম শুনে তৃষ্ণা দৃষ্টি নত করে নেয়। আজ সকালে শসা কাটতে গিয়ে ডান হাতের দুটো আঙুল বেশ খানিকটা কেটে গেছে। কাটা জায়গায় নুন বা ঝাল লাগলে জ্বলে পুড়ে যায়, তথাপি ওয়াসেমের হুকুম অমান্য করার সাহস তার নেই। এর আগেও এভাবে অনেকবার সে ওয়াসেম কে খাইয়ে দিয়েছে আজও তার ব্যাতিক্রম হবে না দিতেই হবে। নিজের ভেতর হাজারো দ্বিধা আর সংকোচ চেপে রেখে সে ওয়াসেমের পাশে বসে। হাত ধুয়ে ভাতের লোকমা মাখাতে শুরু করে। তরকারির ঝোল কাটা আঙুলে লাগতেই তীব্র জ্বালায় শরীরটা শিউরে ওঠে, আঙুলগুলো খা খা করছে যন্ত্রণায়। তাও সেই অসহ্য জ্বালায় মনোযোগ না দিয়ে সে ওয়াসেমের মুখের সামনে খাবার তুলে ধরে।

ওয়াসেম নির্বিকার চিত্তে খাবার মুখে নেয়। তৃষ্ণা দাঁতে দাঁত চেপে আঙুলের যন্ত্রণা সহ্য করে তাকে খাওয়াতে থাকে। ঠিক সেই মুহূর্তেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। আয়রাদ দাঁড়িয়ে আছে দরজার চৌকাঠে।
“আ… আমি কি আসতে পারি?”
ওয়াসেম চিবানো থামিয়ে শান্ত চোখে আয়রাদের দিকে তাকিয়ে অনুমতি দেয়,
“আসুন।”
তবে তার দিকে তৃষ্ণা ফিরেও তাকায় না। কেন তাকাবে? সে পরপুরুষ। তার দিকে দৃষ্টিপাত করা পাপ, অনুচিত। আয়রাদ ধীর পায়ে এগিয়ে এসে আমতা-আমতা করে বলে,
“ওয়াসেম, আই অ্যাম সরি। আসলে আমার বাবা জানতেন না যে উনি আপনার ওয়াইফ। প্লিজ, কিছু মনে করবেন না।”

ওয়াসেম কথাটা শুনে মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে যায়। তার বুকের ভেতরটা দাউদাউ করে জ্বলছে। এক অজানা ঈর্ষা আর অভিমানে ভেতরটা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। তৃষ্ণা তো তার! তাহলে সে কেন আয়রাদের কাছে যাবে? তৃষ্ণা চলে গেলে ওয়াসেম কার ওপর রাগ ঝাড়বে? দিনশেষে কে তার এত নীরবে খেয়াল রাখবে? ওয়াসেম একবার আড়চোখে তৃষ্ণার নতজানু মুখের দিকে তাকায়। তারপর নিজের ভেতরের তোলপাড় করা অনুভূতিগুলোকে আড়াল করে সম্পূর্ণ উল্টো একটা উত্তর দেয়,
“আরে সমস্যা নেই। ওকে তুমি বিয়ে করতে পারো। ও তো নামেই শুধু আমার স্ত্রী, আসলে আমি ওকে স্ত্রী বলেই মানি না। ও তো কুকুরের মতো পড়ে থাকে এখানে। তুমি চাইলে বিয়ে করে নিয়ে যেতে পারো, আমি ওকে ছুঁয়েও দেখিনি কখনো।”

ওয়াসেমের ছুঁড়ে দেওয়া প্রতিটি শব্দ একেকটা তপ্ত শলাকা হয়ে তৃষ্ণার বুকে বিঁধতে থাকে। এক অসহ্য যন্ত্রণায় ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে অদৃশ্য কোনো হাত তার কলিজাটা ছিঁড়ে খুবলে নিচ্ছে শরীর থেকে। আকাশ ভেঙে পড়লেও বোধহয় তৃষ্ণা এতটা কষ্ট পেত না, যতটা পেল ওয়াসেমের এই নিষ্ঠুর সম্ভাষণে। যন্ত্রণায় তার অস্তিত্ব কেঁপে উঠছে, মনে হচ্ছে বুকের পাঁজরের হাড়গুলো মড়মড় করে ভেঙে কলিজাটা ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। অবিশ্বাসের ঘোর কাটছে না তৃষ্ণার এই মানুষটা, এই ওয়াসেম কী করে পারল এমন বিষাক্ত আঘাত করতে? একজন পরপুরুষের সামনে তাকে এভাবে পণ্য বানিয়ে দিল?
আয়রাদ বাকরুদ্ধ। সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এমন কথা তো তার কাম্য ছিল না! পরিস্থিতি সামাল দিতে সে থতমত খেয়ে বলে,

“আচ্ছা… আমি যাই তাহলে।”
আয়রাদ প্রস্থান করে। তবে যাওয়ার আগে এক পলক তৃষ্ণার দিকে তাকায় এক তৃষার্ত হৃদয়ের দৃষ্টি নিয়ে তাকায়। হয়তো বা হয়তো হয় মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে,
“তোমাকে আমি নিজের করব ইনশাআল্লাহ। যে তোমায় মূল্য দেয় না, তার কাছে থেকে তুমি কী করবে?”
তৃষ্ণা ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর প্রাণপণ চেষ্টা করছে। চোখের জল গিলে নিয়ে পুনরায় ওয়াসেমের মুখে খাবার তুলে দেয়। আয়রাদের সামনে অন্তত কথাটা না বললেও পারত! কোন স্বামী নিজের স্ত্রীকে অন্য পুরুষের হাতে তুলে দেওয়ার কথা এভাবে বলতে পারে? ওয়াসেম কি তবে তাকে এতটাই ঘৃণা করে? ওয়াসেম তৃষ্ণার নত হওয়া মুখের দিকে একটু ঝুঁকে জিজ্ঞেস করে,

“তোর কি খুব কষ্ট হচ্ছে? এরুপ কথা বললাম বলে?”
তৃষ্ণা এবার মুখ তুলে তাকায়। ঠোঁটের কোণে ঝুলিয়ে দেয় এক মেকি, যন্ত্রণাকাতর হাসি। তিক্ত গলায় উত্তর দেয়,
“না তো, কষ্ট হবে কেন? আমি তো কুকুর! আর আমার মতো কুকুরের আবার কষ্ট অনুভব হওয়ার কোনো কথা নাকি? যা বলছেন ঠিকই বলেছেন, ভুল তো কিছু বলেননি।”
তৃষ্ণার উত্তরে ওয়াসেম আর কোনো কথা বলে না। নিঃশব্দে উঠে চলে যায়। একটি বাক্যও ব্যয় করে না সে।ওয়াসেম চলে যেতেই তৃষ্ণা হতাশার দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। শূন্য দৃষ্টিতে চারদিকে তাকায়। কী ভয়াবহ তার নিয়তি! কী নিষ্ঠুর এই বেঁচে থাকা! তৃষ্ণার গাল বেয়ে দুই ফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ে। সে সাবধানে জলটুকু মুছে নিয়ে নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দেয়, এক বিদ্রুপের হাসি হেসে বিড়বিড় করে বলে,
“থাক…
আমি তো ভাতের লোভী কুকুরের চেয়েও হীন। আজ ভাগ্য এতটাই বিমুখ, এতটাই নিষ্ঠুর যে পথের কুকুরও আমাকে দেখে করুণার হাসি হাসবে।আর হাসবে নাই বা কেন?আমার প্রাপ্য তো এটাই আমার সাথেই তো এমন হওয়ার কথা।”

পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছে, যাদের ললাটলিখনে ঝুট-ঝামেলা আঠার মতো লেগে থাকে; চাইলেও তা পিছু ছাড়ে না। শিকদার বাড়ির বাসিন্দারা এই তালিকার ঠিক শীর্ষেই অবস্থান করে। বিপদ এদের ঘাড় থেকে তো নামেই না, উল্টো মনে হয় বিপদ এদের ভালোবেসে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে আছে। আজকের দিনটাও তার ব্যতিক্রম নয়।
​ধ্রুব আর ইকরার বিয়েটা সবেমাত্র নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়েছে। সবাই ভাবছে এবার অন্তত শান্তি মিলবে, কিন্তু বাড়ি ফেরার পথেই বিপত্তি। যে জিন কিছুদিন আগেই বিদায় নিয়েছিল, সে আজ আবারো ভর করেছে সিমরানের ঘাড়ে।
​ঘরের ভেতর এখন থমথমে অথচ অদ্ভুত এক হাস্যকর পরিস্থিতি। তৌসির এসে দাঁড়ায় সিমরানের ঠিক মুখোমুখি। জিনের প্রভাবে সিমরানের দৃষ্টিতে এখন বুনো ভাব। তৌসির আর ধৈর্য ধরতে পারে না। জিনরূপী সিমরানের দিকে তাকিয়ে তিক্তকন্ঠে সে বলে ওঠে,

​”মা আমার জিন, তুই দয়া করে জুতার বারি খেতে না চাইলে এখান থেকে ভাগ। তোর যন্ত্রণা সহ্য হয় না আর।”
​তৌসিরের হুমকি শুনে জিন দমে যাওয়ার পাত্র নয়। উল্টো সিমরানের বড় বড় চোখ দিয়ে কটমট করে তৌসিরের দিকে তাকায় সে, তারপর ঝাঁঝালো গলায় বলে,
​”আগের বার মিষ্টি দেসনি, এবার মিষ্টি না দিলে যামু না।”
​জিনের এমন আবদার শুনে তৌসিরের মেজাজ চড়ে যায় সপ্তমে। একরাশ বিরক্তি আর তিক্ততা নিয়ে সে একবার চারদিকে চোখ বুলিয়ে নেয়, যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না পরিস্থিতিটা। তারপর কর্কশ গলায় জবাব দেয়,
​”পয়সা মনে হয় তোর নানীর সাউয়া দিয়া আয়। যে তোর মতো ছিনাল জিনরে আমি মিষ্টি খাওয়ামু নিজের টাকা দিয়া।”

​এমন গালি শুনে জিনের আত্মসম্মানে লাগে। সে তড়পিয়ে উঠে বলে,
​”তুই এত কিপ্টামি করিস ক্যান? তুই এত কিপ্টা ক্যান?”
​অপমান সহ্য করতে না পেরে তৌসির দাঁত কিড়মিড় করে এগিয়ে যায়। ঝট করে সিমরানের চুল টেনে ধরে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলে,
​”হ ছিনাল আমি কিপ্টা! তুই দে পয়সা আমারে, তখন ছাইড়া দিমুনে কিপ্টামি।”
​ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘরে ঢোকেন তৌসিরের বাবা। ছেলের মুখে এমন অকথ্য ভাষা আর পুত্রবধূর সাথে এই ধস্তাধস্তি দেখে তিনি স্থির থাকতে পারেন না। সোজা এগিয়ে এসে কষে এক চড় বসান তৌসিরের গর্দনায়। রাগে কাঁপতে কাঁপতে তিনি বলেন,
​”তুই এই জিনের সাথে এত কথা বলস ক্যান? যা ঘরে যা, নয়তো জুতা খাবি। এত বড় হয়েও তোর শয়তানি গেলো না।”

​তৌসিরকে বাবার হাতে মার খেতে দেখে ফাজিল জিনটা খিলখিল করে হেসে ওঠে। যেন বিরাট কোনো তামাশা দেখছে, এমন ভঙ্গিতে টিপ্পনী কেটে বলে,
​”ছিঃ ছিঃ, এত বড় পোলা হইয়া বাপের হাতে মাইর খাস!”
​লজ্জা, অপমান আর রাগে তৌসিরের ফর্সা মুখ লাল হয়ে ওঠে। বাবার সামনে আর কিছু করার উপায় নেই দেখে সে সিমরানের চুল ছেড়ে দেয়। কিন্তু যাওয়ার আগে জিনের দিকে তাকিয়ে চাপা ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে বলে,
​”যদি তুই মানুষ হইতি তাইলে তোর সাউয়া ফারতাম আমি, ছিনাল কোথাকার!”

কথাটা শেষ করেই তৌসির দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। সে জানে, আর এক মুহূর্ত দেরি করলেই বাবার ভারী হাতটা আবারও তার পিঠে এসে পড়ত তার। তবে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, এত বড় বয়সে বাবার হাতের এই মার তার আত্মসম্মানে লাগে না। বরং মারের সেই জ্বলুনির মাঝে সে এক ধরণের তৃপ্তি খুঁজে পায়।
​আজকালকার দিনে কজন বাবার মেরুদণ্ড এত শক্ত যে, ভরপুর যৌবনে পা দেওয়া ছেলের চোখে চোখ রেখে শাসন করবেন? চারদিকে তাকালে তৌসির দেখে, বাবারা আজ সন্তানদের ভয়ে জুবুথুবু, পাছে ছেলে কিছু মনে করে! কিন্তু তৌসিরের বাবা আলাদা। তার গলার স্বর আজও ঘরের দেয়াল কাঁপায়, তার চোখের দিকে তাকালে আজও তৌসিরের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। এই যে অসীম ক্ষমতা, ছেলের ওপর এই যে অটুট অধিকারবোধ এটাই তৌসিরের গর্ব। তার বাবা আজও এই সংসারের অবিসংবাদিত রাজা, যার সামনে মাথা নিচু করতে তৌসিরের কোনো কুণ্ঠা নেই। তৌসির আজও তার বাবার কাছে সেই ছোট্ট তৌসির।

ইকরাকে বাসর ঘরে বসিয়ে দিয়ে ধ্রুবর জিম্মায় বুঝিয়ে দিয়ে নিজের ঘরে পা বাড়ায় নাজহা। মনটা বিষাদে আচ্ছন্ন, এক তীব্র বিষক্রিয়া ছড়িয়ে পড়েছে শিরা-উপশিরায়। চোখের সামনে জ্যান্ত একটা মানুষের মৃত্যু দেখার পর মস্তিষ্ক স্থির থাকে কী করে? বাপ-চাচাদের সাথে আজ কোনো বাক্যবিনিময় হয়নি তার তারাও নিজেদের মতো প্রস্থান করেছেন। নাজহারও ইচ্ছে ছিল না কথা বলার। ঘরে এসে গোসল সেরে নিজেকে কিছুটা সামলে নেয় সে, চেষ্টা করে সবার সাথে স্বাভাবিক আচরণের। চেষ্টা না করেও তো উপায় নেই কি করতে হবে।

এইমাত্র ঘরে পা রাখার পর তৌসিরের দেখা মিলল তার সেই কবর দেওয়ার পর আর মেলেনি। সদ্য গোসল সেরে ঘরে এসেছে তৌসির। ভেজা চুল থেকে টুপটুপ করে পানি ঝরছে তার। কোমরে একখানা জরাজীর্ণ গামছা-লুঙ্গি জড়ানো, গায়ে ঠুসটাস করে মাখছে ঝাঁঝালো সরিষার তেল। তৌসিরের শরীরটা বড্ড সুঠাম, পৌরুষদীপ্ত। নাজহা যতবার দেখে এই দেহটা, ততবারই এক অমোঘ আকর্ষণে আটকা পড়ে। আজও তার ব্যতিক্রম ঘটল না সে আটকে পড়ল আহাআ কি এক বিস্ময়কর ব্যাপার কি এক মুগ্ধ আকর্ষণ। মোহমুগ্ধ নয়নে সে তাকিয়ে থাকে তৌসিরের দিকে, তাকিয়ে থাকতে থাকতে অজান্তেই এগিয়ে যায় দু-এক পা নাজহা তৌসিরের দিকে । গামছার ওপর লুঙ্গি জড়াতে জড়াতে নাজহার এই দৃষ্টি লক্ষ্য করে তৌসির লক্ষ্য করে বাঁকা হেসে বলে ওঠে,

“কিতা লো ছিনাল? এমনে আমার সাউয়ার দিকে তাকাইয়া আছো ক্যান?”
তৌসিরের এমন অশ্লীল সম্ভাষণে ভড়কে যায় নাজহা। মুহূর্তেই ঘোর কেটে যায় তার। সামান্য বিমোহিত হওয়ার সুযোগটুকুও তার কপালে নেই। নাজহা চোখের চাহনি অন্যদিকে সরিয়ে নিয়ে বলে,
“কিছু না। এখন গোসল করলেন যে? এতক্ষণ কী করছিলেন?”
তৌসির নিজের মনেই জবাব দেয়,
“এতক্ষণ তো এই কনে-বর এসব নিয়া দৌড়াদৌড়ি করলাম, তাই এখন করতাছি। ক্যান? তোমার কোনো সমস্যা আমার গোসলে?”

কথাটা বলতে বলতে তৌসির নাজহার দিকে এগিয়ে আসে। নাজহা বিরক্তি প্রকাশ করে বলে,
“আমার সমস্যা হতে যাবে কেন? আমি শুধু জিজ্ঞেস করলাম। মনে হয় আপনি আমার কথা খুব শুনেন যে, আমার সমস্যা হবে আর আপনি সেটার সমাধান করবেন!”
তৌসির তীক্ষ্ণ চোখে নাজহার মুখমণ্ডল পরখ করতে করতে বলে,
“ঠেস মারলা নাকি লুসিয়ান কে মারায়?”
নাজহার ভেতরটা জ্বলে ওঠে মারছে মারছে তো আবার কড়া কথা বলছে নাজহা পাল্টা জবাব দেয়,
“ঠেস মারব কেন? আপনি তো পশুর মতো কাজ করলেন! জ্যান্ত কবর দিয়ে দিলেন। আমি কত আকুতি করলাম, শুনলেন না। এর থেকেই বুঝলাম আমি কতটুক মূল্যবান আপনার জীবনে। আমাকে তো মানুষই মনে করেন না, মূল্য দিবেন কী করে?”

নাজহার কথায় খানিকক্ষণ সময় নিয়ে নিশ্চুপ থাকে তৌসির তারপর নিচু কিন্তু ভয়ংকর গলায় বলে,
“বেশি প্রেম চুদাইস না। নয়তো তোরেও ওর পাশে জ্যান্ত কবর দিমু। ওর কথা বাদে অন্য কথা বললে বল।”
তৌসিরের এই আচরণটা মেনে নিতে কষ্ট হয় নাজহার, কিন্তু আজ আর ও প্রতিবাদ করে না। সেইদিন বিবিজানের প্রহার আর আজকের এই অবিশ্বাস করা সাথে নিষ্ঠুরতা সব মিলিয়ে নাজহার মনের গহীনে অভিমানের পাহাড় জমতে থাকে। তৌসিরের এই হুমকিটুকুও সে সেই অভিমানের খাতায় টুকে নেয় নিঃশব্দে। তারপর কোনো কথা না বলে ধীরপায়ে ওয়াশরুমের দিকে চলে যায়। আর কথা বলে খারাপ হবে না। রাগ করলেই যদি সব হতো তবে আজ এই পরিস্থিতি তার দেখতে হতো না। তাই থাক না অভিমানী শ্রেয় হয়ে থাক। তৌসির নাজহা কে চুপচাপ চলে যেতে দেখে লুঙ্গির গিঁট শক্ত করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে নাযেম চাচার ঘরে আসে আজ আসর জমে উঠেছে এখানে। সবাই নাযেম চাচার ঘরে বসে আছেন । তৌসির ঘরে ঢুকেই নাযেম চাচার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়,

“আমাদের যে মাল দেওয়ার কথা, সেইটা আইছে থাইল্যান্ড থাইকা?”
রুদ্র মালের কথা শুনে একরাশ হতাশা নিয়ে বলে,
“মাল তো দূরের কথা, বালও আসেনি। কী কমু!”
তৌসির ভ্রু কুঁচকে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলে,
“কী কস? এখনো দেয় নাই? আমাগো তো ইন্ডিয়াও যাইতে হইবো। এর আগে সব নিয়া রাখতে হইবো।”
নাযেম চাচা বিছানার এক কোণে বসে ক্যালকুলেটরে বিয়ের যাবতীয় খরচের হিসেব কষছেন। তৌসিরের কথায় তিনি মুখ না তুলেই বলেন,

“আরে দিতাছে না মাঙ্গের নাতি। টাকা আগে দিতে হইবো এডভান্স কিছু।”
এটা শুনে তৌসিরের মেজাজ চড়ে যায়। সামান্য রাগ ঝেড়ে সে বলে,
“বেশি তেরিমেরি করলে সাউয়া ছিড়িয়া কাউয়ারে খাওয়া দিমু। তখন বুঝব নে।”
মিনহাজ মামা আধো ঘুমে ছিলেন। কাঁথার নিচ থেকে মাথা বের করে তৌসিরের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“সে তুই যারে ইচ্ছে তারে খাওয়াইস। এহন এইটা ক নির্বাচনের প্রচারের কী? তন্ময় ভাই, তুহিন ভাই এরা যদি না ঠিকি তাইলে?”
তৌসির বিছানায় বসতে বসতে আয়েশি ভঙ্গিতে বলে,

“আরেএএ, এসবের চিন্তা করিও না। যামু তো আমরাই। আর না গেলেও সিন্ডিকেট শুরু করব। এসব বালের চিন্তা এখন করে কী লাভ? জনগণ কিন্তু আমাগো তালেই নাচব। যারা বুঝদার হেরা কয়জন ভোটার?”
এর মধ্যেই রুদ্র বলে ওঠে,
“তৌসির ভাই, একটা বিল্ডার আইব তোমার লগে দেখা করতে। ওরে সরকারি যে ইস্কুলের প্রটোকল আছে না, তার মধ্যে একটা দিতে হইবো। মেলা লাভ দিব।”
তৌসির রুদ্রের কথার উল্টো পিঠে হতাশা ঝাড়ে,
“আর লাভ মারাইস না রে সাউয়ার নাতি। আমার বহুত পয়সা লস হইয়া গেছে এক বউয়ের লাইগা। কোন দুঃখে যে হাঙ্গা করতে গেছিলাম!”

নাযেম চাচা এটা শুনে টিটকারি কেটে বলেন,
“সাত কপালের জোরে এমন বউ পাইছে, তারপরও এসব কথা কয়! কত বড় জানুয়ার হালা মাদারচুত।”
নুহমানও তাল মিলিয়ে বলে,
“এতকিছুর পরও ভাবি আপনারে ছাড়ে নাই। বহুত ধৈর্য আছে তার। তুমি কিন্তু ভাইগ্যবান।”
তৌসির ঠোঁট বাঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে।
“হ, আমার বউ আর ভাইগ্য এতই ভালা যে, প্রতিদিন আইক্কাল বাঁশ আমার পাছা দিয়া ঢুইক্কা সামনে দিয়া বার হইয়া যায়।”

​এটা বলতে বলতে তৌসির ঘর থেকে চলে যায়। নাজহা এতক্ষণে নিশ্চিত শুয়ে পড়েছে, তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে হবে যে। তৌসির স্পষ্ট নাজহার মৌন অরণ্যের মতো কালচে সবুজ নয়নে অভিমান দেখেছে। তার কৈতরী এখন আর তার সাথে রাগ দেখায় না, সে তার ওপর অভিমান জমিয়ে বসে। ইশ! কী নিষ্ঠুর সেই অভিমান, কতই না লুকায়িত সেই অভিমান। যতই লুকানো হোক, তৌসিরের তীক্ষ্ণ চোখের চাহনি তা উপেক্ষা করবে না। সে বুঝে গেছে।

​তৌসির ঘরে এসে দেখে নাজহা বিছানার এক কোণে শুয়ে আছে। তৌসির দরজা লাগিয়ে ধীরলয়ে বিছানায় উঠে আসে। উঠতেই ভেতর থেকে ধড়ফড় শব্দ শুরু হয়। আহা! কী ভয়াবহ এক অনুভূতি। একটাবার তার নিকট আসতে দেরি কিন্তু এই অনুভূতি অনুভব হতে দেরি নয়। এই মেয়েটা তৌসিরকে জ্বালিয়ে মারল। কাছে এলেও জ্বালায়, দূরে গেলেও প্রাণ পোড়ায়। মাঝেমধ্যে তৌসির নিজেকে নিজে প্রশ্ন করে, কী আছে এই নারীর মধ্যে যা তাকে এত টানে? এত ভীষণ কেন টানে?

​তৌসিরের নাজহার শরীরের প্রতি কোনো লোভ নেই। তৌসিরের জায়গায় অন্য পুরুষ থাকলে হয়তো বা নাজহার এই হুরের মতো শরীরের মায়ার দহনে সে নিজেকে পোড়াত। তথাচ তৌসির এমন মানসিকতার নয়। যদিও সে একজন খারাপ মানুষ বা মন্দ মস্তিষ্কের অধিকারী, তারপরও তার কাছে তার স্ত্রীর, তার কৈতরীর চোখটাই সব। তৌসিরের ধ্বংস হওয়ার জন্য অনেক কিছুই ছিল কিন্তু সে নাজহার আঁখিদ্বয়ে এসেই থেমে গেছে। এই নাজহা তৌসিরের কাছে মহান এক সত্তা। আর হবেই না কেন? যে লোকের মেয়েমানুষের প্রতি কোনো অনুভূতি কাজ করত না, সেই পাথর মানুষটা এক দেখায় মোহাবিষ্ট হয়ে হোঁচট খেয়ে তার মায়ায় পড়ে গেছে। তৌসিরের কাছে নাজহা বরাবরই বড্ড আদরের। সে দোষ করুক আর যাই করুক, আদরের তো আদরেরই। তৌসির নাজহার পাশে বসে যেতে যেতে বলে, “নাজহা, ঘুমিয়ে গেছো?”

প্রশ্নের রেশ কাটতে না কাটতেই ওপাশ থেকে নাজহার তরফ থেকে সংক্ষিপ্ত অথচ চূড়ান্ত উত্তর ভেসে আসে ” না ”
প্রত্যাখ্যান পেয়েও দমে না তৌসির। বরং সোহাগি সুরে আহ্বান জানায়,
” আমার এদিক আও কৈতরী আমার বুকে আসো। ”
নাজহার কণ্ঠে তখন একরাশ জমাটবাঁধা অভিমান। সে অভিযোগি গলায় বলে ওঠে,
” যে আমাকে বিশ্বাস করেনি তার বুকে আমার স্থান তো হওয়ার কথা নয়। ”
তৌসির অনুনয়ের ভঙ্গিতে বলে,
” আমি আর এমন করমু না মাফ কইরা দাও। ”
নাজহা এবার কঠিন শর্ত জুড়ে দেয়,
” পায়ে ধরে বলুন করে দিব ইনশাআল্লাহ। ”

শুনে তৌসিরের মাথায় হাত! মনে মনে সে গজগজ করে ওঠে, ‘চুতমারানি ছিনাল এত খারাপ তুই কিন্তু।’ তবে মুখে প্রকাশ করে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া,
” ধুর ছিনাল তোর ঠ্যাং ধরমু ক্যান আমি না তোর জামাই। ”
নাজহা অবিচল। আগের মতোই হীমশীতল গলায় সে জানিয়ে দেয়।
” তাহলে আর মাফ চাইয়েন না। ”
তৌসির বেকায়দায় পড়ে যায়। কী আর করা! পরক্ষণেই ভাবে, বউ তো! বউয়ের সবকিছুই ছোঁয়া জায়েজ। তাই আর কালক্ষেপণ না করে চুপচাপ হাত বাড়িয়ে নাজহার পায়ে হাত রাখে সে। নরম গলায় বলে,

” আমার ভুল হইয়া গেছে সব দোষ আমার মাফ কইরা দাও কৈতরী। ”
তৌসির যে সত্যি সত্যিই তার পা ধরবে, তা নাজহার দুঃস্বপ্নেও ছিল না। তার এমন কাণ্ডে সে এক লাফে উঠে বসে। বিস্ময়ে চিৎকার করে ওঠে,
” এই সত্যি সত্যি ধরলেন কেন আমি তো মিথ্যা বললাম। ”
তৌসির এবার নাজহার পা টেনে ধরে এক নিমিষে তার দেহটা নিজের বলিষ্ঠ বুকের নিচে নিয়ে আসে। নাজহার চোখের গভীরতায় তৃষার্ত দৃষ্টি মেলে শুধায়,
” তুমি যা বলবা তাই করমু তবে শুনার যোগ্য হইলে শুনমু নয়তো না। ”
নাজহা লজ্জায় এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলে,

” হয়েছে বুঝেছি আসুন ঘুমিয়ে যাই। ”
তৌসির নাজহার একটা হাত নিজের বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে। ফিসফিস করে জানতে চায়,
” আইজ লুঙ্গির গিটটা খুলি? ”
নাজহা দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানায়,
” নাহ আজ থাক আজ শরীর টা ঠিক নেই কাল বা পরশু থেকে হবে? এটা আমার ইচ্ছে আপনি চাইলে আপনার যখন ইচ্ছে আপনার হক এটা। ”
তৌসির আলতো করে নাজহার কপালে কপাল ঠেকায়। আশ্বস্ত করে বলে,
” আচ্ছা তোমার সুবিধায় আমার সুবিধা তুমি যখন নিজ হাতে খুলতে সাহায্য করবা লুঙ্গির গিট তখনি নাহয় খুলব ”
নাজহা খিলখিল করে হেসে ওঠে,

” আচ্ছা! ”
তৌসির একটা বালিশ হাত দিয়ে টেনে নিয়ে শুয়ে পড়ে। তার প্রশস্ত বক্ষে লেপ্টে থাকে নাজহা। তৌসিরের উদোম শরীরটা এত কাছে পেয়ে নাজহা এক গোপন সুযোগ লুফে নেয়। ইচ্ছেমতো ছুঁতে থাকে তাকে শরীরে শরীর সে, বারবার ঠোঁট ছোঁয়ায় তৌসিরের বুকে। কিন্তু এমন ভান করে ঘুমের ঘোরে নড়াচড়া করছে, ইচ্ছে করে চুমু খাচ্ছে না। তৌসির বিষয়টা স্পষ্ট বুঝতে পারে। অন্ধকারের আড়ালে সে মুচকি মুচকি হাসে নাজহাকে নিজের বক্ষে আরো জোরে চেপে ধরে বলে ওঠে, ” খা চুমু খা যত ইচ্ছে চুমু খা এই তৌসির শুধু তোর।”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩২

“ততক্ষণ পর্যন্ত চুমু খা কৈতরী যতক্ষণ পর্যন্ত না তোর তৃষ্ণা মিঠে। ”
নাজহা তৌসিরের কথা শুনে হুট করেই তৌসিরের গলায় ঠোঁট বসিয়ে দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে থাকে। এক হাতে তৌসিরের বক্ষে নখ বসিয়ে দিতে থাকে

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩৩

5 COMMENTS

Comments are closed.