Home স্নিগ্ধবিষ স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩২

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩২

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩২
সানজিদা আক্তার মুন্নী

লুসিয়ান গাড়ি থেকে বের হতেই নাজহা বেরিয়ে আসে। সে তৌসিরকে সামনে দেখে মনে হয় প্রাণ ফিরে পায়। নাজহা এক দৌড়ে তৌসিরের কাছে যেতে চায়, কিন্তু লুসিয়ান তার হাত চেপে ধরে তাকে যেতে দেয় না নাজহার হাত চেপে ধরে তাকে নিজের কাছে টেনে নিয়ে নেয় আর বলে, “কোথায় যাচ্ছিস? তুই আমার!”
নাজহা লুসিয়ানের এই আচরণে তার দিকে বহ্নিশিখা দৃষ্টিতে তাকিয়ে চিৎকার করে ওঠে, “লুসিয়ান, আমাকে ছাড়ুন। আমি ম্যারেড, বোঝার চেষ্টা করুন।”
তৌসির তাদের দিকে এগোচ্ছিল কিন্তু নাজহার কথা শুনে তার পা থেমে যায় আপনাআপনিই চরণ সামনে এগোয় না আর। লুসিয়ান তার কোনো শত্রু নয়, নাজহা তাকে চেনে। এটা নিশ্চয়ই নাজহার কোনো চক্রান্ত, নিশ্চিত নাজহার চক্রান্ত।

নাজহা লুসিয়ানের হাতে খামচে ধরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তৌসিরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। কোনোপ্রকার কথা না বলে ও তৌসিরকে আঁকড়ে ধরে তৌসিরের বুকে মুখ গুজে দেয়। ভয়ে তার হাত কাঁপছে ভয়টা কি? ভয়টা এই যদি তৌসির না আসতো তাহলে হয়তো আবারো সে মরতো। এই লুসিয়ান একটা সাইকো, এই সাইকো থেকে তৌসির শতগুণে ভালো নাজহার কাছে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

নাজহা তৌসিরকে জড়িয়ে ধরেই ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে। তার কান্না তৌসির এবার বিশ্বাস করতে পারে না বিশ্বাস করতে গিয়ে বারবারই দন্দে পড়ে যায় । পুরোনো কথা মনে দাগ কাটতে শুরু করে। তৌসির একপর্যায়ে নাজহাকে ঠেলে দূরে সরিয়ে দিয়ে বিষাক্ত সুরে বলে ওঠে, “মাগিগিরি করতাছিস মাগি? ছিনাল তুই একটা, আস্ত ছিনাল। তুই হলি বিশ্বছিনাল। নিজের লাঙের লগে ভাইগা যাওয়ার পথে ধরা পইড়া নাটক করতাছিস? প্রেম চুদাস তুই?”
তৌসিরের এই কথাগুলো শুনে নাজহা হুহু করে কেঁদে ওঠে। ঝাপটে গিয়ে তৌসিরের গলা জড়িয়ে ধরে সে আবারো বলে, “বিশ্বাস করুন, আমি জানি না এসব সম্পর্কে। আমি মানছি লুসিয়ান আমার মামাতো ভাই কিন্তু আমার তার সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। আমি এবার গাদ্দারি করিনি, বিশ্বাস করুন।”
কিন্তু তৌসির তাকে বিশ্বাস করে না। সে তাকে আবারো নিজের থেকে ছাড়িয়ে দূরে ঠেলে দিয়ে বলে, “মিথ্যা বলিস না। তুই আস্ত একটা মাগি, এটা আমি ভালো করেই জানি।”

নাজহা স্তব্ধ চোখে তৌসিরের দিকে তাকিয়ে থাকে। পায়ের নিচের মাটি সরে যাচ্ছে তার। তৌসির তাকে বিশ্বাস করছে না, এখন কি করে সে বিশ্বাস করাবে? দুনিয়া যে উল্টে যাচ্ছে তার। লুসিয়ান এ সুযোগে নাজহার হাত ধরে নিজের কাছে টেনে নেয় আর হাসতে হাসতে বলে, “আমার সাথে চল। আমি তোকে একটা বেটার লাইফ দিব। যে লোক নিজের স্ত্রীকে পরমানুষের সামনে এমন বিশ্রীভাবে গালি দিতে পারে, সে তোকে কিভাবে খুশি রাখবে? আমার সঙ্গে চল সুইটহার্ট, আমি তোকে সুখ দিব।”

লুসিয়ানের কথা নাজহা শুনছে না। লুসিয়ান তাকে নিজের কাছে টানলেও সে এক দৃষ্টিতে শুধু তৌসিরের দিকে তাকিয়ে আছে। তার কালচে সবুজ নয়নায় শুধু একটাই প্রশ্ন ‘আমাকে এতটা অবিশ্বাস করলেন আপনি? আমার আপন আপনি হলেন না? আমাকে একটু ভরসা করলেন না? আমি কি খুব নিকৃষ্ট? আমি কি বিশ্বাসের এতটাই অযোগ্য? আজ আমি থাকতে চাইলাম অথচ আপনি রাখতে চাইলেন না। আমি সবদিকেই শূন্য হলাম, আমি শুধু এ জীবনে শূন্যতাই বইলাম।’

লুসিয়ান কথাগুলো বলে নাজহার গালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াতে নেয়। তৌসির নাজহার চোখের দিকে তাকিয়ে তার অসহায় দৃষ্টির অসহায় চাহনি দেখে আর সহ্য করতে পারে না। চিলের মতো এগিয়ে এসে এক হাতে নাজহার হাতের বাহু টেনে ধরে, অন্য হাতে লুঙ্গির কোঁচা মুঠোয় নিয়ে লুসিয়ানের কাঁধে সজোরে একটা লাথি মারে। তার থেকে নাজহাকে ছিনিয়ে একটানে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে।

নাযেম চাচা আর মিনহাজ মামা কোনো কথাবার্তা ছাড়াই লুসিয়ানের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা সব গার্ডদের ‘হেডশট’ দিয়ে একসাথে তাদের মাটিতে লুটিয়ে ফেলেন। এরা হলেন পুরোনো খিলাড়ি, এদের সাথে কি আর বাচ্চাকাচ্চা সমান মানুষ খেলায় মেতে উঠলে পারে? এই যে মুহূর্তেই লুসিয়ানকে একা করে দিয়েছেন একদম শূন্য।
নাজহা তৌসিরের বুকে থাকতে চায় না আর তার ভীষণ অভিমান জমে ভীষণ , সে সরে যাওয়ার জন্য ছটফট করে ওঠে বলে, “আমাকে ছাড়ুন। যে আমাকে বিশ্বাস করে না তার বুকে আমার কোনো স্থান নেই। আমাকে ছাড়ুন বলছি।”
তৌসির নাজহাকে ঝাঁকিয়ে তুলে তার দিকে তাকিয়ে বলে, “কৈতরী চুপ থাক! কথা বলিস না। আমার বুক ছাড়া দ্বিতীয় কোনো প্রশান্তির স্থান আছে নাকি তোর?”

এটা বলে কোমরে গোঁজা চাপাতিটা বের করে লুসিয়ানের দিকে ছুড়ে মারতে নেয় তৌসির। কিন্তু নাজহা তার হাত চেপে ধরে বলে ওঠে, “তৌসির, উনাকে মারবেন না দয়া করে। আমার মামার একমাত্র সন্তান তিনি। মারা গেলে আমার মামা আর মামি আমাকে দোষ দেবে, আমার না মানা মাকে দোষ দেবে। ছেড়ে দিন, আমাকে একটু আপন ভাবলে ছেড়ে দিন।”
তৌসির নাজহার কথায় চাপাতিটা নামিয়ে বলে, “কেন ছাড়ব? কেন? ও তোকে নিতে চেয়েছিল আর তুই ওর প্রতি দরদ দেখাস?”

নাজহা ঢোক গিলে বলে, “আমাকে নিয়ে যেতে পারত না। আমি জানতাম আপনি আসবেন। প্রাণটা ভিক্ষা দিয়ে দিন আমার জন্য হলেও, নয়তো মেরে ফেলুন। এমনিতেও এমন শোহর না থাকাই উত্তম।”
লুসিয়ান নিজের গান তৌসিরের দিকে তাক করে গুলি করার উদ্দেশ্যে, কিন্তু তার আগেই ‘টাশ’ করে শব্দ ওঠে। লুসিয়ানের হাতেই কেউ পিছন থেকে গুলি করে দেয়। লুসিয়ানের হাত থেকে গান পড়ে যায়, গলগলিয়ে লাল উষ্ণ ধারা বইতে থাকে হাত থেকে। নাজহা আর তৌসির পিছনে তাকিয়ে দেখে গুলিটা বিবিজান করেছেন। বিবিজানের পাশেই নাজহার বাবা আর ইকরাবের বাবা দাঁড়িয়ে আছেন।

নাজহার বাবা তাড়াতাড়ি সামনে এসে লুসিয়ানের সামনে বসেন আর বলেন, “লুসিয়ান তুমি এখান থেকে চলো, নয়তো মৃত্যু নিশ্চিত। তাড়াতাড়ি ওঠো। তুমি আমার অতীত, আমি চাই না আমার সামনে তোমার মরণ হোক।”
তৌসির নাজহাকে ছেড়ে এগিয়ে এসে বলে, “ওকে মরতে হবে। ও আমার বউয়ের দিকে হাত বাড়িয়েছে, ওকে তো মরতেই হবে।”

এটা বলে তৌসির লুসিয়ানের কলার চেপে ধরে তাকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে তাদের বাড়ির পিছনের দিকে। তার পিছনে পিছনে উপস্থিত সবাই ছুটেন। বিবিজান, নাজেম চাচা আর মিনহাজ মামা আরেক ভয়ে আছেন এখন না এই তালুকদারদের সামনে তৌসির ট্রমার মধ্যে চলে যায়!
লুসিয়ান আহত অবস্থায় অনেক চেষ্টা করে নিজেকে ছাড়াতে কিন্তু পারে না। তৌসির তাকে বাড়ির পিছনে কবরস্থানে নিয়ে যায়, যেখানে অনেকগুলো খালি কবর খুঁড়ে রাখা হয়ে থাকে প্রয়োজন পড়লেই কাউকে মাটি চাপা দিতে। তৌসির একটা কবরে লুসিয়ানকে ফেলে দেয়। তাকে জ্যান্ত কবর দিয়ে দেওয়ার জন্য কবরের পাড়ে রাখা কোদাল দিয়ে ওপর থেকে মাটি ফেলতে থাকে।নাজহা পিছন থেকে চিৎকার করতে শুরু করে, “তৌসির ছেড়ে দিন! দয়া করে ছেড়ে দিন!”

তাকে বিবিজান সামনে এগোতে দিচ্ছেন না। নাজহাকে তিনি ধরে রেখেছেন। নাজহা চিৎকার করছে, বিবিজানের পায়ে পর্যন্ত পড়ছে, তারপরও তিনি কিছু করছেন না। তৌসির লুসিয়ানকে অর্ধকবর দিয়ে দিয়েছে।
নাজহা না পেরে নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে বলে, “আব্বা তুমি কিছু করো! আব্বা, তৌসিরকে বাঁধা দাও। আমাকে ছেড়ে দিতে বলো, আমি আমার উন্মাদকে সামলে নেব। আমাকে ছাড়িয়ে দাও!”

কিন্তু কেউ তার কথার তোয়াক্কা করেন না। তারাও চান লুসিয়ান মরে যাক। নাজেম চাচা, মিনহাজ মামা সবাই গিয়ে হাত লাগিয়ে লুসিয়ানকে জ্যান্ত কবর দিয়ে দেন। বিবিজানের পায়ে লুটিয়ে পড়েও নাজহা এই অনিবার্য মৃত্যু আটকাতে পারল না। তৌসির যা করেছে তা হয়তো ন্যায়সঙ্গত, কিন্তু তার মামার যে আর কোনো সন্তান নেই! নাজহা জানে, কত দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর আকুতির পর লুসিয়ান তাদের ঘরে এসেছিল।নাজহা শুনেছিল, কতো কষ্ট দীর্ঘশ্বাস আর কতো জনমের হাহাকারের পর লুসিয়ান তাদের কোল আলো করে এসেছিল। কত যত্নে, কত মমতায় তিল তিল করে গড়ে তোলা সেই জীবন! সেই করুণ ইতিহাস জানত বলেই নাজহা চেয়েছিল তাকে রক্ষা করতে। কিন্তু হায়রে মানুষের ভাগ্য! যাকে সে বাঁচাতে চাইল, সেই লুসিয়ান নিজেই তো নিজের মরণ-পরোয়ানা হাতে নিয়ে যমের দুয়ারে এসে দাঁড়াল।

​বাতাসে আজ শুধু দীর্ঘশ্বাস। নাজহার মনে হচ্ছে, তার হাত দুটি মনে হয় অদৃশ্য রক্তে রঞ্জিত। এই নিয়ে দ্বিতীয়বার সে কারোর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ালো। বিবেক তাকে দংশন করছে এত পাপ, এত বড় দায়ভার নিয়ে সে লোকালয়ে মুখ দেখাবে কী করে? এই বিদীর্ণ আত্মা আর কলঙ্কিত নিয়তি নিয়ে বেঁচে থাকা কি মৃত্যুর চেয়েও অধিক যন্ত্রণার নয়?

{ কেমন হয়েছে বলে যেও }
পাটোয়ারী বাড়িতে আজ এক অনর্থ ঘটে গেল। ঘটনাটি হলো, আজ ওয়াসেমের বাবা ইব্রাহিম সাহেবের বন্ধু সপরিবারে তাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। সাথে তার ছেলে-মেয়েও আছে। ছেলে একটি বড় কোম্পানির চেয়ারম্যান।
​তৃষ্ণাকে দেখে তারা তার পরিচয় জিজ্ঞেস করেছিলেন। বাইরের কাউকে তৃষ্ণা যে তার স্ত্রী, সেটা বলতে ওয়াসেম নিষেধ করেছিল। তাই সিতুজা পরিচয় দিয়েছেন যে, তৃষ্ণা তাদের আরেক মেয়ে।
​এখন তারা খাবার টেবিলে বসে খাবার খাচ্ছেন। তৃষ্ণা সিতুজার সাথে চুপচাপ খাবার পরিবেশন করছে। ওয়াসেমের বাবার বন্ধু মিস্টার এরশাদ খেতে খেতে তৃষ্ণার দিকে এক পলক তাকিয়ে ওয়াসেমকে বলেন, “তা ওয়াসেম বাবা, বিয়ে কবে করছ?”

​ওয়াসেম এ প্রশ্ন শুনে চুপচাপ খেতে খেতে বলে, “জি আঙ্কেল, এসবে আমার ইন্টারেস্ট নেই।”
​এটা শুনে এরশাদ সাহেব হেসে বলেন, “তা তুমি নাই-ই করো, কিন্তু বোনকে কবে বিয়ে দিচ্ছ?”
​কথাটা তিনি তৃষ্ণাকে উদ্দেশ করেই বলেছেন। তৃষ্ণাকে তার বেশ মনে ধরেছে, তাকে ছেলের বউ করতে চান। তাই এই প্রসঙ্গ তুলে তিনি এবার সরাসরি ইব্রাহিমের দিকে তাকিয়ে বলেন, “বন্ধু, তুমি যদি কিছু মনে না করো, তবে তোমার মেয়েকে আমার ছেলে আয়রাদের জন্য ঘরে তুলতে চাই। মেয়েটি খুবই মিষ্টি, আমার আয়রাদেরও পছন্দ হয়েছে।”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩১

​এটা শুনে ইব্রাহিম সাহেবের বিষম লেগে কাশি উঠে যায়। তৃষ্ণার ভয় হতে শুরু করে ওয়াসেম যদি কিছু বলে এখন? ওয়াসেম এটা শুনে এক পলক তৃষ্ণার দিকে তাকায়, আরেক পলক আয়রাদের দিকে। তারপর চুপচাপ হাত ধুয়ে খাবারের প্লেট ঠেলে উঠে যায়। তারা কেউ কিছু বুঝতে না পেরে সিতুজার দিকে তাকিয়ে বলেন, “কী হলো! ওয়াসেম এটা শুনে উঠে গেল যে?”
​সিতুজা কী বলবেন বুঝতে না পেরে একটা অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়ে যান। তাই শেষমেশ সত্যিটা বলে দেন, “আসলে… আসলে তৃষ্ণা আমার মেয়ে না, সে আমার ছেলের বউ।”

স্নিগ্ধবিষ পর্ব ৩২ (২)

1 COMMENT

Comments are closed.