Home Naar e Ishq Naar e Ishq part 19

Naar e Ishq part 19

Naar e Ishq part 19
তুরঙ্গনা

ঘড়ির কাঁটায় সময়টা ঠিক এগারোটা তিপ্পান্ন মিনিট। বারোটা বেজে নতুন দিনের সূচনা হতে আর মাত্র ৭ মিনিট বাকি। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে সুহিন সবেমাত্র একটি আরামদায়ক সাদা গাউন পড়ে শুয়েছে। এরিমধ্যে হঠাৎ দরজায় ঠকঠক শব্দে তার ঘুম ভাঙে। একপ্রকার হকচকিয়ে উঠে পড়ে সে। বিছানা হাতড়ে চশমটা খুঁজে নিয়েই, দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে যায়।
চশমাটা পড়তে পড়তেই সে ঘুম জড়ানো গলায় উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞেস করল,

“কে?”
কোনো সাড়াশব্দ মেলে না। এক মূহুর্তের জন্য অন্তরাত্মা অচিরেই কেঁপে উঠতেই, সে কিঞ্চিৎ শুষ্ক ঢোক গেলে। পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে, বারান্দার পর্দা গুলো রাতের শীতল হাওয়ায় উড়ছে। যা তার ভীতু মনকে সহসাই ভীতু করে তোলে। তবে পরক্ষণেই সে ভাবে,এবার একটু অতিরিক্ত হয়ে যাচ্ছে। এতো বড় বাড়ি, হিসেব ছাড়া গার্ড, এলেও নিশ্চিত কেউ প্রয়োজনেই এসেছে। বাহিরের লোক তো আসতে যাবে না। কিন্তু প্রতিবার এভাবে ভয় পেয়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রচন্ড বিরক্তিকর।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

যথারীতি সে দরজাটা খুলতেই দেখল, কেকে দাঁড়িয়ে। সামনে কোনো ভুত থাকলে সে ততটা বোধহয় ভয় পেতো না, যতটা ভয় সে এই কেকের হুটহাট আগমনে পায়। পার্টিতে পড়া সেই একই সাদা শার্ট,কালো কোট-প্যান্টেই হাজির হয়েছে। চোখে-মুখে চিরচেনা সেই এক তীক্ষ্ণ গম্ভীর্যতা। সুহিন ইতস্তত হলো কেকের চাহুনিতে। দরজা খুলতে দেরি করেছে বলেই কি,এভাবে তাকিয়ে আছে?
সুহিন কিছু বলবে তার আগেই কেকে রুমের ভেতর দু’পা এগিয়ে আচমকা থেমে যায়। পরক্ষণেই গুরুগম্ভীর স্বরে শুধায়,

“মে আই কাম ইন?”
সুহিন কিছু বলল না৷ এ আর নতুন কি৷ ঘরের ভেতর দু’পা ঢোকার পর, তার হুঁশ হয় অনুমতি নেবার! সুহিন সোজাসাপটা স্বরে জিজ্ঞেস করে,
“না ঘুমিয়ে এভাবে পিশাচের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন কেনো?”
সুহিনের কথায় কেকের ভ্রু কুঁচকে গেলেও, সে তাকে আর জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করল না।উল্টো পা দিয়ে পেছনের দরজাটা ঠেলে দিয়ে, পকেট থেকে আচমকা কিছু একটা বের করতে লাগল। হঠাৎ কুচুরমুচুর শব্দে সুহিনের কপালটা কিঞ্চিৎ কুঁচকে গেলো। এই বেটা কি বের করছে?
এরিমধ্যে সে একটা প্যাকেটজাতীয় ছোট ম্যাফিন কেক বের করে সুহিনের হাতে দিল। পুরো ঘরটা কেবল তার বেডের পাশের ল্যাম্প লাইটের আবছা আলোয় আলোকিত। যথারীতি সুহিন ভ্রু-কুঁচকে জিনিসটা দেখার পর কেকের উদ্দেশ্যে অবাক স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“এসব কি?”

—“চুপচাপ প্যাকেটটা খোল।”,কেকে’র সোজাসাপটা কথা। সে কেবল ‘মাফিন কেক-এর’ প্যাকেট বের করেই থেমে থাকেনি, বরং প্যান্টের পকেট হাতড়ে একটা লাইটার আর ছোট্ট একটা দুই ইঞ্চি সমান ক্যান্ডেল বের করল। এদিকে সুহিনও আর একদণ্ড-ও দেরি না করে প্যাকেটটা খুলল। নিমিষেই প্যাকেট হতে বের হলো একটি সাদামাটা মাফিন কেক। খুব বেশি হলে এটা সাধারণ একটা ব্র্যান্ডের দশটাকা দামের একটি মাফিন কেক।
সুহিনের মাথা এবার কাজ করছে না। এই বাড়ির লোকগুলো সব এমন অদ্ভুত কেন? নাকি সে নিজেই অদ্ভুত?
এদিকে কেকে সুহিনের হাতের আঙুলের ডগায় ধরে থাকা কেকটার উপর ক্যান্ডেলটা জোরেসোরে বসিয়ে দিয়ে, নিজের হাত-ঘড়ির দিকে তাকায়। কিছুক্ষণ ধরে সময়টা পর্যবেক্ষণ করার পর, সে লাইটারটা জ্বালিয়ে ক্যান্ডেলে আগুন ধরায়। সুহিন অ-আ কিছুই বলছে না। জানে, বলেও লাভ নেই। সোজা উত্তর তো সে পাবে না।
সুহিনের এমন ধ্যান-ভাবনার মাঝেই,কেকে তাকে পুরোপুরি রূপে চমকে দিয়ে বলে উঠল,

“হ্যাপি বার্থডে মাই প্রিন্সেস।”
সেই চিরচেনা গুরুগম্ভীর শীতল কন্ঠস্বর। অথচ হঠাৎ এই তিন শব্দের বাক্যতেই সুহিন রীতিমতো স্তম্ভিত। সুহিনের বিস্ময়বিহ্বল চোখের তারায় তখন কেবল মোমবাতির কম্পমান শিখাটি প্রতিফলিত হচ্ছে। কেকে’র সেই চিরচেনা গম্ভীর কণ্ঠস্বরে ‘প্রিন্সেস’ সম্বোধনটি মোটেও প্রত্যাশিত নয়।
নিজের জন্মদিনের কথা সে নিজেও ভুলে গিয়েছিল;আজ তার আঠারো পেরিয়ে উনিশ বছরে পদাপর্ণ হলো। অথচ এই মানুষটি—যাকে সে বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরের এক রহস্যময় ব্যক্তিত্ব ভেবে এসেছে—সে ঠিক ঘড়ির কাঁটায় সময় মেপে হাজির হয়েছে।

​নীলচে দৃষ্টিতে জমে থাকা একরাশ বিস্ময় নিয়ে সুহিন কেকের নির্লিপ্ত চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। আজ ঐ তীক্ষ্ণ-গম্ভীর চোখজোড়ায় এক অদ্ভুত গভীরতা খুঁজে পেল। কেকে তাকে পলকহীন নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে চোখের ইশারায় মোমবাতিটি নিভিয়ে ফেলতে বলল।
​সুহিন আচ্ছন্ন মনেই আলতো করে ফুঁ দিয়ে মোমবাতির শিখাটি নিভিয়ে দিল। পরক্ষণেই ঘরের সেই মায়াবী আবছা আলোয় ধোঁয়ার একটি সরু রেখা কুণ্ডলী পাকিয়ে শূন্যে মিলিয়ে গেল।
সেই অন্ধকারের রেশ কাটতে না কাটতেই কেকে অদ্ভুত এক কান্ড ঘটিয়ে বসে। তার হাত থেকে ছোট্ট কাপ-কেকটা একপ্রকার ছোঁ মেরে নিয়ে, সোজা মুখে পুরে দেয়। সুহিন অবাক দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে থাকে। কেক’টা যদি এভাবেই খাওয়ার ছিল তবে রাতের বেলায় এতো কাহিনি করার কি প্রয়োজন ছিল? আর তার চেয়েও বড় কথা, আজ জন্মদিনটা কি তার? নাকি কেকে-এর?

কেকে নির্বিকার ভঙ্গিতে খাওয়া শেষ করে হাত ঝেড়ে নিল। যদিও মুখের অভ্যন্তরে কিছু অবশিষ্টাংশ রয়ে গিয়েছে কিনা তা অনিশ্চিত।
কেকে নিস্পৃহ গুরুগম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল,
“গিফট লাগবে, প্রিন্সেস?”
​সুহিন কেবল চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে রইল। উত্তরের অপেক্ষা না করেই কেকে দু-পা এগিয়ে এল। আকস্মিকভাবে সুহিনের কোমড় পেঁচিয়ে ধরে নিজের দিকে এক হেঁচকা টানে তাকে কাছে টেনে নিল। এই ঘনিষ্ঠতা নতুন নয়, কিন্তু আজকের অনুভূতি যেন সম্পূর্ণ আলাদা।

সুহিনের ডান হাতটা অজান্তেই কেকে’র বুকের বাম পাশে আশ্রয় নিল। সেখানে হৃৎপিণ্ডের ধুকপুকানি কি অনুভূত হচ্ছে? সুহিন জানে না। তার মস্তিষ্ক ক্রমশই শূন্য হয়ে যাচ্ছে। কেকে তার সেই নিগূঢ় চাহনিতে সুহিনকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল। আর ঐ তীক্ষ্ণ-শীতল চোখজোড়ায় চোখ রেখে, সুহিনের হৃৎস্পন্দন তখন দ্রুতগতিতে ছুটছে। উচ্চতার পার্থক্যের কারণে তাকে মাথা তুলেই তাকাতে হচ্ছিল, অথচ সে নজর সরিয়ে নেওয়ার সাহসটুকুও সঞ্চয় করতে পারল না।এ কেমন দহন,এ কেমন অনুভূতি? কই, আগে তো হয়নি কখনো!
​কেকে ধীরলয়ে সুহিনের হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তার পরানো আংটিটি বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে দেখতে সে যেন কোনো গভীর ধ্যানে মগ্ন হলো। এরপর হঠাৎই সুহিনের আঙুলে রিং বরাবর ঠোঁট স্পর্শ করে একটি গাঢ় ও তপ্ত চুমু এঁকে দিল।তার ওষ্ঠদ্বয় হতে অস্ফুট স্বরে উচ্চারিত হলো একটি শব্দ—

​”ওয়াইফি!”
​এক অজানা শিহরণে সুহিন কেঁপে উঠল। তার সমস্ত প্রতিরোধ যেন মোমের মতো গলে গিয়ে কেকে’র বাহুডোরে নুইয়ে পড়ল। কেকে তাকে আরও দৃঢ়ভাবে নিজের অস্তিত্বের সাথে মিশিয়ে নিল। তার মোহময় দৃষ্টি এবার নিবদ্ধ হলো সুহিনের গোলাপি ওষ্ঠাধরে। ও যেন এক তৃষ্ণার্ত শিকারির আহ্বান। কেকে আনমনে বলে উঠল,
​”ক্যান আই ইট ইওর লিপস, হানি?”
​সুহিন চকিতেই স্তম্ভিত হলো। সম্মতির অপেক্ষায় না থেকেই কেকে ডান হাতে সুহিনের গ্রীবা ও ঘাড় শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। অন্যহাতে দৃঢ়তা প্রয়োগ করে,সুহিনকে আরো নিজের কাছে টেনে নিল। পরক্ষণেই পৃথিবীর সমস্ত স্তব্ধতা চিরে দিয়ে সে নিজের ওষ্ঠাধর মিলিয়ে দিল সুহিনের অধরে।
সুহিন যেন এক লহমায় হারিয়ে গেল কেকের অস্তিত্বের গহীনে। এমন নিবিড় ও তপ্ত স্পর্শ এর আগে কখনো অনুভূত হয়নি তার। এ মুহূর্তের সমস্ত অনুভূতিই যেন তার ভাবনার অগোচরেই ছিল। এক অতল আবেশে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বিলিয়ে দিল সে।

শান্ত-গম্ভীর কেকে আচমকাই কিছুটা বেপরোয়া হয়ে উঠল। ওষ্ঠের সেই সুতীব্র আলিঙ্গন এক মুহূর্তের জন্যও শিথিল হতে দিল না সে। তার জিভের অগ্রভাগ সুহিনের ওষ্ঠের সীমানা ভেদ করে এক অস্থির অন্বেষণে লিপ্ত হলো; এক ছন্দময় সংঘাত আর সমর্পণের খেলায় মেতে উঠল তাদের নিঃশ্বাস। এই সংযোগে ছিল না কোনো ধীরগতি, বরং ছিল এক তৃষ্ণার্ত ব্যাকুলতা যা সুহিনের সংজ্ঞাকে ক্রমশ আচ্ছন্ন করে দিচ্ছিল।

নিজের জন্মদিনের কেক খেতে না পারার আফসোসটাও বোধহয় কিঞ্চিৎ মিটে গেল সেই জিভের স্পর্শে। সুহিন যেন সেই ওষ্ঠের নিবিড় সিক্ততাতেই খুঁজে পেল পৃথিবীর সমস্ত মাধুর্য আর সেই কাঙ্ক্ষিত জন্মদিনের কেক-এর আস্বাদ।
​সুহিন অনবরত শুষ্ক ঢোক গিলল। আঙুলের দৃঢ় স্পষ্টে খামচে ধরল কেকের টিশার্টের বুকের বা-অংশ। পা দুটো সহসাই উঁচিয়ে নিজেকে সঁপে দিতে চাইল। কেকে’ও তার দৃঢ় বন্ধনে একপ্রকার শূন্যে তুলে নিয়েছে। এদিকে সুহিন যখন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে, এই বেপরোয়া আবেশের তালে তাল মেলাতে চাইল, ঠিক তখনই আবহ বদলে গেল।
ঘড়ির কাঁটায় গুনে গুনে ঠিক সাত মিনিট স্থায়ী হলো এই নিগূঢ় মুহূর্ত। কেকে আকস্মিকভাবে সুহিনের নিম্ন অধর দাঁত দিয়ে সজোরে কামড়ে ধরল। মায়া আর আবেশের দেয়াল ভেঙে সে যেন এক নিমিষেই সবকিছু ছিন্নভিন্ন করে দিতে চাইল। তার সেই অমানবিক ক্ষিপ্রতায় সুহিন তীব্র যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেল, যন্ত্রণার ছাপ স্পষ্ট হলো তার মুখাবয়বে। আর ঠিক সেই চরম মুহূর্তেই কেকে তাকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত করে দিয়ে কয়েক পা পিছিয়ে দাঁড়াল।

​সুহিন কাঁপাকাঁপা হাতে নিজের ঠোঁট স্পর্শ করতেই আঙুলের ডগায় রক্তের উষ্ণতা অনুভব করল। বিস্ময় ও হতভম্ব দৃষ্টিতে সামনে তাকাতেই দেখল, কেকে অত্যন্ত নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। বাম হাতের কব্জি দিয়ে ঠোঁট থেকে রক্তের দাগটুকু মুছে নিয়ে সে এক তির্যক বাঁকা হাসিতে সুহিনকে বিদ্ধ করল।
​”হ্যাপি বার্থডে, মাই ব্লু-বেরি!”

​সুহিন রাগে ক্ষিপ্ত কিছু বলতে যাবে, তার আগেই কেকে নিস্পৃহ কণ্ঠস্বরে আবারও বলে উঠল,
“আগেই বলেছিলাম—আই ওয়ান্ট টু ইট ইয়োর লিপস, নট জাস্ট কিস দেম।”
​সুহিন রাগে আর যন্ত্রণায় দাঁতে দাঁত পিষে দাঁড়িয়ে রইল। কেকে নির্বিকার ভঙ্গিতে প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজল। যাওয়ার আগে শেষবারের মতো বলে গেল,
“এখন যেতে হবে। এটাকে গিফট ভেবে ভুল করিস না। তোর জন্য এর চেয়েও স্পেশাল একটা উপহার তোলা আছে। জাস্ট ওয়েট, মাই সুইট লিটিল হ্যামস্টার।”
​কেকে কক্ষ ত্যাগ করার পর সুহিন নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বারবার নিজের ক্ষতবিক্ষত ঠোঁট জোড়া মুছতে মুছতে বিড়বিড়িয়ে ক্ষিপ্ত স্বরে আওড়াল,
“একদম ছিঁড়ে ফেলেছে, জানোয়ারটা!”

রাত তখন একটা ছাড়িয়ে দেড়টার কাছাকাছি। চারপাশ নিঝুম, কেবল অন্ধকার ঘরের এক কোণে মোবাইলের স্ক্রিন থেকে বিচ্ছুরিত নীলচে আলোটা নাফিসার মুখে এসে পড়ছে। মেসেঞ্জার গ্রুপে তখন আড্ডার তুবড়ি ছুটছে, হাসির হুল্লোড়ে যেন ডিজিটাল মাধ্যমটাও টালমাটাল। নাফিসা বিছানায় শুয়ে শুয়ে বালিশে মুখ গুঁজে হাসছে। শব্দহীন সেই হাসি মাঝে মাঝে দমক দিয়ে উঠছে, যেন হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরার উপক্রম।
​আজকের পুরো দিনটাই ছিল একটা পাগলাটে অভিযানের মতো। আর এই অভিযানের কেন্দ্রবিন্দুতে সেই গম্ভীরমুখো লোকটা—তালহা রিজভী। তালহার সাথে নাফিসার দেখা হওয়াটা অনেকটা গল্পের উপন্যাসের মতোই কাকতালীয়, তবে আজকের ঘটনাটা ছিল একদম ছক কষা।

প্রথম দিনের সেই অদ্ভুত সাক্ষাতের কথা নাফিসা যখন রসিয়ে রসিয়ে তার বন্ধবীদের বলেছিল, তখন তালহাকে নিয়ে হাসাহাসির অন্ত ছিল না। বান্ধবীরা তাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দিয়েছিল—পরেরবার দেখা হলে যেন তালহার পিলে চমকে দেওয়ার মতো কিছু একটা করে বসে।
​তখন সেসব নাফিসা মাথায় না নিলেও, আজ সকালে সেই মোক্ষম সুযোগটা চলে এলো। নাফিসা একা ছিল না, সাথে ছিল তার চিরচেনা বান্ধবীর দল। দূর থেকে তালহাকে দেখেই যখন নাফিসা উত্তেজনায় বলে উঠল,
‘আরে! এটাই তো সেই লোক!’, অমনি বান্ধবীরা তাকে ডেয়ার পালনের জন্য চেপে ধরল। এরপর যা ঘটল, তা বোধহয় কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের কাজ হতে পারে না। বান্ধবীদের উসকানিতে সেধে গিয়ে তালহার সাথে কথা বলা তো ছিলই, তার ওপর ক্যাফেতে নাস্তা করে বিল না মিটিয়েই সটকে পড়া! উল্টো সেই বিলের দায়ভার নির্লজ্জের মতো চাপিয়ে দেওয়া হলো বেচারা তালহার কাঁধে।

​গ্রুপে বান্ধবীদের মেসেজগুলো এখনো অবিরাম আসছে। একজন লিখেছে,
“সোজা আঙ্কেল বলে সম্বোধন করলি? তোর কান্ড দেখে আমরা তো থ!”
মেসেজের শেষে একগাদা ‘হা হা’ ইমোজি। নাফিসা হাসতে হাসতে একটু থামল। তার মনের গহীনে একটা সূক্ষ্ম ভাবনা উঁকি দিল—লোকটা আসলে মন্দ নয়। যতটা গম্ভীর, ততটাই ধৈর্যশীল। অন্য কেউ হলে হয়তো মেজাজ হারিয়ে অপমান করত, এমনকি চড়-থাপ্পড়ও চালিয়ে দিতে পারত। কিন্তু তালহা অবাক হলেও নিজের গাম্ভীর্য হারায়নি। নাফিসা ভাবল, আজকের এই উড়নচণ্ডী কাণ্ডের পর লোকটা নিশ্চয়ই আর কক্ষনো তার ছায়াও মাড়াতে চাইবে না। এসব ভেবেই সে আবারও হাসতে লাগল।

​নাফিসা স্বভাবগত দিক হতেই বেশ চঞ্চল প্রকৃতির। তবে নাফিসার এই চঞ্চলতার পেছনে এক দীর্ঘ বিষণ্ণ অতীতও আছে। যা সে সযত্নে ঢেকে রাখে তার হাসির আবরণে।এই পৃথিবীতে তার নিজের বলতে আছে কেবল মামা-মামি আর একটা ছোট মামাতো বোন। নাফিসা একদম শিশুকালেই নিজের বাবা-মা’কে হারিয়ে এতিম হয়েছে।
এরপর পুরো জীবনটা মানুষ হয়েছে তার এই মামা-মামীর আশ্রয়ে। মামা তাকে প্রচন্ড আদর করতো—সেই ছোট্ট বেলা থেকেই। লোকজনের মতে মামার এতো আদরের কারণেই সে নাকি বাদর হয়েছে। কিন্তু বিষয়টা খানিক ভিন্ন।
হ্যাঁ,মামার আদর তো সে পেয়েছে কিন্তু বুঝ হওয়ার পর থেকে আড়ালে-অগোচরে মামির নানান কটু আচরণের পর থেকে সে বুঝেছে, বাস্তবটা আসলে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ছোট বেলায় এসব নিয়ে কষ্ট পেয়ে আড়ালে বালিশ ভেজালেও, সময়ের সাথে সাথে সে এই পরিবার থেকে নিজেকে যথাসম্ভব গুটিয়ে নিয়েছে। সিন্ধান্ত নিয়েছে পৃথিবীতে আর কারো ব্যবহারেই সে কখনো কষ্ট পাবে না। প্রয়োজনে বাদর হয়ে গাছে ঝুলবে, কিন্তু এই একটি মাত্র জীবনে কখনো কষ্টের ছিটেফোঁটাকেও আসতে দেবে।

সে আর কাউকে তাকে কষ্ট দেওয়ার অধিকারও দেবে না। লোকে তাকে ‘বেয়াদব’ বলুক বা ‘বাদর’, তাতে তার কিছু যায় আসে না। সে বরং হাসিমুখে জীবনটাকে উড়িয়ে দিতে চায়।
তারপর থেকেই বোধহয় নাফিসা এমন। মামার অনুপস্থিতিতে মামি তার হাজারটা কটু কথা শুনালেও,সে গায়ে মাখে না। বড় হয়েছে বিধায়,এখন আর তেমন গায়ে হাত তুলতে পারে না। কিন্তু সেসবে তার কিচ্ছু যায় আসে না। সারাদিন টইটই করে ভার্সিটি, আর বান্ধবীদের নিয়েই ঘুরাঘুরি করে বেড়ায়। অনেক আগে থেকেই টিউশনি পড়ায় বিধায়, নিজের খরচ নিয়েও তার তেমন চিন্তা থাকে না৷ আবার বাড়তি টাকা মাঝেমধ্যে মামি আর মামাতো বোন রিতুকে দিলে তারাও খুশি হয়ে যায়।

মোটামুটি এভাবেই চলছে তার জীবন। রাত দেড়টা অব্দি আড্ডা দেওয়ার পর, নাফিসা ফোনটা রেখে শুয়ে পড়ল। বুঁজে হারিয়ে গেল নিজের স্নিগ্ধ কল্পনায়।
তার এই কল্পনার জগতটা আরো বেশি চমৎকার। কোনো ঝামেলা নেই, ঝঞ্জাট নেই, পৃথিবীর সকল কোলাহল থেকে তাকে মুক্তি দেয়। নাফিসা কল্পনা করতে করতে ঘুমে আচ্ছন্ন হয়।ঘুমের আচ্ছন্নতায় তলিয়ে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে, তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। শেষ প্রহরে তার হাসি মিশ্রিত ঠোঁট হতে অস্ফুটে নিঃসৃত হলো তিনটি শব্দ,
“আলু মোটা ভালু।”

শহরের কোলাহল ছাপিয়ে জনমানবহীন প্রান্তরে অবস্থানরত এক পরিত্যক্ত গোডাউন। মধ্যরাতের নিকষ কালো অন্ধকারে নিমজ্জিত চারপাশ। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা ছাপিয়ে বিশাল গোডাউনটির ভেতর থেকে ভেসে আসছে কিছু মানুষের চাপা গোঙানির শব্দ।
​গোডাউনের সুউচ্চ সিলিং থেকে চারটি দেহ বাদুড়ের মতো উল্টো হয়ে ঝুলছে। তিনজনের পরনে ধুলোবালি মাখা সাদা পাঞ্জাবি, অন্যজনের পরনে সাধারণ চেকের শার্ট ও প্যান্ট। মধ্যবয়স্ক এই মানুষগুলোর চোখেমুখে জমাটবদ্ধ রক্তের দাগ আর তাজা আঘাতের চিহ্ন। তাদের মস্তিষ্ক এখনো ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারেনি; ঠিক কী হয়েছিল, কীভাবে তারা এই নরককুণ্ডে এসে পৌঁছাল, তার কোনো স্মৃতিই অবশিষ্ট নেই।

​উল্টো হয়ে ঝুলে থাকার যন্ত্রণা অসহ্য। মধ্যাকর্ষণের টানে মাথার দিকে রক্ত হু হু করে নেমে আসছে, চোখের মণি দুটো যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। শরীরের সমস্ত ভার এখন শুধু পায়ের শিকলবাঁধা বাঁধনটুকুর ওপর। সেই ভার সহ্য করতে না পেরে পেশিগুলো বিদ্রোহ করছে, মেরুদণ্ড ফেটে-চিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম। ভারী শরীর নিয়ে এই শূন্যে ঝুলে থাকাটাই যেন এক অন্তহীন নরকযন্ত্রণা।
​এরিমধ্যে নিস্তব্ধতা চিরে একজন গোঙাতে গোঙাতে আর্তনাদ করে উঠল,
“কেউ আছেন? এটা কোন জায়গা? আমাদের এখানে কেনো আনা হয়েছে…?”
​কোনো উত্তর নেই। কেবল গোডাউনের শূন্যতায় সেই স্বর প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল। মিনিট খানেক পর, বিশাল লোহার দরজাটা কড়মড় শব্দ করে খুলে গেল। অন্ধকারের বুক চিরে কেউ বা কারোর পদশব্দ শোনা গেল। সেই পায়ের শব্দ ধীর, ছন্দময় এবং অত্যন্ত দৃঢ়। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন মৃত্যুর আগাম বার্তা নিয়ে এগিয়ে আসছে।
​ঝুলে থাকা লোকগুলো আতঙ্কে কুঁকড়ে গেল। তাদের মধ্যে শার্ট পরা লোকটি কর্কশ স্বরে হুমকি দেওয়ার চেষ্টা করল,
“কারা তোরা? জানিস আমরা কে? কী চাস তোরা আমাদের কাছে? এখনো সুযোগ দিচ্ছি ছেড়ে দে, নয়তো একটারও হাড়গোড় আস্ত থাকবে না!”

​তার সেই শূন্যগর্ভ হুমকি কেবল অন্ধকারের দেয়ালে ধাক্কা খেল। কোনো সাড়া মিলল না। কিছুক্ষণ এক নিরেট নীরবতা। সেই নিস্তব্ধতা যেন লোকগুলোর সংশয় আর ভয়কে বহুগুণ বাড়িয়ে দিল। হঠাৎ, পাঞ্জাবি পরা এক লোক কুঁচকানো ভ্রু আর কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠল,
“কে তুমি?”

​অন্ধকারে মিশে থাকা প্রথম ছায়াটির ঠোঁটের কোণে তখন এক পৈশাচিক তির্যক হাসি ফুটে উঠেছে। কাঁপা গলার প্রশ্ন করা ‘কে তুমি’ বলা লোকটা তার বড্ড চেনা। এই নিকষ কালো অন্ধকারের মাঝেও লোকটি যে তাকে চিনে ফেলতে চাইছে—ভয়ংকর শিকারি আর অসহায় শিকারের এই খেলাটাকে সে বেশ উপভোগ করল।
​সময় বয়ে যাচ্ছে। আগন্তুকের হাতের ব্ল্যাক ব্র্যান্ডের কালো ঘড়ির কাঁটার সূক্ষ্ম ‘টিক-টিক’ আওড়ায়—এই নিস্তব্ধতাকে আরো নৃশংস ভাবে চিঁড়ে ফেলছে। ঝুলে থাকা লোকগুলোর হৃৎস্পন্দন সেই শব্দের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। ঠিক তখনই আগন্তুক তার প্যান্টের পকেট থেকে একটি ব্ল্যাক মেটালিক লাইটার বের করল। সে সেটি জ্বালাল না; কেবল বুড়ো আঙুল দিয়ে বারবার সুইচটা অন-অফ করতে লাগল। ধাতব সেই ‘ক্লিক-ক্লিক’ শব্দটা অন্ধকারে এক অদ্ভুত ত্রাসের খেলা সৃষ্টি করল।
​ঝুলে থাকা সেই ব্যক্তিটি এবার হুংকার দিয়ে শেষবারের মতো আর্তনাদ করে উঠল,

“কে…কে তুমি?”
​আগন্তুক এবারও কেবল নিঃশব্দে হাসল। অতঃপর বৃদ্ধাঙ্গুলির চাপে লাইটারটি জ্বালিয়ে নিজের মুখের সামনে ধরল।
আগুনের সেই ক্ষুদ্র শিখায় কেবল একজন নয়, বরং পাঁচটি হিং”স্র শিকারির ন্যায় কালো ছায়া দৃশ্যমান হলো। তারা সকলে এক সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্যেকের পরনে মিশমিশে কালো পোশাক। সেই চারজনের একদম মাঝবরাবর শীতল-তীক্ষ্ণ চোখের,প্রশস্ত বুকের অধিকারী সেই আগন্তুক নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। যার একহাতে জলন্ত লাইটার আর অন্যহাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে রাখা। বাকি সবটাই রহস্যময় অন্ধকার।
​ঝুলে থাকা লোকটি অস্ফুট স্বরে বিস্ময়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে আবারও জানতে চাইল,

Naar e Ishq part 18

“কে তুমি?”
বিস্তৃত তির্যক হেসে, ​নিজের সহজাত শীতল-গুরুগম্ভীর ও রক্ত হিম করা নিস্পৃহ কণ্ঠে আগন্তুক উত্তর দিল,
​”ব্যাড ওল্ফ!”

Naar e Ishq part 20