Naar e Ishq part 18
তুরঙ্গনা
সকালের মিঠে রোদ মেখে সকলের ব্যস্ততা এখন তুঙ্গে। এনগেজমেন্টের আয়োজন বলে কথা! জাভিয়ানের নিখুঁত নির্দেশনায় বাড়ির প্রতিটি কোণে প্রস্তুতির আমেজ। এদিকে কেকের তাগাদায় তালহাকে ছুটতে হয়েছে লোকাল মার্কেটে; বিশেষ কিছু জিনিস এখনো সংগ্রহ করা বাকি।
জনবহুল এই বাজারের শোরগোলের মাঝে তালহা যখন নিজের কাজে মগ্ন, ঠিক তখনই তার প্রাত্যহিক জীবনের নিস্তরঙ্গতায় এক পশলা ঝোড়ো হাওয়ার মতো নাফিসার আগমন ঘটল।
সেই চঞ্চল মেয়েটি—যার উচ্ছ্বলতা মুহূর্তেই চারপাশের পরিবেশ বদলে দেওয়ার মতোও ক্ষমতা রাখে। তালহা প্রথমে তাকে একদমই চিনতে পারল না। মানুষের ভিড়ে মিশে থাকা আর দশটা সাধারণ মুখের মতো ভেবে নিয়ে সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পাশ কাটিয়ে যেতে চাইল। কিন্তু তৎক্ষনাৎ একটি অদ্ভুত সম্বোধন তাকে থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করল।
—“এই যে আলু মোটা ভালু! দেখেও না দেখার ভান করে চলে যাচ্ছেন?”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
ভীড়ের মাঝে হঠাৎ এমন রসিকতাপূর্ণ মন্তব্যে তালহা মুহূর্তের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেল। ভ্রু কুঁচকে পেছনে তাকাতেই দেখল, সামনে একটি বিস্তৃত হাসিমাখা মুখ। নাফিসা! তার কোমড় অব্দি লম্বা চুলগুলো আজ সুন্দর করে পনিটেল করা। পরনে একটি মিষ্টি রঙের সাধারণ গাউন—যা তাকে আরও বেশি প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
তালহা কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে পরখ করল। পরক্ষণেই নিজেকে কিছুটা তটস্থ করে, ধীর পায়ে নাফিসার দিকে এগিয়ে গিয়ে গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল,
”মিস নাফিসা নূর! আমি কি ঠিক বলছি?”
নাফিসার ঠোঁটের কোণে হাসি আরও বিস্তৃত হলো। সে বেশ খোশমেজাজে জবাব দিল,
“এই তো! আপনার স্মৃতিশক্তি তো বেশ ভালো। ভালোই মনে রেখেছেন দেখছি।”
তালহা নিজের গাম্ভীর্য বজায় রেখে শান্ত স্বরে বলল,
“জ্বী, কিন্তু আপনার বোধহয় আমার নামটা ঠিক মনে নেই। আমার নাম তালহা রিজভী, ‘আলু মোটা ভালু’ নয়।”
নাফিসা মোটেও দমে গেল না। বরং একরাশ তাচ্ছিল্য মেশানো হাসিতে, তালহার কথাটাকে উড়িয়ে দিয়ে বলল,
“না না, আপনার নাম আমার ঠিকই মনে আছে। কিন্তু আপনাকে ওই নামে ডাকতেই আমার বেশি ভালো লাগে।”
তালহা আর কথা বাড়াতে চাইল না। এই মেয়েটির অদ্ভুত যুক্তির সাথে পাল্লা দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। নিজের সহজাত গাম্ভীর্য ফিরিয়ে এনে সে সংক্ষেপে বলল,
“আসি তবে, ভালো থাকবেন।”
বলেই সে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে যাবে, ঠিক তখনই ঘটে গেল এক অপ্রত্যাশিত কাণ্ড। নাফিসা আচমকা তালহার কালো হুডির হাতাটা খপ করে টেনে ধরল। তালহার মতো একজন গম্ভীর মানুষের জন্য এটি ছিল একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত। নাফিসা প্রায় টেনেহিঁচড়েই তাকে রাস্তার উল্টো দিকে নিয়ে যাওয়ার উপক্রম করে চটপটে গলায় বলল,
”কিসের আসি-টাসি? এত দিন পর দেখা হলো, চলেন একটু ঘুরে আসি!”
সবসময় মেপে চলা, স্বল্পভাষী তালহা নিমিষেই থতমত খেয়ে গেল। এই পিচ্চি সাইজের মেয়েটার মেয়ের জোরেই তাকে এমন হতভম্ব হতে হচ্ছে, ব্যাপারটা তার জন্য বোধহয় কল্পনাতীত ছিল। পরিস্থিতির আকস্মিকতায় প্রতিবাদ করার ভাষাও যেন সে হারিয়ে ফেলেছে। অগত্যা একপ্রকার বাধ্য হয়েই, গুমসো মুখে চঞ্চল নাফিসার পেছন পেছন পা মেলাতে লাগল।
রাস্তার পাশের এক চিলতে ছিমছাম ক্যাফে। কাঁচের দেয়াল ভেদ করে সকালের নরম রোদ টেবিলের এক কোণে এসে পড়েছে। নাফিসা বেশ আয়েশ করে একটা জানালার ধারের সিট দখল করল, আর তালহা তার বিশাল দেহ নিয়ে কিছুটা সংকুচিত হয়ে উল্টো দিকের চেয়ারে বসল। তার চোখেমুখে এখনো সেই হার মেনে নেওয়া’র ছাপ স্পষ্ট।
ওয়েটার এসে মেনু কার্ড রাখতেই নাফিসা সেটা একপাশে সরিয়ে দিয়ে বলল,
“মেনু লাগবে না। আমাদের দুই কাপ কড়া লিকারের চা দিন, সাথে দুটো বিস্কুট। ব্যস!”
তালহা ভ্রু কুঁচকে তাকাল। গলাটা কিঞ্চিৎ খাকিয়ে বলল,
“আপনি কি আমাকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন বোধ করলেন না? আমি কফিও খেতে পারতাম।”
নাফিসা থুতনিতে হাত রেখে ঝুকে বসল। তার চোখের মনিতে রোদের ঝিলিক। এই পর্যায়ে তালহা খেয়াল করল, মেয়েটার সৌন্দর্য বেশ অদ্ভুত। একদম মনে ধরার মতোই। সেই স্বাভাবিক দুটো চোখ, সরু একটা নাক, গোলাপের পাপড়ির ন্যায় ঠোঁট—এতে আর এমন বিশেষ কি আছে? অথচ এমন ভাবনার পরও, তালহার কাছে মেয়েটা সম্পূর্ণই স্পেশাল কিছু মনে হলো। হয়তো হতে পারে এর বিশেষ কারণ হলো তার নামটা। নূর! নূরের মতোই অদ্ভুত এক সৌন্দর্যে প্রচ্ছন্ন সে।
এদিকে নাফিসা তার কথার জবাবে চটপটে গলায় বলল,
“এই যে আলু মোটা ভালু সাহেব! কফি খাওয়ার মতো ভারিক্কি মুড সবসময় আপনার থাকতে পারে। কিন্তু এখন কফি খাওয়ার জন্য নূন্যতম ইন্টারেস্ট আমার একদমই নেই। আর এমনিতেও, এমন খোলা হাওয়ায় চায়ের চেয়ে ভালো আর কিছু হতেও পারে না। বিশ্বাস না হলে খেয়েই দেখুন!”
তালহা আর কথা বাড়ায় না। চা আসার অপেক্ষায় তালহা চুপ করে রইল। চারপাশের কোলাহল থেকে দূরে এই নিভৃত কোণটিতে কেন জানি তার গাম্ভীর্যের দেয়ালটা একটু একটু করে আলগা হচ্ছে। সে শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আপনি কি সবসময়ই এমন? মানে, হুটহাট মানুষকে ধরে টানাটানি করা আর অদ্ভুত সব নামে ডাকা—এগুলো কি আপনার শখ?”
নাফিসা শব্দ করে হেসে উঠল।
—“শখ না, এটা হলো একটা আর্ট! আর্ট মানেই শিল্প। আর শিল্পকে সম্মান করতে হয়, মিস্টার! আর আপনি তো আমার পরিচিত। আগেও একবার দেখা হয়েছিল তো! সেক্ষেত্রে পরিচিত মানুষদের সাথে এসব মজা করাই যায়।”
তালহা অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে ক্ষীণ হাসার চেষ্টা করল। পরক্ষণেই রুক্ষ গলায় আবারও জিজ্ঞেস করল,
“কিন্তু আমি তো মোটা বা আলুর মতো দেখতে নই। তাহলে দুনিয়ায় এতোসব নাম থাকতে এই নামই কেন…?”
নাফিসা আবারও হেসে উঠল। সব প্রশ্নে এভাবে হাসার কি মানে থাকতে পারে তা তালহার জানা নেই।
—“আপনি গ্রিজি অ্যান্ড দ্য লেমিংস কার্টুনটা দেখেছেন? ঐখানে অনেকগুলো পুলপুলে থাকে আর একটা আলুমোটা ভালু…আ মানে, ব্রাউন-অরেঞ্জ কালারে ভাল্লুক থাকে! ওটা আমার ফেবারিট কার্টুন। দেখেছেন?”
তালহা ফ্যালফ্যাল করে নিস্ফল দৃষ্টিতে নাফিসার দিকে তাকিয়ে রইল। কিসের কার্টুন,আর কোন কার্টুনের কথাই বা বলছে এই মেয়ে?
এদিকে নাফিসা তার চুপসে থাকা বিরক্তিতে পূর্ণ মুখটা দেখেই বুঝে নিল, সে তার কথা বুঝছে না। এই পর্যায়ে সে ভাবল, ফোন বের করলে লোকটাকে কার্টুনটা দেখানো যাক।কিন্তু পরক্ষণেই সে এই সিন্ধান্ত থেকে সরে এসে, সরাসরি তালহার উদ্দেশ্যে ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আপনার বয়স কত,ভাল্লুক সাহেব?”
হঠাৎ সরাসরি বয়স জিজ্ঞেস করায়, তালহা কিছুটা থমকে গেলেও পরক্ষণেই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“থার্টি টু অর থার্টি থ্রি…দুটোর মাঝামাঝি বলা চলে।”
তালহার এই স্বাভাবিক কথাটা বোধহয় নাফিসার হজম হলো না। সে বিস্ময়ে মুখটা হা করে তৎক্ষনাৎ উঠে দাঁড়াল। তালহাকে রীতিমতো ভড়কে দিয়ে তার দিকে ঝুঁকে পড়ল;বিস্ময়ের স্বরে বলল,
“কিহ! আপনি আমার চেয়ে এত্তো বড়? এটা কি করে সম্ভব? আপনি তো পুরো বুড়ো মানুষ।”
নাফিসার এহেন অভিব্যক্তিতে, তালহা দ্রুত তার হাতটা খপ করে ধরে জোর করেই ইশারায় বসতে বলল।নাফিসার কান্ডে আশে পাশের মানুষগুলো অব্দি তাকিয়ে আছে।
—“কি করছেন নাফিসা! সবাই দেখছে!”
নাফিসা তটস্থ হলো। চুপচাপ বসে পড়ে, তালহাকে আপাদমস্তক চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল। না, দেখতে তো খুব বেশি হলে পঁচিশ, ছাব্বিশ এর মতো ঠেকছে। কিন্তু তাই বলে বত্রিশ, তেত্রিশ? একটু বেশিই হয়ে গেল না?
নাফিসা খানিক ইতস্তত স্বরে আওড়াল,
“সরি মিস্টার ভালু, আমি তো অনার্স ফাস্ট ইয়ারে কেবল আর আপনি তো দেখছি…যাই হোক, আমাদের বয়সের পার্থক্যটা বোধহয় একটু বেশিই হয়ে গেসে।”
তালহা ভ্রু উঁচিয়ে ভারী শ্বাস ফেলল। স্বাভাবিক গম্ভীর স্বরে বলল,
“হ্যা, তা তো অবশ্যই। তবে আমি কোনো বুড়ো নই। বরং আপনি নিজেই পিচ্চি।”
শুরুতে নাফিসা কিছুটা ইতস্তত বোধ করলেও, পরক্ষণেই সে তার চিরচেনা চঞ্চল রূপে ফিরে এসে বলল,
“তাহলে আপনি বরং আমাকে তুমি বলেই ডাকবেন। যেহেতু আমি আপনার চেয়ে অনেক ছোট, সেক্ষেত্রে এটাই ভালো হবে।”
এই বলতে না বলতেই, নাফিসা আরো কিছু বলতে উদ্যত হবে ঠিক তৎক্ষনাৎ তার ফোনের নোটিফিকেশনটা বেজে উঠল। এবং সে তড়িঘড়ি করে তা একবার দেখে নিয়েই সোজা উঠে দাঁড়াল। তালহাকে বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়ে তৎক্ষনাৎ উদ্বিগ্ন চিত্তে চলে যেতে যেতেই বলল,
“আজ বরং আসি, আশা করি আমাদের আবারও দেখা হবে। আর বিলটাও একটু দিয়ে দিয়েন আঙ্কেল। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
এই বলতে বলতেই চোখের সামনে মেয়েটা ক্যাফে থেকে বেরিয়ে গেল।আর অন্যদিকে স্তম্ভিত হয়ে বসে রইল তালহা। ‘সিরিয়াসলি, আঙ্কেল? শেষ বেলায় এটা কি বলল মেয়েটা?”
তালহা ভারী শ্বাস ফেসে তাচ্ছিল্যের সহিত ক্ষীণ হাসল। পরক্ষণেই রুক্ষস্বরে বিড়বিড়িয়ে আওড়াল,
“অন্তত এই জনমে তোমার সাথে আমার আর কখনো দেখা না হোক, মিস নাফিসা নূর!”
সবাই যে যার মতো কাজে ব্যস্ত। সুহিন ভেবে পাচ্ছে না সে কি করবে? কিসব মুসিবতে ফেঁসে আছে। পাগলের মতো যে যা বলছে তাকে তাই করতে হচ্ছে। মন-মেজাজটাও ঠিক ভালো নেই।
এরিমধ্যে সে দোতলার করিডোর পেরোতে যাবে ঠিক তৎক্ষনাৎ পরিচিত এক কন্ঠস্বর পেয়ে কিছুটা থমকে দাড়াল।
—“হেই ইউ চশমিশ!”
সুহিন ফিরে তাকাল। দেয়ালের পিলারের সাথে হেলায় দিয়ে, বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে কেকে। কাঁধটা খানিক বাঁকা করে রাখা, চুলগুলো বরাবরের মতোই এলোমেলো। আর সেই তীক্ষ্ণ শীতল চাহুনি! সে তো প্রয়োজন ভেদে কখনো হিংস্র কখনো বা গম্ভীর-নমনীয়। আপাতত তার ভাবগম্ভীর্য খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে গেল না সুহিন।
বরং কেকের ডাকেও সাড়া দিল না সে। উল্টো তাকে না দেখার ভাণ করে এগিয়ে যায়। কেকে পুনরায় ডেকে ওঠে,
—“ব্লু-বেরি স্টপ!”
সুহিন তবুও থামে না। এবার কেকের ভ্রু-জোড়া সামান্য কুঁচকে যায়। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে, গলার স্বর খানিকটা রুক্ষ করে বলল,
—“হানি!”
আবারও সুহিনের নিরুদ্বিগ্ন ভাবভঙ্গিতে কেকে অচিরেই ক্ষীণ মুচকি হাসে। পুনরায় নির্বিকার ভঙ্গিতে বুকে হাত গুঁজে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। কাঁধটা সামান্য বাঁকা করে,হাস্কিস্বরে ডাকে,
—“হেই ওয়াইফি!”
সুহিন থমকে যায়। পেছনে দেওয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা কেকের তির্যক হাসিটুকু আরো বিস্তৃত হয়। সে আচমকাই নিজের পছন্দসই ‘মে হু না’ খ্যাত শিসখানা বাজিয়ে ওঠে। আর এতেই সুহিন যেন কপোকাত। কেকে নির্বিঘ্নে শিস বাজাতে বাজাতে, তার কাছে এগিয়ে যায়। সুহিন সরে যাবার পূর্বেই,তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে আওড়ায়,
—“আর ইউ লস্ট? লিটিল হ্যামস্টার!”
অচিরেই সুহিন অদ্ভুত এক শিহরণে কিঞ্চিৎ কেঁপে ওঠে। ভীতু চোখে কাঁধটা সামান্য ঘোরাতেই দেখা মেলে, তার অতি সন্নিকটে ঘেঁসে থাকা কেকের ক্ষীণ হাসিযুক্ত মুখখানা।
এই পর্যায়ে কেকে আচমকা হাত বাড়িয়ে, তার কোমড় পেঁচিয়ে ধরে। অকস্মাৎ এহেন কান্ডে সুহিনের চোখজোড়া বিস্ময়ে খানিক বড় হলেও,কেকে মোটেও দমে না। উল্টো কোমড় হতে পেটে খানিকটা দৃঢ়তার সহিত বল প্রয়োগ করে, তাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। পিঠটা কেকে’র বুকে ঠেকা মাত্রই, সুহিন বেশ অস্বস্তির সাথে উসখুস করে আওড়ায়,
“কি করছেন এসব?”
এই পর্যায়ে আচমকা কেকে’র চোখ-মুখ শক্ত হয়। তীক্ষ্ণ চোয়ালখানা দৃঢ় করে, তির্যক দৃষ্টিতে সুহিনকে কিছুক্ষণ দেখার পর বলে,
“লাস্ট ওয়ার্নিং!আর কখনোই আমায় ইগনোর করার চেষ্টাও করবি না। নয়তো…”
কেকে নিজের কথাটা সম্পূর্ণ করল না। বরং তার আগেই হঠাৎ হাতের দৃঢ়তা বেড়ে যেতেই, সুহিন ক্ষীণ ব্যাথায় চোখ-মুখ খিঁচে নিয়ে ব্যাথাতুর স্বরে আওড়ায়,’আহ্!’
কেকে পরক্ষণেই তাকে ছেড়ে দিল। এবং নূন্যতম কালবিলম্ব না করে, নিজের সহজাত ভাবগাম্ভীর্যের সহিত পেছন ফিরে চলে যেতে লাগল। তার এমন অদ্ভুত কার্যকলাপ আর ভাবগম্ভীর্যে সুহিন কপাল কুঁচকে বিড়বিড় করে আওড়াল,
“অসভ্য লোক!”
দুপুরের মধ্যেই খাবারের মেনুতে যা যা রাখার কথা ছিল,সবই প্রস্তুত হলো। তবে সুহিন কিচেনের কাছেই যেতেই কিছু অবাক হলো। কেকে রান্নাঘরে কি করছে?
একটু ভালোমতো খেয়াল করতেই দেখল, শেফ’টা বেশ ভীতুথিতু হয়ে তার কথামতো কিছু একটা বানাচ্ছে। আর কেকে কাউন্টার টপের এক’কোণে পা ঝুলিয়ে বসে বসে, কিছু একটা খাচ্ছে। আর কেকে খাওয়ার মাঝেই, শেফকে নানান দিকনির্দেশনা দিচ্ছে।
সুহিন পিলারের আড়াল হয়ে দুজনের কথাবার্তা শোনার চেষ্টা করল।
—“ইট টেস্টেস্ গুড। বাট এর পর থেকে লাজানিয়্যেতে পারমেজান চিজটা একটু কম, আর স্পাইসেস আরেকটু বেশি দিবেন। আদারওয়াইজ, এভরিথিং ইজ পারফেক্ট!”
কেকের এই সামান্য গম্ভীর্যে ঘেরা কথাবার্তাতেও, কাজের মাঝে মধ্যবয়স্ক শেফটাও খানিক ঘাবড়ে গেলো। অন্যদিকে সুহিন ভাবতে লাগল, এই বেটা বসে বসে শেফটাকে দিয়ে এসব কি বানিয়ে খাচ্ছে? পরক্ষণেই মনে করে দেখল, ‘এই খাবারটা হয়তো ইতালিয়ান কোনো খাবার। আগেও কোথাও একবার নাম শুনেছে। কিন্তু কথা তো তা নয়! জাভিয়ান আঙ্কেলের বহু কষ্টে খুঁজে নিয়ে আসা, এই বাঙ্গাল শেফ’কে খাঁটিয়ে, উনি এসব কি বানাচ্ছে?’
বেচারা শেফটার চোখমুখ দেখে তার বেশ মায়াই হলো। এরিমধ্যে শেফটা তাকে জিজ্ঞেস করল,
“বলছিলাম, এই তিরামিসুতে চিনি কি বেশি নাকি…”
—“একদমই কম। আর কফির পরিমানটা খানিক বেশি।”,কেকে সোজাসাপ্টা কাঠখোট্টা জবাব। লোকটা তার কথা শুনে, পুনরায় তিরামিসুর ফ্রস্টিং বানানোতে মনোযোগী হলো।
সুহিনের আর এসব তামাশা দেখার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে হলো না৷ সে কালবিলম্ব না করে, আড়ালেই থেকে অন্যরাস্তার দিকে পা বাড়াল। একইসাথে নাকের ডগায় নেমে আসা চশমটা ঠেলে দিয়ে, বিড়বিড় করে আওড়াল,
“সবগুলো পাগল। একবার শুধু এই ঝামেলা মিটে যাক আর নিমরাটা চলে আসুক—আমি এই বাড়ি ছেড়েই চলে যাবো। ওসব বিয়ে-টিয়ে কে মানে? আমার তো ঠেকা পড়েনি!”
কাহসান কুঞ্জের স্নিগ্ধ সন্ধ্যাটি আজ এক মায়াবী আলোকচ্ছটায় সিক্ত। অন্দরমহলের প্রশস্ত সিঁড়ি হতে শুরু করে হলরুমের সুবিশাল স্ফটিক ঝাড়বাতিগুলোর বিচ্ছুরণ পুরো পরিবেশকে এক রাজকীয় আভিজাত্য দান করেছে। ঝিলমিল করতে থাকা আলোকসজ্জার নিচে আমন্ত্রিত অতিথিদের কলরব এক উৎসবমুখর আবহ তৈরি করলেও সেখানে আভিজাত্যের গাম্ভীর্য বিন্দুমাত্র ম্লান হয়নি।
নির্ধারিত ড্রেস কোড অনুযায়ী তালহা, জায়ান, ফারিস এবং সাদ—প্রত্যেকেই কালো রঙের শার্প স্যুটে নিজেদের সজ্জিত করেছে। তালহা ব্যতীত বাকি সকলেই খাওয়াদাওয়ায় ব্যস্ত। তবে এই রাজকীয় আবহের মাঝেও সাদের চিত্তে বিষাদের ছায়া। শেষমেশ সাফওয়ানের মতো এক হাঁদারামের সাথে সুহিনের বিয়ে হবে?এটা যেন সে কোনোমতেই মানতে পারছে না।
এদিকে জাভিয়ানের চোখেমুখে এক বিশেষ তৃপ্তির আভা। অত্যন্ত সাবলীল ও মার্জিত ভঙ্গিতে সে অতিথিদের সাথে কুশল বিনিময় করছে। তবে তার প্রতীক্ষমাণ দৃষ্টি বারবার প্রবেশপথের দিকে নিবদ্ধ হচ্ছে। আজ সব গেস্টের মাঝেও,একজন বিশেষ ব্যক্তি আসবে। তিনি হলেন সাফওয়ানের বড় জেঠা।বহু বছর হতেই তিনি বিদেশে থাকেন। কিন্তু এবার একমাত্র ভাতিজার বিয়েতে দেশে না এসেও উপায় ছিল না। তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে হবে। খুব সম্ভবত বিয়ে অব্দি থাকতে পারবে,কিন্তু তারপরই আবার বিদেশে ফিরতে হবে। অন্যদিকে, জীবনের এই নতুন অধ্যায়ের সূচনায় সাফওয়ান নিজেও বেশ প্রফুল্ল এবং উত্তেজিত।
এরিমধ্যে জাভিয়ানের নির্দেশে সুহিনকে হলরুমে নিয়ে আসার তোড়জোড় শুরু হলো। সিঁড়ির উচ্চতায় যখন সুহিনের অবয়ব ফুটে উঠল, উপস্থিত সকলের দৃষ্টি তখন এক বিন্দুতে থমকে, কেবল তার দিকেই নিবদ্ধ হলো।
কালো রঙের এক সুবিশাল বার্বি গাউনে সুহিন যেন কোনো এক ধ্রুপদী সাম্রাজ্যের রাজকুমারী রূপে সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসছে। পায়ে চার ইঞ্চি উচ্চতার YSL এর কালো হিল।গাঢ় বাদামী চুলগুলো নিখুঁত কৌশলে উঁচুতে ফেন্সি খোঁপা করে বাঁধা। চোখে পরিচিত সেই চশমাটা আজ নেই, নেই কোনো বাহুল্য প্রসাধন—তবুও তার সহজাত স্নিগ্ধতা যেন পুরো হলরুমের আলোকচ্ছটাকেও হার মানালো।
এত মানুষের সপ্রশংস দৃষ্টির সামনে সুহিন কিছুটা আড়ষ্ট বোধ করলেও, তার নীলচে চোখজোড়া ভিড়ের মাঝে বারবার এক বিশেষ মানুষকে খুঁজে ফিরছিল। সবাই আছে কিন্তু কেকে কোথায়? তবে কি তাকে এই ঝামেলায় ফাঁসিয়ে দিয়ে কেটে পড়েছে?
এসকল চিন্তা ভাবনা করতে করতেই, সুহিন সাবধানে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এল। একজন বয়স্ক নারী মেড অত্যন্ত সংক্ষেপে এবং নিপুণভাবে তাকে আনুষ্ঠানিকতার বিবরণ দিল। অতঃপর সবার করতালি আর হর্ষধ্বনির মাঝে সাফওয়ান ও সুহিনের আংটি বদল সম্পন্ন হলো। লৌকিক এই আনুষ্ঠানিকতা শেষ হতে না হতেই সুহিন আবার তার সন্ধানী দৃষ্টি চারিদিকে সঞ্চালন করল।
অবশেষে কিচেন আর হলরুমের এক নিভৃত কোণে তার দেখা মিলল। চারপাশের এই আড়ম্বরকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কেকে অত্যন্ত নির্বিকার চিত্তে, উল্টো দিকে মুখ করে বসে তিরামিসু খাচ্ছে। তার এই নির্লিপ্ততা দেখে সুহিনের সমস্ত বিরক্তি আর ক্ষোভ যেন উপচে পড়ল। ইচ্ছে হলো সশব্দে কোনো গালমন্দ করতে। কালো রঙের পোশাকে তার থেকে বেশ খানিকটা দূরে উল্টো ঘুরে বসে থাকায়, সুহিন তাকে ঠিকমতো পর্যবেক্ষণ করতে পারল না। বরং তার আগেই বিড়বিড় করে বলে উঠল,
“অসভ্য, অভদ্র,অমানুষ একটা! এ কেমন পাগল লোক? আমাকে এসব ঝামেলায় ফাঁসিয়ে, তার খাওয়াদাওয়ার হিড়িক পড়েছে। রাক্ষস কোথাকার!”
রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে সুহিন সিঁড়ির পেছন দিয়ে অন্যদিকে প্রস্থান করতে পা বাড়াল। ঠিক তার কিছুক্ষণ বাদেই, হঠাৎ অশোভন ভঙ্গিতে শিস বাজানোর শব্দে সুহিন খানিকটা চমকে উঠল। পাশে ফিরতেই দেখল, সিঁড়ির কোণায় দেয়ালে হেলান দিয়ে বুকে হাত গুঁজে সহজাত সেই নির্বিকার ভঙ্গিতে কেকে দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে হঠাৎ, কেকে নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি ঠোঁটে ছোয়াল। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সবেমাত্র ভালোমতো খেয়েদেয়েই এসেছে।
যথারীতি সুহিন নিজের রগচটা ভাবটা বজায় রেখে,দুহাতে গাউনের দুপাশ উঁচিয়ে—হিলের দরুন ঠকঠক শব্দ করে, একপ্রকার তার দিকে তেড়ে এলো। এবং দাঁতে দাঁত পিষে আওড়াল,
“এবার বলুন, আর কি কি করতে হবে? আর কি তামাশা করা বাকি? দশ জায়গায় বিয়ে দেবেন আমার? অসহ্য হয়ে যাচ্ছি আমি। আর হ্যাঁ,অনেক করেছি। আমি আর এসব তামাশা করতে পারব না। আপনার কি করার আপনি করে নিয়েন। আমি আজই জাভিয়ান আঙ্কেলকে বলে এসব বিয়ে-শাদির ঝামেলা থেকে বিদেয় হবো। বলে দেবো আপনি আমায় জোর করে এসব…”
সুহিনের কথা শেষ হলো না। বরং তার আগেই কেকে তার হাত নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের কাছে টেনে নিল। অতঃপর অত্যন্ত দায়সারা ভাবে সুহিনের আঙুল হতে সাদা হীরের আংটিটা খুলে পাশেই ছুঁড়ে ফেলল।যা দেখে সুহিনের কথা অচিরেই থেমে গেল।
সে কেকের দিকে চেয়ে দেখল—সে সাইড টেবিলে থেকে একটা টিস্যু নিয়ে, নিস্পৃহে তার হাতটা মুছে দিতে লাগল। অতঃপর প্যান্টের পকেট থেকে তার পড়ানো সেই ব্ল্যাক ডায়মন্ডের রিংটা পরিয়ে দিয়ে, গুরুগম্ভীর স্বরে বলল,
“বলেছিলাম এনগেজমেন্টর সময় রিংটা খুলে রাখতে। তার মানে এই নয় যে, এটা আমি যেখানে-সেখানে ফেলে রেখে আসতে বলেছি।”
সুহিন এই পর্যায়ে শুষ্ক ঢোক গিলল। রিং-টা খুলে ড্রেসিং টেবিলের উপরই ফেলে এসেছিল। ঠিকমতো রাখার কথা তো একপ্রকার ভুলেই গিয়েছিল। আর একটু আগে কেকে যে আংটিটা ফেলে দিল,তা খানিকক্ষণ আগে সাফওয়ান নামক ঐ হাঁদারামটা পড়িয়ে দিয়েছে।
অজান্তেই ফুঁসে ওঠা রাগটা, কেকের এই গুরুগম্ভীর্যের মাঝেই ঢাকা পড়ে গেল। সুহিন কিছুটা ইতস্তত হয়ে আওড়াল,
“আমি এসব আর করতে পারব না।”
—“ইট’স ওকে।”
কেকের অভিব্যক্তিতে সুহিন মুখ তুলে তাকাল। উৎসুক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল। এতক্ষণ খেয়াল না করলেও, এবার কেকে’কে এতো কাছ থেকে বেশ ভালে মতো পরখ করে দেখতে লাগল। লোকটাকে আজ বেশ পরিপাটি দেখাচ্ছে। নিত্যদিনের সেই অগোছালো ভাবটা নেই।
গায়ের সেই কোরাল পারফিউম মাত্রাতিরিক্ত সুগন্ধিই তার মস্তিষ্কে অদ্ভুত এক বিচরণ ঘটাচ্ছে। অধরের নিচের সেই কালো তিল;সেটিও বেশ নজর কাড়ছে আজ। এছাড়া গায়ের সাদা শার্ট; কেকের জন্য বিষয়টা খানিক নতুনত্ব মনে হলো সুহিনের কাছে। শার্টের শুরুর তিনটে বোতাম খোলা। সেখানের আবার ঝুলে আছে গোল্ডেন-ব্ল্যাক সানগ্লাস আর তার ব্ল্যাক ম্যাটালের ‘KK’ অক্ষর খচিত লকেট—যা শুভ্র শার্টের আড়ালে আবছায়ায় কিছুটা ঢাকা পড়েছে।
কিন্তু সব ছাড়িয়ে তার উন্মুক্ত বুকে নজর পড়তেই সুহিন অকস্মাৎ কিঞ্চিৎ ঢোক গিলল। দ্রুত নিজের নজর সরিয়ে, মাথাটা সামান্য নুইয়ে ফেলল। তবে আবারও সেই কৌতূহলী নীল চোখদুটো কেকে’কে পরখ করতে মত্ত হলো। সাদা শার্টের উপর কালো কোট—এতে মোটেও তাকে জেন্টলম্যান মনে হচ্ছে না। এই জেন্টলম্যান হওয়ার বিষয়টা বোধহয় কেকের সাথে যায়না।
সুহিন ঠিকই ধরেছে। জেন্টাল আর গ্যাংস্টার,দুটো মিলিয়ে অদ্ভুত এক রূপে ধরা দিয়েছে সে। কাঁধ অব্দি ছুঁয়ে যাওয়া ওল্ফ কাটের চুলগুলোও, আজ জেল দিয়ে সেট করা। কপালের উপর হতে কিছু চুলের সরু ডগাও নেমে এসে ভ্রু ছুঁয়েছে।
এদিকে অনেকক্ষণ হতে সুহিনের এমন উসখুস অদ্ভুত ভাবভঙ্গি পরখ করে, কেকে ভ্রুকুটি করে বলল,
“এমন করছিস কেন? কি হলো তোর?”
সুহিন থতমত খেয়ে যায়। দ্রুত নিজেকে তটস্থ করে আওড়ায়,
“আ…কিছু না। বলছিলাম সত্যিই আর এসব ড্রামা করতে হবে না তো? আর জাভিয়ান আঙ্কেলকে তবে কি বলবো?”
—“তোকে কিছুই করতে হবে না। যা করার আমিই করবো। কিন্তু এখন আর যেন ঐ গাধাটার আশেপাশেও ঘেঁষতে না দেখি।”
কেকের গুরুগম্ভীর অভিব্যক্তিত্বেও, সুহিন উৎসুক স্বরে বলল,
“কোন গাধা?”
কেকে কিছুটা বিরক্তির সাথে বলে উঠল,
“দুই গাধাই।”
এই বলেই সে দৃঢ়পায়ে জায়গা প্রস্তান করল। সুহিন কেবল পেছন হতে চেয়ে চেয়ে, ভেংচি কেটে বলল,
“সবচেয়ে বড় গাধাটা তো আপনি!”
অনুষ্ঠানের এই পর্যায়ে অবশেষে সেই বিশেষ অতিথির আগমন হলো। আব্বাস মির্জা! পরনে সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা। আধাপাকা চুলদাড়ি গুলোও পরিপাটি করে গোছানো। চোখেমুখে বার্ধক্যের ছাপ পড়লেও, তা তার ব্যক্তি গম্ভীর্যের তেজে বোঝা মুশকিল। তাকে দেখে জাভিয়ান সহ পরিচিত মহলের সকলেই মোটামুটি খুশি হলো। কেবল সিঁড়ির কোণ হতে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করলছিল একজোড়া চোখ। দৃঢ় চোয়ালে, বুকে হাত গুঁজে সিঁড়ির অভিমুখের দেয়ালে ঠেস দিয়ে, সে কেবল এই আব্বাস মির্জাকেই পরখ করছিলো।
গুরুজন হওয়ায় সুহিন নিজে থেকেই তাকে বেশ আন্তরিকতা সাথে সালাম দিল। কিছুক্ষণ সাফওয়ান আর সুহিনের সাথে হেসে হেসে কথাবার্তা বলার পর, তাকে আপ্যায়নে ব্যস্ত হলো জাভিয়ান সহ বাকিরা। আব্বাসের আসতে দেরি হবে বিধায়, জাভিয়ান আগেভাগেই রিং পড়ানোর কাজটা সেড়ে ফেলেছে। তার ভয় ছিল কেবল কেকে’কে নিয়েছে।একটা শুভকাজটা হয়ে গিয়েছে,এতেই সে নিশ্চিন্ত। বাদবাকি কেকে কি করল না করল,সেসবে ধ্যান দেওয়ার নূন্যতম সময় তার নেই।
এরিমধ্যে সামান্য গানবাজনার আয়োজনে সাদ আর ফারিস একপ্রকার মেতে উঠতেই, তারা কেকে’কেও তাদের সাথে যোগ দেওয়ার জন্য বারবার ডাকতে লাগল। কেকে শুরুতে রাজি না থাকলেও, পরক্ষণেই কি যেন ভেবে রাজিও হয়ে গেল। সুহিন তখন হলরুমের একপ্রকার মাঝবরাবর দাঁড়িয়ে—কেবল তাকেই পরখ করছে। তার পাশে অবশ্য সাফওয়ানটাও না চাইতেও বারবার চলে আসছে।
এরিমধ্যে চারপাশের সব লাইট গুলো বুঁজে দিয়ে, কেবল হলরুমের বিম-লাইটটা অন করে দেওয়া হলো। কেকে নির্বিকার ভঙ্গিতে সিঁড়ির কাছ থেকে হলরুমের এককোণে এসে গা হতে ব্ল্যাক-কোটটা খুলে চেয়ারে মেলে দিল। ততক্ষণে বিম-লাইটের সব টুকু ফোকাস যেন কেবল তাদের দুজনের দিকেই পড়েছে।
কেকে শার্টে ঝুলিয়ে রাখা ব্ল্যাক-গোল্ডেন সানগ্লাসটা দক্ষ-বাম হাতের দরুন চোখে পড়ে নেয়। সাদা শার্টের হাতাটা দৃঢ় গম্ভীর্যের সহিত খানিকটা গুটিয়ে, কালো রঙের গিটারটা নিয়ে টুলে বসে পড়ল। অতঃপর নিজের সহজাত প্রফেশনাল ভঙ্গিতে, স্পষ্টত ভগ্নস্বরে গাইতে শুরু লাগল,
Naar e Ishq part 17
“If you like your coffee hot,
Let me be your coffee pot,
You call the shots, babe
I just wanna be yours____
Secrets I have held in my heart,
Are harder to hide than I thought,
Maybe I just wanna be yours
I wanna be yours, I wanna be yours
Wanna be yours Wanna be yours
Wanna be yours_______
