Naar e Ishq part 17
তুরঙ্গনা
রাতের নিস্তব্ধতা গ্রাস করেছে চারপাশ। ডিনারের পরবর্তী এই সময়টা সাধারণত অলসতার হয়, কিন্তু বাড়ির পেছনের নির্জন বাগানটিতে এখন এক অস্বস্তিকর গাম্ভীর্য বিরাজ করছে। টিমটিমে আলোয় কেবল দুটি অবয়ব দেখা যাচ্ছে—কেকে আর তালহা।
আশেপাশে কোনো জনমানবের চিহ্ন নেই।সব গার্ড-সার্ভেন্ট বাড়ির সামনের দিকে। কেবল দূর হতে ভেসে আসা ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক সেই নীরবতাকে মাঝেমধ্যে বিদ্ধ করছে।
কেকে লন-চেয়ারে পায়ের ওপর পা তুলে বসে আছে। তার আঙুলের খাঁজে জ্বলছে তার প্রিয় সিগনেচার ট্রেজারার লন্ডন ব্র্যান্ডের ব্ল্যাক এডিশনের সিগারেট। আগুনের লাল শিখাটা অন্ধকারের বুকে ধিকধিক করে জ্বলছে, আর কেকে নির্বিকার চিত্তে ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকিয়ে তা রাতের বাতাসে মিশিয়ে দিচ্ছে।
তার পাশে বসা তালহার মুখাবয়ব পাথরের মতো শক্ত। বন্ধুর এমন উদাসীনতা তার ভেতরকার উত্তেজনাকে আরও উসকে দিচ্ছে। তালহা কিছুটা সামনের দিকে ঝুঁকে এল, গলার স্বর যতটা সম্ভব নিচু রেখে বলল,
”কেকে! এসব কী শুরু করেছিস বল তো? সুহিন তোর বিয়ে করা বউ। দুদিন আগে যাকে কবুল বলে বিয়ে করলি, এখন সেই মেয়েটাকেই অন্য কারো সাথে বিয়ে দিতে চাচ্ছিস! এটা কেমন পাগলামি?”
তালহার কণ্ঠে বিস্ময় আর বিরক্তি মিলেমিশে একাকার। কিন্তু কেকের মধ্যে কোনো ভাবান্তর নেই। সে ধীরলয়ে সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়াটা ছাড়ল। তারপর অত্যন্ত নিস্পৃহভাবে প্রশ্ন ছুড়ল,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“তোর কী মনে হয়?”
বন্ধুর এমন দায়সারা জবাবে তালহার ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলে নিয়ে আবারও গুরুগম্ভীর স্বরে বলতে শুরু করল,
“শোন, তোকে একটা কথা পরিষ্কার জিজ্ঞেস করছি। এই সুহিনকে কি তুই আদৌ ভালোবাসিস? নাকি এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য আছে? যতটুকু জানি, সুহিন তোর আত্মীয় সম্পর্কের বোন টাইপ কিছু একটা হয়। কিন্তু হুট করে এই বিয়ের সিদ্ধান্তটা আমার হজম হচ্ছে না। তুই তো বরাবরই বিয়ে-শাদির ধার ধারতিস না। তাহলে হঠাৎ সুহিনকে…বিষয়টা মানতে পারছি না।
আর রোজি? ওর কী করবি? আমাদের গ্রুপের কেউ এখনো তোর এই বিয়ের খবর জানে না। সেক্ষেত্রে রোজি যদি জানতে পারে… একবার ভেবে দেখেছিস ওর কী হবে? জানি তুই ওর ব্যাপারে সিরিয়াস নোস, কিন্তু মেয়েটা তো তোকে প্রচন্ড ভালোবাসে!”
তালহার উৎকণ্ঠা যখন চরমে, কেকে তখন অদ্ভুত এক শান্ত দৃষ্টিতে তাকে দেখল। অন্ধকারেই নিজের কাঁধ ছুঁয়ে থাকা এলোমেলো ‘ওল্ফকাট’ চুলগুলো আঙুলের সাহায্যে একবার পেছনের দিকে ঠেলে দিল সে। তার এই নীরবতা যেন তালহার বিরক্তিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। কেকে কিছু বলছে না দেখে তালহা এবার ভ্রু-জোড়া কুঁচকে, কিছু একটা ভেবে নিয়ে রুক্ষ স্বরে বলে উঠল,
“তার মানে তুই সুহিনকেও ভালোবাসিস না?”
এবার কেকের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসিটা যতটা না আনন্দের, তার চেয়ে বেশি ক্রুর। জ্বলন্ত সিগারেট থেকে শেষবারের মতো ধোঁয়া ছেড়ে সে শান্ত অথচ ধারালো গলায় বলল,
”Love? No. It’s a toxic addiction. And unfortunately for her, I never quit my addictions.”
(ভালোবাসা? ওসব দুর্বল চিত্তের বিলাসিতা।আর এ তো এক বিষাক্ত মরণনেশা। তার দুর্ভাগ্য এই যে, আমি আমার শিকারে আসক্ত হলে তাকে মুক্তি দিতে শিখিনি।)
তালহা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। কেকের গলার স্বর এবার আরও গম্ভীর শোনাল। তালহা চোখ-মুখ খানিকটা কুঁচকে আওড়াল,
“সিরিয়াসলি ইয়ার?”
কেকে ক্ষীণ হাসে। মাথাটা খানিক ঝাঁকিয়ে, মেঘে ঢাকা আকাশের দিকে চেয়ে বলল,
‘Yeah,Love is a myth.Love is a fairytale. But she’s not a choice. She is my masterpiece, my lethal addiction.She belongs in my fu*king dark world, under my rules. So,don’t call it love.”
(ভালোবাসা একটা মিথ, নিছকই রূপকথা মাত্র। কিন্তু সুহিন…ও কোনো সাধারণ মোহ নয়। ও আমার তৈরি করা এক মাস্টারপিস, আমার এক মরণঘাতী আসক্তি। ও আমার এই অন্ধকার জগতেরই একটা অংশ, যেখানকার নিয়মগুলো শুধু আমিই তৈরি করেছি। সো, ডোন্ট কল ইট লাভ!)
কেকে হাতের সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে পিষে নিভিয়ে ফেলল। তারপর তালহার চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শীতল গলায় আবারও বলল,
“ভালোবাসা শব্দটা বড্ড সস্তা, ওসব না হয় মধ্যবিত্তদের জন্য তোলা থাক! আমার কাছে ও কেবলই এক আসক্তি। এক বিষাক্ত মরণঘাতী আসক্তি।আর দিনশেষে ভালোবাসা বলতে আমার কাছে পৃথিবীতে কিচ্ছু নেই, যা আছে তা হলো দখলদারিত্ব। ঐ যে বলে না? জোর যার,রাজত্ব তার! এক্ষেত্রেও বিষয়টা ঠিক তাই।…আর সুহিন? ও তো কেবলই আমার।”
তালহার চোখ-মুখ কুঁচকে যায় কেকের এহেন সব কথাবার্তায়। বিরক্তির সাথে আওড়ায়,
“এই সিগারেট কোম্পানি কি তোর সিগারেটের ভেতর আলাদা করে ড্রা*গ*স্ দেওয়া শুরু করেছে? এমন মাতালের মতো কথাবার্তা বলছিস কেনো?”
কেকে আর কথা বাড়ায় না। সামন্য বিদ্রুপাত্মক হেসেই স্থির হয়ে বসে থাকে।
তালহাও শেষপর্যন্ত আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারল না। কেকের অদ্ভুত জীবনদর্শন আর ঔদাসীন্য তাকে ক্ষুব্ধ করে তুলল। দু-চারটে কড়া কথা শুনাতে চেয়েও চুপ রইল।
আকাশের আবহাওয়া বেশ গুমোট; যেকোনো সময় বৃষ্টি নামার প্রবল সম্ভাবনা। তালহা যাওয়ার সময় কেকে-কে সাথে যেতে বললেও, কেকে তার জায়গায় জ্যান্তমূর্তির ন্যায় বসে রইল। অগত্যা তালহা একাই বাড়ির ভেতরের উদ্দেশ্যে পথ ধরল।
নিস্তব্ধ বাগানে কেকে একা আরও কিছুক্ষণ বসে ছিল। ভাবনার জগতে বিচ্ছেদ ঘটাল বৃষ্টির প্রথম কয়েকটা ফোঁটা। সরাসরি চোখের ওপর হিমশীতল জলকণা পড়তেই সে বিরক্তি নিয়ে চোখমুখ কুঁচকে ফেলল। অসময়ে প্রকৃতির এমন আদিখ্যেতা তার অসহ্য লাগে।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে উঠে দাঁড়াতে হলো।
বাড়ির সদর দরজায় পৌঁছাতেই কেকে দেখল একজন মেড অত্যন্ত অস্থির হয়ে পায়চারি করছে। তার অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ করে কেকে কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কোনো সমস্যা?”
মেয়েটি বেশ ইতস্তত হলো কেকের আগমনে। খানিকটা ভীত হয়ে জানাল যে,
‘সুহিন অনেকক্ষণ আগেই বাড়ি থেকে বেড়িয়েছে। কিন্তু রাত গভীর হলেও সে এখনো ফেরেনি।”
এই প্রথম কেকের নির্বিকার মুখে কিছুটা দুশ্চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। সে কর্কশ স্বরে জানতে চাইল,
“কোথায় গিয়েছে ও?”
উত্তরে মেয়েটি বলল,
“উনি প্রায়ই হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির ঐদিকের আশ্রমটায় যায়। আজও গিয়েছে,বলেছিল দ্রুতই ফিরে আসবে। কিন্তু এখনও তো…বাহিরের খুব একটা অবস্থাও ভালো না।”
কেকে বুঝে গেল মেয়ে’টি কি বোঝাতে চাচ্ছে। যথারীতি সুহিনের এমন কর্মকান্ডে সে বেশ বিরক্ত হয়ে মনে মনে আওড়াল,
”এ কেমন বাচ্চাদের মতো আচরণ!”
বিরক্তি আর ক্ষুব্ধতার সংমিশ্রণে সে আর কালক্ষেপণ করল না। নিজের ব্ল্যাক ফেরারি নিয়ে বাড়ি হতে বেরিয়ে পড়ল অন্ধকার রাস্তায়। কিছুটা পথ যেতেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। রাতের অন্ধকারে মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি চালানো তার মেজাজকে আরও বিগড়ে দিচ্ছে।
হঠাৎ করেই রাস্তার মাঝখানে তাকে ব্রেক কষতে হলো। একদল ছোট বাচ্চারা ফাঁকা রাস্তার মাঝখানে বৃষ্টিতে ভিজছে। সম্ভবত এরা আশ্রমের অনাথ শিশুই। কেকে হর্ন দিতে গিয়েও হঠাৎ থেমে গেল। ল্যাম্পপোস্টের ঝাপ্সা আলো ও গাড়ির হেডলাইটের তীব্র আলোয় বাচ্চাদের মাঝে একজন পূর্ণবয়স্ক মেয়েকে দেখা যাচ্ছে।
আকাশী নীল-সাদা রঙের কামিজ-প্লাজো পরা মেয়েটি বাচ্চাদের সাথে প্রবল উচ্ছ্বাসে ভিজছে। কেকে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। দৃশ্যটি অস্পষ্ট মনে হওয়ায় সে গাড়ির উইন্ডশিল্ড ওয়াইপার চালিয়ে সামনের কাঁচ পরিষ্কার করার চেষ্টা করল, কিন্তু বৃষ্টির তোড়ে কিছুই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত সে বিরক্ত হয়ে গাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। মুহূর্তেই সে ভিজে একাকার হলো প্রবল বৃষ্টির চোটে। গায়ের টিশার্ট হতে ঝাঁকড়া চুল,সবই ভিজে লেপ্টে গেল।
কিন্তু তার তো সেদিকে খেয়াল নেই। সে বাচ্চাদের মাঝে মিশে থাকা সেই রমণীর দিকে ভ্রুকুটি করে চেয়ে থাকতে থাকতেই, খানিকটা বিস্ময়ের সাথে আওড়ায়,
“সুহিন?”
বৃষ্টিতে ভিজে চুপসে যাওয়া কেকে অদ্ভুত এক ঘোরের মধ্যে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কোনোক্রমেই তার চোখের পলক পড়ছে না। ঠিক সেই সময় তার ফোনটি বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে না তাকিয়েই সে কলটা রিসিভ করলে,ওপাশ থেকে তালহার ত্যাক্ত কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“কী রে, তোকে বাড়িতে আসতে বললাম আর তুই এই বৃষ্টিতে কোথায় গেলি?”
—“….”
আশেপাশে ঝমঝমে বৃষ্টির আওয়াজ ব্যতীত,আর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে তালহা আশ্চর্য হয়ে আবারও বলল,
“হ্যালো, কেকে! শুনতে পাচ্ছিস?”
কেকে ঘোরের মধ্যে থেকেই শান্ত গলায় বলে উঠল,
“Huh? I’m BD from KK.”
এই বলেই সে ফোনটা কেটে দিল। গাড়িতে হেলান দিয়ে, হাতদুটো বুকে গুটিয়ে সুহিনকে দেখতে মত্ত হলো সে। পরক্ষণেই হঠাৎ ই তার চিরাচরিত অভ্যেসে,‘ওয়ান সাইড লাভ’ খ্যাত এক বিশেষ সুরের শিষ বাজিয়ে উঠল।
সেই শিসের শব্দে বাচ্চাগুলো চমকে প্রথমে কেকে’কে একঝলক দেখে নিয়ে, সুহিনের দিকে ফিরল। তারা ভীত স্বরে বলল,
“সুহিন আপি, তোমার বাড়ির লোক এসেছে। আমরা যাই, নয়তো মিস বকা দেবে।”
কথা শেষ করেই তারা দ্রুত আশ্রমের উদ্দেশ্য ছুটে দৌড়ে পালাল। অকস্মাৎ এমন কান্ডে সুহিন স্তম্ভিত হয়ে একা দাঁড়িয়ে রইল। একটু দূরেই আবছা আলোয় ভিজে জুবুথুবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেকে। মানুষটাকে চিনতে তার এক মুহূর্তও দেরি হলো না। সে শুকনো ঢোক গিলে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। রাত তো অনেক হয়েছে, কিন্তু তার হুঁশ তো হলো কেবল।
ভেজা চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করতে করতে সে দেখল,শিস বাজাতে বাজাতেই কেকে তার দিকে এগিয়ে আসছে। এবং অল্প কিছুক্ষণের মাঝেই সে তার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। এবং তৎক্ষনাৎ থামিয়ে দিল তার শিস বাজানো। কেকে স্থির দৃষ্টিতে সুহিনের পানে চেয়ে রইল।
সুহিনের চোখের কোণ লাল হয়ে আছে। কেকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সেটা পরখ করে ভাবল,
“ও কি কেঁদেছে? কিন্তু কেনো?”
তবে নিজের ভেতরের অস্থিরতা সে প্রকাশ পেতে দিল না। ক্ষণিকের স্বাভাবিক ভাবগাম্ভীর্য সম্পূর্ণ রূপে বদলে, চোখ-মুখ শক্ত করে অত্যন্ত রাশভারী গম্ভীর গলায় বলল,
”এতো রাতে এভাবে বৃষ্টিতে ভিজছিস কেন, গাধা!”
সুহিন হকচকিয়ে গেলো। খেয়াল করে দেখল সে তো একা নয় বরং কেকে’ও ভিজে জুবুথুবু হয়েছে। কিছুটা সময় নিয়ে ইতস্তত স্বরে বলল,
“আ…আপনিও তো ভিজছেন।”
সুহিনের কন্ঠস্বর বেশ ভাঙা শোনালো। স্পষ্টত মনে হচ্ছে, ও কেঁদেছে। কিন্তু এ বিষয়ে নূন্যতম কিছু জিজ্ঞেস না করেই, সে সুহিনের হাতটা শক্ত করে ধরে নিয়ে বলল,
“আমার সাথে তর্ক করিস না, হানি। এভাবে ভিজলে ঠান্ডা লেগে যাবে।”
—“তাতে আপনার কি?”,সুহিনের কন্ঠস্বর বেশ জোরালো মনে হলো। কেকে ভ্রু-জোড়া সামান্য কুঁচকে নির্বিকারে বলল,
“আমার কিছুই না। কিন্তু আগামীকাল এনগেজমেন্টের আগে তোর কারণে কোনো ব্যাঘাত ঘটলে, তোর জন্য আমার চেয়ে খারাপও আর কেউ হবে না। এখন বাধ্য মেয়ের মতো চুপচাপ গাড়িতে ওঠ,বাড়ি ফিরতে হবে।”
সুহিনের অজান্তেই খানিক কান্না পেলো। এই পৃথিবীতে সবাই শুধু তাকে নিজের স্বার্থেই ব্যবহার করতে চায়। সে-ও জানে, কেকে হয়তো কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই এসব করবে। এছাড়া আর কি-ই বা হতে পারে! অমানুষ একটা!
তার এরূপ ভাবনাচিন্তার মাঝেই, কেকে তার হাত ধরেই গাড়ির কাছে নিয়ে এলো। সুহিনকে গাড়িতে বসিয়ে দিয়ে,নিজেও ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ল। ভেজা কাপড়ের চোটে মূহুর্তে গাড়ির ভেতরটাও ভিজে উঠল।
কেকে তার কার স্টার্ট দিতে গিয়ে, হঠাৎ সুহিনের দিকে নজর পড়তেই থেমে গেল। সুহিন তার দিকে অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। এবং-কি সে তার দিকে তাকানোর পরও, সুহিন নিজের স্থির নজরটুকু সরানোর প্রয়োজন মনে করল না। উল্টো কেকে’কে কিছুক্ষণ একনজরে পরখ করতে লাগল।বাম গালের তিলক হতে চিবুকে কিংবা অধরের কোণের তিল, তীক্ষ্ণ অক্ষিযুগলের দৃঢ় চাহুনি কিংবা ঠোঁটজোড়া পরখের পর, আনমনেই বলে উঠল,
“আপনাকে দেখতে না, খানিকটা লরেঞ্জোর মতো লাগে।”
কেকে’র ভ্রু-জোড়া নিমিষেই কুঁচকে যায়। ঘাড়টা খানিক এগিয়ে ভ্রুকুটি করে আওড়ায়,
“হাহ?লরেঞ্জো-টা কে?”
—“লরেঞ্জো জুরজুলো, ইতালিয়ান এ্যক্টর। বেবি সিরিজ দেখলে চিনতে পারেন হয়তো।”
কেকে ভ্রু দুটো কুঁচকে, সুহিনের কথামতো দুদণ্ড ভাবতেই বুঝে যায় সে কার কথা বলতে চাচ্ছে। ইতালিতে অনেকগুলো বছর থাকার সুবাদে, এই ইন্ডাস্ট্রির মোটামুটি অনেককেই তার চেনা। কোনো এক ইভেন্টে দেখাও হয়েছিল বোধহয়।
কেকে স্টিয়ারিং এ হাতটা শক্ত করে চেপে, অকস্মাৎ ভাবগম্ভীর্য রুক্ষ করে তীক্ষ্ণ স্বরে বলল,
“ডু ইউ লাইক হিম?”
সুহিন কেকের গম্ভীর্যপূ্র্ণ চেহেরাটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই ক্ষীণ হাসল। তার এহেন হাসিতে কেকের চোখজোড়া আরো খানিকটা সরু হলো। কিছুট সময় অতিক্রম হবার পর, সুহিন মাথাটা নেড়ে আওড়াল,
“উঁহু! আমার পছন্দ-অপছন্দে আর কি-বা এসে যায়?”
এই বলেই সে মুখটা ফিরিয়ে নিল। কেকে তার ভাবভঙ্গিতে খানিক ভিন্ন কিছু লক্ষ করে বলল,
“তোর কি কিছু হয়েছে? এমন উল্টোপাল্টা বিহেভ করছিস কেনো?”
সুহিন কেকে’র দিকে ফিরে তাকাল। এবার না হাসল আর না কিছু বলল। বরং সিটে ভেজা গা-টা এলিয়ে দিয়ে, সম্পূর্ণ ভগ্নস্বরে বলে উঠল,
“আমার আর ভালো লাগে না। বাবা আর মাম্মামের কাছে যেতে ইচ্ছে করে।”
এই বলতে না বলতেই তার চোখজোড়া হতে দু’ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল। কেকে নিজের ভাবগম্ভীর্য শিথিল করতেই, সুহিন আবারও কাঁপা কাঁপা কন্ঠস্বরে বলল,
“তখন সন্ধ্যায় বারান্দার কোণে, একা একা বসেছিলাম। হুট করেই দেখলাম, অন্ধকার থেকে মাম্মাম এলো। সে আমায় নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু যখনই হাত বাড়াই তখনই কোথায় যেন মিশে হারিয়ে যায়।”
এই বলেই সুহিন মুখটা ফিরিয়ে নিল। কেকে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। খুব বেশি আশ্চর্য না হলেও, এমন কিছু সে আশাও করেনি। সুহিনের মানসিক অবস্থা খুব বেশি ঠিক মনে হলো না তার।
যদিও সে এইটুকু তো আগে থেকেই জানে, সুহিনের বাকিদের মতো না। জন্মগত ভাবেই সে আর সকল বাচ্চাদের চেয়ে বেশ দূর্বল হয়েই জন্মেছে। সুহিন হওয়ার পর বেশ কয়েকটা মাস তাকে বিশেষ পর্যবেক্ষণের সাথে রেস্টে রাখা হয়েছিল। আবার কিছুটা বড় হওয়ার পর উপলব্ধি করেছে,সে যথেষ্ট ভীতু ও বোকা স্বভাবের। অবশ্য এই কারণে ছোট-বেলার পুরোটাই কেটেছে মায়ের আঁচলের নিচে। আর যখন সঠিক বোধবুদ্ধি হওয়ায় সময় এলো, তখন বাবা-মা দুজনেই হারিয়ে গেলো। এরপরও জীবনটা মোটেও স্বাভাবিক রইল না। ছোট হতে বড় একটার পর একটা নানান ঝড় এসেছে জীবনে। আর সবটা মিলিয়েই সে আজকের সুহিন।
Naar e Ishq part 16
কেকে আড়ালে কিঞ্চিৎ ভারী শ্বাস ফেলে, গাড়ি স্টার্ট দেয়। সুহিনকে আড়চোখে একপলক দেখে নিয়ে, চোখ-মুখ শক্ত করে প্রচন্ড দৃঢ়তা ও অদ্ভুত এক ক্ষুব্ধতার সাথে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়।ফেরার পথে একবার অবশ্য মনে মনে বেশ জোর গলায় আওড়ায়,
“আমার সাথে যা হওয়ার হয়েছে; তোর জীবনটা বৃথা যেতে দেবো না আমি। ঐ জানোয়ারগুলো যদি আর দুদিন এই দুনিয়ায় স্থায়ী হয়—অন্তত কাশিফ কাহসান নামক এই জানোয়ারটার অস্তিত্ব পৃথিবীতে থাকবে না।”
