Naar e Ishq part 20
তুরঙ্গনা
—“কে তুমি?”
—“ব্ল্যাড ওল্ফ!”
মুহূর্তের ব্যবধানে চারপাশের হাই-ভোল্টেজ আলোগুলো একসাথে জ্বলে উঠল। আকস্মিক তীব্র আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায় সেখানে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকা চার ব্যক্তির। চোখের পলক স্বাভাবিক হতেই তাদের সামনে দৃশ্যমান হলো পাঁচটি অবয়ব, যারা হিং”স্র রুদ্র মূর্তির ন্যায় স্থির দাঁড়িয়ে আছে।
মাঝখানে দাঁড়িয়ে স্বয়ং কেকে, ওরফে ব্ল্যাড ওল্ফ। তার এই ব্যাড ওল্ফ নামের পেছনেও কিঞ্চিৎ রহস্য আছে। ইতালিতে সে যে কেবল একজন প্রফেশনাল ফেরারি রেসার, অ্যাডজাঙ্ক্ট সোশিওলজির প্রফেসর, ব্ল্যাকভেইনের লিডার কিংবা রকস্টার হিসেবেই নিজের পরিচিতি গড়েছে বিষয়টা ঠিক তেমনটা নয়।
স্বাভাবিক ভাবেই একটা মানুষকে এতোকিছুতে নিজেকে উপস্থাপন করার জন্য, কিছু বিশেষ কৌশলেরও অবলম্বন করতে হয়। সেটা কখনো ভালো হতে পারে আবার কখনো খা*রাপ। যার কারণে তার একটি সুক্ষ্ম যোগাযোগ রয়েছে ইতালির সিসিলি সহ আন্ডারগ্রাউন্ডের বড় বড় কিছু গ্যাংস্টার-মাফিয়াদের সাথে। এক্ষেত্রে সে এসব দলের সাথে সরাসরি যুক্ত না রইলেও, তাদের সাথে কেকে’র বেশ খাতির রয়েছে। যেখানে তাকে কমবেশি সকলেই ব্যাড ওল্ফ হিসেবেই চিনে থাকে।এছাড়া আন্ডারগ্রাউন্ড ব্যতীতও রেসিং ওয়ার্ল্ডেও তাকে ফেরারি কিং এর পাশাপাশি ব্যাড ওল্ফও ডাকা হয়।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
আর তার এই সবগুলো প্রফেশনাল যেহেতু সেশন ভিত্তিক অর্থাৎ সারাবছর এক লাগাতারের সবগুলো প্রফেশনের সাথে যুক্ত থাকতে হয় না—সেক্ষেত্রে একক ব্যক্তি হিসেবে সবকিছু একাই সামলাতেও তার খুব একটা অসুবিধাও হয়না। এমনিতেও কেকে তার সুবিধা ব্যতীত কোনোকিছু অন্যের জোরে কখনোই করেনা।
আর এভাবেই ইতালির ব্ল্যাড ওল্ফ হতে সে আজকের সাধারণ কেকে’র খোলসটা পাল্টে নিজস্ব সত্তায় ফিরেছে। পরনে আজ কালো হুডি-প্যান্ট। কাঁধ অবধি ছুঁয়ে যাওয়া তার সিগনেচার ‘ওল্ফ কাট’ চুলগুলো আজ বড্ড অবিন্যস্ত।যা তাকে আরও রহস্যময় আর ভ*য়ঙ্কর করে তুলছে।
কেকে’র দুই পাশে অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে তার চার সঙ্গী— তালহা, সাদ, জায়ান আর ফারিস। প্রত্যেকের হাতে হকি স্টিক,রড থেকে শুরু করে কিছু ধারালো সব অ”স্ত্র।
তাদের শীতল চাহনি আর পেশিবহুল শরীরের ভঙ্গি দেখে সিলিং থেকে ঝুলে থাকা চারজনের কলিজা যেন শুকিয়ে এল।পাঞ্জাবি পরা সেই লোকটা ভীতু গলায় অস্ফুটস্বরে বলে উঠল,
“তোমরা!”
কেকে উত্তর দিল না, শুধু ঠোঁটের কোণে একটা ক্ষীণ, তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। বিস্তৃত এলোমেলো চুল ঢেকে রাখা সেই হুডির টুপিটা পেছনের দিকে ঢেলে দিল। ধীর পায়ে গিয়ে পাশে রাখা একটা কাঠের চেয়ারে পায়ের ওপর পা তুলে বসল। পকেট থেকে ট্রেজারারের ব্ল্যাক সিগারেট বের করে ঠোঁটে চেপে ধরল। লাইটারের শিখায় তামাক পুড়িয়ে এক গাল ধোঁয়া ছেড়ে, কালো মেটালের লাইটারটা বাম হাতের আঙুলের ডগায় নিয়ে খেলতে খেলতে শান্ত স্বরে আওড়াল,
”জ্বী, চাচাজান!”
তার এই নির্ভার বি’ষাক্ত সম্ভাষণে জায়ান আর সাদ কিঞ্চিৎ ফিঁচকে হাসল। অন্যদিকে, সিলিং থেকে ঝুলতে থাকা আব্বাস মির্জা, আরশাদ মির্জা, আরিজ খন্দকার আর জাভিয়ান হায়দারের হাড়গোড় অবধি হিমশীতল শিহরণে স্তম্ভিত হয়ে গেল। তারা কল্পনাও করতে পারেনি, কয়েক ঘণ্টা আগের রাজকীয় পরিবেশ থেকে তারা এই নরককুণ্ডে এসে পৌঁছাবে।
অনুষ্ঠান শেষ করে যখন আব্বাস মির্জা আর আরশাদ মির্জা এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিল, তখন সবকিছু স্বাভাবিকই মনে হচ্ছিল। জাভিয়ান হায়দারও একই গাড়িতে ছিল। রাতের ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি ছুটছিল দ্রুতগতিতে। ড্রাইভারের আসনে ছদ্মবেশে থাকা জায়ান তখন অত্যন্ত সুকৌশলে গাড়ির এসি ভেন্ট দিয়ে এক বিশেষ ধরনের অবশকারী গ্যাস ছেড়ে দেয়।
রাস্তা যে মূল পথ ছেড়ে নির্জন গলির দিকে মোড় নিয়েছে, তা বোঝার মতো মানসিক অবস্থায় তারা তখন ছিলেন না। ড্যাশবোর্ডের নিচ থেকে দ্রুত মাস্ক পরে, নির্দিষ্ট স্থানে গাড়ি থামিয়ে নেমে আসে জায়ান। আর ততক্ষণে গাড়ির পেছনের সিটে থাকা তিনজন অর্ধচেতন হয়ে এলিয়ে পড়েছে।
এরপর লোক লাগিয়ে তাদের টেনেহিঁচড়ে আনা হয় এই পরিত্যক্ত গোডাউনে। কেকে তখনো সেখানে পৌঁছায়নি। সেই সুযোগে সাদ আর জায়ান নিজেদের ক্ষোভ মেটাতে অর্ধচেতন অবস্থাতেই চারজনকে ইচ্ছেমতো ধোলাই দিয়ে দেয়। কেকে যদিও তাদের এমন কোনো নির্দেশ দেয়নি, তবুও তারা নিজেদের সামলাতে পারেনি। কারণ তারা জানে, কিছুক্ষণ পর কেকে যখন নিজের স্বরূপে ফিরবে, তখন এই চারজনের ওপর যা হতে চলেছে তা সহ্য করার ক্ষমতা হয়তো তাদেরও নেই।
গোডাউনের ভ্যাপসা গুমোট বাতাসে এখন কেবল সিগারেটের ধোঁয়া আর আসন্ন মৃত্যু-আতঙ্কের অন্ধকার খেলার আভাস বিরাজ করছে।
জাভিয়ান হয়তো শুরুতেই কিছুটা আন্দাজ করেছিল। যে কারণেই সে বারবার জানতে চেয়েছিল, অন্ধকারে মিশে থাকা আগুন্তকঃ আদতে কেকে কিনা। আর তার এই গূঢ় সন্দেহটাই যেন সত্যি হলো। একইসাথে বাকিদের চেয়ে তার মনে চাপা ভয়-সংশয়টাও যেন অত্যন্ত বেশি।
জাভিয়ান কাঁপা কাঁপা স্বরে আওড়াল,
“কেকে! এসবের মানে কি? কেনো করছো এসব?”
কেকে কোনো জবাব দেয়না। ক্ষীণ হেসে কাঁধ বাঁকিয়ে কেবল তাদের দেখতে থাকে। কিন্তু আব্বাস মির্জা রীতিমতো মতো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সে চিৎকার করে ওঠে,
“এই ছেলে! পাগল হয়ে গেছো? মাথায় আছে তুমি কি করছো? এর পরিণতি ঠিক কি হতে পারে? সময় থাকতেই ছেড়ে দাও আমাদের।”
কেকে ক্ষীণ হাসল। ভাবগম্ভীর্য একই রেখে বলল,
“ছেড়ে দেওয়ার জন্য তো এতো আয়োজন করিনি, আঙ্কেল!”
সে আব্বাস মির্জা হতে নজর সরিয়ে, পেছনের দিকের আরিজ খন্দকারের দিকে ফিরে তাকাল।
—“আরিজ খন্দকার! কি বলছে ওরা? ছেড়ে দেবো?”
কেকের এমন ব্যাঙ্গাত্বক অভিব্যক্তিতে আরিজ আরেকটু ঘাবড়াল। এটাই সেই ব্যক্তি যাকে রাফায় আমিন আর শাহমীর কাহসানের কেস ফাইলে সিআইডি অফিসার ফাওয়াদ সবার আগে উল্লেখ্য করেছিল। অনেক কষ্টে খোঁজ চালানোর পর, গত রাতে তাকে দেশের বর্ডার এলাকা হতে ধরে আনা হয়েছে। এতোদিন ছদ্মবেশে গা ঢাকা দিয়ে, দেশেই জনসাধারণের মাঝেই লুকিয়ে ছিল। আর পরিবার সহ বাকিদের কাছে সে ছিল মৃত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার রক্ষাও হয়নি।
কেকে’র সিগারেটটা ফুরিয়ে আসতেই, বাদবাকি অবশিষ্টাংশ নিচে ফেলে দিয়ে পায়ে পিষে ফেলল। অতঃপর আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে, ঝুলন্ত সেই চারজনের উদ্দেশ্যে বলল,
“ঝুলে থাকতে কষ্ট হচ্ছে? তাহলে ছেড়ে দিতে পারি, কিন্তু একটা শর্ত আছে।”
আরশাদ মির্জা কাঁপা স্বরে আওড়ায়,
“কি…কি শর্ত?”
চারজনের প্রত্যেকের অবস্থাই বেশ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। কেউই ঠিকভাবে কথাটুকুও বলতে পারছে না। হাড়-মাংস যেন ছিঁড়ে পড়ার উপক্রম।
এরিমধ্যে কেকে নির্বিকার স্বরে বলে উঠল,
“তবে একটা গল্প শোনাতে হবে। যে ঠিকঠাক মতো পুরো গল্পটা শোনাতে পারবে, তাকেই সবার আগে ছেড়ে দেবো।”
হঠাৎ গল্পের প্রসঙ্গ এলেই, জাভিয়ান বলে উঠল,
“কিসের গল্প? কোন গল্প?”
কেকে জাভিয়ানের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, কিছুক্ষণ পরখ করল। জাভিয়ানের ব্যাকুলতায় শুরুতে তির্যক হাসলেও, পরক্ষণেই চোখমুখ শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিষে আওড়াল,
“শাহমীর কাহসান আর রাফায় আমিনের গল্প। তাদের শেষটা কিভাবে হয়েছিল, সেটাই জানতে চাই।”
এই পর্যায়ে মোটামুটি সকলেরই চোখমুখ কিছুটা শুকিয়ে এলো। জাভিয়ান নিজেকে স্বাভাবিক রেখেই বলল,
“তারা দুজন তো এক্সিডেন্টে…এক্সিডেন্টে মারা গিয়েছিল।”
—“ওহ রিয়েলি? জানা ছিল না।”
কেকে পুনরায় বিদ্রুপাত্মক হাসল। ঘাড়টা কিঞ্চিৎ কাত করে, গুরুগম্ভীর স্বরে আবারও বলল,
“আর আরশিয়া মেহের! সে কিভাবে মারা গিয়েছিল?”
জাভিয়ান এই পর্যায়ে কিছুটা জোর গলায় বলে উঠল,
“মজা করছো তুমি? আরশিয়া সুইসাইড করেছিল। এটা তুমি নিজেও জানো,কেকে!”
কেকে দু-দণ্ড স্থির হয়ে রইল। তার চোখের মণি দুটো কুঁচকে ছোট হয়ে এল, চোয়ালের হাড়গুলো শক্ত হয়ে প্রকট হয়ে উঠল। সে অদ্ভুত এক নিস্পৃহতায় আবারও প্রশ্ন করল—
”কেনো সুইসাইড করেছিল?”
—“কারণ সে… সে…”
—“হ্যাঁ, কারণ…?”
জাভিয়ান তোতলাতে শুরু করল। তার জিহ্বা যেন তালুর সাথে আটকে গেছে। বলার মতো কোনো শব্দই সে আর খুঁজে পেল না। জাভিয়ানের থতমত খেয়ে যাওয়া দেখে আব্বাস মির্জা আর বাকি দুজনও চরমভাবে ঘাবড়ে গেলেন। তাদের কপালে এখন বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে।
কেকে আবারও সেই ম্লান হাসি হাসল। সে আয়েশ করে ঘাড়টা চেয়ারের পেছনের শক্ত কাঠের সাথে ঠেকাল। ওপরের ঝুলে থাকা টিমটিমে আলোর দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলে উঠল—
”গল্পটা এবার আমি বলি?”
সে আর সময় নষ্ট করল না। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সিগারেটে শেষ টান দিয়ে ধোঁয়াটা ধীরে ধীরে বাতাসে মিলিয়ে দিল। এরপর এই বীভৎস নিস্তব্ধতা ভেঙে, বহু বছর ধরে আড়ালে থাকা সেই অন্ধকার অতীত ধিকিধিকি আগুনের মতো পুরো ঘটনাটা একদম শুরু থেকে পুনরাবৃত্তি করতে শুরু করল।
______ফ্ল্যাশব্যাক
আজ থেকে ঠিক বারো বছর আগের কথা। শাহমীর কাহসান আর রাফায় আমিনের মধ্যে সখ্যতা এতটাই গভীর ছিল যে, জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত তারা একে অপরের পরামর্শ ছাড়া নিতেন না। কিন্তু এই গভীর ভরসাই যেন একসময় তাদের জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ায়।
শাহমীর কাহসানের চাচাতো ভাই হয়েও জাভিয়ান হায়দার কোনোদিন সেই গুরুত্ব পায়নি, যা শাহমীর দিতেন রাফায় আমিনকে। জাভিয়ানকে সরিয়ে রাফায়কে ব্যবসায়িক অংশীদার করার সিদ্ধান্তটি জাভিয়ানের মনে এক তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিহিংসার জন্ম দেয়।
এই আগুনেই ঘি ঢালে তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা আব্বাস মির্জা। একবার এক ব্যবসায়িক প্রজেক্টে শাহমীরকে বিশেষ একটি প্রস্তাব দিয়েছিল আব্বাস মির্জা, যা শাহমীর তৎক্ষণাৎ নাকচ করে দেন। কারণ, রাফায় আমিনের দূরদর্শী চিন্তায় সেই প্রস্তাবটি ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। ফলে শাহমীরের পাশাপাশি রাফায় আমিনের ওপরও আব্বাস মির্জার এক চাপা আক্রোশ তৈরি হয়।
এই ষড়যন্ত্রের বৃত্তে তৃতীয় মাথা হিসেবে যুক্ত হন কাহসান ইন্ডাস্ট্রির ফাইন্যান্স কনসালটেন্ট আরিজ খন্দকার। রাফায় আমিনের আগমনে নিজের গুরুত্ব ও প্রভাব কমতে দেখে সে-ও আড়ালে এক বিশেষ সুযোগের সন্ধানে ছিল।
শেষ পর্যন্ত জাভিয়ান হায়দার, আব্বাস মির্জা এবং আরিজ খন্দকার—এই তিন কুচক্রী এক বিন্দুতে মিলিত হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট: শাহমীর আর রাফায় আমিনকে চিরতরে সরিয়ে দিয়ে আমিন ও কাহসানদের বিপুল সহায়-সম্পদ ভোগ করা। শাহমীরের একমাত্র পুত্র কাশিফ কাহসান ওরফে কেকে তখন দু-চারটে মেয়ে সঙ্গ,উগ্র-বেপোরোয়া ব্যক্তিত্ব আর মা*রাত্মক নে*শাদ্রব্য মিলিয়ে চরম উশৃঙ্খল জীবনে মত্ত, তাই তাকে নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা ছিল না। ভেবেই বসল, এই ছেলেকে দিয়ে ভবিষ্যতেও কোনো ঝামেলা হওয়ার সুযোগ নেই।এদিকে আব্বাস মির্জার ছোট ভাই আরশাদ মির্জাও নেপথ্যে থেকে তাদের পূর্ণ সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছিল।
এবং শেষ অব্দি সেই অভিশপ্ত দিনটির আগমন হলো। রাফায় আমিনের একমাত্র কন্যা সুহিনের সপ্তম জন্মদিন। মেয়ের জন্মদিনে অংশ নিতে রাফায় ও শাহমীর নির্ধারিত সময়ের দুদিন আগেই বিদেশ থেকে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। সেদিন রাতে সুহিন তার বাবার প্রিয় মুখটি দেখার অপেক্ষায় মায়ের সাথে নিজেদের ছোট্ট বাড়িতে প্রহর গুনছিল। কিন্তু তাদের সেই অপেক্ষা আর শেষ হয়না।
এদিকে বাড়ি হতে যে গাড়িটির শাহমীর আর রাফায় আমিনকে নিতে এয়ারপোর্টে যাওয়ার কথা ছিল—সেই গাড়ির সিস্টেমেই আরিজ খন্দকার পরিকল্পনা মোতাবেক নিজের লোক দিয়ে সুক্ষ্ম কারচুপি করে দেয়। তার নিজস্ব বিশ্বস্ত এক মেকানিককে দিয়ে অত্যন্ত নিপুণভাবে শাহমীর কাহসানের ব্যক্তিগত গাড়ির ব্রেক ফ্লুইড লাইনে একটি সূক্ষ্ম ছিদ্র এবং ইঞ্জিনের কুলিং সিস্টেমে এমন এক গোলযোগ পাকিয়ে রাখা হয়েছিল, যা গাড়ি চলার কিছুক্ষণ পর সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাদের পরিকল্পনা ছিল, এয়ারপোর্ট থেকে ফেরার পথে হাইওয়েতে যখন গাড়ি পূর্ণ গতিতে থাকবে, তখনই যেন ব্রেক অকেজো হয়ে পড়ে। যদিও গাড়ির সাথে পাঠানো ড্রাইভার এসব বিষয়ে কিছুই জানতো না।
সেদিন রাতে শাহমীর কাহসান ও রাফায় আমিন যখন টার্মিনাল থেকে বের হলেন, তখন তাদের চোখে ছিল দীর্ঘ সফর শেষে ঘরে ফেরার প্রশান্তি। ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে প্রস্তুত থাকলেও, শাহমীর হুট করেই এক অদ্ভুত খেয়ালে ড্রাইভারকে ছুটি দিয়ে দিলেন। হয়তো প্রিয় বন্ধুর সাথে একান্তে কিছু ব্যবসায়িক আলাপ বা পারিবারিক গল্প করতে করতেই ফিরতে চেয়েছিলেন তিনি। ড্রাইভারটি জানত না, শাহমীরের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তই তাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল। শাহমীর নিজেই স্টিয়ারিং ধরলেন, আর পাশে বসলেন রাফায় আমিন।
শহর ছাড়িয়ে গাড়ি যখন নির্জন হাইওয়েতে পড়ল, তখনই বিপত্তির শুরু। ইঞ্জিন থেকে এক ধরণের অস্বাভাবিক আওয়াজ ভেসে আসছিল, যা শাহমীর প্রথমে গুরুত্ব দেননি। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর তিনি লক্ষ্য করলেন, ব্রেক প্যাডেলটি অস্বাভাবিক রকমের শিথিল হয়ে গেছে। বারবার পাম্প করেও গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছিল না। ঠিক সেই মুহূর্তে তারা এক দুর্গম পাহাড়ি ঢাল আর খাদের পাশের রাস্তা অতিক্রম করছিলেন।
রাতের নিস্তব্ধতা চিরে হঠাৎ সামনে থেকে ধেয়ে আসে এক দানবীয় ট্রাক। যে ট্রাকটির আগমনও ছিল সেই কুখ্যাত পরিকল্পনারই অংশ। শাহমীর মরিয়া হয়ে গাড়িটিকে বামে কাটানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু ব্রেক পুরোপুরি অকেজো হয়ে যাওয়ায় এবং ইঞ্জিনের যান্ত্রিক বিকলতায় স্টিয়ারিং যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে যায়। একদিকে ধেয়ে আসা ট্রাকের তীব্র হেডলাইটের আলো, আর অন্যদিকে গভীর খাদ—মাঝখানে অসহায় দুই বন্ধু। ট্রাকটি প্রচণ্ড শক্তিতে তাদের গাড়ির সামনের অংশে আঘাত হানে এবং সেই ধাক্কায় গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শূন্যে ভেসে এক ঝটকায় গভীর খাদে আছড়ে পড়ে।
মূহুর্তেই সব নিস্তব্ধ হয়ে যায়। সেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে খাদের নিচে পড়ে থাকা দুমড়েমুচড়ে যাওয়া গাড়িটি থেকে তখন কেবল আগুনের ধোঁয়া বের হতে থাকে। আরিজ খন্দকারের সেই সূক্ষ্ম কারচুপি আর আব্বাস মির্জার পাঠানো সেই ঘাতক ট্রাক মিলে ঘটনাটিকে একটি সাধারণ সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে অতীতের পাতায় তুলে দেয়। আর এই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে যায়, দুটি সাজানো সংসার আর এক নিষ্পাপ শিশুর শৈশব।
এদিকে সেই অভিশপ্ত রাতে সুহিনদের বাড়িতে তখন উৎসবের আমেজ। বসার ঘরে জন্মদিনের কেক আর সুগন্ধি মোমবাতির ভিড়ে সুহিন বারবার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল—এই বুঝি তার বাবা আর শাহমীর আঙ্কেল ফিরে আসবেন। কিন্তু হুট করেই মাঝরাতে যখন খবর এলো—তারা বাবা আর নেই; মুহূর্তেই এই খবর সুহিন আর মেহেরকে জ্যান্ত মূর্তি বানিয়ে দিল। শোকের এমন তীব্রতা ছিল যে, কান্নার শব্দটুকুও যেন তাদের গলা দিয়ে বেরোচ্ছিল না; তারা কেবল পাথরের মতো নিথর হয়ে বসে রইল।
অন্যদিকে, কাহসান কুঞ্জের চিত্রটা ছিল ভিন্ন। চিরকাল নিয়মভাঙা আর উশৃঙ্খলতায় মত্ত শাহমীর পুত্র কাশিফ কাহসান ওরফে কেকে তখন তার নিজের জগতেই বিভোর ছিল। কিন্তু বাবার অকাল মৃত্যুর সংবাদটি যখন তার কানে পৌঁছাল, তখন সে পুরোপুরি স্তম্ভিত। এক মূহুর্তের জন্য তার সমস্ত দম্ভ, জেদ আর উগ্রতা স্তব্ধ হয়ে গেল। যে মানুষটিকে সে বিশেষ এক কারণে সারাজীবন অবজ্ঞা করে এসেছে—তার শূন্যতা যে এতোটা প্রলয়ংকারী হতে পারে, তা সে সেদিনই প্রথম অনুভব করল।
কিন্তু এই শোকের আড়ালে অত্যন্ত সুচারুভাবে কাজ করে যাচ্ছিল ষড়যন্ত্রকারীরা। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল পুলিশ কর্মকর্তা রাদিফ হান্নানকে। সে ছিল জাভিয়ান ও আব্বাস মির্জার কেনা গোলাম। ন্যায়বিচারের পরিবর্তে রাদিফ বেছে নিল জাভিয়ানের দেওয়া কালো টাকার পাহাড়। দিনের পর দিন লোকদেখানো ইনভেস্টিগেশনের নাটক সাজিয়ে, অবশেষে প্রভাবশালীদের নির্দেশে সে পুরো বিষয়টিকে একটি সাধারণ রোড এক্সিডেন্ট হিসেবে ফাইলবন্দি করে কেসটি বন্ধ করে দিল। বিচারের দাবি তখন ধামাচাপা পড়ে গেল ক্ষমতার দাপটে।
দীর্ঘ বারোটি বছর পার হয়ে যাওয়ার পর, যখন সময়ের ধুলোয় সব ঢাকা পড়ে যাওয়ার কথা, তখনই কেকে-র বাল্যবন্ধু তথা সিআইডি অফিসার ফাওয়াদ ব্যক্তিগত উদ্যোগে ফাইলটি পুনরায় খোলার সিদ্ধান্ত নেয়। ধূর্ত অপরাধীরা অনেক চিহ্ন মুছে ফেললেও প্রকৃতির বিচার ছিল ভিন্ন। ফাওয়াদ যখন রাফায় আমিনের পুরনো মেডিকেল রিপোর্ট এবং সংরক্ষিত ফরেনসিক নমুনাগুলো সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করতে শুরু করল, তখন বেরিয়ে এলো শিউরে ওঠার মতো কিছু সত্য।
যার মধ্যে একটি ছিল রাফায় আমিনের শরীরে পাওয়া গেল উচ্চমাত্রার স্লো পয়জন-এর অস্তিত্ব। মূলত, জাভিয়ান আর আব্বাসের পথের কাঁটা ছিলেন এই তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষটি। তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল অনেক আগেই। আরিজ খন্দকার, আব্বাস মির্জার কুমন্ত্রণা অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে রাফায় আমিনের খাবারে বা পানীয়তে নানান উপায়ে অল্প অল্প করে বিষ মিশিয়ে আসছিল।
যে কারণে মৃত্যুর মাসখানেক আগে থেকেই রাফায় আমিন প্রায়ই শারীরিক অসুস্থতায় ভুগতেন। ষড়যন্ত্রকারীরা ভেবেছিল, বিষের ক্রিয়ায় তার স্বাভাবিক মৃত্যু হবে এবং কেউ তাদের সন্দেহ করবে না।কিন্তু ক্ষমতার লোভ তাদের ধৈর্য হার মানিয়েছিল।
Naar e Ishq part 19
বিষের ধীর গতির চেয়ে তাদের কাছে রক্তমাখা দ্রুত ফলাফল অনেক বেশি কাঙ্ক্ষিত হয়ে উঠেছিল। তাই সুহিনের সেই বিশেষ দিনটিকেই তারা বেছে নিয়েছিল চূড়ান্ত আঘাত হানার জন্য।
আজ বারো বছর পরেও সুহিনের কাছে জন্মদিন মানেই এক বিষণ্ণ হাহাকার। যেখানে পৃথিবীর অন্য সব সন্তান তাদের জীবনের বিশেষ দিনটি আনন্দ আর উদযাপনে কাটায়, সেখানে সুহিন সেই দিনটিতে নিজের ঘরের কোণে অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে। যে কারণে প্রতিবারের মতো এবারও সে নিজের জন্মদিনের কথা ভুলতে বসেছিল। কিন্তু কেকে তা হতে দেয়নি। ১২ বছর আগে নিজ হাতে সাত বছরের ছোট্ট সুহিনের প্রাণ নিতে চাওয়া কেকে, আজ তার উনিশতম জন্মদিনে সবচেয়ে সেরা উপহারটা দিতে চেয়েছে। যা হয়তো আজকের রাত গড়ানোর পূর্বেই পুরোপুরি প্রস্তুত হতে চলেছে—কিছু মানুষের জীবনের বিনিময়ে।
