Home প্রেমের নীলকাব্য প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫৪

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫৪

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫৪
নওরিন কবির তিশা

দুদিনের গভীর ও নিশ্ছিদ্র অবচেতনা শেষে অবশেষে তিহুর জ্ঞান ফিরল, নিস্তেজ দেহটাকে অতি কষ্টে সামান্য সঞ্চালন করে সে পিটপিটিয়ে চোখ মেলে চাইল। কিন্তু একি! চোখের পাতা দুটো যেন পাথরের মতো ভারী, মাথার ভেতরটা এক অসহ্য যন্ত্রণায় ছিঁড়ে পড়ছে।
ক্লোরোফরমের সেই তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ নেই ঠিকই, কিন্তু এক অদ্ভুত নেশার ঘোরে তার সমস্ত শরীর যেন অসাড় হয়ে আছে। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোনো এক নিগূঢ় রাসায়নিক প্রয়োগে তাকে এই দীর্ঘ সময় ঘুমের অতলে ডুবিয়ে রাখা হয়েছিল, যার রেশ এখনো কাটেনি।

আশেপাশের পৃথিবীতে বড্ড অচেনা; তিহু দেখল সে এক বিশাল কক্ষের কিং সাইজ বিছানায় শুয়ে। জানলার ভারী পর্দা সরানো, বাইরে বিকেলের ম্লান আলো এসে পড়েছে ঘরের দামি কার্পেটে। ঘরের আসবাবপত্র আর সাজসজ্জায় এক আভিজাত্য মেশানো নিঃসঙ্গতা।
বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করতেই সে চমকে উঠল। সামনেই একটা ‌লাউঞ্জ চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে আরহাম। তার সেই গভীর, ঘোরলাগা দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে তিহুর বিবর্ণ মুখের ওপর স্থির। সেই দৃষ্টিতে অদ্ভুত এক জয়ী হওয়ার নেশা, যেন কোনো এক নিষিদ্ধ শিকারকে সে অবশেষে আয়ত্তে এনেছে। তিহুর বুকের ভেতরটা এক নিমেষে কেঁপে উঠল। আরহামের ওই ঘায়েল করা চাহনি দেখে তার অবচেতন মন আর্তনাদ করে উঠল তৎক্ষণাৎ।
মুহূর্তের মধ্যে তিহুর দুশ্চিন্তা রূপান্তরিত হলো এক অগ্নস্ফুলিঙ্গে। ভয়কে জয় করে সে ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসল। তার শান্ত স্বভাব যেন হঠাৎ কালবৈশাখীর রূপ নিল হঠাৎই। আরহামের দিকে তাকিয়ে সে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল,,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

—’কোথায় আমি? কোন সাহসে তুই আমাকে এখানে নিয়ে এসেছিস?
তিহুর ডাগর মায়াবি চক্ষুদ্বয়ে আজ মায়ার লেশমাত্র নেই।সে যেন জলন্ত অঙ্গার।সে বেড সাইড টেবিলের ওপর রাখা কাঁচের ফুলদানিটা হাতে তুলেই এক নিমেষেই সেটা আছাড় দিয়ে মেঝেতে চুরমার করে দিল। হৃদয়ের অবদমিত ক্ষোভ গুলোর বহিঃপ্রকাশ ঘটলো মুহূর্তের মাঝে তার বদলে যাওয়া অবয়বে‌।
কিন্তু তার এমন কাণ্ডে আরহাম হেলদোল দেখালো না বরং তার ঠোঁটের কোণে ‌ফুটে উঠল এক চিলতে বাঁকা হাসি। সে ধীরস্থিরভাবে লাউঞ্জ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তিহুর ঠিক সামনে এসে দাঁড়িয়ে সে পকেটে হাত গুঁজে খুব শান্ত গলায় বলল,,

—’রিলাক্স, তোতা! জাস্ট রিলাক্স। তোমার শরীর এখনো পুরোপুরি রিকভার করেনি। ইউ আর সিক, বেবি। নিজেকে এত কষ্ট দিচ্ছ কেন?
​তিহুর চোখে তখনো আগুনের স্ফুলিঙ্গ। সে পিছিয়ে যেতে চাইলে আরহাম এক পা এগিয়ে এসে নিচু স্বরে, অনেকটা হিসহিসিয়ে বলে উঠল,,
—’এই যে এত চিৎকার করছ, তাতে কোনো লাভ নেই। সুইটহার্ট, দিস ইজ মাই টেরিটরি। আর এখানে তোমার এই সস্তা ড্রামা দেখার জন্য আমি বাদে আর কেউ নেই।
​হঠাৎ করেই আরহামের শান্ত কণ্ঠস্বর কঠোর হয়ে উঠল। তিহুর বাহুটা শক্ত করে চেপে ধরে সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,,

—’শাট আপ অ্যান্ড জাস্ট লিসেন টু মি! ডোন্ট ট্রাই টু প্লে স্মার্ট উইথ মি।আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিও না। তুমি কি ভেবেছিলে ওই নীল খানের ছায়াতলে গেলেই তুমি বেঁচে যাবে? হাউ স্টুপিড অফ ইউ!
​তিহু যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠলেও তার দৃষ্টি নুইয়ে পড়ল না। আরহাম তার মুখের খুব কাছে মুখ নিয়ে এসে একটা শীতল হাসি দিয়ে আবার বলল,,
—’তুমি আমার সম্পত্তি, তিহু। আর আমার জিনিস আমি কীভাবে নিজের কাছে ফিরিয়ে আনি, সেটা তো ভালো করেই দেখলে। সো, স্টপ দিস ননসেন্স এন্ড গেট ইউজড টু ইট। কারণ এখন থেকে এই চার দেয়ালই তোমার পৃথিবী।
পরক্ষণেই নরম স্বরে সে বলল,,—’আমি তোমাকে ভালবাসি তোতা। আই জাস্ট লাভ ইউ , কেন বোঝনা ইউ স্টুপিড লেডি!

আরহামের মুখে ‘সম্পত্তি’ শব্দটা শোনামাত্র তিহুর শরীরের শিরায় শিরায় যেন বিদ্যুৎ খেলে গিয়েছে।বাদবাকি কোন কথাই কর্ণগোতর হলো না তার। ঘৃণায় তার ফর্সা মুখটা মুহূর্তেই তপ্ত তামাটে বর্ণ ধারণ করেছে। আরহাম তার বাহুটা যে পাশবিক শক্তিতে চেপে ধরেছিল, তিহু সর্বশক্তি দিয়ে ঝটকা মেরে সেই হাতটা সরিয়ে দিল। সে এক পা এগিয়ে গিয়ে আরহামের চোখের মণি বরাবর তর্জনী উঁচিয়ে হিসহিস করে বলে উঠল,,,
—’সম্পত্তি? তোর সম্পত্তি আমি? কোন আয়নায় মুখ দেখে এই কথা বলছিস আরহাম? তোর মতো একটা নিচ, জঘন্য আর মেরুদণ্ডহীন জা*নো*য়ারের ছায়াও মাড়াতে আমার ঘেন্না হয়!
আরহাম কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তিহু তাকে থামিয়ে দিয়ে ঝড়ের বেগে গর্জে উঠল,,
—’শাট ইয়োর ফিলদি মাউথ, ইউ ডিসগাস্টিং ক্রিপ! হাউ ডেয়ার ইউ লে আ ফিঙ্গার অন মি?তুই ভেবেছিস ক্লোরোফর্ম দিয়ে অজ্ঞান করে তুলে আনলেই আমাকে জয় করে ফেলবি?ইট’স নট লাভ, ইট’স আ মেন্টাল সিকনেস!তুই একটা আস্ত সাইকোপ্যাথ!

তিহুর এই রুদ্রমূর্তি দেখে আরহাম এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে ভাবতেও পারেনি এই নিস্তেজ মেয়েটা এত দ্রুত এমন বিধ্বংসী হয়ে উঠবে। তিহু তখনো থামেনি, তার কণ্ঠস্বর তখন ঘরের দেয়াল চির ধরিয়ে দিচ্ছে,,
—’তুই কি ভেবেছিস এখানে আমাকে বন্দি রাখবি?এতে তুই জিতে যাবি তাহলে জেনে রাখ ইউ আর আ লুজার, আরহাম! আ প্যাথিটিক, স্পাইনলেস লুজার! নীল খানের নখের ও যোগ্য নস তুই। আর তুই আমাকে এখানে বন্দি রাখবি? জাস্ট সি দ্য নিউজ মিডিয়া এতক্ষণে বাংলাদেশে তাণ্ডব লীলা শুরু করেছে আমার নীল। আর কিছুক্ষণের মধ্যে হয়তো এখানেও পৌঁছাবে সে তান্ডবের লেলিহান শিখা। যা থেকে তোর নিস্তার নেই, তোর গন্তব্য হবে কোনো নিস্তব্ধ নির্জন উপত্যাকার অন্ধকার গর্তে। অল্প বয়সেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে গো’রে শায়িত হবি তুই!
রাগে তিহুর পুরো শরীর কাঁপছে। সে আবারও বিছানার পাশের ছোট ল্যাম্পশেডটা তুলে আরহামের পায়ের কাছে সজোরে আছাড় মারল। কাঁচের টুকরোগুলো আরহামের জুতো স্পর্শ করল। তিহু দাঁতে দাঁত চেপে শেষবারের মতো সাবধান করে দিয়ে বলল,,
—’তোর ওই ‘টেরিটরি’ আজ আছে কাল নেই। কিন্তু তোর কপালে যে দুর্ভোগ আমার নীল লিখে দেবে, সেটা মুছবার সাধ্য তোর কোনোদিন হবে না। তুই ওকে চিনিস না আরহাম, ইউ হ্যাভ জাস্ট ইনভাইটেড ইওর ওন ডেস্ট্রাকশন!

নিউ ইয়র্কের জেএফকে এয়ারপোর্টের টার্মিনাল থেকে যখন নীল বেরিয়ে এল, তখন তার অবয়ব কোনো সুস্থ মানুষের মতো নয়। গত কয়েক ঘণ্টার নির্ঘুম জার্নি আর হৃদয়ের ভেতর জ্বলতে থাকা আগুনের লেলিহান শিখা তাকে এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরিতে পরিণত করেছে। তার রুক্ষ চুল, লাল হয়ে থাকা চোখ আর চোয়ালের শক্ত পেশিগুলো বলে দিচ্ছিল—সে এখন কোনো সাধারণ মানুষ নয়, বরং এক ধ্বংসাত্মক ঝড়ের নাম।
​নাহিয়ান আগে থেকেই গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। নীলকে দেখা মাত্রই সে এগিয়ে এল, কিন্তু নীলের চেহারা দেখে তার বুকের ভেতরটা ছ্যাৎ করে উঠল। যে নীলকে সে চেনে, এই নীল তার থেকে যোজন যোজন দূরে।নাহিয়ান কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই নীল ওর কলারটা এক ঝটকায় ধরে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল। ওর শান্ত কিন্তু বিষাক্ত গলার স্বর চারিদিকে প্রতিধ্বনিত হলো,,

—’হোয়াট দ্য ফা*ক আর ইউ ডুয়িং, নাহিয়ান? কী ফা*কিং ডিউটি করছিস তুই এখানে? আমার গোটা দুনিয়া আর তুই এখনো আমাকে বলছিস ‘উই আর ট্রাইয়িং’? ট্রাইয়িং ফর হোয়াট? আমার পেশেন্সের পরীক্ষা নিচ্ছিস?
নাহিয়ান নীলকে শান্ত করার চেষ্টা করে দুই হাতে তার বাহু চেপে ধরল। সে বেশ বুঝতে পারছে, নীল এখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য,
—’নীল, শান্ত হ! আমি সব ফোর্স লাগিয়েছি। সম্ভাব্য সব কটা হাইড-আউটে রেইড চলছে….!
নীল ওর কথা শেষ করতে দিল না। ওর চোখের মণি দুটো রাগে আর যন্ত্রণায় টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। ও নাহিয়ানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে চিৎকার করে উঠল,,
—’আই ডোন্ট গিভ আ ড্যাম অ্যাবাউট হিজ ক্লেভারনেস! তুই কি জানিস না তিহু আমার জন্য কী? ও আমার নিঃশ্বাস রে, স্টুপিড! আর তুই আমাকে বলছিস লোকেশন ট্রেস করতে পারিসনি? হাউ প্যাথিটিক! ইউ হ্যাড ওয়ান জব, নাহিয়ান। জাস্ট ওয়ান ফা*কিং জব ওর লোকেশন ট্রেস করা। আর তুই সেখানেও ফেইল করলি?
নীল একটা লাথি মারল পাশের গাড়িটায়। ওর ভেতরের অস্থিরতা আর হাহাকারটা এবার ওর গলার স্বরে ঝরে পড়ল। ও এবার কিছুটা নিচু কিন্তু তীক্ষ্ণ স্বরে বল,,

—’আমার কলিজাটা ছিঁড়ে যাচ্ছে,ভেতরটা জ্বলে যাচ্ছে আর তোরা বারবার আমাকেই বলছিস শান্ত হতে? শাট আপ! জাস্ট শাট দ্য ফা*ক আপ! যদি আগামী এক ঘণ্টার মধ্যে আমাকে কোনো লিড দিতে না পারিস, তবে আই উইল টেক ম্যাটারস ইনটু মাই ওন হ্যান্ডস। তারপর এই শহরে কী তান্ডব হবে, সেটা তুই কল্পনাও করতে পারবি না।আই উইল বার্ন দিস হোল সিটি ডাউন ইফ আই হ্যাভ টু!
নীল ফোনটা বের করে স্ক্রিনে তিহুর ছবিটার দিকে এক পলক তাকাল। ওর রুক্ষ চেহারাটা মুহূর্তের জন্য নরম হলো, কিন্তু পরক্ষণেই সেটা আবার পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। ও নাহিয়ানের দিকে আঙুল উঁচিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,,
—’গেট মি আ লোকেশন। নাও! আমি এখানে ট্যুরিস্ট হয়ে আসিনি। কু*ত্তা*টাকে জি*ন্দা ক*ব*র দিতে এসেছি। আমি ওকে এমনভাবে শেষ করব যে ওর মৃ*ত্যু*র কথা স্মরণ করলেও মানুষের কলি*জা থেকে পানি শুকিয়ে যাবে। মুভ!

নিউইয়র্কের আকাশটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে উঠল। সাধারণ নাগরিকদের কাছে যা এক আকস্মিক নিরাপত্তা মহড়া বলে মনে হচ্ছে, বাস্তবে তা ছিল এক আদিম হিংস্র প্রতিশোধের প্রস্তুতি। নীলের নির্দেশে ওয়াশিংটন থেকে শুরু করে নিউইয়র্ক সিটি হলের ক্ষমতার অন্দরে কাঁপুনি ধরে গেছে। নীল যে এক ভয়ংকর মস্তিস্কের অধিকারী—তার প্রমাণ মিলছে প্রতিটা মিনিটে।
সড়কপথে তখন শত শত কালো এসইউভি টায়ার জ্বালিয়ে রাস্তা দখল করে নিয়েছে।নাহিয়ানেরর নিজস্ব বাহিনীর সদস্যরা প্রতিটি মোড়ে মোড়ে চেকপোস্ট বসিয়েছে। নিতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় কর্তব্যরত এত তারা। ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকার হ্যাকাররা সিগন্যাল ট্র্যাক করতে গিয়ে নিউইয়র্কের সাবওয়ে সিস্টেম পর্যন্ত জ্যাম করে দিয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো ব্রেকিং নিউজে দেখাচ্ছে: ‘A high-stakes manhunt turns NYC into a war zone.’

নিউইয়র্কের মূল শহর থেকে কয়েকশ মাইল দূরে, অ্যাপালেচিয়ান পর্বতমালার গহীন অরণ্যে ঘেরা আরহামের এই গোপন বাংলো। পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে কুয়াশার আস্তরণ আর ঘন পাইন গাছের বুনন ভেদ করে কোনো সিগন্যাল পৌঁছানো সাধারণ প্রযুক্তির সাধ্যের বাইরে। স্যাটেলাইট ট্র্যাকিং এড়াতে আরহাম এখানে হাই-ফ্রিকোয়েন্সি জ্যামার বসিয়ে রেখেছিল, যাতে পুরো এলাকাটা পৃথিবীর মানচিত্র থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে।
কিন্তু আরহাম জানত না, নীল খানের প্রতিশোধের আগুন কোনো কৃত্রিম জ্যামার দিয়ে আটকে রাখা সম্ভব নয়। নীলের নির্দেশে কাজ করা আন্ডারগ্রাউন্ড হ্যাকাররা ‘সিগন্যাল ট্রায়াঙ্গুলেশন’ পদ্ধতিতে ওই নির্দিষ্ট এলাকার বিদ্যুৎ গ্রিডে অস্বাভাবিক লোড শনাক্ত করে ফেলেছে। ধীরে ধীরে নীলের শিকারি চোখ আরহামের লুকানোর গর্তটা চিনে নিচ্ছে।
বাংলোর ড্রয়িংরুমে রাখা বিশাল এলইডি স্ক্রিনে তখন নিউইয়র্কের উত্তাল পরিস্থিতির খবর প্রচার হচ্ছে। আরহাম সোফায় বসে সংবাদগুলো দেখছিল আর তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। নিউজ অ্যাঙ্কর চিৎকার করে বলছে,,

“পুরো নিউইয়র্ক সিটি এখন এক অদৃশ্য শক্তির নিয়ন্ত্রণে। জেএফকে এয়ারপোর্ট থেকে অ্যাপালেচিয়ান ট্রেইল পর্যন্ত প্রতিটি হাইওয়ে সিল করে দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল কোনো অপহরণ মামলা নয়, মনে হচ্ছে কোনো এক ব্যক্তিগত যুদ্ধের ময়দান আজ আমেরিকার রাজপথ!”
পর্দার স্ক্রিনে শত শত কালো এসইউভি আর আকাশে চক্কর দেওয়া ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার দেখে আরহামের হাতের গ্লাসটা কেঁপে উঠল। তার ‘টেরিটরি’ বা নিজের এলাকা বলে যে দম্ভ ছিল, তা এখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার উপক্রম।পিছন থেকে একটা শুকনো বিদ্রূপাত্মক হাসির শব্দ ভেসে এল। আরহাম ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তিহু। তার ফর্সা মুখে এখনো সেই আগুনের আভা, কিন্তু ঠোঁটের কোণে এখন এক বিজাতীয় তৃপ্তির হাসি।
তিহু ধীর পায়ে এগিয়ে এসে স্ক্রিনের দিকে আঙুল উঁচিয়ে শান্ত স্বরে বলল,,

—’কী হলো আরহাম? তোমার ওই তথাকথিত ‘টেরিটরি’ তো দেখছি এখন কাঁপছে। ওই যে দেখছ আকাশ কাঁপানো হেলিকপ্টারগুলো? ওগুলো কোনো সরকারি মহড়া নয়। ওটা নীল খানের নিঃশ্বাসের শব্দ। ও তোর মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে এই পাহাড়ের দিকেই আসছে।
আরহাম দাঁতে দাঁত চেপে বলল,,

—’শাট আপ তিহু! ও এখানে পৌঁছাতে পারবে না। এই পাহাড়ের গোলকধাঁধায় ও হারিয়ে যাবে।
তিহু এবার আরও একটু কাছে এগিয়ে এল। তার চোখেমুখে এখন গভীর এক গূঢ় হাসি। সে ফিসফিস করে বলল,,
—’ভুল বলছিস। নীল হারাবার জন্য আসেনি, সে তোকে শেষ করতে এসেছে। তুই ভেবেছিলি ওকে আড়ালে রেখে আমাকে জয় করবি? এখন দেখ, ও তোর পুরো শহরটাকেই নরক বানিয়ে দিয়েছে। তুই তো ইঁদুরের মতো গর্তে ঢুকে আছিস, কিন্তু বাঘের থাবা থেকে এই অন্ধকার গর্ত তোকে বাঁচাতে পারবে না আরহাম। তোর ধ্বংসের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ!
তিহুর সেই বাঁকা হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা আত্মবিশ্বাস আরহামের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বইয়ে দিল। বাইরে তখন পাহাড়ের নিস্তব্ধতা চিরে দিয়ে দূরে কোথাও সাইরেনের শব্দ শোনা যাচ্ছে।

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫৩

এদিকে নীল এক যন্ত্র পক্ষীর উদরে বসে খুঁজে-ফিরছে সারা আমেরিকা। নিষ্পলক চোখের উন্মাদ দৃষ্টি খুঁজছে নিজের অর্কিডকে। মনের নিভৃত কোণে কোথাও বেজে উঠছে,,
🎶কোথায় পাব বল….
কোনখানে তুই…
কোথায় তোর দেশ আজ যাবও……🎶

প্রেমের নীলকাব্য পর্ব ৫৫