Naar e Ishq part 21
তুরঙ্গনা
স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুতে আরশিয়া মেহের তখন দিশেহারা, যেন এক অতলান্ত অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে সে। শোকের এই তীব্রতায় তার হিতাহিতজ্ঞান লোপ পেয়েছে। অন্যদিকে ছোট্ট বোকা সুহিন এখনো বুঝে উঠতে পারেনি মাথার ওপর থেকে বাবা নামক এই ছাদ সরে যাওয়ার অর্থ কী। সে কেবল ফ্যালফ্যাল করে মায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে, কখনো বা কাঁদে, আবার কখনো মায়ের আঁচল ধরে বাবার নাম জপতে থাকে।
তাদের আগামীর অনিশ্চিত পথচলার সমান্তরালে বিষণ্ণতার আরেক দীর্ঘ ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেকে। তার নিজের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎও যেন এক গোলকধাঁধায় বন্দি।
কেকের শৈশবটা মোটেও সুখকর ছিল না। মা বেঁচে থাকা পর্যন্ত জীবনটা ছিল আর দশটা সাধারণ শিশুর মতোই রঙিন। কিন্তু মায়ের অকাল প্রস্থান তার সাজানো জগতটাকে ওলটপালট করে দেয়।
বাবা হিসেবে শাহমীর কাহসান পিতৃত্বের গুরুদায়িত্ব পালনে হয়তো কিছুটা অপটু ছিলেন। তার সমস্ত মনোযোগের কেন্দ্রে ছিল সামাজিক প্রতিপত্তি আর ব্যবসার প্রসার। বিশাল এই প্রাসাদে মাতৃহীন ছোট্ট ছেলেটিকে আগলে রাখার মতো মানসিক অবস্থা বা সময়—কোনোটাই শাহমীরের ছিল না।
স্ত্রীর শূন্যতা ঢাকতেই হয়তো তিনি নিজেকে কাজের মাঝে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন, কিন্তু এর চড়া মাশুল দিতে হয়েছে কেকে ওরফে সেই বাচ্চা ছেলে কাশিফ কাহসান চৌধুরীকে।
বাবার সান্নিধ্য যখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, ঠিক তখনই কেকে-কে পাঠিয়ে দেওয়া হলো এক কঠোর বোর্ডিং স্কুলে। সেই স্কুলের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই ছিল অনাথ। বাবা বেঁচে থাকতেও এতিমদের মাঝে বেড়ে ওঠার এই নির্বাসন কেকের ভেতরের সবটুকুও কোমলতা কেড়ে নিল।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
সময়ের সাথে সাথে সে হয়ে উঠল গম্ভীর, জেদি আর উগ্র। কৈশোর পেরিয়ে তারুণ্যে পা দিতে দিতে সে এক বেপরোয়া চরিত্রে রূপ নিল। পুরো স্কুল তাকে এক হিংস্র নেকড়ের ন্যায় ভয় পেতো; তার চলন-বলন আর চোখের চাউনিতে সবই যেন এক নিকষ কালো অন্ধকার জঙ্গলের হিংস্র নেকড়েরই প্রতিচ্ছবি।
সেই বোর্ডিং স্কুলেই তার পরিচয় হয়েছিল তালহা, সাদ, ফারিস আর জায়ানের সাথে। যে কারণে তারাও ছিল পরিবারহীন, আশ্রয়হীন। এছাড়া কাহসান ইন্ডাস্ট্রির অনুদানে চলা সেই স্কুলে কেকের দাপটও ছিল প্রশ্নাতীত।
অনুদানের সহয়তায় প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর এই পাঁচ বন্ধু সহ অনেকেই স্কুল থেকে বেরিয়ে শহরের নামকরা কলেজে ভর্তি হয়। যদিও কেকে’র সাথে তালহা,সাদ,জায়ানের বন্ধুত্বটা জোড়াল হয়েছিল ইতালিতে গিয়ে। কিন্তু দেশে থাকতেই তাদের জীবন গড়ে যায় বিশৃঙ্খলার চরম সীমায়। ফারিস আর জায়ান নেশার জগতে ডুবে ছিল, আর তাদের হাত ধরেই কেকে-ও সেই চোরাবালিতে তলিয়ে গেল।
এক পর্যায়ে কেকে ভয়াবহভাবে ড্রাগ অ্যাডিক্টেড হয়ে পড়ে। গভীর রাত পর্যন্ত নাইট ক্লাবে পড়ে থাকা, বাড়িতে উদ্দাম পার্টি কিংবা মদ্য পান করে মাতাল হয়ে মেয়ে নিয়ে যেখানে সেখানে পড়ে থাকার মতো নানা নৈতিক অবক্ষয়ের খবর যখন চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল—ঠিক তখন গিয়ে শাহমীর কাহসানের টনক নড়ল।
সমাজ নিয়ে শাহমীর কাহসানের অদ্ভুত এক ভয় ছিল। সে তার ছেলের মতো সমাজকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা কিংবা সমাজকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সকল সিন্ধান্ত নিতে পারতো না। সমাজে নিজের কিংবা বংশের নামডাক ঠিকঠাক বজায় রাখাটাই ছিল তার কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শাহমীর যখন বুঝতে পারল তার একমাত্র উত্তরাধিকারী ধ্বংসের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে, তখন তার ভেতর এক বিজাতীয় আতঙ্ক ভর করল। একদিকে তিল তিল করে গড়ে তোলা ব্যবসা আর সামাজিক আভিজাত্য, অন্যদিকে বখে যাওয়া নেশাসক্ত ছেলে—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে তিনি দিশেহারা হয়ে পড়লেন।
অবশেষে রাফায় আমিনের সাথে পরামর্শ করে তিনি এক কঠোর সিদ্ধান্ত নিলেন। কেকে-কে কার্যত গৃহবন্দি করা হলো। বিশাল প্রাসাদের চার দেয়ালই হয়ে উঠল তার জগৎ। শাহমীরের মৃত্যুর আগের বেশ কিছুদিন কেকে তার বাবার তীক্ষ্ণ নজরদারিতে একপ্রকার শৃঙ্খলিত জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়েছিল।
বাইরের জগতের সেই উন্মাদনা আর নাইট ক্লাবের নীল আলোর জগৎ বন্ধ হলেও কেকের ভেতরের অস্থিরতা বিন্দুমাত্রও কমে না। সে তখন এক খাঁচায় বন্দি পাগলাটে নেকড়ের ন্যায় ফুঁসছে। আড়ালে-আবডালে গোপনে নেশাদ্রব্য আনিয়ে সে মাঝেমধ্যেই ঘরের ভেতর তাণ্ডব চালাত।
ভাঙচুর আর চিৎকার মিলিয়ে কাহসান কুঞ্জে এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো। ঠিক এই সংকটকালেই রাফায় আমিন আরেক সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি চাইলেন এই বিষাদগ্রস্ত বাড়িতে প্রাণের স্পন্দন ফিরিয়ে আনতে। সেই উদ্দেশ্যেই শহরের অন্য প্রান্তের ছিমছাম বাড়ি ছেড়ে আরশিয়া মেহের আর ছোট্ট সুহিনকে থাকতে বলা হলো এই কাহসান কুঞ্জে। তারা যে মাঝেমধ্যেই কাহসান কুঞ্জে এসে থাকত—এ আর গোপন কিছু নয় বরং এ কথা আশেপাশের লোকজন কমবেশি সকলেই জানত।
এদিকে আরশিয়া মেহেরের ওপর অর্পিত হলো আরেকটি দায়িত্ব—কেকের দেখভাল করা। মেহের জানত, কেকে যতটা না অপরাধী, তার চেয়ে বেশি সে বঞ্চনার শিকার। তাই সে শাসকের ভূমিকায় না গিয়ে বড় বোন, আবার কখনো বা মায়ের মতো মমতাময়ী এক ছায়া হয়ে দাঁড়াল। এমনিতেও কেকে আর তার বয়সের ব্যবধান ছিল মাত্র ৫-৬ বছরের।
কেকের অবাধ্য আর খ্যাপাটে মনকে শান্ত করতে আরশিয়াকে ধৈর্যের চরম পরাকাষ্ঠা দেখাল। তার হাতের রান্না আর স্নিগ্ধ ব্যবহার ধীরে ধীরে কেকের চারপাশের বরফ গলাতে শুরু করল। কেকে হয়তো মুখে কিছু বলত না, কিন্তু মেহেরের উপস্থিতিতে তার ভেতরের হিংস্রতা কিছুটা হলেও স্তিমিত হয়ে আসত। এছাড়া মাঝেমধ্যে বোকা সুহিনকে পেলে, খানিক শয়তানি করে তাকে কাঁদাতো। এসব কখনো কখনো মেহেরের নজরে পড়লেও,সে কিছু মনে করতো না। বড় ভাই আর ছোট বোন ভেবেই বিষয়গুলো স্বাভাবিক মনে করতো।
এভাবেই দিনগুলো একপ্রকার থমথমে শান্তির মধ্য দিয়েই অতিবাহিত হচ্ছিল। মাঝে মাঝে কেকের সেই চার বন্ধু সহ অনেকেই বাড়িতে আসতো। দেখাসাক্ষাৎ সহ বেশ আড্ডাও হতো তাদের মাঝে। মেহের তাদেরও আপন করে নিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এই স্থিরতা ছিল বালির বাঁধের মতো ক্ষণস্থায়ী।
পরপর শাহমীর কাহসান এবং রাফায় আমিনের আকস্মিক মৃত্যু পুরো দৃশ্যপট পাল্টে দিল। যে দুজন মানুষের ভয়ে বা শ্রদ্ধায় বাড়ির নিয়মগুলো টিকে ছিল, তারা নেই হয়ে যেতেই সব তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। শোকাতুর আরশিয়া মেহের তখন সুহিনকে নিয়ে এক অথৈ সাগরে ভাসছে। অন্যদিকে কেকে—যার মাথার ওপর থেকে শেষ রাশটুকুও সরে গেছে, সেও তখন এক অনিশ্চিত আগ্নেয়গিরি রূপে ফুঁসছে। যে কোনো মুহূর্তে তার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আর নেশার অন্ধকার আছড়ে পড়তে পারে এই সাজানো সংসারের ওপর। অভিভাবকহীন এই প্রাসাদ সমতুল্য বাড়িটিতে তখন কেবল নীরবতা আর এক আসন্ন ঝড়ের পূর্বাভাস।
অথচ শাহমীর কাহসান এবং রাফায় আমিনের মৃত্যুর সেই অভিশপ্ত রাতটি ছিল কেবল এক বিধ্বংসী ঝড়ের সূচনা। চারিদিকের বিশৃঙ্খলা আর শোকের মাতমে আরশিয়া মেহের এবং সুহিন জ্যান্ত মূর্তির ন্যায় স্তম্ভিত। অন্যদিকে জাভিয়ান সেইরাতেই তাদের কাছে পৌঁছে গেল। অতঃপর অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে তাদের বুঝিয়ে, অনেকটা জোর করেই কাহসান কুঞ্জে নিয়ে এলো।
সুহিন তার জাভিয়ান আঙ্কেলকে বাবা আর শাহমীরের ভালো বন্ধু হিসেবেই জানত, তাই কোনো সংশয় ছাড়াই সে নিজেও মায়ের সাথে চলে এলো। কিন্তু আজকের বোকা সুহিনের মতো সেই ছোট্ট সুহিনও জানত না যে—এই কাহসান কুঞ্জের প্রতিটি ইট-দেওয়ালের মাঝে কেবল কলঙ্ক, ষড়যন্ত্র ও রহস্যের ছাপ।
বাড়ির এক কোণে স্বামীর ছবি আঁকড়ে ধরে বিধ্বস্ত আরশিয়া মেহের তখন এক জীবন্ত লাশ বসে পড়ে আছে। অন্যদিকে সুহিনও ধীরে ধীরে নীরব হয়ে যাচ্ছে। তার শৈশব যেন এক নিমেষেই হারিয়ে গেছে;তার বাবা যে আর পৃথিবীতে নেই—তা তার ছোট মন কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। আর এই শোকের আবহে কেকে ছিল একেবারেই নির্বিকার। বাবার মৃত্যু তার মাঝে কোনো অনুশোচনা বা পরিবর্তন আনেনি, বরং সে আরও গভীরভাবে ডুবে গেল নেশার অন্ধকার জগতে। সে দিন-দুনিয়ার ধ্যানজ্ঞান হারিয়ে নিজের ঘরের অন্ধকারে কি করত—তা হয়তো সে নিজেও জানত না।
কিন্তু এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝে বাড়ির কাজের লোকদের মধ্যে শুরু হলো এক অদ্ভুত কানাঘুষা। আরশিয়া যখন প্রথমবার সুহিনকে নিয়ে এই বাড়িতে থাকতে এসেছিল, তখন শৃঙ্খলা বজায় রাখার খাতিরে সে বাড়ির কর্মচারীদের ওপর কিছু নিয়মকানুন জারি করে। সেই সময় থেকেই একদল কাজের লোক তাকে সহজভাবে নিতে পারেনি।
যদিও আরশিয়া কোনোদিন কারো সাথে অসংলগ্ন ব্যবহার করেনি, কিন্তু ঘরের শত্রু বিভীষণ প্রবাদের মতোই তার আড়ালে এক নেতিবাচক ধারণা দানা বাঁধতে শুরু করল। তারা আরশিয়াকে এই বাড়ির অঘোষিত মালকিন হিসেবে মেনে নিতে পারছিল না।
অন্যদিকে জাভিয়ান নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছিল,যেন তাদের চেয়ে আপন আর কেউ নেই। একদিকে শাহমীর ও রাফায় আমিনের মৃত্যুর তদন্ত নিয়ে তার সীমাহীন তৎপরতা, অন্যদিকে রাফায় আমিনের পরিবারের প্রতি অতি-যত্ন—সব মিলিয়ে সে যেন দেবদূত।
কিন্তু পর্দার আড়ালে বাড়ির সার্ভেন্টরা আরশিয়া আর কেকের সম্পর্ক নিয়ে এক নোংরা খেলায় মেতে উঠল। স্বামীহারা আরশিয়া যখন ভবঘুরে আর মাতাল কেকের দেখভাল করতে যেত, তখন সেই সাধারণ যত্নটুকুকেই তারা বিকৃত নজরে দেখতে শুরু করল। এই কুৎসা কেবল দেয়ালের ভেতরেই সীমাবদ্ধ রইল না, ছড়িয়ে পড়ল বাইরের লোকসমাজেও।
আরশিয়া মেহেরের মাথায় তখন এতোসব ভাববার বা বোঝার সুযোগ ছিল না। সে শুধু নিজেকে শান্ত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। মেহের জানত, কেকে আর সুহিনকে আগলে রাখার দায়িত্ব এখন কেবল তারই। আগের সেই প্রাণখোলা হাসি হারিয়ে গেলেও, সে দায়িত্ব পালনে ছিল অটল।
এভাবেই আরো কিছুদিন কেটে যায়। অতঃপর এমনই এক দুর্যোগপূর্ণ রাতে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামল। ঝোড়ো হাওয়ার দাপটে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। চারদিকে গুমোট অন্ধকার। আরশিয়া একটি মোমবাতি হাতে নিয়ে কেকের ঘরের দিকে পা বাড়াল। ইচ্ছা ছিল কেবল একঝলক দেখে আসা সে ঘুমিয়েছে কি না। এটা সচারাচর সে ঘুমানোর আগে প্রায়ই করে থাকে।
আরশিয়া ঘরে ঢুকে দেখল কেকে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে, কিন্তু তার শরীরটা অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে। চিন্তায় আরশিয়ার কপালে ভাঁজ পড়ল। সে মোমবাতিটা বেডসাইড টেবিলে রেখে কেকের পাশে বসল। কপালে হাত দিতেই জ্বরের তীব্রতায় তার হাত পুড়ে যাওয়ার উপক্রম। উদ্বিগ্ন স্বরে সে ডাকতে লাগল,
“কাশিফ! কি হয়েছে তোমার? এতো… এতো জ্বর কিভাবে?”
কেকের এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে আরশিয়া বারবার তাকে ডাকতে লাগল। বাড়ির লোকগুলোর ওপর তার চরম বিরক্তি এল; বাড়ির মালিকের মৃত্যুর পর কেউ যেন আর নিজের দায়িত্ববোধ বজায় রাখছে না। কেউ একবার খোঁজও নেয়নি ছেলেটার। আরশিয়া দুহাতে কেকে-কে আগলে ধরে জোর স্বরে লোক ডাকল,
“কে আছেন? একটু এদিকে আসুন…”
কথাটা শেষ করার আগেই সে দেখল, কেকের কাঁপুনি আরও বেড়ে গেছে। কেকে জ্বরের ঘোরে বিড়বিড় করে অস্পষ্ট কিছু একটা বলছে। আরশিয়া যখন তাকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই একজন নারী পরিচারিকা দরজায় এসে দাঁড়াল। ঘরের ভেতরের এই স্বাভাবিক দৃশ্যটিও, সেই নারীর কলুষিত মনে ভিন্ন ও ব্যতীক্রমী ভাবনার সৃষ্টি করল।
কেকে জ্বরের ঘোরে আরশিয়ার উরুতে মাথা রেখে অবিন্যস্তভাবে কাঁপছে, আর আরশিয়া তার মাথা-কাধ দুহাতে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করছে। মোমবাতির অস্পষ্ট আলোয় এই দৃশ্যটি সেই নারীর কাছে সেবামূলক মনে হলো না, বরং তার সন্ধিগ্ধ মস্তিষ্কে তা ধরা দিল এক নিষিদ্ধ ঘনিষ্ঠতা হিসেবে।
নারীটি সেই মুহূর্তে কোনো কথা না বললেও, রাতের আঁধারে এই ঘটনাটি আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল অন্য সার্ভেন্টদের কানে।
আরশিয়া তখন কুলক্ষণে বুঝতে পারেনি, তার এই নিঃস্বার্থ মাতৃত্বসুলভ আচরণই সমাজের চোখে তার চরিত্রের ওপর কলঙ্কের দাগ হয়ে ফিরছে।
যতই দিন যাচ্ছে ততই যেন, কাহসান কুঞ্জ যেন এক জীবন্ত কবরে পরিণত হচ্ছে। বিশাল অট্টালিকার জাঁকজমক হারিয়ে গিয়ে সেখানে জেঁকে বসল এক মরা নিস্তব্ধতা। কিন্তু সেই নিস্তব্ধতার ভেতরেই আরশিয়া মেহেরের জীবনে দানা বাঁধতে লাগল এক বিধ্বংসী পরিবর্তন।
স্বামী হারানোর শোক মেহেরকে ক্রমশ এক অতল গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছিল। দিনদুনিয়ার প্রতি তার সমস্ত মোহ যেন কর্পূরের মতো উড়ে গেল। হুটহাট মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, নিজের ছায়াকেও সহ্য করতে না পারা—এমন এক অদ্ভুত বিচ্ছিন্নতা তাকে গ্রাস করল যে, নিজের কলিজার টুকরো মেয়েকেও সে আর সহ্য করতে পারছিল না। অধিকাংশ সময় অন্ধকার ঘরের কোণে একা কাটিয়ে দিতো সে; যেন আলোর সাথে তার চিরশত্রুতা।
বাড়ির লোকজনের নজরে মেহেরের এই পরিবর্তনগুলো এড়ালো না। বিশেষ করে তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে অধিকাংশ পরিচারক চলে যেত এবং তারা ফিরতো ঠিক শনিবার সকালে। এতে করে বাড়িটা প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়ত। আর এতে করেই রহস্যের মেঘ আরও ঘনীভূত হতো।
এমনই এক বৃহস্পতিবার রাতে, এক নারী পরিচারিকা আরশিয়ার ঘরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ঘর থেকে কিছু অপ্রীতিকর শব্দ শুনতে পেল। কৌতূহলবশত দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিতেই, তার নজর পড়ল সরাসরি বাথরুমের দিকে। বাথরুমের দরজা খোলা অবস্থাতেই আরশিয়া বিধ্বস্ত অবস্থায় উপুড় হয়ে বমি করছে।
নারীটি তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে গেল না, বরং তার সন্ধিগ্ধ মনের কুটিল ভাবনা পাকাপোক্ত হলো। মেহেরের এই জটিল শারীরিক পরিবর্তন আর অসুস্থতার লক্ষণ দেখে সে নিশ্চিত হয়ে গেল যে, আরশিয়া অন্তঃসত্ত্বা। দ্রুত পায়ে সে বাকি পরিচারকদের কাছে গিয়ে এই খবর রসিয়ে রসিয়ে পরিবেশন করল।
শুরু হলো বিষাক্ত আলোচনা। রাফায় আমিন মারা গেছেন মাস দেড়েক হতে চলল। তাহলে এই সন্তান কার? সেই বৃষ্টির রাতে কেকের ঘরের দৃশ্য আর মেহেরের এই অসুস্থতা—সব মিলিয়ে দুইয়ে দুইয়ে চার মেলাতে দেরি করল না বাড়ির নিচুতলার মানুষগুলো।
দুই দিনের মাথায় খবরটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে, জাভিয়ানের কানে এল। জাভিয়ান নিজেও যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে একমুহূর্তও দেরি না করে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক নিয়ে এলো আরশিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য।
এদিকে আরশিয়া তখন এতটাই বেখেয়ালি আর মানসিক ভারসাম্যহীন যে, নিজের শরীর বা সম্মানের কোনো তোয়াক্কাই তার মাঝে ছিল না। চিকিৎসক পরীক্ষা শেষে যখন নিশ্চিত করলেন যে আরশিয়া মেহের সত্যিই অন্তঃসত্ত্বা, তখন জাভিয়ানের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার উপক্রম।
জাভিয়ানের সামনে তখন এক সুবিশাল পাহাড়সম সংকট। সমাজের উঁচু স্তরে কাহসান পরিবারের নামডাক আর প্রতিপত্তি ছিল আকাশছোঁয়া; সেই সুউচ্চ প্রাসাদ এক মুহূর্তের অসতর্কতায় তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার উপক্রম হলো। জাভিয়ান খুব ভালো করেই জানত, সমাজের চোখে সদ্য বিধবা আরশিয়া মেহেরের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবরটি কোনো স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে সমাদৃত হবে না।
চারপাশের মানুষের নোংরা কৌতূহল আর সন্দেহ আরশিয়াকে নয়, বরং সরাসরি বিদ্ধ করবে এই বাড়ির বর্তমান মালিক তথা কাশিফ কাহসানকে। লোকে দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে নেবে যে, স্বামীহারা নিঃসঙ্গ মেহের আর বখে যাওয়া মদ্যপ কেকে এক নিষিদ্ধ মোহে জড়িয়ে পড়েছে।
আর এই অপবাদ শুধু পারিবারিক কলঙ্ক বয়ে আনবে না, বরং ধুলোয় মিশিয়ে দেবে তিল তিল করে গড়ে ওঠা কাহসান ইন্ডাস্ট্রিকেও। আর যদি এমনটাই হয় তবে, শাহমীরকে সরিয়ে লাভটাই বা কি হলো—যদি না সে নিজে এইসব ভোগ করতে পারে!
কিন্তু এই সংকটের আড়ালে জাভিয়ানের নিজস্ব এক স্বার্থের অঙ্ক কষা ছিল। শাহমীর কাহসানের উইল অনুযায়ী বংশপরম্পরায় এই বিপুল সম্পত্তি আর ক্ষমতার পূর্ণ অধিকার কেবল কেকের। কেকে যদি জীবিত থাকে, তবে অন্য কারো পক্ষে এই সাম্রাজ্য ভোগদখল করা আইনিভাবে অসম্ভব। এবং কেকে’র মৃত্যুর পর এই সম্পত্তি তার ভবিষ্যৎ সন্তানরা পাবে। আর যদি এমনটা না হয় তবে পুরো সম্পত্তি সরকারি ভাবে দান-ক্ষেত্রে চলে যাবে। যে কারণে শাহমীরের মতো কেকে’কেও দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার মতো ভাবনা জাভিয়ান কল্পনাতেও ভাবতে পারছে না। কিন্তু এসব ব্যতীতও এই সম্পত্তির ভাগীদার হওয়ার কেবল একটিই চোরা গলি ছিল—যদি কেকে তার সহধর্মিণীকে এই সম্পত্তির মালিকানা লিখে দেয়।
অর্থাৎ, এই বিশাল সাম্রাজ্যের চাবিকাঠি নিজের কবজায় নিতে হলে জাভিয়ানের এমন এক সুনিপুণ চালের প্রয়োজন ছিল, যেখানে সাপও মরবে আবার লাঠিও ভাঙবে না। কেকের মতো একজন নেশাগ্রস্ত যুবককে এই বিপুল সম্পত্তির হিসাব রাখা বা ব্যবসা সামলানোর যোগ্য করে তোলা সম্ভব নয়। কারণ কেকে যোগ্য হয়ে উঠলে,সে এসব নিশ্চিন্তে ভোগ করবে কিভাবে? ঘুরেফিরে বাপের মতো ছেলেরেও কামলা খাটতে হবে।
তাই জাভিয়ান চাচ্ছিল এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করতে, যেখানে কেকে-র ওপর নিয়ন্ত্রণও থাকবে আবার আইনি মারপ্যাঁচে সম্পত্তির দখলও নিশ্চিত হবে। আর আরশিয়া মেহেরের এই আকস্মিক গর্ভাবস্থা আর তাকে কেন্দ্র করে রটা কলঙ্ক যেন জাভিয়ানের হাতে এক অব্যর্থ অস্ত্র তুলে দিল।
জাভিয়ান বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে যদি আরশিয়া আর কেকে-র ওপর এই সম্পর্কের দায়ভার চাপিয়ে দেওয়া যায়, তবে একদিকে যেমন মেহেরের অনাগত সন্তানের সামাজিক স্বীকৃতি মিলবে, অন্যদিকে কেকে-র সাথে মেহেরের এক বৈধ সম্পর্কের দোহাই দিয়ে সম্পত্তির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতের মুঠোয় আনা সম্ভব হবে। জাভিয়ান ঠান্ডা মাথায় নিজের পরিকল্পনা সাজাতে লাগল, যেখানে শোকাতুর মেহের আর নেশাগ্রস্ত কেকে হবে কেবল তার হাতের পুতুল।
এদিকে ক্রমশই এসব নোংরা অপবাদ বিষাক্ত বাষ্পের ন্যায় সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ছে। অন্যদিকে আরশিয়া যেন ততই ভঙ্গুরে পরিণত হচ্ছে। তার চারপাশের চেনা জগৎটা মুহূর্তেই অচেনা আর বিভীষিকাময় হয়ে উঠল। বাড়ির পরিচারকদের সেই অভ্যস্ত বাঁকা চাউনি, আড়ালে করা ঘৃণ্য ফিসফিসানি আর অবজ্ঞার হাসি তার কানে এসে বিঁধলেও সে যেন তখন সব অনুভূতির ঊর্ধ্বে।
তার চেতনার জগত তখন অসাড়; নিজের শরীরের ভেতর বেড়ে ওঠা অকালজাত প্রাণ আর মৃত স্বামীর স্মৃতি—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে সে তখন এক অতীন্দ্রিয় শূন্যতায় বাস করছে।
কিন্তু সেই গুমোট নিস্তব্ধতাও বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। এক রাতে পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটল। এলাকার একাংশ বিশাল উত্তপ্ত জনতা তীব্র ক্ষোভ নিয়ে কাহসান কুঞ্জে এসে জড়ো হলো। তাদের দাবি ছিল স্পষ্ট এবং অত্যন্ত নিষ্ঠুর।
আসলে এই জনরোষের পেছনে বারুদ ছিটিয়ে দিয়েছিল স্বয়ং কেকে। দিন দুয়েক আগে নেশার চরম পর্যায়ে থাকা অবস্থায় এলাকার এক ব্যক্তি তাকে আরশিয়া মেহেরের সাথে তার সম্পর্ক নিয়ে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছিল। কেকে তখন এমনিতেই অনিয়ন্ত্রিত এবং উগ্র। যার ফলে সে হিতাহিতজ্ঞান হারিয়ে লোকটিকে পশুর মতো পিটিয়ে আধমরা করে ফেলে।
এই ঘটনাই যেন বারুদে আগুনের স্ফুলিঙ্গ হিসেবে কাজ করল। উত্তেজিত জনতা এটাকে কেবল একটি মারপিটের ঘটনা হিসেবে দেখল না; তারা প্রচার করল যে নিজের নোংরা পাপ ঢাকতেই কেকে এভাবে হিং”স্র হয়ে উঠেছে।
পরিস্থিতির জটিলতা তখন চরমে। লোকজনের মুখে মুখে একটাই দাবি—কাহসান কুঞ্জের এই পাপাচার বন্ধ করতে হবে। ভিড়ের মাঝখান থেকে শোনা যাচ্ছিল উত্তপ্ত জনতার হুংকার,
“এই সমাজে এমন নিষিদ্ধ সম্পর্ক চলতে দেওয়া যাবে না। একজন সদ্য বিধবা নারী কীভাবে একই বাড়ির এক মদ্যপ যুবকের সাথে এমন নির্লজ্জতায় মেতে ওঠে? এর বিচার চাই!”
জনতার ক্ষোভ এতটাই তীব্র ছিল যে, তারা বাড়ির ফটক ভেঙে ভেতরে প্রবেশের উপক্রম করল। জাভিয়ান বাইরে এসে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও কেউ তার কথা কানে তুলছিল না। বরং তাদের দাবি আরও ভয়ংকর রূপ নিল। তারা চিৎকার করে বলতে লাগল,
“আড়ালে লুকিয়ে থাকলে চলবে না! ওই কলঙ্কিনীকে বাইরে নিয়ে আসুন। আমরা তার মুখ থেকে জবাব শুনতে চাই।”
লোকজনের চাপে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে, আরশিয়াকে ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বাড়ির মাধ্যিখানে সকলের মাঝে নিয়ে আসা হলো।
একদিকে অন্ধকার রাত, অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক মানুষের ঘৃণায় ভরা দৃষ্টি। বিধ্বস্ত আরশিয়া তখন নিজের শরীরের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ পাচ্ছিল না। তাকে ঘিরে রাখা জনতা বিচারকের আসনে বসে একে একে তাকে লক্ষ্য করে নানান বিষবাক্য ছুড়তে লাগল।
—“বলুন, এই বাচ্চার বাবা কে? কাশিফের সাথে আপনার কী সম্পর্ক? শোকের নাটক করে রাতের অন্ধকারে আপনারা এই নোংরামো চালিয়েছেন?”
জনতা দাবি তুলল যে, আরশিয়াকে কেবল ক্ষমা চাইলেই হবে না, এই অবৈধ সম্পর্কের দায় তাকে স্বীকার করতে হবে।
আরশিয়া মেহের হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে ফ্যালফ্যাল করে সকলের দিকে তাকিয়ে রইল। যে মাতৃত্ব তার গর্ব হওয়ার কথা ছিল, তা কীভাবে এক রাতের ব্যবধানে সমাজের চোখে সবচেয়ে বড় অপরাধে পরিণত হলো, সেই হিসাব মেলানোর মতো শক্তিও তার ছিল না। ভিড়ের ভেতর থেকে কেউ একজন চিৎকার করে উঠল,
“যদি কেকে এর দায় না নেয়, তবে এই নষ্টা নারীকে সমাজ থেকে বিতাড়িত করতে হবে!”
তখন পরিস্থিতি সামলাতে জাভিয়ানকে এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। সমাজের দাবি ছিল, এই কেকে আর আরশিয়ার সম্পর্কটাকে স্পষ্ট করে সমাজের কাছে তুলে ধরা। নয়তো এই সমাজে এইধরনের কোনো নিষিদ্ধ সম্পর্ক গড়ে ওঠা সম্ভব না। আর এই ধারণার কারণে রীতিমতো কাহসানদের নাম খারাপ হচ্ছিল। আর তখন সেই রাতেই জাভিয়ান ঘোষণা দিয়ে দেয় যে, ‘আরশিয়া আর কেকের মাঝে কোনো নিষিদ্ধ সম্পর্ক নেই। বরং তাদের সম্পর্কটা বৈধ। কেননা কেকে আর আরশিয়ার বিয়ে হয়ে গিয়েছে আর তারা স্বামী-স্ত্রী।’
সে রাতে সম্পর্কের ওপর কোন কলঙ্ক লেগে গেল তা হয়তো মাতাল কেকে বুঝতেও পারেনি। কিন্তু আরশিয়া সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে গেল। জাভিয়ান তাকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে চুপ থাকতে বলল। নয়তো এই সমাজে তাদের সব নাম-সম্মান ধুলোয় মিশে যাবে। সমাজ কখনোই মানবে না যে, তার পেটের সন্তানটি মৃত রাফায় আমিনের। কারণ তাদের সব সন্দেহ এখন কেকে আর আরশিয়ার ওপরই স্থির হয়ে ছিল।
আরশিয়া এতো কিছু বুঝল না। সে ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত মানসিক রোগে আক্রান্ত হতে লাগল। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা যেতে পারে ক্যাটালিপটিক স্টুপর এর সাথে মিশ্রিত সাইকোটিক ডিপ্রেশন। এটি সাধারণ বিষণ্নতার চেয়েও অনেক বেশি ভয়”ঙ্কর।এই অবস্থায় রোগী নড়াচড়া করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা একভাবে বসে থাকে এবং বাস্তব জগত থেকে তার সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ ঘটে।
আর আরশিয়া মেহেরও নিজেকে হারিয়ে ফেলছিল এমন এক অন্ধকারে, যেখানে কোনো সম্পর্ক, কোনো বেদনা আর তাকে স্পর্শ করতে পারছিল না। তার কাছে মনে হতে লাগল, চারপাশে যা ঘটছে সবই অবাস্তব, নিজের অস্তিত্বই তার কাছে অর্থহীন হয়ে উঠল। হ্যালুসিনেশন আর ভ্রান্ত ধারণা তাকে এমনভাবে গ্রাস করল যে, পেটের সন্তান কিংবা পাশে থাকা সুহিন—কারো প্রতিই তার কোনো মমত্ববোধ অবশিষ্ট রইল না। সে নিজেকে গুটিয়ে নিল এক ঘোরলাগা আঁধারে, নিজের বিষণ্ণতা নিয়েই ঘরের কোণে দিনের পর দিন কাটিয়ে দিতে লাগল। বাইরের পৃথিবীর আলো-বাতাস সহ সবকিছুই তার কাছে অর্থহীন হয়ে গিয়েছিল।
এদিকে কেকে-কেও জাভিয়ানের আলাদা করে কিছু বোঝানোর প্রয়োজন পড়েনি। ততদিনে তার মন ও মস্তিষ্ক মারাত্মক সব ড্রাগ নিয়ন্ত্রণ করছিল। তার জগতটাও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ল কাহসান কুঞ্জের একটি ঘরের অন্ধকার কোণে, নেশার ঘোরে।
অতীতের এই ধূসর পাণ্ডুলিপির সীমাবদ্ধতা এখানেই হতে পারত, কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসে গল্পের বী”ভৎসতা কেবল ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। কাহসান কুঞ্জে’র প্রতিটি দেয়াল আজও হয়তো, কিছু পি”শাচের অট্টহাসিতে কেঁপে ওঠে। কেননা এর চেয়েও বিভ”ৎস ও নি”কৃষ্ট অতীত ঘুরে বেড়াচ্ছে অভিশপ্ত এই কাহসান কুঞ্জের অন্দর হতে বাহিরে।
সমাজে নতুন ও বিকৃত এক পরিচয় পেয়েও আরশিয়া মেহেরের মাঝে কোনো ভাবান্তর ঘটল না। সে তখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে, বাস্তব জগতের বাইরের কোনো এক জগতে বিচরণ করছে।
অন্যান্য দিনের মতোই আরশিয়া অন্ধকার ঘরের কোণে এক বিধ্বস্ত ছায়ার ন্যায় পড়ে আছে। অন্যদিকে গত কিছুদিন মায়ের এই অপ্রকৃতিস্থ আচরণ আর আকস্মিক চিৎকারে ছোট্ট সুহিনও এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে যে, সে মায়ের সাথে থাকতে আর সাহস পায় না। মূলত আরশিয়া নিজেও এখন তার পাশে কাউকে সহ্য করতে পারে না; এমনকি নিজের সন্তানকেও। অগত্যা ছোট্ট মনে বুকভরা অভিমান আর ভয় নিয়ে সুহিন বাড়ির অন্য প্রান্তের একাকী ঘরে থাকে শুরু করেছে।
অন্যদিকে কেকের অবস্থাও একপ্রকার যা-তা বিচ্ছিরি পর্যায়ে। অতিরিক্ত নেশার প্রভাবে শরীর ভেঙে পড়েছে তার; দুদিন আগেই রক্তবমি করে সে মৃত্যুর কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। এখন দিনের সিংহভাগ সময় সে কাঁচের মতো স্বচ্ছ নেশার তোপে অচৈতন্য হয়ে পড়ে থাকে। জেগে থাকলেও সেই ঘোর তাকে বাস্তব দুনিয়া থেকে যোজন যোজন দূরে সরিয়ে রাখে। সে বেঁচে আছে কি মরে গেছে, সেই খবর নেওয়ার মতো অনুভূতিও যেন কারো অবশিষ্ট নেই।
আর এই বিভীষিকাময় পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে চারটি বিকৃত মস্তিষ্ক এক বিন্দুতে মিলিত হয়ে এক কুপরিকল্পনা আঁটল। আরশিয়া মেহের—পারস্যের এক চমৎকার সুন্দরী রমণী। যার রূপ কোনো এক সাম্রাজ্যের রাণীর চেয়েও বোধহয় কোনো অংশে কম নয়। বয়সও খুব বেশি নয়।
যদিও শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অবক্ষয়ে সে এখন ম্রিয়মাণ, তবুও তার সেই বিধ্বস্ত রূপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা লাবণ্য আজও যে কোনো পুরুষের মনে কামনার ঝড় তোলার ক্ষমতা রাখে। আর এই আদিম লালসার নজরই পড়ল আব্বাস মির্জা আর আরিজ খন্দকারের।
আরিজের মনে রাফায় আমিনের প্রতি সেই চাপা ক্ষোভ তখনও কমেনি। রাফায় এখন পৃথিবীতে নেই। আর এই সুযোগে যদি তার সুন্দরী স্ত্রীর উপরও একটি ভালো সুযোগ নেওয়া যায়—নেই সুযোগ হাতছাড়া করার তো কোনো মানেই নেই।এভাবেই এই পৈশাচিক লালসায় যোগ দিল আব্বাস মির্জার ভাই আরশাদও।
অন্যদিকে জাভিয়ান শুরুতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছিল। সে আদতে কি করবে? আব্বাস মির্জার মতো প্রভাবশালী একজন মানুষ তার কাছে এমন এক ইচ্ছে পোষণ করেছে,যা সে পূরণ করতে পারলেও,মন পুরোপুরি সায় দিচ্ছে না। কিন্তু আব্বাসকে তো নিষেধও করতে পারবে না।
তবুও তার মনে কু ডাকছিল—আরশিয়া বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বা, এমন এক অবস্থায় এই নিকৃষ্ট ঘৃণিত কাজ করা কি আদৌ সম্ভব? কিন্তু ক্ষমতার লোভ আর নিজের অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার আকাঙ্ক্ষায় শেষমেশ তার শয়তানি সত্তাই জয়ী হলো। জাভিয়ানও যোগ দিল এই পিশাচদের দলে।
নিয়ম অনুযায়ী বৃহস্পতিবারের সেই রাতে বাড়ির অধিকাংশ সার্ভেন্ট সন্ধ্যা হওয়ার আগেই বিদায় নিয়েছে। জাভিয়ানের ইচ্ছেতে হাতেগোনা কয়েকজন অনুগত বডিগার্ড ছাড়া কাউকেই বাড়িতে রাখা হয়নি। কেকে তখন নেশার চরম ঘোরে নিজের বিছানায় পড়ে আছে। সুহিনও বাড়ির অন্য কোণে গভীর ঘুমে নিমগ্ন। পুরো বাড়িতে তখন স্তব্ধ নীরবতা। রাত ঠিক সাড়ে বারোটার সময় জাভিয়ানসহ আরো ৩ জন বিকৃত মানুষের ছায়া পড়ল অভিশপ্ত এই কাহসান কুঞ্জে।
জাভিয়ান ঠান্ডা মাথায় প্রথমেই গিয়ে কেকের ঘরের দরজাটি বাইরে থেকে আলগোছে আটকে দিল।যেন কোনো চিৎকারেও তার ঘোর না ভাঙে। একইভাবে সুহিনের ঘরের দরজাটাও বন্ধ করা হলো। জাভিয়ান তাদের সঙ্গীদের নিয়ে একে একে পা বাড়াল আরশিয়ার ঘরের দিকে।
আরশিয়া তখন অন্ধকার ঘরে, জোছনার আলোয় নিজ ঘরের কোণে বসে আছে। শূন্য দৃষ্টি তার দেয়ালের দিকে নিবদ্ধ। হাতে নিজের স্বামী-সন্তান সহ তিনজনে একটি ছবির ফ্রেম। দুনিয়াবি কোনো শব্দ বা উপস্থিতিই তখন আর তার চেতনার দরজায় করাঘাত করতে পারছিল না।
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের দরজায় মৃদু কড়া নাড়ার শব্দ হলো। জাভিয়ান অত্যন্ত সন্তর্পণে দরজায় টোকা দিল, কিন্তু আরশিয়ার সেই শব্দ শোনার মতো মানসিক অবস্থা ছিল না। সে নড়ল না, এমনকি চোখের পলকও ফেলল না। দরজাটি আগে থেকেই আলগাভাবে ভেড়ানো ছিল; জাভিয়ানের হাতের সামান্য একটু স্পর্শ পেতেই সেটি অবাধ্যের ন্যায় কর্কশ এক তীক্ষ্ণ শব্দ তুলে খুলে গেল। রাতের সেই নিস্তব্ধতায় দরজার কপাট খোলার সেই আওয়াজটাই যেন অশুভ এক সংকেত বয়ে আনল।
দরজাটা হাট হয়ে খুলে যেতেই বাইরের আবছা আলোয় চারজন মানুষের দীর্ঘ ছায়া ঘরের মেঝেতে লম্বা আকাড়ে আছড়ে পড়ল।দরজা খোলার শব্দে আরশিয়ার কিঞ্চিৎ হুঁশ ফিরল। সে অত্যন্ত ধীরলয়ে দরজার দিকে মুখ ফেরাল। দেখল দরজার সামনে চারজন মানুষ অদ্ভুত এক ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে।
দুজন শার্ট-প্যান্ট পরা, আর দুজন সফেদ সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত। জাভিয়ান ব্যতীত বাকি তিনজনকে সে চেনে না। আর সেই তিনজনের মুখেই এক কুৎসিত লালসার ছাপ ফুটে উঠেছে। কেবল জাভিয়ান কিছুটা চুপসে যাওয়া মুখে আরশিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।
Naar e Ishq part 20
দুনিয়াবি সব ধ্যানজ্ঞান হারিয়ে ফেলা আরশিয়া তখনও বুঝতে পারল না, এই অভিশপ্ত প্রাসাদে পূর্বের ঘটনাগুলোর মতো করেই, তার গল্পটাও কুৎসিত এক অতীতের ছায়ায় ঢাকা পড়তে চলেছে। মাঝরাতে তাদের আগমনের উদ্দেশ্যও সে উপলব্ধি করতে পারল না। ফলে আরশিয়া তার নিষ্প্রাণ ভাবনাহীন মনে, অত্যন্ত ক্ষীণ স্বরে জাভিয়ানের উদ্দেশ্যে অস্ফুটে আওড়ায়,
”জাভিয়ান ভাই!”
