ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১৬
মারিয়াম ফুল
“বেবির হার্টবিট… আমরা পাচ্ছি না!”“ডাক্তার, পেশেন্টের কন্ডিশন ক্রিটিক্যাল হয়ে যাচ্ছে!”
“ব্লিডিং কন্ট্রোল করা যাচ্ছে না!”
রুদ্র কতক্ষণ ব্রাঞ্চে বসে ছিল, আদিলের কল কেটে যাওয়ার পর তার ঠিক ধারণা নেই। সময়টা যেন থেমে গিয়েছিল চুপচাপ, ভারী, অস্বস্তিকর।
হঠাৎ করেই তার ভেতরে একটা অদ্ভুত টান অনুভব হলো। মনে হলো, আর বসে থাকা ঠিক না… মেহেরের কাছে যাওয়া দরকার, এখনই।
সে হন্তদন্ত হয়ে হাসপাতালের করিডোর দিয়ে ছুটছিল। যে পথ দিয়ে প্রেগন্যান্ট মহিলাদের আল্ট্রাসোনোগ্রাম করতে নেওয়া হয়, সেই পথটা পার হতেই রুদ্রর পা থমকে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে হাসপাতালের ভেতর থেকে হঠাৎ তীব্র দৌড়াদৌড়ির শব্দ ভেসে এলো।
“ডাক্তার, পেশেন্টের কন্ডিশন ক্রিটিক্যাল হয়ে যাচ্ছে!”
“ব্লিডিং কন্ট্রোল করা যাচ্ছে না!”
রুদ্রর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। শরীরের সবটুকু রক্ত যেন মাথায় চড়ে বসল। তার পা যেন আপনাআপনি সেই যন্ত্রণার শব্দের দিকে দৌড়াতে শুরু করল। একটি কেবিনের দরজার সামনে পৌঁছাতেই সে পাথর হয়ে গেল। দরজার ওপাশ থেকে ভেসে এলো এক নার্সের আতঙ্কিত কণ্ঠ—
“বেবির হার্টবিট… আমরা পাচ্ছি না!”
সময় যেন হঠাৎ থেমে গেল। রুদ্রর মনে হলো কোনো এক বিভীষিকাময় অতীত আবার তাকে পিছন থেকে খামচে ধরেছে। সে দরজার ভেতরে ঢোকার সাহস পেল না, ওখানেই থমকে দাঁড়িয়ে রইল। নিজের অজান্তেই সে বিকারগ্রস্তের মতো মাথা নেড়ে বলতে লাগল, “না, এটা সম্ভব নয়! না না… এরকম হতে পারে না!” তার এই অস্বাভাবিক আচরণ দেখে চারপাশের মানুষ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেও রুদ্রর সেদিকে খেয়াল ছিল না।
ঠিক তখনই পাশ থেকে একজন নার্স তাকে ডেকে উঠল,
“আপনি কি মিস্টার রুদ্র? ডাক্তার মৃদুলা আপনাকে ডাকছেন। প্লিজ, এদিকে আসুন।”
রুদ্র টলমল পায়ে সামনের দিকে পা বাড়াল। নার্স তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, “স্যার, ওই দিকে না। আপনার ওয়াইফ সেকেন্ড ফ্লোরে আছেন, সেখানে আসুন।”
রুদ্রর ঘোর তখনো কাটেনি। সে মনে করেছিল ওই ঘরটাতেই হয়তো মেহের আছে। ঘোরের মাথায় সে যখন ডাক্তার মৃদুলার চেম্বারে ঢুকল, সোজা গিয়ে ধপ করে চেয়ারে বসে পড়ল। তার চেহারা ফ্যাকাশে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। পাশে মেহের বসা ছিল, রুদ্রর এমন অবস্থা দেখে সে বেশ অবাক হলো।
রুদ্রর মুখ দিয়ে কথা সরছিল না, সে বিড়বিড় করে বলে উঠল, “ডাক্তার, বাচ্চার হার্টবিট? ডাক্তার… ইজ বেবি ওকে? আপনি কি বাচ্চার হার্টবিট শুনতে পাচ্ছেন?”
হাসি হেসে বললেন, “মিস্টার রুদ্র, শান্ত হোন। এই ভ্রূণটার বয়স মাত্র চার সপ্তাহ। এত অল্প সময়ে হার্টবিট আসে না, এটা তো আপনার জানার কথা।”
রুদ্রর সম্বিত ফিরল মেহেরের চোখের দিকে তাকিয়ে। তার মানে, ওই মৃত্যুশীতল আর্তনাদ মেহেরের জন্য ছিল না! সে অন্য কারো জীবনের হাহাকারকে নিজের বলে ভুল করেছিল। ডাক্তার মৃদুলা ফাইলটা বন্ধ করে হাসিমুখে বললেন,
“আসলে মিস্টার এবং মিসেস চৌধুরী, প্রথম রিপোর্টটা একটু গোলমেলে ছিল। যেহেতু খুব ছোট ভ্রূণ, তাই পাশে থাকা সামান্য রক্ত জমাট বা হেমাটোমা ওটাকে আড়াল করে রেখেছিল। এখন আমরা নিশ্চিত, স্যাকটা জরায়ুর একদম সঠিক জায়গাতেই আছে।”
রুদ্রর চোখে তখনো অবিশ্বাস্য এক দৃষ্টি। “কিন্তু ডাক্তার, টিউবে হওয়ার কথা ছিল না?”
মৃদুলা মাথা নেড়ে বললেন, “ওটা স্রেফ একটা আশঙ্কা ছিল। জরায়ুতে কিছু না দেখলেই ডাক্তাররা ওটা ধরে নেয়। বাচ্চার পজিশন একদম ঠিক আছে। তবে ওই রক্ত জমাটটার জন্য মেহেরকে খুব সাবধানে থাকতে হবে। ভয়ের কিছু নেই, সঠিক চিকিৎসা আর বিশ্রামে মা-বাচ্চা দুজনেই সুস্থ থাকবে।”
এরপর মেহেরের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “মেহের, আপনার এই দুর্বলতা আসলে অনিয়মিত খাওয়া আর মানসিক চাপের ফল। প্লিজ নিজের যত্ন নিন।” রুদ্রর দিকে ফিরে মৃদুলা এক – প্রকার দুষ্টুমি করে করলেন, “আপনাকে আর নতুন করে কী বলব? আপনি তো জান প্রাণ দিয়ে যত্ন নিচ্ছেন। ইউ আর লাকি মিসেস চৌধুরী..”
মেহের আর রুদ্র মুহূর্তের জন্য একে অপরের চোখের দিকে তাকাল। সেই চাহনিতে ছিল না কোনো স্বাভাবিকতা। ডাক্তার জানালেন, কাল সকালেই বাসায় যেতে পারবেন আপনারা।
পরের দিন সকাল। মেহের তখনো ওষুধের প্রভাবে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। রুদ্র একবার মেহেরের ম্লান মুখের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রুদ্রর জায়গায় অন্য কোনো কেউ হলে হয়তো মেহেরের চোখ মেলার জন্য অপেক্ষা করত, কিন্তু রুদ্রর পাথুরে হৃদয় তা করল না।
সে শুধু নার্সকে শুধু বলে গেল, “পার্কিং লটে ড্রাইভার আছে, ও যেন মেহেরকে নিয়ে বাসায় চলে যায়।”
রুদ্র অ্যাপার্টমেন্টে না গিয়ে সরাসরি এয়ারপোর্টের দিকে রওনা দিল। ড্রেসিংরুমের বড় আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে সে তার ধবধবে সাদা শার্টের হাতা গুটিয়ে নিল। ইউনিফর্মের নেভি ব্লু কোট আর সোনালী স্ট্রাইপগুলো তাকে এক অদ্ভুত গাম্ভীর্য দিচ্ছিল। আয়নার নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল, “শি ইজ রং….. দুনিয়াতে কোনো গড নেই। যা হয়েছে সব নিছকই বিজ্ঞান আর কাকতালীয় ব্যাপার।”
সে ককপিটে গিয়ে নিজের সিটে বসল। পাশে কো-পাইলট নিদিতা। গত তিন বছর ধরে এই মেয়েটি রুদ্রর প্রতি এক নিরব মায়া জমিয়ে রেখেছে। নিদিতার টানা টানা চোখে রুদ্রর জন্য আজ এক বিশেষ উদ্বেগ ছিল, কিন্তু রুদ্র বরাবরের মতোই তাকে কেবল সহকর্মী হিসেবে দেখে গেল।
এরপর এয়ারক্রাফটের স্পিকারে রুদ্রর সেই গম্ভীর আর গমগমে কণ্ঠস্বর ভেসে এল
“লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান, দিস ইজ ইয়োর ক্যাপ্টেন রাইহাম চৌধুরী রুদ্র স্পিকিং। আমরা এখন টেক-অফের জন্য প্রস্তুত। আবহাওয়া কিছুটা প্রতিকূল হতে পারে, তাই দয়া করে সিটবেল্ট বেঁধে রাখুন। আমাদের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।”
আজ মেহেরের হাসপাতাল থেকে ফেরার ১২ দিন হয়ে গেছে। মেহের ভেবেছিল রুদ্র হয়তো বিল পে না করেই চলে -গেছে । কিন্তু যখন সে নিজের জমানো টাকা থেকে বিল মেটাতে ক্যাশ কাউন্টারে গেল, তখন শুনল রুদ্র সব পেমেন্ট আগেভাগেই নগদে মিটিয়ে দিয়েছিল।
মেহের বারান্দার ইজি চেয়ারে বসে বাইরের ধূসর আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ মেঘলার কল এল। মেঘলা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “মেহের, তুই ভালো আছিস তো ?”
মেহেরের মনে হলো তার ঘায়ে কেউ নতুন করে নুন ছিটিয়ে দিল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধু বলল, “হুম।” সায়েদ বাড়ির মানুষগুলোর প্রতি তার মনে এতটাই ঘৃণা জমে আছে যে, সে আর বাড়িয়ে কিছু জিজ্ঞেস করল না। মেঘলা বুঝতে পেরেও কিছু বলল না। মেঘলা আবার প্রশ্ন করল, “রাইহাম চৌধুরী কি কিছু জানেন?”
মেহের শান্ত কিন্তু তীক্ষ্ণ গলায় উত্তর দিল, “হ্যাঁ, সব জানে সে। মেঘলা প্রতিউত্তরে শুধু একটাই প্রশ্ন করছিল,
“সে কেমন …?”
মেহের আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। এতক্ষণ জমে থাকা কান্নার বাঁধটা হঠাৎ করেই ভেঙে গেল। সে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে একনিশ্বাসে বলতে লাগল…
“তার ব্যবহার জঘন্য। সে মেয়েদের সাথে কথা বলার নূন্যতম আদব জানে না। ওর কোনো বোধ নেই। কেউ কতটুকু বদনসিব হলে উনার মতো মানুষকে স্বামী হিসেবে পায়..”
মেঘলা ওপাশ থেকে চমকে উঠল। সে বুঝতে পারল মেহেরের ভেতরটা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। “তাহলে তুই আছিস কীভাবে ওর সাথে? ও তোকে কিছু বলেনি?”
মেহের শুকনো হাসল। “না, কিছু বলেনি। আমি তাকে স্বামী মানি না। আমাদের মাঝে মাত্র ৬ মাসের ডিল। এই বিয়েটা স্রেফ একটা চুক্তি।”
মেঘলা যখন কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই ওপাশ থেকে সায়েদ মির্জার কর্কশ কণ্ঠস্বর ভেসে এল। মেঘলা ভয়ে তড়িঘড়ি করে ফোনটা কেটে দিল। মেহের রকিং চেয়ারে মাথা এলিয়ে দিয়ে নিজের ভাগ্যের ওপর হাসল। যদি সে সত্যিই রুদ্রর স্ত্রী হতো, তবে কি রুদ্র তাকে ওই মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে একা ফেলে উধাও হতে পারত? মেহের নিজেকেই ধমক দিয়ে বলল “না, আমি ওর কেউ নই। আমরা জাস্ট দুটো আলাদা জগতের মানুষ যারা এক জায়গায় বন্দি।”
ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ১৫
এই ১২ দিনে তাদের মধ্যে একবারও কোনো কথা বা যোগাযোগ হয়নি। লকডাউন প্রথমে এক সপ্তাহের জন্য হলেও এখন তা অনির্দিষ্টকালের দিকে যাচ্ছে। রুদ্রর মা-বাবা সিলেট থেকে ফোনে রুদ্রকে অনেক শাসন করেছেন মেহেরকে একা রেখে যাওয়ার জন্য। রুদ্র অবশ্য মেহেরের জন্য সব ব্যবস্থা নিখুঁত করে রেখেছে। একজন গৃহকর্মী প্রতিদিন এসে খাবার রান্না করে দিয়ে যায়। মেহেরকে নখ নাড়াতে হয় না ঠিকই, কিন্তু এই নিঃশব্দ ঘরে একাকীত্ব যেন তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
