Home ক্যাপ্টেন সাহেব ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩১

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩১

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩১
মারিয়াম ফুল

সকাল সাতটা বেজে দশ মিনিট। রুদ্র লিভিং রুমে ফিরে এসে বারান্দার স্লাইডিং ডোরটা খুলে বেড়ালটাকে বাইরে ছেড়ে দিল। ঘাড়ের খাঁজে ব্যথাটা তখনো চিনচিন করে জানান দিচ্ছে নিজের উপস্থিতি। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের ঠোঁটের কোণটা খুঁটিয়ে দেখল—
সেখানে জমাট বাঁধা রক্তের একটা কালচে দাগ। কাল রাতের রিংয়ে জিশানের পাঞ্চটা বেশ জুতসই লেগেছিল। তবে রুদ্রর নিজের ভেতরের যে তীব্র অস্থিরতা আর আক্রোশ ছিল, সেটা যেন ওই রিংয়ের ঘাম, ক্লান্তি আর রক্তেই ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেছে।
সে আলমারি থেকে একটা সাদা টি-শার্ট বের করে গায়ে গলিয়ে নিল। আজ আয়নায় নিজের মুখোমুখি হতেই তার চোখেমুখে এক অদ্ভুত, অচেনা প্রশান্তি ধরা পড়ল। মেহেরের গায়ের তপ্ত জ্বরটা শেষমেশ কমেছে, ভোরের দিকে শরীরটা জুড়িয়ে এসেছে তার এই একটা খবরই যেন রুদ্রর জন্য গত চব্বিশ ঘণ্টার সবচেয়ে বড় স্বস্তি।

যদিও এই স্বস্তিটুকু অনুভব করতেই পরক্ষণে নিজের ওপর এক তীব্র বিরক্তিতে রুদ্রর কপাল কুঁচকে উঠল। সে আয়না থেকে চোখ সরিয়ে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। কেন সে মেহেরকে নিয়ে এতটা ভাবছে? কেন তার অবচেতন মন মেহেরের সুস্থতায় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছে?
তার কাছে তো এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। এর আগেও সে কত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে, কত বিপদগ্রস্ত মানুষকে বাঁচিয়েছে। কোনো ব্যক্তিগত অনুভূতির টানে নয়, স্রেফ নিজের মনুষ্যত্বের তাগিদে। আজ মেহেরের জায়গায় অন্য যে কোনো চেনা-অচেনা মানুষ থাকলেও সে ঠিক এই একই কাজ করত। সারারাত জেগে কপালে জলপট্টি দিত। এখানে মেহের বলে আলাদা কোনো বিশেষত্ব নেই, থাকার প্রশ্নই ওঠে না…রুদ্র নিজেকে নিজে বোঝানোর চেষ্টা করল, কিন্তু মেহেরের সেই ফ্যাকাশে, অসহায় মুখটার স্মৃতি মগজ থেকে কিছুতেই সরছিল না। নিজের ভেতরের এই অবাধ্য চিন্তাভাবনার ওপর মেহেরের প্রতি এক রাশ বিরক্তি দানা বাঁধল তার। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল।
কিছুক্ষণ পর—

রুদ্র কিচেনের দিকে পা বাড়াচ্ছিল এক মগ কড়া কফি বানাবে বলে, ঠিক তখনই মেহের নিজের ঘরের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলো।
মেহের দরজার চৌকাঠে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল। গায়ের জ্বরটা এখন আর নেই ঠিকই, তবে নিস্তেজ শরীরটা এখনো বড্ড দুর্বল, বড্ড ভারী। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই সে থমকে গেল। কিচেন কাউন্টারের সামনে রুদ্রকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার অবশ মগজে গত রাতের আবছা, বিচ্ছিন্ন কিছু স্মৃতি ভিড় করার চেষ্টা করল।
মেহেরের স্পষ্ট মনে আছে, মাঝরাতে যখন তার শরীরটা আগুনে পুড়ছিল, হাড়ের ভেতর পর্যন্ত কাঁপন ধরেছিল তখন কেউ একজন পরম মমতায়, ভীষণ সাবধানে তার কপালে শীতল ছোঁয়া দিচ্ছিল। সেই স্পর্শটা ছিল চেনা, তীব্র এক সুরক্ষায় মোড়ানো। কিন্তু সেটা কি রুদ্র ছিল? নাকি শুধুই তার নিঃসঙ্গ মনের কোনো বিভ্রম?

রুদ্র কফির মগে একটা ছোট চুমুক দিয়ে আড়চোখে মেহেরকে একবার দেখে নিল। তারপর ঠোঁটের কোণে সেই চিরচেনা, বাঁকা হাসিটা ঝুলিয়ে বলল,
“কী ব্যাপার? ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই কি ভূত দেখলে নাকি? নাকি আমার মতো হ্যান্ডসাম পুরুষকে সকাল সকাল এভাবে দেখে নিজেকে দমাতে পারছ না?”
মেহের রুদ্রর দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলল, “অসভ্য”
রুদ্রর টিপ্পনিটা মেহেরকে ভেতরে ভেতরে বিরক্ত করলেও, সে নিজের কৌতূহল চেপে রাখতে পারল না। রুদ্রর এই খোঁচাটা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করার ভান করে দেয়াল ধরে ধীর, কাঁপাকাঁপা পায়ে সে কয়েক কদম এগিয়ে এলো। তার কণ্ঠস্বর ভাঙা, ভেতরে একটা গভীর দ্বিধার কম্পন,
“কাল রাতে… আপনি কি আমার ঘরে গিয়েছিলেন?”
রুদ্রর কফির মগটা ঠোঁটের খুব কাছে গিয়েও এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে সরাসরি মেহেরের চোখের দিকে তাকাল, চোখের মণি দুটো স্থির। কিন্তু পরক্ষণেই অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে দৃষ্টি সরিয়ে নিল সে। গলায় একরাশ নির্লিপ্ততা ঢেলে বলল,

“আমি? আপনার রুমে? মিস অ্যারোফোবিয়া, এটা আমার ফ্ল্যাট, ভুলে গেলেন নাকি? হ্যাঁ, আমাকে হাজব্যান্ড হিসেবে মানলে অবশ্য এটা আপনারও হতে পারত। তাহলে কি মনে মনে আমাকে সত্যিই স্বামী হিসেবে মেনে নিয়েছেন? কেউ একজন তো বুক ফুলিয়ে বলেছিল, আমাকে ভালোবাসা তো দূরের কথা, স্বামী হিসেবে সে কোনোদিনও আমাকে মানতে পারবে না ”
রুদ্রর শেষের এই বিষাক্ত খোঁচাটা মেহেরের কপালে হালকা ভাঁজ ফেলল। তার ভেতরের সুপ্ত জেদ আর আত্মসম্মান যেন পলকে জেগে উঠল। মেহের চোখ দুটো সরু করে গম্ভীর, অনমনীয় স্বরে বলল, “আমার খুব ভালো করেই মনে আছে এটা একটা ডিল, জাস্ট মাত্র একটা ডিল, পঁয়ষট্টি পার্সেন্ট সম্পত্তির ডিল। আমি কেন ভুলে যাব? উল্টো আপনি যাতে ভুলে না যান, নিজের সীমার মধ্যে থাকুন, ………”
মেহেরের মুখে সম্পত্তির হিসেব আর এই আকস্মিক পাল্টা আঘাত শুনে রুদ্রর ঠোঁটের কোণের বাঁকা হাসিটা আরও চওড়া হলো। সে এক কদম এগিয়ে এসে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,

“ওহ আচ্ছা! তা কী করেছি আমি তোমার সাথে? সীমা তো তুমি লঙ্ঘন করছ সকাল সকাল আমার সামনে এসে ……..”
রুদ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের ভেতরের চড়ে যাওয়া রাগটা সামাল দিল। মগটা হাতে নিয়ে হালকা ঘুরিয়ে মেহেরের দিকে তাকাল সে। অত্যন্ত অবহেলার ভঙ্গিতে কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে বলল,
“আমার কি খেয়েদেয়ে কোনো কাজ নেই যে মাঝরাতে মানুষের ঘরে গিয়ে পাহারা দেব? আমি তো পাশের রুমে এসি ছেড়ে অঘোরে ঘুমাচ্ছিলাম। কেন বলো তো? রাতে কি স্বপ্নের ঘোরেও আমাকে দেখতে শুরু করেছ নাকি?”
মেহেরের চোখে ক্ষণিকের জন্য বিষাদ আর বিভ্রান্তি ফুটে উঠল। রুদ্র তার দিকে একপলক তাকিয়ে মগটা কাউন্টারে রাখল। তারপর অত্যন্ত উদাসীন স্বরে বলল, “যাই হোক, তোমার সাথে সকাল সকাল এই ফালতু ঝগড়া করার মুড একদম নেই আমার।মা ডাক্তারকে ফোন করেছিল। আধঘণ্টার মধ্যে উনি চলে আসবেন। তখন যেন আবার ন্যাকামি করে বলতে যেও না যে তুমি একদম ঠিক আছ। জেলের ভাত খেয়ে এমনিতেই কঙ্কাল হয়ে গেছ, তার ওপর আবার এই হাই ফিভার…… চৌধুরী বাড়ির বদনাম হয়ে যাবে। লোকে বাইরে বলবে ক্যাপ্টেন সাহেব নিজের বউকে দু’বেলা খেতে দেয় না
মেহের রুদ্রর এই অপমানজনক কথার পিঠে তীব্র কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু ঠিক তখনই ফ্ল্যাটের কলিং বেলটা কর্কশ শব্দে বেজে উঠল। রেহানা চৌধুরী নিজের ঘর থেকে তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে এলেন।

“তাতিন, দেখ তো বাবা, ডাক্তার সাবিনা এলেন বোধহয়। মেহের, তুমি এখানে বসে কেন মা? ঘরে চলো।” মেহেরকে সঙ্গে করে রেহানা চৌধুরী ধীর পায়ে নিজের কক্ষের দিকে এগিয়ে গেলেন…
ডাক্তার আসার পর মেহেরকে বেশ সময় নিয়ে চেকআপ করলেন। স্টেথোস্কোপটা সরিয়ে নিয়ে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, “রক্তচাপ বেশ কম, আর অ্যানিমিয়াও আছে ভালো রকম।” তিনি প্রেসক্রিপশনে কিছু আয়রন সাপ্লিমেন্ট আর কড়া একটা ডায়েট চার্ট লিখে দিলেন। যাওয়ার সময় তিনি রুদ্রর দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বললেন,

“মিস্টার রুদ্র, পেশেন্টের মেন্টাল স্টেট কিন্তু একদমই স্টেবল নয়। দীর্ঘদিনের আইসোলেশন আর পুরোনো ট্রমা থেকে ওঁর মধ্যে হ্যালুসিনেশন বা হুট করে অ্যাংজাইটি অ্যাটাক হতে পারে। ওনাকে একদম একা রাখবেন না সবসময় একটা হাসিখুশি পরিবেশের মধ্যে রাখার চেষ্টা করবেন।”
ডাক্তার চলে যাওয়ার পর লিভিং রুমে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এলো। রেহানা চৌধুরী গভীর দুশ্চিন্তায় কপাল কুঁচকে রুদ্রর দিকে তাকালেন, কিন্তু রুদ্র বাহানা দেখিয়ে ওখান থেকে উঠে গেল। সে এসে বসল বারান্দার একটা চেয়ারে। বাইরে তাকালে নিস্তব্ধ, কোনো মানুষ নেই চারপাশ লকডাউনের কারণে, রুদ্র তখন বারান্দার গ্রিল ধরে বাইরের শূন্য নিস্তেজ রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল। তার কানে ডাক্তারের শেষ কথাগুলো বারবার হাতুড়ির মতো বাজছিল ‘ওনাকে একা রাখবেন না।’

দুপুরের কড়া আলোটা ঘরের কোণে এসে পড়েছে, কিন্তু অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরের স্তব্ধতা যেন কাটছেই না। দুপুরে খাওয়ার পর রেহানা চৌধুরী মেহেরকে জোর করে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে নিজের ঘরে গেছেন একটু বিশ্রাম নিতে। পুরো ফ্ল্যাটে তখন এক নিঝুম, দমবন্ধ করা নীরবতা। রুদ্রর ঘর থেকেও কোনো সাড়াশব্দ আসছে না।
মেহেরের ঘুম ঠিকমতো লাগেনি। সে বিছানায় শুয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। একটা তপ্ত হাওয়া এসে ঘরের পর্দাটাকে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। পাশ ফিরতে গিয়েই হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল বেডের পাশের সাইড টেবিলে। একটা মগ, আর তার পাশে পড়ে আছে নিংড়ে রাখা একটা সাদা তোয়ালে। পানি শুকিয়ে তোয়ালের কাপড়টা এখন কেমন শক্ত, খসখসে হয়ে গেছে।

মুহূর্তেই মেহেরের বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠল। তার মানে রাতে….ক্যাপ্টেন সাহেব এখানে ছিল? কোনো বিভ্রম ছিল না….ক্যাপ্টেন সাহেব তাহলে সত্যিই এই ঘরে এসেছিলেন? সকালে সে যা বললেন, সব মিথ্যা…
ভাবতেই এক অদ্ভুত, তীব্র অস্বস্তি মেহেরের গলার কাছে দলা পাকিয়ে উঠল। রুদ্র তো তার কাছে একজন পরপুরুষ,আইনি কাগজের একটা সই ছাড়া তাদের মাঝে তো কোনো আত্মিক বন্ধন নেই। তবে কোন অধিকারে, কার অনুমতিতে সে সারারাত এই ঘরের একাকীত্বে ভাগ বসাল? মেহেরের মনে হলো, তার ব্যক্তিগত সীমানায় কেউ যেন জোর করে ঢুকে পড়েছে। কৃতজ্ঞতার চেয়েও এক তীব্র, আত্মরক্ষামূলক ক্ষোভ তার ভেতরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
ঠিক তখনই, ঘরের এক কোণে রাখা ড্রেসিং টেবিলের ঝাপসা আয়নাটার দিকে চোখ পড়তেই মেহের শিউরে উঠল। পারদের ওপাশ থেকে একটা চেনা অবয়ব যেন তাকে দেখে উপহাসের হাসি হাসছে। অন্তু? অন্তু কি আবার ফিরে এলো?

মেহের দুই হাতে নিজের কান চেপে ধরল। তার হাত-পা কাঁপতে শুরু করল। সে চোখ বন্ধ করে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল….ওটা কেউ নয়, ওটা শুধুই তার মস্তিষ্কের কল্পনা।
কিন্তু বাতাসের সামান্য শোঁ শোঁ শব্দটাও এখন তার কাছে পুরোনো কোনো আর্তনাদের মতো ঠেকল।
মেহের আর সহ্য করতে পারল না। এই বন্ধ ঘরটা যেন তাকে গ্রাস করতে আসছিল। সে বিছানা থেকে নেমে একপ্রকার মরিয়া হয়ে প্রায় ছুটে বেরিয়ে এলো ড্রয়িংরুমে। তার শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হচ্ছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সারা অ্যাপার্টমেন্টে কেউ কোথাও নেই। শুধু রুদ্রর ঘরের দরজাটা আধখোলা।
মেহের কাঁপতে কাঁপতে রুদ্রর ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দেখল, রুদ্র বিছানায় ল্যাপটপ কোলে নিয়ে বসে আছে, কানে হেডফোন। অফিশিয়াল কোনো কাজে সে এতটাই মগ্ন যে বাইরের পৃথিবীর কোনো খেয়াল নেই তার।

মেহের দরজার পাল্লায় শক্ত করে একটা টোকা দিল।
শব্দটা হতেই রুদ্র হেডফোনটা টেনে নামাল। মেহেরের উষ্কখুষ্ক ঠোঁট আর চোখের ভেতরের তীব্র আতঙ্ক দেখে রুদ্রর ল্যাপটপ বন্ধ করতে এক সেকেন্ডও লাগল না। সে তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়িয়ে মেহেরের দিকে এগিয়ে এলো। তার কণ্ঠস্বর অবলীলায় নরম হয়ে গেল,
“কী হয়েছে? আবার শরীর খারাপ লাগছে? ডাক্তার তো বলল—”
“আপনি কাল রাতে আমার ঘরে ছিলেন?” মেহেরের কণ্ঠস্বর কাঁপছিল, কিন্তু তাতে ছিল তীব্র ধার।
রুদ্র থমকে গেল।মেহের আর তখন নিজের মাঝে ছিল না… এক অদ্ভুত ঘোর আর তীব্র আবেগের তাড়নায় সে এমন কিছু করে বা বলে বসেছিল, যা সাধারণ পরিস্থিতিতে সে কখনোই করত না।
“অনুমতি ছাড়া আমার ঘরে ঢোকার, আমাকে স্পর্শ করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?”
মেহেরের চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে, “সকালে অত নাটক করার কী দরকার ছিল? কেন বললেন আপনি যাননি? ওই সাইড টেবিলের মগ আর তোয়ালে কি আকাশ থেকে উড়ে এসেছে? কেন মিথ্যা বললেন?”
মেহের যেন এক আহত বাঘিনীর মতো সমস্ত শক্তি দিয়ে রুদ্রর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল যেন।
মেহেরের এই আকস্মিক আক্রমণ রুদ্রর ভেতরের পুরুষালি অহংকারে গিয়ে আঘাত করল। যে মানুষটা নিজের হাতের ক্ষত, ব্যথা উপেক্ষা করে সারারাত একটা মেয়ের কপালে জলপটি দিয়েছে, সে এই প্রতিদান আশা করেনি। রুদ্রর চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। চোখের নরম ভাবটা পলকে উধাও হয়ে সেখানে জায়গা করে নিল এক হিমশীতল ক্রোধ।

সে মেহেরের ঠিক এক কদম সামনে এসে দাঁড়াল। রুদ্রর দীর্ঘ দেহের ছায়া মেহেরকে পুরোপুরি ঢেকে দিল। অবদমিত ক্রোধে রুদ্রের চোয়াল জোড়া শক্ত হয়ে গেল, দাঁতগুলো চেপে বসল পরস্পরের ওপর। তার কপাল আর হাতের টানটান হয়ে যাওয়া শিরাগুলোই চিৎকার করে বলে দিচ্ছে—তার ভেতরের রাগের পারদ কতটা বিপজ্জনক সীমানায় পৌঁছেছে।
“কার অ্যাপার্টমেন্টে দাঁড়িয়ে গলা তুলছ, মেহের? মনে করিয়ে দিতে হবে?”
মেহের এক পা পেছাতে চাইল, কিন্তু রুদ্র তাকে সেই সুযোগ দিল না। সে আরও এক ধাপ এগিয়ে এসে বলল,
“তোমার জন্য আমার অ্যাপার্টমেন্টে আজকে পুলিশ পাহারা দিচ্ছে। তোমার জন্য ন্যাশনাল টেলিভিশনে প্রথমবার আমার বাবার নাম বাজেভাবে উপস্থাপন হয়েছে… আজকে আমার ফ্যামিলি উপহাসের পাত্র হয়েছে তোমার জন্য… তোমার জন্য আমার ফ্যামিলি কী না করেছে! আর তুমি আমার ঘরে এসে আমাকে ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট দিচ্ছ? কী ভাবো নিজেকে? তুমি একাই দুনিয়ায় ধোয়া তুলসী পাতা, আর বাকি সবাই খারাপ?”

মেহেরের চোখ টলমল করে উঠল। রুদ্র যা বলছে তা-তো মিথ্যে কিছু নেই, রুদ্র তো একদম সত্যি কথাই বলছে। রুদ্রর এই তীব্র চাউনি আর নির্মম সত্যের আঘাত সইতে না পেরে মেহেরের ভেতরের সমস্ত রাগ যেন এক সেকেন্ডে জল হয়ে গেল। হঠাৎ করেই তার মনে হলো, পায়ের তলার মাটিটা আর নেই। তার চোখ ফেটে নোনা পানি চলে এলো।
সে বুকফাটা অভিমান আর ভাঙা গলায় বলল, “আর একটা মাস… শুধু আর একটা মাস। তারপর ডিভোর্স দিয়ে দেব আপনাকে। মুক্তি দেব আপনার এই চৌধুরী পরিবারকে। আমারই ভুল, আমিই ভুলে গেছিলাম…।”
মেহের হাত দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে ধরা গলায় বলল, “আপনাদের অপমান করার ইচ্ছা আমার ছিল না। আসলে আমার কপালেরই দোষ, বুঝলেন? চলে যাব আপনাদের থেকে অনেক দূরে… আপনার থেকে অনেক দূরে…।”

রুদ্র মেহেরের দিকে তাকিয়ে রইল, তার চোখে তখনো রাগের রেশ।
রুদ্রর ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। সে মেহেরের পাশ কাটিয়ে গিয়ে সোফায় গা এলিয়ে বসল। তারপর অত্যন্ত নির্বিকার, প্রায় চ্যালেঞ্জিং গলায় বলল,
“মনে করো, আমি তোমাকে ডিভোর্স দিলাম না। তখন কী করবে?”
মেহেরের চোখের পানি ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল। রুদ্রর এই ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদল—
এই রাগী, এই চূড়ান্ত ঠান্ডা মাথার জেদ—সে কিছুতেই মেলাতে পারছিল না। সে নিজের সমস্ত ক্ষোভ উগরে দিয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠল,

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩০

“আপনি আমাকে ডিভোর্স দিতে বাধ্য, মিস্টার রাইহাম চৌধুরী রুদ্র! ভুলে যাবেন না, আমাদের মাঝে কোনো বিয়ে হয়নি। ইটস জাস্ট আ ডিল! একটা চুক্তি ছিল এটা”
রুদ্র সোফায় আরও আরাম করে হেলান দিল। তার চিরচেনা সেই বাঁকা হাসিটা ফিরে এসেছে ঠোঁটে, কিন্তু চোখ দুটো বরফের মতো ঠান্ডা।
“মিস আরোফোবিয়া, রাইহাম চৌধুরী রুদ্র কে কোনো কিছুতে ‘বাধ্য’ করা যায় না, এটা তোমার জানা উচিত ছিল । চুক্তি আমি ভাঙতেও জানি, গড়তেও জানি। এনিওয়ে… নাও, আউট! আউট ফ্রম মাই রুম…..

ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৩২