ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৫
মারিয়াম ফুল
মাদার ডি’সুজা নিজের হাতটি রুদ্রর মাথায় রাখলেন। “কিসের এত দ্বিধা রুদ্র?”
রুদ্র বুকভরা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অসহায় কণ্ঠে বলল, “, আমি আসলে কী করব কিছু বুঝতে পারছি না। আমার কাছে চারপাশের সবকিছু এলোমেলো লাগছে… আচ্ছা, যে অতীতে অন্যের কাছ থেকে সব সুখ কেড়ে নিয়েছে, সে কি আর কখনো নিজের জন্য সুখ চাইতে পারে? আর যদি চেয়েও ফেলে… সে কি আদেও তা পাওয়ার যোগ্য?”
মাদার ডি’সুজা কয়েকবার পলক ফেলে নিবিড় দৃষ্টিতে তাকালেন রুদ্রর দিকে, “আমি জানি না তুমি ঠিক কী নিয়ে এত চিন্তিত, মাই বয়… সত্যি বলতে, আমি তা জানতেও চাইছি না। কিন্তু অন্যের সুখ কেড়ে নেওয়ার কথা বলছ….?”
রুদ্র মাথা নিচু করেই রইল। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে পুরোনো দিনগুলো। প্রতিটা স্মৃতিই যেন বুকের কোথাও গিয়ে বিঁধছে।
মাদার আবার বলতে শুরু করলেন,
“মানুষ হিসেবে তুমি যদি কোনো ভুল করেও থাকো, তবে উপরওয়ালার কাছে ক্ষমা চাও। কিন্তু অতীতের একটি ভুলের শাস্তি দিতে গিয়ে নিজের পুরো জীবনকে নিঃসঙ্গতার দণ্ড দেওয়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। মানুষ ভুল করে, আবার সেই ভুল থেকেই নতুন করে বাঁচতেও শেখে। তাই নিজের সুখকে বারবার শাস্তির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রেখো না।”
রুদ্র কিছুক্ষণ চুপ থেকে মাথা তুলল। চেয়ারে আরেকটু হেলান দিয়ে বসে ক্লান্ত গলায় বলল, “সব বুঝলাম মাদার… কিন্তু যে আমাকে নিজের জীবনে চায়ই না, তার জন্য এসব ভেবে কী লাভ?”
মাদার ডি’সুজার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। “কে? মেহের?”
কথাটা শোনামাত্রই রুদ্র যেন চমকে উঠল। পর মুহূর্তেই নিজেকে সামলে নিয়ে একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলে উঠল, “আপনি ভুল ভাবছেন, মাদার! আর ওরকম কিছু একদমই না! ও আর আমি দুই মেরুর মানুষ। পরিস্থিতি আমাদের একসাথে এনে ফেলেছিল, ব্যস এতটুকুই। এর বাইরে আর কিছু নেই।”
রুদ্রর এমন একরোখা, আত্মরক্ষামূলক ভঙ্গি দেখে মাদার একটুও অবাক হলেন না। তিনি খুব শান্ত চোখে তাকালেন।
“রুদ্র, নদীতে যে বাঁধ দেওয়া হয়, সেটা কেন দেওয়া হয় জানো?”
রুদ্র মাথা নেড়ে ‘না’ সূচক ইঙ্গিত দিল। সে জানে না।
“যাতে জোয়ারের জল ভেতরে না ঢোকে। কিন্তু জলের চাপ যখন খুব বেশি বেড়ে যায়, তখন বাঁধ আর জলকে আটকে রাখতে পারে না—একেবারে ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। তুমি নিজেকে …..নিজের অনুভূতিগুলোকে আটকে রাখার জন্য যে কৃত্রিম বাঁধ বুনেছ, সেটা ভেঙে গেলে কিন্তু ক্ষতিটা তোমার নিজেরই সবচেয়ে বেশি হবে।”
রুদ্র মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।মাদার বলে চললেন,
“মেহের যেদিন প্রথম এখানে এসেছিল, সেদিন ওর চোখে আমি যে অনুভূতিটা দেখেছিলাম, সেটা ভুল হওয়ার মতো ছিল না। আজ তুমি যেমন ওর জন্য ব্যাকুল, সেদিন সেও জানালার পাশে বসে ঠিক এভাবেই তোমার দিকে তাকিয়ে ছিল। আমি ওকে সেদিন জিজ্ঞেসও করেছিলাম, ‘মেহের, তুমি কি ওর প্রেমে পড়েছ?'”
রুদ্র কিছুক্ষণ নীরব রইল। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ এক হাসি ফুটে উঠল।
“না, মাদার… আমার মনে হয় আপনি ভুল বুঝেছেন।ও কোনো প্রেমে-ট্রেমে পড়েনি, আর আমিও না… আপনি ভুল বুঝছেন। ”
“তোমরা দুজনই এখন নিজের অনুভূতি লুকানোর চেষ্টা করছ,” মাদার আলতো করে রুদ্রর কাঁধে হাত রাখলেন। “তোমাদের এই বয়সটা আমি পার করে এসেছি, রুদ্র। চোখের ভাষা কখনো মিথ্যা বলে না।”
রুদ্র বেশ শক্ত গলায় আবারও নাকচ করল, “সেরকম কিছুই না, মাদার ”
“ঠিক আছে, আমাকে আর কিছু বলতে হবে না,” মাদার মৃদু হেসে বললেন,” নিজেকে প্রশ্ন কোরো, রুদ্র। উত্তরটা তখন আর কাউকে খুঁজে বলতে হবে না, নিজেই বুঝে যাবে।”
রুদ্র নিঃশব্দে টেবিলের দিকে তাকিয়ে রইল। অস্ফুটে বলল, “আপনি সত্যটা জানেন না, মাদার। কিছু অপরাধের ক্ষমা হয় না। আমি চাইলেও আর সাধারণ হতে পারব না।”
মাদার কিছুক্ষণ চুপ করে রুদ্রের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। মুখে প্রশান্ত এক হাসি।
“তোমাকে সাধারণ হতে কে বলেছে, রুদ্র?বরং অসাধারণ হও। তবে এমন অসাধারণ, যে নিজের অতীতের কাছে হার মানে না।”
কয়েক পা হেঁটে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। বাইরে দৃষ্টি রেখে আবার বললেন,
“তুমি কি জানো, একটা পুরোনো ক্যানভাসে নতুন ছবি কীভাবে আঁকা হয়?
শিল্পী যখন দেখে আগের ছবিটা আর তার মনের মতো নেই, তখন সে সেটাকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকে না। সে ক্যানভাসের ওপর নতুন করে সাদা রঙের একটা প্রলেপ দেয়। তারপর আবার নতুন ছবি আঁকতে শুরু করে।
হয়তো আগের ছবির কিছু দাগ ক্যানভাসের গভীরে থেকেই যায়। কিন্তু সেই দাগ কখনো নতুন ছবিটার সৌন্দর্যকে আটকে রাখতে পারে না। কারণ মানুষের চোখ শেষ পর্যন্ত নতুন ছবিটাই দেখে।
অতীতও ঠিক তেমনই, রুদ্র। সেটা তোমার জীবনের একটা দাগ হতে পারে, একটা স্মৃতি হতে পারে, কিন্তু সেটাই তোমার পুরো ক্যানভাস নয়। তোমার হাতে এখনো তুলি আছে, সামনে এখনো ফাঁকা জায়গা আছে। তুমি চাইলে এমন একটা ছবি আঁকতে পারো, যার পাশে পুরোনো দাগগুলোর আর কোনো গুরুত্বই থাকবে না।”
রুদ্র স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। মাদারের কথাগুলো ভেতরে কোথাও গিয়ে ধাক্কা দিচ্ছিল।
—– “তুমি বললে, সে তোমাকে চায় না। তাই তো?”
রুদ্র চোখ তুলে মাদারের দিকে তাকাল।
—–“আমি যদি তোমার জায়গায় থাকতাম, জানো কী করতাম?”
রুদ্র কোনো উত্তর দিল না।
——“আমি অপেক্ষা করতাম। তবে দূরে সরে গিয়ে নয়। এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতাম, যেখানে ফিরে আসতে চাইলে মানুষটার আর পথ খুঁজতে না হয়।”
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এল। “সময়কে তার নিজের কাজ করতে দাও, রুদ্র। কিন্তু সময়ের অপেক্ষায় থেকে নিজের করণীয়টা ভুলে যেয়ো না।”
তিনি ধীরে রুদ্রের দিকে ফিরলেন।
“জীবনে কিছু মানুষ একবারই আসে। তাদের চলে যেতে দেওয়াটা যতটা সহজ, ধরে রাখার সাহস দেখানো তার চেয়ে অনেক কঠিন।যদি কখনো মনে হয়, একটা মানুষকে হারালে নিজের ভেতরের একটা অংশও হারিয়ে যাবে… তাহলে তাকে ধরে রাখার জন্য যতটুকু করা দরকার, ততটুকু করো। কারণ কিছু আফসোসের ভার মানুষ সারাজীবনও নামাতে পারে না।”
রুদ্র মাদারের কথার প্রতি উত্তর করলা না । শুধু শুনলো, তারপর ধীরে ধীরে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। ধাতব নবটা চেপে ধরে একবার পেছন ফিরে তাকাল। তার চোখে ছিল একরাশ ক্লান্তি, আর ঠোঁটের কোণে চাপা পড়ে থাকা না-বলা হাজারটা কথা। শুধু বলল,
“মাদার, আসি… আই অ্যাম অলরেডি লেট। কল মি ইফ ইউ নিড, ওকে?”
মাদার ডি’সুজা রুদ্রর হঠাৎ এমন তাড়া দেখে ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না। “এখনই চলে যাচ্ছ? ”
—‘জি… যেতে হবে। মেহের আর বেবি একা হসপিটালে। ”
“আচ্ছা, যাও…” বলে মাদার ডি’সুজা রুদ্রকে বিদায় জানালেন।
শান্তি নীড় থেকে বেরিয়ে আসতেই রাতের হিমেল বাতাস রুদ্রর মুখে এসে লাগল। অথচ সেই শীতল বাতাসও তার ভেতরের অস্থিরতাকে একটুও শান্ত করতে পারল না। বরং মাথার ভেতরটা আরও বেশি এলোমেলো হয়ে উঠল। অসংখ্য প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল মনে , কিন্তু কোনো প্রশ্নেরই মুখোমুখি হওয়ার সাহস হলো না তার। দৃষ্টি সরিয়ে দ্রুত পায়ে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল রুদ্র।
রুদ্র চলে যাওয়ার পর মাদার ডি’সুজা নিজের চেয়ারে এসে বসলেন। মনে মনে একটু হাসলেন—
“দুজনে-ই বাচ্চা মানুষ, নিজেদের অনুভূতি লুকিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করছে! যে রুদ্র মুখে বলেছিল, মেহেরের জন্য আসেনি, সেই রুদ্রই আবার তার কাছেই ফিরতে এত তাড়াহুড়ো করছে।”
মাদার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে টেবিলের ল্যাপটপটা খুলে নিজের কাজে মন দিলেন।
দেওয়াল ঘড়িতে তখন সময় রাত দশটা ছুঁইছুঁই।
ঠিক তখনই পড়ার টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা একটানা ভাইব্রেট করে উঠল।মেঘলা হাতের কাজ ফেলে টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। স্ক্রিন অন করতেই দেখল হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ। অ্যাপে ঢুকতেই মেহেরের পাঠানো বেশ কয়েকটি ছবি ভেসে উঠল।
ছবিতে তোয়ালে জড়ানো ছোট্ট বাচ্চাটাকে দেখেই মেঘলার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। “ইশ! কত সুন্দর…” ফিসফিস করে বলে সে ছবিটা জুম করতে লাগল। অবিকল মায়ের মতো দেখতে হয়েছে বাচ্চাটা—সেই চুল, নাক, মুখ —মাশাআল্লাহ।
ছবিতে এতটাই মশগুল ছিল যে, মেঘলা খেয়ালই করেনি দরজার পাশের পর্দাটা সামান্য সরে গেছে।
হঠাৎ ঘাড়ে আর কাঁধের ভাঁজে কারো চিবুকের আলতো স্পর্শ পেতেই মেঘলা চমকে উঠল। সঙ্গে ভেসে এলো পরিচিত পারফিউমের মিষ্টি গন্ধ। মাশফি যে তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে, সেটা বুঝতে মেঘলার একটুও সময় লাগল না ….মাশফির উপস্থিতি মেঘলাকে মুহূর্তেই স্থির করে দিল।।বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা যেন নিজের ছন্দ ভুলে দ্রুত কাঁপতে লাগল। অজানা এক অনুভূতিতে তার সারা শরীর কেমন অবশ হয়ে এলো।
হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ার উপক্রম হলো। মেঘলা ছটফট করে ওঠার চেষ্টা করে বিড়বিড় করে বলল,
“ছাড়ুন….ছাড়ুন না…”
মাশফি চিবুকটা একটুও না সরিয়ে মেঘলার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, “ছাড়ব না…”
মেঘলা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। কথাগুলো যেন গলায় এসে আটকে রইল। ঘরজুড়ে নেমে থাকা নিস্তব্ধতার মাঝে মাসফির উষ্ণ নিঃশ্বাস আলতো করে ছুঁয়ে যাচ্ছিল তার ঘাড়। সে শুধু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
মেঘলাকে এভাবে চুপ হয়ে যেতে দেখে মাসফি হঠাৎ থমকে গেল। ভুল কিছু করে ফেলল কি না ?এই ভেবে সে দ্রুত এক পা পিছিয়ে দাঁড়িয়ে গেল।
“আই… আই অ্যাম সরি! সত্যি বলছি… সরি, মেঘলা…”
মেঘলা আস্তে আস্তে মাসফির দিকে ঘুরে দাঁড়াল। লজ্জায় আর সংকোচে তার দুটো গাল ততক্ষণে একদম লাল হয়ে উঠেছে। সে নিজের পরনের ওড়নার খুঁটটা শক্ত করে চেপে ধরে কপালে হাত দিয়ে বলল, “আপ… আপনি সরি কেন বলছেন?”
মাসফি চোখ সরিয়ে নিয়ে দেওয়ালের দিকে তাকাল। নিজের চুলগুলো হাত দিয়ে পেছনের দিকে ঠেলে দিয়ে অশান্ত গলায় বলল, “না মানে… না বলে এভাবে তোমাকে স্পর্শ করাটা ঠিক হয়নি। তুমি বোধহয় কমফোর্টেবল হওনি, তাই না?”
মাসফির এমন ছটফটানি আর অপ্রস্তুত চেহারা দেখে মেঘলা ভেতরে ভেতরে নিজেও ঘাবড়ে গেল। নিজের মাথাতেই যেন একটা বাড়ি মারতে ইচ্ছে করছে তার…কিন্তু ‘কমফোর্টেবল না’—এই কথাটা সে কখন বলল?
“আমি কি একবারও বলেছি, আমার খারাপ লেগেছে বা আমি কমফোর্টেবল না ?”
কথাটা শুনে মাসফি হঠাৎ মেঘলার দিকে তাকাল। এতক্ষণ এড়িয়ে থাকা চোখদুটো এবার স্থির হয়ে রইল তার মুখে। মেঘলার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটুকরো হাসি।
কোনো কথা না বলে সে ধীরে ধীরে ডান হাতটা মাসফির দিকে বাড়িয়ে দিল। আঙুলের ডগায় হালকা কাঁপুনি, যেন অপেক্ষা করছে—সে ধরবে কি ধরবে না।
মাসফি কয়েক সেকেন্ড মেঘলার সেই বাড়িয়ে দেওয়া হাতটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। মেঘলার এই নিঃশব্দ সম্মতিটুকু পেতেই মাশফির ভেতরের সব অপরাধবোধ আর দ্বিধা মুহূর্তেই কেটে গেল।
মাশফি ধীরপায় এক পা এগিয়ে এলো। হাত বাড়িয়ে মেঘলার সেই কাঁপতে থাকা নরম হাতটা পরম যত্নে নিজের হাতের তালুতে তুলে নিল। তারপর আঙুলগুলোর ভাঁজে নিজের আঙুলগুলো গলিয়ে দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল।
মাশফির হাতের ওম পেতেই মেঘলা চোখের পাতা দুটো আলতো করে বুজে ফেলল। বুকের ভেতরটা এক অজানা আবেশে ধক করে উঠল তার।
মাশফি অন্য হাত দিয়ে মেঘলার থুতনিটা সামান্য উপরে তুলে ধরে ফিসফিস করে বলল, “মেঘলা… আর ইউ শিওর… মে-আই? ?”
মেঘলা চোখ না খুলেই খুব আস্তে করে ওপর-নিচে মাথা নাড়ল।
মাসফি তার হাতের চাপটা একটু বাড়িয়ে মেঘলাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিল। ঘরের আবছা আলোয় দুজনের মাঝের দূরত্বটুকুও যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল। মেঘলা আর সরে গেল না। নত মুখে স্থির হয়ে রইল তার কাছেই, বুকের ভেতর জমে থাকা লজ্জা আর অস্থিরতাকে সামলানোর চেষ্টা করতে করতে।
পরদিন সকাল।
গত রাতে রুদ্র হাসপাতালে আসেনি। সে কেন আসেনি কিংবা কোথায় ছিল, মেহেরের তার কিছুই জানা নেই। অবশ্য আসারই বা কী দরকার! মেহের চোখ খুলে ধীরপায়ে বিছানায় সোজা হয়ে বসল। শরীরের ব্যথাটা এখনো পুরোপুরি কমেনি, একটা হালকা অস্বস্তি লেগে আছে।
পাশে তাকাতেই মেহের দেখল—তার ছোট্ট পুতুলটা পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে। ঘুমের মধ্যে মাঝে মাঝেই ঠোঁট দুটো উল্টে যাচ্ছে, কখনো বা ছোট্ট জিবটা একটু বের হয়ে আসছে। দৃশ্যটা দেখতেই মেহেরের বুকের ভেতরের খালি জায়গাটা যেন নিমেষেই কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠল। গত কয়েক মাসে তার জীবনে কত ঝড়ঝাপটাই না বয়ে গেল!
অথচ আজ কোলজুড়ে থাকা এই একরত্তি জীবনের দিকে তাকালে সব কষ্ট এক নিমেষে মিলিয়ে যায়।
মেহের নিজের নাকটা আলতো করে ছেলের নাকের সাথে ঠেকিয়ে বিড়বিড় করল “হাই চ্যাম্প… এখনো ঘুমাচ্ছ? সকাল হয়ে গেছে তো!”
হাত থেকে ক্যানুলাটা রাতে ডাক্তার এসে খুলে দিয়ে গেছেন। হাত একদম খালি। মেহের এবার নিজের একদম কাছে টেনে নিল ছেলেকে। কিন্তু হঠাৎই শান্ত পরিবেশ বিঘ্নিত হলো। মায়ের স্বর কান পর্যন্ত পৌঁছাতেই নিষ্পাপ প্রাণটা নড়েচড়ে উঠল। হালকা ‘আআ… হুম’ শব্দ করেই এক মুহূর্তের মধ্যে ঠোঁট ভেঙ্গে কান্নাকাটি জুড়ে দিল।
মেহের তড়িঘড়ি করে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে আলতো করে দোলাতে লাগল। কিন্তু না! কান্না থামার কোনো লক্ষণই নেই। উল্টো কান্নার গতি আরও বেড়ে গেল। মেহের একদম দিশেহারা হয়ে পড়ল, কী করবে ভেবে পাচ্ছে না।
ঠিক তখনই কেবিনের দরজায় হালকা খটকা শব্দ হলো।
মেহের ঘুরে তাকাতেই দেখল রুদ্র ভেতরে ঢুকছে। কিন্তু চোখ যেতেই মেহের একটু থমকে গেল—রুদ্রর কনুইয়ের ঠিক পাশটাতে সাদা ব্যাণ্ডেজ প্যাঁচানো! রুদ্রর এমন বিধ্বস্ত চেহারা দেখে মেহেরের কপালে ভাঁজ পড়ল, তবে সেই ভাবনা বেশিক্ষণ টিকল না। বাচ্চার চিৎকারে পুরো ঘর মাথায় ওঠার জোগাড়।
মেহের উসখুস করে বলল, “জানি না হঠাৎ কী হলো! ও তো এতক্ষণ শান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছিল… এখন কিছুতেই কান্না থামাচ্ছে না।”
কথা বলতে বলতেই মেহের ছেলেকে নিয়ে একটু দোল খাওয়ানোর চেষ্টা করল। কিন্তু তাতে কাজের কাজ কিছুই হলো না।
রুদ্র দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একমুহূর্ত মা ছেলেকে দেখল। তারপর ধীরপায়ে এগিয়ে এসে হাত দুটি বাড়িয়ে বলল, “আমাকে দাও।”
মেহের না চাইতেও একটু হেসে উঠল, “আমার কোলে থেকে কান্না থামছে না, আপনার কোলে কি মধু আছে যে আপনার কাছে গেলই কান্না থামিয়ে দেবে ?”
রুদ্র গম্ভীর মুখে ভুরু কুঁচকাল, “ওকে যদি আমার কোলে গিয়ে কান্না বন্ধ করে দেয়, তবে তোমার সম্পত্তির সেভেন্টি পার্সেন্ট কিন্তু আমাকে দিয়ে দিতে হবে, রাজি?”
মেহের ভাবল—যেখানে পেটে ধারণ করা মা নিজে ব্যর্থ, সেখানে একজন পুরুষ মানুষ কীভাবে বাচ্চা সামলাবে? মেহের মনে মনে বলল, ‘দেখি দেখি, কীভাবে কান্না থামান… ‘
সে ছেলেকে আলতো হাতে রুদ্রর বাড়িয়ে দেওয়া হাতের ওপর ছেড়ে দিল।
রুদ্র পরম যত্নে বাচ্চাটাকে নিজের বুকের কাছাকাছি পজিশন করে নিল। বাচ্চাটা রুদ্রর মুখের দিকে একবার পিটপিট করে তাকাল। তারপর আবারও ঠোঁট উল্টে ক্যাঁ করে কান্না জুড়ে দিতে চাইল।
রুদ্র আস্তে করে সোফার দিকে এগিয়ে গিয়ে বসল। এবার বাচ্চার কানের কাছে মুখটা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, “তোর মায়ের সামনে এভাবে ইজ্জত মারিস না, বাপজান! অনেক বড় মুখ করে তোকে কোলে নিয়েছি… মান-সম্মানটুকু রাখ অন্তত…”
মেহের দূরে দাঁড়িয়ে রুদ্রর ঠোঁট নাড়া দেখে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কিছু বলছেন নাকি?”
রুদ্র গলার স্বর বদলে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, “কই, না তো! তুমি কান দুটো বন্ধ রেখে শুধু দেখো কীভাবে কান্না থামাই।”
রুদ্র এবার আলতো করে হাত দুটো উঁচু-নিচু করে বাচ্চাকে দোলাতে লাগল। “কুদ্দুস বয়রাতি, আর কাঁদে না… এবার চুপ কর তো।”
কী এক আশ্চর্য কাণ্ড! বাচ্চাটা যেন সত্যিই রুদ্রর কথা বুঝতে পারল। ধীরে ধীরে কান্নার শব্দ কমে এলো। চোখ দুটি বন্ধ করে পুঁচকে হাতটা টেনে এনে মুখের কাছে নিয়ে ‘আআআাম… এএমএম’ শব্দ করে আঙুল চুষতে শুরু করল।
মেহের নিজের চোখ দুটি বড় বড় করে দাঁড়িয়ে রইল। ওটা কি সত্যিই তার ছেলে? ছেলেটা তার কোলে গিয়েও কান্না থামাল না কেন?যে কয়েক সেকেন্ড আগেও পুরো কেবিন মাথায় তুলে ফেলছিল?
মেহের মুহূর্তেই নিজের গাল দুটো ফুলিয়ে ফেলল। বুকের ওপর হাত দুটো আড়াআড়িভাবে বেঁধে একবার রুদ্রর দিকে তো একবার ছেলের দিকে কটমট করে তাকাতে লাগল।
রুদ্র এবার মেহেরের দিকে তাকিয়ে একটা ভুরু উঁচিয়ে বলল, “উঁহু! দাও এবার, আমার সেভেন্টি পার্সেন্ট। ”
মেহের তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এলো। একপ্রকার ছাঁ মেরে রুদ্রর কোল থেকে ছেলেকে নিজের কোলে তুলে নিয়ে বলল, “মগের মুল্লুক নাকি? কান্নাকাটি তো এমনিতেই কমে আসছিল! আমি… আমি নিজেই পারতাম থামাতে। আপনি মাঝখান থেকে হাত বাড়িয়ে নিলেন দেখেই বন্ধ করে দিল… এর মধ্যে আপনার কোনো বাহাদুরি নেই।”
রুদ্র সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,”তাই নাকি? আচ্ছা, তাহলে আবার দাও দেখি আমার কোলে। এক সেকেন্ডেই আবার কাঁদিয়ে দিতে পারি কি না দেখো! কতক্ষণই বা লাগে? একটা চিমটিই তো যথেষ্ট”
কথাটা শুনেই মেহের দুই চোখ বড় বড় করে এক পা পিছিয়ে গেল। পুঁচকেটাকে নিজের বুকের সাথে চিপকে ধরে বলল, “কী সাংঘাতিক মানুষ রে বাবা! ঘুষ না পেয়ে এখন বাচ্চার ওপর অত্যাচার চালাবেন? আপনার মতো ডাকাত তো আমি জীবনেও দেখিনি।”
রুদ্র এবার আলতো করে মেহেরের দিকে দুই পা এগিয়ে নিজের গম্ভীর ভাবটা বজায় রাখার ভান করল, “ডাকাত মানে? চুক্তি তো চুক্তিই ছিল, ম্যাডাম! বাচ্চা শান্ত করলে সম্পত্তি আমার, আর না করলে… এখন ওকে আবার কাঁদিয়ে যদি প্রমাণিত করি যে অলৌকিক ক্ষমতাটা আমারই ছিল, তখন?”
“কান্না থামানোর জন্য সম্মতি দিয়ে দেব নাকি… সরুন, সরুন… দেখুন, আমার টিমে এখন আমার ছেলেও আছে।”
কথাটা শেষ হতেই কোলে থাকা পুঁচকে পুটলিটা হুট করে একটা ছোট্ট “হুম্ম…” শব্দ করে উঠল। যেন মায়ের কথায় সেও নিজের উপস্থিতির জোরালো সমর্থন জানিয়ে দিল।
মেহের আর রুদ্র দু’জনেই একসঙ্গে ছেলের দিকে তাকাল। পরমুহূর্তেই চোখাচোখি হতেই দু’জনের ঠোঁটের কোণে একই সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল।
রুদ্র মাথা নেড়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“এই জন্যই বলেছিলাম… আরেকটা অ্যারোফোবিয়া চলে এসেছে।”
রুদ্র মিটিমিটি হেসে আরও এক পা মেহেরের দিকে এগোতে চাইল—ঠিক তখনই তার পকেটে থাকা ফোনটা সশব্দে বেজে উঠল।
পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনে তাকাতেই রুদ্র দেখল—হামজা চৌধুরী কল দিয়েছেন। কলটা রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে হামজা চৌধুরী বলে উঠলেন, “রুদ্র!”
—“হ্যাঁ, বাবা বলল।”
হামজা চৌধুরীর গলাটা বেশ চিন্তিত শুনা গেল, “রুদ্র, আমরা আজ মনে হয় আসতে পারছি না। কাল রাত থেকে দেশে ৩ দিনের অবরোধ ডেকেছে। রাস্তাঘাটের অবস্থা ভালো না, গাড়িঘোড়া কিছুই চলছে না।”
বাবার কথাগুলো শুনে রুদ্র জানালার কাঁচের দিকে তাকিয়ে ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার টানটান হয়ে থাকা কাঁধের পেশিগুলো যেন এক মুহূর্তেই ঢিলে হয়ে এলো। বাবার কথা শুনে রুদ্রর মনে হলো, যাক, এবারকার মতো বাঁচা গেল।
নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল, “আচ্ছা বাবা, কোনো সমস্যা নেই। আর এখন এই অবস্থায় বের হওয়া একদম ঠিক হবে না। তোমরা ঘরেই থাকো, আমি এই দিকটা দেখে নিচ্ছি।”
কথা বলতে বলতেই রুদ্র কেবিনের জানালার দিকে ধীর পায়ে কিছুটা হেঁটে সরে গেল। তারপর স্বর এক ধাপ নামিয়ে বাবাকে বলল, “আর শোনো বাবা, দেশের অবস্থা এখন বেশ উত্তাল। তোমার দলের কর্মী-সমর্থকদের বলো একটু শান্ত থাকতে, যাতে কোনো মারামারিতে না জড়ায়। বিরোধীরা কিন্তু এই সুযোগটাই নেওয়ার চেষ্টা করবে।”
ওপাশ থেকে হামজা চৌধুরী সায় দিয়ে বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক বলেছিস। আমি সবাইকে বলে দিচ্ছি। আচ্ছা তাহলে রাখি… আর আমার দাদুভাইকে কিন্তু খেয়াল রাখিস!”
“হুম, রাখছি,” বলেই রুদ্র কলটা কেটে দিল।
মেহের এতক্ষণ কোলজুড়ে থাকা ছেলেকে হালকা দোলাতে দোলাতে রুদ্রর দিকেই একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল। রুদ্র ফোনটা পকেটে রেখে মেহেরের দিকে ঘুরতেই মেহেরের নজর গিয়ে আবারও পড়ল রুদ্রর কনুইয়ের ওপর। সেখানে সাদা ব্যাণ্ডেজের ওপর হালকা কালচে ছোপ। মেহের একটু ভুরু কুঁচকে রুদ্রর ব্যাণ্ডেজ করা হাতটার দিকে ইশারা করে বলল, “হাতে কী হয়েছে আপনার?”
রুদ্র নিজের ব্যাণ্ডেজ করা কনুইয়ের দিকে একবার তাকাল। “এক্স এসে কিস করে দিয়ে গেছে।”
মেহের রুদ্রর এমন উত্তর শুনে এক মুহূর্তের জন্য হা হয়ে রইল। তার হাত দুটো নিজে থেকেই স্থির হয়ে গেল। তারপর মুখটা একপাশে বাঁকিয়ে কোলজুড়ে থাকা ছেলেকে আস্তে করে কেবিনের ধভবধে সাদা বিছানাটায় শুইয়ে দিল। ছেলে বিছানায় পিঠ ঠেকানোর পরও নড়ল না দেখে মেহের দু-হাত দিয়ে কাঁথাটা টেনে বাচ্চার বুক পর্যন্ত ঢেকে দিল।
তারপর গাল দুটো ফুলিয়ে বিড়বিড় করল, “অসভ্য লোক একটা! নরমাল কোনো কথা জিজ্ঞেস করলেই অমনি ত্যাড়া ত্যাড়া উত্তর ফরজ উনার।”
মেহেরের বিড়বিড়ানি শুনে রুদ্র সোফার দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা ফুটিয়ে বলল, “একটু জোর করে ভালো ভালো ভাবো তো… মুখে যেটা বের হয়েছে, যদি সত্যি হয়?”
মেহের চট করে ঘুরে দাঁড়িয়ে চোখের ভুরু জোড়া কোঁচকাল, “মানে?”
রুদ্র সোফার হাতলে হাত রেখে নিজের কনুইয়ের ব্যাণ্ডেজে আঙুল বোলাতে বোলাতে বলল, “মানে আবার কী?সত্যি বুঝতে পারছ না? ”
——” দূরে গিয়ে সরে মরুন, অসভ্য লোক!”
—–“আমার যদি সত্যিই কিছু হয়ে যায়, তবে কী হবে জানো? এই পৃথিবী থেকে একটা জেনুইন হ্যান্ডসাম হারিয়ে যাবে! ইউনিভার্সাল লস অফ আর্থ ”
মেহের রুদ্রের কথা শুনে, হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই বলল, “ওরে বাবা!যে না চেহারা নাম বুঝি পেয়ারা? নিজের মুখে নিজেকে হ্যান্ডসাম বলতে একটুও বাধল না?”
রুদ্র সোফায় আর না বসে সোজা হয়ে দাঁড়াল। একটা ভুরু উঁচিয়ে মেহেরের আপাদমস্তক দেখে বলল, “জি মেডাম, আই আম আ হ্যান্ডসাম ম্যান! আনডাউটেডলি! এতে কোনো সন্দেহ আছে নাকি?”
ঠিক তখনই কেবিনের দরজায় দুটো আলতো টোকা পড়ল।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন একজন নার্স। হাতে বেশ কিছু রিপোর্ট আর প্রেসক্রিপশনের ফাইল। “স্যার, ম্যাডাম… আজকে আপনারা ডিসচার্জ নিয়ে নিতে পারেন। ডক্টর সব রিপোর্ট চেক করেছেন, এভরিথিং ইজ অলরাইট।”
কথাটা কানে যেতেই মেহেরের বুকের ভেতর থেকে হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো। সে আলতো করে নিজের দু-হাত একত্রিত করে বুকের কাছে চেপে ধরল,তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা চওড়া হাসির রেখা ফুটে উঠল। রুদ্র একপলক মেহেরের সেই বদলে যাওয়া মুখের দিকে তাকাল।
নার্স কয়েকটা ফাইলগুলো রুদ্রর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “স্যার, রিসেপশনে বাকি ফাইল জমা দেওয়া আছে। আপনি বিল ক্লিয়ার করে পেপারসগুলো সংগ্রহ করে নেবেন।”
রুদ্র থুতনি নেড়ে সায় দিল, “ওকে, থ্যাংকস ।”
নার্স কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকাল রুদ্র—দুপুর বারোটা বাজে।
মেহের ততক্ষণে বিছানার পাশে গিয়ে ঝুঁকে সাবধানে ছেলেকে দুই হাতে তুলে নিল। বাচ্চার তোয়ালেটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে এক হাতে ছেলেকে ধরে অন্য হাতে সাইড ব্যাগের চেইন খুলল। ভেতর থেকে নিজের ক্রেডিট কার্ডটা বের করে রুদ্রর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “এই নিন… হসপিটালের বিলটা এটা দিয়ে পেমেন্ট করে দিন।”
রুদ্র বাড়িয়ে দেওয়া কার্ডটার দিকে একবার তাকাল, তারপর মেহেরের মুখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট উল্টাল। শক্ত গলায় বলল, “ওটা ওভাবে না, অন্যভাবে দাও।”
মেহের চোখ দুটো সামান্য ছোট করে বলল, “অন্যভাবে মানে? কী বলতে চাইছেন আপনি?”
রুদ্র দুই পকেটে হাত গুঁজে মেহেরের একদম মুখোমুখি এসে দাঁড়াল, “তোমার কি মনে হয় আমার কাছে টাকা কম আছে? নাকি তুমি আমাকে ফকির ভাবো যে এভাবে কার্ড বাড়িয়ে দিচ্ছ?”
মেহের হাতটা গুটিয়ে না নিয়ে আরও একটু সামনে বাড়িয়ে বলল, “লাগবে না আপনার টাকা! আমার কাছে টাকা আছে। সেদিন ভাইয়া আমার কার্ডে ব্যালেন্স দিয়ে গেছেন, আমি সেখান থেকেই বিল দেব।”
মেহের বাক্যটি শেষ করার আগেই রুদ্র এক ঝটকায় দরজার ধাতব নবটা চেপে ধরল। তার কপালের রগগুলো সামান্য ভেসে উঠল।
“আমি আগেই বলেছি, এটা আমার দায়িত্ব! লোক দেখানো সুভদ্রতা আমার সামনে দেখাতে আসবে না একদম। আর আমাকে টাকা দেখানোর সাহস তো একদমই করবে না!”
“আপনি কেন দেবেন?” মেহের চোখের মণি দুটো স্থির রেখে শক্ত গলায় বলল, “আপনার এই লোকদেখানো দায়িত্বের কোনো দরকার নেই আমার ”
রুদ্র দরজার নব ছেড়ে মেহেরের একদম চোখের মণিতে চোখ রাখল। চোয়াল দুটো আরও শক্ত হয়ে গেল তার, “চুপচাপ বাচ্চা নিয়ে গাড়িতে গিয়ে বসো! আমি বাকি ফরম্যালিটিজ পূরণ করে আসছি।”
মেহেরের বাড়িয়ে রাখা হাতটা থমকে গেল। সে খোলা দরজার বাইরে দিয়ে হেঁটে যাওয়া দুজন নার্সের দিকে এক নজর তাকাল। রুদ্রর শক্ত হয়ে যাওয়া চোয়াল আর স্থির চোখের দিকে তাকাতেই মেহেরের আর একটা শব্দও মুখ দিয়ে বের হলো না। হাতে ধরা কার্ডটা সে আস্তে করে নিচে নামিয়ে ব্যাগের ভেতর পুরে ফেলল।
কোনো কথা না বাড়িয়ে মেহের ছেলেকে বুকের কাছে আরও একটু চেপে ধরল। তারপর ধীরপায়ে কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
হাসপাতালের পার্কিংয়ে রাখা গাড়ির কাছে গিয়ে মেহের পেছনের সিটের দরজা খুলে ভেতরে বসল। দুপুরের রোদের একটা তীব্র আলো কাঁচ ভেদ করে এসে বাচ্চার চোখের ওপর পড়ছিল। মেহের চট করে নিজের ওড়নাটা টেনে এনে বাচ্চার মুখের ওপর আলতো একটা ছায়া করে দিল।
কয়েক মিনিট পর রুদ্র সব ফাইল আর পেপারস সাথে নিয়ে এসে ড্রাইভিং সিটে বসল। সে দরজাটা একটু জোরেই ধাক্কা দিয়ে বন্ধ করতেই মেহেরের শরীরটা সামান্য কেঁপে উঠল, কিন্তু সে জানালার বাইরের দিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখল।
ক্যাপ্টেন সাহেব পর্ব ৪৪
ইঞ্জিন গর্জে উঠল। গাড়িটা ধীরে ধীরে হাসপাতালের চত্বর পার হয়ে মূল রাস্তায় উঠে অ্যাপার্টমেন্টের দিকে এগোতে থাকল। মেহের জানালার কাঁচে কপাল ঠেকিয়ে বাইরের দৃশ্যগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল, আর তার কোলজুড়ে ঘুমিয়ে থাকা বাচ্চার কপালে আলতো করে নিজের ঠোঁট দুটো ছোঁয়াল।
