খান সাহেব পর্ব ১১
সুমাইয়া জাহান
দিনটা শুক্রবার। ভোরের আলো ফুটেছে। ঘড়ির কাঁটা সকাল আটটায় ছুটছে। চারপাশের পশুপাখি, গাছপালা সব জেগে উঠেছে। ব্যস্ত শহরের ব্যস্ত মানুষ তাদের নিত্যদিনের কাজের জায়গায় ছুটছে। আশেপাশে শোনা যাচ্ছে মানুষের কোলাহল। সিকদার বাড়িতে চলছে বিয়ের তোড়জোড়। আনোয়ার সাহেব, রিসাত সাহেব রান্নার দিকটা দেখছেন। মিনা বেগম, হাসি বেগম সকলের জন্য চা বানাচ্ছেন। খুশি বেগম টেবিলে বসে নিজের মেয়েকে খাইয়ে দিচ্ছেন। বাড়ির ছোটোরা গার্ডেনে ছুটছে। গেটের সামনে বড় করে লেখা “মাইশা ওয়েড্স নয়ন”। পুরো বাড়ি আনন্দে ভরে উঠেছে।
সকাল থেকেই মাইশার মন খারাপ। সুমুরা সবাই মাইশার পাশেই আছে। মিনা বেগম, হাসি বেগম, রাহিন কিছুক্ষণ পর পর বোনকে এসে বোঝাচ্ছে। মাইশা তবুও মন খারাপ করে বসে আছে। মাইশা সকাল থেকে কিছু খায়নি। মিনা বেগম কিছুক্ষণ পর পর এসে মেয়েকে খাবার জন্য বলছে। আনোয়ার সাহেব মেয়ের সামনে খুব একটা আসেন না। মেয়ের সামনে এলেই তার কঠিন হৃদয় নরম হয়ে যায়। চোখে পানি আসে।
সুমু মাইশার অবস্থা দেখে অনেক কষ্ট পাচ্ছে। আর নিজের কথা ভাবছে। একদিনতো তার জীবনও এমন দিন আসবে। তাকেও চলে যেতে হবে।
আশাবানু এলেন নাতনির রুমে। তার পাশে রাইশা। তার হাতে খাবারের ট্রে। আশাবানু এসে নাতনির পাশে বসলেন। নাতনির চিবুক ছুঁয়ে চুমু খেলেন। মাইশা আদুরে ছোঁয়া পেয়ে দাদিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল। আশাবানু নাতনির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
“কাঁদিসনা বোন। আয় খেয়েনে। আমি তোকে খাইয়ে দিচ্ছি। দাদির হাতে খাবি না তুই? শান্ত হয়ে বস।”
মাইশা চোখের জল মুছে আশাবানুকে ছেড়ে উঠে বসল। আশাবানু খবারের লোকমা মাইশার মুখে তুলে দিতে লাগলেন। মাইশা চুপ করে খেয়ে যাচ্ছে। খাবার চিবুতে-চিবুতে হেঁচকি তুলছে সে। আশাবানু নাতনিকে খাইয়ে দিয়ে চলে গেলেন।
সুমুরা মাইশার সাথে বসে গল্প করছে। হঠাৎ সুমুর ফোনে মেসেজ এলো। ফোনটা হাতে নিয়ে বেড়িয়ে গেলো রুম থেকে। ইফতিয়া সুমুর যাওয়ার দিকে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
সুমু রান্না ঘরে এসে এককাপ চা আর খাবার নিয়ে চলে গেল কাঙ্ক্ষিত রুমটার সামনে। রুমের সামনে এসে দরজায় নক করল। ভেতর থেকে পারমিশন পেয়ে রুমে ঢুকল। শেরাজ টেবিলের ওপর বসে কারো সাথে টেক্সট করছে। সুমু খাবারের ট্রে’টা টেবিলের ওপর রাখল। শেরাজ উঠে গিয়ে হাত ধুয়ে আসলো। এসে চেয়ারে বসে খাবার খেতে লাগল।
সুমু মনের সব ভয়কে সরিয়ে বলল,
“আপনি তো কখনও বললেন না আমি চা-টা কেমন বানাই?”
শেরাজ খেতে-খেতে জবাব দিল,
“ভালোই।”
সুমুর ঠোঁটে হাসির ঝলক দেখা গেল। ঠোঁটে হাসি রেখেই সে বলল,
“আজতো মাইশা আপুর বিয়ে। আপু সকাল থেকে কতো কান্না করছে।”
“কেনো?”
“বা রে! আপুর আজ বিয়ে হয়ে গেলে তো আপু আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে যাবে। তাই কাঁদছে।”
“তাহলে বিয়ে করছে কেনো?”
সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“বিয়ে’তো প্রকৃতির নিয়ম। মেয়েরা’তো সারাজীবন বাবার বাড়ি থাকতে পারে না। মেয়েদের জন্মই হয় পরের বাড়ি যাবার জন্য। যেমন একদিন আমিও তো…”
কথাটা শেষ করল না সুমু। ভুল জায়গায় ভুল কথা বলে ফেলেছে ভেবে দাঁত দিয়ে জিহ্বায় কামড় বসাল।
শেরাজ সুমুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমিও তো কি?”
সুমু লজ্জা- লজ্জা মুখ করে বলল,
“কিছু না।”
কথাটা বলে খালি প্লেটগুলো হাতে নিয়ে রুম ত্যাগ করল।
শেরাজ সুমুর লজ্জা নিয়ে পালিয়ে যাওয়া দেখে আলতো হাসল। তারপর পকেট থেকে ফোন বের করে স্যান্ডিকে কল করল।
পার্লারের মেয়েরা এসে মাইশাকে সাজিয়েছে। মেরুন কালারের গর্জিয়াস লেহেঙ্গা পরানো হয়েছে মাইশাকে। মাথায় খোপা করে তার মধ্যে লাল পোলাপ গুঁজে দেয়া হয়েছে। গায়ে ভারি গয়না পরাছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখছে মাইশা।
মাইশার রুমে রেডি হচ্ছে সুমু। পার্লারের মেয়ে দিয়ে সাজেনি সুমু। তার হেবি মেকাপ একদম ভালো লাগেনা। তাই নিজে একাই সাজছে। কালো রঙের গর্জিয়াস লেহেঙ্গা পরাছে সুমু। ডান হাতে সিম্পল ব্রেসলেট পরা আর বা হাতে কালো কাঁচের চুড়ি, চুলগুলো স্ট্রেইট করে করে ছেড়ে রাখা, মাথায় সাদা স্টোনের সিম্পল টিকলি পরা, কানে সেম ডিজাইনের কানের দুল পরা, কপালে সাদা পাথরের টিপ পরা, গলায় একই ডিজাইনের নেকলেস পরা, কোমরে সাদা স্টোনর বিছা পরা, সেই সাথে চোখে কাজল আর ঠোঁটে হালকা গোলাপী লিপস্টিক পরা— এইটাই সুমুর সাজ।
মাইশা আয়নার সামনে থেকে সরে সুমুর সামনে এসে দাঁড়ালো। সুমুর চিবুক ছুঁয়ে চুমু খেয়ে বলল,
“তোকে তো ভারি মিষ্টি দেখতে লাগছে। আজ তো সবাই আমাকে রেখে তোকে দেখবে।”
সুমু লজ্জায় মাথা নামিয়ে নিয়ে বলল,
“তোমাকেও খুব সুন্দর লাগছে আপু। নয়ন ভাইয়া আজ তোমার দিক থেকে চোখ সরাতে পারবে না।”
এবার মাইশাও লজ্জা পেয়ে গেল। সুমু মাইশাকে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বলল,
“তুমি বসো আপু। আমি দেখে আসি সকলে রেডি হয়েছে কিনা।”
মাইশা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। সুমু আলতো হেসে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল।
করিডর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল সুমু। হঠাৎ কারো সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল সে। সামনে থাকা ব্যক্তির জামা খাঁমচে ধরে চোখ-মুখ খিঁচে বন্ধ করে করল সে। সামনে থাকা মানুষটার সারা শব্দ না পেয়ে চোখ পিটপিট করে তাকাল সুমু। আজ সুমু কতো নাম্বার ক্রাশ খেলো জানা নেই তার। নির্লজ্জের মতো ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল সামনে থাকা সুদর্শন পুরুষের দিকে। কালো স্যুট-ব্যুট পড়ে একদম পাক্কা জেন্টলম্যানর বেরিয়েছে। চুলগুলো জেল দিয়ে সেট করে রাখা।
সুমুর নাকে এলো সেই পরিচিত পারফিউমের ঘ্রাণ। শেরাজের এক হাত সুমুর কোমরে আর অন্য হাতে নিজের ফোন ধরে আছে। দুজনেই একে-অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ মানুষের চিৎকারের আওয়াজে ধ্যান ভাঙে দুজনের। দুজনেই চটজলদি সোজা হয়ে দাঁড়াল।
সুমু লজ্জায় লাল হয়ে গেছে। কোনোমতে নিজেকে সামলে সরি, সরি বলে পালাচ্ছিল সে। হঠাৎ সুমুর হাতে টান পড়ল। পিছনে তাকিয়ে দেখল তার খান সাহেব তারই হাত ধরে আছে।
শেরাজ ঘুরে না দাঁড়িয়ে সুমুকে টেনে সামনে এনে প্রশ্ন করল,
“কোথায় যাচ্ছো?”
সুমু আমতা-আমতা করে বলল,
“ব..বর এসেছে। তাই নিচে যাচ্ছিলাম।”
শেরাজ এক ভ্রু উঁচু করে বলল,
“বর এসেছে বুঝলাম। কিন্তু তোমার নিচে যাওয়ার কারণটা বুঝলাম না। তুমি নিচে গিয়ে কি করবে? মানে তোমার নিচে গিয়ে কি কাজ?”
সুমু মুখে হাসি রেখে বলল,
“বাহ রে! গেট ধরব না?”
“গেট ধরার অনেক মানুষ আছে। তোমাকে যেতে হবে না।”
সুমু মুখ কালো করে বলল,
“আমাকে কেনো যেতে হবে না? আমি যাবোই। আপনি আমার হাত ছাড়ুন।”
শেরাজের কপালের মাঝে কয়েকটা ভাঁজ পড়ল। সে কপাল কুঁচকে বলল,
“আমি যখন বলেছি না, মানে না।”
সুমু একটু উচ্চস্বরে বলল,
“কেনো যাব না, সেটা তো বলবেন।”
শেরাজ হালকা রাগ দেখিয়ে বলল,
“শেরাজ খানের কাছে কৈয়ফিয়ত চাইছো মেয়ে? দু’দিন ভালো করে কথা বলেছি বলে, খুব সাহস বেড়ে গেছে তাইনা?”
শেরাজের কথাশুনে সুমু আর নিজের অভিনয় করা রাগটা ধরে রাখতে পারল না। সে গলার স্বর নিচে নামিয়ে আমতা-আমতা করে বলল,
“এ..একটু গেলে কি হবে?”
শেরাজের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেল। হাতের বাঁধন শক্ত করে টানতে- টানতে নিজের রুমে নিয়ে গিয়ে সুমুকে ছুঁড়ে মারল বেডের ওপর। দরজা লক করে দিয়ে দাঁতে- দাঁত চেপে বলল,
“শেরাজ খান যখন বলেছে তুমি নিচে যাবে না, মানে যাবে না।”
সুমু আমতা-আমতা করে বলল,
“গে..গেট ধরলে বরের বাড়ির লোক টাকা দেয়। আমিও পেতাম। আপনার জন্য আমি টাকা পাব না। সামিয়া, নাজমিন, রাইফ, তিশা, রাইশা, ইফতিয়া— ওরা সবাই পাবে। শুধু আমি পাব না।”
শেরাজ পকেট থেকে নিজের ওয়ালেটটা বের করল। ওয়ালেট বের করে পাঁচ হাজার টাকা সুমুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“এই নাও, এখানের সব তোমার। আরও লাগলে বলো রাহিনকে দিয়ে তুলে আনছি।”
সুমু একবার শেরাজের হাতের দিকে তো একবার শেরাজের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনার টাকা আমি কেনো নিব? আপনার টাকা আমি নিব না। আপনি আমাকে যেতে দিন। আমি নিচে যাব।”
শেরাজের ধৈর্য্যের বাঁধ মুহুর্তেই রাগে পরিণত হলো। সে রাগ দেখিয়ে বলল,
“নিচে অনেক ছেলেরা আছে। তাই তুমি নিচে যাবে না।”
শেরাজের মুখ থেকে এমন এমন কথা শুনে সুমু একটু অবাক হলো। সাথে মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি আটলো। সে ইচ্ছে করে অনেক আগ্রহ দেখিয়ে বলল,
“সত্যি অনেক ছেলেরা এসেছে? তাহলে তো আমি যাবোই। আচ্ছা, ছেলেগুলো’কি অনেক সুন্দর দেখতে। আপনি তাদের দেখেছেন?”
শেরাজ আর নিজের রাগ কন্ট্রোল করে রাখতে পারল না। হেঁচকা টান দিয়ে সুমুকে বেড থেকে তুলে দেওয়ালের সাথে দুইহাত চেপে ধরল। মুহুর্তেই কাচের চুড়িগুলো ভেঙে সুমুর হাত কেটে গেল। গলগল করে রক্ত বের হতে শুরু করল। কাচের চুড়ির টুকরোগুলো মেঝেতে শব্দ করে পড়ল।
ঘটনাটা এতো তাড়াতাড়ি ঘটল যে, সুমুর মস্তিষ্ক বুঝে উঠতে পারল না। ভয়ে চোখ-মুখ খিঁচে বন্ধ করে রাখল সে। ওষ্ঠ তিরতির করে কাঁপছে তার।
শেরাজ সুমুর ভয়টাকে পাত্তা দিল না। সুমুর অনূভুতিগুলোকে আজ আর বোঝার চেষ্টা করল না। রাগে শরীর জ্বলছে শেরাজের। সুমুর দুইহাত আরও শক্ত করে চেঁপে ধরল সে। ব্যথায় “আহ্” করে মৃদু আওয়াজ করল সুমু। শেরাজ সুমুর দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। মুহুর্তেই সুমুর একহাত ছেড়ে গলার নেকলেসটা টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেললো সে। পুনরায় আবারও হাত চেপে ধরে দাঁতে- দাঁত চেপে বলল,
“জ্যান্ত মাটিতে পুঁতে ফেলব। ছেলেদের সামনে যাওয়ার খুব শখ তাই না? ছেলেদের সামনে নিজেকে শো করতে খুব ভালো লাগে? তা ওইসব ছেলেদের সামনে নিজেকে শো করতে পারলে, আমি বাদ যায় কেনো? আমার সামনেও একটু নিজেকে শো করো। লুক এ্যাট মি! দেখো আমার দিকে সুমু। আমি কোনো অংশে কম না। উল্টে আমার মতো এতো পারফেক্ট, হ্যান্ডসাম ছেলে তুমি সারাজীবন সাধনা করলেও পাবে না। দ্য ওয়ার্ল্ড ফেমাস শেরাজ খান বাহাদুরখেল, লাখো মেয়েদের হার্টথ্রব তোমাকে সুযোগ দিচ্ছে। সত্যি বলছি সুমু, একটাবার এই সুযোগটাতে রাজি হয়ে দেখো। খুশি করে দেবো তোমায়। এমন ভাবে খুশি করব ভবিষ্যতে আর কোনোদিন কোনো ছেলের সামনে যাওয়ার কথা মাথায় আনাতো দূরে থাক, কোনো ছেলের নামটা পযর্ন্ত মুখে নেওয়ার সাহস পাবে না তুমি।”
হাতের ব্যথায় বন্ধ চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে সুমুর। নিজের সম্পর্কে এমন জঘন্য কথাশুনে লজ্জায় অপমানে মরে যেতে ইচ্ছে করছে তার। শেরাজ আর সুমুর মধ্যে এক ইঞ্চিও দূরত্ব নেয়। ভয়ে সুমুর গলা শুকিয়ে কাঠ। সুমু জিহ্বা দিয়ে ঠোঁটে ভিজিয়ে নিল। এই দৃশ্য দেখে শেরাজ বেশামাল হয়ে গেল। নিজের ওষ্ঠদ্বয় এগিয়ে নিতে লাগল তিরতির করে কাঁপতে থাকা সদ্য ভিজিয়ে নেওয়া ওই ওষ্ঠদ্বয়ের দিকে। হাতের ব্যথায় আবারও মৃদু আর্তনাদ করে উঠল সুমু। এতে সম্মতি ফিরল শেরাজের। মাত্রই সে কি করতে যাচ্ছিল ওইটা ভেবে সুমুকে ছেড়ে সরে আসলো সে । নিজেকে সামলে বলল,
“টাকাগুলো রেখে দাও। শেরাজ খান একবার কাউকে কিছু দিলে, তা আর ফেরত নেয় না।”
কথাগুলো বলেই আর একমিনিটও দাঁড়াল না শেরাজ। হনহনিয়ে রুমের দরজা খুলে বেড়িয়ে যাচ্ছিল সে।
শেরাজ রুমের চৌকাট পেরোতেই সুমু বলল,
“আমি নেব না আপনার টাকা।”
কথাটা শেরাজের কান পযর্ন্ত আসতেই, সে বাঁকা হেসে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“শুধু টাকা কেনো, আজ যেমন তুমি মুখ বুজে আমার দেওয়া আঘাতগুলো সহ্য করলে— ঠিক এইভাবে একদিন তুমি স্বেচ্ছায় আমার দেওয়া আদরের চিহ্ন নিজের শরীরের প্রতিটি স্থানে বয়ে নিয়ে বেরাবে। শুধু আদরের চিহ্ন না, আমার দেওয়া স্পার্ম তুমি স্বেচ্ছায় নিজের শরীরে পুষ করতে দিবে— এবং স্বেচ্ছায় আমার ভবিষ্যৎ বাচ্চাকে নিজের গর্ভে ধারন করবে। শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা।”
কথাগুলো মনে-মনে বলে নিচে চলে গেল শেরাজ। ভেতর থেকে শেরাজের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল সুমু।
মাইশাকে স্টেজে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিয়ে পড়ানো শুরু হয়েছে। আইয়ুব নাজমিনের পিছে পিছে ঘুরছে। রাহিনও সামিয়াকে নজরে নজরে রেখেছে। শেরাজ নিচে এসে বাকি বন্ধুদের সাথে বসে আছে, কিন্তু মন পড়ে আছে সুমুর কাছে।
কাজি সাহেব মাইশাকে কবুল বলতে বলছে, কিন্তু মাইশা কিছুতেই কবুল বলছেনা। মাইশার বান্ধবীরা বার বার মাইশাকে কবুল বলতে বলছে। তবুও মাইশা চুপ করে আছে। নয়ন আড়ে আড়ে মাইশার দিকে তাকাচ্ছে।
মাইশা কবুল বলছে না বলে নয়ন নিজের হাতটা মাইশার হাতের ওপর রাখল। ব্যাস! এতেই মাইশা ভরসা পেল। সে ধিরে- ধিরে তিন কবুল বলল। সকলে একসাথে “আলহামদুলিল্লাহ্” বলে উঠল।
এইবার কাজী নয়নকে কবুল বলতে বলল। নয়ন বেশি সময় নিল না। সে ফটাফট কবুল বলে দিল। সকলে আবারও আলহামদুলিল্লাহ্ বলল। মাইশা আর নয়নকে রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করতে দেওয়া হলো। দুজনে সময় না নিয়ে সাইন করে দিল। মৌলভী সাহেব নতুন বর আর কনের জন্য দোয়া করলেন। সকলে একসাথে তাদের জন্য দোয়া করল।
বিয়ে পড়ানো শেষ হবার সাথে- সাথে শেরাজ উঠে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। নিজের রুমে এসে দেখল সুমু বেলকনিতে দাঁড়িয়ে বাহিরে গার্ডেনের দিকে তাকিয়ে আছে— হয়তো বিয়ে পড়ানো দেখছে। শেরাজ সুমুর পাশে এসে দাঁড়ল।
সুমু কারো উপস্থিত টের পেয়ে চোখের পানি মুছল। শেরাজ সুমুর হাত ধরে টেনে নিয়ে বেডের ওপর বসালো। ফাস্ট এইডের বক্স এনে সুমুর হাতে খুব যত্ন করে ঔষধ লাগিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিল। সুমুর উদ্দেশ্যে বলল,
“উঠে দাঁড়াও।”
সুমুর কথার মানে না বুঝে আহাম্মকের মতো তাকিয়ে রইল। শেরাজ সুমুর হাত ধরে পিছন ঘুরিয়ে দাঁড় করালো। হাত দিয়ে সুমুর চুল সরিয়ে গলার পিছনের ক্ষত জায়গাটায় হাত রাখল।
শেরাজের হাতের নরম স্পর্শে কেঁপে উঠল সুমু। মুহুর্তেই চোখ বন্ধ করে ফেললো সে। সুমুর অস্বস্তি বুঝে শেরাজ দ্রুত মলম লাগিয়ে দিল। চুলগুলোকে আবারও পুনরায় জায়গা মতো রেখে দিয়ে বলল,
“সরি!”
সে একটু থেমে আবারও বলল,
“নিচে যাবে?”
পরের কথাটা সুমুর কান অবধি গেল না। সে আহাম্মকের মতো ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে তার খান সাহেবের দিকে। শেরাজের বলা সরি শব্দটাতে কি আছে জানেনা সুমু। মুহুর্তেই তার সব রাগ, অভিমান গলে পানি হয়ে গেল।
শেরাজ আবারও বলল,
“নিচে যাবে?”
হুঁশ ফিরল সুমুর। নিজের অজান্তেই “হুম” বলল সে। শেরাজ ফাস্ট এইডের বক্সটা জায়গা মতো রেখে সুমুকে নিয়ে চললো গার্ডেনের উদ্দেশ্যে।
গার্ডেনে আসতেই সামিয়া আর নাজমিন সুমুর সামনে এসে দাঁড়াল। শেরাজ ওদের পাশ কেটে চলে গেল বন্ধুদের দিকে।
সামিয়া বলল,
“এতোক্ষণ কোথায় ছিলে আপু? বিয়ে পড়ানো তো শেষ হয়ে গেছে।”
সুমু বলল,
“আমার মাথায় একটু ব্যথা করছিল, তাই রুমে ছিলাম।”
নাজমিন সুমু হাত দেখে বলল,
“তোমার হাতে কি হয়েছে আপু?”
সুমু পড়ল মহাবিপদের। এরা দুজন একেরপর এক প্রশ্ন করেই চলেছে। না জানি আরো কে কে প্রশ্ন করবে তাকে। কথাগুলো মনে-মনে বলে, মুখে বলল,
“বরযাত্রী এসেছে শুনে দৌড়ে আসছিলাম। তখন দেয়ালের সাথে হাতে ধাক্কা লেগে চুড়ি ভেঙে হাত কেটে গেছে। এখন ঠিক আছে। ঔষধ লাগিয়ে নিয়েছি।”
সামিয়া বলল,
“আপু ফটোসেশন হবে এখন, চলো।”
তারা দুজন সুমুকে নিয়ে চলে গেল স্টেজের দিকে।
মাইশারা ফটোসেশন করছে। একে- একে সকলের ফটোসেশন করা শেষ। মাইশা সব বোনদের নিয়ে পিক তুলবে। সে সকলকে স্টেজের ওপর ডাকল। সুমুরা উঠে এল স্টেজের ওপর। মাইশা সুমুকে হাতের কথা জিঙ্গাসা করল। সুমু একই উত্তর দিল।
মাইশা বলল,
“কতো বড়ে হয়ে গেছিস সুমু, এখনো বাচ্চাদের মতো করিস। নিজের খেয়ালটাও ঠিকমতো রাখতে পারিস না। আয় আমার পাশে দাঁড়া।”
সুমু গিয়ে মাইশার পাশে দাঁড়াল। ক্যামেরাম্যান কয়েকটা ফটো তুলে নিল। মাইশা সবশেষে নিজের ভাইদের ডাকল। রাহিনসহ, তার সব ফ্রেন্ডরা উঠে এলো, শুধু সারবাজ ছাড়া।
শেরাজ সারবাজকে কিছু একটা বলে স্টেজে উঠে এলো। সে গিয়ে দাঁড়াল সুমুর পাশে। সুমু শেরাজের দিকে ঘাড় কাত করে মাথা উঁচু করে তাকাল। শেরাজও সুমুর দিকে তাকাল। এমন সময় সারবাজ দুজনকে একসঙ্গে ক্যামেরা বন্দি করল। সে আরও কিছু ওদের দুজনের আলাদা পিক নিয়ে নিজেও স্টেজের ওপর উঠে এলো। ক্যামেরাম্যান সকলকে একসাথে ক্যামেরা বন্দি করল।
ইফতিয়া জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে শেরাজ আর সুমুকে পাশাপাশি দাঁড়াতে দেখে। শুধু নিজের মায়ের নিষেধাজ্ঞার জন্য কিছু করতে পারছেনা সে।
আইয়ুব আর রাহিনও চালাকি করে সারবাজকে দিয়ে তাদের প্রিয়তমাদের সাথে আলাদাভাবে ফটো তুললো। মাইশা নিজের ফুল ফ্যামিলির সাথে নিজেকে ক্যামেরা বন্দি করল।
ফটোসেশন শেষে বর আর কনেকে একসাথে খেতে দেওয়া হলো। সেই সাথে বরযাত্রীর সবাইকেও দেওয়া হলো। বরযাত্রীর শেষে বাকি সবাইকে খেতে বসানো হলো।
সকলের খাওয়া শেষ হলো। এবার মাইশার বিদায়ের পালা। আনোয়ার সাহেব মেয়েকে জামাইয়ের হাতে তুলে দিল। মাইশা অনবরত কেঁদেই চলেছে। আনোয়ার সাহেব নিজের মেয়েরকে জামাইয়ের হাতে তুলে দিয়ে, মেয়ে জামাইকে একসাথে জড়িয়ে ধরে বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন। যেতে-যেতে দু’ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল তার চোখ থেকে। মিনা বেগম কেঁদেই চলেছেন। হাসি বেগম, খুশি বেগম তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন।
মাইশা রাহিনের সামনে গেল। রাহিন বোনের সামনে নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। বোনকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে দিল। আইয়ুবরা তাকে সামলাচ্ছে। রাহিনের কান্না দেখে সামিয়ার খুব মায়া হলো। সে পানির গ্লাস এগিয়ে দিল রাহিনের দিকে। রাহিন প্রেয়সীর মুখে দিকে তাকিয়ে পানিটা পান করল। আইয়ুবরা সরে আসলো, ওদের দুজনকে স্পেস দিয়ে। সামিয়া রাহিনকে শান্ত করল। মাইশা একে- একে সকলের থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। আত্মীয়রাও বিদায় নিল।
খান সাহেব পর্ব ১০
সকলকে বিদায় দিতে- দিতে রাত আটটা বেজে গেল। আত্মীয়রা সবাই চলে গেছেন। সিকদার বাড়ি এখন ফাঁকা— শুধু সুমুরা, ইফতিয়ারা, আর রাহিনের ফ্রেন্ডরা আছে। সকলে হালকা খাবার খেয়ে শুয়ে পড়ল। আজ সকলেই অনেক টায়ার্ড। তাই সকলে ঘুমিয়ে পড়ল তাড়াতাড়ি। শুধু একটা রুমের আলো জ্বলছে। এখন তারা জঘন্য প্ল্যান করতে ব্যস্ত।
