Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ২৭

খান সাহেব পর্ব ২৭

খান সাহেব পর্ব ২৭
সুমাইয়া জাহান

ফাঁকা শুনশান রাস্তা দিয়ে একটা গাড়ি ফুল স্পিডে চলছে। কখনও কখনও গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। শেরাজ ড্রাঙ্ক অবস্থায় গাড়ি ড্রাইভ করছে। রাহিন শেরাজের পাশে বসে ভয়ে কাঁপছে। গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললে সামলে নিচ্ছে সে। কিন্তু নিজে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসতে পারেনি। শেরাজের জেদের কাছে হার শিকার করে ড্রাইভিং সিট শেরাজকে ছেড়ে দিয়েছে।
শেরাজ রাহিনকে নিজের সাথে আনতে নারাজ ছিল। রাহিন জোর করে এসেছে, আর বলেছে, সে শুধু পাশের সিটে চুপচাপ বসে থাকবে। তাই রাহিনকে সাথে নিয়ে এসেছে শেরাজ। কিন্তু, এখন শেরাজ প্রচন্ড বিরক্ত। কারণ, রাহিন পাশে বসে ড্রাইভিংয়ের মধ্যে তাকে ডিস্টার্ব করে চলেছে। প্রথমবার ড্রিঙ্কস করাতে, ভালো করেই নেশা চড়েছে শেরাজের। তবে মস্তিষ্ক পুরোপুরি সজাগ আছে। রাহিন পাশে বসে বারবার তাকে গাড়ির স্পিড কমাতে বলছে। বাধ‍্য হয়ে সে একটা দোকানের সামনে গাড়ি থামিয়ে মাতাল কন্ঠে বলল,

“চোখে ঝাপসা দেখছি, রাহিন। এক বোতল পানি এনে দিবি, প্লিজ।”
রাহিন ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আনতে পারি। তবে তার আগে তোর আমাকে কথা দিতে হবে যে, তুই আমাকে ড্রাইভ করতে দিবি।”
শেরাজ চোখমুখ কুঁচকে বিরক্তিরস্বরে বলল,
“ওকে, দিব। আগে পানি আন।”
রাহিন গাড়ি থেকে নেমে দোকানে গেল পানি আনতে। পানির বোতল হাতে নিয়ে পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে দোকনদারকে টাকাটা দিতে গিয়ে গাড়ির শব্দ পেয়ে পেছনে ফিরে তাকাল সে। দোকানদারের হাতে টাকাটা কোনোমতো ধরিয়ে দিয়ে দৌড়ে এসেও গাড়িটাকে ধরতে পারল না সে। পেছন থেকেই চিৎকার দিয়ে বলল,
“এস.কে তুই ড্রাঙ্ক। গাড়ি থামা, ব্রো। খারাপ কিছু হওয়ার আগে গাড়ি থামা এস.কে, প্লিজ।”

রাহিনের কথাগুলো শেরাজের কান পযর্ন্ত পৌঁছাল না। মিনিট পাঁচেক রাস্তা আসতেই সে গাড়ির ভারসাম্য হারিয়ে ফেললো। গাড়ি সামাল দিতে গিয়ে ব্রেক কষল, কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না। গাড়ি গিয়ে বারি খেলো গাছের সাথে। স্টিয়ারিংয়ের সাথে মাথায় লাগল তার। গাড়ির সামনের গ্লাস ফেঁটে চৌঁচির হয়ে গেল। কিছু কাচের টুকরো এসে শেরাজের শরীরে বিঁধল। গাড়ির স্পিড ফুল থাকায় স্টিয়ারিংয়ের সাথে কপালে খুব জোরেশোরেই লেগেছে তার। মুহূর্তের মধ্যে কপালের ফাঁটা জায়গা দিয়ে ব্লাড বের হতে শুরু হলো। কাচের টুকরো ঢুকে আর গাড়ির দরজার সাথে বারি খেয়ে ডান হাতটা খুব ভালো ভাবেই যখম হলো। শূনশান রাস্তা হওয়ায় এখন খুব একটা মানুষ নেই রাস্তা। তবুও যারা যারা আশেপাশের দোকানে ছিল, তারা সকলে দৌড়ে এলো। মিনিট দশেক বাদে রাহিন দৌড়াতে দৌড়াতে এসে পৌঁছাল। গাড়ির সামনে মানুষের ভিড় দেখে অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল তার। সে আর এগিয়ে না এসে ওখানেই বসে পড়ল।

আশেপাশের লোকজন ততক্ষণে শেরাজকে গাড়ি থেকে বের করে এনেছে। কপাল দিয়ে প্রচন্ড ব্লিডিং হচ্ছে তার। এখনো জ্ঞান থাকলেও যেভাবে ব্লিডিং হচ্ছে তাতে কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান হারাবে সে। হলোও তাই। গাড়ি থেকে বের হবার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই জ্ঞান হারাল সে। আশেপাশের সবাই বলছে, পুলিশ কেস। আগে পুলিশকে কল করতে হবে। একজন লোক রাহিনকে ধরে নিয়ে এলো। রাহিন এসে বসল শেরাজের পাশে। শেরাজের মুখের দিকে তাকিয়ে সে আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। গগন ফাটিয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠল সে। কাঁদতে কাঁদতে সে বারবার বলতে লাগল,
“এস.কে চোখ খোল, ব্রো। প্লিজ, চোখ খোল। তোর কিছু হবেনা এস.কে। আমি তোর কিছু হতে দিব না। তুই কেনো আমার কথা শুলনি না এস.কে? তোর কিছু হয়ে গেলে আমাদের কি হবে? আমাদের গ‍্যাঙ্গটা শেষ হয়ে যাবে। চোখ খোল, ব্রো।”

আর কোনো কথা বলতে পারল না রাহিন। কান্নার তোপে কথা আটকে আসছে তার। কে বলেছে ছেলে মানুষ কাঁদতে জানেনা? রাহিনের এই আর্তনাদ, এই গগন ফাটানো চিৎকার, এই কান্নার আওয়াজ আজ দুনিয়ার মানুষ শুনলে তারা হয়তো বলতো, ছেলেরাও কাঁদে। প্রচন্ড কষ্ট আর কাছের খুব প্রিয় কাউকে হারানোর ভয়ে ছেলেরাও কাঁদে। ছেলেরা কাঁদতে পারেনা, ছেলেদের কান্না মানায় না, এই সত্য কথা দু’টো আজ রাহিনের কান্নার কাছে মিথ্যা প্রমাণিত হলো। রাহিনের কান্না দেখে কেউ আর তাকে কিছু জিঙ্গাসা করল না। এখানে থাকা একটি লোক তার গাড়ি নিয়ে এলো। সকলে মিলে শেরাজকে লোকটির গাড়িতে তুলে দিল। একজন লোক বলল,
“ছেলেটা কি এখনো বেঁচে আছে?”
কথাটা রাহিনের কানে পৌঁছাতেই রাহিন লোকটির দিকে তেড়ে গেল। সকলে মিলে রাহিনকে সামলে গাড়িতে তুলে দিল। এখন পযর্ন্ত কেউ পুলিশকে কল করেনি। যেহেতু আহত লোকটির বাড়ির লোক তার সাথেই আছে, তাই সকলে পুলিশের ব‍্যাপারটা এড়িয়ে গেল। রাহিনের সাথে আরও দু’জন লোক গাড়িতে উঠল। রাহিনের যেই অবস্থায়, এই অবস্থা সে সবকিছু একা একা সামলাতে পারবেনা বলে লোক দু’জন তার সাথে গেল। আর তাদের মতে, “দেশের নাগরিক হিসাবে তাদেরও কিছু দায়িত্ব আছে। তাই তারা তাদের দায়িত্ব পালন করছে।”

বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে সুমু। মনটা বড্ড অশান্ত তার। খান সাহেবের সাথে রাহিন আছে, এইটা জেনেও মনটা কিছুতেই শাস্ত করতে পারছেনা সে। হঠাৎ সিকদার বাড়ির ড্রয়িংরুমে টেলিফোন বেজে উঠল। সুমুর কানে কলের শব্দ যেতেই প্রচন্ড বিরক্ত হলো সে। রাহিনকে সে অনেকবার কল করেছে, তবে রাহিনের কোনো রেসপন্স পায়নি। ড্রয়িংরুমে ফোন বাজতে বাজতে কেটে গেল। সেকেন্ড দশেকের মধ‍্যে আবারও বেজে উঠল। সুমুর কাছে কলের শব্দটা খুব করুণ, আর্তনাদী মনে হলো। তার মনে হলো ওটা কলের শব্দ নয়, কারো আর্তনাদের শব্দ। কোনো খারাপ খবর আসার সংকেত। সুমুর বুকের ভেতর ধক করে উঠলো এই অসময়ে আসার কারণটা বুঝল না সে। আর দেরি না করে রুমে ছেড়ে দৌড়ে ড্রয়িংরুমে এলো। সে কাঁপা হাতে ফোনটা কানে নিয়ে “হ‍্যালো” বলল। ত্রিশ সেকেন্ড মতো কিছু একটা শোনার পর ফোনটা আপনাআপনি হাত থেকে পড়ে গেল তার। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে মেঝের ওপর ধপাস করে পড়ে গেল। অপরিচিত লোকটি কথাগুলো আবারও কানে বেজে উঠতেই, গগন ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল সে। তার চিৎকারের আওয়াজে পুরো সিকদার বাড়ি জেগে উঠল। মুহূর্তেই সিকদার বাড়ির প্রতিটা কোণা আলোকিত হয়ে উঠল। সকলে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো ড্রয়িংরুমে।

সুমুকে মেঝেতে বসে কাঁদতে দেখে সকলেই তাকে প্রশ্ন করল। কান্নার তোপে সে কথা বলতে পারছে না। মাইশা, সামিয়া, নাজমিন এসে তার পাশে বসল। খারাপ কিছু যে ঘটেছে, আইয়ুবদের আর বুঝতে বাকি নেই। আইয়ুব দেরি না করে রাহিনের নাম্বারে কল করল। কল দুবার রিং হওয়ার সাথে সাথে একজন অপরিচিত লোক কল রিসিভ করল। লোকটির মুখ থেকে সবকিছু শোনার পর আইয়ুব বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। সারবাজ, আইয়ুবকে দু’বার জিঙ্গাসা করল, “কি হয়েছে।” আইয়ুব কোনো কথা না বলে, মেঝের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সারবাজ, আইয়ুবের দু’বাহু ধরে ঝাকি দিতেই হুঁশে ফিরল সে। করুণ স্বরে আমতা আমতা করে বলল,

“এস… এস.কের এক্সিডেন্ট হয়েছে। ঢাকা স্কয়ার হসপিটালে ভর্তি। অবস্থা খুব ক্রিটিক‍্যাল। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে। দুই ব‍্যাগ রক্ত দেওয়া লাগবে। রক্ত দেওয়া হচ্ছে। তবে এস.কের বডি রক্ত নিয়ে সক্ষম হচ্ছেনা।”
আইয়ুবের কথাশুনে সকলে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ ড্রয়িংরুমে সুমুর কান্না ছাড়া আর কারো কথা শোনা গেলে না। কারো মধ‍্যে আর এক্সিডেন্ট কীভাবে হলো, কখন হলো, এমন কোনো প্রশ্ন করার মতো সাহস অবশিষ্ট নেই। হঠাৎ সুমু কাঁদাত কাঁদতে উঠে দাঁড়াল। আইয়ুবের পায়ের সামনে বসে বলল,
“ভাইয়া! দয়া করে আর দেরি না করে আমাকে ওনার কাছে নিয়ে চলুন। আমি মরে যাব ওনাকে ছাড়া, ভাইয়া। এই দেখুন, আমার নিঃশ্বাস আটকে আসছে। ওনার কিছু হয়ে গেলে আমি মরে যাবে। দয়া করে আমাকে নিয়ে চলুন। আমার একটা ভুলের জন্য উনি আমাকে এতো বড় শাস্তি দিতে পারেন না।”
আইয়ুব সুমুর দিকে তাকাল। সে কান্নামাখা কন্ঠে বলল,

“ভাবিজি! আমি জানিনা আপনার আর এস.কের মধ্যে বাসার ফেরার পর আবারও কি হয়েছে? আর আমি জানতেও চাইনা। কিন্তু, একটা কথা জেনে রাখুন, আর কারো কথা জানিনা। তবে আজ এস.কের যদি কিছু হয়, তাহলে আমি আপনাকে কোনোদিনও ক্ষমা করতে পারব না। এই কথাটা আমি ভরা ড্রয়িরুমের সকলের সামনে বলে রাখলাম।”
কথাগুলো বলে আইয়ুব বেরিয়ে গেল। কেউ আর দাঁড়িয়ে রইল না। মাইশা এসে সুমুকে টেনে তুললো। সকলে একসাথে বেরিয়ে গেল বাসা থেকে। তিশা, রাইফ, খুশি বেগম আর হাসি বেগম ছাড়া সকলেই হসপিটালের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।

সকলে হন্তদন্ত হয়ে হসপিটালে ঢুকল। আইয়ুবদের দেখে একটা লোক এগিয়ে এসে বলল,
“আপনাদের আমি কল করেছিলাম। এক্সিডেন্ট করা ছেলেটার সাথে যেই ছেলেটা ছিল, সে তো কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। ভালো হয়েছে আপনারা চলে এসেছেন।”
সকলে মিলে লোকটির সাথে অপারেশন থিয়েটারের সামনে এলো। রাহিনের কাছ থেকে সবটা শুনলো সকলে। তারপর থেকেই সবাই চুপ মেরে গেছে। স‍্যান্ডি তার স‍্যারের জন্য কেঁদেই চলেছে। সারাবাজরা সকলে চুপ করে বসে আছে। সুমু গাড়িতে আসার সময় দু‍’ বার কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারিয়েছে। কিন্তু, এখন সে চুপ করে মেঝেতে বসে আছে। তবে চোখের পানি এখনো বাঁধ মানেনি তার।
ডাক্তার বেরিয়ে এলো অপারেশন থিয়েটার থেকে। ডাক্তারকে বেরোতে দেখে সকলে ঘিরে ধরল তাকে। সারবাজ অস্থির হয়ে বলল,

“আমার ভাইয়ের এখন কি অবস্থা, ডাক্তার? আমার ভাই সুস্থ হয়ে যাবে তো?”
ডাক্তার কিছুটা চিন্তিত কন্ঠে বললেন,
“দেখুন, আমরা আমাদের মতো চেষ্টা করে যাচ্ছি। পেশেন্টের বডি রেসপন্স না করা অবধি আমরা আপনাদের কিছুই বলতে পারব না। তবে, পেশেন্টের অবস্থা এখনো বিপদজনক। এক ব‍্যাগ ব্লাড বডি অনেক কষ্ট করে নিতে সক্ষম হয়েছে। আর এক ব‍্যাগ ব্লাড পেশেন্টের বডি নিতে পারলে হয়তো পেশেন্ট রেসপন্স করতে পারে। আর ব্লাড নিতে না পারলে আমাদের আর কিছু করার নেই। বাকিটা আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিতে হবে। মাথায় আটটা স্টিচ পড়েছে। ওনাকে কিছুক্ষণ পরে আইসিইউতে শিফট করা হবে। মাথার মতো একটা সেনসিটিভ জায়গায় এতো বড় আঘাত। আপনারা পেশেন্টকে এখানে আনতে অনেকটা দেরি করে ফেলেছেন। ওনার বডি থেকে অনেক ব্লাড বেরিয়ে গেছে, যার ফলে ওনার কান্ডিশন এতোটা সিরিয়াস। তবুও আমরা চেষ্টা করছি। বাকিটা ওপরওয়ালার হাতে। আর একটা কথা, পেশেন্ট ড্রাঙ্ক অবস্থায় ড্রাইভিং করছিল। উনি কি জানতেন না, নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো অপরাধ? এর জন‍্য তো পুলিশ কেস হতে পারে।”
আইয়ুব বেশ নরম কন্ঠে বলল,

“দেখুন ডাক্তার, ও ড্রিংকস করেনা। আজ হয়তো কোনো একটা কারণে মাথা গরম করে ড্রিংকস করে ফেলেছে। এই ব‍্যাপারটা নিয়ে আপনারা প্লিজ পুলিশকে কিছু জানাবেন না। ও সুস্থ হোক, তারপর প্রয়োজনে আমরা নিজেরাই পুলিশকে জানাব।”
আইয়ুবের কথার মাঝেই সুমু দৌড়ে এসে ডাক্তারের সামনে দাঁড়াল। সে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“ডাক্তার আঙ্কেল! বিশ্বাস করুন, উনি ড্রিংকস করেনা। আজ আমার সাথে রাগ করে এমনটা করে ফেলেছেন। আপনি ওনাকে সুস্থ করে দিন।”
ডাক্তার সুমুর দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন,
“তুমি পেশেন্টের কে হও, মামনি?”
“আমি ওনার স্ত্রী। প্লিজ, ওনাকে সুস্থ করে দিন, আঙ্কেল।”
ডাক্তার সুমুর মাথার ওপর হাত রেখে বললেল,
“তুমি আমার মেয়ের বয়সি, মামনি। আর আপারেশন থিয়েটারে যে শুয়ে আছে সেও আমার ছেলের বয়সি। আমাদের কাজই মানুষকে সুস্থ করা। আমি তোমার স্বামীকে বাঁচানোর জন‍্য সব রকমের চেষ্টা করব। বাকিটা আল্লাহর হাতে। তুমি আল্লাহরকে স্বরণ করো।”
কথাগুলো বলে ডাক্তার সুমুর মাথায় দু’বার হাত বুলিয়ে চলে গেলেন।

ফজরের আজান পড়েছে। আইয়ুবরা উঠে পাশের মসজিদে গেল নামাজ পড়তে। সুমু, নাজমিন, সামিয়া, স‍্যান্ডি আর শেরাজের সব ফ্রেন্ডরা বাদে সকলে বাড়ি ফিরে গেছে। কেউ যেতে চায়নি। আইয়ুবরা জোর করে সকলকে বাড়ি পাঠিয়েছে। সুমুর জন‍্য নাজমিন আর সামিয়াকে যেতে বলেনি। ওরা থাকলে সুমুকে সামলাতে পারবে বলে, ওরা দুজন রয়ে গেছে। শেরাজের বডি এখনো রেসপন্স করেনি। বাকি এক ব‍্যাগ ব্লাডের অর্ধেকটা বডি নিতে সক্ষম হয়েছে, তবে বডি এখনো রেসপন্স করছেনা বলে ডাক্তাররা অনেক চিন্তিত। সামিয়া আর নাজমিন সুমুকে নিয়ে নামাজ পড়তে গেল। নামাজে বসে সুমু কেঁদে উঠল। তার এক একটা সেজদায় অনেক দীর্ঘ হলো আজ। সামিয়া আর নাজমিন নিজেদের নামাজ শেষ করে সুমুকে রেখে আবারও শেরাজের কেবিনের সামনে এলো। আইয়ুবরা নামাজ আদায় করে চলে এসেছে মিনিট দশেক হলো। সকলের চিন্তায় অবস্থা খারাপ। কাল রাতে শেরাজকে আইসিইউতে শিফট করা হয়েছে। তবে কারো সাথে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। সুমু অনেকবার চেষ্টা করেও একপলক ভালো করে দেখতে পারেনি তার খান সাহেবকে। শুধু তাদের সামনে দিয়ে আইসিইউতে নেওয়ার সময় একটু দেখেছে সকলে।

আটটার দিকে সিকদার বাড়ির সকলে আবারও হসপিটালে এলো। ডাক্তার এসে জানালো পেশেন্টের বডি দু’ব‍্যাগ ব্লাড নিতে সক্ষম হয়েছে, তবে পেশেন্টের বডি এখনো পযর্ন্ত রেসপন্স করেনি। ৪৮ ঘন্টার আগে পেশেন্টের বডি রেসপন্স না করলে, পেশেন্ট কোমায় চলে যেতে পারে।
সুমু এখনো হসপিটালের নামাজ ঘর থেকে বের হয়নি। জায়নামাজের ওপর প্রাণহীন মানুষের মতো বসে আছে সে। কাল থেকে একবারও কি চোখে পানি তার শুকিয়ে ছিল তার। নাহ! শুকায়নি।
মাইশা এসে সুমুর পাশে বসল। সুমুর মাথার ওপর হাত রাখতেই সুমু মাইশাকে জড়িয়ে ধরে অঝরে কেঁদে উঠল। মাইশা তাকে শেরাজের বতর্মান অবস্থার কথা জানালো। সে মাইশাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,

“আমি ওনাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না, আপু। আমি অনেক বড় একটা ভুল করে ফেলেছি, আপু। তার জন‍্য উনি আমাকে এতোবড় শাস্তি না দিলেও পারতেন। উনি তো আমাকে ভালোবাসেন, তাহলে আমাকে এতো বড় শাস্তি কীভাবে দিলেন, আপু? আমাকে এতোবড় শাস্তি দেওয়ার আগে কি একবারও ওনার আমার মুখটা মনে পড়েনি? উনি কি একবারও ভেবেছিলেন যে, আমি ওনার দেওয়া এতো বড় শাস্তি সহ‍্য করতে পারব কি পারবোনা? ভাবেনি, তাইনা আপু? যদি ভাবতো তাহলে কি উনি পারতেন এমনটা করতে? আমাকে এতোবড় শাস্তি দিয়ে আরামে শুয়ে আছেন। আমার আর্তনাদ কি তার কান পযর্ন্ত পৌঁছাছেনা? উনি এতোটা পাষাণ, নির্দয় কীভাবে হলেন? উনি আমাকে বলেছিলেন, আমাকে আর কাঁদতে দেবেন না। তাহলে আজ যে আমি এতো কাঁদছি, উনি কি শুনতে পারছেনা আমার কান্নার আওয়াজ?

উনি আমাকে বলেছিলেন, আমার একফোঁটা চোখের পানি ওনার কাছে অনেক মূল‍্যবান। উনি নাকি আমার চোখের পানি মাটিতে পড়তে দেবেন না। তাহলে এখন? তুমি তাকিয়ে দেখে আপু, আমার কতো চোখের পানি কাল থেকে মাটিতে পড়ছে। কই উনি তো আমার চোখের পানি মাটিতে পড়ার আগে হাতে তুলে নিলেন না। আমার চোখের পানির থেকে, আমার কান্নার থেকে, ওনার কাছে শুয়ে থাকাটা বেশি জরুরী হয়ে গেল। ওনাকে উঠে আসতে বলোনা আপু।
ওনাকে গিয়ে বলো, আমি শুধু ওনার দেওয়া এই শাস্তিটা ছাড়া যেকোনো শাস্তি মাথা পেতে নেব। যদি সে শাস্তি আমার মৃত্যুও হয়, সেটাও আমি হাসি মুখে গ্রহণ করব। তবুও তিনি যেন একটিবার শোয়া থেকে উঠে বসে আমাকে “সুইটহার্ট” বলে ডাক দেয়। বিশ্বাস করো আপু! কাল রাতে যদি বুঝতে পারতাম উনি আমার জন‍্য এতো বড় শাস্তির ব‍্যবস্থা করতে চলেছেন, তাহলে তখনই ওনার পায়ের সামনে লাশ হয়ে পড়ে থাকতাম। তবুও ওনাকে আমার জন‍্য এতো বড় শাস্তির ব‍্যবস্থা করার জন‍্য বাসা থেকে বের হতে দিতাম না।”
সুমুর আর্তনাদ মাইশার হৃদয় পোড়াচ্ছে। সে চোখের পানি মুছে সুমুকে বলল,

“এভাবে কাঁদিসনা। ভাইয়ার কিছু হবেনা। তুই নিজেকে শক্ত রাখ। তুই তো স্ট্রং গার্ল, সুমু। এভাবে কাঁদলে চলবে? দেখিস তোর ডাক আল্লাহ শুনবেন। তিনি ভাইয়াকে সুস্থ করে দেবেন। এখন চল একটু কিছু খেয়ে নিবি। এভাবে চললে তোকেও হসপিটালে ভর্তি করতে হবে। চল বোন।’
মাইশা টেনে তুললো সুমুকে। সে সুমুর চোখের পানি মুছতে নিলে, সুমু মাইশার হাত থামিয়ে দিয়ে বলল,
“মুছবে না, আপু। আমিও দেখতে চাই উনি কতক্ষণ আমার চোখের পানি সহ‍্য করতে পারেন। উনি না বলেছেন, আমার চোখের পানি উনি মাটিতে পড়তে দেবেন না। তাহলে আজ কেনো পড়লো? তাহলে কি উনি আমাকে মিথ্যা প্রমিজ করেছিল? হয়তো তাই। আর এরজন‍্যই উনি যতক্ষণ পযর্ন্ত নিজে আমার চোখের পানি মুছে দিবেন না, ততক্ষণ পযর্ন্ত এই পানি থাকবে।”
মাইশা আর কথা না বলে সুমুকে নিয়ে এলো। বাসা থেকে আনা খাবার বের করে সুমুর মুখে সামনে ধরতেই, সুমু মাইশার হাত ধরে থামিয়ে বলল,

“কাল রাত থেকে উনিও কিছু খায়নি, আপু। রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার আনার সময় ভেবেছিলাম ওনার সাথে বাসায় গিয়ে খাব। কাল রাত থেকে উনি স‍্যালাইন ছাড়া আর কিছুই খায়নি। তাই আমাকেও যদি কিছু খাওয়াতে হয় তাহলে স‍্যালাইনটাই দাও।”
মাইশা রাগিস্বরে বলল,
“তুই কি পাগল হয়ে গেছিস, সুমু? না খেয়ে থাকলে তুই বাঁচবি? জেদ না করে খেয়েনে।”
সুমু একটু উচ্চস্বরে চেঁচিয়ে বলল,
“হ‍্যাঁ! আমি পাগল হয়ে গেছি। উনিও একটু উঠে দেখুক, ওনার জন‍্য ওনার সুমুর কি অবস্থা। আর তুমি বলছো, আমি জেদ করছি? তাহলে উনি কি করছেন? উনি জেদ করছেন না? উনি ঘাড়ত‍্যাড়ামি করে, জেদ ধরে ওই আইসিইউর মধ্যে শুয়ে আছে না? এতো জেদ ওনার যে, একটু রেসপন্স পযর্ন্ত করছেন না। আর তুমি আমাকে বলছো, আমি জেদ করছি?”
সে আর একটু জোরে আইসিইউর দিকে তাকিয়ে বলল,

“ওনাকে বলে দাও মাইশা আপু, উনি বুনো ওল হলে আমিও বাঘা তেতুল। জেদ শুধু ওনার একারই আছে। আর কারো নেই। উনি জেদ করলে আমার সাথে জিততে পারবেন? পারবেন না। উনি জেদ করে হসপিটালের বেডে এসে পড়ে থাকতে পারলে, আমি জেদ করে কবরে গিয়ে শুয়ে থাকতে পারব। ঠিক ওনার মতোই কোনো রেসপন্স ছাড়া।”
সুমুর কথাশুনে মাইশা জোরে এক ধমক মারল তাকে। শামীম সাহেব মেয়ের পাশে বসে মেয়ের মাথায় হাত রাখলেন। হাসি বেগম মেয়ের অবস্থা দেখে আঁচলে মুখ গুঁজে কাঁদছেন। সুমুর আর্তনাদ কারোর সহ‍্য হচ্ছেনা। আইয়ুবরা সকলে মেঝের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। স‍্যান্ডিও এখন চুপ করে গেছে। ইফতিয়া আর রাইশা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। সুমুর ক্ষতি হোক এটা ওর চায়, তবে শেরাজের কোনো ক্ষতি হোক এটা ওরা স্বপ্নেও ভাবেনি।
হঠাৎ করে সুমু পাগল হয়ে উঠল শেরাজকে দেখার জন‍্য। একজন নার্স গিয়ে ডাক্তারকে ডেকে আনলো। ডাক্তার আসতেই সকলে ডাক্তারকে অনুরোধ সুমুকে একবার ভেতরে যেতে দেওয়ার জন‍্য। সুমু ডাক্তারের পায়ে পড়ে অনুরোধ করতে লাগল। ডাক্তার সুমুর এমন পাগলামি দেখে পাঁচ মিনিটের জন‍্য সুমুকে ভেতরে যাবার পারমিশন দিল। ভেতরে ঢুকতেই একজন নার্স এসে সুমুর হাত স‍্যানিটাইজ করে দিয়ে বলল,

“ম‍্যাম! আমি স‍্যানিটাইজ করে দিলাম। তবুও আপনি ওনার শরীরে টাচ লাগাবেন না। ওনার ইনফেকশন হতে পারে। আপনি মেঝেতে বসে ছিলেন। মেঝে থেকে অনেক জীবাণু আপনার জামাকাপড়ে লেগেছে, আপনার শরীরে লেগেছে। তাই আপনার স্বামীর ভালোর জন‍্যই বলছি, ওনাকে এখন টাচ না করাটাই আপনার স্বামীর জন‍্য ভালো।”
নার্সের কথাগুলো সুমুর কানে গেল কিনা কে জানে। নার্সের মুখ থেকে তার প্রেয়সীকে তার শরীর ছুঁতে বারণ করার কথাটা শুনলে কি মেনে নিতো শেরাজ, নাকি নার্সকে নিজ দায়িত্বে জাহান্নাম থেকে ঘুরিয়ে আনতো? ডাক্তাররা সুমুকে তার কাছে আসতে দিচ্ছলো না, এটা শেরাজ জানলে কি চুপচাপ বসে থাকতো? নাকি তার প্রয়সীকে আটকানোর অপরাধে ডাক্তারকে আবারও নতুন করে ডাক্তারি পড়িয়ে আনতো?

সুমু একদৃষ্টিতে তাকিয়ে এগিয়ে গেল তার খান সাহেবের কাছে। তার চোখের পলক পড়েনা যেন। সুমুর মনে হলো চোখের পলক পড়লেই তার খান সাহেব তার থেকে হারিয়ে যাবে। শেরাজের মুখের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে কেঁদে ফেলল সে। শেরাজকে পা থেকে মাথা পযর্ন্ত পরখ করতে করতে সুমুর চোখ আটকালো শেরাজের আধরের দিকে। গোলাপি রঙের পাতলা ঠোঁট জোড়া শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। তার খান সাহেব সুস্থ অবস্থায় দিনে হাজার বার জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজায়। সেই ঠোঁটগুলো আজ শুকিয়ে কাঠ। তার খান সাহেব একবারও জিভ দিয়ে এখন আর ঠোঁট ভেজাছেনা। তবে ঠোঁট জোড়া এখনও হাসছে। সুমু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কেঁদে উঠে বলল,

“আপনি এতোটা পাষাণ, খান সাহেব? আপনি আপনার একটা কথাও রাখেননি। এই দেখুন, আমি কাঁদছি। কই আপনি তো আজ আমাকে কাঁদতে বারণ করলেন না। আপনি জানেন? এই সিস্টার আমাকে বলল আপনাকে না ছুঁতে। আমি ছুঁলে আপনার নাকি ইনফেকশন হতে পারে। এই সিস্টার জানেই না, আমার খান সাহেব বাড়িতে সারাদিন আমাকে ছুঁতে চায়। ওই ডাক্তার আঙ্কেল আমাকে আপনার কাছে আসতে দিতে চায়নি। ডাক্তার কি জানে আপনি আমাকে কতোটা ভালোবাসেন?
ডাক্তার আর নার্স কি জানে, তাদের এসব কথা আর কাজগুলো আপনি শুনতে এবং দেখতে পেলে এতক্ষণে কি কি করতেন? নাহ! তারা জানেই না। জানলে কি আর আমাকে আপনার কাছে আসা থেকে আপনাকে ছোঁয়া থেকে তারা আটকাতো? নাহ! কখনোই না। আপনি আর জেদ ধরে শুয়ে থাকবেন না, খান সাহেব। উঠুন! উঠে আমাকে “সুইটহার্ট” বলে ডাকুন। আমাকে অন‍্যভাবে শাস্তি দিন। এই শাস্তি ক‍্যানসেল করুন। কাল রাতে আমি একটা ভুল কথা বলে ফেলেছি, তার জন‍্য আপনি আমাকে একটা বার “সরি” বলার সুযোগটুকু পযর্ন্ত দিলেন না। আপনি বলেছিলেন, আমাকে মাশুল দিতে হবে। তাই বলে এইভাবে আমাকে মাশুল দিতে হবে?

আমি কি সত্যি এতো বড় শাস্তি পাওয়ার মতো কোনো কথা বলেছিলাম। আর যদি বলেও থাকি, তার জন‍্য এতো বড় শাস্তি। আমার তো এখন মনে হচ্ছে, দুনিয়ায় সব থেকে বড় পাপিষ্ঠ নারী আমি। আর তাই সেই পাপের শাস্তি আমি এইভাবে পাচ্ছি। আমাকে এইভাবে কষ্ট দিতে খুব ভালো লাগছে আপনার, তাইনা? আমি বলেছিলাম আপনাকে, আপনার খুশির জন‍্য দুনিয়ার যেকোনো ব‍্যথাকে লক্ষ কোটি গোলাপের শুভেচ্ছা দিয়ে আমি আমার জীবন স্বাগতম জানাই। আপনি আমার সেই কথার সুযোগ নিয়েছেন। দেখুন, আমার বুকের মধ্যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। প্রচন্ড ব‍্যথায় ছিঁড়ে যাচ্ছে আমার বুকের ভেতরটা। একবার উঠে চোখ মেলে তাকান। আমি আমার বুকটা চিড়ে আপনাকে দেখাচ্ছি, আমার সেই রক্তক্ষরণ।”
সুমুর কথার মধ্যে নার্স এসে বলল,
“ম‍্যাম! আপনার সময় শেষ। প্লিজ, চলে আসুন।”
সুমু তবুও দাঁড়িয়ে রইল। নার্স এসে সুমুর পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
“ম‍‍্যাম! প্লিজ চলুন।”
সুমু ধীর পায়ে হেঁটে বেরিয়ে এলো আইসিইউ থেকে।

দুপুর দুটোর দিকে একজন নার্স আইসিইউ থেকে বেরিয়ে ডাক্তারকে ডাকতে গেল। সকলের মনে ভয় ঢুকে গেল নার্সের এমন কান্ডে। ডাক্তার দৌড়ে এসে আইসিইউতে ঢুকল। মিনিট পাঁচেক বাদে আবার বেরিয়ে এলো আইসিইউ থেকে। সকলে গিয়ে ঘিরে ধরল ডাক্তারকে। সুমু, শামীম সাহেবরে কাঁধে মাথা রেখে চেয়ে আছে ডাক্তারের দিকে। চোখ বেয়ে তার নোনা পানি পড়ছে। আইয়ুব ডাক্তারকে বলল,
“কি হয়েছে ডাক্তার? কোনো খারাপ কিছু?”
ডাক্তার, আইয়ুবের দিকে তাকাল, তবে কোনো কথা বলল না। সকলে আবারও ডাক্তারকে একই প্রশ্ন করল। ডাক্তার কারো প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে এগিয়ে গেল সুমুর কাছে। তিনি সুমুর পাশে বসে সুমুর মাথার ওপর হাত রেখে বললেন,
“আমি তোমার সমস্ত পাগলামির কথা শুনেছি। এখন যদি তুমি শোনো তোমার স্বামীর ভালো মন্দ কিছু একটা হয়ে গেছে বা তোমার স্বামী আর বেঁচে নেই, তাহলে তুমি কতক্ষণ এমন পাগলামি করে না খেয়ে থাকবে মামাণি?”
সুমু তাচ্ছিল্য করে হেসে মেঝের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মৃত্যু দেহে খাবারের প্রয়োজন পড়েনা। আজ যদি আমার খান সাহেবের খারাপ কিছু হয়ে যায়, তাহলে আমারও হবে। আমার খান সাহেবের খারাপ কিছু হলে, এই হসপিটাল থেকে আজ একটা নয় দু’টো লা*শ বের হবে।”
ডাক্তার দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও বললেন,

আর যদি শোনো! তোমার স্বামী রেসপন্স করেছে। খুব তাড়াতাড়ি সুস্থও হয়ে যাবে, তাহলে কি করবে?
সুমু শামীম সাহেবের কাঁধ থেকে মাথা তুলে ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তাহলে উনি সবসময় আমাকে যেমন দেখতে চেয়েছিলেন, সুস্থ, হাসিখুশি এবং ওনার এই অবস্থা হওয়ার আগে উনি আমাকে যেমনটা রেখে গিয়েছিলেন, আমি ঠিক তেমনটা হয়ে যাব।”
ডাক্তার সুমুর মাথায় হাত বুলিয়ে হেসে বললেন,
“তাহলে তো এখন তোমাকে বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে, কিছু খেয়ে তারপর হসপিটালে আসতে হবে।”
“মানে?”
“মানে হলো তোমার স্বামী রেসপন্স করেছে। তুমি জিতে গেছো, মামনি। তোমার স্বামী তোমার জেদের কাছে হার মেনেছে। তিনি রেসপন্স করেছে। আল্লাহ তোমার ডাক, তোমার আর্তনাদ শুনেছেন। তুমি জিতে গেছো, মামনি। তুমি জিতে গেছো।”
সকলের মধ্যে খুশি জোয়ার বয়ে গেল। সকলে একসাথে “আলহামদুলিল্লাহ” বলে উঠল। সুমু খুশিতে কেঁদে ফেললো। সে কান্না জড়ানো কন্ঠে বলল,

“আপনি সত্যি বলছেন, আঙ্কেল?”
“হ‍্যাঁ মামনি!”
“আমি ওনার সাথে দেখা করতে চাই। আমাকে যেতে দিন।”
“না মামনি! এখন না। এখন তোমার স্বামী ঘুমাচ্ছে। আমি ওনাকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে এসেছি। কিছুক্ষণ পর ওনাকে কেবিনে শিফট করা হবে। তাছাড়া তোমার স্বামী তোমার এই অবস্থা দেখলে আবারও অসুস্থ হয়ে পড়বে।”
সুমু নিজের দিকে তাকিয়ে দেখলো একবার। ডাক্তার হেসে বললেন,
“তাহলে, বাসায় যাও। বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে, খেয়ে, একটু রেস্ট নিয়ে তারপর এখানে এসো।”
কথাগুলো বলে ডাক্তার চলে গেল। আইয়ুব সুমুর সামনে এসে বলল,
“ভাবিজি! আপনি এখন বাসায় যান। শুধু আপনি না, সকলেই এখন বাসায় যান। আমি আর রাহিন থাকি। আপনার সকলে বাসায় গিয়ে রেস্ট করুন। আর ভাবিজি! আপনি বাসায় গিয়ে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে তারপর সারবাজদের সাথে আসেন।”
সুমু উঠে দাঁড়াল। আইয়ুব, সারবাজের কাছে গিয়ে বলল,
“একটা ব‍্যাগে করে আমার আর রাহিনের জন‍্য চেঞ্জ নিয়ে আসিস। আর খাবার আমরা ক‍্যান্টিন থেকে খেয়ে নিব।”
আইয়ুবের কথায় সারবাজ সম্মতি জানিয়ে হসপিটাল থেকে সকলকে নিয়ে বেরিয়ে গেল।

বাড়ি ফিরতে ফিরতে সুমুদের বিকাল চারটা বেজে গেল। রুমে ঢুকে আগে শাওয়ার নিল সে। তবে কিছু খেলো না। না খেয়ে ড্রয়িংরুমে বসে সারবাজদের খাওয়া শেষ হবার অপেক্ষা করতে লাগল। হাসি বেগম মেয়ের সামনে খাবার নিয়ে এসে বসলেন। তবে সুমু একটা দানাও মুখে তুললো না। সে তার খান সাহেবের সাথেই খাবে। আনোয়ার সাহেব হাসি বেগমকে বললেন, খাবার প‍্যাক করে সুমুর সাথে দিয়ে দিতে। বাধ‍্য দিয়ে হাসি বেগম হাল ছেড়ে দিলেন। সারবাজরা খেয়ে উঠে হাত ধুয়ে এলো। ড্রয়িংরুমে আসতেই সারবাজের ফোন বেঁজে উঠল। ফোনে কথা বলে সে হাসি মুখে সুমুর সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল,

খান সাহেব পর্ব ২৬

“সুমু! এস.কের ঘুম ভেঙেছে। তুমি ওর জন‍্য খাবারটা নিয়ে চলো।”
সুমু খুশি মনে হাসি বেগমের হাত থেকে খাবারের প‍্যাকেটা নিয়ে সারবাজদের সাথে গাড়িতে গিয়ে বসল। গন্তব্য এখন তাদের ঢাকা, স্কয়ার হসপিটাল।

খান সাহেব পর্ব ২৮