Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৫৭

খান সাহেব পর্ব ৫৭

খান সাহেব পর্ব ৫৭
সুমাইয়া জাহান

বাইরে তখন ঘন অন্ধকার। জানালার কাচের ওপারে রাতের আকাশে ঝাপসা চাঁদ দেখা যাচ্ছে। দূরের থেকে ঝিঁঝিপোকার আওয়াজ ভেসে আসছে। সারা বাড়ি নিস্তব্ধ। কেবল দেয়ালের ঘড়ির টিকটিক শব্দ শোনা যাচ্ছে। রুমের মধ্যে মৃদু আলো জ্বলছে। সুমুর খোলা চুল বিছানায় এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে। শেরাজ একহাত দিয়ে সুমুকে নিজের বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে। তখন ফ্রেশ হতে গিয়ে সুমু চুল ভিজিয়ে ফেলেছিল। তার ভেজা চুলের গন্ধে শেরাজের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। সুমু চোখ মেলে শূণ্যের দিকে তাকিয়ে আছে। আবছা আলোয় রুমটা কিছুটা স্পষ্ট। শেরাজ তার কোমরের কাছে হাতের বাঁধন শক্ত করে ধরে আছে, যেন এক ইঞ্চিও দূরে যেতে না পারে।
সুমু খুব আস্তে আস্তে শেরাজের চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। নিজেকে শেরাজের সামনে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল,

“এতো রাত করলেন যে?”
শেরাজ হালকা নড়েচড়ে বলল,
“কাজটা একটু বেশি ইম্পর্টেন্ট ছিল।”
সুমু একটু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আপনি ড্রিঙ্কস করেছেন?”
শেরাজ কোনো ভন্নিতা ছাড়াই বলল,
“মুড খারাপ ছিল। প্রেশার বেশি ছিল। তখন তো তুমি কাছে ছিলে না যে, মুড ঠিক করব। ওয়াইন কাছে ছিল, তাই মুডটাকে ঠাণ্ডা করতে একটু খেয়েছি। হ‍্যাবিট নেই, একটুতেই নেশা চড়ে গেছে।”
সুমু হতাশার নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
“ঘুমান, তাহলে নেশা কেটে যাবে।”
“তুমি এখনো ঘুমাওনি কেনো?”
“ঘুম আসছে না।”
“চিন্তা করো না, এমন ক্লান্ত করে দেব যে, তুমি এক ঘুমে সকালে উঠবে।”
সুমু প্রসঙ্গটা পাল্টানোর জন‍্য বলল,

“আমার এখন খুব ঘুম পাচ্ছে।”
শেরাজ নেশালো গলায় বলল,
“বাট নাউ, আই ব‍্যাডলি নিড ইউ বেইব। রিফ্রেশমেন্ট চাই আমার এখনই।”
সুমুর বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল শেরাজের এমন নেশালো কণ্ঠস্বর শুনে। শেরাজের হাতের বাঁধন তার কোমরের কাছে আরও শক্ত হয়ে এলো। সুমু নিচু গলায় বলল,
“আপনি আমাকে ছেড়ে শুয়ে পড়ুন।”
শেরাজ খুব ধীরে নিজের গালটা সুমুর গালের সাথে ঘষে নিয়ে বলল,
তুমি বুঝতে পারো না কেন, সুইটহার্ট? তুমি যতো কাছে থাকো, ততোই ভালো লাগে।”
সুমু ঠোঁট কামড়ে অল্প একটু হাসল, কিন্তু চোখের কোণ ভিজে উঠল তার। শেরাজ সরলভাবে স্বীকারোক্তি দিল,
“মুড খারাপ হলে তো তোমার কাছেই আসি, সুইটহার্ট। তুমিই তো আমার ওষুধ, নেশা, শান্তি, সবকিছু।”
শেরাজ সুমুর গলায় মুখ গুঁজলো। সুমু আর বাঁধা দিল না। বুকের ভেতর একরাশ কষ্ট নিয়ে চোখ বন্ধ করল সে। তার চোখের কোণা দিয়ে গড়িয়ে পড়ল উষ্ণ নোনা পানি।

ফজরের আজান পড়ল। সারারাত চোখে পাতা এক করতে পারেনি সুমু। শেরাজ এখন গভীর ঘুমে। সুমুর কোমর জড়িয়ে ধরে সুমুর উন্মুক্ত বুকের উপর উঁপুর হয়ে মাথা রেখে শেরাজ গভীর ঘুমে ডুবে আছে। ব্লাঙ্কেট জড়ানো গায়ের সেই গরম তাপ সুমুর গায়ে লাগছে। খুব সন্তর্পণে শেরাজের মাথার ওজন বুকের ওপর থেকে সরিয়ে নিল সে। শেরাজ অজান্তেই অল্প শব্দ করে উঠল, কিন্তু জেগে উঠল না। সুমু বেড থেকে নেমে মেঝেতে পড়ে থাকা নিজের জামাকাপড় হাতে তুলে নিয়ে ওড়নাটা শরীরে জড়িয়ে নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। রুমটা এখনো আবছা। বাইরের আকাশও অন্ধকার আর আভা মিশিয়ে ধীরে ধীরে ফর্সা হচ্ছে।

ওয়াশরুমে ঢুকেই ঝর্ণার নীচে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। শরীরে সদ‍্য হওয়া লালচে ছোপ ছোপ দাগগুলোতে পানি পড়তেই যেন মরিচের মতো জ্বালা করে উঠল তার। মার্বেলের দেওয়ালে কপাল ঠেকিয়ে চোখ কুঁচকে বন্ধ করে রাখল। কিছুক্ষণ পর ভিজে চুল গুছিয়ে, ড্রেস পরে, রুমে এসে নামাজে গিয়ে বসল। নামাজের তসবিহ আর কান্নার শব্দে একাকার হয়ে গেল রুমটা। একটুও শব্দ যেন শেরাজ না শুনে ফেলে, এই ভয়ে চেপে চেপে অশ্রু ফেলতে লাগল সে।
নামাজ শেষ করে ধীরে বেলকনির দরজা খুলে বেরিয়ে এলো। ফজরের হালকা বাতাসে ভেজা চুলগুলো মেলে দিল। বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সে। চোখের সামনে থাকা শান্ত সমুদ্রটাকে দেখতে লাগল। আকাশে ভোরের আলো ফুটছে। ঝাপসা চাঁদ এখনও কিছুটা দেখা যাচ্ছে। সুমু চুপচাপ সেই দিকেই তাকিয়ে রইল। দুই গাল বেয়ে গড়িয়ে নামছে উষ্ণ নোনা পানি। ভোরের নরম বাতাসে ভেজা চুলগুলো ধীরে ধীরে শুকিয়ে আসছে। বেলকনির রেলিংয়ে কনুই ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে সমুদ্রের নীলচে রেখাটার দিকে তাকাল। ঢেউগুলো একবার কাছে আসছে, আবার দূরে সরে যাচ্ছে। সুমু আস্তে করে নিজের দুই হাতের তালু মেলে ধরল। নামাজের পর বাকি থাকা দোয়ার কথাগুলো মনে পড়ে গেন। সে ঠোঁট নাড়িয়ে বলল,

“আল্লাহ, আমাকে পথ দেখাও। আমার মনকে শান্ত করে দাও। সব খারাপকে এই মুহুর্তে দূরস্বপ্ন বানিয়ে ভুলিয়ে দাও।”
কিছু গাঙচিলে সমুদ্রের পানি থেকে কিছুটা উপরে উড়ছে। সুমু চোখ মেলে তাকিয়ে রইল। তারও মনে হলো, ‘যদি পারতো এমন করে উড়ে যেতে’। বেলকনি থেকে ঘরের ভেতরে চোখ গেল তার। শেরাজ এখনো গভীর ঘুমে মগ্ন। বালিশে মুখ গুঁজে রেখেছে। তার বড় চুলগুলো বালিশের ওপর ছড়িয়ে আছে। সুমু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শেরাজের গভীর ঘুম জড়ানো মুখের দিকে তাকিয়ে সে মনে মনে বলল,

“এই মানুষটার বুকেই আমি সবচেয়ে বেশি নিরাপদ, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এই মানুষটাই আমার সবচেয়ে বেশি অস্থিরতার কারণ। তাকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, তার ছোঁয়াতেই আমার সমস্ত অনুভূতি জ্বালা হয়ে উঠছে।”
বেলকনির রেলিংয়ে হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে সে। জানালা গলে আসা আলো এসে ভেজা চোখে লেগে মুক্তোর মতো ঝিকমিকিয়ে উঠল সুমুর অশ্রুবিন্দুগুলো। ভিজে চুল এখনো বাতাসে উড়ছে। সুমুর মনে হলো, সমুদ্রের ঢেউয়ের ডাক যেন তাকে বলছে, ‘তোমার ভিতরের যতটুকু অশান্তি, আমার ঢেউয়ে ভাসিয়ে দিয়ে, ফিরে এসো হালকা হয়ে।’ সুমু আবারও মনে মনে বলল,
“কিন্তু কীভাবে? কীভাবে আমি শিখব সবটুকু মেনে নিয়ে ভালোবাসতে? খান সাহেবের গভীর ঘুম আর তপ্ত বুকের আড়ালে লুকিয়ে থাকা তার এতোটা কঠিন, রুক্ষ, নির্দয় মুখ কীভাবে মেনে নিব আমি?” সে চোখ মুছে আবার দু’হাত তুলে ধরে ঠোঁট নেড়ে ফিসফিস করে বলল,

“আল্লাহ, তুমি তো জানো আমি ওনাকে কতটা ভালোবাসি। কিন্তু আমার মনটাকে আরেকটু শক্ত করো। আমি যেন অন্ধ ভালোবাসার ভেতর এতটাও ডুবে না যাই, যা আমার শান্তি কেড়ে নেয়, আমার মনুষ্যত্ব হারাতে বাধ‍্য করে।”
হঠাৎ একটা পাখির শব্দে সুমু চমকে গেল। তার অশান্ত মন আরও অশান্ত হয়ে উঠল। কাল রাতের ঘটনা আবারও চোখের সামনে ভেসে উঠল।
সময় চলে যাচ্ছে। সুমু ওভাবেই ঠায়ে দাঁড়িয়ে রইল বেলকনির রেলিং আঁকড়ে ধরে। সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ সুমুকে এক অদ্ভুত শান্তি দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর সে কাঁধের ওপর কারও হাতের গরম স্পর্শ অনুভব করল। শেরাজ ঘুম জড়ানো চোখে অদ্ভুতভাবে ঝুঁকে এসে, সুমুর ভেজা চুলের গোছা মুঠোয় নিয়ে মুখটা এগিয়ে দিল চুল ঘ্রাণ নিতে। সুমু পেছন ফিরে তাকাল না। শেরাজের নিঃশ্বাস গভীর হয়ে তার কাঁধের ওপর পড়ছে। সে চোখ বন্ধ করে এই অনূভুতি আড়াল করতে চাইল। শেরাজের ঠোঁট তখনো থেমে রইল না। তার ঠোঁট তখন ধীরে ধীরে সুমুর কাঁধে, গলায় ছোট ছোট আদুরে পরশ এঁকে দিতে ব‍্যস্ত রইল। পেছন থেকে সুমুর কোমর জড়িয়ে ধরল শেরাজ। সুমু নিঃশ্বাস টেনে নিয়ে বলল,

“হ‍্যাংওভার কী কাটেনি এখনো?”
শেরাজ সুমুর কাঁধে মুখ ঘষে হেসে উঠে ফিসফিস করে বলল,
“ওয়াইনের মধ্যে তো কোনো নেশাই ছিল না।”
“নেশা নেই, তাহলে এমন করছেন কেনো?”
“তোমার নেশা ওয়াইনের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। এখন আবার করতে হবে। বেডে চলো নাকি এখানেই শুরু করব?”
সে শক্ত করে সুমুকে বুকের সাথে চেপে ধরল। সুমু তাড়াতাড়ি করে পেছন ফিরে তাকাল। শেরাজের চোখে অদ্ভুত এক দাবিময় দৃষ্টি। সে এক হাত দিয়ে চুলগুলো সরিয়ে সুমুর নরম গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বল,
“না, বলো না, সুইটহার্ট। না বলার সুযোগ নেই তোমার। কারণ তুমি খুব ভালো করে জানো, না বললে আমি অনেক বেশি হার্ড হয়ে যাই। আর তুমি এটাও খুব ভালো করে জানো, রিজেকশন আমার পোষায় না।”
সুমু ধাক্কা দিতে চাল, কিন্তু শেরাজের গরম নিঃশ্বাস আর শক্তির কাছে হেরে গেল। তবুও সে রাগ দেখিয়ে বলল

“আমি এখন পারব না।”
শেরাজ বাঁকা হেসে বলল,
“কোনো সমস্যা নেই। আমি জোর করতে পারি, করব?”
সুমু একটা আঙুল তাক করে বলল,
“দেখুন, খান সাহেব…”
শেরাজ সুমুর আঙুলের ওপর ছোট করে কামড় দিয়ে বলল,
“দেখান, খান সাহেবা!”
সুমু আমতা আমতা করে বলল,
“কী… কী?
শেরাজ দুষ্টু হেসে বলল,

“যা আপনি দেখাতে চান।”
সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল
“এখন আমার মুড নেই ওসবের।”
শেরাজ তাকে আরও একটু কাছে টেনে নিয়ে বলল,
“আমি মুড তৈরি করে নিতে জানি।”
“আপনার একটুও লজ্জা লাগেনা?”
“গতকাল রাতে আপনার লজ্জা লেগেছিল, ম‍্যাডাম?”
সুমু কথা কাটানোর জন‍্য হালকা কেঁশে বলল,
“একটু তো লজ্জা করুন। অসভ্য, বেশরম, ঠোঁটকাটা, লাগামহীন, নষ্ট, নির্লজ্জ পুরুষ একটা।”
“ম্যাডাম, আপনিই তো গতকাল রাতে আদর করার সময় কেঁদে বলেছিলেন, বাচ্চা চাই আপনার। কিন্তু, বাচ্চা নেওয়ার জন‍্য যে প্রেসেসিং করতে হয়, সেটা কি আর লজ্জার পেয়ে করার মতো কাজ, বলুন? ওইটা তো নির্লজ্জের মতোই কাজ। আপনি বলছেন লজ্জা করতে, অথচ কাজটাই এমন যেটা নির্লজ্জের মতো। এবার আমি কী করব বলুন?”

সুমু জানে এই অসভ্য মুখ একবার শুরু হলে, আর বন্ধ হবার না। সে মুখটা কঠিন করে গম্ভীর গলায় বলল,
“গতকাল রাতে আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি।”
“কী স্বপ্ন, সুইটহার্ট?”
“আমি আপনাকে গ্রেফতার করিয়ে, জেলে ঢুকিয়ে দিয়েছি।”
“আমিও একটা স্বপ্ন দেখেছি।”
সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,

“কী স্বপ্ন?”
“তুমি আমার চার সন্তানের মা হতে যাচ্ছো।”
সুমু ভ্রু কুঁচকে রাগী গলায় বলল,
“মেরে ফেলব আপনাকে।”
শেরাজ হেসে বলল,
“তো চলো শুরু করি।”
“কি শুরু করবেন?”
“মারপিট! বেড আর ব্লাঙ্কেটের ভেতর।”
“আমি সিরিয়াসলি বলেছি।”
শেরাজ এক চোখ মেরে বলল,

“আমি তো আরও বেশি সিরিয়াস।”
“দূর হাটুন! আপনার থেকে দূরে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।”
“দূর গেলে মারব কীভাবে?”
“কী? কী দিয়ে মারবেন?”
“চুমুপিট দিয়ে, মাই লেডি।”
“অসভ্যতামি ওপর সব রকমের কোর্স করেছেন, তাইনা?”
“আমি কোর্স করিনা, কোর্স করাই।”
“খান সাহেব জানেন, ভালোবাসা হোক কিংবা ঘৃণা— দুটোই খুব মন থেকে একদম খাঁটিভাবে করি আমি।”
“এইজন্যই তো তোমাকে আরও বেশী করে ভালোবাসি আমি। মন থেকে খাঁটি জিনিসের দাম যে সবাই বুঝতে পারে না। আমি তোমার এই একরোখা, মন থেকে আসা ভালোবাসা আর ঘৃণা দুটোকেই ভালোবাসি। যা খাঁটি, তাই আমার। তুমিও আমার।”
সুমু চুপ করে রইল। শেরাজ একটু সময় নিয়ে বলল,

“এখন বেডে চলো!”
সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,
“আমি কোথাও যাবো না।”
শেরাজ বাঁকা হেসে বলল,
“ফোর্স রোমান্স কিন্তু আমার জোশ লাগে, সুইটহার্ট। যেখানে বউ উপরে উপরে চাইবে না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে বলবে, ‘কাম অন হানি’। এখন আবার ভেবোনা, আমি অন‍্য কোনো নারীর সাথে জোর করে… নো সুইটহার্ট, আমি শেরাজ খান এক নারীতে আসক্ত। শেরাজ খান’স পার্সোনাল প্রোপার্টি মিসেস সুমাইয়া জাহান ছাড়া দুনিয়ার প্রতিটি সুন্দরী নারী যদি আমার সামনে ফুল নেইকেড হয়ে বসে থাকে, তবুও আমি তাদের দিকে ফিরেও তাকাব না।”
কিছুক্ষণের জন‍্য থমকে গেল সুমু। তবুও জেদ ছাড়ল না সে। কপাল কুঁচকে মুখ সরিয়ে বলল,
“আপনি থাকেন আপনার প্রোপার্টি নিয়ে। আমি কোথাও যাবো না।”
শেরাজ একটু হাসল। ঠোঁটের কোণে শিকারীর মতো হিংস্র হাসি তার। গম্ভীর গলায় বলল,
“আমি থাকব? হুম? আমার প্রোপার্টি নিয়ে? মিসেস শেরাজ খান, তুমি আমার বউ, মানে তুমি শেরাজ খানের লিগ্যাল অধিকার। এখন যদি আমি চাওয়ার পরও তুমি না আসো, তাহলে আমি কী করব, বলো তো?”
সুমু ফিসফিস করে বলল,

“কি করবেন?”
শেরাজের গলা খুব আস্তে গর্জে উঠল,
“তোমাকে তুলে নিয়ে যাব, সুইটহার্ট। তারপর একটুখানি খুনসুটি হবে, তারপর তোমার ওই জেদি ঠোঁট থেকে ‘না’ শব্দটা চিরতরে মুছে দেব।”
সে এক হাতে সুমুর কোমর আরও শক্ত করে জড়িয়ে নিল। সুমু নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল,
“খান সাহেব, ছেড়ে দিন! বাড়ির সকলে অলরেডি উঠে পড়েছে।”
শেরাজ সুমুর কপালে ঠোঁটটা ছুঁইয়ে দিয়ে খুব নিচু গলায় ফিসফিস করে বলল,
“সবাই জানে আমি পাগল তোমার জন্য। আর পাগলের যখন পাগলামী পায়, তখন বেডরুমের দরজা বন্ধ করে দেয়, সুইটহার্ট। এই সকাল শুধু আমাদের, বুঝলে? আজ থেকে তুমি কোনো কিছুতেই না বলার সাহস পাবে না।”
সুমু চোখ তুলে একবার শেরাজের চোখের দিকে তাকাল। চাপা গলায় বলল,

“আপনি এমন করেন কেন?”
শেরাজ আবারও তার কপালে চুমু খেয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“কারণ তুমি খাঁটি। আর যা খাঁটি, তা তো পাগলের মতো ভালোবাসতে হয়, ম‍্যাডাম।”
সুমু আর কোনো কথা বলল না। শেরাজ ঠোঁট কামড়ে হেসে বলল,
“সো, রেডি? রাইট নাউ অ্যান্ড টুনাইট, গেট রেডি টু বি মাইন এগেইন অ্যান্ড এন্ডিউর মাই সুইট অ্যান্ড হার্ড কম্বিনেশন অফ টর্চার।”
সে উত্তরের আশায় সুমুর দিকে ঘোর লাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সুমু কপাল কুঁচকে বলল,

“আপনার লজ্জা লাগে না নাকি? একটু পরপরই শুধু তাকিয়ে থাকেন।”
“লজ্জা লাগে তো বেইব। লজ্জা না লাগলে তো শুরু থেকেই দু’জনের গায়ে ক্লোথ থাকতো না!”
“অসভ‍্য! কখনো তো লজ্জা পান। যখনই দেখি মনে হয় চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছেন আমাকে।”
“আহা! লজ্জা আছে বলেই তো এখনো তোমায় ছুঁয়ে গিল্লাম না, নাহলে…”
সুমু লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল। তার ঠোঁট দুটো কাঁপছে। শেরাজ একটু ঝুঁকে গিয়ে ওর গাল ছুঁয়ে বলল,
“কী হলো? কথা থেমে গেল কেন?”
সুমু হঠাৎ গলা শক্ত করে বলল,
“আপনি এমন অসভ্য কথা বলবেন না।”
শেরাজ হেসে বলল,
“সুইটহার্ট, তুমি জানো না? ভালোবাসার মতো পবিত্র জিনিসের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে সব রঙ। তোমার সাথে সব রঙেই থাকতে চাই।”
সুমু তার বুকে ধাক্কা দিয়ে একটু দূরে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল। শেরাজ ওকে আরও কাছে টেনে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“একবার চোখে চোখ রাখো আর বলো, আর জেদ করবে না।”
সুমু ধীরে ধীরে চোখ তুললো। শেরাজের চোখের গভীরতা আর হালকা হিংস্র কোমলতা দেখে তার বুকের ভিতর কাঁপতে লাগল। সে কাঁপা গলায় বলল,
“এমন গাগলামি কেন করেন আপনি?”
শেরাজ নরম গলায় বলল,
“কারণ, তুমি আমার পাগলামি সহ্য করার মতো মেয়ে। আর পাগলামি ছাড়া ভালোবাসা পূর্ণ হয় না।”
সুমু মুখ ভেঙিয়ে বলল,
“যত যাই বলুন, আমি যাব না।”
শেরাজ হতাশার নিঃশ্বাস ছেড়ে বলল,
“ঘাড় ত‍্যাড়া, বউ!”
সুমু একটু ভাব নিয়ে বলল,
“ঠিক বলেছেন। এসব আপনার বুকের বা পাঁজরের হাড়ের দোষ। আপনার বাঁকা হাড়, টু মাচ বাজে কোয়ালিটি।”
“ওকে! আমার বাঁকা হাড় ঠিক কীভাবে সোজা করতে হয়, ওইটা তোমাকে আজ ফিজিক্যালি লাইভ দেখাব।”
শেরাজ সুমুর গলায় ঠোঁট ছুঁইয়ে সুমুকে কোলে তুলে নিল। সুমু শিহরিত গলায় বলল,
“খান সাহেব! সবাই…”
“সবাই দেখুক না, এই বউ পাগল শেরাজ খান তার বউকে কতটা ভালোবাসে।”
সুমু আর কথা বাড়াল না। শেরাজ সুমুকে নিয়ে এগিয়ে চললো বেডের দিকে। আপাতত সুমুকে তার খান সাহেবের পাগলামী সহ‍্য করতে হবে।

আজ অফ ডে, তাই সকলে বাড়িতেই আছে। খান ম‍্যানশনের ডাইনিং টেবিলে সুমু আর শেরাজ বাদে সকলে আছে। সাহাবাজ সাহেব চা খাচ্ছেন আর নিউজ পেপার পড়ছেন। শেহজাদ সাহেব আর আরবাজ অফিসের কাজের ব‍্যাপারে আলোচনা করছে। ইশিতা আর আফিয়া খাতুন সকলকে খাবার সার্ভ করছে। অনন‍্যা খাতুন, রিয়াজ, শাহরুখ আর সারবাজ চুপচাপ খাবারের দিকে মন দিয়েছে। ফিরোজা সোফায় বসে ফোনে কার্টুন দেখছে। হঠাৎ শাহরুখ খেতে খেতে শেহজাদ সাহেব আর সাহাবাজ সাহেবকে বলল,
“ড‍্যাড আর বড় আব্বু! আজ অফ ডে, আমি ফেন্ড’সদের সাথে বাহিরে যাব। তাই, আমার কিছু এক্সট্রা রিয়াল লাগবে।”
শেহজাদ সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন,

“নিজের ক‍্যারিয়ারের দিকে ফোকাস করো। এইসব ফ্রেন্ড’সদের সাথে বাজে আড্ডা অফ করো। আর তুমি জানো না, শেরাজ বেটার পারমিশন ছাড়া তুমি বা রিয়াজ, তোমাদের হাতে এক্সট্রা রিয়াল দেবার পারমিশন নেই।”
“তাহলে, তুমি একটু ব্রো’কে বলো আমাকে এক্সট্রা রিয়াল দিতে।”
“অসম্ভব, আমি পারব না।”
শাহরুখ হতাশার নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“আর বড় আব্বুু, তুমি?”
সাহাবাজ সাহেব চোখের সামনে থেকে নিউজ পেপার সরিয়ে বললেন,
“সরি বেটা! শেরাজকে তুমি চিনো। এই ব‍্যাপারে আমি তোমাকে কোনো হেল্প করতে পারব না।”
শাহরুখ আশা ছেড়ে দিল। হঠাৎ তার চোখ পড়ল পাশে বসে থাকা সারবাজের দিকে। সে একটু নিচু গলায় বলল,
“বিগ ব্রো! তুমি হেল্প করো।”
সারবাজ খেতে খেতে বলল,
“আমাকে এসবে জড়াবি না। এস.কে জানতে পারলে আমার কার্ড ব্লক করে দিবে।”
“প্লিজ! একবার বলে দেখো।”
“পারব না। আর বললেও এস.কে শুনবে না।”
শাহরুখ মুখ গোমড়া করে ব্রেকফাস্টে মন দিল। সারবাজ ভাইয়ের মুখের দিকে মায়াভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“আমি হেল্প করতে পারব না। তবে তোকে একটা জ‍াম্পেশ আইডিয়া দিতে পারি।”
শাহরুখ একটু এক্সসাইটেড হয়ে বলল,

“কি হেল্প, ব্রো?”
“শোন! এই ব‍্যাপারে সুমু তোকে হেল্প করতে পারবে। এস.কে’কে রাজি একমাত্র সুমু করাতে পারবে।”
“ঠিক বলেছ। একমাত্র ভাবিজি পারবে।”
“হুম! তুই সুমুকে বলে দেখ।”
ওদের কথার মাঝেই সুমু আর শেরাজ একসাথে নিচে নেমে এলো। শেরাজ সকলকে ‘গুড মনিং’ জানিয়ে সুমুর জন‍্য চেয়ার টেনে দিয়ে সুমুকে বসতে বলল। সুমু বসতেই শেরাজ তার পাশের চেয়ারে বসল। শেরাজকে দেখে ফিরোজা দৌড়ে এসে তার কোলে উঠে বসল। ওদেরকে খাবার সার্ভ করা হলো। সকলে সুমুর শারীরিক অবস্থার কথা জানতে চাইল। সুমু হাসি-মুখে সকলের প্রশ্নের উত্তর দিল। শেরাজ কোনমতে ফিরোজাকে খাইয়ে দিয়ে নিজে খেয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

“সুমু রিলাক্সে ব্রেকফাস্ট শেষ করে রুমে এসো। আমার অফিসের কিছু কাজ আছে, আমি রুমে যাচ্ছি।”
শেরাজ চলে গেল। সুমু অল্প খেয়ে উঠে দাঁড়াল। সিঁড়ির ওপর এক’পা রাখতেই শাহরুখ দৌড়ে এলো। সুমু দাঁড়িয়ে পড়ল। আলতো হেসে বলল,
“কিছু বলবে?”
শাহরুখ একটা মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে বলল,
“ভাবিজি, একটা ছোট্ট হেল্প চাই আপনার কাছে। প্লিজ, না করবেন না।”
সুমু অবাক হয়ে শাহরুখের মুখের দিকে তাকাল। ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে বলল,
“বলো কি হেল্প?”
শাহরুখ সাথে সাথে দুই হাত জোড় করে বলল,
“দেখুন ভাবিজি, আজ অফ ডে, আমি একটু ফ্রেন্ড’সদের সাথে ঘুরতে যাব। বড় আব্বু আর ড‍্যাড দু’জনেই ব্রো’র পারমিশন ছাড়া একটা রিয়ালও দেবেনা বলেছে। সারবাজ ব্রো বলল, আপনি পারবেন একমাত্র ব্রো’কে রাজি করাতে। ভাবিজি প্লিজ, একবার বলুন না ব্রো’কে। আপনার কথা’তো ব্রো কোনোদিন অমান্য করতে পারবে না।”
সুমু হেসে বলল,

“এইটুকুর জন্য এতো কান্না-কাটি। আচ্ছা, কত রিয়াল লাগবে?”
শাহরুখ আবার মিষ্টি হাসি হেসে বলল,
“পাঁচ হাজার রিয়াল। আপনি একবার বললে ব্রো রাজি হয়ে যাবে।”
সুমু চোখ ছোট করে শাহরুখকে একটু ভয় দেখানোর ভঙ্গিতে বলল,
“শাহরুখ, তুমি কোনো খারাপ কাজ করবেনা তো?”
শাহরুখ সাথে সাথে অপরাধীদের মতো দুই হাত উঁচু করে বলল,
“না ভাবিজি! কোনো খারাপ কাজ না। শুধু ফ্রেন্ড’সদের সাথে খাওয়া-দাওয়া আর আড্ডা দেব, বিশ্বাস করুন।”
সুমু একটু ভেবে বলল,

“আচ্ছা, কথা দিচ্ছো কোনো বাজে আড্ডা হবে না?”
শাহরুখ লাফিয়ে উঠে বলল,
“কথা দিলাম! ইউ আর দ্য বেস্ট ভাবিজি। ব্রোকে একটু সুন্দর করে বুঝিয়ে বলুন।”
সুমু হেসে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে উঠতে বলল,
“আচ্ছা, দেখছি কী করা যায়।”
শাহরুখ সুমু সাথে যেতে যেতে বলল,
“ভাবিজি, ইউ আর দ্য কুইন। লাভ ইউ ভাবিজি।”
সুমু লাজুক হাসি হেসে রুমের দরজার সামনে গিয়ে হালকা টোকা দিয়ে বলল,
“তুমি এখানেই থাকো, আমি দেখছি।”
“ওকে!”
ভেতর থেকে শেরাজ গম্ভীর গলায় বলল,
“এসো সুইটহার্ট!”
সুমু ভেতরে ঢুকতেই শেরাজ ল‍্যাপটপ থেকে চোখ তুলে সুমুকে দেখল। সুমুর চোখে মুখে কেমন যেন লুকানো দুষ্টুমি। শেরাজ ভ্রু কুঁচকে বলল,

“এই মুখের রহস্য কী?”
সুমু ধীরে কাছে গিয়ে শেরাজের চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে তার কাঁধে হাত রেখে নিচু গলায় বলল,
“আমার কিছু রিয়াল লাগবে। এই ধরেন পাঁচ হাজার মতো।”
শেরাজের সন্দেহ হলো। সে চোখ তুলে তাকাতে দরজার পাশে শাহরুখকে দেখতে পেয়ে বাঁকা হেসে বলল,
“বেড সাইড টেবিলের ওপর কার্ড আছে, নিয়ে যাও। কিন্তু, তোমার রিয়াল লাগবে আমার বিশ্বাস হচ্ছেনা। কার জন‍্য নিচ্ছো, সেটা বলো। একদম মিথ্যা বলবে না।”

“আমারই লাগবে!”
“রিয়াল দিয়ে কি করবে? আমাকে বলো।”
সুমু কিছু না বলে কার্ডটা নিয়ে বাহিরে বেরিয়ে আসতেই গেলেই শেরাজ উঠে দাঁড়িয়ে তাকে আটকে বলল,
“শাহরুখ!”
শাহরুখ কেঁপে উঠল। সুমু চোখ বড় করে তাকাল। শেরাজ গম্ভীর গলায় বলল,
“রুমে আয়!”
শাহরুখ ধীর পায়ে রুমে ঢুকে এলো। শেরাজ সুমুর থেকে কার্ডটা নিয়ে বলল,
“রিয়াল কেনো লাগবে তোর?”
“আসলে ব্রো আজ অফ ডে…”
শেরাজ তার কথা মাঝেই বলল,
“তাই বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে যাবি তাই তো?”
শাহরুখ আর কোনো কথা বলল না। শেরাজ কার্ডটা পকেটে ঢুকিয়ে বলল,
“কোথায় যেতে পারবি না, ক্লাবে যা।”
শাহরুখ আসহায়ের মতো সুমুর দিকে তাকাল। সুমু শাহরুখকে শেরাজের পায়ের দিকে ইশারা করল। ইশারা করতেই শাহরুখ আর সুমু একসাথে শেরাজের পা জড়িয়ে ধরে বসে পড়ল। শেরাজ প্রথমে থমকে গেল। ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর গলায় বলল,

“উঠো দুজনেই। এসব নাটক আমার সাথে চালবে না।”
শাহরুখ ছোটদের মতো করে বলল,
“ব্রো, ব্রো প্লিজ, আমি কোনো বাজে আড্ডা দেব না।”
দুজনেই একসাথে তাল মিলিয়ে শেরাজকে অনুরোধ করতে লাগল। শেরাজ কোমরে দু’হাত রেখে অন‍্যদিকে তাকিয়ে রইল। এই সুযোগে সুমু শেরাজের পকেট থেকে কার্ডটা নিয়ে শাহরুখের হাতে দিয়ে বলল,
“রান ফাস্ট! কার্ডের পাসওয়ার্ড আমি টেক্সট করে পাঠিয়ে দিব।”
শাহরুখ উঠে দৌড়ে বেরিয়ে গেল। শেরাজ শাহরুখকে ধরতে গেল সুমু উঠে দাঁড়িয়ে শেরাজের কোমর জড়িয়ে ধরে বলল,
“আপনি যাবেন না।”
শেরাজ আর যেতে পারল না। চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুমুকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরে তার ঠোঁটে ঠোঁট মেশালো।

বাহির থেকে দেখলে রায়য়ানের চৌধুরী ম্যানশন দেখাবে যেন কোনো রাজপ্রাসাদ। বড়ো লোহার গেইট। যাতে কালো রঙের, উপরে সোনালী কাজ করা। গেইটের মাঝখানে বিশাল ‘সি’ চিহ্ন, যা চৌধুরী পরিবারের শক্তি ও ক্ষমতার প্রতীক। গেইটের দুইপাশে নিরাপত্তা গার্ডরা কালো ‍স‍্যুট, কানে ওয়ারপডস আর চোখে কালো সানগ্লাস লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরে ঢুকতেই লম্বা স্টোন-লাইনড ড্রাইভওয়ে দু’পাশে থমথমে পাম গাছ আর কিছু অদ্ভুত বিদেশি মূর্তি। যেগুলো রায়য়ান ইউরোপ থেকে এনে বসিয়েছে ভয় আর রহস্যের ছাপ ধরে রাখার জন্য। ম্যানশনের দেয়ালগুলো ধূসর আর কালো পাথরের মিশেলে বানানো। জানালাগুলো লম্বা আর গ্লাসগুলো টিন্টেড। ভেতরের কেউ বাইরে সবটা দেখে নিতে পারবে। কিন্তু বাইরে থেকে কিছুই দেখা যাবে না। ভেতরের ফ্লোর একদম কালো মার্বেল, তার উপর হাতে বানানো আফগানি ওমেন রাগ। দেওয়ালে লম্বা সোনালী ফ্রেমে রায়য়ানের ছবি। ড্রইংরুমে বিশাল ক্রিস্টাল ঝাড়বাতি। নিচে রেশমি কাভার দেওয়া ব্ল্যাক লেদার সোফা। সেন্টার টেবিলে গোল্ডেন গানের রেপ্লিকা রাখা রায়য়ানের শখ।

একটা সিক্রেট বেসমেন্টও আছে। যেখানে রায়য়ানের ‘ডার্ক ওয়ার্ল্ড’ চলে। নিচে মার্বেল সিঁড়ি, হালকা লাল আলো, দেওয়ালে সিসিটিভি স্ক্রিনে পুরো ম্যানশনের একেকটা কোনা দেখা যাচ্ছে। ম্যানশনের পেছনের দিকটায় জঙ্গলের ভেতরে বিরাট পাথরের বাগানের মাঝখানে গোপন পুল। পুলটা অনেক গভীর। এই ম‍্যানশনে রায়য়ান খুব একটা আসে না। সে বেশিভাগ সময় পাতালপুরীতেই থাকতে ভালোবাসে। তবে, আজ সে এই ম‍্যানশনেই আছে। তার কারণ, আরিয়ান। আরিয়ান আজ তার সাথে দেখা করতে আসবে।
রায়য়ানের বাড়ির সামনে এসে থামল আরিয়ানের গাড়ি। গাড়ির ভেতর থেকে আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপ করে বাইরে তাকিয়ে রইল। দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডদের মধ্যে একটুও ভাবান্তর হলো না। কেউ সামনের মাটিতে চোখ রেখেছে, কেউ ওয়্যারলেসে চাপা গলায় কিছু বলছে।
আরিয়ানের গার্ড দৌড়ে এসে দরজা খুলে দিল। আরিয়ান ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামল। তার পরনে শার্প ব্লাক স্যুট। গার্ডদের মধ্যে একজন এগিয়ে এসে বলল,

খান সাহেব পর্ব ৫৬

“স্যার, বস আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।”
আরিয়ান কোনো কথা বলল না। সে একবার গেইটের মাথার ওপরে সোনালী ‘সি’ চিহ্নটার দিকে তাকাল। গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে সামনে পা বাড়াল। গেইট খুলে দিল একজন গার্ড। আরিয়ান গেট পেরিয়ে ভেতরে এলো। ম্যানশনের দরজার কাছে পৌঁছাতেই আরেকজন দেহরক্ষী দরজা খুলে দিল। দরজা পেরোতেই সোনালী ফ্রেমে টাঙানো রায়য়ানের বিশাল ছবি চোখে তার।

খান সাহেব পর্ব ৫৮