খান সাহেব পর্ব ৭৫ (২)
সুমাইয়া জাহান
বিকেলের নরম আলো ধীরে ধীরে আঙিনার গায়ে মিশে যাচ্ছে। সূর্য যেন আজ বিষণ্ণ আলো ছড়াচ্ছে। সোনালি রোদ শেখ বাড়ির জানালা দিয়ে করিডোর এসে পড়ছে। পাখির ডাক, দূরে আজানের সুর, সব মিলিয়ে একটা বিদায়ের সংকেত ভেসে বেড়াচ্ছে। শেখ বাড়ির ভেতরে এখন ব্যস্ততা চলছে। সুটকেস খোলা, কাপড় গুছানো, উপহার আলাদা করে রাখা—সবকিছুতেই যেন একধরনের তাড়াহুড়ো। তবু সেই ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকেই সবার চোখে লেগে আছে কান্নার ছাপ।
সুমুরা আজ সকালেই শেখ বাড়িতে ফিরে এসেছে। চারপাশে যেন বিদায়ের গন্ধ ভাসছে। ওমানে ফিরে যাওয়ার জন্য সকলে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে প্যাকিংয়ে। জামাকাপড় গুছিয়ে নেওয়ার শব্দে ঘর ভরে উঠলেও, সামিয়া, নাজমিন আর সুমুর মন যেন একেবারেই গুছোতে চাইছে না। তিনজনের চোখেমুখে শুধু ভারী বিষণ্ণতা, যেন এই ঘর, এই বাড়ি, এই মুহূর্তগুলো ছেড়ে যেতে তাদের মন একেবারেই মানতে পারছে না। সামিয়া বারবার জামা-কাপড় ভাঁজ করতে গিয়ে থেমে যাচ্ছে। কখনো চুপ করে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে, আবার কখনো গোপনে চোখ মুছে নিচ্ছে। নাজমিনেরও একই অবস্থা। তার হাতের কাজ বারবার গুলিয়ে যাচ্ছে। সুটকেসে কাপড় রাখতে গিয়ে আবার বের করে নিচ্ছে, যেন মন চাইছে না কোনো কিছুই গুছিয়ে ফেলতে। সুমু বিছানার কোণে বসে আছে। তার চোখে অশ্রু জমে আছে, অথচ ঠোঁটে জোর করে টেনে আনা হাসির ছাপ। সে হাত দিয়ে একেকটা জামা গুছাচ্ছে, আবার বুকের কাছে টেনে ধরে রাখছে—যেন প্রতিটি জিনিসের সাথেই লেগে আছে প্রিয়জনদের অমূল্য স্মৃতি। ইনায়া, ইশিতা আর নাতাশাও তাদের সুটকেস গুছিয়ে নিচ্ছে। ফারিন আর ফারিয়া তাদের সাহায্য করে দিচ্ছে।
আরিয়ানরা আজ সকালেই ওমানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেছে। শেরাজের ভাষ্যমতে, “ওরা আলাদা এসেছে, আলাদাই ফিরে যাবে।” সুমু আলিশাকে নিজের সাথে রাখতে চাইলেও, শেরাজ রাখতে দেয়নি।
শেখ বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠারা এদিক-ওদিক ঘুরে ঘুরে দেখছেন। তারা মুখে কিছু বলছেন না, কিন্তু তাদের চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠছে বিদায়ের কষ্ট। সুমি বেগম সুমুর মাথায় হাত বুলিয়ে বারবার বলছেন,
“যা মা, ভালো থাকিস। আর তোর বোনদের দেখে রাখিস।”
হাসি বেগম নীরবে সামিয়ার সুটকেসের ভেতর কাপড় গুছিয়ে দিচ্ছেন। আর রুমা বেগম সামিয়ার হাত ধরে বসে আছেন। কিছু বলতে পারছেন না তিনি। শুধু তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
ঘরজুড়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। বাইরে বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। বিদায়ের ভার যেন সবার বুকের ভেতর চেপে বসে আছে।
ড্রয়িংরুমেও এখন গম্ভীর পরিবেশ। সাখাওয়াত সাহেব, শামীম সাহেব আর মুস্তাক সাহেব আরাম করে সোফায় বসে আছেন। তাদের সামনে কফির কাপ, চায়ের কাপ আর হালকা নাস্তার আয়োজন। তাদের সাথে শেরাজ ও তার বন্ধুরাও আছে। সবাই যেন বিদায়ের আগে শেষবারের মতো একসাথে সময় কাটাতে চাইছে। কথাবার্তায় হালকা গাম্ভীর্য থাকলেও, ভেতরে ভেতরে লুকিয়ে আছে একরাশ আবেগ আর অদ্ভুত টানাপোড়েন।
শামীম সাহেব কফির কাপে হালকা চুমুক দিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন,
“ওমানে তো এখন শীত শুরু হয়ে গেছে, তাই না?”
শেরাজ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল,
“জি, আব্বু। সন্ধ্যার পর বেশ ঠান্ডা পড়ে। তবে কাজের ব্যস্ততায় খুব একটা টের পাওয়া যায় না।”
সাখাওয়াত সাহেব মৃদু হেসে বললেন,
“ব্যস্ততা ভালো। কিন্তু নিজের শরীরের দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। শুনছি তোমার ব্যবসার ভালোই প্রসার।”
শেরাজ ভদ্র ভঙ্গিতে উত্তর দিল,
“আলহামদুলিল্লাহ, দোয়ার বরকতেই সব এগোচ্ছে। তবে এখনও অনেক কিছু শেখার আছে।”
মুস্তাক সাহেব এবার সামনের দিকে ঝুঁকে বললেন,
“শেখার বয়স তো আসলে কোনোদিন শেষ হয় না। তোমাদের তরুণ প্রজন্মের ভেতরে এই আগ্রহটাই আমাদের ভরসা।”
শেরাজের পাশে বসা আইয়ুব মৃদু হাসি দিয়ে বলল,
“এস.কে তো আমাদের কাজের সময় কড়া শাসন করে। কাজের ব্যাপারে কোনো ছাড় নেই ওর কাছে।”
শামীম সাহেব হেসে তাকালেন শেরাজের দিকে,
“কড়া হওয়াটাই ভালো। দায়িত্ব নিতে গেলে দৃঢ়তা চাই।”
শেরাজ একটু নিচু গলায় উত্তর দিল,
“দায়িত্বই আসলে মানুষকে বদলে দেয়।”
সাখাওয়াত সাহেব কথাটা শুনে থেমে গেলেন কিছুক্ষণ, তারপর সন্তুষ্ট ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন। পাশ থেকে শামীম সাহেব আবারও বললেন,
“এরপর এলে অবশ্যই বেয়াই, বেয়াইনকে নিয়ে আসবে। ছেলেরা কোন বাড়ির মেয়েদের বিয়ে করেছে, সেটা কি তারা কোনোদিনও দেখবে না।”
শেরাজ হালকা গলায় উত্তর দিল,
“অবশ্যই, আব্বু। এবার সময়ের স্বল্পতার জন্য হয়ে উঠল না। তবে ইনশাআল্লাহ, পরেরবার যখন আসব, তখন দুই পরিবার এখানে একসাথেই বসবে।”
মুস্তাক সাহেব চশমা খুলে চোখ মুছে বললেন,
“ঠিকই বলেছো। পরিবারের মানুষদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হলে সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়।”
শেরাজ সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলল,
“পরেরবার সত্যিই কি একসাথে আসা সম্ভব হবে? সব বাধা কি মুছে যাবে?”
তার ভাবনার মাঝেই সাখাওয়াত সাহেব বললেন,
“আমার বেয়াই আর বিয়াইনদেরও নিয়ে এসো।”
আইয়ুব আলতো হেসে বলল,
“ইনশাআল্লাহ, আব্বু! এরপর এলে অবশ্যই সবাইকে নিয়ে তারপর আসব।”
শেরাজ চারপাশটা একবার লক্ষ্য করে বলল,
“পিয়াস এলো না?”
মুস্তাক সিকদার গম্ভীর গলায় বললেন,
“কি দরকার? আমার ছেলে এখানে না আসাটাই ভালো।”
শেরাজ ভদ্রতাসূচক হেসে বলল,
“আঙ্কেল! আমি আজ আবারও আপনাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। তবে আজ আমরা চলে যাচ্ছি, পিয়াসের সাথে একবার দেখা না হলে আমাদের খারাপ লাগবে।”
পাশ থেকে শাহরুখ বলল,
“পিয়াসের সাথে আমার টেক্সটটে কথা হয়েছে। সকলে বেরোনোর আগেই ও চলে আসবে।”
মুস্তাক সিকদার ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তার গলার স্বর আগের মতোই কঠিন। তিনি ধীরে বললেন,
“দেখা করার মতো তেমন কিছু নেই, শেরাজ। তবুও যদি আসে, আমি কিছু বলব না।”
সাখাওয়াত সাহেব হালকা কেশে নরম গলায় বললেন,
“ভুল সবাই করে। আর এখন তো সবকিছু অনেকটাই ঠিক হয়ে গেছে। এভাবেই একদিন সব পুরোপুরি ঠিক হয়ে যাবে।”
শেরাজ গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বলল,
“আমারও তাই বিশ্বাস, বড়আব্বু। পরিবারের ভেতর দূরত্ব যেন আর না বাড়ে।”
ঠিক তখনই বাইরে বাইকের শব্দ শোনা গেল। শাহরুখ দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে দরজার কাছে গিয়ে বলল,
“ পিয়াস এসেছে।”
ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। সবার দৃষ্টি একসাথে দরজার দিকে স্থির হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরেই দরজার কাছে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল। ড্রয়িংরুমের পরিবেশ মুহূর্তেই আরও ভারী হয়ে উঠল। সবার দৃষ্টি সেদিকেই আটকে রইল। দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকল পিয়াস। তার মুখে একরাশ দ্বিধা, চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ। গায়ের পোশাকও যেন অগোছালো।
মুস্তাক সিকদার ঠোঁট চেপে বসে রইলেন। সাখাওয়াত সাহেব ও শামীম সাহেব দু’জনেই একটু গম্ভীর ভঙ্গিতে একে অপরের দিকে তাকালেন।
শেরাজ ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার ঠোঁটে ভদ্রতাসূচক একটুকরো হাসি। সে দৃঢ়তার সাথে বলল,
“পিয়াস! ভালো লাগছে তুমি এলে বলে। আজ আমরা চলে যাচ্ছি। ভেবেছিলাম তুমি হয়তো আসবে না। দেখা না হলে, খারাপ লাগত খুব।”
পিয়াস কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। ঘরের নীরবতা যেন আরও গভীর হয়ে উঠল। তারপর সে নিচু গলায় বলল,
“আজ আমাকে আসতেই হতো।”
শাহরুখ পেছন থেকে মজা করে বলল,
“ভাগ্যিস এলি, না হলে তো আমি ভাবতাম আমাদের এড়িয়ে যাচ্ছিস।”
পিয়াসের হালকা হেসে চাপাস্বরে বলল,
“শেষবারের মতো দেখতে এলাম। কে জানে, আবার কবে দেখতে পাব।”
শাহরুখের মুখের হাসিটা নিভে গেল। তবুও সে জোরপূর্বক হেসে বলল,
“চল ভেতরে।”
সে পিয়াসকে ভেতরে নিয়ে এলো। পিয়াস আসতেই সকলে আবারও কথা বলতে বলতে নাস্তায় মন দিল।
সন্ধ্যার নরম আলোয় চারপাশটা যেন এক অদ্ভুত বিষণ্ণতায় ঢেকে গেল। সুমুদের বাড়ির আঙিনায় ব্যস্ততা থাকলেও, সবার চোখেমুখে এখন আরও বেশি গভীর কষ্টের ছাপ। বিদায়ের সময় এসে পড়েছে—এই সত্যিটা যেন কেউ মুখে বলছিল না, তবু সকলের হৃদয়ে ভারী হয়ে আছে।
সুমু রেডি হয়ে রুমে একা বসে আছে। তার চোখ দূরের ল্যাম্পপোস্টের দিকে। শেরাজ নিঃশব্দে রুমে এলো। সে সুমুকে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। হঠাৎ রুমের কোণে থাকা ফুলদানি থেকে সে একটা গোলাপ ফুল হাতে তুলে নিল। সুমু এতোটাই অন্যমনস্ক যে, সে শেরাজের উপস্থিতি এখনো বুঝেতে পারেনি। শেরাজ ধীরে পায়ে এগিয়ে এলো তার কাছে। সে সুমুর কাঁধে হাত রাখতেই সুমু চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল। শেরাজ পেছনে ফুলটা লুকিয়ে রেখে একবার সুমুর মুখটা ভালো করে দেখে বলল,
“আজ অনেকটা জার্নি করতে হবে, সুইটহার্ট। আমাকে এনার্জি দাও।”
সুমু বুঝতে পারল শেরাজের কথার মানে। সে সরে যেতে চাইলে, শেরাজ তার হাত ধরে বলল,
“প্লিজ!”
সুমু হাতাশার নিঃশ্বাস ফেলে। সে জানে, তার এই মানুষটার কাছে তার মুক্তি নেই। সে একটু সময় নিয়ে শেরাজের দু’পায়ের ওপর পা রেখে উঁচু হয়ে দাঁড়াল। তারপর সে শেরাজের ঘাড়ের পেছনে একহাত রেখে অন্যহাত শেরাজের পিঠে রেখে তাকে কাছে টেনে এনে অধরে অধর ডোবাল। শেরাজ চোখ বন্ধ করে সুমুর অধরের ছোঁয়া উপভোগ করল। কিছু সময় যেতেই সুমু ছেড়ে দিল শেরাজকে। শেরাজ আলতো হেসে সুমুর হাতে ফুলটা দিয়ে বলল,
“চলো, যেতে হবে আমাদের।”
সুমু মাথা নাড়িয়ে ধীরে পায়ে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। শেরাজ তার পাশে থেকে তাকে সাবধান নিচে নিয়ে গেল।
বাড়ির ভেতর থেকে বের হওয়ার আগে সুমু একবার চারপাশটা গভীর দৃষ্টিতে দেখে নিল। দেয়ালের প্রতিটি ছবি, বারান্দার প্রতিটি চৌকাঠ, এমনকি দরজার কাঠের গন্ধ—সবকিছু যেন তাকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। তার চোখ ভিজে উঠল, বুকটা কেঁপে উঠল। সামিয়া আর নাজমিন তখন তার পাশে এসে দাঁড়াল। তাদের দু’জনের চোখেও জল চিকচিক করছিল।
হাসি বেগম কাঁপা গলায় বললেন,
“আমার মায়েরা, ভালো থাকিস তোরা। আল্লাহ তোদের মঙ্গল করুক। আমাদের দোয়া সবসময় তোদের সাথেই থাকবে। পৌঁছে গিয়ে সাথে সাথে আমাদের জানাবি।”
সুমু কিছু বলতে পারল না। শুধু মায়ের হাত শক্ত করে চেপে ধরল। তার ঠোঁট কাঁপছিল, চোখ দিয়ে অঝোরে জল গড়িয়ে পড়ছিল।
শামীম সাহেব তখন শেরাজের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
“মেয়েটার যত্ন নিও, বাবা। আমার নাতি হোক বা নাতনি, তারও খেয়াল রেখো।”
শেরাজ ভদ্র গলায় মাথা নেড়ে উত্তর দিল,
“দোয়া করবেন, আব্বু।”
শামীম সাহেব শেরাজের কাঁধে একবার হাত রেখে রাহিনের কাছে এগিয়ে গেলেন। তিনি সামিয়াকে ডেকে এনে গোপনে চোখের পানি মুছে রাহিনকে বললেন,
“আমার বুকের ভেতর দুটো পাজর ছিল। একটা অনেক আগেই তার মালিকের হাতে তুলে দিয়েছি। আর অন্যটাও কিছুদিন আগে তার মালিকের হাতে চলে গেছে। আমার দুটো মেয়ে আমার কলিজার টুকরা। ওদের ওপর আমার অভিমান হলেও, ওরাই আমার সব। আমি জানি, আমি তোমাকে প্রথমে মেনে নিতে পারিনি। তবে আজ আমি স্বেচ্ছায় আমার ছোট মেয়েটাকে তোমার হাতে তুলে দিলাম। তুমি আমার এই মেয়েটাকে দেখে রেখো। ওকে কখনও কষ্ট দিওনা।”
কথাগুলো বলে তিনি সামিয়ার হাত রাহিনের হাতের ওপর দিলেন। রাহিন সামিয়ার হাত শক্ত করে ধরে বলল,
“আপনি চিন্তা করবেন না, আব্বু। আমি আপনার মেয়েকে নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে রক্ষা করার চেষ্টা করব। আমি আপনাকে কথা দিলাম, ওকে আমি কখনও কষ্ট পেতে দেবনা।”
সামিয়া একটু জোরে কেঁদে উঠল। শামীম সাহেব আলতো হাসলেন। তিনি মেয়ে জামাইকে একসাথে বুকে টেনে নিলেন।
এদিকে, নাজমিন! সাখাওয়াত সাহেব আর রুমা বেগমকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে চলেছে। আইয়ুব তার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ফারিয়া আর ফারিন অনেক চেষ্টা করছে নাজমিনকে সামলানোর। সুমি বেগম! হাসি বেগম আর রুমা বেগমকে সামলাচ্ছেন। শাহরুখ আর আশিক একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের ভেতরটা ভেঙে গেলেও, তারা যেন নীরব। তাদের দুজনের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে পিয়াস। তার মুখে মুচকি হাসি থাকলেও, চোখে ব্যথা স্পষ্ট।
হঠাৎ সামিয়া আর নাজমিন একসাথে এগিয়ে গেল শাহরুখ আর আশিকের কাছে। দুজনকে গিয়ে দুই ভাইয়ের জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল। শাহরুখরা নিজেদের শক্ত করে বোনদের সামলালো। কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ নাজমিন তাকাল পিয়াসের দিকে। পিয়াস অন্যদিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
নাজমিন তার সামনে গিয়ে বলল,
“আমাদের ক্ষমা করে দিও, ভাইয়া। নিজের খেয়াল রেখো। আর এই বোনদের মনে রেখো।”
পিয়াস ধীরে নাজমিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। সামিয়া একপলক পিয়াসের দিকে তাকাল। তারপর সে ধীরে এগিয়ে গেল পিয়াসের কাছে।
পিয়াস তার দিকে তাকাতেই সামিয়া বলল,
“নিজের খেয়াল রাখবেন। আসি।”
কথাটা বলে সরে এলো সে। সামিয়ার আর নাজমিন ধীরে গিয়ে দাঁড়াল মুস্তাক সিকদার, সুমি বেগম আর ফারিনের সামনে। সামিয়া! ফারিনের হাতদুটো ধরে বলল,
“আজ অন্তত রাগ করে থাকিস না। চলেই তো যাচ্ছি, বল। কিছুক্ষণ পর থেকে তোর এই খারাপ বোনটাকে আর চাইলেও চোখের সামনে দেখতে পাবিনা। এই কিছুক্ষণ সময়ের জন্য আমার ওপর থাকা সমস্ত রাগ ভুলে গিয়ে, আমাকে একবার জড়িয়ে ধরবি?”
ফারিন নিজেকে আটকাতে পারল না। সে সামিয়া আর নাজমিনকে একসাথে জড়িয়ে ধরে কেঁদে বলল,
“একটু রাগ করেছিলাম বলে, আজ আমাকে আর আমার আপুকে একা ফেলে এতোদূরে চলে যাচ্ছিস? ঠিক আছে যা। আমিও আর কোনোদিনও কথা বলব না তোদের সাথে। তোরা দুজনেই খুব খারাপ। সুমু আপুও খারাপ। সবাই আমাদের ফেলে যাচ্ছে। এই শোন, আজ আসবি না এখানে। এইভাবে বারবার এসে আমাদের এইভাবে মায়ায় ফেলে চলে যাবি, আর আমরা সেসব সহ্য করব, তাই না? যা চলে, যা।”
সে নাজমিন আর সামিয়াকে দূরে সরিয়ে দিতে চাইল। কিন্তু নাজমিন আর সামিয়া যেন আঠার মতো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখল তাকে। ফারিয়াও এসে তাদের সাথে অংশগ্রহণ করল। মুহুর্তেই পরিবেশটা কান্নায় ভারি হয়ে উঠল। শাহরুখ আর আশিক এসে ওদের সামলালো। নাজমিন আর সামিয়া! মুস্তাক সিকদার আর সুমি বেগমের থেকেও বিদায় নিল। তারা দুজনও আজ সামিয়াকে আবারও আপন করে নিল। পিয়াস কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে চোখ সরিয়ে নিল। ইশিতা, ইনায়া আর নাতাশাও একে একে সকলের থেকে বিদায় নিল।
বাইরে গাড়িগুলো প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। লাগেজ একে একে তোলা হচ্ছে। চাকার শব্দে বাড়ির আঙিনায় এক অদ্ভুত শূন্যতা ভর করছে। সকলে নীরবে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে, যেন হঠাৎ করেই সবকিছু বদলে যাচ্ছে। শেরাজের সব ফ্রেন্ডরা একে একে সকলের থেকে বিদায় নিয়ে আগেই গাড়িতে উঠে পড়ল। শেরাজরা বাকিদের নিয়ে ধীরে ধীরে বাহিরে বেরিয়ে এলো। সুমু আজ নিজেকে যথেষ্ট শক্ত রেখেছে। আজ সে খুব একটা কাঁদেনি, ভেঙেও পরেনি।
মুস্তাক সিকদার বাহিরে এসে তাড়া দিয়ে বললেন,
“এবার ওদের ছাড়ো। এরপর বেরোলে অনেক দেরি হয়ে যাবে।”
শেরাজ ধীরে মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিল,
“ঠিক আছে! তাহলে আমরা আসি। আপনারা সকলে একে অপরের খেয়াল রাখবেন।”
সে ধীরে পিয়াসের কাছে গিয়ে বলল,
“পরের বার আসলে, তোমাকে সবার আগে বিয়ে দিব। আপাতত আসি, ব্রো। নিজের খেয়াল রেখো।”
পিয়াস ভদ্রতাসূচক হাসল। শেরাজ তার কাঁধে একবার হাত রেখে গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। সে ধীরে ধীরে গাড়িতে উঠে সুমুকে পাশে বসাল। গাড়ির ইঞ্জিনের গর্জন শুরু হলো, চাকার শব্দ ছড়িয়ে পড়লো সন্ধ্যার নিরিবিলি বাতাসে। শেরাজ জানালার দিকে তাকিয়ে একটি মুহূর্তের জন্য থেমে রইল, যেন চোখে চোখ রেখে সমস্ত বিদায়ের ব্যথা ও ভালোবাসা ধারণ করতে চাইছে।
সুমু তার হাত নীরবে শেরাজের হাতের ওপর রাখল। তার চোখে অশ্রু, মুখে সামান্য হাসি। ধীরে ধীরে গাড়ি বাড়ির আঙিনা ছেড়ে চলে যেতে লাগল। চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই তাদের বিদায়ের দৃশ্য দেখছিল। তাদের গাড়ি ধীরে ধীরে শেখবাড়ির সীমানা থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল।
রাত প্রায় শেষের দিকে। প্লেনের চাকাগুলো ভেসে চলা ক্লাউডের ওপরে আলোয় ঝলমল করছে। ধীরে ধীরে প্লেন ল্যান্ডিং রানওয়ে স্পর্শ করল। গাইডের মৃদু গর্জন আর চাকার শব্দ ভেসে আসছে। সুমুর হাতে শেরাজের হাত। সে নরম কন্ঠে বলল,
“সুইটহার্ট, আমরা পৌঁছে গেছি।”
প্লেন থেমে গেল। সাফে ল্যান্ডিংয়ের স্থিরতা। সুমুর হৃদয় ধুকপুক করছে। সে ধীরে শেরাজের হাত আরও শক্ত করে ধরল। চারপাশের আলো, বোর্ডিং গেটের ব্যস্ততা, মানুষের পদচারণা—সবকিছু যেন একসঙ্গে থেমে গেছে।
গেট খুলল। যাত্রীরা একে একে নামতে লাগল। সুমু এবং শেরাজ ধীরে ধীরে কার্গো এলাকা পার হলো। লাগেজ নিতে গিয়ে সুমুর চোখ চারপাশে ছুটে বেড়াচ্ছে।
শেরাজ একবার পিছনে তাকিয়ে নিশ্চিত হলো যে, কেউ তাদের দিকে অযাচিত নজর দিচ্ছে কিনা। সে শান্ত ও দৃঢ়ভাবে স্যান্ডিকে বলল,
“সবাইকে নিরাপদে নিয়ে এসো। আমি আর সুমু এগোচ্ছি।
স্যান্ডি মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। শেরাজ সুমুকে নিয়ে এগিয়ে গেল। তারা লাগেজের কাছে পৌঁছে তাদের ব্যাগগুলো খুঁজতে লাগল। সুমুর চোখ এখন আর চারপাশে ঘুরছে না, তার মন পুরোপুরি শেরাজের পাশে স্থির। শেরাজ তার দৃষ্টিকে চারপাশে রাখতে ভুলল না। সে কাজের ফাঁকে ফাঁকে চারপাশেও নজর রেখে সুমুকে বলল,
“তুমি কি নিজের লাগেজটা ঠিকভাবে দেখছো?”
সুমু মাথা নেড়ে উত্তর দিল,
খান সাহেব পর্ব ৭৫
“হ্যাঁ, সব ঠিক আছে।”
শেরাজ ব্যাগগুলো একে একে বের করল। রাহিনরা এসে ব্যাগগুলো গাড়ির দিকে সরাতে শুরু করল। সকলে বাহিরে এসে গাড়ির দিকে এগোল। শেরাজ দরজা খুলে সুমুকে প্রথমে উঠতে বলল, তারপর নিজে সিটে বসল। তারা দুজন উঠতেই একে একে সকলে গাড়িতে উঠে পড়ল। গাড়ি ধীরে ধীরে বিমানবন্দর এলাকা থেকে বের হলো। সুমু জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। এবার সবকিছু কিছুটা পরিচিত মনে হচ্ছে তার কাছে। শেরাজও তার চোখে সতর্কতা রেখেছে। সে দেখছে, কেউ তাদের দিকে নজর রাখছে না, সব কিছু ঠিকঠাক আর নিরাপদে আছে কিনা। এখন তার মাথায় একটাই চিন্তা, সবাইকে নিয়ে নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছানো।
