Home খান সাহেব খান সাহেব পর্ব ৭৭

খান সাহেব পর্ব ৭৭

খান সাহেব পর্ব ৭৭
সুমাইয়া জাহান

সকাল থেকে বাড়িটি উৎসবের মেজাজে। “খান ম‍্যানশনের”–এর বিশাল গেটের মধ্য দিয়ে ঢুকতেই চোখ জুড়িয়ে যাওয়ার মতো রঙিন ব্যানার আর ঝুলন্ত ফুলের মালা। ফেইরি লাইটের আলো বাড়ির ভেতরে প্রতিটি কোণকে আলোকিত করছে। চারপাশে হালকা বাতাসে দুলছে সিল্কের পর্দা, আর বাতাসে ছড়িয়ে আছে তাজা ফুলের মিষ্টি গন্ধ। ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই যেন সিনেমার সেটে প্রবেশ করার মতো অনুভূতি দিচ্ছে। ফ্লোরে বালিশ আর আরামদায়ক কার্পেট বিছানো হয়েছে। চারপাশে ছোট ছোট মোমবাতি আলতো আলো ছড়াচ্ছে। ফুলের পাপড়ি এমনভাবে ছড়িয়ে আছে যেন কেউ দেখলেই পদচারণার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দ অনুভব করবে। জানালার পাশে ঝুলছে রঙিন গারল্যান্ড আর ছোট ছোট লাইট দিয়ে সাজানো হয়েছে।

খান ম‍্যানশনের গার্ডেনও আজ কম সাজিয়ে রাখা হয়নি। ছোট ফোয়ারা জলে ঝরঝর করছে, আর চারপাশে ছোট চেয়ার আর সোফা দিয়ে অতিথিদের জন্য বসার ব‍্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি ঘরে মোমবাতি আর ছোট ঝুলন্ত লাইট। বেবি শাওয়ারের জন্য বিশেষভাবে সাজানো হয়েছে। বিছানার ওপর নরম কম্বল, ছোট প্লাশ খেলনা, কেক আর গিফট বক্স রাখা হয়েছে।
সুমু আজ গোলাপি রঙের গাউন পরেছে। পুরো গাউনটিতে সাদা পাথরের কাজ করা। মাথায় ফুলের ক্রাউন, চোখে কাজল, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক। তার মুখে মাতৃত্বের দীপ্তি ছড়িয়ে আছে। শেরাজ আজ একেবারে সাদা শার্ট আর ধূসর প্যান্টে, হাতার ভাঁজ তুলে রেখেছে আগের মতোই। চোখে সেই আগের কঠোরতা আছে, কিন্তু সুমুর পাশে দাঁড়াতেই যেন পুরো মানুষটা বদলে যায়। মাঝে মাঝে সবার চোখ এড়িয়ে সে সুমুর হাতটা ধরে রাখছে।
তাদের চারপাশে পরিবারের সবাই হাজির। নাজমিন, সামিয়া, রাহিন, আইয়ুব, সারবাজ, ইনায়া, শাহরুখ, ফারিয়া সবাই মিলেমিশে আজ উৎসবের রঙে মেতেছে। আজ মৌ সেনরাও উপস্থিত আছে এই পার্টিতে। আলিশা আর মরিয়ম বেগমও এসেছেন। পার্টিতে শুধুমাত্র আরিয়ান আর রায়য়ান বাদে সকলেই উপস্থিত।
সুমু চেয়ারে বসে আছে। সবাই এসে তার সাথে কথা বলছে, সকলে তার জন‍্য দোয়া করেছে।
নাজমিন কাছে এসে মুচকি হেসে বলল,

“আপু, তোমাকে তো আজ একেবারে রাজকন্যার মতো লাগছে।”
সামিয়া পাশ থেকে বলল,
“না না, রাজকন্যা না। আমার আপুকে আজ পুরো রাণীর মতো লাগছে।”
সবাই হেসে উঠল। সুমু মুখে হাত দিয়ে হেসে ফেলল। শেরাজের চোখ তখন শুধু তার দিকেই। সে যেন সবাইকে ভুলে গিয়ে, শুধু সুমুর মুখের হাসিটাই দেখছে।
আইয়ুব পাশে এসে শেরাজকে বলল,
“ভাই, তুই আজ খুব শান্ত। মনে হয় ভয় পাচ্ছিস ছোট্ট খান আসার আগে থেকেই। কি হয়েছে তোর? কোনো কিছু নিয়ে টেনশনে আছিস?”
শেরাজ হালকা হেসে বলল,

“ভয় নয় আইয়ুব, এটা অন্যরকম অনুভূতি। এমন অনুভূতি আমি আগে কখনো পাইনি।”
সুমু পাশ থেকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“খান সাহেব! আপনার কি কিছু হয়েছে? সকাল থেকেই দেখছি, আপনার মুড অফ। আমি এমনিতেই ভয় পাচ্ছি। কেন জানিনা আমার মনটা অশান্ত হয়ে আছে। তার ওপর আপনি আপসেট থাকলে, আমার ভয়ে কান্না চলে আসবে।”
শেরাজ হাত বাড়িয়ে সুমুর গাল ছুঁয়ে বলল,
“কান্না না, হাসি দিও। আমার মেয়ে যেন তোমার মতো হাসিটা পায়।”
সুমু চোখ নামিয়ে নিয়ে বলল,
“কেন জানিনা আমার সত্যি খুব ভয় করছে, খান সাহেব।”
“ভয় পাবার কিছু নেই, সুইটহার্ট। আমি আছি তো।”
শেরাজ সুমুর পাশে গিয়ে বসে তাকে ভরসা দিল। দুজনে মিলে একপাশে বসে দেখতে লাগল, আজ সবাই কতটা খুশি।
সুমু একবার মৌ সেন আর রোজাকে দেখে ধীরে বলে উঠল,

“সবাই কত আপন হয়ে গেছে, তাই না?”
শেরাজ তার কানে ঝুঁকে মৃদু স্বরে বলল,
“হয়ত। তবে তোমাকে সাবধান থাকতে হবে, সুইটহার্ট।”
সুমু ধীরে মাথা নাড়ল। এতো এতো খুশির মাঝেও তার মনে মধ্যে ভয় কাজ করছে। সে জানেনা, তার এই এতো খুশি কতোক্ষণ থাকবে।
হঠাৎ সবার মাঝখানে রাখা গোল টেবিলের ওপর ছোট গোলাপি কাপড়ে মোড়ানো উপহার, আর পাশে একটি সাদা কেক। যার ওপর লেখা,
“ওয়েলকাম লিটল খান।”

কেকটা সুমু সামনে আনা হলো। সুমু বসে আছে ফুল দিয়ে সাজানো চেয়ারে। চারপাশে সবাই তাকে ঘিরে আছে। মুখে সবার হাসি, কিন্তু চোখে এক বিশেষ মায়া। সকলেই যেন পরিবার নতুন প্রাণকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত।
অনন‍্যা খাতুন এগিয়ে এলো। তার হাতে রূপার ট্রেতে দুধ আর মিষ্টি। তিনি হাসতে হাসতে বললেন,
“আমাদের পরিবারের প্রথম ছোট রাজকন্যা বা রাজপুত্র আসছে, আল্লাহ যেন তাকে তোমার মতো কোমল আর আমার ছেলের মতো শক্ত করে রাখে।”
কথাটা বলেই তিনি সুমুর কপালে আলতো করে দুধের ফোঁটা ছোঁয়াল। ইশিতা আর ইনায়া একসঙ্গে ফুল ছিটাতে ছিটাতে বলল,
“সুমু, সবসময় ভালো থাকো। তোমার জীবনের প্রতিটা সময় ফুলের মতো সুন্দর হোক।”
রাহিন, সারবাজ, আইয়ুবরা প্রত্যেকে এসে মজার ছলে দোয়া করতে লাগল।
শাহরুখ এসে বলল,
“ভাবিজি, ছোট্ট বাচ্চাটা যেন আমার মতো দুষ্টুমি করে। ব্রো’র মতো ভয়ঙ্কর রাগী না হয়।”
সবাই একসাথে হেসে উঠল, এমনকি শেরাজ নিজেও মাথা নেড়ে মুচকি হাসল।
আইয়ুব হেসে বলল,

“চল সবাই, সুমু ভাবিজিকে নিয়ে একটা স্লোগান হোক।”
নিহাল উৎসাহ দিয়ে বলল,
“হুম, ঠিক। তার আগে একটু ওয়েট।”
নিহাল গিয়ে চৌদ্দটা গোলাপ ফুল নিয়ে এলো। সকলে তাকিয়ে রইল তার দিকে। সে একে একে আইয়ুব, অমিত, রাহিন, রিয়াদ, আরবাজ, সারবাজ, শাহরুখ, রিসান, রিয়াজ, ফিরোজা, সাইফ, ফাহিম- সকলের হাতে একটা করে ফুল দিয়ে নিজেও একটা রাখল। শেরাজ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল ওদের দিকে। আইয়ুবরা একে একে সুমুকে এসে ফুল দিতে লাগল। সুমু আলতো হেসে সকলের ফুল গ্রহণ করল। আইয়ুবরা ফুল দিয়ে একটু দূরে গিয়ে স্লোগান দিতে শুরু করল।
আইয়ুব উচ্চস্বরে বলল,

“আরে আমাদের মাঝে কোনো ভাবি আছে?
সকলে মিলে একসাথে বলল,
“আছে…!”
“আমাদের এস.কে গ‍্যাঙ্গে কোনো ভাবি আছে?”
“আছে…!”
“আমাদের সকলে প্রিয় কোনো ভাবি আছে?”
“আছে…!”
“কে সে ভাবি?”
“সুমু ভাবি!”
“জোরে বলো!”
“সুমু ভাবি!”
“আরও জোরে!”
“সুমু ভাবি!”
“ভাবি, ভাবি!”
“সুমু ভাবি!”

উপস্থিত সকলে হাসতে হাসতে শেষ। সুমু লজ্জায় মাথা নামিয়ে রাখল। শেরাজ পাশে বসে সুমুর দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ শেরাজ উঠে দাঁড়াল। সবার চোখ তখন তাদের দিকে। সে ধীরে এসে সুমুর সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। চারপাশে এক মুহূর্তের নীরবতা।
শেরাজ হাত রাখল সুমুর পেটে। তারপর খুব মৃদু স্বরে বলল,
“তুমি আমার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপহার, আর তোমার ভেতরে যে ছোট্ট প্রাণটা আছে, সে আমার পবিত্র ভালোবাসার চিহ্ন।”
সুমুর চোখ ভিজে উঠল, কিন্তু মুখে এক অনির্বচনীয় হাসি। সে হাত বাড়িয়ে শেরাজের কপালে আলতো ছোঁয়া দিল,
“আমাদের সন্তান যেন আপনার মতো সৎ হয়, কিন্তু আপনার মতো রাগী যেন না হয়।”
সবাই হেসে উঠল, মুহূর্তটা ভরে গেল আনন্দে। তারপর শুরু হলো “বেবি শাওয়ার”–এর মূল অনুষ্ঠান। সুমুর কোলের ওপর রাখা হলো ফুলে ভরা ঝুড়ি। সবাই একে একে তার ওপর ফুল ছিটিয়ে দোয়া করল। সামিয়া মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বলল,

“সবাই হাততালি দিন। আজ আমাদের সুমুর আপু, আর আসন্ন ছোট্ট খান সাহেব বা খান কন্যার জন্য সকলে মন থেকে দোয়া করুন।”
সারা হল ঘর করতালিতে মুখর হয়ে উঠল। সাহাবাজ সাহেব, শেহেজাদ সাহেব, আফতাব চৌধুরী, আদনান চৌধুরী, আফিয়া খাতুন, অনন‍্যা খাতুন, মরিয়ম বেগম, মৌ সেন, রুহি খাতুন- সকলে সুমু আর সুমুর আসন্ন বেবিকে দামী দামী উপহার দিল।
হঠাৎ রোজা এগিয়ে এলো সুমুর কাছে। সে সুমুর পাশে বসে আলতো হাসল। সুমুর ভদ্রতাসূচক হাসি দিল। রোজা একটা মিষ্টি তুলে সুমুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“বেবির মম হতে যাচ্ছো। ভালো কথা। কিন্তু তুমি জানো, আমি আজও ভেবে পাইনা, এস.কে তোমাকে কীভাবে এতো পছন্দ করেছিল।”

“আর ইউ জেলাস, রোজা?”
রোজা তাচ্ছিল্য করে হেসে বলল,
“রোজা চৌধুরী যাকে তাকে দেখা জেলাস হয়না, বেবি।”
“ওহ! ইগো?”
“অবশ‍্যই! রোজা চৌধুরীর ক্লাসটাই অন‍্যরকম।”
সুমু হঠাৎ গাউন উঠিয়ে নিজের পায়ে পরে থাকে “ওয়াইএসএল” হিল দেখিয়ে বলল,
“ইউর ইগো ইজ লাইক মাই হিলস। এক্সপেনসিভ বাট অলওয়েজ আন্ডার মাই ফুটস।” (তোমার অহংকারটা আমার হিলের মতো দামি, কিন্তু সবসময় আমার পায়ের নিচে।)
রোজা আর বসে না থেকে দাঁতে দাঁত চেপে চলে গেল। সুমু তাচ্ছিল্য করে হেসে অনুষ্ঠানে মন দিল। নাতাশারা সকলে আবারও এসে ঘিরে ধরল তাকে। সকলে তাকে নিয়ে কেক কাটতে চলে গেল। সুমুও হেসে সকলের সাথে আনন্দে মেতে উঠল।

রাত অনেকটা গড়িয়ে গেছে। বাড়ির আঙিনায় এখন নিস্তব্ধতা। অতিথিদের হাসি, আলোর ঝলকানি, গানের আওয়াজ সব যেন মিলিয়ে গেছে।
সুমু বিছানায় বসে আছে। গাউন খুলে এখন হালকা কটন নাইটি পরে নিয়েছে। চুল খোলা, চোখে একটু ক্লান্তি, কিন্তু মুখে শান্ত হাসি। ঘরজুড়ে মৃদু আলো, জানালার পাশে ছোট মোমবাতি, আর টেবিলে বেবি শাওয়ারের কেকের অবশিষ্ট টুকরো পড়ে আছে।
শেরাজ ধীরে ঘরে ঢুকল। তার হাতে এক গ্লাস দুধ, মুখে হালকা ক্লান্তি। সে সুমু কাছে এসে বলল,
“খুব ক্লান্ত লাগছে, সুইটহার্ট?”
সে ধীরে গ্লাসটা বাড়িয়ে দিলেন। সুমু মৃদু হেসে বলল,
“না, ক্লান্ত না। বরং আজ আবারও মনে হচ্ছে আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভাগ্যবতী মানুষ।”
শেরাজ তার পাশে বসে ধীরে বলল,
“তুমি জানো, আজ সবাই যখন তোমার আর আমাদের বেবির জন‍্য ফুল ছিটিয়ে দোয়া করছিল, আমি শুধু একটা কথাই ভাবছিলাম…”
সুমু কৌতূহলে তাকাল,

“কী?”
“যদি সেই দিনটা না আসত, যেদিন তোমার প্রেমে পড়েছিলাম। তাহলে হয়তো আমার জীবনটাতে এই আলো, এই হাসি, এই ছোট্ট প্রাণ—সবকিছুরই বাইরে থাকত। এসব হয়ত আমি কোনোদিনও এসব পেতাম না।”
সুমু মৃদু চোখ নামিয়ে নিল। তার হাত শেরাজের হাতে গেল,
“আপনি তো জানেন না, আমি কত ভয় পেয়েছিলাম। প্রথমে আপনার রাগ, আপনার দূরত্ব- এসবে আমি ভেবেছিলাম, আপনি হয়ত সারাজীবন আমার স্বপ্নের রাজকুমার হয়েই থেকে যাবেন। কিন্তু এখন বুঝি, আপনার ওই কঠিন মুখের আড়ালেই ছিল কোমল ভালোবাসা।”
শেরাজ আলতোভাবে তার মুখটা নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিয়ে বলল,
“তুমি আমার ভেতরের আগুন নিভিয়ে দিয়েছো, সুইটহার্ট।”
বাতাসে জানালার পর্দা উড়ল। বাইরে চাঁদ ঢেলে দিচ্ছে রুপালি আলো। শেরাজ উঠে এসে লাইটটা আলো আরও কমিয়ে দিল, তারপর ধীরে এসে সুমুর পাশে বসল। সুমু হেলান দিল তার বুকে। শেরাজ তার কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে বলল,
“আমার পৃথিবী এখন দুইটা নিঃশ্বাসে বাঁধা। এক তুমি, আর তোমার ভেতরের ছোট্ট হৃদস্পন্দন।”
সুমুর চোখ বেয়ে নেমে এলো একফোঁটা অশ্রু, কিন্তু মুখে শান্তির হাসি। সে তাকাল তার কোলের দিকে যেন তার কোলের ভেতর কেউ তার দিকে তাকিয়ে হাসছে।

সূর্যের আলো জানালার ফাঁক গলে ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকছে। হালকা সোনালি আলোয় ঘরটা যেন অন্যরকম উজ্জ্বল লাগছে। সুমু ধীরে চোখ খুলল। তার চুল কাঁধে ছড়িয়ে আছে। মুখে এখনো ঘুমের ছাপ। সে পাশের দিকে তাকাতেই দেখল শেরাজ নেই পাশে। কিছুটা অবাক হয়ে চারপাশে চোখ বোলাল সে। তার চোখ গেল বেড সাইড টেবিলের ওপর। সেখানে একটা ট্রে রাখা। তার ওপরে এক গ্লাস দুধ, একটা প্লেটে কাটা ফল, আর পাশে একটা ছোট খাম। খামের ওপরে শেহেরাজের হাতে লেখা,
“আমার সুইটহার্টের জন্য।”
সুমু ধীরে খামটা হাতে নিল। তার হৃদস্পন্দন যেন একটু বেড়ে গেল। খাম খুলতেই ভেতর থেকে বের হলো একটি ছোট্ট নোট,
“যখন তুমি এই চিঠিটা পড়ছো, আমি নিচে ফ্যামিলির সঙ্গে আছি। তোমাকে ঘুম থেকে তুলতে মন চায়নি। কারণ তোমার ঘুম আমার কাছে খুব মূল্যবান। আজ সকালে তোমার জন্য একটা ছোট্ট পরিকল্পনা করেছি। রেডি হয়ে নিচে এসো। সেখানে তোমার জন্য কিছু অপেক্ষা করছে।”
“তোমার খান সাহেব”
চিঠি পড়েই সুমুর মুখে এক চিলতে হাসি ফুটল। তার মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে মিষ্টি সকালটা হয়তো এমনই হয়, যেখানে ভালোবাসা শব্দে নয়, যত্নে প্রকাশ পায়।
সুমু ধীরে বিছানা থেকে নেমে আয়নার সামনে গেল। চুল বেঁধে, পোশাক চেঞ্জ করে নিল। পেটটা এখন বেশ ভারী। সে নিজেকে আয়নায় দেখে মৃদু হেসে বলল,

“আপনার সারপ্রাইজ মানেই ভালোবাসা, খান সাহেব।”
সে ধীরে ধীরে সিঁড়ির কাছে এলো। সিঁড়ির কাছে পৌঁছেই হালকা ফুলের গন্ধ এসে তার নাকে লাগল। তার চোখ পড়ল লিভিং রুমে। সেখানে দাঁড়িয়ে আছে শেরাজ, একগুচ্ছ গোলাপ হাতে। তার চারপাশে সাজানো ফুল, ফিতা, আর মাঝখানে একটি ছোট টেবিল। তার ওপরে একটি বেবি বেড, নরম কটন কম্বল আর একটি ছোট্ট খেলনা খরগোশ।
সুমু বিস্ময়ে থমকে গেল। শেরাজ এগিয়ে এসে সুমুকে ধরে নিচে নামিয়ে নিয়ে গিয়ে বলল,
“সুইটহার্ট, আমাদের বেবির জন্য উপহার। আমি নিজেই সাজিয়েছি।”
সুমুর চোখ ছলছল করে উঠল। সে শেরাজের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল,
“আপনি সবসময় এতো পাগলামি করেন কেন?
শেরাজ মুচকি হেসে উত্তর দিল,
“কারণ আমি চাই, তুমি প্রতিদিন জানো, তুমি একা নও। তুমি, আমি, আর আমাদের এই ছোট্ট অলৌকিক প্রাণ। আমরা একসাথে।”
সুমু হাসতে হাসতে চোখ মুছল। তারপর সে বলল,
“এটা শুধু সারপ্রাইজ না, এইটা আমাদের বেবিকে তাদের পাপা দেওয়া কিউট, মিষ্টি একটা উপহার।”
শেরাজ তাকে আলতো করে বুকে টেনে নিল। হঠাৎ চারপাশ থেকে বাড়ির সকলে বেরিয়ে এলো। সুমু সরে দাঁড়াল শেরাজের থেকে। শেরাজ তাকে নিয়ে সকলের সাথে ব্রেকফাস্ট করতে চলে গেল।

সন্ধ্যার আলো জানালার ফাঁক গলে রুমে ঢুকছে। হালকা বাতাসে পর্দাগুলো আস্তে দুলছে। ঘরের ভেতর মোমবাতির আলো। সুমুর পাশে ছোট বেবি বেডের ওপর খেলনা খরগোশটা বসে আছে, যেন অপেক্ষা করছে তার ছোট্ট বন্ধুর জন্য।
সুমু বিছানার কিনারায় পেটে হাত রেখে বসে আছে। তার চোখে সামান্য চিন্তার ছাপ। হঠাৎ দরজাটা ধীরে খুলে গেল। শেরাজ ভেতরে ঢুকল। সাদা শার্টের হাতা গোটানো, মুখে হালকা ক্লান্তি, কিন্তু চোখে সেই অচেনা কোমলতা।
সে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে সুমুকে দেখল। তারপর ধীরে বলল,
“চলো সুইটহার্ট! তোমাকে রেডি করে দেই। আজ তো তোমার লাস্ট চেকআপ।”
সুমু মাথা তুলে তাকাল। তার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠল,
“আপনি নিজে রেডি করবেন? আমি তো নিজেই পারব রেডি হতে।”
শেরাজ ধীরে হেসে তার কাছে এসে বলল,
“তুমি এখন শুধু আমার দায়িত্ব না, তুমি আমার প্রাণের অর্ধেক। আমি নিজে তোমার সবকিছু না করলে নিশ্চিন্ত হতে পারি না।”
সে সুমুকে ড্রেসিংটেবিলের সামনে নিয়ে এলো। তারপর আলতোভাবে সুমুর চুল কাঁধের পেছনে সরিয়ে দিল। তারপর সে সুমুকে বোরকা পরিয়ে রেডি করে দিল।
সুমু চোখ নামিয়ে বলল,

“খান সাহেব, আজ জানি না কেন, তবে মনটা কেমন করছে। যেন কিছু একটা হতে যাচ্ছে।”
শেরাজ থেমে তার মুখের দিকে তাকাল। তারপর মৃদু গলায় বলল,
“কিছুই হবে না, সুইটহার্ট।”
সে সুমুর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। তারপর হাত বাড়িয়ে বলল,
“চলো, আমার ছোট্ট পৃথিবীকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাই।”
সুমু ধীরে উঠে দাঁড়াল। পেটে হাত রেখে সে হালকা হেসে বলল,
“আপনার পাশে থাকলে, আমি সত্যিই আর ভয় পাই না।”
শেরাজ এক মুহূর্তের জন্য তাকিয়ে রইল তার দিকে। তারপর সে ধীরে সুমুকে নিয়ে নিচে নেমে এলো। নিচে নামতেই লিভিং রুমে বসে থাকা অনন্যা খাতুন হালকা ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। তার হাতে চায়ের কাপ। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন,

“তোর মামনিকে নিয়ে এখন চেকআপ করতে যাওয়াটা আমার মোটেও ভালো লাগছে না। এপয়েন্টমেন্ট সকালে কিংবা বিকালে কেন নিসনি?”
ঘরের বাতাস মুহূর্তে ভারী হয়ে গেল। সুমু চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। শেরাজ এক পা এগিয়ে এসে বলল,
“মম! দিনে প্রচুর ভিড় থাকে। আমি চাইনি, সুমু ওয়েট করুক।”
সে একটু থেমে গভীর গলায় বলল,
“আর সব জায়গাই ক্ষমতা দেখানো উচিত না।”
অনন্যা খাতুনের চোখে বিস্ময়। তিনি রাগ চেপে নরম স্বরে বললেন,
“তুই জানিস না, মেয়েটার অবস্থা এখন খুব সংবেদনশীল। এখন ড্রাইভ করে যাবি। ফিরতে হয়ত তোদের রাত হবে। এইরাতের বেলায় তোদের যাওয়াটা আমার সত্যি ভালো লাগছেনা।”
শেরাজ শান্তভাবে বলল,
“আমি আছি, মম। আমি ওকে এক সেকেন্ডের জন্যও একা রাখব না। তুমি চিন্তা করো না।”
সুমু মাথা তুলে তাকাল। তার চোখে স্পষ্ট ভরসা। অনন্যা খাতুন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“ঠিক আছে। আল্লাহ হেফাজত করুক। সাবধানে নিয়ে যাস। আর ড্রাইভ একটু সাবধানে করিস।”
সুমু এগিয়ে অনন‍্যা খাতুনের হাতে হাত রেখে বলল,

“দোয়া করবেন, আম্মু।”
অনন্যা খাতুন তার মাথায় হাত রেখে বললেন,
“সব যেন ঠিকঠাক হয়, মামনি। সাবধানে যেও। আর তাড়াতাড়ি ফিরে এসো। এই মা তোমাদের অপেক্ষায় রইল।”
শেরাজ গাড়ির চাবি হাতে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। সুমু মাথা নেড়ে ধীরে শেরাজের কাছে পাশে গেল।। শেরাজ সুমুকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। সে গাড়ির দরজা খুলে সুমুকে ভেতরে বসাল, তারপর নিজেও সিটে বসল। গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট হতেই খান ম্যানশন ধীরে ধীরে পিছনে হারিয়ে গেল।

গাড়ি এসে থামল হসপিটালের সামনে। রাতের হালকা ঠান্ডা হাওয়া গায়ে লাগছিল। শেরাজ গাড়ি থেকে নেমে দরজা খুলে দিল সুমুর জন্য।
“ধীরে নামো, সুইটহার্ট।”
সুমু মাথা নিচু করে গাড়ি থেকে নামতেই হালকা বাতাস তার গায়ে এসে লাগল। শেরাজ হাত বাড়িয়ে সুমুকে ধরল। তারপর দুজন ধীরে ধীরে হসপিটালের দিকে হাঁটল।
রাতের হসপিটাল প্রায় ফাঁকা। রিসেপশনের আলোটা নরম, ঘড়িতে তখন প্রায় সাড়ে নয়টা। রিসেপশনিস্ট সম্মানভরে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“মিস্টার খান, ডঃ শারমিন ইজ ওয়েটিং ফর ইউ।”
শেরাজ হালকা মাথা নাড়ল,
“থ্যাঙ্ক ইউ।”
সুমু তার পাশে চুপচাপ বসে রইল ওয়েটিং এরিয়ায়। শেরাজ তার দিকে পানির বোতল এগিয়ে দিল।
“একটু পানি খাও, সুইটহার্ট। একটু পরেই ডাক পড়বে।”
সুমু হালকা হেসে পানি নিল। তার চোখে একটু ভয়। শেরাজ সেটা বুঝে ফেলল। সে হাতটা এগিয়ে সুমুর ঠান্ডা আঙুলগুলো চেপে ধরল।

“ভয় পাচ্ছো?”
সুমু মাথা নেড়ে বলল,
“না! শুধু একটু টেনশন হচ্ছে।”
শেরাজ নিচু গলায় বলল,
“আমি আছি, সুইটহার্ট। সবকিছু ঠিক থাকবে। তুমি টেনশন করো না।”
ঠিক তখনই নার্স এসে বলল,
“মিসেস খান, প্লিজ কাম ইন।”
সুমু উঠে দাঁড়াতেই শেরাজ এগিয়ে গেল,
“আমি সঙ্গে যেতে পারব?”
নার্স হেসে বলল,

“হ্যাঁ, স্যার। শি’ল বি মোর কমফোর্টেবল ইফ ইউ আর দেয়ার।”
শেরাজ আলতো হাসল। সে সুমুকে নিয়ে চেম্বারে গেল। চেম্বারে ঢোকার পর ড. শারমিন হাসিমুখে তাদের স্বাগত জানালেন।
“আহা! আমাদের প্রিয় কাপল এসে গেছে। কেমন আছো, সুমু?”
সুমু লজ্জায় নিচু গলায় বলল,
“ভালো আছি, ডক্টর।”
শেরাজ চুপ করে পাশে বসে সুমুর হাতটা ধরে রাখল। ডাক্তার সুমুর চেকআপ করে মনিটরে রিপোর্ট তুললেন। তারপর হালকা হেসে বললেন,
“সবকিছু একদম পারফেক্ট। মাশাআল্লাহ! তোমার বেবি একদম হেলদি।”
শেরাজের মুখে একরাশ স্বস্তির ছায়া। সে আলতো করে সুমুর হাতে হাত রেখে মৃদু স্বরে বলল,
“সি, আই টোল্ড ইউ। মাই সুইটহার্ট অ্যান্ড মাই বেবি—বোথ স্ট্রং।”
সুমুর চোখ ভিজে উঠল আনন্দে। সে ধীরে বলল,
“আমার এতো খেয়াল রাখার জন‍্য, ধন্যবাদ খান সাহেব। সত্যি আপনার ভালোবাসা আর যত্নের কোনো তুলনা হয়না।”
শেরাজের আলতো হেসে বলল,

“এই দুই প্রাণ আমার সারা জীবনের আমানত।”
সুমু আলতো হাসল। শেরাজ ডাক্তারের সাথে কথা বলে সুমুকে নিয়ে বেরিয়ে এলো। সে গাড়ির দরজা খুলে সুমুকে ভেতরে উঠতে সাহায্য করল। সুমু বসতেই সে বোরকাটা ঠিক করে দিল, তারপর নিজেও পাশের সিটে বসল। গাড়ি চলতে শুরু করল ধীরে ধীরে।
একটু চুপচাপ সময় কাটল। তারপর শেরাজ তাকাল সুমুর দিকে। সে নরম গলায় বলল,
“কেমন লাগছে এখন?”
সুমু হালকা হাসল,
“ভালো লাগছে। জানেন, যখন ডক্টর বলল সবকিছু ঠিক আছে, মনে হচ্ছিল বুক থেকে একটা পাহাড় নেমে গেল।”
শেরাজের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল।
“আমি জানতাম, আমার সুইটহার্ট আর আমাদের বেবি ঠিক থাকবে। আর তাছাড়া তুমি তো খুব স্ট্রং।”
সুমু নিচু গলায় বলল,
“আপনি পাশে থাকলেই হয়তো স্ট্রং হয়ে যাই। একা হলে পারতাম না।”
শেরাজ হেসে বলল,
“তাহলে আমার প্রিসক্রিপশন মানবে? বেশি বেশি রেস্ট নিবে, আর টেনশন একদম করবেনা।”
সুমু ঠোঁট বাঁকিয়ে মৃদু হাসল,

“জি খান সাহেব, আপনার নির্দেশ মানতে আপত্তি নেই।”
শেরাজ গাড়ি ড্রাইভিংয়ে মন দিল। সুমু গাড়ির কাচে মাথা হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বলল,
“আল্লাহ্‌, আপনি এ মানুষটাকে আমার জীবন থেকে কখনো দূরে করে দিয়েন না।”
শেরাজ পাশে তাকিয়ে মৃদু হেসে আস্তে বলল,
“আমার সুইটহার্ট, তোমাকে হারানোর ভয়ই আমার একমাত্র দুর্বলতা।”
সুমু কথাটা শুনল কিনা কে জানে। হঠাৎ সে মাথা তুলে তাকিয়ে বলল,
“খান সাহেব! আইসক্রিম খাওয়ান।”
শেরাজ আলতো হেসে গাড়ি থামতে গেল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় গাড়ি থামছেনা। শেরাজ বারবার ব্রেক করার চেষ্টা করছে।
সুমু ভ্রু কুঁচকে বলল,

“কি হয়েছে, খান সাহেব?”
শেরাজ আনমনেই বলল,
“গাড়ির ব্রেক পাচ্ছি না। হয়তো ব্রেক ফেল করেছে।”
সুমু চোখ বড় করে তাকাল।
“কি! ব্রেক ফেল করেছো? এখন আমরা কী করব?”
“শান্ত থাকো। প্যানিক করলে সব শেষ। আমি চেষ্টা করছি গাড়ি কন্ট্রোল করতে।”
সুমু তার পেটে হাত রেখে বলল,
“খান সাহেব! ভয় লাগছে।”
শেরাজ তার কণ্ঠে মৃদু আত্মবিশ্বাস এনে বলল,

“ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আমি আছি। প‍্যানিক করো না, সুইটহার্ট। তুমি একটু শক্ত থাকো।”
সুমু ভয়ে প‍্যানিক করতে লাগল। বারবার তার প্রথম সন্তানের কথা মনে পড়তে লাগল। প‍্যানিক করার ফলে হঠাৎ তার লেবার পেইন উঠল। সুমু চিৎকার করে উঠল। শেরাজ একহাতে সুমুকে সামলানোর চেষ্টা করল, অন‍্যহাতে গাড়ি কন্ট্রোল আনার চেষ্টা করল। কিন্তু না গাড়ি কিছুইতে থামছেনা। হঠাৎ শেরাজ দেখল, বেশ কিছুটা দূরে তাদের গাড়ির সামনে একটা বড় গাড়ি এগিয়ে আসছে। শেরাজ হিতাহিতঞ্জানশূণ‍্য হয়ে পড়ল।

খান সাহেব পর্ব ৭৬

সে জানে, সামনের গাড়ির সাথে লাগলে সব শেষ। শেরাজ আর কোনো উপায় না পেয়ে রাস্তার সাইডে থাকা একটা বড় গাছের দিকে গাড়ির ঘুরিয়ে নিল। সে স্টিয়ারিং ছেড়ে দিয়ে সিটবেল্ট খুলে সুমুর সামনে ঝুঁকে তাকে আড়াল করল। মূহুর্তে গাড়ি গাছের সাথে ধাক্কা লেগে সামনের গ্লাস ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। গ্লাসের কাচ ছিটে এসে শেরাজের পিঠে গেঁথে গেল। শেরাজ চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে নিল। অপরদিকে, সুমু ব‍্যথায় চিৎকার করতে লাগল। মুহুর্তেই আশেপাশের লোকজন ছুঁটে এলো। শেরাজ আর অপেক্ষা না করে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় সুমুর সিটবেল্ট খুলে তাকে গাড়ি থেকে নামাল।

খান সাহেব পর্ব ৭৮