খান সাহেব পর্ব ৮৬ (২)
সুমাইয়া জাহান
ওমানের নারী কারাগারের সেই বিশালাকার লোহার ফটকটি কর্কশ আর্তনাদ করে উন্মুক্ত হতেই, সুমু এক পা বাড়িয়ে বাহিরের পৃথিবীর মুখোমুখি হলো। ফটকটির আর্তনাদের শব্দে সুমুর মনে হলো কলিজাটা কেউ খামচে ধরেছে। পাঁচটা বছর! এই পাঁচটা বছর সে শুধু দেওয়ালের ওপারে একটা চৌকো আকাশ দেখেছে। আজ মাথার ওপর অসীম নীল আকাশটা দেখে তার বুকটা ধক করে উঠল—কেমন যেন ভয়ংকর আর অচেনা ঠেকল। রোদে চোখ মেলতে পারছে না, মনে হচ্ছে চোখের মণি পুড়ছে।
সুমু থমকে দাঁড়াল। সামনে ধূ ধূ পিচঢালা রাস্তা। ওমানের এই দুপুরে বালু উড়ছে চড়কির মতো। গেটের সামনে কোনো চেনা গাড়ি নেই, কোনো পরিচিত মুখও নেই। তার প্রতাপশালী শশুরবাড়ি খান পরিবার কিংবা শেরাজের সেই সব বন্ধুদের কেউ আসেনি। বড় একা লাগছে। এই মুক্তির চেয়ে বোধহয় জেলের সেই অন্ধকার সেলের একঘেয়েমিটাই ভালো ছিল। অন্তত সেখানে একলা হওয়ার এই অপমানটা ছিল না।
পেছন থেকে আলিয়া অফিসারের বুটের শব্দ পাওয়া গেল। কাঁধে হাত রেখে আলিয়া একটু ম্লান হাসলেন।
“কেউ নিতে আসেনি, সুমু?”
সুমু নিচের দিকে তাকাল। তপ্ত বালুর ওপর তার নিজের ছায়াটা কাঁপছে। দীর্ঘশ্বাসটা অবরুদ্ধ রেখেই নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিল,
“হয়তো আসবে। পথের দূরত্ব অনেক সময় মনের দূরত্বের কাছে হেরে যায়, অফিসার। তবে এই অপেক্ষার প্রহর আমার দীর্ঘদিনের চেনা।”
আলিয়া সুমুর শুকিয়ে যাওয়া মুখটার দিকে এক মুহূর্ত চেয়ে রইলেন। তারপর তার হাতের ফাইলগুলো নিয়ে বললেন,
“চলো, রোদে দাঁড়িয়ে থেকে লাভ নেই। পাশের ক্যাফেটেরিয়াটায় গিয়ে বসি। এই তেপান্তরের রোদ বড় নিষ্ঠুর। তাছাড়া, তোমার জীবনের সেই পৈশাচিক আখ্যানের উপসংহার তো এখনো শোনা হয়নি। গল্পের বাকি অংশটুকু আজ শুনতেই হবে।”
সুমু একবার আকাশের দিকে তাকাল। মরুভূমির এই রোদে যেন সে শেরাজ খানের সেই পৈশাচিক হাসিটা দেখতে পেল। বুকের ভেতরটা তপ্ত সীসার মতো ভারি হয়ে এলো। আজ হয়তো শব্দরা আবার জীবন্ত হবে, আজ হয়তো ধুলো জমা স্মৃতির ঘর থেকে বেরিয়ে আসবে আরও কিছু রহস্য।
তপ্ত মরুভূমির বুক চিরে বয়ে আসা তপ্ত হাওয়া থেকে বাঁচতে তারা দুজনে পা বাড়াল কারাগার সংলগ্ন ছোট ক্যাফেটেরিয়াটির দিকে। কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই এসির হিমশীতল পরশ আর কফির গাঢ় ঘ্রাণ সুমুর নাসারন্ধ্রে আঘাত করল। এই ঘ্রাণটা গত পাঁচটি বছর সুমুর যাপিত জীবনের সমান্তরালে ছিল না।
ক্যাফেটেরিয়াটি জনশূন্য বললেই চলে। কোণের দিকের একটি জানালার ধারের টেবিল বেছে নিল তারা, যেখান থেকে বাইরের ধূ ধূ প্রান্তর আর কারাগারের ওই উঁচু প্রাচীরটা স্পষ্ট দেখা যায়। সুমু ধীর পায়ে চেয়ার টেনে বসল। তার শরীর এখানে থাকলেও মনটা যেন এখনো সেই পাঁচ বছর আগের বৃষ্টির রাত আর আগুনের লেলিহান শিখায় বন্দি হয়ে আছে।
আলিয়া সুমুর উল্টো দিকের চেয়ারে বসে নিজের টুপিটা টেবিলের ওপর রাখলেন। সুমুর ফ্যাকাশে আর ভাবলেশহীন মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি কাউন্টারে থাকা ওয়েটারকে ইশারা করলেন। তারপর সুমুর দিকে ঝুঁকে এসে মৃদু স্বরে বললেন,
“এই কড়া রোদ আর দীর্ঘ স্মৃতিচারণ—দুটোই শরীরের রক্ত শুষে নেয়। এক কাপ কড়া কফি এখন তোমার খুব দরকার।”
ওয়েটার আসতেই আলিয়া স্থানীয় আরবি ভাষা আর আন্তর্জাতিক ইংরেজি—দুটো মিলিয়ে কথা বলে দুই কাপ ডাবল শট এসপ্রেসো অর্ডার করলেন। কফির অর্ডার দিয়ে তিনি আবারও সুমুর চোখের দিকে তাকালেন। সেই চোখে এখন অনেক প্রশ্ন, অনেক কৌতূহল। আলিয়া টেবিলের ওপর দুহাত ভাঁজ করে রেখে বললেন,
“বলো এবার। আলিশার ওই লাল শাড়িটা কি সত্যিই শেষ পর্যন্ত তার কাফন হয়ে রইল? আর রায়য়ান… ওই বিষাদগ্রস্ত মানুষটা তোমার জন্য ব্যাগে কী রেখে গিয়েছিল, যা তুমি পুলিশ আসার আগে একবার দেখার সময় পেয়েছিলে?”
ওয়েটার টেবিলের ওপর ধোঁয়া ওঠা দুটো কফি রেখে গেল। সুমু কফির কাপ হাতে নিল না, বরং নির্লিপ্ত চোখে জানালার ওপারে মরুভূমির ধূ ধূ প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে রইল। কফির কাপ থেকে উঠে আসা ধোঁয়া তার চোখের দৃষ্টিকে কুয়াশাচ্ছন্ন করে দিল। সে দীর্ঘশ্বাস চেপে জানালার ওপারে মরুভূমির দিগন্তের দিকে তাকিয়ে-ই বলতে শুরু করল,
“পরের দিন সকালে যখন ভোরের আলো ফুটল, তখন আকাশটা খুব পরিষ্কার ছিল, অফিসার। অথচ আমাদের পৃথিবীটা ততক্ষণে শ্মশান হয়ে গেছে। আলিশার পুড়ে যাওয়া নিথর দেহটা পাওয়া গেল আর.সি ম্যানশনের রুফটপে। যে লাল শাড়িটা সে তার প্রিয় মানুষটার জন্য পরেছিল, সেই শাড়িটাই পুড়ে তার গায়ের চামড়ার সাথে লেপ্টে কদর্য এক কাফন হয়ে রইল। মরিয়ম আন্টি—যিনি রায়য়ানকে নিজের সন্তানের চেয়েও বেশি আগলে বড় করেছিলেন, তিনি একই দিনে ছেলে আর মেয়ে দুজনকে হারিয়ে জীবন্ত লাশে পরিণত হলেন। সেই যে স্ট্রোক করলেন, তারপর থেকে চিরতরে শয্যাশায়ী হয়ে গেলেন।
আফতাব আঙ্কেলও তার পাপ আর গোপনীয়তার এমন ভয়াবহ পরিণতি সইতে পারলেন না। যে দম্ভ নিয়ে তিনি একদিন চলতেন, সেই দম্ভই পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে তাকে বিছানায় ফেলে দিল। আর রোজা? নিজের ভাই আর সারাজীবনের অপ্রাপ্ত প্রেমকে একসাথে ওই আগুনের লেলিহান শিখায় হারিয়ে সে একেবারে নির্বাক হয়ে গেল। মৌ সেন হয়তো পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝেছিলেন। তিনি দেখলেন এই ধ্বংসস্তূপে থাকলে কাউকেই বাঁচানো সম্ভব নয়। তাই নিজেকে ইস্পাতকঠিন শক্ত করে তিনি অসুস্থ স্বামী আর শোকাচ্ছন্ন মেয়েকে নিয়ে নিভৃতে কোরিয়াতে পাড়ি জমালেন।
এদিকে, আমার শশুর একদম চুপচাপ হয়ে গেলেন, আর শাশুড়ি আম্মু… তিনি তো পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেন। সারাটা দিন শেরাজ শেরাজ বলে চিৎকার করতেন আর বাড়ির আঙিনায় পাগলের মতো ছুটাছুটি করতেন। শাহরুখের অবস্থা ছিল সবচেয়ে করুণ। সে তার আইডল, তার ব্রো-কে ছাড়া ক্রিকেট ব্যাটটাই আর হাতে তুলতে চায়নি। পরে সকলের অনেক জোরাজুরি আর পরিবারের কথা ভেবে সে শেষ পর্যন্ত মাঠে ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু সেই চনমনে শাহরুখকে আর কেউ খুঁজে পায়নি। রিয়াজও পড়াশোনাতে খারাপ করতে শুরু করল। রুম থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিল।
আর ছোট্ট ফিরোজা? সে তো তখনো বুঝতেই পারেনি তার লাভ কেন আর ফিরে আসে না। সে সারাদিন দরজার দিকে তাকিয়ে থাকত আর ডুকরে কাঁদত। ওদিকে আমার জন্মদাত্রী মাও সবটা জানতে পেরে মেয়ের শোকে পাগল হয়ে গেলেন।”
সুমু থামল। কফির কাপটা হাতে তুলে নিয়ে সে দেখল সেটা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। সে আলিয়ার দিকে তাকিয়ে ম্লান হেসে বলল,
“সবাই মুক্তি পেয়েছিল অফিসার, শুধু আমি আর আমার স্মৃতিগুলো ছাড়া।”
সে ঠাণ্ডা কফির কাপে একটা দীর্ঘ চুমুক দিল, যেন তেতো স্বাদের আড়ালে অতীতের বিষাদটুকু গিলে নিতে চাইল।
“খান সাহেবের সেই প্রাণের বন্ধুরা—আইয়ুব, নিহাল, ফাহিমরা যেন একেকটা পাথরের মূর্তিতে পরিণত হলো। তাদের সেই অদম্য প্রাণশক্তি কোথায় যেন হারিয়ে গেল। লোকে বলে, মানুষ মারা গেলে নাকি কালক্রমে সবাই ভুলে যায়, কিন্তু এই তিনজনের চলে যাওয়াটা ছিল এক প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পের মতো, যার রেশ বছরের পর বছর ধরে সবার সত্তাকে কাঁপিয়ে দিয়ে গেছে। তারা মরল ঠিকই, কিন্তু সবাইকে এক মৃতবৎ জীবনের শিকলে বেঁধে দিয়ে গেল।
আমার সেই দিনগুলো কাটতে থাকল ওমানের এই ধূসর কারাগারের নির্জন প্রকোষ্ঠে। কিন্তু আমার সেই ছোট্ট নিষ্পাপ দুধের বাচ্চা দুটো, নাতাশা, ইনায়া আর ইশিতা—ওরা প্রতিদিন আসত আমার সন্তানদের বুকে আগলে, যাতে ওরা মায়ের ওম আর মাতৃদুগ্ধ থেকে বঞ্চিত না হয়। সারবাজ ভাইয়া আর ইনায়া তো আমার জন্য এই কারাগারের পাশেই একটা ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকতে শুরু করল। বাচ্চারা কাঁদলেই ওরা আমার কাছে ছুটে আসত।
এসিপি প্রশান্ত ঘোষ মানুষটা ছিলেন বিচিত্র। তিনি একদিকে যেমন শেরাজ খান, আরিয়ান চৌধুরী আর রায়য়ান চৌধুরীর সমস্ত অপরাধের নথি আর প্রমাণ জোগাড় করে আমার শাস্তির মেয়াদ কমিয়েছিলেন, অন্যদিকে তার মানবিকতাও ছিল আকাশচুম্বী। তিনি আইনের ঊর্ধ্বে গিয়ে স্পেশাল পারমিশন করিয়ে দিয়েছিলেন, যাতে জেলখানাতেও আমি আমার সন্তানদের সান্নিধ্য পাই।
এভাবেই চলছিল সব। হঠাৎ একদিন কারাগারের সেই নিস্তব্ধতা চিরে আমার কানে এলো এক নিদারুণ সংবাদ—মরিয়ম আন্টি মারা গেছেন। সন্তান হারানোর শোক তিনি আর বইতে পারেননি। তাই ভাগ্যের খাতায় আমাকে আরও একবার অপরাধী প্রমাণ করে তিনি সবাইকে বিদায় জানালেন।”
সুমু কফির কাপে শেষ চুমুক দিয়ে আবারও জানালার ওপারে মরুভূমির দিগন্তের দিকে তাকাল।
“কারাগারের ওই চার দেয়ালের ভেতরটা ছিল নিস্তব্ধ, কিন্তু বাইরের পৃথিবীর কোনো স্পন্দনই আমার কান এড়াত না। এসিপি প্রশান্ত ঘোষ আর ইনায়াদের মাধ্যমে আমার কাছে বাইরের দুনিয়ার ভালো-মন্দ সব খবরই আসত। ওটা ছিল এক অদ্ভুত সমান্তরাল জীবন—যেখানে আমি ছিলাম স্থির, অথচ আমার প্রিয় মানুষগুলোর জীবন বয়ে যাচ্ছিল নিস্তব্ধতার আপন ছন্দে।
সেই পাথরের মতো ভারী দিনগুলোর মাঝে কিছু খবর আসত বসন্তের হাওয়ার মতো। এই কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসেই আমি সংবাদ পেয়েছিলাম—আমার সেই বিধ্বস্ত পরিবারে আবার নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। প্রিয় মানুষগুলোর জীবনে ছোট্ট নতুন সদস্যদের আগমনের সংবাদ যখন কানে আসত, তখন ক্ষণিকের জন্য ভুলে যেতাম আমি একজন কয়েদি।
আমি জানতে পারলাম, আরবাজ ভাইয়া আর ইশিতার ঘরে এসেছে এক রাজকন্যা। সামু-রাহিন ভাইয়া আর নাজমিন-আইয়ুব ভাইয়ার শূন্যতা পূর্ণ করে এসেছে নতুন প্রাণ। সেই শিশুদের কান্নার শব্দ আমি শুনিনি ঠিকই, কিন্তু কল্পনা করতে পারতাম—খান ম্যানশনের সেই অভিশপ্ত নিস্তব্ধতা হয়তো ওই ছোট কণ্ঠের হাসিতে কিছুটা হলেও ফিকে হয়ে এসেছিল।
কিন্তু আমার সন্তানদের জন্য হয়তো সারবাজ ভাইয়া আর ইনায়ার কোল শূণ্যই রয়ে গেল। ইনায়া বলেছিল ও নাকি কোনদিনও মা হতে পারবে না। কিন্তু আমার মনে হয়, আমার সন্তানদের জন্য সৃষ্টিকর্তা ওদের কোল শূন্য করে রেখেছেন। আর তাই, সিমরান আর শেরানের অধিকার আমি কোনদিনও ওদের থেকে চাইব না। কারণ আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি, ওদের ওপর আমার থেকেও বেশি সারবাজ ভাইয়া আর ইনায়ার অধিকার। বাংলাদেশ থেকেও খবর এলো ফারিয়া আর শাহরুখের জীবনে নতুন প্রাণ এসেছে। তাদের কোলও ভরে উঠেছে।
আমি হাসতাম, আবার কাঁদতামও। ভাবতাম, পৃথিবীটা কত বিচিত্র! একদিকে আমরা শ্মশান সাজিয়ে বসে আছি, আর অন্যদিকে প্রকৃতি তার আপন নিয়মে নতুন ফুল ফুটিয়ে আমাদের ক্ষতগুলো সারিয়ে তুলছে। ওই নতুন প্রাণগুলোর কথা ভাবলে আমার নিজের বাচ্চাদের চেহারার দিকে তাকিয়ে মনে হতো—হয়তো সত্যিই একদিন এই রক্তের দাগ মুছে গিয়ে সব শান্ত হবে।”
সুমু এবার থেমে আলিয়ার দিকে তাকাল। আলিয়া সুমুর চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থির কণ্ঠে বললেন,
“কী অদ্ভুত নিয়তি, তাই না সুমু? রায়য়ান চৌধুরী আর আরিয়ান চৌধুরী—এই দুই ভাই সারাজীবন ছিল ভালোবাসার বিপক্ষে। একজন নিজের অহংকার আর ক্ষমতা দিয়ে নারীদের ভোগ করার জন্য কিনতেন, আর অন্যজন ভালোবাসাকে মনে করতেন কেবল এক তুচ্ছ দুর্বলতা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কী হলো? ইতিহাসের কী বিচিত্র পরিহাস! সেই পাষাণ হৃদয়ের দুজন মানুষই এক নারীর জন্য নিজেদের প্রাণ উৎসর্গ করে দিয়ে গেল।”
আলিয়া কফির কাপটি দুহাতে জড়িয়ে ধরে কিছুটা ঝুঁকে এসে আবার বললেন,
“তবে রায়য়ান চৌধুরী সত্যিই অন্যরকম ছিল, একেবারে সংজ্ঞার বাইরে। যে নারীটির প্রাণ নেওয়ার জন্য তিনি একসময় হন্যে হয়ে উঠেছিলেন, যাকে ধ্বংস করতে তিনি কোনো সীমানা মানেননি—পরিশেষে সেই নারীর অস্তিত্ব রক্ষা করতেই তিনি নিজের বুক পেতে দিলেন আগুনের লেলিহান শিখায়। ঘৃণা থেকে ভালোবাসার এই যে রূপান্তর, এটাই বোধহয় রায়য়ান চৌধুরীকে ভিলেন থেকে এক রহস্যময় ট্র্যাজিক হিরো বানিয়ে দিয়েছে। তিনি শুধু তোমাকে ভালোবাসেননি সুমু, তিনি আসলে নিজের সমস্ত অন্ধকার সত্তাকে তোমার আলোর কাছে বিসর্জন দিয়ে গেছেন।”
সুমু চুপ করে রইল। তার চোখের মণি জানালার বাইরে মরুভূমির বালুরাশির ওপর স্থির। আলিয়া আবারও বলল,
“আর তোমার সেই স্বামী… শেরাজ খান! সত্যি বলছি সুমু, লোকটা বড্ড অদ্ভুত। তাকে চেনা বা বোঝা সাধারণ মানুষের কাজ না। সে তার প্রিয় নারী আর সন্তানের কোনো ক্ষতি হতে দেবে না বলে নিজের দুই কলিজার বন্ধুকে নিজ হাতে খুন করে ফেলল। এরপর সে চাইলেই পারত তোমাকে নিয়ে দূরে কোথাও পালিয়ে যেতে, নতুন করে জীবন শুরু করতে। কিন্তু সে তা করল না।
শেরাজ খান কী করল? নিজের বন্ধুদের মেরে ফেলার সেই দহন সে সহ্য করতে পারল না, সে নিজের বাঁচার পথ নিজেই বন্ধ করে দিল। লোকটা নিজের মৃত্যুর জন্য এমন মরিয়া হয়ে উঠল যে, শেষ পর্যন্ত নিজের প্রিয়তমা স্ত্রীর হাত থেকেই মৃত্যুকে উপহার হিসেবে গ্রহণ করল। ভাবা যায়? এমন পৈশাচিক আর অদ্ভুত ভালোবাসা আমি খুব কমই দেখেছি।”
অফিসার আলিয়ার কথা শুনে সুমু এবার সরাসরি জানালার বাইরে থেকে চোখ ফিরিয়ে আলিয়ার চোখের দিকে তাকাল। সে কফির ঠাণ্ডা কাপটা টেবিলের ওপর নামিয়ে রেখে গম্ভীর গলায় উত্তর দিল,
“খান সাহেব আসলে কোনোদিন পালাতেই চায়নি, অফিসার। সে জানত পালিয়ে যাওয়াটা তার ব্যক্তিত্বের মধ্যে পড়ে না। আসলে উনি ছিল এমন এক বাজিগর, যে জেতার চেয়ে হারার আনন্দ বেশি খুঁজত। উনি যখন রায়য়ান আর আরিয়ানকে মারল, তখন উনি শুধু বন্ধুদের মারেনি, নিজের অস্তিত্বের শেষটুকুও শেষ করে দিয়েছিল। আমার হাতে উনি মরে গিয়ে যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে চেয়েছিল। হয়তো উনি জানত, আমার হাতে মরলেই উনার মুক্তি মিলবে, কিন্তু আমার জন্য যে উনি এক আজীবনের জেলখানা বানিয়ে দিয়ে গেলেন—সেটা উনি একবারও ভাবেননি।”
“কিন্তু সেদিন ওই ব্যাগের মধ্যে রায়য়ান চৌধুরী তোমার জন্য কি রেখে গিয়েছিল?”
সুমু জানত এমন একটা প্রশ্ন আলিয়া করবে। সে আলিয়ার উৎসুক চোখের সামনে ধীরে তার কারাগারের সেই জীর্ণ বাক্সটি খুলল। সযত্নে রাখা দুটো ভাঁজ করা কাগজের মধ্যে একটি সে আলিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিল। কাগজের রঙ সময়ের আবর্তে কিছুটা বিবর্ণ হলেও তাতে লেগে থাকা অনুভূতির তীব্রতা হয়তো এখনো আগের মতোই অমলিন। কাগজটির ওপর আরিয়ান চৌধুরী নামটা দেখে আলিয়া কাঁপাকাঁপা হাতে কাগজটি খুলে পড়তে শুরু করলেন।
“প্রিয় অতিথি পাখি”
চিঠির সম্বোধন দেখেই আলিয়ার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। আরিয়ান চৌধুরীর মতো একজন দুর্ধর্ষ নারী ভোগী মানুষ কতটা নিঃস্ব হলে এমন শব্দ চয়ন করতে পারে, সেটা তিনি বুঝতে পারলেন। একটু সময় নিয়ে তিনি নিবিষ্ট মনে পড়তে শুরু করলেন,
“প্রিয় অতিথি পাখি,”
“চিঠির শুরুতেই তোমাকে অতিথি বলে সম্মোধন করলাম, কারণ তুমি আমার জীবনে অতিথি পাখির মতোই এসেছিলে। তুমি এসেছিলে নিঃশব্দে, যেন হঠাৎ এসে থেমে যাওয়া এক দমকা হাওয়া। আমার জীবনের শুকনো আকাশে তুমি মেঘ হয়ে এসেছিলে— কিন্তু বৃষ্টি হয়ে নামোনি কখনো। তুমি ছিলে আমার অস্তিত্বের সবচেয়ে সত্য স্বপ্ন, অথচ সবচেয়ে ভয়ংকর মায়া। আমি তোমায় ভালোবেসেছিলাম এমনভাবে, যেভাবে মানুষ শ্বাস নেয়— অজান্তেই, থেমে না গিয়ে। তুমি ছিলে আমার জীবনের সেই চাওয়া, যাকে পাবার জন্য আমি সবকিছু ধ্বংস করতে প্রস্তুত ছিলাম। আমার হৃদয়, আমার স্বপ্ন, আমার আশা—সবই তোমার জন্য উৎসর্গিত ছিল। কিন্তু আফসোস, তুমি বুঝতে পারোনি আমার সেই অসীম ভালোবাসা। যে ভালোবাসার জোরে আমি সমস্ত সীমা ভেঙে দিতে পারতাম, সেই ভালোবাসাই আমাকে শেষ পর্যন্ত ধ্বংস করে দিয়েছে। তোমাকে নিয়ে কল্পনায় একটা পৃথিবী সাজিয়ে তুলেছিলাম, যদিও জানতাম— বাস্তবে তোমাকে পাওয়ার সম্ভাবনা এক শতাংশও নেই। সত্যি কথা বলতে, রাতে আমার চোখে ঘুম থাকত ১% আর তোমাকে নিয়ে কল্পনা থাকত ৯৯%। তবু, তোমাকে কতটা ভালোবাসি—এই কথাটা তোমাকে বোঝাতে না পারার কষ্টটা আসলেই ভয়ংকর। তোমাকে আমার ভালোবাসা বোঝাতে না পারার কারণেই প্রতিদিন একটু একটু করে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছি। অথচ তোমার সামনে ঠিকই স্বাভাবিক থাকার অভিনয় করেছি। তুমি তো কখনো দেখোনি আমার কান্নায় ভেজা লাল চোখ, দেখোনি বলেই হয়তো বুঝতে পারোনি— ঠিক কতটা ভালোবাসতাম তোমায়। তুমি তো কখনো শুনোনি তোমার অভাবে বুক ফেটে যাওয়ার সেই নিরব চিৎকার, শুনোনি বলেই হয়তো টের পাওনি তোমায় কতটা নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসেছিলাম। তুমি তো কখনো দেখোনি তোমার অভাবে কান্নায় দম বন্ধ হয়ে যাওয়া যন্ত্রণার সেই দৃশ্য। যদি দেখতে, তাহলে হয়তো বুঝতে— আমি তোমায় কতটা গভীরভাবে ভালোবাসতাম।
ভালোবাসা… কী অদ্ভুত সুন্দর তাই না? কারও জীবন গড়ে তোলে, আবার কারও জীবন শেষ করে দেয়। প্রতিটা চোখের পানি বলে দেয়, কারও মায়া কতটা ভয়ংকর হতে পারে। ভালোবাসতে তো সবাই জানে, কিন্তু মায়ায় পড়ে ভেতর ভেতর ধ্বংস হতে পারে কয়জন? আমি পেরেছি, দেখো— তোমার মায়ায় পড়ে আমি ধ্বংস হয়েছি। তুমি ছিলে আমার একমাত্র শান্তি, অথচ তোমার কারণেই আমি এখন শান্তিহীন। আমি কখনও স্বার্থের জন্য ভালোবাসিনি। তবে হ্যাঁ! তোমাকে পাওয়ার বড্ড লোভ ছিল আমার। কিন্তু আমি কখনও বুঝতে পারিনি, তুমি মানুষটা এতটা দামী। আমার এতো অর্থ-সম্পত্তি থাকার পরেও তোমাকে কেনার মতো অর্থ আমার কাছে ছিল না। তোমার মতো এতো দামী জিনিসের ওপর আমার নজর দেওয়াটাই হয়তো ভুল ছিল। তুমি কি জানো, চিরকাল আমার এই হৃদয়টা তোমার না পাওয়ার যন্ত্রণায় ছটফট করবে। তুমি কি জানো অতিথি পাখি, তোমার অনুপস্থিতিতেও আমি তোমার জন্যই বেঁচেছিলাম, কিন্তু এখন ক্লান্ত। তোমাকে ইচ্ছে হলে দেখতে না পারা, তোমাকে শুনতে ইচ্ছে হলে শুনতে না পারা, মনে হয় যেন বুকটা তৃষ্ণার ফেটে যাচ্ছে। তখন ছটফট করি, হাঁসফাঁস লাগে ভিষণ। আর তখন তোমাকে না পাওয়ার যন্ত্রণা থেকে বাঁচতে মরে যেতে ইচ্ছা করে। বলোতো অতিথি পাখি, কোথা থেকে নিয়ে আসব সেই ভাগ্য, যে ভাগ্য তোমাকে আমার করে দিবে। তোমার এই মায়া, এই অদ্ভুত টান–এগুলো ভোলাও যায়না আবার একান্তই নিজের করে পাওয়া ও যায়না। তোমার স্মৃতির ভার, তোমার মায়ার দহন, তোমার নীরবতার ছুরিটা— সবকিছুই আমাকে রক্তাক্ত করেছে। তোমার কাছে হয়তো আমার কোন মূল্য ছিল না। কিন্তু আমার মূল্য তুমি তাদের কাছে জিঙ্গাসা করো, যাদের দিকে আমি ফিরেও তাকায়নি। তোমার বোঝা উচিত ছিল এতো মানুষের পছন্দের তালিকায় থাকার পরেও আমি কেন তোমার প্রতি দূর্বল ছিলাম।
আমি এখন শুধু চাই একটু থামতে, একটু নিঃশব্দ হতে। এখন আমার ভালোবাসা তোমার কাছ থেকে মুক্তি চায়। তোমার মায়ার ভার আমি আর নিতে পারছি না, অতিথি পাখি। তাই এই শেষ বিদায়— আমি যাচ্ছি তোমার স্মৃতির ওপারে, যেখানে হয়তো কোনো ব্যথা নেই, কোনো অপেক্ষা নেই। তুমি সুখে থেকো, আমি কষ্ট নিয়ে চলে গেলেও তাতে আফসোস নেই। কারণ মৃত্যুর পরেও যদি ভালোবাসা থেকে যায়, তবে জানবে— আমি এখনো তোমাকেই ভালোবাসি, অতিথি পাখি। মৃত্যু দিয়েই প্রমাণ করে গেলাম—আমি তোমাকে সত্যি ভালোবাসি, অতিথি পাখি।”
“এক মৃত ভালোবাসা!”
চিঠিটা শেষ করে আলিয়া স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। দীর্ঘক্ষণ সেই চিঠির বয়ানটুকু নিজের মস্তিষ্কে আবারও আওড়ালেন। তারপর এক দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে চিঠির কাগজটি টেবিলের ওপর আলতো করে নামিয়ে রাখলেন। ক্যাফেটেরিয়ার এসির কৃত্রিম ঠাণ্ডার মাঝেও আরিয়ানের সেই জ্বলন্ত অনুভূতির উত্তাপ যেন তাকে স্পর্শ করছিল। তিনি সুমুর দিকে তাকালেন। সুমু তখন শান্ত, তার চোখে কোনো অশ্রু নেই—অশ্রুর ভাণ্ডার হয়তো সেই পাঁচ বছর আগেই শেষ হয়ে গেছে।
আলিয়া এবার সুমুর হাতের সেই দ্বিতীয় ভাঁজ করা কাগজটির দিকে ইশারা করে বললেন,
“ওই দ্বিতীয় কাগজটিতে কী লেখা আছে? রায়য়ান চৌধুরীও কি তার শেষ বিদায়ের আগে তোমার জন্য তার মনের কথা লিখে রেখে গেছেন?”
সুমু দ্বিতীয় কাগজটি আলিয়ার দিকে এগিয়ে দিল। কাগজের ওপরের শিরোনামটি দেখেই আলিয়ার বুঝল, এর মধ্যে রায়য়ান চৌধুরীর শেষ কথাগুলো লেখা আছে। তিনি কাগজের ভাঁজ খুলে পড়তে শুরু করল,
“সুহাসিনী”
“এই চিঠিটা যখন আপনার হাতে পৌঁছাবে, তখন আমি সম্ভবত এই পৃথিবীর সমস্ত ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। আজ জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে আপনাকে তুমি থেকে আপনি বলে সম্বোধন করছি, সুহাসিনী। কারণ শেষবেলায় এসেও আমি আপনাকে আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্মানের বেদিতে রাখলাম। সেখানে কোনো অধিকার নেই, আছে শুধু বিনম্র দূরত্ব।
আমি বড় অদ্ভুত এক কাপুরুষ। আপনি আমার কোনদিনও হবেন না ভেবে আপনাকে কোনদিনও আমার মনের কোনো কথা বলার সাহস করে উঠতে পারিনি। সারাটা জীবন নিজের দম্ভ নিয়ে চললেও আপনার সামনে এসে আমার সমস্ত সাহস কেমন যেন জল হয়ে যেত। আমি জানতাম আপনি আমার জন্য নিষিদ্ধ, আমাদের মাঝখানের দেয়ালটা অনেক উঁচু। আপনার মায়ায় জড়ানো যেন আমার জীবনের এক নিষিদ্ধ স্বপ্ন আর আমার হৃদয়ের গভীরে লুকানো এক অপরাধ, যেটা আমি করতে চাইনি, তবুও করে ফেলেছি। আমি জানতাম, যে চোখ দিয়ে আপনাকে দেখে আপনার মায়ায় জড়িয়েছি, সেই চোখ চিরস্থায়ীভাবে বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত আপনার মায়া কাটবে না।
মাঝে মাঝে একা বসে ভাবি, ভাগ্যটা আসলে কোথায় লেখা থাকে? হাতের তালুর রেখায়, নাকি কপালের ভাঁজে? যুক্তিবাদী হতে হতে আমি বড্ড ক্লান্ত। খুব ইচ্ছে করত অন্ধ-বিশ্বাসী হয়ে কোনো এক গণকের কাছে গিয়ে হাতটা বাড়িয়ে দিই। তারপর জিজ্ঞেস করি—বলুন তো, কপালটা কি আমার জন্ম থেকেই খারাপ, নাকি আমার ভাগ্যের পাতায় ভালোবাসা নামক শব্দটা লিখতেই সৃষ্টিকর্তা ভুলে গেছেন? আচ্ছা, এই বিশাল পৃথিবীতে আমাকে কেন কেউ কোনোদিন ভালোবাসতে পারল না? আপনি জানেন, আমি কোনোদিন মজার ছলেও কাউকে ভালোবাসি বলিনি। আমাকেও খুব গভীরভাবে কেউ কখনও ভালোবাসেনি। আমার দিকে তাকিয়ে কেউ কোনোদিন আঙুল উঁচিয়ে বুক চিতিয়ে বলেনি—‘এই মানুষটাকে শুধু আমার চাই’। একজন হয়তো বেসেছিল, কিন্তু আমি তার জন্য নিষিদ্ধ ছিলাম।
জীবনে অনেক কিছু হারালাম, তার মধ্যে সবচেয়ে পছন্দের মানুষটি ছিলেন আপনি। যদিও আমাদের গল্পটা ছিল খুব অল্পদিনের। এই ক্ষুদ্র জীবনের আয়ুতে আমি আপনার মায়ায় পড়েছিলাম ঠিক সমুদ্রের মতোই—যতই পাড়ে এসে ঢেউ ভাঙুক না কেন, সমুদ্র যেমন তার গভীরতা হারায় না, আপনার প্রতি আমার টান’টাও তেমন ছিল। আপনি আমার সেই মায়া, যাকে আমি কোনোদিন হারাতে চাইনি। কিন্তু তবুও হয়তো আপনি দূরত্ব চেয়েছিলেন, আর আমি দূর থেকে শুধু আপনাকে চেয়েছিলাম। দূরত্বের নামে আপনি মুক্তি পেলেন, আর আমি আপনার মায়ায় আরও বীভৎসভাবে জড়িয়ে গেলাম।
আমি বড়ই লোভী, সুহাসিনী! এতো কিছু থাকার পরেও আপনার অভাবে নিজেকে বড় বেশি অভাবী মনে হতো। আপনি কোনোদিনও জানবেন না, বিষাদের দিনগুলোতে আপনাকে কতটা তীব্রভাবে চাওয়া হয়েছিল। আমি জীবনে যতটুকু কষ্ট পেয়েছি, তার একাংশ বহন করার ক্ষমতাও আমার ছিল না। মানুষ হিসেবে আমার জীবন অনেক অপূর্ণতা রয়েছে, তবুও আমি আপনার মায়ায় নিজেকে জড়ানোর ক্ষেত্রে কোনো অপূর্ণতা রাখিনি। আমি সবসময় চেয়েছি—সে আমার না হোক, তবুও সে জানুক পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তে এক ক্ষুদ্র মানুষ কী বীভৎসভাবেই না তার মায়ায় জড়িয়ে ছিল।
আজ নিজের প্রিয়তম বন্ধু আবার শত্রুর হাতেই হাসিমুখে মৃত্যুকে বরণ করে নিলাম শুধু আপনার সুখের কথা ভেবে। যদি আমার এই রক্ত আপনার আগামীর পথকে একটুও নিষ্কণ্টক করে, তবে আমার মৃত্যু সার্থক। আপনি জানেন সুহাসিনী, এই কাহিনীর শেষ পাতায় হয়তো খুব বড় করে লেখা থাকবে—ওমানের নাম্বার ওয়ান মাফিয়া রায়য়ান চৌধুরীকে কেউ কোনোদিন ভালোবাসেনি। সবাই তাকে ঘৃণা করেছে, ভয় পেয়েছে, কিন্তু কেউ তার বুকের ভেতরের হাহাকারটা ছোঁয়ার চেষ্টা করেনি।
ভালো থাকবেন, আমার সুহাসিনী। এই রায়য়ান চৌধুরী আপনাকে ছুঁতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু নিজের পুরো অস্তিত্ব দিয়ে আপনার মায়াটাকে আগলে রাখার চেষ্টা করেছে।”
ইতি,
“আপনার মায়ায় আজীবন কারাবন্দি এক অপরাধী।”
আলিয়া চিঠিটা ভাঁজ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“রায়য়ান চৌধুরী… মানুষটা জানোয়ার ছিল না, সুমু। তিনি ছিল আসলে এক অতৃপ্ত প্রেমিকের প্রেতাত্মা, যে নিজের ধ্বংসের মাঝেই নিজের মুক্তি খুঁজেছে।”
আলিয়ার কথা শেষ হতেই ক্যাফেটেরিয়ার ভেতরে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। এসির শব্দটাও যেন হঠাৎ খুব জোরালো হয়ে উঠল। সুমু কফির কাপটা দুহাতে জড়িয়ে ধরল। সে জানালার ওপারে মরুভূমির দিগন্তের দিকে তাকিয়ে খুব ধীরলয়ে বলতে শুরু করল,
“জানেন অফিসার, আরিয়ান আর রায়য়ান—দুজনেই আমার মায়ায় পড়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের প্রকাশের ধরন ছিল আলাদা। তবে দিনশেষে আমি এক শেরাজ খান ছাড়া দুজনের কারও দিকে বিন্দুমাত্র করুণার দৃষ্টিতেই তাকাতে পারিনি। আমার সমস্ত ভালোবাসা তো সেই বৃষ্টির রাতেই শেরাজ খানের সাথে ওই আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল।”
সুমু একটু থামল। তার গলার স্বর এবার কিছুটা শক্ত হলো। সে আলিয়ার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল,
“আপনি হয়তো ভাবছেন, ওমানের সেই দুর্ধর্ষ মাফিয়া আর গ্যাংস্টার আমার জন্য প্রাণ দিল, এতে আমার খুব গর্ববোধ হওয়ার কথা। কিন্তু বিশ্বাস করুন, এই রক্তমাখা চিঠিগুলো এখন আমার কাছে কেবল এক অভিশপ্ত স্মৃতি। রায়য়ান নিজেকে অপরাধী বলে গেছে, কিন্তু আসল অপরাধী তো আমি। আমি কেন ওদের ভালো করে বোঝাতে পারলাম না, যে আমি ওদের ভালোবাসি না।”
আলিয়া সুমুর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন। সহমর্মিতার সুরে বললেন,
“নিজের ওপর এত ঘৃণা রেখো না, সুমু। মানুষের মন বড় বিচিত্র। আমরা কাকে ভালোবাসব আর কার মায়ায় জড়াব, তার নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে থাকে না।”
সুমু মলিন হাসল,
“ঘৃণা রাখছি না, শুধু একটা নতুন আমি-কে খুঁজতে চাই। যেখানে কোনো পাপিষ্ঠ পুরুষ থাকবে না।”
“সুমু, যে মানুষটার সাথে তুমি ঘর করেছিলে, যার সন্তানেরা তোমার ভেতরে বেড়ে উঠছিল— সেই শেরাজ খানকে কি সত্যিই স্রেফ ‘পাপিষ্ঠ স্বামী’ বলে এক বাক্যে মুছে ফেলা সম্ভব? সে কি তোমার চোখে কেবলই বিষ ছিল?”
“শেরাজ খান আসলে আমার জন্য এক সুন্দর বিভীষিকা ছিল, অফিসার। সে আমাকে স্বর্গের স্বপ্ন দেখিয়ে নরকের মাঝপথে ছেড়ে দিয়েছিল। আমি তাকে আমার সব দিয়েছিলাম—বিশ্বাস, শরীর, আত্মা। কিন্তু বিনিময়ে সে আমাকে উপহার দিয়েছিল শুধু রক্ত আর পাপ। যে স্বামী নিজের স্ত্রীর চোখে শান্তির বদলে ভয়ের ছায়া এঁকে দেয়, সে পাপিষ্ঠ ছাড়া আর কী হতে পারে? মানুষের দেওয়া বিষে শরীর নীল হয়, কিন্তু স্বামীর দেওয়া বিষে আত্মা মরে যায়। আমার সাথেও ঠিক তাই হয়েছে।”
“এই যে আজ পাঁচ বছর পর ওমানের কারাগার থেকে তুমি বের হলে, এই মুক্ত পৃথিবী কি তোমাকে নতুন করে বাঁচবার কোনো পথ দেখাচ্ছে না? অতীতকে কি শ্মশানেই কবর দেওয়া যায় না?”
“সব হারিয়ে একটা সত্য বুঝেছি, স্বামী যদি পাপিষ্ঠ হয়, তবে স্বর্গের দোরগোড়াতে গিয়েও স্ত্রীর সুখ চিরতরে হারিয়ে যায়। জেল থেকে বের হয়ে আমি উন্মুক্ত আকাশ দেখছি ঠিকই, কিন্তু আমার ভেতরটা রয়ে গেছে সেই আগের মতোই।”
“তাহলে তোমার এখনকার গন্তব্য কোথায়? এই যে বলছো ‘নতুন এক আমি-কে’ খুঁজতে চাই— সেই নতুন সুমু কি ক্ষমা করতে শিখবে, নাকি সেও শেরাজের মতো ধ্বংসের খেলায় নামবে?”
“ক্ষমা? না অফিসার, সুমু আজ আর ক্ষমা করার জন্য বেঁচে নেই। আজ এই ওমানের তপ্ত বালুর শপথ নিয়ে বলছি— যে মায়া আমাকে ধ্বংস করেছে, সেই মায়া থেকে আমি আজ মুক্ত। ওই পাপিষ্ঠ পুরুষ আমার জীবন থেকে সব কেড়ে নিয়েছে, কিন্তু সে আমার প্রতিশোধের ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারেনি। আমি আজ সেই নতুন আমি হতে চাই, যে কারো স্ত্রী বা কারো মায়া নয়— বরং যে নিজের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে আসা এক অগ্নিশিখা। আমার সুখ হারিয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু আমার বিচার পাওয়া এখনো বাকি।”
আলিয়া চেয়ে রইল সুমুর কঠিন হয়ে ওঠা মুখটার দিকে। সুমু পুরোনো সেই বাক্সটি থেকে শেরাজের একটি ছবি বের করে হাত বুলিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“ভালোবাসা আজ মৃত, স্মৃতির পাতায় ধুলো জমেছে বিস্তর। একটা সময় আসবে, যখন আপনাকে পাওয়ার এই বিষাক্ত প্রতীক্ষাটারও অবসান ঘটবে। সেদিন আমি মুক্ত হবো— আপনার মায়া থেকে, আপনার দেওয়া যন্ত্রণার খাঁচা থেকে। আর সেদিন আমি খুঁজে পাবো নতুন এক আমি-কে।”
হঠাৎ ক্যাফেটেরিয়ার সেই থমথমে নীরবতা চুরমার করে দিয়ে কাচের দরজার ওপার থেকে একজোড়া চিকন কণ্ঠস্বর ভেসে এলো সুমুর কানে।
“মাম্মা!”
কণ্ঠটা সুমুর চেনা। এটি তার হৃদপিণ্ডের প্রতিটি স্পন্দনের সাথে মিশে থাকা এক সুর। সুমু বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সে পেছন ঘুরতেই দেখল, তার পাঁচ বছরের দুই কলিজার টুকরো— সিমরান আর শেরান দুহাত বাড়িয়ে পাগলের মতো দৌড়ে আসছে। সুমু নিজেকে ধরে রাখতে পারল না, হাঁটু গেড়ে বসে দুই সন্তানকে বুকের পাঁজরের সাথে মিশিয়ে নিতে চাইল। পাঁচটি বছরের হাহাকার, কারাগারের ওই পাথুরে দেয়াল আর চোখের জল আজ এক নিমেষে মাতৃত্বের এই পরম ছোঁয়ায় ধুয়ে গেল। সুমু পাগলের মতো তাদের কপালে, মুখে চুমু খেতে লাগল। তাদের গায়ের সেই অবোধ ঘ্রাণ যেন সুমুর মৃত আত্মাটাকে নতুন করে প্রাণ দিল।
অফিসার আলিয়া মুগ্ধ নয়নে এই দৃশ্য দেখছেন। মানুষের দেওয়া কষ্টের ওপারেও যে এমন এক টুকরো স্বর্গ থাকতে পারে, তা এভাবে চোখের সামনে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
ক্যাফেটেরিয়ার বাইরে তপ্ত বালু উড়িয়ে একদল মানুষ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের চোখেমুখে অপরাধবোধ আর স্বস্তির এক অদ্ভুত লড়াই। সুমু মুখ তুলে তাকাল। একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে নিহাল, সাইফ, অমিত, রিয়াদ, ফাহিম আর রিসান। তাদের থেকে একটু আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রিয়াজ। তার পাশে শাহরুখ। আর ঠিক তার পাশেই দাঁড়ানো শেরাজের দুই ছায়াসঙ্গী ভাই আর বন্ধু— সারবাজ আর আরবাজ। সারবাজের পাশে তার স্ত্রী ইনায়া আর আরবাজের পাশে তার স্ত্রী ইশিতা। আরবাজের কোলে তাদের চার বছরের ছোট্ট মেয়ে রুহি। তাদের থেকে একটু দাঁড়িয়ে নাজমিন ডুকরে কাঁদছে। তার পাশে হাত ধরে সান্ত্বনা দিচ্ছে আইয়ুব। ছোট নিশান অবাক হয়ে দেখছে তার মা কাঁদছে কেন। আর সবার শেষে দাঁড়িয়ে আছে ফিরোজা। সে আজও সেই পুরোনো আদলে সুমুর দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল, “নিউ ফ্রেন্ড!”
আলিয়া এক পা এগিয়ে এসে সুমুর কাঁধে হাত রেখে বললেন,
“তোমার জন্য কেউ আসেনি বলে যে আক্ষেপটা করেছিলে তুমি, তাকিয়ে দেখো— তোমার পুরো পৃথিবীটাই আজ তোমার অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল।”
আলিয়ার কথার পিঠে সুমু এক অদ্ভুত ম্লান হাসি হাসল, যেন সে এই মুহূর্তটির কথা অনেক আগে থেকেই জানত। ধীরস্বরে সে বলল,
“আমি জানতাম সবাই আসবে। ঘৃণা হোক বা ভালোবাসা—এই মানুষগুলো আমায় একা ছাড়ার পাত্র নয়।”
সুমুর কথা শেষ হতে না হতেই ক্যাফেটেরিয়ার সেই গম্ভীর পরিবেশটা এক লহমায় বদলে গেল। উপস্থিত সবাই—আইয়ুব, নিহাল, সারবাজ থেকে শুরু করে সকলে একসাথে চেঁচিয়ে বলে উঠল,
“হ্যাপি বার্থডে, খান সাহেবের সুইটহার্ট!”
সুমু মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো জমে গেল। তার শরীরটা যেন কেঁপে উঠল এক অজানা শিহরণে। আজ বারো-ই এপ্রিল! গত পাঁচ বছর জেলের ওই অন্ধকার কুঠুরিতে দিন-রাতের হিসেব মেলাতে মেলাতে সে নিজের জন্মদিনের কথা ভুলেই গিয়েছিল। অথচ এই মানুষগুলো ভোলেনি। শেরাজ খানের সেই চিরচেনা সম্বোধন— ‘খান সাহেবের সুইটহার্ট’—আজ অন্যের মুখে শুনে সুমুর বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল।
সিমরান আর শেরান তার পরনের সাদা সুতির শাড়িটার আঁচল ধরে টান দিতে লাগল। সুমু চোখের জল সংবরণ করে সন্তানদের উচ্চতার সমান হয়ে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসল। সাথে সাথেই কচি দুই জোড়া হাত সুমুর গলা জড়িয়ে ধরল। সিমরান আর শেরান একসাথে সুমুর দুই গালে নরম ঠোঁটের ছোঁয়া দিয়ে আধো আধো কণ্ঠে বলে উঠল,
খান সাহেব পর্ব ৮৬
“হ্যাপি বার্থডে, মাম্মা!”
বাচ্চাদের এই নিষ্পাপ ভালোবাসার স্পর্শে সুমুর দীর্ঘদিনের জমে থাকা পাথরচাপা কষ্টটা যেন গলতে শুরু করল। সে দুই সন্তানকে শক্ত করে বুকের মাঝে চেপে ধরল। আলিয়া দেখলেন, এক ভয়ংকর প্রতিশোধের নেশায় মত্ত নারীর ভেতরে থাকা মা-টা আজ সন্তানদের আদরে কেমন অসহায় হয়ে পড়েছে।
ফিরোজা ধীর পায়ে এগিয়ে এসে সুমুর হাতে একটা ছোট বুনো ফুলের তোড়া ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“নিউ ফ্রেন্ড, আজ আর কান্না নয়। চলো আমাদের সাথে এখন বাড়িতে ফিরবে তুমি। খান ম্যানশনে সকলে যে তোমার অপেক্ষায় বসে আছে।”
