Home চারুবৃত্ত চারুবৃত্ত পর্ব ১২

চারুবৃত্ত পর্ব ১২

চারুবৃত্ত পর্ব ১২
জুলি জোনাকি

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত ছুঁইছুঁই, আকাশে চাঁদ বা তারার মেলা আজ বসে নি। আকাশে মেঘ করেছে, চারিদিক ঠাণ্ডা বাতাসও বইতে শুরু হলো, হাটতে হাটতে অনেকটা দূরে এসে পৌঁছাল, চারু তার মায়ের সাথে হাত ধরে হাঁটছিল , হঠাৎ করে চারুর মা রাস্তার পাশে বসে পড়লো। চারু চমকাল, মায়ের কাছে বসে বলল,

“কি হয়েছে মা ? ”
চারুর মা মাথায় হাত দিয়ে বলল,
“ভাল লাগতাছে না, ভাল লাগতাছে না ।”
আর কিছু বলাই আগেই জ্ঞান হারিয়ে ফেললো । চারুর ভয়ের মাত্রা বাড়লো। চোখ বন্ধ করে ভায়কে আটকাল তখন চারুর পাশ কেটে চারুর বয়সি একটা মেয়ে হেটে যাচ্ছিল , কিন্তু এমন পরিস্থিতি দেখে দাড়িয়ে গেল । এগিয়ে এসে বলল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

” কি হয়েছে ওনার আপু ?”
চারু তাকাল, কান্না আওড়ানো কণ্ঠে বলল,
“বুঝতে পারছি না কি হলো হঠাৎ ।”
মেয়ে টা হাটু মুরে বসে বলল,
” কোথায় যাবেন বলুন এগিয়ে দিচ্ছি । ”
চারু কি বলবে কি করবে বুঝতে পারলো না । আমতা আমতা করে বলল,

” একটু বিপদে পড়েছি , কোথায় যাব জানি না । ”
“এ মা কি বলছেন ,আকাশের যে অবস্থা , তারপর ওনার যা অবস্থা কি করে যাবেন ।”
“একটু বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে । কিন্তু কি করবো বুঝতে পারছি না । ”
মেয়েটা অনেকখন চুপ থেকে বলল,
“আপনার কোন সমস্যা না থাকে আমার সাথে আসুন , ওনি ঠিক হয়ে গেলে তখন যাবেন ।”
চারু চুপ ছিল দেখে মেয়েটা আঙ্গুল তুলে দেখিয়ে বলল,
” ওই যে দেখা যাচ্ছে বিল্ডিং এই খানেই থাকি আমি । চলুন আপু ।”
চারু তার মায়ের দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবতে পাড়লো না , এখন এই মেয়েকে বিশ্বাস করা ছাড়া কোন গতি নেই । তাই রাজি হয়ে গেল । দুজন মিলে ধরে নিয়ে গেল ।

” চারুকে এমন করে কেন আঘাত করলে মা ? ভালো তা আমি বাসি ও তো বাসে না । আমায় বলতে ।”
বৃত্ত সোজা তার মায়ের রুমে এসে চেঁচিয়ে বলল কথা গুলো । বৃত্তের মা মুখ ঘুরিয়ে বসে ছিল । বৃত্ত ফের চেঁচিয়ে উঠলো,
” হয় চারুকে এনে দিবে না হয় ছেলেকে হারাবে । আরেকটা কথা তুমি নিজে চারুকে আমার কাছে এনে দিবে , তার আগে আমি তোমার সাথে কথা বলবো না ।”
একটু আগে বৃত্তের বাবা বেশ কড়া কথা শুনিয়ে গেছে এমন ভাষায় গালাগালি করার জন্য , এছন বৃত্ত এসে মাকে কথা শোনালো । বৃত্ত যেতেই বৃত্তের মা চোয়ার শক্ত করে বৃত্তের যাওয়ার দিক তাকিয়ে থাকলো ।
বৃত্ত ঘরে গিয়ে মুখে পানি দিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে চারুর নাম্বারে কল করতে করতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল ।

মায়ের পাশে বসে ছিল চারু । কাজল লেপটে গেছে । পেটে গুজে রাখা ফোনটা বাজতেই বের করলো । তাতে বৃত্তের নামটা জলজল করছে, বেশ কয়েকবার বাজলো তবে চারু ধরলো না । সেই মেয়েটা আসতেই ফোন উল্টো করে রেখে দিল , এসে পাশে বসে বলল,
” আপনার নাম কি ?”
“চারু ।”
“আরে বাহ !আমার নাম তো লতা , বেশ মানিয়েছে তাইনা? চারুলতা ।”
চারু মুখে হাসি টেনে বলল,

“তোমার বয়স কেমন? ”
” আঠারো ছাড়িয়েছি ।”
“ওহ আমিও ।”
“আচ্ছা । একটা কথা বলি ?”
“বলো ?”
“এতো সুন্দর শাড়ি পড়ে সেজেগুজে কোথায় গিয়েছিলে? তুমি করেই বললাম কেমন ।”
চারু মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল । বলল,

“এটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম । ”
” ওহ ।”
” কাউকে দেখছি না যে ?”
“আমি একাই থাকি এখানে ,বাবা মা গ্রামে থাকে । আমি এখানে একটা স্টলে থাকি, কাজ করি । ”
“ওহ , বুঝলাম ।”
অনেকখন চুপ থেকে চারু বলল,

” আমায় যখন এতো সাহায্য করলে তাহলে আর একটু সাহায্য করো ?”
” কি সাহায্য বলো ?”
” আমায় কিছু দিন এখানে থাকতে দিবে ? বাড়ি ভাড়া অর্ধেক আমি দিয়ে দিব ।”
” ঠিক আছে । আমার ও ভালোই হলো একা থাকতে হবে না ।”
চারু হাসলো, লতা বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে পড়ে কথা হবে , খাবার রান্না শেষ হলে ডাকবো চলে এসো ।”
“হুমমম ।”
লতা যেতেই চারু মায়ের পাশে মাথা গুঁজে শুলো । ওদিকে বৃত্ত একের পর এক ফোন করেই যাচ্ছে, তবে চারু ধরলো না । বৃত্ত ক্লান্ত হয়ে রাস্তার পাশে ফুটপাতে বসলো আর চিন্তিত সুরে বলল,
“কোথায় তুমি ?”

আজ ফিরুনি, বিন্তি বিন্দু আসবে বলে বৃত্ত কে যেতে বলল কিন্তু বৃত্ত কোন কথা না বলে কলেজে চলে গেল । আজ চারুর ও ব্যবহারিক পরীক্ষা আছে তবে খাতা সব ওবাড়িতে, খাতা ছাড়া পরীক্ষা দিতে পারবে না । কাল রাতে লতাকে বিশ্বাস করে সব খুলে বলেছে চারু । লতা এসে জানতে চাইলো কি হয়েছে । চারু সব বলল , ঠিকানা দিল লতা বলল ,

“তুমি খাবার খেয়ে তৈরি হও বাকিটা আমি দেখছি।”
লতা ঠিকানাটা হতে করে বৃত্তদের বাড়িতে গেল । বাড়িতে ভালোই লোকজন । চারু যেমন ভাবে বলেছিল ঠিক সে ভাবেই পা টিপে টিপে বাড়ির পেছনে গিয়ে জানালা দিয়ে একটা ঘরে টুকে পড়লো । ঘরে তেমন জিনিস নেই দেখে বই খাতা দেখতে লাগলো , কোথাও নাম লেখা আছে কিনা , খাতাতে চারুর নাম দেখে বুঝলো এটা চারুর রুম । তাই চারু যা যা বলেছিল তাই তাই নিয়ে ধীরে বেড়িয়ে এলো । চারিদিকে মানুষ জন্য কেউ তেমন সন্দেহ করে নি ।
চারুর আজ সকালে পরীক্ষা বৃত্ত তা জানতো না । সে জানতো বিকালে তাই হল থেকে বেরিয়ে সেদিন চারু গাড়ির জন্য যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল বৃত্ত সেখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করো । সন্ধ্যা ওবদি দাঁড়িয়ে ছিল কিন্তু চারুর দেখা মিললো না , মলিন মখে ক্লান্ত পায়ে বাড়ির পথ ধরলো ।
বসার ঘরে সবাই বসে ছিল , বৃত্ত ঢুকতেই বিন্দু উঠে বলল,

“ভাইয়া আমরা তোমার ওপর রাগ করেছি । তুমি আনতে গেলে না কেন ?”
বৃত্ত কিছু বলল না । বিন্তি এগিয়ে গিয়ে বৃত্তের হাত ধরে বলল,
” আমাদের রাগ ভাঙ্গাতে হলে টাকা দিয়ে ভাঙ্গাতে হবে বলে দিলাম ।”
মেয়েদের এমন বাহানা শুনে বৃত্তের মা হাসলেন বৃত্ত একবার তার মায়ের দিকে তাকিয়ে ওপরে ধীর পায়ে চলে গেল ।
বৃত্ত রুমে গিয়ে ধপ করে বিছানাতে শুয়ে পড়লো, পেছন পেছন বিন্দু এসে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডাকলো,
“ভাইয়া ।”

ভেতর থেকে উওর এলো না দেখে বিন্দু দরজা ঠেলে ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে দেখলো বৃত্ত শুয়ে আছে । এগিয়ে গিয়ে গায়ে হাত দিয়ে ডাকলো,
“ভাইয়া কি হয়েছে ? ”
এবার ও কোন উওর এলো না
” ভাইয়া কি হয়েছে বলো ?”
বৃত্ত তখনো চুপ । বিন্দু পাশে বসে ভাইয়ের মাথায় হাত রেখে বলল,
” চারুকে খুজে পাওনি ?”

বৃত্ত চারু কথা শুনে উঠে বোনকে জড়িয়ে ধরে নিঃশব্দে কাদলো । বিন্দু বেশ আবাক হলো , তার ভাইকে বেশি কষ্ট না পেলে কাদতে দেখেনি । অনেক দিন পর কাল তাদের বিদায়ের সময় কাদতে দেখেছিল । আর এখন চারুর জন্য কান্না করছে ? বিন্দু ভারি শ্বাস ছেড়ে ধীরে শুধলো ,
” তোমায় আমি এভাবে বাচ্চাদের মত হাঁউমাউ করে কান্না করতে কখনো দেখিনি ভাইয়া । ”
বৃত্ত তখনো চুপ । বিন্দু ফের ভারি শ্বাস ছেড়ে আওরাল,
“ভাইয়া …….?”
বৃত্তর তখনো কোনো হেলদোল নেই, ওভাবেই কেদে যাচ্ছে । বিন্দু ফের একাএকাই বলল,
“আশ্চর্য! তোমাকে আমি এভাবে কখনো কারো জন্য কান্না করতে দেখিনি বৃত্ত ভাইয়া ।”
বৃত্ত আসলে এভাবে কখনোই কান্না করেনি । তবে আজ যেন বৃত্তের চোখে বৃষ্টি নেমেছে । যার থামার কোন নাম নেই ।

“কি করবে ভেবেছ কিছু? ”
“ভাবছি যে একটা ছোট্ট ফুড কার্ডের দোকান দিব । ওই সামনে দেখলাম বেশ ভির জমে বিকাল থেকে রাত ওবদি । সকালের দিক ছোট্ট বাচ্চাদের পড়াবো আর বিকাল থেকে দোকানটা চালাব মায়ের সাথে । এছাড়া তো কোন উপায় নেই , মাত্রই পরীক্ষা দিলাম চাকরি কে দিবে ? তারচে ভালো কিছু করি ।”
“এটা কিন্তু ভালো আইডিয়া, দরকার হলে আমিও তোমাদের কাজে হাত লাগাব । ”
“ঠিক আছে । তবে সব ব্যবস্থা করার জন্য তো টাকা লাগবে , আমার কাছে বেশি টাকা নেই । তোমার কাছে থাকলে কিছু ধার দাও , আমি পড়ে ফেরত দিয়ে দিব । ”
“ঠিক আছে নিও । ”

চারুর মায়ের আজ কাল অসুক টা বেশ বেড়ে গেছে , চিকিৎসার জন্য টাকাও দরকার , পার্ট টাইম কিছু না করলে টাকা আসবে না হতে । এমন অনেক কিছু ভাবছিল বেলকুনিতে রেলিং ঘেষে দাঁড়িয়ে । তখন লতা এসে ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটালো । মেয়েটা বড্ড ভালো ,দু দিনেই কেমন আপন করে নিয়েছে । তাই সবটা লতার সাথে শেয়ার করলো । এমন সিদ্ধান্তে লতাও সম্মতি দিল ।
এভাবেই পার হলো বেশ কিছু দিন । বৃত্ত বাড়ির কারো সাথে কথা বলে না । মায়ের সাথে তো দেখা পর্যন্ত করে না । এখনো চারুকে খুজে যাচ্ছে । ফোন দিলে ফোন সবসময়ই বন্ধ দেখায় । এ কদিনে বেশ বেহাল দশা হয়েছে বৃত্তের । ঠিকমতো খাওয়া দেওয়াটা ও করে না ।
ওদিকে চারুর বৃত্তের কথা মনে পড়লেও কখনো কারো কাছে প্রকাশ করে না , নিজের মধ্যেই ভালো লাগাটা চেপে রাখে ।

চারুবৃত্ত পর্ব ১১ (২)

একদিন বৃত্ত হাটতে হাটতে ঘুড়তে ঘুড়তে এদিক ওদিক যাচ্ছিল । চারুও সেই পথে ময়লা ফেলার জন্য যেতেই দুজন দুজনের মুখোমুখি হলো । চমকাল দুজনি । দুজন দুজনের থেকে বেশ খানিকটা দূরে থমকে দাঁড়িয়ে ছিল । বৃত্তের চোখে পানি ছলছল করে উঠলো। আচমকা অস্থির হয়ে চারুকে ডেকে উঠলো ,
” চারু ………!”

চারুবৃত্ত পর্ব ১৩