Home চারুবৃত্ত চারুবৃত্ত পর্ব ২১

চারুবৃত্ত পর্ব ২১

চারুবৃত্ত পর্ব ২১
জুলি জোনাকি

রাত পোহাল, সকাল হতেই বাড়িতে হঁইচঁই পড়ে গেল । আজ বাদে কাল অনুষ্ঠান , সকাল থেকেই কাজ শুরু হয়ে গেছে ।
চারুর মা আর বৃত্তের মা একসাথে রান্না ঘরে কাজ করছে , অবিশ্বাস হলেও সত্য! কাল অনেক রাত করে ঘুমানোর পরেও আজ সকাল সকাল চারুর ঘুম ভেঙ্গে গেছে । ফ্রেশ হয়ে গুটিগুটি পায়ে নিচে নামতেই বৃত্তের মা ডেকে উঠলেন ,

“এদিকে আয় চারু ,কথা আছে ।”
কথার তালে চারু সেদিকে গেল , তিনি ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“শোন চারু, আমার ছেলের জন্যই তোকে মেনে নিয়েছি, এখন যেমনি হোক আমার মানতে হবে , তাই তুই তোর সবটুকু দিয়ে আমার মনের মতো হওয়া কঠোর চেষ্টা করবি । পরবি ?”
চারু কেবল মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল । চারুর মা ফের বলল ,
“আমার ছেলেকে আবার বলতে যাসনা আমি যা বললাম ।”
চারু ফের মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল । চারুর মা চুপচাপ কথা শুনছিল । এমন সময়ে বিন্তি এলো , এসে চারুকে ঘিরে বলল,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“আচ্ছা চারু, আমি তোকে কি বলে ডাকবো ? চারু নাকি ভাবি ?”
চারু এহেন প্রশ্নে থতমত খেয়ে বলল,
“তোমার যা ভালো লাগে তাই ডেকো ।”
“তাহলে তোকে চারু বলেই ডাকি, তোকে নাম ধরে ডাকতে ভীষণ লাগে । রাগ করবি না তো ?”
চারু হেসে মাথা নেড়ে না বলল । এবার সকাল সকাল এবাড়িতে রুহির পা পড়লো । বৃত্তের বাবা মা কাল রাতে অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে আসার জন্য রাজি করিয়েছে। তবে রুহির বাবা আসে নি কেবল রুহি আর তার মা এসেছে । বাড়িতে এসেই চারুকে দেখে মুখ বাঁকিয়ে পাশ কাটলো । বৃত্তের মায়ের কাছে গিয়ে বলল,
“ফুপি আমি কিন্তু শুধু তোমার জন্য এসেছি । ”
“ঠিক আছে ।”

চারুর পড়নে লাল শাড়ি । রুহি দেখে দাঁত কটমট করে উপরে চলে গেল । আজ চারুর রেজাল্ট দিবে তা ভুলেই গিয়েছিল। হুট করে মনে আসতেই হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল । তখন উপর থেকে বৃত্ত নেমে এলো । চারুর দিক একবার তাকিয়ে গাল টিপে হাসলো । চারু খেয়াল অন্যদিকে ছিল । বৃত্তের মা বৃত্ত কে ডাকতেই চারু সেদিকে তাকালো । মুখে হাসি টানলো ।
“বৃত্ত এদিকে আয় ।”
বৃত্ত চারুর পাশ কেঁটে মায়ের কাছে গেল । বৃত্তের মা বড় একটা তালিকা ধরিয়ে দিয়ে তাকে এখনি আনতে বললো । বৃত্ত যাওয়ার সময় ফের একবার চারুর দিক তাকাল, চারু তখন অন্য ভাবনাতে ছিল । বৃত্ত কপালে ভাঁজ ফেলে চলে গেল ।
চারুও কাজে হাত লাগালো । তখন লতা এলো এসে ফিসফিস করে চারুর কানে কানে বলল,

“কি গো বাসর কেমন হলো ?”
চারু চোখ ছোট ছোট করে তাকাল, মিনমিন করে বলে,
“দেখো আমি বড্ড টেনশনে আছি ।”
“ওমা কেন ? এতো তারাতারি গুড নিউজ দিবে নাকি হুমম? ”
লতা মজা নিল । চারু সবার আড়ালে লতার কান টেনে ধরে বলল,
“আজ আমার রেজাল্ট দিবে । খুব চিন্তা হচ্ছে ।”
“চিন্তা করো না, ভালোই হবে ।”
“হুমম ।”

বেলা এগারোটা, চারু অনেক খন হলো রেজাল্ট দেখার চেষ্টা করছে তবে দেখতে পারছে না । এরমধ্যে বৃত্ত হাত ভর্তি জিনিস এনে রান্না ঘরে রেখে ঘরে চলে গেল ।
বৃত্তের মা চারুর হাতে লেবু শরবত ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
“ভ্যাবলার মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন ? দেখতে পাসনি আমার ছেলে ঘেমে একাকার হয়ে গেছে, যা শরবত দিয়ে আয় ।”

চারুর এদিকে এক চিন্তা হচ্ছিল । বারবার কপাল ঘাটছিল চারুর ,শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে গ্লাস টা নিয়ে উপরে গিয়ে ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“ভেতরে আসলাম ।”
বলে উওরের আশা না করে ভেতরে পা রাখলো । বৃত্ত নেই, হয়তো ওয়াশরুমে গেছে । চারু গ্লাস টা হাতে রেখে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল তখন বৃত্ত টাওয়াল দিয়ে হাত মুখ মুছতে মুছতে এসে চারুর মুখোমুখি দাঁড়ালো । চারু হেসে গ্লাস এগিয়ে দিল । বৃত্ত গ্লাসটা নিয়ে টেবিলে রাখলো, চিন্তিত চারুকে প্রশ্ন করলো,
“রেজাল্ট দেখেছো? ”
চারু দিব্যি তাকালো, মাথা নেড়ে না বললো । বৃত্ত এবার আয়েশ করে বিছানায় বসলো । তারপর চারুকে হাত টেনে পাশে বসিয়ে বললো,

“দেখো নি কেন ?”
“অনেকখন হলো চেষ্টা করছি কিন্তু দেখতে পারছি না । ”
বৃত্ত লেবু শরবতটা চারুর দিক এগিয়ে দিয়ে ধীরে বললো,
“এটা অর্ধেক শেষ করো , আমি দেখছি ।”
চারু কাঁপাকাঁপা হাতে নিলো তবে খেল না । রেজাল্ট দেখে বৃত্ত চারুর দিক তাকাল, চারু তখন বৃত্তের ফোনে উঁকিঝুঁকি মারছিল । বৃত্ত চারুর মাথায় টোঁকা দিয়ে বলল,
“বললাম তো অর্ধেক শেষ করো ।”
“আপনি আগে দেখান ।”
“আগে শেষ করো ।”

চারু হার মানলো, তারপর একটু খেয়ে গ্লাস হাতে রাখলো । বৃত্ত তা দেখে শ্বাস ফেলে হাসলো । চারুর হাত থেকে গ্লাস টা নিয়ে হাতে ফোনটা ধরিয়ে দিয়ে বলল ,
“এখন দেখো ।”
চারু দেখছিল, এরমধ্যে বৃত্ত বাকি অর্ধেক শেষ করে চারুর দিকে তাকেই দেখলো মেয়ে টা হাসছে । চারু চোখ হেসে তাকালো, বৃত্ত ভ্রু উঁচিয়ে জানতে চাইলো, চারু লাফিয়ে বৃত্তের গলা আঁকড়ে ধরে বলে উঠলো ,
“জিপিএ ফাইভ ।”
বৃত্ত চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিয়ে বলল ,

“এমনে ধরে থাকলে মরেই যাব । নতুন বিয়ে করেছি এতো তারাতারি মরতে চাই না । ছাড় !”
চারুর বোকামি খেয়ালে আসতেই ছেড়ে দিয়ে জিহ্বা কামড়ে ধরলো । বৃত্ত হেসে চারুর চুলগুলো এলোমেলো করে বলল ,
“খুশি? ”
চারু উৎফুল্ল হয়ে বলল,
“উমম খুব খুশি ।”
এই বলে চারু দৌড়ে নিচে চলে গেল । বৃত্ত গাল ভরে হাসলো ।

“কেমন আছেন? ”
“এই চলছে গাড়ি যেমন তেমন । আপনার কি খবর? ”
“ভালো না ।”
“কেন ভালো না ?”
“চারুর বিয়ে হয়ে গেল এখন আমার একা থাকতে ভালো লাগবে না । তাই মন খারাপ ।”
“ওহ, তাহলে আপনার মন ভালো করার জন্য কি করতে পারি? ”
“আমার বন্ধু হ…..”
লতার কথা শেষ না হতেই রুহি এসে সামনে দাঁড়াল । বৃত্ত আদিলকে ফোন করে আসতে বলেছে তাই সে এসেছে । তখন লতা বাড়ির বাইরে ডেকোরেশন দেখছিল, আচমকা আদিল এসে পাশে দাঁড়ালো ।
রুহি দূর থেকে দেখেই এগিয়ে এসে বলল,

“হেই, তুমি কে ?”
আদিল লতা দুজনেই অপ্রস্তুত ছিল । আদিল নিজের দিকে আঙুল উঠিয়ে বলল,
“আমায় বলছেন ?”
রুহি বেহায়া হেসে জবাব দিলো,
“হ্যাঁ, তোমাকেই বলছি ।”
আদিল একটু কপাল কুঁচকে মনে মনে বলল,’তুমি তুমি করে বলতে কেন ? আজব তো !’
আদিল হেসে জবাব দেয়,
“আমি? আমি কেউ একজন ।”
“ওহ, ”
লতার দিকে তাকিয়ে বললো,
“এটা কে ? আপনার বউ? ”

লতা চট করে আদিলের দিকে তাকালো , আদিল একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল ,
“নাহ , এখনো হয়নি তবে তার অনুমতি থাকলে খুব তারাতারি আমরা বিয়ে করছি ।”
লতা অবাকে বিষম খেল । এটা শুনে রুহি দাঁত কটমট করে তাকালো আদিলের দিক । আদিল তখনো লতার দিক তাকিয়ে । রুহি গাল ফুলিয়ে ঠোঁট কাপতে কাপতে চলে গেল আর জোরে জোরে বলে গেল ,
“ভাল লাগে না, যারেই ভাল লাগে তারি ইটিশফিটিশ আছে । আমার কপালে নিজ পছন্দের মানুষ লেখা নাই । ”
রুহি যেতেই ,লতা আদিলের দিকে গভীর প্রশ্ন ছুড়লো,

“কি বললেন আপনি ?”
আদিল সোজাসুজি বলে দিল ,
“বিয়ে করবে আমায়? ”
এমন উওর একদমই আশা করেনি লতা । তাই কিছুটা থতমত খেয়ে বলল,
“এভাবে কি করে বিয়ে করবো , আমরা একে অপরের সম্বন্ধে কিছুই জানি না । ”
আদিলের মন স্থির হলো । শীতল মনে বলল ,
“আমি আদিল ,আমার বাবা মা দুজনি বাইরে থাকে আর আমি আমার দাদার বাড়ি থাকি । চারুকে চাইতে গিয়ে যে আমি তোমায় চেয়ে ফেলেছি তা কাল বুঝতে পেরেছি । তাই আজ বলে দিলাম । এখন তুমিও আমায় ফেরাতে পারো , তোমার সে হাক টুকু আছে । ”

“আমার সম্পর্কে তো কিছুই জানেন না ?”
“সব জানার দরকার নাই , তুমি মেয়ে টা অনেকক ভালো আর কিছু না জানলেও চলবে । তুমি সময় নাও , কাল জানিও আমি অপেক্ষা করবো , তোমার উওর শুনে তবেই আমি আমার আর তোমার বাবা মার সাথে কথা বলবো । ”
লতা মাথা নুইয়ে নিল । তার কি বলা উঠিত? ফিরিয়ে দিবে ? নাকি …….
“তুমি কখন এলে? ”
বৃত্ত পকেটে হাত গুজে এসে দাঁড়ালো । আবিদ বৃত্তের দিক তাকিয়ে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“তুমিই তো আসতে বললে ।”
বৃত্ত হাসলো , এগিয়ে গিয়ে আদিলের নাক টা উঁকি ঝুঁকে দিয়ে দেখে বলল,
” ব্যাথা কমেছে? ”
“ব্যাথা কমানোর জন্য ওষুধ কিনে দিয়েছো? ”
বৃত্ত হাসলো । বলল ,

“কাল বাসর ছিল তাই ব্যস্ত ছিলাম, তোমায় দেখার সময় ছিল না ।”
কথাটা বলে চট করে লতার দিক তাকালো, বৃত্তের তাকানো দেখে লতা লজ্জা পেয়ে চলে যেতেই আদিব চেয়ে বলল,
“তোমার উওরের অপেক্ষায় থাকলাম ।”
লতা যেতেই বৃত্ত চোখ ছোট ছোট করে আদিলের দিকে তাকিয়ে বললো,
” আবার লাইন মারছো? তোমার তো অন্যের জিনিসে তাকানোর স্বভাব । আগে জেনে নিও তার কেউ আছি কিনা, না হলে আবার মার খেতে হবে । ”
আদিল অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“তোমায় বলবো কেন ? তুমি মানুষটা সুবিধার না । ”

বৃত্ত আচমকা আদিলের নাকে টোকা দিলেই আদিল উফফ শব্দ করে উঠে । বৃত্ত হেসে আদিলের কাঁধ চাপকে বলল,
“চলো আগে তোমায় ওষুধ কিনে সুস্থ করি তারপর প্রেমে সাহায্য করবো । যাই হোক বউকে পাইতে সাহায্য করেছো নাকটাও ফাটিয়েছো । কাল তোমারো হবে ধামাকা আমারো হবে ধামাকা ।ঠিক আছে ?”

চারুবৃত্ত পর্ব ২০

“ভালো হয়ে যান মাস্টার মশাই ।”
বৃত্ত আদিলের কাধে হাত রেখে যেতে যেতে বলতে লাগলো ,
“তোমার মুখে মাস্টার মশাই শুনতে ভালো লাগে না , বউ ডাকলে ফিল আসে তাই বউয়ের জন্য ডাকটা নির্ধারণ করেছি, সে ব্যতীত কেউ না ডাকুক ।”

চারুবৃত্ত শেষ পর্ব