চারুবৃত্ত শেষ পর্ব
জুলি জোনাকি
“তোকে কি করে সাজাই বলতো চারু ?”
লতা,বিন্দু, বিন্তি তিন জন মিলে চারুকে সেই সকাল থেকে সাজাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে । আজ অনুষ্ঠান সুন্দর করে সাজাতে হবে না? কোন সাজ দিলে ভালো লাগবে তিন জন কোমড়ে হাত রেখে তাই ভাবছে । চারুকে আয়নার সামনে বসিয়ে রেখেছে সেই কখন থেকে ।
এ পর্যায়ে ভারি শ্বাস ফেলে চারু বলে উঠলো,
“যেমন তেমন সাজিয়ে দাও , সমস্যা নাই ।”
বিন্দু আর লতা এক সাথে বলে উঠলো,
“একদম না ।”
বিন্দু আর লতা দুজন দুজনের দিক তাকিয়ে হো হো করে হেসে উঠলো । বিন্তি মাঝখান থেকে বলল,
“এমন দিন একবারই আসে , তাই সাধ মিটিয়ে সাজগোজ করবি ।”
তারপর তিনজন আবার চারুকে সাজাতে মেতে উঠলো ।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“কিরে পেত্নী কেমন আছিস ?”
রুহি সেজেগুজে বাইরে নতুন ছেলেকে দেখতে যাচ্ছি, যদি কাউকে চোখে ধরে । সিঁড়ি বেঁয়ে নিচে নামছিল পেছন থেকে বৃত্তের ডাক শুনে মুখ ভেঙচি কেটে তাকালো । বলল ,
“আমায় কি পেত্নীর মতো দেখাচ্ছে? ”
“উপস, ভুল বললাম, ডাইনির মতো দেখাচ্ছে । দেখিস কেউ ভয় না পায় ।”
বৃত্ত হাসার আগে রুহি হেসে বলল,
“ওহ বুঝতে পেরেছি , আমায় ভালো দেখাচ্ছে তাই চোখ সরাতে পারছো না । সোজাসুজি না বলে এমন ভাবে প্রশংসা করছো ? তুমি চাইলে আমি আবার আগের মতো সব ঠিক করে দিতে পারি ।”
শেষের কথাগুলো ফিসফিস করে বলল রুহি । বৃত্ত ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো,
“কি ঠিক করার কথা বলছিস ?”
রুহি লজ্জিত সুরে শুধলো ,
“মানে বিয়ের কথা বলছি । চলো না বৃত্ত ভাই বিয়ে করি , যা হয়েছে সব ভুলে যাবো ।”
“ও গালে মনে হয় সে দিন দেওয়া হয়নি , তাই না ?”
রুহি দু গাল ধরে বলল,
“ভেবে দেখ বৃত্ত ভাই, আমার থেকে ভালো বউ তুমি পাবে না । ”
“আমার ভালো বউ দরকার নাই । ”
“আবারও বলছি ভেবে দেখো ।”
“হুমম ভাবলাম ।”
রুহি উত্তেজিত হয়ে বলল ,
“কি ভাবলে ?”
“তোর ও গালেও দিতে হবে ।”
রুহি গাল ধরে নিচে নামতে নামতে বলল,
“তোমায় সুখে থাকতে ভুতে কিলাবে, দেখে নিও ।”
বৃত্ত হাসলো ।
কাল রাতে চারু বৃত্ত এক রঙের শাড়ি পাঞ্জাবী পরবে বলে ম্যাচিং ম্যাচিং সব কিনে এনেছে ।
আদিল কে দেখে সেদিকে গেল বৃত্ত । কাল বিকেলে তার সাথেই গিয়ে শাড়ি কিনে এনেছে ।
বেশ লোকজন কে দাওয়াত করা হয়েছে । চারুকে নিয়ে গিয়ে বৃত্তের পাশে বসতেই বৃত্ত বারবার আড় চোখে দেখতে লাগলো । একটু আড়াল হয়ে চারুর দিক ঝুঁকে বলল ,
“চারু শুনো ।”
চারু কানটা এগিয়ে দিল । বৃত্ত শীতল কণ্ঠে প্রশংসা করলো,
“ভীষণ সুন্দর লাগছে । ”
চারু মুচকি হেসে বলল,
“আপনাকেও ।”
লোকজন এসে টুকটাক কথা বলে যাচ্ছে চারু বৃত্তের সাথে । রুহি এদিক সেদিক সুন্দর ছেলে খুঁজে বেড়াচ্ছে । লতা দাঁড়িয়ে চারুবৃত্ত কে এক সাথে দেখছিল । নীরবে কেউ পেছনে এসে দাঁড়ালো । লতার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“তুমি চাইলে আমরা ওদের মতো এক হতে পারি ।”
লতা ভয় পেয়ে বুকে হাত রেখে ঘুরে তাকালো । আদিল কে দেখে বলল,
“আপনি কখন এলেন? ভয় পাইয়ে দিয়েছেন ।”
“আমার উত্তর টা পেলাম না এখনো ?”
লতা এদিক ওদিক তাকিয়ে লজ্জায় মাথা নিচু করে জবাব দিলো,
“কাল এটা নিয়ে ভেবেছি ।”
আদিল আগ্রহ নিয়ে মুখ ঝুঁকে বলল ,
“কি ভাবলে ?”
“বিয়ের আগে প্রেম করা উচিত ।”
আদিল হাসলো । লতার দিক তাকিয়ে বলল,
“যথা আগ্গ মহারানী ।”
তারপর দুজনি হেসে উঠলো । অবশেষে তাদের ও প্রেম হলো । কেবল রুহির হলো না ।
চারুর মা মেয়েকে এমন সাজে দেখে বেশ খুশি হলো । দু হাত ভরে দোয়া করলো । বৃত্তের মা বাবা গিয়ে দুজনের মাথায় হাত রেখে প্রশংসা করলেন ।
বৃত্তের মা ও সব কিছু মেনে নিল ।
সারা দিন বেশ ধকল গেছে সবার উপর । রাত তখন একটা কি দুটো ছুঁইছুঁই । চারু ভারি শাড়ি খুলে সুতি শাড়ি পড়ে রুমে পা রেখে দেখলো বৃত্ত টানটান হয়ে শুয়ে আছে । চারু এগিয়ে যেতেই বৃত্ত উঠে চারুকে বসিয়ে চারুর কোলে মাথা রেখে ক্লান্ত সুরে আওরাল,
“বড্ড ক্লান্ত লাগছে চারু । একটু চুলে হাত রাখ ।”
চারু বৃত্তের চুলে হাত বুলিয়ে বলল,
“ঘুমিয়ে পড়ুন ভালো লাগবে । ”
বৃত্ত ধপ করে উঠে পড়লো । তারপর চারুর দিক তাকিয়ে অপরাধী সুরে বলল,
“তোমায় ভালোবাসি এটা তো বলাই হয়নি মুখে ।”
চারু বৃত্তের গাল টেনে হেসে বলল,
“ভালোবাসি মুখে না বললে বুঝি ভালোবাসা যায় না ?”
“যায় তো তবুও বলতে হয় । বলি ?”
“ঠিক আছে বলুন ।”
বৃত্ত ফ্লোরে হাটু মুরে বসে চারুর হাত নিজের মুঠোর মধ্যে বন্দি করে আদুরে সুরে কইলো,
“এই যে দু হাত দেখছো , এই দু হাত প্রসারিত করে যতটুকু ভালোবাসি বোঝানো হয়, তার থেকেও অনেক অনেক অনেক ভালোবাসি । ”
চারু ঠোঁট টিপে হাসলো । তা দেখে বৃত্ত বলল,
“হাসলে হবে না এবার তুমি বলো ।”
“উহু ।”
“কেন? ”
“শুনুন মাস্টার মশাই, ভালোবাসি মুখে বলতে যাব কেন ? বরং আমাদের পথ চলা দীর্ঘায়ু হোক, পথ চলতে চলতে না হয় জেনে নিবেন কতোটা ভালোবাসি ।”
বৃত্ত হাতটা ছেড়ে চারুর গাল টেনে দিয়ে বলল ,
“খুব পাকা পাকা কথা বলতে শিখে গেছো ।”
চারু ফের হাসলো । বৃত্ত এবার উঠে দাঁড়িয়ে চারুকে বলল ,
“চলো ছাদে যাই? ”
“আজও? এই এতো রাতে? অসময়ে ?”
“হুমম চলো ।”
কালকের মতো পা টিপে টিপে দুজন উপরে গেল । রাতের আকাশে তারার ঝলক । তারায় তারায় খেলা করছে । বেশ কিছুক্ষণ দুজন নীরব হয়ে আকাশ পানে চেয়ে দেখছিল । এমন সময়ে বৃত্ত নীরবতা ভেঙে চারুকে আগের ন্যায় মধু সুরে শুধল,
“চারু শুনছো? ”
চারু অন্ধকারের মধ্যে বৃত্তের দিক তাকিয়ে আওরাল,
“বলুন মাস্টার মশাই, আমি শুনছি ।”
বৃত্ত চারুর কাঁধে মাথা রেখে বলল ,
“তোমায় পাওয়া একদম সহজ ছিল । হুটকরেই এতো সহজ হলো কি করে ?”
চারু কাধ সরিয়ে বৃত্তের চুলগুলো এলোমেলো করে বলল ,
” আপনি খুব করে চেয়েছেন তাই পেয়েছেন ।”
বৃত্ত ও চারুর চুল এলোমেলো করে বলল ,
” তুমি বুঝি চাওনি? ”
চারু ফের মুচকি হেসে বৃত্তের হাত পেঁচিয়ে জড়িয়ে ধরে বৃত্তের কাঁধে মাথা রেখে বলল ,
“আপনাকে না চাইলে বুঝি এখন এখানে থাকতাম? ”
“তার মানে তুমিও খুব করে চেয়েছো? ”
চারুর কণ্ঠ গম্ভীর হলো , বৃত্তকে কেমন ডেকে উঠলো,
“মাস্টার মশাই? ”
“হুমম ।”
“আমিও চাইতাম কেউ আমায় খুব করে ভালো বাসুক, খুব করে চাক । তাই আপনাকে ফেরাতে পারিনি । ”
বৃত্ত চুপচাপ শুনলো চারুর কথা । চারু ফের প্রশ্ন করলো,
চারুবৃত্ত পর্ব ২১
“মাস্টার মশাই? ”
বৃত্তের শীতল স্বর ,
“হুমম ।”
“ছেড়ে যাবেন না তো ?”
বৃত্ত এবার চারুর হাতটা শক্ত পোক্ত করে ধরে বলল ,
“কক্ষনোই না । নিশ্চিন্তে থাকো । ”
“হুমম ।”
চারুর শীতল গম্ভীর মন চঞ্চল হলো । চুপ থেকে একে অপরের মন বুঝলো । জোরে শ্বাস নিয়ে একে অপরের হাত ধরলো দুজন । গভীর রাত ওখানেই কাটালো ।
