চারুবৃত্ত পর্ব ১৫
জুলি জোনাকি
চারদিকটা ভীষণ অন্ধকার , তবে রাস্তার মাঝে মাঝে ল্যাম্পপোষ্টের আলো , তা এসে চারুবৃত্তের গায়ে ঢেলে পড়ছিল । বৃষ্টির তেজ বাড়লো , ছাতার ওপর বৃষ্টির ফোটার শব্দ এসে চারুর কানে বাজলো । নড়েচড়ে উঠলো চারু , বৃত্তের চোখ ভর্তি হাসির ছাপ , নীরবতা কাটিয়ে বৃত্ত আগে বলে উঠলো ,
“তুমি এখানে ?”
চারু উওর দিতে গিয়ে যেন হিমসিম খেতে লাগলো ,
“বৃষ্টিতে ভিজলে অসুস্থ হয়ে পড়বেন , ছাতা নিয়ে বাড়ি যান ।”
বৃত্ত মুচকি হাসি মুখে টেনে চারুর দিক ঝুঁকে গেলে , চারু মাথাটা একটু পেছনদিক ঝুঁকে নিল । বৃত্তের সুর তখন অন্য রকম হলো ,
“আমার জন্য বুঝি তোমার চিন্তা হয় , চারু ?”
ভেজা ঢোক চিপলো চারু , শরীরে কাঁপনি ধরলো । বৃত্তের তা নজরে এড়িয়ে যেতে পারলো না , ফের ঝুঁকলো , এতে যেন চারুর ঠোঁট ছুঁইছুঁই নাক ছুঁইছুঁই এমন পরিস্থিতির হলো , চারুর শ্বাস ভারি হলো , ভারি শ্বাস গিয়ে বৃত্তের মুখে আঁচরে পড়লো । চারু চোখ বন্ধ করে নিল , বৃত্ত কিছু না বলে চারুর মাথায় টোকা মেরে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
“আমায় ভয় পাচ্ছো ?”
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
চারু এক চোখ খুলে দেখলো , বৃত্ত সরে গেছে দেখে দু চোখিই খুললো । অর্ধ কন্ঠে বলল,
” আ আমি ক কেন ভয় পেতে যাব আপনাকে ?”
চারু বলা মাত্রই বৃত্ত চারুর চুল গুলো এলোমেলো করে দিল, তারপর আবার একটু ঝুঁকলো , শুধলো ,
” আমায় ভয় না পাওয়াই ভালো , এতে তোমার আমার দুজনেরই সুবিধা, বুঝলে ?”
চারু এক হাত দিয়ে চুল গুলো ঠিক করে কিছু বলতে যাবে তার আগে বৃত্ত ফের চারুর চুল এলোমেলো করে দিয়ে বলল,
” এলোমেলো চুলে বড্ড আমার আমার লাগে , এলোমেলোই থাক ।”
চারু বৃত্তের হাত সরিয়ে দিয়ে ছাতা ধরিয়ে দিল আর বলল,
” অনেক রাত হয়েছে, বৃষ্টি বোধয় কমবে না , আপনি ফিরে যান ।”
“তুমি এইটুকু রাস্তা কি করে যাবে ?”
“আমি যেতে পারবো ।”
বলে চারু ছাতার নিচে থেকে দৌড়ে দু পা যেতেই বৃত্ত চিৎকার দিয়ে বলল,
“শুনো চারু ।”
চারু দাঁড়ালো, বৃত্ত দৌড়ে গিয়ে ছাতার নিচে নিয়ে বলল,
“এতো রাতে একা একা যাচ্ছো , যদি ভুত এসে ….না মানে , যাও তুমি তো বাহাদু মেয়ে ।”
ব্যস চারু এখন কোথাও ভয়ে লুকাতে পাড়লে ভালো হতো এমন ছাপ চোখে মুখে । চোখে মুখে ভয় নিয়ে চারপাশটা চোখ ঘোড়ালো, শুকনো একটা ঢোক গিলে আওরাল,
“আ আ আপনি মি মিথ্যা বলছেন , ভ ভুত বলে ক কিছু আছে নাকি ?”
বৃত্ত সিরিয়াস মুড নিয়ে বলল,
“তা তো জানিই তবে , রাত হলে শুনেছি জ্বীনদের আনাগোনা বেড়ে যায় । ”
চারু ঠোঁট ভিজিয়ে কামড়ে ধরে বলল,
“তা তাহলে আ আমি এখন কি ক করে যাব ।”
বৃত্ত চারুর পেছনে বড় বড় করে তাকিয়ে বলল,
“চ চারু তো তোমার পেছনে ওটা কি ?”
চারুর কাঁপাকাঁপি তিন গুন বেরে গেল , কাঁপাকাঁপা গলায় বলল,
“ক ক কি ?”
“জানি না এদিকেই আসছে মনে হয় , হ্যা এদিকেই আসছে ।”
চারুর পেছনে তাকানোর সাহস হলো না , খপ করে বৃত্তকে আঁকড়ে ধরলো , বৃত্তের বুকে মুখ গুঁজলো । বৃত্তের ভেজা শার্টে যেন চারুও ভিজে গেল । বৃত্ত মুখ চেপে হাসলো , আর একটু ভয় দেখালো ,
” আরো একটা আসছে , এদিকেই ।”
চারু বৃত্তের পিঠ খামচে জোরে জড়িয়ে ধরলো । এবার বৃত্ত থামলো , চারুকে হালকা করে হাত দিয়ে নিজের সাথে আগলে নিল । কয়েক মিনিট ওভাবেই থাকলো । চারু যে কাপছে তা বৃত্ত বুঝতে পাড়লো , তারপর বলল,
“চলে গেছে , এখন তুমি যেতে পারো ।”
চারু জড়িয়ে ধরেইশুধু মাথাটা একটু উচু করে চারদিক তাকালো , কাউকে নজরে এলো না দেখে বৃত্তের দিক তাকালো , থমকালো চারু , বৃত্তের চোখে যেন কিছু ছিল । চারু হাতের বাঁধন আলগা করলো , শুধু এক হাত জড়িয়ে ধরে বলল,
“আ আমায় এ একটু এগিয়ে দিয়ে আসবেন ?”
চারুর কপালে লেপটে থাকা ভেজা চুলগুলো সরিয়ে কানের কাছে গুঁজে দিয়ে আদুরে ভঙ্গিতে আওরাল,
“ঠিক আছে চলো ।”
চারুর হাতটা এবার বৃত্ত নিজের হাতের সাথে পেঁচিয়ে নিয়ে আরেক হাতে ছাতা ধরে হাটতে লাগলো । চারু ভীতু চোখে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল, তাদেখে বৃত্ত মৃদু হাসলো , চারুর হাতটা শক্ত পোক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফের আওরাল,
“চারু ?”
চারু তাকালো না বৃত্ত ও তাকালো না কেবল সামনে হাটলো , চারু ওভাবেই ঠেই উওর দিল ,
“হ হ্যাঁ বলুন শুনছি ।আমার পেছনে আবার কিছু এলো নাকি ?”
চারু দাড়িয়ে গেল , বৃত্ত বলল,
“দাঁড়ালে কেন ?আমি আছি তো চলো, বলছি ।”
চারু ফের হাঁটা ধরলো , বৃত্ত বলল,
” তুমি আমার ভুল নও ,ভুল ভেবে কখনো চলে যেও না ।”
বৃত্তের চোখ ছলছল হলো ,চারু থেমে তাকালো ,এক সেকেন্ডে দু সেকেন্ডে এভাবে অনেকখন একে অপরের দিক তাকিয়ে ছিল । চারু চোখ সরিয়ে কিছু বলতে যাবে এমন সময় চেনা সুরে কেউ চারুর নাম নিল ,
“চারু ।”
চারুবৃত্ত দুজনি একসাথে তাকালো ,সামনে ছাতা হাতে নিয়ে লতা দাঁড়িয়ে আছে । চারুর লেট হচ্ছিল জন্য চারুকে খুজতে খুজতে এগিয়ে এসেছে । দুজনকে একসাথে দেখে লতা এগিয়ে চারুর ঠিক কাছে গিয়ে থামলো । হেসে বলল,
“তুমি ঠিক আছো , সেই কখন থেকে অপেক্ষা করছি , দেরি হচ্ছে জন্য এগিয়ে এলাম ।”
চারু একবার বৃত্তের দিক তাকালো, তারপর বলল,
“আপনি এখন বাড়ি চলে যান , অনেকখন হলো ভেজা শার্ট পড়ে আছেন ,অসুস্থ হয়ে পড়বেন ।”
বৃত্ত ছলছল চোখে তাকিয়ে ছিল , চারু লতার কাছে গিয়ে ফের তাকালো , বৃত্ত তখনো তাকিয়ে, চারু দূর থেকেই বলল,
” কি হলো যান ।”
বৃত্ত কিছু বললো না ।চারু পা বাড়াল, লতা অনেক কিছুই বলছিন কিন্তু চারুর তা কর্ণপাত হচ্ছিল না । চারু যেতে যেতেও বারবার ফিরে তাকাচ্ছিল । একসময় চারুকে আর দেখা গেলো না , তখন বৃত্ত ধীর পায়ে একা পথ ধরে হাটতে লাগলো ।
সেই কখন ঘড়িতে ঘন্টার কাঁটা এগারোটা ছুঁয়েছে, বৃত্ত মাত্রই ভেজা গা নিয়ে বাড়িতে ঢুকলো । বৃত্তের মা বসার ঘরে ছেলের জন্য অপেক্ষা করছে । বৃত্ত ঢুকতেই গম্ভীর হয়ে প্রশ্ন করলো,
” এতো রাতে কোথায় ছিলি বৃত্ত? ”
বৃত্ত হকচকিয়ে ওঠে , আবার শান্ত হলো , একবার মায়ের দিকে তাকিয়ে চোখ সরিয়ে উপরে যেতে যেতে উওর দিল ,
“তোমার বউমার কাছে ।”
বলে সোজা ঘরে চলে গেল । বৃত্তের মা আশ্চর্য হয়ে একাই বলল,
“বউমা ?”
রাত পেরিয়ে সকাল ,সকাল পেরিয়ে বিকাল । চারু আজ একটু লেট করে দোকানে আসবে বলে লতাকে আগে পাঠিয়ে দিয়েছে । লতা এসে দোকান খুলবে তখন দেখলো আগে থেকেই বৃত্ত এসে বসে আছে । লতাকে দেখে দাঁড়িয়ে গলা উঁচু করে কাউকে খুঁজলো, লতা হেসে বলল,
“চারুকে খুঁজছেন ভাইয়া ?”
বৃত্ত মাথা উপর নিচ ঝাঁকিয়ে হ্যাঁ বললো । লতা এগিয়ে গিয়ে বলল,
“ওর আসতে একটু লেট হবে আপনি বসুন ।”
“আচ্ছা ।”
বৃত্ত চুপচাপ বসলো , কাল বৃষ্টিতে ভিজেছে জন্য গায়ে জ্বর এসেছে একটু, তবুও চারুকে একবার দেখবে বলে এসেছে । মাথার ভেতর ভালো লাগছিল না জন্য টেবিলে মাথা নিচু করে শুয়ে ছিল । তখন চারু এলো ,পাশ কেটে লতার কাছে গিয়ে বলল,
“ওনি কখন এসেছে ?”
“অনেকখন হলো , দেখে মনে হচ্ছে অসুস্থ ।”
চারু চটকরে তাকালো , বৃত্ত এখনো ওভাবেই শুয়ে, চারু কাছে এগিয়ে গিয়ে ডাকলো ,
“শুনুন ।”
বৃত্ত মাথা তুলে তাকালো, চোখ দুটো লাল তবুও চারুকে দেখে হাসলো । চারু কিছু না ভেবেই বৃত্তের কপালে হাত রাখলো , অনুভব করলো বেশ গরম । হাত সরিয়ে নরম গলায় বলল,
” আপনার তো জ্বর , বিশ্রাম নেওয়া বাদ দিয়ে এখানে কেন এসেছেন ?”
বৃত্ত নিজের গালে হাত দিয়ে বলল,
” এখানে একটু বসো ।”
চারু আজ না করলো না , মুখোমুখি বসলো ।
“বলুন ।”
” কিছু না ,এভাবেই একটু বসে থাকো ।”
চারু অনেক খন বসে থেকে বলল,
“কিছু খাবেন ?”
“গলা ব্যথা খুব ,কিছু খেতে পারছি না ।”
“ঠিক আছে বসুন আমি কড়া করে আদা , লবঙ্গ দিয়ে চা বানিয়ে দেই ।”
“উমমম ।”
চারু উঠে গিয়ে কড়া করে চা বানাতে লাগলো । বৃত্ত ফের মাথাটা টেবিলে রাখলো ।
কিছুখন পরে চারু এসে চা দিয়ে গেল । বৃত্ত বসে তা খেতে লাগলো । আস্তে আস্তে লোকজন আসতে লাগলো, চারু রান্না বসিয়ে দিল ।
চারুবৃত্ত পর্ব ১৪
একটা সুন্দর, সুদর্শন ছেলে এলো ।লতা অর্ডার নিল , চারু এসে খাবার দিয়ে গেল । তখন বলল,
“হ্যালো, আজ থেকে আমি আপনাদের রেগুলার কাস্টমার হবো । ”
“আচ্ছা আসবেন ।”
বৃত্ত দেখছিল চারু ছেলেটার সাথে হেসে হেসে কথা বলছিল । তা দেখে বৃত্ত বিরক্তে কপাল কুঁচকে চারুকে ডাকলো
