চারুবৃত্ত পর্ব ৭
জুলি জোনাকি
“হাতে কি হয়েছে তোমার? ”
বৃত্তের চোখে মুখে এক হ্রাস হতাশা । চারু হাথটা আলতো করে সরিয়ে নিয়ে, ঠোঁটে এলিয়ে হাস । বলল,
“তেমন কিছু না ,একটু চোট লেগেছে ঠিক হয়ে যাবে ।”
বলে বৃত্তের দিক কেকটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
” শুভ জন্মদিন স্যার ।”
বৃত্তের চোখের কোণে পানি ঝকঝক করছিল । বৃত্ত কেক মুখে না নিয়ে চিরুর হাত ধরে ঘরে নিয়ে গিয়ে যত্ন করে ওষুধ লাগিয়ে দিল । চারু হাসফাস করতে করতে এদিক ওদিক তাকালো, কেউ এসে না পরে । চারু হাতটা এক ঝটকা মেরে সরিয়ে নিয়ে বলল,
“আমি ঠিক আছি, আসছি ।”
“চারু শুনো …..?”
চারু নিমিষেই সেখান থেকে পালালো । বৃত্তর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো , সমনে চারুর পরীক্ষা আর হাতের এমন বেহাল দশা হলো ? রাগে আর বিরক্তে বিছানায় জোরে করে কিল ঘুষি মারলো ।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“বৃত্ত ভাই একটা গান বলো না ?”
খাওয়া দাওয়া শেষ করে সবাই চলে গেল , কেবল বৃত্তের কিছু পুরনো বন্ধু আর তার বাড়ির সবাই ছিল । সবাই গল্প করছিল , তবে বৃত্ত দূরে বসে থাকা চারুকে দেখছিল । বিন্তি হঠাৎ করে এমন আবদার করতেই সবাই ঝেকে বসলো । রুহি বৃত্তের কাছে গিয়ে বসে চোখ মেরে বলল,
“বৃত্ত ভাই গাওনা একটা গান আমার জন্য ।”
বৃত্ত সরে বসে বলল,
“একদম কাছ ঘেঁষবি না , তোর ইঙ্গিত ভালো না ।”
সবাই হো হো করে হেসে ফেললো । রুহি দাতে দাত চেপে বলল,
” বৃত্ত ভাই তুমি আমায় আবার ইনছাল্ট করছো ।”
“এই সবাই এবার থামো , এই নে ভাইয় ।”
বিন্দু গিটার টা এনে বৃত্তের হাতে ধরিয়ে দিল । আচমকা বৃত্ত বলল,
“চারু এদিকে এসো ।”
সবাই তাকাল চারুর দিক ,চারু বেশ অপ্রস্তুত হলো । বৃত্তের মা ছেলেকে খুটিয়ে দেখলেন , চোখে মুখে কেমন একটা চাওয়া পাওয়ার আশা দেখতে পেল । বলল,
” ও এখানে এসে কি করবে ?”
“তোমরা যা করছো তাই করবে । ”
“দেখ বৃত্ত ……”
“আরে থামো থামো আসলে কি এমন হবে । চারু এদিকে আয় ।”
বিন্দু তাদের থামিয়ে দিয়ে এমন কথা বলে চারুকে হাত ধরে টেনে এনে বসিয়ে দিল । চারু গুটিয়ে বসলো , বৃত্ত কেবল হাসলো । তারপর গিটারের টুং টুং শব্দ তুলে চারুর দিক তাকিয়ে গাইতে লাগলো ,
“তুমি চোখের আড়াল হও
কাছে কি বাঁ দূরে রও
মনে রেখো আমিও ছিলাম
এই মন তোমাকে দিলাম ”
বৃত্ত ঠান্ডা মাথায় গানটা গেয়ে চারুকে ভালো লাগার কথা বলে দিল , অথচ কেউ বুঝলো না । তবে বৃত্তের মা কিছু আঁচ করতে পাড়লো । তাই বলল,
“চারু যা তো সবার জন্য কিছু বানিয়ে নিয়ে আয় ।”
চারু উঠতে গেলে বৃত্ত গান থামিয়ে বলে উঠলো ,
“কোথায় যাচ্ছ? ”
বৃত্তের মা তাকালো ছেলের দিক । আমার ছেলের রুচি এমন বাজে অবশ্যই হবে না । চোয়াল শক্ত করে বলল,
” তুই থামলি কেন ? ”
“ন না মানে ….”
“বৃত্ত ভাই তুমিকি গান টা আমার জন্য গাইলে , উফফ কি রোমান্টিক ।”
বৃত্তের কথার মাঝে রুহি এমন বেতাল কথা বলে ফেলল । বৃত্ত তাকাল রুহির দিক । বৃত্তের মা চারুকে চোখের ইশারায় সেখান থেকে তারিয়ে দিল । বৃত্ত বলল,
“অবশ্যই না । ”
“তাহলে ?”
“এই এটাকে কেউ সরাতো সামনে থেকে ।”
বৃত্তর মা মাঝে বলে ফেলল,
“কেনরে বৃত্ত, মেয়েটার সাথে এমন করে কেন কথা বলিস ? ভালো করে কথা বল ।”
রুহি বৃত্তের মাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“দেখেছো ফুপি তোমার ছেলে অন্য কোনো মেয়ের প্রেমে পড়েছে আর গানটা তার জন্যই গাইলো ।”
“অন্য মেয়ের প্রেমে ওকে পড়াবো ।”
এমন আরো অনেক কথা হতে থাকলো । বৃত্ত পাত্তা না দিয়ে গিটার টা রেখে তার বন্ধুদের সাথে বাইরে বেরিয়ে গেল ।
সকালটা রোজ এমনি চলে চারুর । কাজ করতে করতে বেহাল দশা। বৃত্তের মা এক গাদা কাপড় ধুতে দিয়ে গেল । হাতটারো বেহাল দশা ,তাই চারুর মা কেচ্ছে দিচ্ছে আর চারু বসে দেখছে । ধোঁয়া শেষে চারু জোর করে নিজেই ছাদে কাপড় মেলতে গেল । কাজ শেষে চারু তার মাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেল ।
ডাক্তার দেখিয়ে আসার সময় কিছু সবজি কিনে মা মেয়ে বাড়িতে ঢুকলো । একটু বিশ্রাম নিয়ে রান্না ঘরে এসে রান্না বসিয়ে দিল । বৃত্তের মা বাড়িতে নেই রুহিকে বাড়িতে রেখে আসতে গেছে । বিকালে আসবেন বলে গেছে । চারু দুপুরের রান্না টা করে টেবিলে রাখতেই বিন্দু বিন্তি আর বৃত্ত একসাথেই বাড়িতে ঢুকলো । বিন্তি বিন্দু বলে গেল,
“একটু ঠান্ডা পানি দে না চারু ।”
“ঠিক আছে দিচ্ছি, তোমরা উপরে যাও আমি আনছি ।”
বিন্দু আর বিন্তি কে পানি দিয়ে বৃত্তের রুমের সামনে গিয়ে দাড়াল, ঢুকবে কি ঢুকবে না তাই ভাবছে । কিছু একটা ভেবে পা ঘুরিয়ে ফিরে আসতে নিলেই দরজা খুলে তাতে হেলান দিয়ে বুকে হাত গুঁজে বৃত্ত বলে উঠলো ,
” আমায় পানি না দিয়েই চলে যাচ্ছ যে ?”
চারু চমকে গা ঝাকিয়ে উঠলো । চোখ মুখ খিঁচে ফিরে তাকিয়ে পানি এগিয়ে দিল ।বৃত্ত মাথাটা একটু নিচে ঝুকে চারুকে দেখলো , বলল
” হাতের কেমন অবস্থা ?আর তুমি কাজ করছো কেন?”
চারু চোখ ঘুরিয়ে বলল,
“একদম ঠিক হয়ে গেছে ।”
বৃত্ত পানি নিয়ে খেতে খেতে বলল,
“সত্যি? দেখি ?”
পানি শেষ হতেই চারু ছো মেরে নিয়ে সোজা নিচে চলে গেল । বৃত্ত কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বলল,
” তোমায় বোঝা কি যে কঠিন চারু ।”
বিকাল থেকে মেঘ করেছে । বৃত্ত বাড়ি নেই, সেই দুপুরে খেয়ে বেড়িয়েছে । চারু গোসল করে খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে টিউশন পড়তে গেল । আকাশে মেঘ দেখে ছাতা সঙ্গে করে নিয়েই বেড়িয়েছিল । পড়ানো শেষ হতে চারু বাইরে বেরিয়ে দেখলো সন্ধ্যা হয়ে গেছে । যখন তখন বৃষ্টি হবে । একা একা হাতছিল চারু ,কিছু দূর যেতেই বৃষ্টি পড়তে লাগলো । ছাতা ফুটিয়ে নিয়ে হাটতে লাগলো । জোরে বৃষ্টি হতেই কেউ পেছন থেকে আওরাল,
“চারু ওখানেই দাড়াও ।”
চারু শুনতে না পেয়ে একলা মনে হাটছিল । এমন সময় আচমকা কেউ চারুর ছাতার নিচে এসে ঠাই নিল । বুকে হাত দিয়ে চিৎকার দিয়ে চোখ বন্ধ করলো চারু । সবে মাত্র আসা মানাষটা এমন কান্ড দেখে সে নিজেও চমকাল, পরক্ষনে চারুর মুখপানে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসলো । চারুর চোখ এখনো বন্ধ দেখে তার মুখটা চারুর কানের কাছে নিয়ে বলল,
” ভয় পেয়েছ ?”
চেনা কণ্ঠ পেয়ে পিটপিট করে তাকাল চারু । সামনে থাকা মানুটা তার দিকে ঝুঁকে হাসছে । চারু চোখ দুটো বড় করে আবাক হয়ে আওরাল,
“আ আপনি আবার এসেছেন ?”
চারুর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফের ফিসফিস করে বলল,
চারুবৃত্ত পর্ব ৬
“তোমায় একা ছাড়ি কি করে বলো , যদি হাড়িয়ে ফেলে ?”
এমন ঠান্ডা ফিসফিস শব্দ কানের কাছে বাজতেই চোখ বন্ধ করে ফেললো চারু । তার যে গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যাচ্ছে । চোখ বন্ধ করেই শুকনো ঢোক গিললো চারু । পুরুষটা চারুর এমন বেগোছালো হাল দেখে হেসে ফের ঠান্ডা কন্ঠে শুধালো ……….
