Home চিত্রাঙ্গনা চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৭

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৭

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৭
ইশরাত জাহান জেরিন

বজ্র নিরুর কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে। নিরু তার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আমচকা বজ্র উঠে বসল। নিরুকে ভালো করে একবার দেখে টেনে নিলো কাছে।
“নিরু… আমরা যদি বিয়ে করি, আমাদের ছোট্ট সংসারটাকে সামলে রাখতে পারবে তো?”
নিরু হাসল না। সোজা উত্তর দিল,“সম্ভব হলে রাখব। নইলে চেষ্টা করব। সংসার সামলানোর গ্যারান্টি কেউ দিতে পারে?”

বজ্র একটু চুপ করে থেকে বলল, “আমার রাগ একটু বেশি… ঝগড়া লাগতে পারে।”
“ঝগড়া না হলে সম্পর্ক টেকে না। মানুষ দুইটা, মতও দুইটা।”
বজ্র তাকিয়ে রইল তার দিকে শান্তভাবে।
তারপর বলল, “তুমি জানো, আমি বাড়িতে খুব কম সময় থাকতে পারব… ডিউটি, জরুরি কল… রোগী নিয়ে দৌড়ঝাঁপ আমার বেশি। এগুলো নিয়ে সংসার সামলানো কঠিন হবে। সমস্যা হবে না?”
নিরু উত্তরটা ভেবে বলল,“সমস্যা হবেই, কিন্তু সেটা তোমার পেশা নিয়ে নয়। সমস্যা হবে যদি তুমি সময় না পাও, আর পাওয়া সময়টা সম্পর্কের জন্য ব্যয় না করো।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

বজ্র একটু থমকে গেল। মাথা নেড়ে বলল,“মানে সময়ের পরিমাণ না, মান কতটা ওটাই আসল?”
“হুঁ। পাঁচ ঘণ্টা একসাথে থেকেও কেউ কেউ দূরত্বে থাকে। আর পাঁচ মিনিটেও মানুষ অনেক কিছু বুঝে যায়।”
বজ্র একটা হালকা হাসি দিল। “তাহলে জলদি বিয়ে করতে হবে দেখছি।”
“হুম চলো করে ফেলি। আর কত লুকোচুরি বলো? এবার সবাই জানুক নিরু বেঁচে আছে, যেদিন তার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল সেদিন কি হয়েছিল আসলে সকলের তো তা জানা দরকার।”
“সবাই জানবে তো পাখি। এখনো সময়ের অপেক্ষায় আছি। তোমাকে কায়সার বাড়ির বউ করার ইচ্ছে তো আমারও কম না। তবে আমি যেই সময়টার জন্য অপেক্ষা করছি সেটা কিছুতেই যে আসছে না।”

“সময় কবে আসবে?”
“আন্দাজ করতে পারছি খুব জলদি।” হঠাৎ বজ্র নিরু ঠোঁট ছুঁয়ে বলল, “তোমার ঠোঁটটা ক্লান্ত দেখাচ্ছে।”
“বুঝো না মেডিসিনের অভাব।”
“আমি ডাক্তার সামনে থাকতে তুমি মেডিসিনের অভাবে ভুগে ঠোঁটকে কষ্ট দিবে তা কি করে মেনে নেই বলো তো?” বলেই সে নিরুকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। বাইরে বিকেলটা তৎক্ষনাৎ হয়ে উঠল আরো উষ্ণ। যেই উষ্ণতার উৎস একান্তই ভালোবাসা।

সন্ধ্যা হবে হবে ভাব। ফারাজ দুপুরে খেয়ে ঘুমিয়েছিল। ঘুম ভাঙতেই দেখল ছোটলোক বউটা, ছোটলোক গিরি করতে কোথায় যেন চলে গেছে। এমন মেজাজ খারাপ হয় এই বউকে নিয়ে না। ফারাজ ঘুম থেকে উঠেই অভ্রকে ফোন করে। তিনতলা থেকে অভ্র দৌড়ে আসে ফারাজের রুমে। রুমে এসে অভ্র ফারাজের পাশে দাঁড়াতেই সে বলল, “কুদ্দুসের বাপ, মাথা ধরে আছে। এক প্যাক খেতে হবে।”
“ওইসব খেলে আরো ধরবে।”
“আমার উল্টো হয়, জানো না?”
“ভাবীকে ডাকব।”
“শালা দুধ-কলা দিয়ে মীরজাফর পালছি।”

“ভাইয়া আমি আপনার দুধও খাইনি আর কলাও।” ফারাজ ভ্রু কুঁচকে চাইতেই অভ্র চুপ হয়ে যায়।
“তোর ভাবির পাসপোর্টের কি খবর?”
“হবে না ভাই। আচ্ছা ভাবির যেই সার্টিফিকেট, সনদ দিয়েছে সেটা বারবার ভুল দেখাচ্ছে কেন তাই তো বুঝতে পারছি না।”
“সময় আসুক, একসঙ্গে না হয় বুঝব। তবে কোথাও একটা ঘাপলা আছে রে জানিস।”
“মানে?”
“সময় আসুক, আমি সিউর যা হচ্ছে তা নিজ থেকেই আমার চোখে ধরা দিবে। তাই বেহুদা এটার পেছনে সময় নষ্ট করার সময় নেই বুঝলি তো?”
“হুম।”

ফারাজ তৈরি হয়ে নিলো। কালো রঙের একটা শার্ট পড়ে, ওপরে কালো ব্লেজার জড়িয়ে নিলো। গায়ে তার কাস্টমাইজড করা এলাহীর মিষ্টি সুগন্ধির মিশ্রণে তৈরি ক্লাইভ ক্রিশ্চিয়ান পারফিউমের গন্ধ। দেশের একপাড়ে মাখলে, ওপারের মানুষ অবধি ঘ্রাণ পেয়ে যাবে। ফারাজ ঘড়ি পড়তে পড়তে অভ্রর সঙ্গে সিড়ি বেয়ে নেমে গেল। রোমানার রুমের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। রুমানা তাকে দেখে কেমন যেন কেঁপে উঠল। তারপর কি একটূ ভেবে গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “জোহানের মতো আমার স্বামীরেও তুমিই খুন করছো তাই না?”

” ময়লা হাতে লাগানোর ইচ্ছে ফারাজ এলাহীর নেই বুঝলেন তো? আপনারা আমার কাছে আগাছা মাত্র। চাইলে কবেই আগাছা উপড়ে ফেলতে পারতাম, তবে আমার নজর বড় গাছের দিকে। এসব আগাছা মেরে হাতে মাটি লাগিয়ে লাভ আছে? তবে বড় গাছ উপড়ে ফেলার সময় যদি পথে কিছু আগাছা পড়ে যায় তবে একটু হাত তো নোংরা করাই যায়।”
রুমনার চোখ দিয়ে জল পড়ছে। ফারাজ তা দেখে বলল, “আপনাদের কাঁদতে দেখলে শান্তি লাগে। আমার মায়ের কথা মনে আছে? খোদার কাছে শুকরিয়া আদায় করুন, তার মতো আর্তনাদ এখন অবধি আপনাদের গলা চিরে বের করেনি আমি।”

ফারাজ এক মিনিট অপেক্ষা না করে জলদি নেচে নেমে গেল। বাড়ির সামনের খোলা উঠানে চিত্রা আর আয়েশা ব্যান্ডমেন্টন খেলছে। দু’জনেই খেলায় বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে। অভ্র ডাক দিতে গেলেও ফারাজ তাকে নিষেধ করে দেয়। চিত্রাকে এমন লাফালাফি করতে দেখলেও ভালো লাগে। হঠাৎ চিত্রার নজর ফারাজের দিকে যেতেই চিত্রা বলল, “আপনি খেলতে পারেন?”
ফারাজ ভ্রু কুঁচকে বলল, “আরো প্রমাণ চাই নাকি?”

আয়েশা সেই কথা শুনে হেসে ফেলতেই ফারাজ তার দিকে তাকালো। তাতেই আয়েশা চুপ করে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই অভ্র ফারাজকে বলে উঠল, “আমার বউটা একেবারে বাচ্চা মেয়ে। এভাবে নজর দিয়ে ভয় দেখাবেন না ভাই।” ফারাজ সেই কথা শুনে অভ্রর দিকে তাকাতেই সে চুপসে যায়। ফারাজ আয়েশার থেকে ব্যাডমেন্টন নিয়ে চিত্রার সঙ্গে খেলা শুরু করল। শীতের এই তাপমাত্রায় নিমিষেই তার শরীর ঘেমে গেল। সে ব্লেজার আগেই খুলে ফেলেছে। এখন গরমের কারণে একেবারে কালো শার্টটা ভিজে গায়ের সঙ্গে লেপ্টে গেছে। চিত্রা একটু পর পর আড়চোখে তাকে দেখছে। সবসময় এই লোককে এত সুন্দর কেন দেখাতে হবে?

একটু কম সুন্দর দেখালে কি বিশ্বে অশান্তি বাঁধবে? ঢং! হঠাৎ চিত্রা শাড়ির আঁচল কোমরে গুঁজতেই সরু ফর্সা পেটটার দিকে নজর গেল ফারাজের। তবে মুহূর্তেই সেই নজর যায় চিত্রার পেছন দিকে দাঁড়িয়ে থাকা একদল পুরুষের দিকে। বয়স আছে মোটামুটি ভালোই। বাড়িতে নতুন করে কিছু কাজ করানো হচ্ছে। তাই ওই লোকেদের আনা হয়েছে। তবে তাদের মধ্যকার এক জনের নজর বেশ কিছুক্ষণ ধরেই চিত্রার দিকে। বিষয়টি প্রথমেই ফারাজ আন্দাজ করেছিল। তাই বাইরে চলে যেতে গিয়েও থেমে যায়৷ ফারাজ এখানে দাঁড়ানোর পর নজর একটু কম দিয়েছে। তবে শয়তানের থেকে ভালো কিছু আশা করা যায় না। লোকটা এখন আরো ভালো করে নজর দিচ্ছে। একটু পর পর তার নজর যাচ্ছে চিত্রার সরু পেটের দিকে। কেন যাবে? ওখানে নজর দেওয়ার অধিকার যে কেবল ফারাজ এলাহীর সেটা কি ওই লোক জানে না? বয়স তো ভালোই হয়েছে। চিত্রা তার মেয়ের সমান হবে। এসব মানুষের চোখ উঠিয়ে নেওয়া হয়না বলেই তারা এত সাহস পায়। ফারাজ চিত্রাকে বলল, “যাও আর খেলা লাগবে না। আজকে তুমি জিতেছো। রাতে আমি জিতব।” বলেই বউকে চোখ মারল। চিত্রা আয়েশা কে জিজ্ঞেস করল, “তুই যাবি না রুমে?”

“অভ্রর সঙ্গে চিপায় যাব।”
চিত্রা মুখ ভেংচি কেটে বাড়ির ভেতর চলে গেল। ফারাজ টিস্যু দিয়ে ঘাম মুছে অভ্রকে বলল, “আজকে কলিজা ভুনা দিয়ে ভাত খাবো রে অভ্র।”
“ভাই আবার?”
ফারাজ জবাব না দিয়ে গাড়ির দিকে যাত্রা ধরল। অভ্র এখন বাইরে যাবে না। বজ্র বাইরে আছে সেই যাবে ফারাজের সঙ্গে। অভ্রর তো এখনো তার বউয়ের সঙ্গে অনেক কাজ করা বাকি। ভাবতে না ভাবতেই সে হাঁটা ধরল পুকুরপাড়ের দিকে। সেখানে আয়েশা তার জন্য অপেক্ষা করছে। পুকুর পাড়ে গিয়ে দেখল ঘাটে বসে আছে আয়েশা। অভ্র গিয়ে তার পাশে বসল। আয়েশা তাকে দেখে বলল, “আহারে কুদ্দুসের বাপ, তুমি এমন শুঁকিয়ে যাচ্ছো কেন?”
“তোমার ভালোবাসার অভাবে।”
আয়েশা লজ্জা পেল। হঠাৎ অভ্র তাকে জিজ্ঞেস করল, “তোমার সেই হিটলার কোরিয়ান দাদি কই? আবার এখানেও চলে আসবে না তো?”

“না সে তো তার রুমে ঘুমাচ্ছিল।”
“ওই মহিলা কি করেছে জানো? সে ওইদিন আমার ব্যান্ডের আন্ডারপ্যান্ট দিয়ে ঘর মুছেছে। আবার সেগুলা করে, ভিডিও বানাচ্ছে। ওনাকে পেইজ কে খুলে দিয়েছে? উনি উল্টাপাল্টা ভিডিও বানিয়ে ব্লগ করে, আবার বলে, বন্ধুরা আমার রেইলি ব্লগে আপনাদের সবাইকে কোরিয়ান চুম্মা? এসব কি?”
“তুমি কি এখানে এসব বলতে এসেছো?” আয়েশা ক্ষেপতেই অভ্র তার হাত ধরে গালে একটা চুমু খেয়ে বলল, “ভালোবাসিরে ঘরনী, তোকে এক মুহূর্ত না দেখলে আমার পেছন কামড়ানো শুরু করে।”
“কেন আপনি কি আমাকে পেছন দিয়ে ভালোবাসেন নাকি?”
“আরে নাউজুবিল্লাহ। সত্যি বলছি কিডনি দিয়ে তোমায় ভালোবাসি ঘরনী।”
“আচ্ছা ভালো যেহেতু বাসো তাহলে বলো তো ভালোবাসার রঙ কী?”

“কেন জানো না? সবুজ।”
“সবুজ? আমি তো জানতাম ওইটা লাল।”
“আরে না সবুজই কেন তুমি বাঁশের রঙ দেখোনি?”
“কুদ্দুসের বাপ!!!!!”
“সরি বউ। আচ্ছা চোখ বন্ধ করো একটা পিংক কালারের পুকি চুমু দেব।”
আয়েশা চোখ বন্ধ করতেই হঠাৎ কোথা থেকে কে গেয়ে উঠল, ” কালুর বাপ কইরে, কইরে, কই???????
আয় দুইজনে মিল্লা পড়ি কালা পিরিতের বই।”

অভ্র নিজের চোখও বন্ধ করে রেখেছিল। চোখ খুলতেই দেখে আয়েশা দূরে ছিটকে পড়ে আছে। আর জমেলা আয়েশার জায়গায় বসে আছে গাল পেতে। অভ্র ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তার পানে চাইতেই সে ঠোঁট দুটো মাছের মতো চোখা করে বলল,”পিলিজ গিভ মি পুটকি কিস, বিকুজ আই লাভিং ইউ।”
অভ্র কোনো মতে আয়েশাকে তুলে, দৌড়ে সেখান থেকে পালায়। জমেলাও কি থেমে থাকার পাত্রী? সেও পেছন পেছনে দৌঁড়ানো সুরু করে। দৌঁড়ানোর সময় অভ্র পেছন ফিরে একবার বলে, “ওরে ইংরেজি বুড়ি ওটা পুটকি নারে, ওটা পুকি। ননসেন্স জমেলা বুড়ি। হুহ!”

জমেলা পেছন পেছন দৌড়াতে দৌড়াতে গেটের কাছে চলে আসে। মুখে সেই একই গান চলছে। হঠাৎ গেটের কাছে আসতেই কারো সঙ্গে একটা শক্তপোক্ত ধাক্কা খেয়ে সে মাটিতে পড়ে যায়। তবে সামনের মানুষটা পড়তে পড়তেও বেঁচে যায়। সে উঁচু গলায় বলে, “বুড়া বয়সে কি ব্যারাম ধরছে? শাড়ির মধ্যে কি কেউ ঝোঁক ছাইড়া দিছে নাকি?”
জমেলা উঠে দাঁড়ালো। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটার দিকে ভালো করে একবার দেখল। সোহান পালোয়ান লুঙ্গি সামলে ভেতরে প্রবেশ করতেই জমেলা তার লুঙ্গি টেনে ধরে বলল, “এই তো পাইছি, একেবারে খাপেখাপ, এই কাল্লুই আমার কালুর বাপ।”

“এই এসব কি? এই ছাড়েন কইলাম। লুঙ্গি ছাড়েন। ওইটা খুললে বিপদ। এই সিফাইত্তা, বাল তুই নাটক দেখোস দাঁড়াইয়া। এটারে ছাড়া।”
সিফাত জলদি জমেলার কাছে গিয়ে বলল, “ছেড়ে দেন, ভাই আবার লুঙ্গির নিচে কিছু পড়ে না। কোন সময় ভাবি আইসা পড়ে কে জানে? পরে উল্টাপাল্টা জিনিস দেখলে ভয় পাইয়া যাইব।”
“ছাড়মু নট। এটাই নোর কালুর বাপ। ওই কালুর বাপ, আই কালা পিরিত করিং, তোমার লগে। বিকুজ আই লাভিং, কাল রঙ, আর কালা…” বলেই মিটিমিটি করে হেসে উঠে সে।”
সোহান সিফাতের দিকে তাকায়। জিজ্ঞেস করে, “কি কয়? কালা? কি কালা?”

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৬

“আরে ভাই ওইটাই।”
“ওইটাই?”
“হ।”
“নাউজুবিল্লাহ। এই বুড়ি ছাড় আমি এখনো পিউর কচি, এক্কেবারে পবিত্র, বিশুদ্ধ পুরুষ। ছাড়!”

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৮