Home চিত্রাঙ্গনা চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৪

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৪

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৪
ইশরাত জাহান জেরিন

হাসপাতালের বাইরে এক কোণে বসে আছে ফারাজ। কারও সঙ্গে কথা নেই, কারও দিকে তাকানোর শক্তিও নেই। চারপাশে মানুষের আনাগোনা, কান্নার শব্দ, দৌড়ঝাঁপ। সবকিছু তার কাছে ঝাপসা, দূরের কোনো দৃশ্যের মতো। শরীর যেন পরিস্থিতির কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। ফারাজ পাথর হয়ে গেছে। চোখে জল নেই, গলায় কোনো হাহাকার নেই। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় তার কিছুই হয়নি, সবকিছু অস্বাভাবিক রকম শান্ত। কিন্তু এই চুপসে থাকাই তো সবচেয়ে ভয়ংকর। ফারাজ যদি চুপ করে থাকে, যদি না কাঁদে তাহলে সে ভেতরে ভেতরে মরতে থাকবে। ভাই হারানোর শোক তাকে কাঁদাক, ভেঙে দিক, বুক ফেটে বেরিয়ে আসুক কান্না।

কারণ কান্না না এলে যন্ত্রণাটা বুকের ভেতরেই আটকে পড়ে। সেখানেই সে বাসা বাঁধে, ধীরে ধীরে বিষের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এই যন্ত্রণা কাউকে বলা যায় না। ভাষা পায় না, শব্দে ধরা দেয় না। আজ না হোক, কাল না হোক, সারা জীবন ধরে সে মানুষটাকে ভেতর থেকে পোড়াতে থাকে। হঠাৎ অপারেশন থিয়েটার থেকে ডাক্তার বের হতেই ফারাজ দৌড়ে ডাক্তারের কাছে যায়। ডাক্তার ইতালিয়ান। সে জানায় অভ্রর কিছুই হয়নি। তীরটা হাতে লেগেছে। সময় মতো হাসপাতালে না আনলে এই বিষ হাত থেকে হার্টে চলে যেত। তখন রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হতো না। তবে অভ্রর অপারেশন সাকসেসফুল হয়েছে। কিছুদিন হাত নাড়াচাড়া করতে পারবে না। তারপর ঠিক হয়ে যাবে। ফারাজ দীর্ঘ একটা শ্বাস ছাড়ল। বুকের একপাশ থেকে কিছু একটা নেমেছে, তবে অন্যপাশে এখনো কিছু একটা রয়েই গেছে যেটা সে চাইলেও আর কখনো বের করতে পারবে না।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আফসোস যদি সে এখানে না আসত তাহলে রোশানও বেঁচে যেত, অভ্ররও কিছু হতো না৷ বাড়ির কাউকে এখনো অভ্রর বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। ফারাজ ডাক্তার কে বলে ভেতরে প্রবেশ করল। অভ্র এতক্ষণ বেহুঁশ ছিল। এখন হুঁশ ফিরেছে। রোগীর সঙ্গে কথা বলে যাবে তবে অতিরিক্ত নয়। ফারাজ ভেতরে গিয়ে অভ্রর পাশেই বসল। ফারাজকে দেখতেই অভ্রর মুখের কোনে হাসি ফুটে উঠল, “শরীর ঠিক লাগছে? দরকার কী ছিল নিজেকে তীড়ের সামনে ঠেলে দিয়ে মহৎ ব্যক্তি সাজার।”

অভ্র মৃদু স্বরে বলল,” কী যে বলেন ভাই, এই জীবন আপনি দিয়েছেন আমাকে, আমি বেঁচে থাকতে আপনার গায়ে তীড় কী করে লাগতে দেই? আপনাকে যন্ত্রণায় দেখা, আমার কাছে নিজের অর্ধেক মৃত্যুর সমান।”
“তাই বলে আর যেন এসব না দেখি। এত বেশি বেশি পছন্দ না।”
“ভাই আমি মারা গেলে আপনি কাঁদতেন না?আপনার কী আমার কথা মনে পড়ত?”
“থাপ্পড় চিনো? আমার চোখের পানির কোনো মূল্য নেই? আমি কেন অকারনে এত মূল্যবান জিনিস তোমার মতো কুদ্দুসের বাপের জন্য ব্যয় করব?”

অভ্র হাসল। ব্যথা করছে হাতে তাও হাসি পাচ্ছে তার। এই যে সামনে বসে থাকা লোকটা তাকে পছন্দ ও ভালোবাসে তবে জিজ্ঞেস করলে বকাঝকা করে কথা উড়িয়ে দেবে। তীড় লাগার সময় অভ্র তার আহাজারি, চোখের কোনের জল দেখেছিল কিন্তু এই যে বলল, স্বীকার কিছুতেই করবে না। ফারাজ অভ্রর দিকে তাকিয়ে বলল, “আমায় এক্ষুনি বাংলাদেশ যেতে হবে। তুই থাক, সুস্থ হয়ে ধীরে সুস্থে ফিরিস।”
“কেন ভাই কিছু হয়েছে?”

ফারাজ একটা আঘত শ্বাস ছেড়ে সবটা খুলে বলল। সবটা শুনে অভ্রর চোখ ছানাবড়া। সে জিদ ধরে বলল, “আমিও যাবো ভাই। আমি তো সুস্থই আছি। আয়েশাকে সব বলে দিয়েছেন কী?”
“সুযোগ হয়নি। তবে বাংলাদেশ যাই আগে। তারপর সব ম্যানেজ করব।”
অভ্রর জিদ কাজে আসল না। ভাইকে একা ছাড়ছে এই প্রথম। নিজেকে ব্যর্থ মনে হচ্ছে। ভাইয়ের এমন বিপদের সময় নিজেই তো এত্তগুলা ঝামেলায় ফেলল৷ তার হাতে তীড় না লাগলে,অপারেশনের সময়গুলো এভাবে ব্যয় হতো না। আরো অনেক আগেই বাংলাদেশ পৌঁছাতে পারত।

দুপুর গড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু এলাহী বাড়ির ভেতরে আলো ঢুকেও অন্ধকার কাটাতে পারছে না। এখানো শোকের ভারে আলোও থমকে গেছে। একটার পর একটা মানুষ আসছে। উঠোনে ফিসফাস, দীর্ঘশ্বাস, চাপা কান্না। কেউ কোরআনের আয়াত পড়ছে, কেউ নিঃশব্দে চোখ মুছছে। মানুষের ভিড় এখন কমে গেছে। রুমানা বসে আছে লাশের একেবারে পাশে। ঠিক বসে আছে বলা যায় না, সে বসে থাকার ভান করছে। শত হলেও মা, আর একজন মাকে সন্তান হারানোর শোকে সান্ত্বনা দেওয়া যায় না। প্রথমে স্বামী হারালেন, মাস কাটতে না কাটতে ছেলে হারালেন। মেয়েটা তো সেই কবেই হারিয়ে গেছে। আর যে আছে,সে থাকা আর না থাকা একই বিষয়। রুমানার চোখ দুটো শুকনো, পাথরের মতো স্থির। না কান্না, না হাহাকার। কেউ কাছে এসে কিছু বললেও সে তাকায় না। হাত দুটো লাশের চাদরের কিনারে রাখা আছে। ছুঁয়েও নেই, আবার ছাড়েও না।

মোহনার অবস্থা উল্টো। তাকে আর ধরে রাখা যাচ্ছে না। কখনো লাশের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়তে চায়, কখনো বুক চাপড়ে চিৎকার করে ওঠে। “এইভাবে চলে যায় কেউ? এইভাবে?” তার গলা ফেটে যাচ্ছে, শরীর কাঁপছে। দুই-তিনজন মিলে তাকে সামলাতে হচ্ছে। চোখের সামনে ভালোবাসার শুরুটা এখনো টাটকা৷ আর শেষটা এত নির্মম, এত অসমাপ্ত। প্রকৃতি ইচ্ছে করেই সবচেয়ে নিষ্ঠুর জায়গাটায় থামিয়ে দিয়েছে গল্পটা। আরেকটু সুন্দর হলে কি খুব ক্ষতি হতো?

হাসপাতাল থেকে লাশ আনার পর পুলিশ পোস্টমর্টেম করতে চেয়েছিল। নিয়ম, কাগজ, প্রটোকল সবই ছিল। কিন্তু বজ্র সামনে দাঁড়িয়ে বিষয়টা সামলেছে। এসব করতে করতে অনেক সময় চলে যায়। লাশ ছাড়ে সেই মাঝ রাতের দিকে। এ দেশে মরেও শান্তি নেই। মানুষ মরলে এমনিতেই শরীর নাজুক হয়ে যায় তার ওপর কাটাছেঁড়া! যদিও সে নিজেই তো এই কাটাছেঁড়ার পেশার মানুষ। প্রতিদিন মৃতদেহ দেখে, ক্ষত সেলাই করে। তবুও আজ তার বুক মানেনি। রোশানের শরীরে আর কোনো দাগ । সে নিতে পারেনি। বুকে বিদ্ধ হওয়া একটা বুলেটের দাগই যথেষ্ট ছিল। “আর কিছু না। যথেষ্ট হয়েছে,” বলেই সে কাগজপত্র থামিয়েছে।
লাশ রাখা আছে ফারাজের জন্য। সে না এলে মাটি কে দেবে? কবরে কে নামাবে? এই প্রশ্নটা বাতাসে ঝুলে আছে। রাজনের কথা উঠেছিল। নদী ফোন করেছিল তাকে। জানিয়ে দিয়েছিল সব। কিন্তু সে বাড়ি ফেরেনি। কোনো খবর নেই। কেউ কেউ চাপা স্বরে বলছে,

“এমন ভাই থাকার থেকে না থাকাই ভালো।”
কথাগুলো বাতাসে মিশে যাচ্ছে, কারও প্রতিবাদ নেই।
দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছে। এলাহী বাড়িটা আজ আবার সেই পুরনো রূপ নিয়েছে। মার্জিয়া এসেছে। আজ তার মাহাদী আর মারিয়ার কথা মনে পড়ছে। সোহাগ তার পাশে দাঁড়িয়ে। কারও সঙ্গে ঠিক চোখাচোখি করছে না। মৃত লাশের দিকে তাকিয়ে হয়তো বিবেককে প্রশ্ন করছে।
ফারাজ বাড়ির ভেতর ঢোকে। এক মুহূর্তের জন্য মনে হয় সে কোনো শব্দ সঙ্গে করে আনেনি। দরজার চৌকাঠ পেরোনোর সময় তার পা কাঁপে। অন্দরমহলে খাটিয়া।

তার চোখ সোজা খাটিয়ার দিকে যায়। কাফন জড়ানো দেহটা দেখেই সে থেমে যায়। একদম থেমে যায়। সময় এখন তার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে। কয়েক সেকেন্ড সে নড়ে না। নিঃশ্বাস নেয় না বলেই মনে হয়। তারপর ধীরে ধীরে এগোয়। এক পা। আরেক পা। হাত বাড়িয়ে কাফনের ওপর রাখে। আঙুলগুলো কাঁপছে। এই কাঁপুনিটাই তার ভাঙন। এতক্ষণে প্রথমবার বোঝা যায়, সে মানুষ। সে কথা বলে না। ডাকেও না। শুধু কাফনের ভাঁজে হাত বুলিয়ে দেয়। ঠিক যেমন জীবিত অবস্থায় রোশানের কাঁধে হাত রাখত। তার গলা ছেড়ে কথা বলতে চায়, কিন্তু শব্দ বেরোয় না। চোখে পানি জমে, গড়িয়ে পড়ে না। চোখের কোণে আটকে থাকে, জেদ করে। মনে হয় সে ভাবছে, আমি দেরি করে ফেললাম।

রুমানা তাকায় তার দিকে। এই প্রথম তার চোখে নড়াচড়া। সে কিছু বলতে চায়, পারে না। মোহনা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। “ফারাজ…” এই ডাকটুকুতে ফারাজের বুকের ভেতর কিছু ভেঙে পড়ে।
সে বসে পড়ে খাটিয়ার পাশে। মাথা নিচু করে। কাফনের ধারে কপাল ছুঁইয়ে দেয়। ঘরের ভেতর কেউ কাঁদছে না জোরে। ফারাজ বসে আছে। নড়ে না। এই নড়াচড়া না করাটাই মোহনার সহ্য হয় না। হঠাৎ যেন মোহনার ভেতরের শেষ বাঁধটাও ভেঙে যায়। সে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়। যে হাতগুলো এতক্ষণ তাকে ধরে রেখেছিল, সেগুলো শক্তি হারায়। এক ছুটে সে খাটিয়ার কাছে চলে আসে। “দেখেছ ফারাজ, দেখতে পারছো? এই বাড়িট পাপ আমার সুখ কেড়ে নিলো। এই বাড়িতে থেকে সুখ আশা করাটাও বোকামি।” গলা ফেটে বেরোয় শব্দগুলো। সে কাফনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। দুই হাতে আঁকড়ে ধরে সাদা কাপড়। “ওঠো! ওঠো রোশান! এইভাবে শুয়ে থেকো না!” তার শরীর কাঁপছে। “তুমি তো কথা দিয়েছিলে… বলেছিলে কোথাও যাবে না। এত কম সময়ে সব কথা ভুলে গেলে?” চিত্রা ছুটে এসে বলল, “ভাবী, শান্ত হন!” কিন্তু শান্ত হওয়ার মতো কিছু বাকি নেই তার। সে চেঁচিয়ে ওঠে— “ছাড়ো আমাকে! ও আমার! ও আমার ওকে এইসব কী পড়িয়ে রেখেছো বলোতো? ও তো ঘুমাচ্ছে। সরো সামনে থেকে, ওর চুলের গুড়ায় ব্যথা করছে। আমি ওর চুলে হাত বুলিয়ে দেব। সরো সবাই সামনে থেকে।” মোহনা কাফনের ওপর মাথা ঠুকে কাঁদতে থাকে। এই কান্নায় সৌন্দর্য নেই, নিয়ম নেই শুধু প্রাণভাঙা শব্দ।

ফারাজ তখনও চুপ। কিন্তু মোহনার এই পাগলামি তার ভেতরে চাপা রাখা সবকিছুকে উসকে দেয়।
সে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে। “ভাবী!” মোহনা তাকায় তার দিকে। চোখে ক্ষুধার মতো আকুতি। “ফারাজ … ওকে বলো না উঠতে। তুমি বললে শুনবে।” এই কথাটাই যেন ফারাজের বুক চিরে দেয়। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। “ফারাজ, ও তো আমাকে ভালোবাসে। তাহলে শেষটা এত নিষ্ঠুর কেন?”হঠাৎ সে নিজের বুক চাপড়ে ওঠে।“আমি ওকে বাঁচাতে পারলাম না!”

এই মুহূর্তে রুমানা উঠে দাঁড়ায়। এতক্ষণ পাথর হয়ে থাকা মানুষটা এবার ভেঙে যায়। সে কিছু বলে না শুধু মোহনার হাত ধরে নেয়। সেই স্পর্শে মোহনার কান্না আরও তীব্র হয়। ঘরের ভেতর কেউ আর চুপ থাকতে পারে না। চাপা কান্না এবার প্রকাশ পায়। কেউ মুখ ঢেকে কাঁদছে, কেউ দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। কাফন জড়ানো দেহটা নিঃশব্দে শুয়ে আছে। কোনো প্রতিবাদ নেই। কোনো সাড়া নেই। ফারাজ গোসল করানো সুরমা দেওয়া লাশের মুখটা ভালো করে দেখে। মৃত্যুর পর সৌন্দর্য যেন আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। ফারাজের চোখ দিয়ে সত্যি একবিন্দু জলও বের হয়না। তবে বুকের ভিতর হাহাকার। একটাবার যদি চিৎকার করা যেত তাহলে আত্মা শান্তি পেত। হঠাৎ সে রোশানের খাটিয়ায় হাত রেখে বলল,”ভাই আজানের সময় হয়েছে, নামাজে যাবেন না?

ভাই আপনিও শেষে এমন স্বার্থপর হয়ে গেলেন? চলেই গেলেন? আপনারা সবাই স্বর্থপর ভাই। এই এতিমকে আরো এতিম করে দিয়ে আপনারা ঠিকই চলে গেলেন। একবার এই এতিমের কথা কেউ ভাবলেন না। মা ভাবল না, আপনিও না। এই ফারাজের দুনিয়ায় আর কেউ রইলো না। আপনার এই খাটিয়া আমি কেমন করে কবর অবধি নিবো ভাই? কেমন করে? আমার শরীরটা আর কাজ করছে না ভাই। আপনি আর ঘুমাবেন না, উঠেন এইবার৷ আমি ফারাজ আর নিতে পারছি না ভাই। আপনি উঠে পরেন৷ আমি ভাই আপনার পছন্দের বিরিয়ানিটা সত্যি রাঁধব। আপনি একবার খালি উঠেন। ভাই আমি আপনাকে ভালোবাসি ভাই, আপনি আমাকে একা করে চলে যাবেন যদি জানতাম তাহলে ভাই আমি আপনাকে রেখে যেতাম না। মুখে হাজারবার বলতাম ভাই, আপনাকে আমি অনেক ভালোবাসি।” এবার ফারাজের চোখের আস্তর ভেদ করে জল পড়েই গেল৷ বাঁধা আর মানল না। চিত্রার চোখেও জল। তবে ফারাজকে থামালো না সে। কাঁদুক, একটু হালকা হোক। আল্লাহ তাকে ভাই হারানোর শোক সামলানোর ধর্য্য দান করুক।

দু’দিনের এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ায় খোদা কেন এত মায়ার বীজ ছিটিয়ে দেন? তিনি কি জানেন না মানুষ হারানোর শোক কতটা সর্বগ্রাসী? স্বামীহারা নারীর বুকের ভেতর যে শূন্যতা জন্মায়, তা যে শব্দে ধরা যায় না। ভাই হারানোর যন্ত্রণা যে বুকের হাড় ভেঙে দেয়, সন্তানহারা মায়ের আর্তনাদ যে আকাশকেও কাঁপিয়ে তোলে এসব কি তাঁর অজানা? খোদা তো সবই জানেন। তবুও কেন বান্দাকে তিনি আগুনে ফেলে দেন বারবার? কেন এই পরীক্ষার নামে এমন দহন?
জানাযা শেষ হতেই মানুষজন সম্মিলিত ভারে লাশটাকে কাঁধে তুলে নিল। সামনের সারির ডান পাশে দাঁড়িয়ে ছিল ফারাজ এলাহী। গায়ে তার সাদা পাঞ্জাবি। কিন্তু তা তার নিজের নয়। ওটা রোশানের। সাদা ছিল রোশান ভাইয়ের প্রিয় রঙ। তার মনটাও ছিল সেই রঙের মতোই নির্মল। কিন্তু সাদা কি কখনো দাগ সহ্য করতে পারে? একবার কলুষিত হলে কি আর আগের মতো ফেরে? এলাহী বংশ রোশানকে কিছু দিতে পারেনি। শুধু দাগ দিয়েছে, চিরস্থায়ী কলঙ্কের দাগ।

দাফনের পথে লাশ যখন এগোয়, তখন মোহনা উন্মাদের মতো ছুটে আসে। পাগলপ্রায় দেহে সে ছুটে যেতে চায় কবরের দিকে। বাড়ির নারীরা তাকে আঁকড়ে ধরে। চিত্রা নিজের চোখের জল গিলে নিয়ে মোহনাকে বুকে টেনে নেয়। আহা, জীবন—শখের জীবনের দাম বড় বেশি, অথচ মেয়াদ বড়ই স্বল্প। শেষ পর্যন্ত এলাহী বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে ঠাঁই হয় রোশান এলাহীর। তার গল্প সেখানেই সমাপ্ত হয়। ফেরার কোনো পথ আর খোলা থাকে না।
সবাই চলে যাওয়ার পরও ফারাজ দীর্ঘক্ষণ কবরের পাশে বসে থাকে। তার চোখে জল নেই। জল অনেক আগেই শুকিয়ে গেছে। তবুও উন্মাদের মতো বারবার কাঁচা মাটিতে হাত বুলিয়ে সে ফিসফিস করে বলে,
“ভাই, আমি আছি। আপনি ভয় পাবেন না। আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর দিন ভাই। আমি আছি।” কিন্তু সে জানে এই কথাগুলো শুনবার মতো কেউ নেই।

ফারাজ গভীর একাকীত্বে ডুবে যায়। আজও তার পাশে কেউ নেই। কাল সে মরলেও পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ থাকবে এই নিশ্চয়তাও নেই। খোদা দুনিয়াটা সৃষ্টি করেছেন এক নির্মম, অনমনীয় নিয়মে। সেই কঠিন নিয়মের অর্থ ফারাজের মতো পাপীর বোঝার সাধ্য নেই। সে শুধু জানে দিন আসে, দিন যায়। ভালো দিনের পর খারাপ দিন অনিবার্য। আর সেই খারাপ দিনকেই যদি ভালো বলে মেনে নেওয়া যায়, তবে জীবন সহনীয় হয়। নচেৎ সবকিছুই জঘন্য, অসহনীয়, শ্বাসরুদ্ধকর হয়ে ওঠে।

রাত তখন এগারোটার কাছাকাছি। হাসপাতালের ঠান্ডা করিডোরে রাজন বসে আছে। তার মাথা আর শরীর কোনোটাই সুস্থ নেই। অথচ তার চেয়েও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছে মনটা। মানুষের প্রতি বিশ্বাস নামক যে অদৃশ্য অঙ্গটি ছিল, তা আজ সম্পূর্ণ পচে গেছে। মানুষ বড়ই বেইমান। এই পৃথিবীতে বেইমানি ছাড়া আর কিছুই শিখতে পারেনি। যার জন্য সে এতকিছু করেছিল, যার নাম উচ্চারণ করতে গিয়ে বুকের ভেতর কাঁপুনি উঠত সেই রাবসা কোনো পূর্বসংকেত না দিয়েই চলে গেছে। এমন দূরত্বে, যেখান থেকে তাকে ফিরিয়ে আনা তো দূরের কথা, ডাক পাঠানোরও আর কোনো উপায় নেই। মানুষ কি এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে? নাকি নিষ্ঠুরতা আসলে ভালোবাসারই আরেক রূপ? রাজনের মাথার ভেতর প্রশ্নগুলো পচে পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়। রাবসা কি তার পাপের শাস্তি পেয়েছে? সে যে লোক ভাড়া করেছিল মোহনাকে হত্যা করার জন্য। সেই লোক মোহনাকে হত্যা করতে গিয়ে রোশানকেই পৃথিবী থেকে মুছে দিল। এই ভয়ংকর ভুল কি কেবল দুর্ঘটনা ছিল? নাকি এটাই ছিল পাপের নির্ভুল হিসাব? ভাই হত্যার পাপ কি এমনই নিষ্ঠুর? এমনই নির্মম যে তার ছায়া নিরপরাধের গায়েও পড়ে? রাজনের বুকের ভেতর প্রশ্নগুলো কাঁদে, কিন্তু কোনো উত্তর আসে না। আর রাজন বুঝে যায় এই দুনিয়ায় পাপের শাস্তি সবসময় অপরাধীর গায়ে পড়ে না অনেক সময় তা এসে ভেঙে দেয় অন্য কারো জীবন।

আর এই ভাঙনই বোধহয় খোদার সবচেয়ে ভয়ংকর বিচার।
মর্গের দরজা খুলতেই লাশটা বের করে আনা হলো। রাজন কিছুক্ষণ নড়ল না। শুধু তাকিয়ে রইল। ওই নিথর দেহটার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া তার আর কোনো ক্ষমতা অবশিষ্ট ছিল না। যে মানুষটাকে সবাই পাথরের মতো কঠিন বলে জানত, তার চোখ দিয়েও সেদিন জল গড়িয়ে পড়ল। হয়তো সেদিনই প্রথমবার সে তার দীর্ঘদিনের পাপের হিসাব কষতে শুরু করল৷ একটা একটা করে, নির্মম স্পষ্টতায়। সে বুঝতে পারল, হারানোর যন্ত্রণা কতটা সর্বনাশী। যাকে নিঃস্ব করে ভালোবাসা হয়, সে যদি চিরদিনের জন্য দূরে সরে যায় তাহলে সেই শূন্যতা কেবল বুক নয়, অস্তিত্বকেও ছিন্নভিন্ন করে দেয়। আজ সে বুঝতে পারল, এই হাত দিয়েই সে কত মানুষের জীবন উজাড় করেছে কত ঘর সে ভেঙেছে কত হৃদয়কে সে বাধ্য করেছে শোকের ভেতর বাঁচতে।

রাবসার নিথর দেহ তাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল। কোনো শব্দ ছাড়াই, কোনো অভিযোগ ছাড়াই শুধু উপস্থিতির মাধ্যমে। রাজনের বুক ফেটে যাচ্ছে যন্ত্রণায়, অথচ এই মৃত শরীরটা ছাড়া তার পাশে আর কেউ নেই। সে একা। সম্পূর্ণ একা। খোদা তাকে একা রেখে, সমস্ত ভালোবাসা কেড়ে নিয়ে, এমন এক জঘন্য নীরবতায় তাকে দাঁড় করিয়ে দিলেন যেখানে পাপ আর পুণ্যের ফারাক আর ব্যাখ্যার দাবি রাখে না।

রাত গভীর করে ফারাজ বাড়ি ফিরল। দিনের ক্লান্তি নয় তার শরীর বয়ে এনেছে শোকের ভার। ঘরে ঢুকেই সে নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল, “ভাবীকে কিছু খাইয়েছো?”
চিত্রার কণ্ঠে ক্লান্তির সঙ্গে অসহায়ত্ব মিশে ছিল। “অনেক কষ্টে। সবাই মিলে ধরে বেঁধে দুই লোকমা মুখে তুলতে পেরেছি। তারপর ঘুমের ওষুধ দিয়েছি। এখন ঘুমাচ্ছে। আর আপনি? সকাল থেকে কিছু খাননি।”
ফারাজ চোখ নামিয়ে বলল, “ক্ষুধা নেই, বউ। তুমি খাটে গিয়ে বসো। আজ তোমার কোলে মাথা রাখতে চাই। মাথার ভেতরটা সহ্য করা যাচ্ছে না।”
চিত্রা চুপচাপ খাটে বসল। ফারাজ তার কোলে মাথা রাখতেই সে হাত বুলিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ থেমে গেল তার হাত। নিঃশব্দ ভেঙে চিত্রা বলল,

“একটা অনুরোধ রাখবেন?”
ফারাজ চোখ তুলল। “কি?”
“রোশান ভাইকে যে কেড়ে নিয়েছে তার লাশ এনে দিতে পারবেন না? লাশ চাই, ফারাজ। লাশের বদলে লাশ চাই।”
ফারাজ তার কোল থেকেই ধীরে চিত্রার মুখের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে বিস্ময় ছিল না। সে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কি বলছো? ভেবে বলছো তো?”
চিত্রা একটুও দেরি করল না। “হ্যাঁ।”

মধ্যরাতের নিস্তব্ধতায় এসে পড়া একটিমাত্র সংবাদই যথেষ্ট হলো সারাদিনের জমে থাকা আনন্দকে ধূলিসাৎ করে দিতে। রাজনের প্রতি তার অন্তরের শেষ অবশিষ্ট আস্থাটুকুও ছিঁড়ে গেল। মনে মনে স্থির করল এইবার রাজন সামনে এলে আর কোনো ব্যাখ্যা নয়, কেবলই বলা হবে, “নিজের হিসাব নিজেই মিটিয়ে নাও। আমার পথ তোমার পথের সঙ্গে আর এক নয়।”

অল্প কিছু সময় আগেই সোহানের কানে এসেছে বিভীষিকাময় খবরটি। মোহনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ভাড়া করা লোকটির ভুল নিশানায় গুলিটি গিয়ে বিদ্ধ হয়েছে রোশানের বুকে। এমন স্থানে আঘাত লেগেছে যে, ফেরার কোনো পথই তার জন্য খোলা রইল না। আজ রাতেই চিত্রাকে তুলে আনার কথা ছিল অথচ রাজনের লালসা আর অদূরদর্শিতার ফলেই ফারাজ বিদেশের কাজ ছুড়ে ফেলে দেশে ফিরতে বাধ্য হলো।
আর নয়। রাজনের উপর ভরসার ভাঙা সেতুতে আর এক পা-ও এগোনো যাবে না। এবার নিজের কাজ নিজের হাতেই নিতে হবে। চিত্রাকে এইবার তার চাই মূল্য যাই হোক, যে কোনো মূল্যেই তাকে চাই।
সোহান সিফাতকে ডাকল। সে উপস্থিত হতেই কঠোর কণ্ঠে উচ্চারণ করল, “অনেক হইছে। এইবার তারেই ফোন লাগা।”
সিফাত এক মুহূর্ত থমকে প্রশ্ন করল, “সত্যিই লাগামু?”
“হ। সত্যি। এইবার ঘুঘু দিয়া ঘুঘুই ধরব।”

ফজরের আজানের আগেই বজ্র বিদ্যুতের গর্জনে ঘুম ভেঙে উঠল। নিরুকে লুকিয়ে সপ্তাহেই বিয়ে করেছে সে। অথচ বিয়ের পর ঘরসংসারের কোনো উষ্ণতায় ডুবে থাকার সুযোগ হয়নি। ব্যস্ততার ঘূর্ণিতে পড়ে নববধূর কাছে যাওয়াই হয়ে ওঠেনি। ভোরে কলের শব্দে ঘুম ভাঙল বজ্রর। হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিতেই নাম্বারটা দেখে বজ্র চমকে উঠল। ধীরে পা ফেলে বারান্দায় গিয়ে কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে শীতল কণ্ঠ ভেসে এলো, “একটাই কাজ দিয়েছিলাম। সেটাও করতে পারলে না।”
বজ্র নিস্তরঙ্গ স্বরে বলল, “যা বিবেক মানে না, তা আমি করি না।”

“আমি বাড়ি ফিরে যাচ্ছি।”
“আগেও বলেছিলাম,” বজ্রের গলায় তাচ্ছিল্য।“সময় নষ্ট করেএখানে পড়ে থেকে লাভ নেই।”
“হয়েছে, আর বলা লাগবে না। তুমি ফিরছ কবে?”
“বোমা বিস্ফোরণের আগে ফেরা সম্ভব নয়।”
ওপাশ থেকে তিক্ত হাসির মতো শব্দ, “সব কাজ ফেলে রেখে এই দেশে তোমাদের বোমা বিস্ফোরণই চলতে থাকবে।”
লাইন কেটে গেল।
বজ্র নীরবে ফোনটা নামিয়ে রাখল। ফ্রেশ হয়ে শার্ট গায়ে চাপিয়ে আবার বারান্দায় এসে দাঁড়াল। তখনই চোখে পড়ল, চোখে পড়ার মতো এক নাম্বার থেকে আসা মিসড কল। মুহূর্ত দেরি না করে কল ব্যাক করল।
কিছুক্ষণ পর কল রিসিভ হতেই বজ্র জিজ্ঞেস করল,

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৩

“কী চাও?”
“চিত্রাকে।”
বজ্র নির্বিকার, “বলেছিলাম তো পেয়ে যাবে।”
“আমি দেখা করতে চাই।” বজ্র একবার ফিরে তাকাল। বিছানায় ঘুমন্ত নিরুপমা। নিরুর মুখে নিষ্পাপ শান্তি। এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে সে দৃষ্টি সরাল। ফোনে সোহানকে উদ্দেশ করে বলল,
“আসছি।”

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৭৪ (২)

1 COMMENT

Comments are closed.