Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ৮

মহামায়া পর্ব ৮

মহামায়া পর্ব ৮
তুশকন্যা

“আনায়া বউ হয় আমার। তবে আমায় না জানিয়েই,ওর কি করে অন্য কারো সাথে বিয়ে হতে পারে?”
কেনীথের কথা শুনে ভাহিদ বিস্ময়ের সাথে তাকিয়ে বলল,
“পাগল হয়ে গিয়েছো? কিসব বলতে চাইছো? সকাল সকাল মজা করছো আমার সাথে?”
কেনীথ ভাহিদের ক্ষিপ্ততায় কিছুক্ষণ চুপ রইলেও, পরক্ষণেই মাথা গরম না করে শক্ত গলায় বলতে লাগল,
“আমি মজা করছি না বাবা। হিসেবে তো আনায়া এখনো আমার বউ তবে কেনো…”

—“কিসের বউ বউ লাগিয়ে রেখেছো, রিডিকিউলাস! আনায়া তোমার কিসের বউ? ওকে বউ হিসেবে কবে থেকে মেনে নিয়েছো তুমি? বিয়েটা মেনে নিয়েছিলে? কিচ্ছু মানোনি, উল্টো কি করছো? ঐ মেয়েটাকেই মে”রে ফেলার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিলে। এখন ভুলে গিয়েছো বারো-চৌদ্দ বছর আগে, কি কি অকাজ করে দেশ ছেড়ে ছিলে তুমি!
দেখো ভিভান,আমার মাথা গরম করো না। তোমাকে বিদেশ থেকে আনিয়েছি নতুন কোনো ঝামেলা বাঁধানোর জন্য নয়। ভালো কিছু করতে পারলে কিছু করো, নয়তো শান্তিতে চুপচাপ আবার বিদেশ ফিরতে পারো। তবে দয়া করে ওই মেয়েটার জীবন আর শেষ করো না। তারেকের সাথে আমার যত সমস্যাই থাকুক না কেনো, আমি কখনো চাইবো না আনায়ার জীবনটা তোমার মতো একটা ডাফারের জন্য আবারও কোনোভাবে খা”রাপ হোক। পুরোনো কথা পুরোনই থাক, নতুন করে আর কোনো অশান্তি করো না। মেয়েটার বিয়ে হচ্ছে,শান্তিতে হতে দেও। আর কিছু বলার না থাকলে, যেতে পারো।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সবগুলো কথাই কেনীথ চোখ-চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুনলো। মেজাজ তার যেমনই থাকুক না কেনো, নিজের বাবার সাথে কোনো বাজে বিহেভ করার ইচ্ছে তার নেই। তবে এখানে আর এক মূহুর্ত দাঁড়ানোরও ইচ্ছে নেই। নিজের রাগকে সামলে নিয়ে, রুম থেকে বেড়িয়ে আসতে লাগলে, পেছন থেকে ভাহিদ আবারও বলল,
“আর হ্যাঁ,যে কাজ দিয়েছিলাম তা পরে করলেও চলবে। আপাতত বিয়ের সব কার্যক্রম শেষ না হওয়া পর্যন্ত, তোমায় যেন ঢাকায় যেতে না দেখি। শুধু ঢাকায় কেনো, খবরদার এই কয়েকদিন চিটাগং এর বাহিরেও এক পা-ও রাখবে না তুমি। কথাটা যেন মাথায় থাকে। এখন গিয়ে রেস্ট করতে থাকো।”

কেনীথ পেছনে না ফিরেই কথাগুলো মনোযোগ সহকারে শুনল, তবে একবারও পেছনে ফিরে তাকায় না। বরং ভাহিদের কথা শেষ হলে কেনীথ কিঞ্চিৎ মুচকি হাসে, এই ভেবে যে—তার বাবা এখনো তাকে বাচ্চা ভেবে যাচ্ছে। যে কারণে কেনীথ তাচ্ছিল্যের সাথে মনে মনে আওড়ায়,
“রেস্ট তো আমি করবই বাবা, কিন্তু তুমি যে ভুল করছো! তোমার ছেলে তো কোনোকালেই কারো বাঁধ্য ছিলো না। আবারও তুমি ভুল জায়গায়, ভুল এক্সপেকটেশন রাখছো।”
এইটুকু বলার পর কেনীথ রুম থেকে বেড়িয়ে আসতে আসতে, আবারও বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়,
“বিয়ে যখন একবার করেইছি, তখন বউ তো আর আমি—কারো সাথে ভাগাভাগি করবো না।যেটা আমার,সেটা শুধু মাত্রই আমার। আমি চিরকাল তা ফেলে রাখলেও—তা শুধু আমারই থাকবে।”

তারেক এহসানের সাথে পাভেল আর কেনীথের আলোচনা তখনই সমাপ্ত হয়ে যায়। তারেক আর ইনায়ার ত্যারামোতে দুজনেই বিরক্ত হয়। অবশ্য জানাই ছিলো এমন কিছুই হয়তো ঘটবে। তারেক এহসান সোজাসাপ্টা হলে তো আর এতো কিছু করতে হতো না। যথারীতি কেনীথ আর পাভেল চা খাওয়া শেষ করে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যেতে নিলে আচমকা দেখা মেলে তারেক এহসানের স্ত্রী অনিমার। কেনীথদের দেখা মাত্রই অনিমা আচমকাই ছুটে আসে।
কেনীথ ভেবেছিলো এতোবছর পর আচমকা তার কাকীমা আদৌও তাকে চিনবে কিনা—তা অজানা। কিন্তু কেনীথকে অবাক করে দিয়ে অনিমা কেনীথের দু-হাত হাত ধরে, প্রচন্ড আবেগী হয়ে বলতে লাগল,
“আমার ভিভান বাপটা না? এতো বছর পর…”

এটুকু বলতে না বলতেই অনিমার চোখে পানি ছলছল করে উঠল। কেনীথও আচমকা হতভম্ব হয়ে গিয়েছে। সে তো ভেবেছিলো, সবার মতো তার এই সাধাসিধা কাকিমাও হয়তো তাকে আর পছন্দ করে না। অবশ্য না করাটাও স্বাভাবিক।কিন্তু নিজের মায়ের চেয়েও তাকে অগাধ ভালোবাসা এই মানুষটা আজও তার জন্য পাগল। অনিমা নিজের সন্তানের চেয়েও সবসময় বেশি ভালোবাসতো কেনীথকে।
অথচ এই ছেলেই কিনা তার পেটের মেয়েকে মে”রে ফেলতে উঠেপড়ে লেগেছিল। এরপরও আজও কোনো প্রকার ঘৃণা তিক্ততা, ক্ষো”ভ ছাড়াই কেনীথকে নিজের সন্তান ভেবেই ছুটে এসেছে। কেনীথ যেন নিজেকে খানিকটা দূর্বল অনুভব করল। দেশে আসার পর থেকেই যেন যত সমস্যা তৈরি হচ্ছে। নিজের কোনা কাজকর্মেই কখনো অনুতপ্ত না হওয়া সেও এখানে এসে কেমন যেন সব কিছুতেই গিল্টি ফিল করছে। কেনীথ এই ব্যপাটায় কিছুটা বিরক্ত এবং হতাশ।

তবে দুজনের মাঝে বেশি একটা কথা আলাপের সুযোগ হয়ে ওঠেনি। সকলের মাঝেই তারেকের চাপা ধমকের কারণে, অনিমাকে নিজের আবেগে লাগাম টানতে হয়েছে। কেনীথও স্তব্ধ চোখের ইশারায় অনুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে এসেছে। নতুন ঝামেলা কিংবা অশান্তির কোনো প্রয়োজন নেই। তবে কেনীথ আর পাভেল যখন বাড়ির দোরগোড়ায় দাড়িয়ে ফেরার উদ্দেশ্য বের হচ্ছিলো তখনই আচমকা কেনীথ কিছু সময়ের জন্য দাঁড়িয়ে যায়। কিঞ্চিৎ ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন থেকে দোতলার দিকে তাকিয়ে—পুনোরায় সামনের মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে,থেমে থেমে বিড়বিড়িয়ে আওড়িয়ে যায়,
“আ…না…য়া!…মাই হার্ট কোর, মাই ফা”কিং চেরি ব্লাস্ট!”
অতঃপর আরো বেশ কিছু ভেবে নিয়ে,সামান্য তির্যক হেসেই সোজা এহসান বাড়ি হতে বেড়িয়ে পড়ে।

কেনীথ গতকালের ঘটনা সহ আরো নানান সব ভাবনা ভাবতে ভাবতে পুনোরায় নিজের রুমের উদ্দেশ্য এগোচ্ছিলো। আচমকা সিঁড়ির কাছে এসে রোজের দেখা মেলে। কেনীথ যখন দেশ ছেড়েছিলো তখন রোজ নিত্যন্তই অনেক ছোট। অথচ এখন কত বড় হয়ে গিয়েছে। ভাবতেই অবাক লাগে,এতোগুলা বছর কিভাবে পেরিয়ে গেল!
ছোট বেলায় বাবা মা হারানো পাভেল আর রোজকে কাশফিয়া কখনো একা ছাড়তে পারেনি। ভাহিদেরও ইচ্ছে অনুযায়ী সে তার ভাইয়ের ছেলে মেয়েদের নিজের কাছেই আগলে রেখেছিল। তবে বহু বছর আগে যখন কেনীথ এবং পাভেল মিলে একটা জঘন্য কাজ করে বসে—তখন দুজনকেই দেশ ছাড়া করা হয়। আর একমাত্র মেয়ে হিসেবে নিজের কাছে আগলে রাখা হয় রোজকে।

রোজ খুব নরম স্বভাবের মেয়ে। অনেকটা আবেগি এবং তাকে সবাই সবসময় চুপচাপই দেখে আসছে। তবে তার নীরবতার জগতে কয়েক বছর হলো একটা বিশাল সমস্যার দেখা মিলেছে। জীবনের এই পর্যায়ে এসে সে ফেঁসে গিয়েছে একতরফা ভালোবাসায়। অনবরত রোজের মন মস্তিষ্কে রাজত্ব করে চলেছে কেনীথের অস্তিত্ব।
এতো বছরে কেনীথ হয়তো একবারের জন্যও দেশে ফেরেনি। তবে কয়েক বছর থেকে রোজ খেয়াল করে দেখেছে, কেনীথের কথা মাথায় এলেই সে নিজেকে প্রচন্ড দূর্বল অনুভব করে। পাভেল একবার কেনীথ সহ নিজের ছবি পাঠিয়েছিল রোজকে। বড়বেলায় এসে তখনই সে তাকে প্রথমবার ভালোমতো দেখার সুযোগ পায়। এরপর আগ্রহের বশে নানান সময়ে,আগ বাড়িয়েই বাড়ির ছেলে ভিভানের সম্পর্কে কাশফিয়া কিংবা নূরজাহানের কাছে গল্প শুনতো। মূলত কেনীথের ছোটখাটো সব বিষয়েই ছিল তার তীব্র আগ্রহ। যার সবই কেনীথের প্রতি তার একতরফা ভালোবাসাকেই নির্দেশ করে।

আর এখন কেনীথ দেশে ফেরার পর যেন সে পুরোপুরি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। মন মস্তিষ্কের চিন্তা ভাবনা সবকিছু যেন এলোমেলো গিয়েছে। যতটা পারছে কেনীথ হতে দূরে দূরে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তবুও যেন কোনো না কোনো ভাবে কেনীথের সামনে এসেই পড়ছে। রোজ অবশ্য এই বিষয়টিতে কিছুটা বিরক্ত। একে তো ছোট বেলায় উগ্র ভিভান আদতে কেমন ছিলো তার কিছুটা ধারনা রোজের নিজেরও রয়েছে। পূর্বে তার ভাই আর কেনীথের ঘটানো ঘটনার কথা সে এখনো ভোলেনি। কতই না বিতিকিচ্ছিরি কাহিনি ঘটেছিল!

তখনও যেমন কেনীথের প্রতি তার ভয় কাজ করতো, এখনও এসে সেই একই অবস্থা। মনে হয়, এই না যেন তার মনের খবর কেনীথ বুঝে ফেলে—আর তাকেই সোজা মে’রে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়। রোজ জানে এসব তার নিত্যন্তই ভীতু মনের বোকা চিন্তা ভাবনা। নয়তো কেনীথকে এতোবছর পর দেখে রোজের খুব বেশি ভয়ংকর কিছু মনে হয়নি—যতটটা সে ভেবে রেখেছিল। পূর্বের ন্যায় অনেকটাই গম্ভীর তবে কেমন যেন বন্ধুসুলভ। যখনই তার সামনে পড়েছে, কেনীথ নিজ থেকেই তার সাথে একদম স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলেছে।এই বিষয়টায় যেমন রোজের খুব ভালোও লেগেছে তেমনি প্রতিবার কথা বলতে গিয়ে প্রচন্ড অস্বস্তিও হয়েছে।

—“কিরে, এতো সকালে এভাবে ছোটাছুটি করছিস কেনো?”
রোজকে আঁটোসাঁটো হয়ে চুপচাপ থাকতে দেখে,কেনীথ নিজ থেকেই কথা বলল। রোজ খানিকটা চমকে উঠল নিমিষেই। তবে তা কেনীথকে বুঝতে না দিয়ে, নিজেকে যথাসাধ্য সামলে নিয়ে বলতে চাইল,
“না মানে… সকাল তো অনেক হয়েই…”
রোজের কথা শেষ হবার পূর্বেই কেনীথ খানিকটা কপাল কুঁচকে ফেলল। বুকে দু’হাত গুঁজে ভ্রু উঁচিয়ে নিরেট কন্ঠে বলল,

“কাহিনি কি বলতো? শুরু থেকেই খেয়াল করছি…আচ্ছা তুই কি কোনো কারণে আমাকে ভয় পাচ্ছিস?”
কেনীথের কথা শুনে রোজের আকস্মিক গলা শুকিয়ে এলো। কি ছেড়ে কি বলবে বুঝে উঠতে পারল না। তবুও ইতস্ততভাবে বলতে লাগল,
“ভয়! ভয় কেনো পাবো। তুমি বাঘ না ভাল্লুক যে আমি ভয় পাবো।”
কেনীথ বিষয়টা নিয়ে আর বেশি কিছু বলল না। কথা ঘুরিয়ে সে নির্বিকারে বলে,
“পড়াশোনা কেমন চলছে তোর?অনার্সে পরিস তো,তাই না?”
আচমকা কেনীথের এহেন প্রশ্নে রোজ কিছুটা অবাক হয়। সেদিনই না কেনীথের সাথে এই নিয়ে কথা হলো?এতো দ্রুত ভুলে গিয়েছে নাকি?

—“হুম…পড়াশোনাও ভালোই যাচ্ছে।”
—“বাহ্! একেকজন তো ভালোই বড় হয়ে গিয়েছিস।”
কেনীথ এই বলেই রোজের চুলে আলতো হাতে টোকা দিলো। রোজও এবার কিছুটা অবাক হলো। কেনীথ আগ বাড়িয়ে কথা বলে তো ঠিকই, তবে হাবভাব কেমন যেন অদ্ভুত। বিশেষ করে বর্তমানে দেখে তো মনে হচ্ছে, তার মন মেজাজ একটু বেশিই ভালো আছে। আবার খারাপও হতে পারে। মনে মনে ভাবল কেনীথ যেহেতু ভাহিদের স্টাডি রুম থেকে বেড়িয়েছে—এরমানে দুজনের মাঝে ভালো কিছুই হয়েছে। বিষয়টা রোজের বেশ ভালো লাগল। তবে এই মূহুর্তে এখানে আর থাকা সম্ভব নয়। এমনিতেই শুরু থেকেই রোজ কেনীথের থেকে নজর লুকিয়ে লুকিয়ে কথা বলার অদ্ভুত চেষ্টা করে চলেছে। আর বেশিক্ষণ কেনীথের সামনে থাকলে নিশ্চিত কোনো গন্ডগোল হয়ে যাবে।

—“তুমি কিছু মনে করো না। আমায় যেতে হবে, ফুপাকে সকাল বেলায় চা না দিলে সে রেগে যাবে। আমি বরং যাই এখন।”
কেনীথ খানিকটা গম্ভীর স্বরে কিঞ্চিৎ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ঠিক আছে যা।”
কেনীথ বলা মাত্রই যেন রোজ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এক মূহুর্তও দেরি না করে সেখান থেকে রান্না ঘরের দিকে ছুটতে নিলে—পেছন থেকে কেনীথের ডাকে আবারও নিজেকে থামাতে হলো।
—“ঐ রোজ, শুন তো!”
রোজ ত্বরিত পেছন ফিরে তাকাতেই, কেনীথ বলল,
“সময় পেলে আমার আর পাভেলের জন্য কফি দিয়ে যাস!”
—“কিন্তু ভাইয়া তো ওঠেনি।”
—“ওঠেনি, পিঠে দুটো পড়লে ঠিকই উঠে যাবে,তুই যা।”

কেনীথ পাভেলের রুমের কাছে এসে দেখল, দরজা খোলাই রয়েছে। বুঝতে বাকি রইল না কাল রাতে ফিরেই সোজা ঘুমিয়েছে যাতে আর দরজাও লাগানো হয়নি। কেনীথ রুমে প্রবেশ করতেই দেখল,পাভেল পিছানার কোণায় উল্টেপাল্টে শুয়ে রয়েছে। দু’পা আর এক হাত বিছানায়। আর অন্য হাত ও মাথাটা হেলে বিছানার বাহিরে চলে গিয়েছে। একটু এলোমেলো ভাবে নড়াচড়া করলেই সোজা বিছানা থেকে নিচে পড়বে।
কেনীথ বিরক্তিতে নিশ্বাস ফেলে পাভেলের কাছে গিয়ে জোর গলায় ডাকে,
“পাভেল!”
এক ডাকে কোনো কাজ হলো না। কেনীথ আবারও ডাকল তবুও লাভ নেই। পাভেলকে নির্বিকারে ঘুমাতে দেখে কেনীথ খানিকটা বিরক্তও হলো। এবার বিরক্তি নিয়ে পাভেলের পেটের কাছে হাঁটু উঁচিয়ে হালকা ঠেলা দিতেই—পাভেল ধুম করে নিচে পড়ল। রাগের মাথায় আধ ঘুমের মাঝেই বলতে লাগল,
“কে রে ভাই, ঘুমের…”

—“শালা,এবার ওঠ ঘুম থেকে। আর কত ঘুৃমাবি?”
—“তুই কে রে শালা? আমার বোনের সাথে তোর কবে বিয়ে…”
এই মূহুর্তে পাভেলের হুঁশ ফিরতেই শোয়া থেকে বসে পড়ল। সামনে কেনীথ বিরক্তিমাখা গম্ভীর চেহারায় দাঁড়িয়ে আছে। পাভেল তড়িঘড়ি করে ফ্লোর থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ইতস্ততভাবে নিজের কোঁকড়ানো চুলের পেছনে হাত বুলিয়ে হাসতে হাসতে বলল,
“আরেহ ব্রোহ্! তুমি এসেছো বললেই তো হতো। এমনিতেই উঠে যেতাম। এভাবে…”

—“মেজাজ খারাপ না করিয়ে তারাতাড়ি ফ্রেশ হয়ে আয়। আই নিড টু টক টু ইউ—ইট’স ইম্পর্ট্যান্ট।”
পাভেলও আর দেরি না করে অতিদ্রুত ফ্রেশ হয়ে বাহিরে এলো। এরই মাঝে দুজনে বারান্দায় গিয়ে দুজনে চেয়ারে বসে কথা শুরু করার পূর্বেই, দরজা হতে ঠকঠক আওয়াজ এলো। পাভেল ভ্রু কুঁচকে ফেললেও কেনীথ নির্বিকারে উচ্চস্বরে ডাকে,
“ভেতরে আয়।”
কিছুক্ষণের মাঝেই রোজ বারান্দায় এসে দুজনকে কফি দিয়ে চলে যেতে নিলেই, পাভেল জিজ্ঞেস করল,
“তোর কি কিছু হয়েছে?”

রোজ খানিকটা ঘাবড়ে গিয়ে বলল,
“আমার আবার কি হবে ভাইয়া।”
পাভেল খানিকটা গম্ভীর চাহনিতে রোজকে দেখে নিয়ে বলল,
“কিছু না,যাওয়ার সময় রুমের দরজাটা লাগিয়ে যাস!”
রোজও একমুহূর্তও দেরি না করে বারান্দা থেকে বেরিয়ে এলো। তবে রুম থেকে বেরোনোর পূর্বেই কেনীথ আর পাভেলের কিছু কথা তার কানে এলো।কেনীথ বেশ গম্ভীর্যের সহিত পাভেলকে বলল,
“পাভেল! আনায়ার বিয়ে, শুনেছিস?”

—“কোন আনায়া?”
—“মন্ত্রী তারেক এহসানের মেয়ে আনায়া এহসান।”
—“ওহ হ্যাঁ,হ্যাঁ! কালই তো বাপ মেয়ের দুজনের কথার মাঝেই বুঝলাম, তারেক এহসান বলেছিল হয়তো আনায়ার বিয়ের কথা।”
—“হু,তোর কি মনে হয় না আমাদের কিছু করা উচিত?”
পাভেল কিছুটা হকচকিয়ে বলল,
“মানে ব্রো, তুমি বলতে চাচ্ছো…ওয়ান সেকেন্ড, তুমি কি এখনো আনায়াকে… লাইক সিরিয়াসলি? তোমার হুঁশ আছে? এসব ভাবাও পাপ হয়ে যাবে। ফুপা জানতে পারলে সোজা মে’রে ফেলবে।”
কেনীথ নির্বিকারে গম্ভীর্যের সাথে কফিতে চুমুক দিয়ে বলল,
“প্রশ্নই ওঠে না।এবার গেইমটা আমি ওর বাপের সাথে খেলতে চাইছি।”

—“মানে?”
এটুকু শুনতে শুনতেই রোজ রুম থেকে বেরিয়ে পড়েছে। সেই সঙ্গে তার চেহেরার রং-ও বদলে ফেকাসে হয়ে গিয়েছে। দুজনে কি করতে চাইছে সেটা তো তার অজানা। কিন্তু আজ সকালে ভাহিদকে চা দিতে গিয়ে, এটুকু তো বুঝেছে যে কেনীথ আর ভাহিদের মাঝে ভালো কিছু হয়নি। আর আগামীতে কি হবে সেটাও অনিশ্চিত। শুধু ভয় হচ্ছে এবারও না কোনো ঝামেলা বাঁধায় এই দুজন। রোজ আর না দাঁড়িয়ে দরজাটা বন্ধ করে চলে গেল।
অন্যদিকে কেনীথ আর পাভেলের আলোচনা অনেকটা এগিয়েছে। একটা পর্যায়ে এসে কেনীথ পাভেলকে বলল,
“বিয়েটা কার সাথে হচ্ছে, ওটার একটু খোঁজ নে তো।”

যেমন কথা তেমন কাজ। বেশি সময় লাগল না, কেনীথের কথামতো পাভেলের সব ইনফরমেশন জোগার করতে। কয়েকজনকে ফোন করতেই—সবকিছু জেনে কেনীথকে বলতে লাগল,
“পাত্রের নাম রেহান আহমেদ চৌধুরী। থাকে তো কানাডায়, কিন্তু বিয়ের জন্য হয়তো কালই দেশে ফিরেছে। আর এই রেহান আহমেদের আরেকটা পরিচয় হলো… সে মিসেস অনামিকা এহসানের একমাত্র ভাইয়ের একমাত্র ছেলে। এক কথায় তোমার কাকিমার ভাইয়ের পোলা। হিসেবে খারাপ না, ভালোই তো।”
পাভেলের পুরো কথায় কেনীথ যেন কিছুটা অসন্তুষ্ট। খানিকটা রাগান্বিত স্বরে বিরক্তির সাথে বলল,
“ও পাত্র নাকি পাত্রী, ভালো না মন্দ; এসব তোর কাছে জানতে চেয়েছি আমি?”

—“আরেহ্ বাস্! আমি খারাপ কি বললাম। যা মনে হলো তাই-ই তো…যাক গে,এটা জানো তো? অনু আন্টির ভাই কিন্তু এমপি। কপাল ভালো থাকলে দুদিন পর মন্ত্রীও হয়ে যাবে।”
—“হুম জানি,ধরা যায় তারেক এহসান ভালো জায়গাতেই টোপ ফেলতে চাইছে। দেখা যাক, জল কতদূর গড়ায়।”
খানিকটা তাচ্ছিল্যের সাথে কথাটা বলে কেনীথ কিঞ্চিৎ মুচকি হাসলো। অন্যদিকে পাভেলের কাছে কেনীথের বিষয়টা খানিকটা ধোঁয়াশার ন্যায় অজ্ঞাত রইল।

ইনায়া ঘরের কোণে চুপটি করে বসে আছে। অস্কারকে নিজের হাতের তালুতে রেখে,পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ভাবভঙ্গি বরাবরের মতোই বেশ গম্ভীর্যপূর্ণ। তবে বর্তমানে সে গভীরভাবে কিছু একটা ভেবে চলেছে।
আনায়ার বিয়ের দিন ঘনিয়ে এসেছে। বিয়েটা হলেই বোনটা তার বহু দূরে চলে যাবে। সে-ও একা হয়ে যাবে। না! সে মোটেও মন খারাপ করছে না। তার মতো মানুষ আদতে কখনো মন-খারাপ করে থাকতে পারে কিনা,তাও বোঝা মুশকিল। ইনায়ার ভাবগাম্ভীর্য সর্বদাই একইরকম থাকে। তার আচার-আচরণের ধরনেও একদম স্পষ্ট রুক্ষ ও গম্ভীর।
যদিও ইনায়া ছোট হতেই কিছুটা এমন,কিন্তু এই অল্প বয়সে তার এতো গম্ভীর্যতার পেছনে যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ঘটনাগুলো বেশ পুরোনো। আনায়া আর ইনায়া তখন অনেক ছোট। ইনায়ার সবেমাত্র বুঝ হয়েছে। অন্যদিকে আনায়া তার চেয়ে খানিকটা বড় হওয়ার পরও,কখনো আনায়াকে তার নিজের বড় বোন মনে হয়নি।
ইনায়ার বুঝ হবার পর হতেই সে খেয়াল করতো,বাকি সব বাচ্চাদের তুলনায় আনায়া অনেক বেশি দূর্বল। সে নিজে হতে বেশিরভাগ কাজই করতে পারে না। সবসময় অদ্ভুত এক ভয়ের মাঝে কাটায়। সে অন্ধকারে থাকতে পারে না, রাতে একা ঘুমাতে পারে না। যথারীতি ইনায়ার একদম ছোট অবস্থান হতেই সে তার মা-কে আনায়ার জন্য নিজের থেকে বেশিরভাগ সময় দূরে থাকতে দেখেছে।

অনিমা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আনায়াকে বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। যদিও তারেক তাকে অনেক বেশিই পছন্দ করে,কিন্তু ইনায়ার এই ব্যাপারটাই পছন্দ নয়। তার ভাবনাচিন্তা—দু’জনেই দুজনকে সমান নজরে দেখুক। তার মা ছোট হতেই মনে করেছে,আনায়াকেই তার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আর ইনায়া ছোট হলেও সে স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যক্তি। নিজের খেয়াল নিজেই রাখতে পারবে। যথারীতি ইনায়াও এসব বোঝার পর হতে, সেই অল্প বয়সেই সবার থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। সে নিজের মতো থাকতে পছন্দ করে।
আনায়া যেমন অন্ধকার সহ্য করতে পারে, তেমনি ইনায়া আলো সহ্য করতে পারে না। বেশিরভাগ সময় অন্ধকারে সে নীরবে একাই সময় পার করে।ছোট বেলায় অনিমা যখন আনায়ার সাথে আলাদা ঘরে ঘুমাতো,তখন সে ছোট্ট হতেই, সম্পূর্ণ অন্ধকার ও নিস্তব্ধ ঘরে একাকী থেকেছে। শুরুতে খানিকটা ভয় হলেও,তার মাঝে থাকা অদ্ভুত এক জেদ তাকে এই কঠোর রূপে পরিণত করেছে।

আনায়ার মতো তার এতো-এতো কোনো বন্ধু-বান্ধবীও নেই। সে ছোট হতে আজ অব্দি,এই বিষয়ে সম্পূর্ণ একা। তার পছন্দ নয়, এতো সব মানুষজনের মাঝে নিজেকে আবদ্ধ করা। তার একমাত্র বন্ধু হলো অস্কার। প্রায় অনেকগুলো বছর হতেই সে তার সাথেই থাকছে।
এছাড়া স্কুল জীবনে এক বড়সড় ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে সে। তখন কেবলমাত্র তাকে স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছে। আনায়া যে স্কুলে পড়তো,ঠিক সে স্কুলেই। যথারীতি সে আনায়া হতে ক্লাসের ক্ষেত্রেও ছোট। কিন্তু প্রতিদিন দুই বোন স্কুলে যাওয়ার পথে,তার বাবা-মা তাকে সর্বদা একটা কথা বলতো।
দুই বোন যখন একত্রে দাঁড়িয়ে, তখন অনিমা আনায়াকে বেশ আদরযত্ন করে ইনায়ার উদ্দেশ্যে বেশ স্পষ্ট স্বরে, হুকুম স্বরূপ বলতো,

“বোনের খেয়াল রাখবি। ওর যেন কোনো কিছু না হয়।”
এটা অনিমা প্রতিবারই বলতো।আর ইনায়া চুপচাপ শুনে যেত। কিন্তু সে এটা বুঝতো না, আনায়া তার বড় হওয়ার পরও কেনো, আনায়ার দায়িত্বটা তাকেই দেওয়া হচ্ছে। কই, সে-ও তো ছোট। তাহলে তাকে কেনো সবাই তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে? ইনায়া এই নিয়ে অবাক হওয়ার পাশাপাশি,তার বেশ রাগও হতো। কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে পারে, তাকে বাঁচতে হলে নিজের খেয়াল নিজেকেই রাখতে হবে। তাকে দেখার মতো তার বাবা কিংবা মা বাস্তব অর্থে কেউই নেই। একইসাথে তার বোন কিংবা পরিবারের খেয়ালটাও তাকেই রাখতে হবে।
কারণ তারেককে সে সর্বদা ব্যস্তই দেখেছে। একইসাথে তার প্রতি তারেকের এক্সপেকটেশনও যেন বরাবরই অত্যন্ত বেশি। তারেকও প্রতিবার দুজনের স্কুলে যাবার পূর্বে,তাকে বেশ বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বলতো,
“নিজের বড় বোনের খেয়াল রাখবে। ওর কোনো ক্ষতি হতে দেবে না। ওর দায়িত্বটা তোমার উপরেই দিলাম। আমি জানি তুমিই আমার একমাত্র যোগ্য সন্তান।”

এই যে ছোট হতেই দুজনের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করা হয়েছে—মূলত এই কারণেই ইনায়া নিজেকে এখন আর পাঁচটা স্বাভাবিক মানুষের মতো ভাবতে পারে না। নিজেকে তার অদ্ভুত লাগে। তার বাবা মায়ের কথামতো সে কখনো আনায়াকে হিংসা করা কিংবা ভিন্ন কোনো নজরে দেখেনি। তবে আনায়া তার বোন হলেও,সে কখনো তার সাথে খুব বেশি সখ্যতায় মিশতেও পারেনি। এটা সে কারো সাথেই পারে না। কিন্তু বোনের জন্য কিংবা পরিবারের জন্য সে সবকিছু করতে রাজি।

যেমনটা ঘটেছিল তার স্কুল জীবনের প্রথম প্রান্তে। আনায়া অনেক বেশি দুর্বল ছিলো বিধায়,স্কুলের অন্যান্য বাচ্চারা তাকে নিয়ে হাসাহাসি,মজা-ঠাট্টা করতো। আর আনায়া শুধু চুপচাপ থেকে মন খারাপ করতো। যা ইনায়ার নজরে পড়ার পর, সে নিজেকে ঐ বয়সেও আর সামলে রাখতে পারেনি। তীব্র এক আক্রোশ জাগে তার নিজের মাঝে। তবে তা কিছুদিনের জন্য দমিয়ে রাখলেও, অল্প কিছুদিনের মাথায় আনায়াকে একটা মেয়ে সিঁড়ি হতে ফেলে দেয়। যা ইনায়া তার নিজের চোখে দূর হতে দেখে ফেলে।

সেইসময় আনায়ার খুব বেশি চোট না লাগলেও,ইনায়া আর নিজেকে দমিয়ে রাখতে পারেনা। চারপাশে তখন শুনশান নিস্তব্ধতা।স্কুল ছুটির পর, বেশিরভাগ স্টুডেন্টই চলে গিয়েছে। কিন্তু সেই মেয়েটির স্টাডি বোর্ডের নোটগুলো তুলতে কিছুটা সময় লেগে যেত। যার ফলে সবাই চলে যাওয়ার পরও সে,প্রায় মিনিট দশের মতো ক্লাসেই থাকত।যে ব্যাপারটা কিছুদিন লক্ষ্য করে, ইনায়া তার নিজের পরিকল্পনা সাজায়।

স্কুল ছুটির পর সে একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মেয়েটির সাথে কথা বলতে যায়।তবে তাকে দেখে অপর বাচ্চাটি মোটেও ভয় না পেয়ে,আনায়ার নামে উল্টোপাল্টা কথা বলতে শুরু করে। এবং ইনায়া তৎক্ষনাৎ তীব্র রূপে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। যদিও তার ক্ষিপ্ততা গম্ভীর্যের মাঝে কখনো টের পাওয়া যায় না।যথারীতি সেই মেয়েটিও ইনায়ার উদ্দেশ্য বুঝতে পারেনি।এবং সুযোগ বুঝেই ইনায়া সেই মেয়েটিকে ধাক্কা দিয়ে বারান্দা থেকে ফেলে দেয়।
মেয়েটি রোগা-সোগা হওয়ায় ইনায়া পাঁচ বছরের এক বাচ্চা হয়েও, আনায়ার সেই ক্লাসমেটটকে সোজা দোতলার বারান্দা হতে নিচে ফেলে দিতে সক্ষম হয়। যা কিনা সে করেছিল সম্পূর্ণ ঠান্ডা মাথায়। সেদিন বাচ্চাটা শুধু জানে বেঁচে যায়। কিন্তু সিসিটিভি চেক করে যখন আসল ঘটনা স্কুল কর্তৃপক্ষ জানতে পারে—তখন তারা বিষয়টা তারেককে জানায়।

তারেক তখন মন্ত্রী না হলেও,রাজনীতির প্রভাবশালী এক নেতা। তার মেয়ে এতো বড় একটা কাজ করলেও,তাকে না জানিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষ তো আর বিশেষ কোনো ব্যবস্তা নিতে পারবে না। যথারীতি ইনায়াকে যখন তারেক সহ স্কুল কর্তৃপক্ষ জিজ্ঞেস করে—সে এটা কেনো করেছে। তখন সে নির্দ্বিধায় শীতল-গম্ভীর্যের সহিত উত্তর দিয়েছিল,
“ওর বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। আমার বোনের রেসপনসেবলিটি আমাকে দেওয়া হয়েছে। কেউ আমার বোনেকে কষ্ট দিলে,আমি তাকে শেষ করে ফেলব।”

তার এহেন নির্বিকার দৃঢ় অভিব্যক্তিতে সেদিন সকলেই প্রচন্ড অবাক হয়েছিল। তারেকের বিস্ময়ের রেশ যেন বহুদিন অব্দি কাটেনি। একইসাথে সে এই নিয়ে নিজের মেয়েকে বিন্দুমাত্র শাসন করেনি। উল্টো স্কুল কর্তৃপক্ষকে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, সিসিটিভি ফুটেজ সহ সকল প্রমাণ যেন গায়েব হয়ে যায়। আর সেই মেয়ে ও তার পরিবারের মুখ বন্ধ রাখতে যত টাকা লাগবে—তা দিতে সে সম্পূর্ণ রাজি।
এভাবেই নানান সময়ে নানান নেতিবাচক কাজকর্মেও,ইনায়া তার বাবাকে সাথে পেয়েছে। কখনো তারেক কোনো বিষয়ে ইনায়াকে কথা শোনানো কিংবা শাসন করার প্রয়োজন মনে করেনি। আর এভাবেই ইনায়া তৈরি হয়েছে এক ভিন্ন ব্যক্তিত্বের মানুষ হিসেবে। যার জীবনের কোনোকিছুতেই আজ অব্দি কখনো বাঁধা আসেনি।

অথচ এমন জীবন নিয়েও ইনায়ার মনে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। তার মতে,তাকে মন থেকে ভালোবাসার মতো কেউই এই পৃথিবীতে নেই। আনায়ার কারণে কখনো মায়ের আদরের অনুভব করার সুযোগ হয়নি তার।আর বাবা যেটা দেখায় সেটা আদতে কি, তা ইনায়া জানে না। কিন্তু সবচেয়ে বেশি বিরক্ত লাগে আনায়ার প্রতি তার বাবার নানান সময়ের নানান কঠোর পদক্ষেপ গুলো। কেনো যেন এসবের কোনোকিছুই তার ভালো লাগে না। শুধুমাত্র আনায়া আর সবার চেয়ে অনেক বেশি দুর্বল স্বভাবের বলেই কি, তাকে তার বাবা সঠিক মূল্যায়ন করে না? কিন্তু মনে তো হয়, তার বাবাও আনায়াকে যথেষ্ট ভালোবাসে। কিন্তু কোনো এক বিশেষ কারণে তা প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক। কিন্তু এই কারণটা কি? এমন কি হতে পারে যার জন্য তারেক তাদের দুজনকে ভিন্ন নজরে দেখে।

ইনায়া এসব ভাবতে ভাবতেই ভারী শ্বাস ফেলে। তার বাড়িতে সদস্য সংখ্যা খুবই কম। চারপাশে যা গিজগিজ করে তার সবই প্রায় সার্ভেন্ট-গার্ড। বাকি তার বাবা তো বেশিরভাগ সময় কাজেই ব্যস্তই থাকে। আর মা তো সবসময়ের মতো আনায়ার সাথেই রয়ে যায়। ফলাফলস্বরূপ কারো সাথে মন খুলে কথা বলার মতোও এখানে কেউ নেই। তবে সে কার কাছে এসবের উত্তর পাবে?
সবশেষে ইনায়া পুনরায় দীর্ঘ শ্বাস ফেলে, অস্কারের দিকে তাকিয়ে,তার উদ্দেশ্যে বলল,

“ডু ইউ নো হোয়াট? সামটাইমস আই ফিল লাইক দ্যাট, আমি তোমায় মে’রে ফেলব। অতঃপর কোনো পিছুটান না রেখে নির্জনে কোথাও হারিয়ে যাব। আই নো,আমার ফ্যামিলি হয়তো আমায় কিছুদিন খুঁজবে।কিন্তু তারা সবাই একসময় আমায় ভুলে যাবে।…বাই দ্য ওয়ে,আইডিয়াটা কেমন? আমার কি তোমায় মে’রে ফেলা উচিত?”
বেচারা মাকড়সাটা হতভম্বের ন্যায় তার অদ্ভুত চোখজোড়া দিয়ে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে রইল। সে আদৌও তার কথা বুঝেছে কিনা কে জানে। তবে ইনায়া নিমিষেই তির্যক হেসে আওড়ায়,
“ডোন্ট ওয়ারি! আ’ম যাস্ট কিডিং। আমি তোমায় কখনো মা’রব না। আমার লাইফের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোয় আমি তোমায় পাশে পেয়েছি। যত যাই হোক,ইনা এতোটাও খারা’প নয়।”

বিকেলের শেষ প্রহরে কেনীথ আর পাভেল,মুখে কালো মাক্স পড়ে, শহরের নামকরা এক ক্যাফেতে এসেছে। একজন বিশেষ মানুষ আসবে তাদের সাথে দেখা করতে। মূলত তারা সকলে কেনীথের ছোট বেলার ফ্রেন্ড। ক্লাসমেট হওয়ার পাশাপাশি, ভালো হোক বা মন্দ হোক,একসময়ের ভিভিয়ানের লিড করা সেই কুখ্যাত গাং—ডার্ক শ্যাটার্স এর সদস্যই তারা। মূলত তাদের তৎকালীন আচার-আচরণ ও কাজকর্মের কারণেই,এমন একটা নাম দেওয়া হয়েছিলো। যেখানে কেনীথের ফ্রেন্ডদের সাথে পাভেলেও কিছু ফ্রেন্ডস্ ছিল।

যদিও দুজনে জানেনা বর্তমানে সবার অবস্থা কেমন। কেননা এতো বছরে কখনোই আর তাদের সাথে যোগাযোগ হয়নি। আর আজ আবারও এক বিশেষ কাজের জন্য পাভেল তাদের খুঁজে খুঁজে যোগাযোগ করেছে।
দুজনে চুপচাপ ক্যাফের এককোণায় গিয়ে বসে রয়েছে। আশেপাশের মানুষের ভিড় খুব একটা ভালো লাগছে না। ইচ্ছে ছিলো নির্জন কোনো একটা জায়গায় যাওয়ার। কিন্তু ভাবনাচিন্তা করে এখানেই আসা হলো।
প্রায় পনেরো মিনিট অপেক্ষার পর, আচমকা পাভেলের ফোনে একটা মেসেজ এলো।তাদের দুজনকে বাহিরে যেতে হবে। দুজনে কিছুটা বিরক্ত হলেও,শেষমেশ দুজনে ক্যাফের বাহিরে চলে আসে। ওমনি রাস্তার পাশেই চারচাকা গাড়ি নিয়ে উৎসুক এক ব্যাক্তির দেখা মেলে। পরিচিত দুটো মুখ দেখামাত্রই সেই ব্যক্তি বিস্ময়ের সাথে এপ্রকার ছুটে আসে পাভেল আর কেনীথের কাছে। ততক্ষণে দুজনে নিজেদের মাক্স খুলে ফেলেছে। এবং সাদা জ্যাকেট পড়া সেই সুদর্শন পুরুষ অবাক হয়ে কেনীথকে সোজা ঝাপ্টে ধরে, তীব্র আবেগের সহিত বলে ওঠে,

“ভিভিয়ান! শ্লা তুই এখানে…এতো বছর কিভাবে কি? শ্লা বলিউড থেকে সোজা হলিউডের নায়ক হয়ে গেছোস।”
—“ব্রো তো ইউনিভার্সের নায়ক। মহাকাশের ব্ল্যাকহোলে তার হেব্বি নাম-ডাক।”
আচমকা পাশ হতে পাভেলের এহেন অভিব্যক্তিতে,কেনীথ চোয়াল শক্ত করে চোখ রাঙায়।ওমনি পাভেল কেশে,ইতস্তত ভঙ্গিতে আওড়ায়,
“ইয়ে মানে,এক্টু মজা করলাম আর কি!”
অন্যদিকে ব্যক্তটিও পাভেলের ঠাট্টায় হেসে ওঠে। অতঃপর তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তার মানে এইসব সিক্রেট গ্যাং ট্যাং এর কাহিনি সব ভুয়া? ভন্ডামি করোস মিয়া?”
পাভেল নিজের কোঁকড়ানো চুলগুলো পেছন হতে চুলকে আওড়ায়,
“সারপ্রাইজ দিলাম একটু। তোমরা যে সিরিয়াসলি নিবে ভাবিনি। যাই হোক,কেমন আছো ফারহান ভাই?”
কেনীথ একপলক পাভেল আর ফারহানকে দেখে। পরক্ষণেই ভেবে নেয়,পাভেল নিশ্চিত উল্টোপাল্টা কিছু বলেছে হয়তো।এদিকে পাভেলের কথা শুনে ফারহান তাকেও জাপ্টে জড়িয়ে বলে,
“আমি তো যাবারদাস্ত! কিন্তু তোর কি অবস্থা ছোটু?”

—“এই তো ভালোই।”
পাভেল মৃদু হেসে এহেন কথা বলতে না বলতেই,ফারহান কেনীথের দিকে তাকিয়ে পুনরায় পাভেলের উদ্দেশ্যে বলল,
“এই বেটা কি এখনো বোবাই আছে? হাবভাব সব তো দেখি আগের মতোই আছে। আল্লাহ জানে,জাউরামি কমছে কিনা।”
ফারহানের এহেন কথায় পাভেল বেশম খেল।তবে কেনীথ সম্পূর্ণ নির্বিকার। এদিকে শেষমেশ কেনীথ তার উদ্দেশ্যে বলল,
“ফারহান,আই নিড ইউর হেল্প।”
ফারহান ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“হেল্প? বলে ফেল বস, তোর জন্য সব করতে পারি। যদিও ঐবার অকাজ করে সব গর্তে চলে গিয়েছিলাম।কিন্তু তোদের প্রচুর মিস করেছি।”
কেনীথ মৃদু রুক্ষ হেসে আওড়ায়,
“চল ভেতরে গিয়ে কথা বলি।”

কেনীথ আর পাভেল দুজনেই নিজেদের মাক্সটা পুনরায় পড়ে নেয়। ওদের হাভভাব দেখে ফারহান সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“কাহিনি কি ভাই? তোরা কিন্তু জেলের আসামী-টাসামি হয়ে এসেছিস নাকি? এভাবে…শোন ভাই,আগেই বলে রাখি। আমার এখন সংসার-টংসার আছে। উল্টোপাল্টা কিছু করলে, বউ মে’রে সোজা তক্তা বানাবে।”
ফারহানের কথায় কেনীথ কপাল কুঁচকে ফেলে। এই ছেলে কাজের হলেও,বরাবরই একটু বেশিই কথা বলে। অন্যদিকে পাভেল বিস্ময়ের সাথে বলল,
“কি বড়-ভাই! বিয়েও করে ফেলছো?”

—“বিয়ে করে ফেলছি মানে…এক সেকেন্ড,তোরা কি এখনো বিয়ে-শাদি কিছু করোস নাই, নাকি?”
পাভেল বেশ মলিন মুখে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,
“না!”
ফারহানের যেন বিস্ময়ের চোখ ছানাবড়া। সে দুজনকে একঝলক দেখে বলল,
“বলিস কি,আমার তো দুইটা বাচ্চাও আছে। মেয়েটা ফাইভে আর ছেলেটা এইটে পড়ে।”
এহেন কথা শুনে পাভেল বেশম খেলো। সে কেনীথের দিকে করুন চাহনিতে তাকিয়ে বলল,
“বিগ ব্রো! মনে হয় জীবন যুদ্ধে হেরে গিয়েছি।”
নিমিষেই কেনীথের চোয়াল শক্ত হলো। সে শুধু বসে বসে দুজনের তামাশা দেখছে। অথচ তার চিন্তাভাবনা পড়ে আছে অন্য কোথাও। এরিমধ্যে ফারহান কেনীথের উদ্দেশ্যে বলল,

“বস! তুইও বিয়ে করিস নাই?”
কেনীথের নির্বিকারে গম্ভীর্যের সাথে আওড়ায়,
“নাহ্!”
ফারহান পুনরায় বেশম খেয়ে বলে ওঠে,
“খাইছেরে! তাহলে তো তুই, এখনও আনলিমিটেড জাউরাই আছিস।”
কেনীথ চোয়াল শক্ত করে, নিজেকে কোনো মতে সামলে ভারী শ্বাস ফেলে। অতঃপর ফারহানের উদ্দেশ্যে বলল,
“কাজের কথায় আসা যাক। দেশে কি তুই এখন একাই আছিস, নাকি আরো কেউ… ”

—“আছে কয়েকটা। তবে বেশিরভাগই তোর মতো দেশছাড়া হয়েছে। যে কাহিনি ঘটিয়েছিলাম। তোর বাপ-চাচা যে আমাদের জানে বাঁচতে দিয়েছে,তাই তো কপাল। যাই হোক,যেগুলো দেশে আছে ওদের বেশিরভাগই এখন বিসিএস কেডার,বস, প্রফেসর সহ হ্যানত্যান নেতাফেতা হয়ে গিয়েছে। একটা আবার পার্লামেন্টের বড় নেতা হয়েছে। মোটামুটি সবাই এখন লাইফ, ক্যারিয়ার,সংসার নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সবচেয়ে হতভাগা এখন তোরা দুইটাই।”
কেনীথ খানিকটা তির্যক হেসে বলে,

“বিয়ে করে ফিলিংস কি তোর?”
ফারহান শুরুতে কিছুটা উৎসাহিত স্বরে কিছু বলতে চেয়েও থমকে যায়।পরক্ষণেই ভারী শ্বাস ফেলে বলে,
“আর ফিলিংস! বউ তো না যেনো কালনাগিনী। জীবনটাই ত্যানাত্যান হয়ে গিয়েছে—এই বিয়ে-শাদি করে।”
তার এহেন কথায় পাভেল কিছুটা হতাশ হলো।একটু আগেই বিয়ের জন্য মনটা ছটফটিয়ে উঠেছিল। এদিকে আবারও তির্যক হেসে কেনীথ বলল,
“তাহলে আমরা হতভাগা হলাম কি করে?”
ফারহান কেনীথের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বলল,

“ঠিকই বলছিস। একদিক দিয়ে বিয়ে না করে কাজের কাজই করছিস। জীবনে প্যারা নেই। সত্যি বলতে আমারও এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে করার ইচ্ছে ছিলো না। ওইবার ঘটনা জানাজানি হবার পর, বাবা ধরে সোজা বিয়েটা করিয়ে দিলো। বিদেশ যেতে চাইলাম,সেখানেও বাঁধা দিয়ে শেষমেশ তার বিজনেস হাতে ধরিয়ে দিয়ে বসে আছে। যাই হোক,তোরা এতদিন কোন দেশে ছিলি। শুনেছিলাম তো ইউরোপে চলে… এক সেকেন্ড, তোদের না আমার কেনো যেন চেনা চেনা লাগছে।”
শেষমেশ ফারহানের এহেন কথায় কেনীথ কপাল কুঁচকে ফেলে। ফারহান তার ক্লাসমেট। আর এখন বলছে,তাদের নাকি চেনা চেনা লাগছে?

—“মানে?”
কেনীথ কপাল কুঁচকে এহেন কথা জিজ্ঞেস করতেই, ফারহান তার উদ্দেশ্যে বলল,
“না মানে,জার্মানিতে একটা মিউজিক ব্র্যান্ড আছে। ওরা বাংলাতেও মাঝেমধ্যে গান গায়। আমি শুনেছিলাম আরকি। তো তোদের কেনো জানি…আচ্ছা, মাক্সটা আবার খুল তো!”
ফারহান সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেও, কেনীথ নির্বিকারে বসে আছে। অন্যদিকে পাভেল খানিক কেশে ওঠে। এদিকে কেনীথ পুনরায় ভারী শ্বাস ফেলে,স্পষ্ট স্বরে ফারহানের উদ্দেশ্যে বলল,
“তোর হয়ে থাকলে এবার কাজের কথায় ফেরা যায়। সিরিয়াস টপিকে কথা বলব,তাই এসব অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলে সময় নষ্ট না করাই ভালো।”
ফারহানও আর কথা বাড়ানোর সুযোগ পায়না। যথারীতি সে-ও এবার গম্ভীর হয়ে বলল,
“হুম, বল।”

—“বর্তমানে দেশে যারা যারা আছে,কমবেশি সবারই হেল্প লাগবে।”
—“আচ্ছা ঠিক আছে, ওরা তোর কথা শুনলে এমনিতেই লাফিয়ে চলে আসবে। কিন্তু কাজ কি করতে হবে তাই বল।”
ফারহানের উৎসুক চাহনিতে চোখ মিলিয়ে কেনীথ অনিমেষেই তির্যক হাসে। পরক্ষণেই শীতল-গম্ভীর স্বরে আওড়ায়,
“…ওয়ান্স এগেইন, অ্যা মাস্টার গেইম!”

মন্ত্রী তারেক এহসানের বড় মেয়ের বিয়ে। অথচ এ যেন কেবল একটি পারিবারিক অনুষ্ঠান নয়, বরং রাজকীয় আয়োজনকেও যেন হার মানানো এক মহিমামণ্ডিত উৎসব। সমগ্র প্রাসাদোপম ভেন্যু ঝলমলে আলোয় আলোকিত। প্রতিটি প্রান্তে শোভিত সুসজ্জিত ফুলের বাহার। অতিথিদের পদচারণায় পরিবেশ মুখরিত। দেশ-বিদেশের বিশিষ্টজন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহল—সবার উপস্থিতি যেন এই আয়োজনকে অন্য মাত্রায় পৌঁছে দিয়েছে।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে। সকলে এখন পাত্রপক্ষের আগমনের অপেক্ষায়। আনায়ার পুরো ফ্রেন্ড সার্কেল তার পরিবার নিয়ে হাজির হয়েছে। যদিও শিখার পারিবারিক সমস্যা থাকায় একাই এসেছে। অন্যদিকে সায়েমও তাই। তার পরিবারের মানুষজনের তীব্র ব্যস্ততায় কেউই আসেনি।

এদিকে সাবার বাবার সাথে তারেকের বেশ খাতির। দুজনে একসাথে চারপাশের আয়জনের খেয়াল রাখছে। তাজিম বেচারা ফেঁসেছে সাবার চক্করে। হাতে একটা ক্যামেরা নিয়ে,এই সাবা নামক চিপকালি তথা টিকটিকির পেছনে ঘুরতে হচ্ছে। তাজিমের দেওয়া নাম অনুযায়ী সাবা একটা ‘চিপকালি’। কারণ তার শত বিরক্তিতেও,সাবা সবসময় তার সাথেই চিপকে থাকে।
শিখা বেশ আনমনেই এদিক সেদিক ঘুরেফিরে দেখছে। পরনে তার সাধারণ একটা মেরুন রঙের জামা। খুব বেশি জাঁকজমকপূর্ণ নয়। তবে ঠোঁটের কোণায় যে বিস্তৃত মুচকি হাসি ফুটে ওঠেছে,তা নিত্যন্তই অমূল্য। এরিমধ্যে সায়েম তার পাশে এসে আচমকা দাঁড়ায়। এই জায়গা টুকুতে খানিক কোলাহল কম থাকায়, শিখা নিজের খেয়ালে ডুবেছিল। কিন্তু আচমকা নিজের পাশে কারো উপস্থিততে সে খানিকটা চমকে পাশে ফিরে তাকায়।
বরাবরের মতোই সায়েম বেশ গম্ভীর ভঙ্গিতে তার পাশে দাঁড়িয়ে। ইদানীং এই ছেলেটাকে তার বেশ অদ্ভুত লাগে। কেমন যেন এক উদ্ভট ব্যাপার রয়েছে। হাবভাব তেমন স্পষ্ট নয়।
শিখা খানিক কপাল কুঁচকে তার উদ্দেশ্যে বলল,

“কি রে,তুই কেনো এখানে?”
সায়েম নিস্পৃহে শিখার দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকায়। এমনিতে সে যথেষ্ট লম্বাচওড়া হওয়ায়, শিখার মাঝেমধ্যে তার দিকে মাথা উঁচিয়ে কথা বলতে হয়।
—“কোনো সমস্যা?”
আচমকা সায়েমের এহেন শীতল-গম্ভীর কন্ঠস্বরে শিখার চোখের পাপড়ি ঝাপটে, কিছুক্ষণ সন্দিহান দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। পরক্ষণেই স্বাভাবিক স্বরে আওড়ায়,
“তোর কি কিছু হয়েছে?”
—“কি হবে?”
—“না, এমনিতেই জিজ্ঞেস করছি। তোর হাবভাব কেমন যেন।”
এই পর্যায়ে সায়েম খানিকটা কপাল কুঁচকে বলল,
“মানে?”
শিখা কিছু একটা বলার জন্য উৎসুক হলেও,পরক্ষণেই কি যেন ভেবে চুপ হয়ে যায়। এবং তৎক্ষনাৎ নজর ফিরিয়ে বলল,

“না কিছু না।”
দুজনের মাঝে কিছু সময়ের জন্য নীরবতা জমে যায়। তবে এবার সায়েমই নীরবতা ভেঙে আওড়ায়,
“তোর বাড়িতে সব ঠিকঠাক চলছে?”
শিখা খানিকটা মলিন হেসে আওড়ায়,
“ওসব আবার কোন কালে ঠিক ছিলো?একে তো মেয়ে মানুষ, তার উপর কালশিটে কাইল্লা চেহেরা আমার। পরিবার বোঝা ভেবে যে অন্য কারো ঘাড়ে চাপিয়ে দেবে,এমন অবস্থাও নেই।”
শিখার এহেন কথা শুনে সায়েম কপাল কুঁচকে বলল,
“মানে? পরিষ্কার করে কথা বল।”
শিখা ভারী শ্বাস ফেলে সায়েমের উদ্দেশ্যে বলল,

“ছোট বেলায় মা ম’রে যাওয়া জীবনের সবকিছুই উলোট পালোট হয়ে গেল। বাবা তখন তখনই বিয়ে করল। ঘরে সৎ মা আর ভাই বোন এলো। আমি হয়ে গেলাম বাড়ির আবর্জনা। অবশ্য আবর্জনাই বটে, ধবধবে সাদা চামড়া না হওয়ায় এখন লোকেও পছন্দ করেনা। বারবার দেখতে এসে সম্বধ ফিরিয়ে দেয়। ঐ তো,এসব নিয়েই এখন কথা শুনতে হচ্ছে।”
সায়েম খানিকটা সময় হতভম্বের ন্যায় তার দিকে তাকিয়ে রইল। তার ফ্রেন্ড সার্কেলের কমবেশি সবাই শিখার পরিবার সম্পর্কে জানে। কিন্তু হঠাৎ শিখার বিয়ের ব্যাপারটা যেন তার মোটেও পছন্দ হলো না। আচমকাই সে রুক্ষ গম্ভীর স্বরে বলে ওঠে,

“এখনই কেনো বিয়ের প্রসঙ্গ আসছে? তোর বিয়ের বয়স হয়েছে?”
সায়েমের এহেন কথা শুনে, শিখা তার দিকে হতভম্বের ন্যায় তাকায়। পরক্ষণেই ফিঁচকে হেসে বলে,
“তুই পাগল? আমার বয়স হয়নি তো আনায়ার হয়েছে? তুই কার বিয়েতে এসেছিস রে পাগলা?”
সায়েম কোনো জবাব দেয় না। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর সে অকস্মাৎ বলে ওঠে,
“তুই বিয়ে করবি না।”
শিখা কপাল কুঁচকে বলে,
“মানে?”
সায়েম পুনরায় নির্বিকারে আওড়ায়,
“তোর এখনই বিয়ে করার প্রয়োজন নেই। তোর ফ্যামিলিকে বোঝা। কিন্তু তবুও তুই এখন বিয়ে করবি না। যখন সঠিক সময় আসবে, তখন করবি।”
নিজের মতো এহেন কথা নির্বিকারে বলেই,সায়েম স্থান ত্যাগ করে চলে যেতে লাগল। অন্যদিকে পেছন থেকে শিখা তার দিকে হতভম্বের ন্যায় তাকিয়ে, বিস্ময়ের সাথে আওড়ায়,
“এ পাগল নাকি?”

এদিকে আলো আর রনক কিছুটা লাভ বার্ডস এর মতো এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছে। দুজনেরই পরিবার এসেছে।যার ফলে চেয়েও দুটো কাছাকাছি ঘেঁষতে পারছে না। কারো নজরে পড়ে গেলে ঝামেলা। তবে আগ বাড়িয়ে বন্ধুত্বের পরিচয়ে,উভয়ই নিজেদের বাবা-মায়ের সাথে একে-অপরকে পরিচয় করাতে ব্যস্ত। কিছুক্ষণ আগেই অবশ্য সবাই মিলে আনায়ার সাথে দেখা করে এসেছে।
দোতলায় নিজের রুমে আভিজাত্যপূর্ণ বিয়ের সাজসজ্জায় প্রস্তুত হয়ে বসে রয়েছে আনায়া। পরনে গাঢ় লাল রঙের লেহেঙ্গা। গা ভর্তি সোনা-হীড়ের অলংকার। এতসব জিনিস পড়ে বসে থাকতে অস্থির লাগলেও, অদ্ভুত ভালোলাগাও কাজ করছে। অবশেষে দেখতে না দেখতে,বিয়ের দিনটা চলেই এলো। যদিও সবাইকে ছেড়ে যেতে হবে ভেবে, মনটাও বেশ মিইয়ে রয়েছে।
বর্তমানে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যারাত হলো। অথচ পাত্রপক্ষ হিসেবে রেহানরা এলো না।আবার এখানে একা একা বসে থাকতে বেশ বোরিংও লাগছে। শেষমেশ আনায়া আর উপায় না পেয়ে, বানির সাথেই গল্প-আলাপ করতে লাগল। বানিও তো তার সাথেই যাবে। নতুন জায়গা, নতুন অনুভূতি সম্পর্কে তো বানিকেও জানানো প্রয়োজন। একা ঘরে এভাবেই সে বসে বসে আনমনে নিজের মতো সময় কাটাতে লাগল।

জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের বাড়ির চারপাশে বিশেষ নিরাপত্তার ব্যবস্তা করা হয়েছে। যত যাই হোক,রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত মানুষদের আনাগোনা রয়েছে এখানে। সেক্ষেত্রে কখন কি হয়ে যায়, কে জানে!
কিন্তু এরিমধ্যে অতিথির ভিড়েই বাড়ির মেইন গেইটের সামনে, চকচক কালো রঙের এক মার্সিডিজের জি-ওয়াগন এসে দাঁড়ায়। যার সম্মূখে মার্সিডিজ এর চকচকে লোগোর পাশাপাশি ভ্যাম্পয়ার সিরিজের স্পেশাল সিগনেচার ‘V-kore’ লোগো জ্বলজ্বল করছে। কিছু সময়ের মাঝেই, গাঢ় লাল রঙের ইন্টেরিয়র হতে বেরিয়ে এলো,কালো পাঞ্জাবি পড়া এক বলিষ্ঠ দেহের সুদর্শন।

কাঁধ অব্দি ছেয়ে যাওয়া চুলগুলো বেশ পরিপাটি করে গুছিয়ে, অর্ধেকটা পেছনের দিকে মেসিবান করে বাঁধা। আর বাদবাকি সামনের চুলগুলো কপালের একপাশে এলোমেলো ভাবে পড়ে রয়েছে। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, বিয়ে বাড়ির এমন আয়জনে ব্যক্তির মুখে কালো রঙের সাধারণ মাক্স! হয়তো সচারাচর কারো নজরে না পড়ার জন্যই তার এই বিশেষ কায়দা।
তাকে দেখামাত্রই, গার্ড সারির মাঝে একজন—গেইট হতে প্রায় নিজেকে আড়াল করেই তার কাছে এগিয়ে এলো।পরনে তার কালো রঙের ইউনিফর্ম। মুখটাও বেশ ক্যাপ আর ম্যাক্স দিয়ে ঢাকা। এবং সে এসেই, কালো পাঞ্জাবি পড়ুয়া ব্যক্তির কানের কাছে ফিসফিসিয়ে আওড়ায়,
“ভিভিয়ান! সবকিছু ম্যানেজ হয়ে গিয়েছে। তুই চুপচাপ ভেতরে চলে যা। বাড়ির পেছনের গেইটে ছদ্মবেশে সব আমাদের লোক। ফারহানও রয়েছে। তোর কাজ ওখান দিয়েই সাড়তে হবে। আর সিসিটিভি কন্ট্রোল রুমেও আমাদের লোক পাঠিয়ে দিয়েছি। ওদের সাথে পাভেল কানেক্টেড আছে। কাজ সারতেই সবকিছু গায়েব করে দেবে।”
তার কথায় কেনীথ বিস্তৃত মুচকি হাসে। এই ছদ্মবেশী গার্ড আর কেউ নয় বরং তার সেই ডার্ক শ্যাটার্স গাং এর সদস্য ও ছোট বেলায় বন্ধু আরাফ। মূলত বর্তমানে পুরো বাড়ি ও সীমানার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোয়, তার বন্ধুরা ও বিশেষ লোকরা ছদ্মবেশে অবস্থান করছে।

একইসাথে তারা সবার আগে সরিয়েছে ভাহিদকে। কেনীথের এক বন্ধু পার্লামেন্টের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হওয়ায়,কৌশলে সে ভাহিদ এহসানকে গতকালই বিশেষ কাজে দেশ ছাড়া করেছে।এটা মূলত কেনীথের নিজস্ব পরিকল্পনা ছিলো। তারেককে অন্তত সরাতে না পারলেও,তার বাবাকে এসব থেকে দূরে রাখাটা প্রয়োজন ছিলো। এবং সে তাই করেছে। কম করে হলেও,ভাহিদ এখন দেশের বাহিরে সপ্তাহের বেশি সময় পার করবে। আর এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে, তারা নিজেদের পরিকল্পনাও বেশ সফলভাবে সম্পন্ন করে ফেলবে।
কেনীথ আর বেশি দেরি করল না। মানুষজনের ভিড়ের মাঝে মিশে গিয়ে,সরাসরি বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করল। চারপাশে মানুষজন গিজগিজ করছে। মূলত সিকিউরিটির জন্য গেইটেরই সবার চেকিং করা হচ্ছে। তাই আরাফের সহয়তায় ভেতরে প্রবেশে তার একটুও অসুবিধা হলো না।

কেনীথ নিজের মাথাটা খানিক ঝুঁকিয়ে,চারপাশে একপলক নজর বুলিয়ে নেয়। পরিচিত অনেককেই নজরে পড়ছে। তবে সবার আগে নজর পড়ল তার দূরের কোণায় গেস্টদের সাথে দাঁড়িয়ে থাকা তারেক এহসানের দিকে। কেনীথ খানিকটা তির্যক হেসে,এবার সরাসরি দোতলার দিকে এগিয়ে যায়। সহজে কারো নজরে না পড়তে,তাকে বেশ সর্তকতাও অবলম্বন করতে হলো। কিন্তু শেষ অব্দি দোতলায় পৌঁছে সে বিস্তৃত মুচকি হাসল।
আনায়ার রুমটা কোনদিকে, এটা সে জানে। তা এই ক্ষেত্রেও তাকে বেশি একটা ভাবনাচিন্তা করে সময় নষ্ট করতে হলো না। তার বন্ধুরা ও তাদের লোকজন গতকাল হতে সার্ভেন্ট,গার্ড ও ডেকোরেটর সহ বিভিন্ন ছদ্মবেশে বাড়িতে অবস্থান করছে। যথারীতি বাড়ির প্রতিটা কোণা হতে সর্বস্তরের সবকিছু সম্পর্কে—তারা আগেই সব ধারণা নিয়ে রেখেছে।

কেনীথ আর দেরি না করে সরাসরি আনায়ার রুমের কাছে এগিয়ে যায়।আলগোছে দরজা ঠেলে দিতেই, নজরে পড়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রাজকীয় সাজসজ্জায় সজ্জিত বিয়ের কনে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে, খানিকটা ঝুঁকে সে কারো সাথে কথা বলছে। একইসাথে নিজের সাজসজ্জা খানিক গুছিয়ে নিচ্ছে। তবে কেনীথের বুঝে আসল না,আনায়া কথা বলছে কার সাথে!
পরক্ষণেই মনে পড়ল,হয়তো ফোনে রেহানের সাথেই কথা বলছে। কেননা তখনও তার নজরে বানি আসেনি। ফলাফলস্বরূপ অজানা এক কারণে, নিমিষেই তার চোয়াল শক্ত হলো। তবুও নিজেকে শান্ত রেখে সে পুরোপুরি রুমের ভেতরে প্রবেশ করে। এবং আলগোছে দরজাটা ঠেলে লক্ করে দেয়।
এদিকে রুমের ভেতরে কারো উপস্থিতি টের পেতেই, আনায়া স্বাভাবিক ভাবেই পিছনে ফিরে তাকায়। সে ভেবেই নিয়েছে হয়তো তার বন্ধুদের মাঝে কেউ এসেছে। যথারীতি সেই ভাবনায়,আনায়া আনমনেই বলে ফেলে,
“রেহান ভাই এসে গিয়েছে?”

এহেন কথা বলতে না বলতেই আনায়া থমকে দাঁড়ায়। চোখের সামনে অজ্ঞাত এক ব্যক্তিতে দেখে তার যেন হুঁশ উড়ে গেল। এই লোক আবার কে? আর এভাবে মাক্স পড়েই বা কেনো এখানে এসেছে? এরিমধ্যে কেনীথ তার উদ্দেশ্যে বেশ নির্বিকার ভঙ্গিতে আওড়ায়,
“তারা মাই ব্লাড!”
নিমিষেই আনায়া সম্পূর্ণ মূর্তির ন্যায় স্তব্ধ হয়ে যায়। তার নজর পড়েছে দরজার দিকে। এই লোক ঘরে প্রবেশ করেই দরজা লাগিয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় বিষয়, ইনি তাকে এই নামে কেনো ডাকল? এই অজ্ঞাত ব্যক্তি কি করে জানল,তার নাম ‘তারা’। এই নাম তো তার বাবা-মা ব্যতীত হয়তো ইনায়াও এখন অব্দি জানে না। অথচ ইনি কি করে জানলো?
আনায়া খানিকটা ঢোক গিলে পেছনের দিকে কয়েক’পা পিছিয়ে গিয়ে,ভীতু স্বরে আওড়ায়,
“কে আপনি?”

আনায়ার এহেন কথায় কেনীথ মাস্কের আদলেই বিস্তৃত মুচকি হাসে। এবং আচমকাই তার প্যান্টের পকেট হতে কিছু একটা বের করে। অতঃপর দু-হাতে নিজের পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে নেওয়ার ভঙ্গিতে, আনায়ার দিকে দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসতে আসতেই আওড়ায়,
“আ’ম ইউর ওয়ান এন্ড অনলি লাইফটাইম হাবি।”
আনায়া মন-মস্তিষ্ক জানান দিয়েছে,এই লোক সুবিধার নয়। নিমিষেই সে প্রচন্ড ঘাবড়ে যায়। আর অতিরিক্ত ঘাবড়ে গেলে তার শ্বাসকষ্ট উঠে যায়। এবং ঠিকভাবে কথাও বলতে পারে না। তবুও সে নিজেকে এই সময়টুকু সামলে রেখে,এই অজ্ঞাত ব্যক্তির হাত থেকে বাঁচার জন্য এদিক সেদিক ছোটাছুটি করতে চাইলে—কেনীথ তৎক্ষনাৎ আনায়ার কাছে ছুটে এসে, তাকে খপ করে আঁকড়ে ধরে ফেলে।

—“সরি বেইবি,বাট ডোন্ট ডু দিস।”
শীতল-গম্ভীর স্বরে কেনীথ এহেন কথা বলতেই,আনায়া আরো বেশি ঘাবড়ে যায়। সে চেঁচিয়ে উঠতে চাইলে,কেনীথ তখন তখনই তার মুখের মাঝে ক্লোরোফর্ম মেশানো রুমালটা চেপে ধরে। এবং ক্ষণিকের মাঝেই আনায়া সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে কেনীথের কোলে ঢলে পড়ে। কেনীথ আনায়াকে নিজের বিস্তৃত বুকের সাথে মিলিয়ে,তার নিষ্পাপের ন্যায় মুখশ্রীর দিকে তাকিয়ে আওড়ায়,
“এখন দেখি,তোর বাপ-চাচায় কি করে।”

শুধুমাত্র একটা মোটা রশি আর বাড়ির পিলারের সাহায্যে, আনায়া সহ বারান্দা বেয়ে নিচে সামনে কেনীথের বেশ বেগ পেতে হলো। তবুও সে সফল। যা তার বিস্তৃত হাসিতেই স্পষ্ট।
কেনীথ আর দেরি না করে, দ্রুত আনায়াকে নিয়ে বাড়ির পেছনের গেইটের দিকে এগিয়ে যায়। এখানে যতগুলো গার্ড রয়েছে সবগুলোই কেনীথ ও তার বন্ধুদের লোকজন। তার নিজের বন্ধুও রয়েছে কয়েকটা। একবার কেনীথ আনায়াকে নিয়ে বাড়ির সীমান ছাড়লে,তারাও সব তৎক্ষনাৎ এখান থেকে পালাবে। আগে যাই করতো না কেনো,তাতে পরিবার আর বাবা-মায়ের সম্মানের জলাঞ্জলি হতো।তখন সেই বয়সে,এসব বিষয়ে মাথা না ঘামালেও, এখন নিজের পরিবার আর মানসম্মান রয়েছে। আগেরবারের মতো প্রাণপ্রিয় বন্ধুর চক্করে ধরা পরলে,আর বাঁচার সম্ভাবনা নেই।
এদিকে কেনীথ আনায়াকে পাজকোলে নিয়ে গেইট পার হতেই, ফারহান সহ তার বাদবাকি বন্ধুদের সাথে তার দেখা হয়। কেনীথ সবার দিকে একপলক তাকিয়ে আওড়ায়,

“থ্যাংকস্ টু এভরিওয়ান।”
তার কথায় সকলেই নিস্পৃহে মুচকি হেসে আওড়ায়,
“এতো বছর পর তোর জন্য আবারও আমরা একসাথে। সে জাউরামিই হোক না কেনো,তোর জন্য যে আবারও কিছু করতে পারলাম তাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার।”
এরিমধ্যে ফারহান কেনীথের দিকে কিছুটা এগিয়ে এসে,একপলক কেনীথের কোলে থাকা আনায়াকে দেখে পরক্ষণেই কেনীথের দিকে তাকায়। এবং কিছুটা ঢোক গিলে আওড়ায়,
“যাই করিস ভাই। আগের মতো কিছু করিস না। ঘরে আমার নিজেরও এখন মেয়ে আছে। বাপ হয়ে একটু হলেও বুঝি। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমরাও চাই তুই নিজেও এখন জীবনে সফল হো। যা সুখে থাক,তবে ধরা খাইস না। তোর বাপ-চাচা যা জিনিস৷ তোর সাথে সাথে আমাদেরও শেষ করে ফেলবে।আর আমার জন্য তো আমার বউই যথেষ্ট। এক্টু যদি টের পায়, তাহলেই আমি শেষ।”

কেনীথ আর কথা বাড়ায়। নির্বিকারে সে তার উদ্দেশ্যে আওড়ায়,
“ডোন্ট ওয়ারি। এবার অন্তত আমার জন্য—তোদের কিছু হবে না।”
কেনীথ এহেন নির্বিকার কথাতেও ফারহান স্বস্তি পেল না। বাকিদেরও তীব্র সংশয় রয়েছে। না জানে,কপালে কি আছে। এদিকে ফারহান আবারও বলল,
“আল্লাহ ভরসা,দেরি করে লাভ নাই। যা এখন।”

এই বলেই তারা নিজেরাই বাড়ির পেছন গেইট দিয়ে বেরিয়ে পড়ে। একইসাথে কেনীথও গিয়ে আনায়াকে নিয়ে নিজের গাড়িতে চড়ে। আনায়াকে নিজের পাশের সিটে বসিয়ে,সে ড্রাইভিং সিটে বসে ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়। তার সাথে বাকিরাও অন্যান্য নিজস্ব গাড়িতে চড়ে,যার যার গন্তব্যের জন্য প্রস্তুত হয়। কেউই এখন আর একসাথে থাকবে না। কিংবা একত্রে গিয়ে জড়োও হবে না। সবাই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে দেশের একেক প্রান্তে গিয়ে কয়েকদিনের জন্য কাজের বাহানায় আড়াল হবে। অতঃপর সব স্বাভাবিক হতেই,পুনরায় নিজেদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবে।
মোটামুটি মূখ্য প্ল্যান তাদের এটাই। যথারীতি কেনীথের সাথে শুধু পাভেল যাবে। যদিও সে এখনও বাড়ির ভেতরে বিশেষ কাজে ব্যস্ত। কিন্তু ক্ষনিকের মাঝে সে-ও চলে আসবে। আর অন্য গাড়িতে করে তাদের নির্দিষ্ট গন্তব্যে গিয়েই পৌঁছাবে।কিন্তু এছাড়াও তাদের আরো এক পরিকল্পনা রয়েছে। কেনীথ সহ সবাই মিলে তারেকের জন্য এক বিশেষ আয়োজন করেছে। সেটা কি এবং কেনো করা হয়েছে তা খুব দ্রুতই সকলে বুঝে যাবে।

কেনীথ অচেতন আনায়ার সিট বেল্ট বেঁধে দিয়ে, কিছুটা সময় তার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। পরক্ষণেই নিজের মাক্সটা খুলে ভারী শ্বাস ফেলে,গাড়ি স্টার্ট দেয়। কেনীথ স্টিয়ারিং হুইল ধরে হঠাৎই ব্রেক কষে গাড়িটাকে একেবারে ঘুরিয়ে নেয়। টায়ারের ঘর্ষণে ধুলো আর ছোট ছোট পাথর উড়ে—নিমিষেই চারপাশ যেন কালো ঝড়ের ন্যায় আঁধারে ঢেকে যায়। গাড়ির হেডলাইটগুলো গর্জে ওঠে তীব্র ঝলকানিতে। মুহূর্তেই ইঞ্জিনের শব্দ ক্রমশ গর্জিত হয়।

অতঃপর ধুম করে পেছনের চাকা ঘুরিয়ে, গাড়ি ছুটে চলে সামনের দিকে। ঠিক তার পেছনেই থাকা বন্ধুদের গাড়িগুলোও সমানতালে ইঞ্জিনে গর্জন তোলে, একসাথে ধোঁয়া উড়িয়ে দেয় তীব্র গতিতে। তাদের ঝলমলে হেডলাইট আর লাল টেইল লাইট—অন্ধকার চিরে ছুটে যাচ্ছে যেন হিংস্র শিকারিদের এক দল। বয়স হয়তো প্রত্যকেই বেড়েছে, কিন্তু ছোট বেলা হতে যৌবনের সেই টগবগে তাগড়া যুবকের ন্যায় যে তারা শহর দাপিয়ে বেড়িয়েছে—তা তো আর মিথ্যে নয়। যথারীতি ডার্ক শ্যাটার্স খ্যাত এই গ্যাং এখনোও ভদ্রতার ছদ্মবেশে একই রয়ে গিয়েছে।
আর এরিমধ্যে, ঠিক তখন তখনই বাড়ির পেছনে থাকা বিশাল মাঠের একপাশটা কেঁপে ওঠে। বিকট আওয়াজে বি*স্ফোরণ হয়। মুহূর্তেই আগুনের লেলিহান শিখা রাতের আকাশ চিরে উঠে যায়। আগুনের ঝলক আর ধোঁয়া একসাথে ছড়িয়ে পুরো পরিবেশটাকে করে তোলে যুদ্ধক্ষেত্রের ন্যায়। বিস্ফোরণের প্রতিধ্বনি এমন ভাবে কানে বাজতে থাকে যেন, সম্পূর্ণ পৃথিবী কেঁপে উঠছে।

মহামায়া পর্ব ৭

কেনীথ মুহূর্তের জন্য রিয়ারভিউ মিররে তাকায়—তার চোখে দৃশ্যটা ঠিক যেন এক অঘোষিত যুদ্ধের সূচনা। এরপর আবারও সামনের রাস্তার দিকে চোখ স্থির করে স্টিয়ারিং আরও শক্ত করে ধরে। গাড়ির স্পিড তীব্র গতিতে বাড়িয়ে, অচেতন আনায়ার দিকে তাকায়। এবং অনিমিষেই তির্যক হেসে আওড়ায়,
“ইউ আর মাই ফা”কিং চেরি ব্লাস্ট।”

মহামায়া পর্ব ৯