মহামায়া পর্ব ৯
তুশকন্যা
অকস্মাৎ বিকট শব্দে বাড়ির সকলেই হতভম্ব হয়ে যায়। গার্ডরা সকলেই দৌড়ে যায় বাড়ির পেছনের মাঠের দিকে। বাড়ির ভেতরে থাকা তারেক বিস্ময়ের সহিত বেড়িয়ে আসে। এবং আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখতে পায়,আগুনের ন্যায় লেলিহান ঝলকানি। সকলেই স্তব্ধ মূর্তির মতো হয়ে, বোঝার চেষ্টা করে—এই মূহুর্তে ঠিক কি হয়ে গেল?
চারপাশে সবার ছোটাছুটি শুরু হয়ে গিয়েছে। কেউই এখন অব্দি স্বাভাবিক হতে পারেনি। কে কোনদিকে দিশেহারা হয়ে ছুটছে,কেউই জানে না। এরিমধ্যে কয়েকজন গার্ড এসে তারেককে জানায়—এই মূহুর্তে যা ঘটেছে,তা কোনো আসল বোম নয়।তাই বিশেষ কোনো ক্ষতি হয়নি। তবে এটা কেউ ইচ্ছে করেই করেছে।
যথারীতি এবার তারা তারেকের কথামতো সিসিটিভি ফুটেজ চেক করতে চলে যায়। অন্যদিকে তারেক নিজের মতো কিছু একটা ভেবে চলেছে। তার বাড়িতে এমন বিশেষ একটা আয়োজনের মাঝে,এতো নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরও, কেউ কি করে এই ঘটনা ঘটালো? আর কারই বা দুঃসাধ্য হলো এমন একটা কাজ করার?
এদিকে সবাই যখন এতো বড় ঘটনায় হতভম্ব হয়ে,নিজের মতো ভাবনায় মগ্ন—তখন বাড়ির বিস্তৃত ছাঁদের এককোণে,স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে এক অল্প বয়সী মেয়ে। সিল্কি চুলগুলো তার কাঁধ অব্দি ছড়িয়ে। বিয়ের আয়োজনেও তার পরনে কালো রঙের স্ট্যান্ডার্ড ডিজাইনের সাধাসিধা গাউন। নিজের বোনের বিয়েতেও তার বিশেষ কোনো সাজসজ্জা নেই।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
ইনায়া অস্কারকে নিজের কাঁধে বসিয়ে,প্রায় বেশ খানিকটা সময় ধরে, ছাঁদেই একা একা ঘুরঘুর করছিল। এতো সব মানুষের মাঝে তার অনেক বেশি অস্বস্তি হয়। এছাড়া সে যে নিচে নেই,তা-ও হয়তো কারো খেয়ালে নেই। এমনই ভাবনায় কিঞ্চিৎ তাচ্ছিল্যের সহিত হেসে, সে বাড়ির ছাঁদের পেছনের দিকটায় এগিয়ে যায়। এবং রেলিং ধরে দাঁড়ায়।
বাড়ির পেছন গেইট হতে দূরের রাস্তার দিকে নজর পড়তেই সে স্তব্ধ হয়ে যায়। ভ্রু কুঁচকে সে বোঝার চেষ্টা করে, ওদিকেটায় আসলে কি ঘটছে। তবে সে সবটা বুঝে ওঠার আগেই,সবগুলো মানুষজন নিজেদের গাড়িতে চড়ে পেছনের রাস্তা দিয়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে এগিয়ে চলে। এবং তার কিছুক্ষণের মাঝেই অকস্মাৎ মাঠের একপাশে বিকট শব্দে সে পুনরায় থমকে যায়। সবাই যখন বোঝার চেষ্টা করছে,এটা কি হলো। তখন ইনায়া কি যেন ভেবে দ্রুত ছাঁদ থেকে নেমে পড়ে। অতঃপর ছুটে সোজা আনায়ার রুমের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল।
চারপাশে মানুষ তীব্রভাবে ছোটাছুটি করছে। আর এরইমাঝে আচমকা তার কারো সাথে জোরেসোরে ধাক্কা লাগল। নিমিষেই ইনায়া চোখ-মুখ খিঁচে পড়ে যেতে নিলে,সেই ব্যক্তিটি তার কোমড়ে হাত পেঁচিয়ে আঁটকায়। ইনায়া চোখ খুলে ঝাপসা নজরে তাকাতেই দেখে,কালো রঙের হুডি-মাক্স পড়া এক লম্বাচওড়া পুরুষ অবয়ব।
এবং সে নিজেকে সামলে নেওয়ার পূর্বেই ব্যক্তিটিকে তাকে ছেড়ে দিয়ে দৌড়ে অন্যদিকে ছুটে পালায়। ইনায়া হুট করেই সন্দেহের বশে ব্যক্তিটির পেছনে দৌড়াতে নিয়েও,থেমে যায়। এনাকে সে ধরতে পারবে না। কিন্তু তার সন্দেহ যদি ঠিক হয় তবে,তারও বুঝতে বাকি নেই যে—এখানে কি ঘটেছে আর কারা ঘটিয়েছে। যথারীতি সে দ্রুত পায়ে আনায়ার ঘরে এগিয়ে যায়। এবং যা ভেবেছিলো ঠিক তাই হয়েছে। নিমিষেই তার চোয়াল শক্ত হয়। সে ছুটে নিচে চলে আসে।
তারেক হতভম্বের ন্যায় লোকজনের সাথে রাগারাগি করছে। মাথায় ঢুকছে না, তার এতো সর্তকতার পরও কেউ এসব কিভাবে করতে পারলো? মিডিয়ায় একবার এইসব খবর পৌঁছানো মানে, লোকজন তারেকের মন্ত্রী পদ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করবে। যে ব্যক্তি নিজের মেয়ের বিয়েতেই যথাযথ নিরাপত্তা দিতে অক্ষম, সে ব্যক্তি দেশের জনগণের কোন কাজে লাগবে?
এদিকে ইনায়া বেশ তীব্র কন্ঠে তারেকের উদ্দেশ্যে আওড়ায়,
“বাবা! রুমে…”
ইনায়ার কথায় শেষ হবার পূর্বেই, তারেক ধমকে তার উদ্দেশ্যে বলে,
“বিরক্ত করো না ইনায়া। পরে কথা…”
—“বাবা! রুমে আপু নেই।”
তারেকের কথা শেষ হওয়ার আগেই, ইনায়া জোর গলায় এহেন কথা বলতেই—তারেক বিস্ময়ের নজরে তার দিকে তাকায়। আশেপাশের সকলে দুজনের দিকে তাকিয়ে। পাশে অনিমা কিংবা আনায়া বন্ধুমহলও অবাক চাহনিতে ইনায়াকে দেখছে। এদিকে তারেক তার উদ্দেশ্যে কপাল কুঁচকে বলল,
“নেই মানে? আনায়া কোথায়?”
—“জানি না, তবে আপুকে ওরা তুলে নিয়ে গিয়েছে।”
তারেক সহ সবার মাথায় যেন বাজ পড়ল। এসব কি বলছে? তারেক রেগেমেগে আরো কিছু বলবে,তার পূর্বেই ইনায়া ছাঁদে দাঁড়িয়ে, নিজ চোখে দেখা সব ঘটনা খুলে বলল। যা শুনে, তারেক বিস্ময়ের সহিত বলল,
“এটা তুমি আমায় এখন বলছো ডাফার? কোথায় গিয়েছে ওরা। এই সবাই চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যাও। পুলিশ কিংবা হাইওয়ে পুলিশ—সবার কাছে খবর পাঠাও, কোনো গাড়িই যেন এই শহর থেকে বের হতে না পারে।”
তারেক আবারও উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতেই, ইনায়া কিছুক্ষণের জন্য থেমে তার উদ্দেশ্যে বলল,
“বাবা! আরো একটা বিষয় জানানোর আছে।”
তারেক কপাল কুঁচকে তার মুখের ভাবভঙ্গি দেখে, সন্দিহান স্বরে আওড়ায়,
“কি?”
—“যারা আপুকে তুলে নিয়ে গিয়েছে,ওরা হয়তো ভাহিদ এহসানের ছেলে আর ভাগ্নে। যদিও ওরা বেশ কয়েকজন ছিলো।”
ইনায়া এহেন কথা বলে নির্বিকারে তাকিয়ে রইলেও,বাদবাকি সকলে স্তব্ধ মূর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে। অনিমা কপাল কুঁচকে ইনায়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“তুই এটা এতো নিশ্চিত হয়ে কিভাবে বলছিস? তুই কি ওদের মুখ দেখেছিস?”
ইনায়া নিজের মায়ের দিকে একপলক তাকায়। তবে কোনো জবাব না দিয়ে, পুনরায় তার বাবার দিকে তাকায়। এরিমধ্যে সিসিটিভি কন্ট্রোল রুম হতে কয়েকজন, তার কাছে এলেই—তারেক উদ্বিগ্নতায় সহিত বলল,
“কি হলো? ফুটেজে কিছু দেখা গিয়েছে…”
তার কথা শেষ হবার পূর্বেই, লোকগুলো জানায়—সিসিটিভিতে একটা ফুটেজেও আর নেই। কেউ সেসব হ্যাক করে নষ্ট করেছে। তারেক আরেক দফায় স্তব্ধ হয়ে যায়। চোয়াল শক্ত করে, হাতের মুঠো দৃঢ় করে।পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা তার পারসোনাল এসিস্ট্যান্ট সাফিনের উদ্দেশ্যে বলল,
“সাফিন! প্রেস ডাকো। ঐ জানোয়ারের বাচ্চাদের আমি এবার ছাড়ব না। আমার জান দিয়ে হলেও,ওদের শেষ করে ছাড়বো।”
তার এহেন কথায় সবচেয়ে বেশি ঘাবড়ে গেল অনিমা। যে ভয়টা পেয়েছিলো,ঠিক তাই হলো। আবারও সেই পুরোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি। নিজের মেয়েকে নিয়েও এখন তার তীব্র দুশ্চিন্তা হচ্ছে। না জানে, ওর সাথে এবার কি হবে।
এদিকে তারেক তীব্র ক্ষিপ্রতায়, দাঁতে দাঁত পিষে চাপা স্বরে মনে বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়,
“ভাহিদ এহসান! প্রিয় বড়ভাই! তোমার আমার অবশিষ্ট সম্পর্কটুকুও হয়তো এবার, সারাজীবনের মতো ধ্বং’স হয়ে যাবে। কিন্তু আমি বেঁচে থাকতে অন্তত,এবার আর তোমার ছেলেদের ছাড়ব না।”
সবাই যখন নিজেদের ভীতি-ভাবনায় ব্যস্ত। ঠিক তৎক্ষনাৎ ভিড়ের মাঝে এক ভদ্র বেশের সুদর্শন আলগোছে, খানিকটা দূরে সরে গিয়ে আড়াল হয়। অতঃপর দ্রত গতিতে কাউকে ফোন করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
পাভেল বাড়ি হতে বেড়িয়েই, সোজা পেছন রাস্তা দিয়ে নিজের বাইক নিয়ে আড়মোড় করে ছুটে চলেছে। একবার ধ’রা পড়লে জীবনটা এখানেই শেষ হয়ে যাবে। তার হৃৎস্পন্দনের গতি ক্রমশই তীব্র হচ্ছে। কেননা, সিসিটিভিতে গড়বড় করার দায়িত্বটা ছিলো তার। আর সে তা যথাযথভাবে করতে পারলেও,বর্তমানে সে-ই সবার চেয়ে বহুগুনে পিছিয়ে রয়েছে। খুব দ্রুত শহর ছাড়তে না পারলে,কপালে বড়সড় দুঃখ আছে।
এরিমধ্য আচমকা অনবরত ফোনের শব্দে সে বেশ বিরক্ত হলো। এখানে তার জান বাঁচে না,আর কেউ লাগাতার ফোন দিয়ে যাচ্ছে। তবে পরক্ষণেই তার হুঁশ হলো,নিশ্চিত কোনো সমস্যা রয়েছে। পাভেল দ্রুত রাস্তার পাশে বাইকটা থামিয়ে, ফোনটা রিসিভ করে।
—“পাভেল,যেখানেই আছো সাবধান হয়ে যাও। তারেক এহসানের ছোট মেয়ে তোমাদের সন্দেহ করেছে। ও নাকি ছাঁদে ছিলো,আর তোমাদের কার্যক্রমের সবকিছু দেখে ফেলেছে। জানি না,অন্ধকারে ও তোমাদের কিভাবে চিনিছে, তবে ভিভিয়ান সহ বাকিদের সতর্ক হতে বলো। তারেক এহসান প্রেস ডাকছে। সাথে শহরের মেইন চেকপোস্টগুলোতে পুলিশদের ইনফর্ম করেছে। আমার মতে, তোমাদের অন্যকোনো রাস্তা ধরে এগোনো উচিত। বিশেষ করে ভিভিয়ানকে বলো, শহরের মেইন রোড ছেড়ে জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে যেন চলে যায়।”
ইলহামের এহেন সব কথা শুনে পাভেলের মাথায় যেন বাজ পড়ে। তারা তো ভেবেছিল,অন্তত শহর ছেড়ে যাওয়া অব্দি সময়টুকু পাবে। নয়তো ওতো সুন্দর করে, ফেইক বোম ফাটানোর কোনো প্রয়োজন ছিল? যদিও তা কেনীথের বন্ধুদের ইচ্ছেতে শয়তানি করেই করা হয়েছে। কিন্তু এখন তো দেখছে, বিপদ কেবল তাদের দিকেই ধেয়ে আসছে।
এদিকে এই ইলহাম শেখ হলো ডার্ক শ্যাটার্স গ্যাং এরই এক বিশেষ সদস্য। তথা কেনীথের সেই বন্ধু যে,বর্তমানে সংসদের এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। একইসাথে বর্তমানে একমাত্র সেই শুধু, তারেক এহসান বাড়িতে ভদ্রবেশে তার আশেপাশেই রয়েছে। কিন্তু পুরোনো সেই ঘটনায় সেদিন ইলহাম না থাকায়, বেশ ভালোমতোই বেঁচে গিয়েছিল। যার ফলে, তারেকও আজ অব্দি তাকে ঠিকমতো চিনতে পারেনি কিংবা কারো সন্দেহের নজরে পড়েনি।
তবে যতই সে ভদ্র বেশে রাজনীতিতে ঘুরে বেড়ায় না কেনো—পুরোনো বন্ধুদের বিপদে এইটুকু সাহায্য করবে না, তা কি করে হয়? যথারীতি বিয়েতে বিশেষ অতিথি হিসেবে,তারেকের সাথে নানান আলাপ-আলোচনা করে তাকে বাকিসব কার্যক্রম হতে ধ্যান সরানো কিংবা বর্তমানে বাড়ির ভেতরের কার্যক্রম সম্পর্কে বন্ধুদের সাবধান করা—দুটোই সে ভালো মতোই করছে।
পাভেল আর বলার মতো কিছু খুঁজে পেলো না। তবে ইলহানের উদ্দেশ্যে শুধু এইটুকুই আওড়ায়,
“ভাই,দোয়া করো। আর শোনো, যেভাবেই হোক ফুপা যেন কয়েকদিনের মধ্যে দেশে আর আসতে না পারে। এই মূহুর্তে ফুপা দেশে চলে এলে,আর কার সাধ্য নেই আমাদের বাঁচানোর। ইউরোপে যা ইচ্ছে তাই করতে পারলেও,এই দেশে এই দুইভাই থেকে বাঁচা অসম্ভব। দুইভাই মিলে সবার ভবলীলাসাঙ্গ করে দেবে।”
—“চিন্তা নেই,ওদিকটা আমি ম্যানেজ করে নেব। তোমরা সাবধান থেকো।”
এই বলেই সে ফোনটা কেটে দেয়। অন্যদিকে পাভেল দ্রুত কেনীথকে ফোন করে। যেভাবে গাড়ি চালায় এই বান্দা, গাড়ি উড়াতে উড়াতে মেইন রোডে পৌঁছে না গেলেই হলো।
‘Nara.. Naa.. NAaaa.Naaaa..Naaa.. Na
Na Ra Na Ra Ne Na Ra Na Na Ra Na Ra Na NanaNara Nara Nara Nara
Nara Ne…
Jhuki Teri Palkon Mein
Mil Jaaye Mujhe Panaah______
Palke Gire Aasu Bhari
Reh Jaaye Mere Nishaan______
Tute Dil Ki Mat Kar
Tu Fikar Mere Hamnawa____
Pyaar Du Tujhko Is Kadar
Reh Jaaye Mere Nishaan____
Mere Nishaan..Mere Nishaan Mere Nishaan… Mere Nishaan_______’
কেনীথ মনের আনন্দে গুনগুনিয়ে গান গাইছে। বর্তমানে তার মাঝে চিন্তা নামক শব্দটার কোনো অস্তিত্বই যেন নেই। একহাত গাড়ির স্টিয়ারিং-এ, অন্যহাতে সিগারেট ধরা। গাড়ির জানালাগুলো খোলা। নির্জন রাস্তার বুক চিঁড়ে ছুটে চলা গাড়ির মাঝে,সাই সাই করে বাতাস ঢুকছে। আনায়া পাশেই অচেতন হয়ে পড়ে আছে। সে মাঝেমধ্যে আনায়াকে একপলক দেখে নিয়ে,পরক্ষণেই আবার সিগারেটে টান দিচ্ছে। এক নেশার জন্য, আরেক নেশায় মত্ত হতে হলো। বিষয়টা কেনীথের কাছে খানিক অদ্ভুতই বটে। পরক্ষণেই সে তির্যক হেসে,আবারও সম্মূখের রাস্তার দিকে মনোযোগ দেয়।
সামনেই একটা জঙ্গল রয়েছে। আর তার পাশ ঘেঁষেই এগিয়ে গিয়েছে শহরের মেইন রোড। কেনীথ মূলত সেই রাস্তা ধরেই এগোচ্ছে। আরেকটু পরই এই শহর ছাড়তে পারবে।
এরিমধ্যে আচমকা ফোন এলো। কেনীথ কার ডিসপ্লে হতেই ফোনটা রিসিভ করে, পাভেলের উদ্দেশ্যে নিস্পৃহে বলল,
“হুম,বল!”
—“ভাই, মেইন রোডে আছো?শহর ছেড়েছো?”
পাভেলের উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বরে,কেনীথ খানিকটা কপাল কুঁচকে বলল,
“না, আরেকটু রাস্তা বাকি…। কেনো কি হয়েছে?”
পাভেল এবার বেশ ক্ষিপ্ত স্ব’রে বলতে লাগল,
“তোমার ঐ চুড়েল শালী!…তারেক এহসানের ছোট মাইয়া। এই ছেমড়ী তোমাদের নাকি ছাঁদ থেকে দেখে ফেলেছে। আবার আমি বাড়ি থেকে পালানোর সময় ওইটার সাথে ধাক্কাও খেয়েছি। নিশ্চিত সন্দেহ করেছে। তার সন্দেহের কারণে, তারেক এহসানও নাকি বিশ্বাস করে নিয়েছে—এসব আমরাই করেছি। এখন সব জায়গার…মেইন রোডের চেকপোস্ট থেকে শুরু করে হাইওয়ে পুলিশদের ইনফর্ম করেছে। আবার নাকি প্রেসও ডেকেছে। কি করবো বুঝতে পারছি না। আপাতত ইলহান ভাই বলল,আমরা যেন মেইন রোড দিয়ে কোথাও না যাই। বিশেষ করে তুমি,আনায়াকে নিয়ে ঐ জঙ্গলের রোড দিয়ে শহর ছেড়ে চলে যাও। আমিও তাই করব।”
কেনীথের কপালে বেশ খানিকটা ভাজ পড়েছে। পাভেলের কথা মনোযোগ সহকারে শোনার পর, সে দৃঢ় কন্ঠে বলল,
“ডোন্ট ওয়ারি! এতো বেশি প্যানিক করার কিছু নেই। যা হওয়ার, দেখা যাবে।”
কেনীথের এহেন কথাতেও পাভেল শান্ত হতে পারে না। তার নিঃশব্দের মাঝেই কেনীথ স্পষ্ট তার সংশয়ের অস্থিরতা টের পায়। কেনীথ ভারী শ্বাস ফেলে আবারও বলল,
“তুই দ্রুত শহর ছাড়ার চেষ্টা কর। আমি জঙ্গলের রাস্তা দিয়েই যাচ্ছি। আর একদম চিন্তা করিস না, এবার কিছুই হবে না।”
এই বলেই, সে পাভেলেকে আশ্বস্ত করে কলটা কেটে দেয়। অতঃপর ভারী শ্বাস ফেলে, আবারও ঠোঁটে সিগারেট চেপে, নিস্পৃহে পাশে ফিরে আনায়াকে দেখে। নিমিষেই তার ঠোঁটের কোণায় খেলে যায় তির্যক হাসি। কেনীথ আনমনে আনায়া হতে নজর সরিয়ে,শক্ত হাতে স্টিয়ারিংটা ঘুরিয়ে সরাসরি রাস্তা পরিবর্তন করে। জঙ্গলের আঁকাবাঁক সরু রাস্তার পথ ধরে এগিয়ে যায় নিস্পৃহে। গাড়ির স্পিডটা আরেকটু বাড়িয়ে, অনিমেষই দৃঢ় কন্ঠে গাইতে শুরু করে,
‘Main tere, main tere qadmon mein, rakh doon yeh jahaan_____
Mera ishq deewangi.
Hai nahi, hai nahi aashiq koi mujh sa tera______
Tu mere liye bandagi________
Zara si dil mein de jagah tu.
Zara sa apna le bana____
Zara sa khwabon mein saja tu.
Zara sa yaadon mein basa____
Main chaahoon tujh ko, meri jaan…bepanaah______
Fida hoon tujh pe, meri jaan, bepanaah______
Whoa-oh-oh, oh-oh-oh, oh-oh-oh, oh-oh-oh.
Whoa-oh-oh, oh-oh-oh, oh-oh-oh, oh-oh-oh.
Whoa-oh-oh, oh-oh-oh, oh-oh-oh, oh-oh-oh________’
তার কণ্ঠের মাদকতায় রাতের নির্জনতা যেন নিমিষেই ভেঙে যায়। অন্ধকারে ছুটে চলা গাড়ির ভেতর থেকে ভেসে আসা সুরটুকু—আশেপাশের গাছগাছালি, শীতল নিশীথের বাতাস ও নীরব বনভূমির বুকে ছড়িয়ে পড়ে। যেন গোটা জঙ্গল স্তব্ধ হয়েছে তার দৃঢ় কন্ঠস্বরে। বিস্তৃত আকাশের বুকে জ্বলজ্বলে চাঁদও, আঁধারে অপার্থিব আলো ছড়িয়েছে। আর সেই আলোতে ছুটে চলা নিশাচর হিং’স্র প্রাণীর ন্যায় ভ্যাম্পায়ার সিরিজের জি-ওয়াগনের সাথে মিশে যাচ্ছে কেনীথের অগ্নিমদির কণ্ঠস্বর।চারপাশ হতে শোনা যাচ্ছে ঝিঁঝিপোকা সহ আরো কিছু বন্যপ্রাণীর ডাক। তবে সবকিছুও এই মূহুর্তে হার মেনেছে কেনীথের কন্ঠস্বরে। কন্ঠের দহনের এমন তীব্রতা যেন নিশীথের বুক চিরে বেরিয়ে আসা কোনো বজ্রধ্বনি। আবার তেমনি মারাত্মক সুন্দর—শীতল হাওয়ার মতোই নেশাত্নক।
অবশেষে রাতের কয়েকটা ঘন্টা জার্নির পর, কেনীথ তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের কাছে এসে পৌঁছায়। কুমিল্লা শহর হতে প্রায় বেশ খানিকটা দূরে এক জঙ্গলের ন্যায় এরিয়ার মাঝে,বড়সড় এক গেস্ট হাউজ রয়েছে। যেটা তার আরেক বন্ধু তন্ময়ের। তবে এখানে বছরের পর বছর কেউ এসে না থাকায়,এখন একপ্রকার পরিত্যক্তই হয়ে আছে৷ কিন্তু তাদের প্ল্যান অনুযায়ী তারা আগেভাগেই পুরো বাড়ি সাফসাফাই করে ফেলেছে। সকলের নজরের আড়াল হবার জন্য, এই জায়গাই একদম পারফেক্ট।
এদিকে আবার নতুন ঝামেলা শুরু হয়েছে। সারা রাস্তায় বৃষ্টির কোনো দেখা না মিললেও,এদিকের রাস্তায় প্রবেশ মাত্রই গুড়িগুড়ি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। তবে আরেকটু রাস্তা বাকি বিধায়,সে এই নিয়ে তেমন ভাববার প্রয়োজন মনে করল না। বরং পাশে ফিরে আনায়ার দিকে তাকিয়ে দেখে, তার অচেতন মুখশ্রীতে অনবরত বৃষ্টির ছিটেফোঁটা লাগছে। কেনীথ অজান্তেই এতে কিছুটা বিরক্ত হয়ে,জানালার গ্লাস তুলে নেয়। এবং একটানে গাড়ি ঘুরিয়ে,এবার সরাসরি গেস্ট হাউজের পথে এগোয়।
বাড়ির সামনে এসে কেনীথ গাড়ি হতে নেমে পড়ে। সাথে করে নিয়ে আসা চাবিটা দিয়ে, বড়সড় আকারের মেইন গেইটটা দ্রুত খুলে ফেলে। অতঃপর গাড়িটা ভেতরে নিয়ে গিয়ে,সরাসরি বাড়ির পেছন দিকটায় গ্যারেজে সরিয়ে রাখে। খানিকক্ষণ বাদে হয়তো পাভেলও চলে আসবে।
আনায়াকে কোলের পরিবর্তে, এবার কেনীথ সোজা কাঁধে তুলে নেয়—সামনের দরজা গুলোর লক্ খোলার সুবিধার্থে। আনায়ার নিস্তেজ দেহ কেনীথের পিঠের দিকে ঝুলে পড়ে। একইসাথে হাতদুটো নড়বড়ে ভঙ্গিতে মৃদুভাবে দুলতে থাকে।
আনায়ার লেহেঙ্গার ঘেরে, কেনীথ অর্ধেকের বেশি ঢেকে গেলেও—শেষ অব্দি তাকে রুম অব্দি ঠিকঠাক মতোই নিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
‘চট্টগ্রাম সিটি মেয়রের ছেলে ভিভিয়ান—বানিজ্য মন্ত্রীর মেয়েকে বিয়ের আসর থেকে তুলে নিয়ে গিয়েছে।এমনটাই অভিযোগ উঠেছে বিদেশ ফেরত ও সদ্য রাজনীতিতে জড়ানো ভিভিয়ান এহসান এর বিরুদ্ধে।’
নিউজ মিডিয়ার এমন রংচঙে হেডলাইট দেখে নিমিষেই কপাল কুঁচকে যা এক মধ্যবয়স্ক ব্যক্তির। পরনে সাদা পাঞ্জাবি,পায়জামা। চোখে-মুখে বার্ধক্যের ছাপ রইলেও,যে কেউ প্রথম দেখায় বলতে বাধ্য—এই লোক নিত্যন্তই সুপুরুষ। আর নিজের চেয়েও অত্যধিক গুনে সুদর্শন ছেলের নামে এমন কিছু কোনো বাবা-ই, কখনো প্রত্যাশা করবে না—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভাহিদ এহসান যেন কেনীথের নামে ছড়ানো এই তথ্য খুব সহজেই বিশ্বাস করে নেয়।
চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়ে তীব্র ক্ষি”প্ততা। যেন সে জানত—এমন কিছুই হবার ছিলো। আর এই আশংকাই সে করেছিল। মূহুর্তেই তার ঠোঁট হতে অস্ফুটস্বরে বেড়িয়ে আসে,
“শু*রের বাচ্চা! মানুষ আর হতে পারলি না।”
বিয়ের আসর হতে তুলে নিয়ে আসা বিয়ের কনে, গোলাপে সজ্জিত বিছানায় বসে অনবরত ফুপিয়ে ফুপিয়ে কেঁদে চলেছে। জোরে কাঁদলেই কখন না যেন,জানটাও চলে যায়। এমনই হুশিয়ারি দেওয়া হয়েছে তাকে। তবুও কোনোমতেই যেন তার কান্না থামছে না।
সে এই মূহুর্তে কোথায় রয়েছে তাও তার অজানা। সঙ্গে সোফায় পায়ের উপর পা তুলে, নির্বিকারে অপলক তার দিকে তাকিয়ে থাকা ব্যাক্তিটিও তার কাছে অজানা। পুরোপুরি অজানা অচেনা বলা চলে না। হয়তো লোকটি তার পরিচিত। কিন্তু আনায়া ঠিকঠাক এই লোকটির সম্পর্কে কিছুই জানে না। অথচ অদ্ভুত হলেও এক বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে তার এই ব্যক্তির সঙ্গে।
আনায়ার পরনে ভারী টুকটুকে লাল রঙের লেহেঙ্গা। মাথায় বড়সড় একটা ঘোমটা। তবে এখন তা এলোমেলো হয়ে মাথা থেকে প্রায় পড়ে যেতে নিয়েছে। মুখভর্তি ভারী মেক-আপও চোখের পানিতে মিলেমিশে একাকার।
তার গলা, কান, দুহাত ভরা সোনার ভারী গহনা। হবেই না বা কেনো, নামকরা মন্ত্রী তারেক এহসানের বড় মেয়ে আনায়া এহসান বলে কথা। তারেক এহসান এবং তাদের পরিবার যে কতটা আভিজাত্যপূর্ণ জীবনযাপন করে তা মোটামুটি গ্রাম-শহরের সবারই জানা। এছাড়া তারেক এহসান যে ঠিক কতটা কঠোর মনোভাব সম্পূর্ণ—তাও সবার ধ্যানে রয়েছে। অথচ তারই বড় মেয়েকেই কিনা কেউ বিয়ের আসর হতে তুলে নিয়ে গিয়েছে।
আনায়ার কান্নার মাঝেই সে খেয়াল করে দেখল, সোফায় বসে থাকা লোকটি একটা কালো রংএর লাইটারে অনবরত আগুন জ্বালিয়ে তা নিভিয়ে দিচ্ছে। লোকটির কাঁধ পর্যন্ত বড় বড় হালকা কোঁকড়ানো চুল। যেগুলোর কিছুটা অংশ মেসিবান করে পেছনে বেঁধে রাখা। বাদবাকি মুক্ত চুলের অংশবিশেষ এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। দাঁড়ি গোঁফও একদম সুনিপুণ ভাবে ছোট ছোট করে কাঁটা। বলিষ্ঠ দেহের পরনে কালো রংএর একটা পাঞ্জাবি,হাতাটাও কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে রাখা। পায়জামা কিংবা জুতোটাও কালো।
এমনিতেই রুমটা কেমন অন্ধকার। শুধু ছোট্ট একটা ডিম লাইট জ্বালিয়ে রাখা রয়েছে। আবার সেই লোকটিও বসে রয়েছে একদম ঘরের কোণার সোফায়। লাইটারটা বারংবার ফ্লিকিং করায়, আবছা আলতো তার মুখটা শুধু ঝাপসা হয়ে দৃশ্যমান হচ্ছে। সবমিলিয়ে আনায়ার কাছে খুব বেশি স্পষ্ট হলো না লোকটির ভাবগতিকের আভাস।
কিন্তু আনায়া যে অন্ধকার ভয় পায়। সে প্রচন্ড রকমের ঘৃ”ণা করে এই অন্ধকারকে। এই অন্ধকারই যেন তার মাঝে সকল অজানা ভয়কে জাগিয়ে তোলে। রুদ্ধ করে দেয় তার শ্বাস প্রশ্বাস।
এরই মাঝে আনায়া লোকটিকে পরখ করতে তাকিয়ে ছিলো বিধায়… আচমকা কি যেন ভেবে লোকটি তার নজর—আনায়া হতে সরিয়ে নেয়।
অতঃপর একটা সিগারেটে আগুন ধরিয়ে টান দেয়। এই নিয়ে গত কিছু সময়ের মাঝে কম করে হলেও, ছয় থেকে সাতটা সিগারেট ফুরিয়েছে সে। আর সেই সিগারেটের গন্ধে আনায়ার জান যায় যায় উপক্রম।
কোনোমতেই সে এসব গন্ধ সহ্য করতে পারে না। প্রতিবার সিগারেটের ধোঁয়া আনায়া পর্যন্ত ছড়িয়ে এলে, সে বারংবার কেশে উঠছে। তবে নিজেকে যথাসাধ্য সমানে নেবারও চেষ্টা করেছে।
কিন্তু লোকটি তো আর থেমে নেই। তার পাশে থাকা একটা কালো এবং কালচে লাল রঙের সমন্বয়ের একটি গিটার কোলে তুলে নিয়ে—টুংটাং শব্দ করেই গানের সুর তুলতে লাগে। একবার সিগারেটে টান দিয়েই নাক মুখ দিয়ে ধোঁয়া বের করছে, অন্যদিকে আবার গিটার বাজাতে মনোযোগী হচ্ছে। এরপর আচমকাই মা’রা’ত্নক নিরেট-ধাঁধানো কন্ঠে গাইতে শুরু করে,
ও ভ্রমর রে_________________
কইয়ো, কইয়ো, কইয়োরে ভ্রমর,
রাঁধারে বুঝাইয়া
কইয়ো কইয়ো কইয়োরে ভ্রমর,
রাঁধারে বুঝাইয়া
মুই কৃষ্ণা______ মইরা যাইমু______
রাঁধা হারা হইয়ারে,
ভ্রমর কইয়ো গিয়া_________
ভাইবে রাধারমণ বলে শোনরে কালিয়া।
ভাইবে রাধারমণ বলে শোনরে কালিয়া____
নিভা ছিলো মনের আগুন
কি দিলা____জ্বালাইয়ারে, ভ্রমর কইয়ো গিয়া।
ভ্রমর কইয়ো গিয়া,
শ্রী___ রাধার বিচ্ছেদের অনলে_______
অঙ্গ যায় জ্বলিয়া রে,
ভ্রমর কইয়ো গিয়া _________
❝ভিভিয়ান এহসান কেনীথ❞—আনায়াকে বিয়ের আসর হতে তুলে নিয়ে আসা এই সুদর্শন বলিষ্ঠ দেহের পুরুষের নামই ভিভিয়ান এহসান কেনীথ। কেনীথের বাবা চট্টগ্রামের সিটি মেয়র ❝ভাহিদ এহসান❞। এছাড়া আনায়া কিংবা আনায়ার পরিবারের সাথেও তার একটা ভিন্ন সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু কেনীথের পরিবার কিংবা আনায়া—দুজনের পরিবারের মাঝের সম্পর্কটা অত্যন্ত জোড়ালো। এক কথায় দু পরিবার একে অপরকে কোনো ভাবেই সহ্য করতে পারে না। যদিও এসব পারিবারিক সম্পর্কের দ্বন্দ্বের কারণটা অনেক পুরোনো।
সুর থেমে গিয়েছে। গিটারের শেষ তারের ঝংকারটি ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে রাতের নিস্তব্ধতায়। আঙুলের ফাঁকে ধরা সিগারেটের শেষাংশটুকু জ্বলজ্বল করে উঠল একবার— তারপর নিভে গেল নিস্পৃহে ।কেনীথ তার লালচে বাদামী ঠোঁটের কোণ হতে সিগারেটের শেষ অংশটুকু ছুঁড়ে ফেলল নিচে। আগুনের ক্ষীণ ছটা অন্ধকারে এক মুহূর্তের জন্য ঝলসে উঠল। অবশিষ্ট আগুনের ক্ষীণ স্পন্দনটুকু নিঃশেষ হলো কেনীথের কালো জুতোয় পদপিষ্ট হয়ে। কেনীথ এক ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুক্ষণ চোখ বুঁজে রইল।
অন্যদিকে এ সব কিছুই আনায়া আড়চোখে দূর হতে খেয়াল করছে। সঙ্গে সিগারেটের ধোঁয়ায় কয়েকবার কেশে উঠলেও নিজেকে যথাসাধ্য সামলে নেয়। তবে তার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠার বেগ এখনো কমেনি। এরই মাঝে যখন কেনীথ আকস্মিক উঠে দাঁড়িয়ে তার দিকে অগ্রসর হলো—তখনই যেন আনায়া খানিকটা আঁতকে ওঠে। কেনীথের পদশব্দের দৃঢ়তায় আনায়ার গলা শুকিয়ে এলো। আনায়া খেয়াল করে দেখে, লোকটা কেমন যেন পাগলাটে ধরনের। কাধ পর্যন্ত এলোমেলো চুল, অদ্ভুত ভাবগাম্ভীর্যের সাথে করা কাজকর্ম কিংবা ভাব-ভঙ্গি ; সবই আনায়াকে খানিকটা ভীত করল।
কেনীথ গম্ভীর্যের সাথে আনায়ার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। যার ফলে আনায়া বিছানার কোণায় নিজেকে খানিকটা গুটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কাঁদো কাঁদো চেহারা নিয়ে কেনীথের দিকে তাকিয়ে কিছু বলার সাহস জোগাচ্ছে না তার। আনায়া তার ছোট বোন ইনায়ার মতো খুব বেশি সাহসী, দৃঢ় মনোভাব সম্পন্ন কিংবা অন্তত তেজী স্বভাবের নয়। বয়সে আনায়া বড় হলেও সে নিত্যান্তই চুপচাপ, সহজ-সরল মেয়ে। তার চোখে সবসময় যেন এক অপার্থিব ভয় বাস করে।আর পৃথিবী যেন তার কাছে অচেনা এক অরণ্য। খুব বেশি কথা বলে না সে। যেটুকুও বলে তার প্রতিটি শব্দেই এক নির্জন শান্তি,কোমলতা মিশে থাকে। আনায়া খুব বেশি সাহসী নয় বরং কিছুটা ভীতু, কিছুটা লাজুক। তবুও তার উপস্থিতিতে এক ধরণের নিরব শক্তি অনুভূত হয়।
কেনীথ আনায়ার কাছে পৌঁছে তার দিকে হাত বাড়াতে নিলে—আনায়া খানিকটা পিছিয়ে গিয়ে জোরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। একইসাথে ইতস্তত ঘাবড়ানো স্বরে বলতে থাকে,
“আমি বাড়ি যাব।…প্লিজ আমাকে কিছু করবেন না।…আমি বাড়ি যেতে চাই।”
আনায়া এইটুকু বলেই মাথাটা আরো বেশি নুইয়ে ফেলল।অন্যদিকে ওর এহেন প্রতিক্রিয়ায় কেনীথ কপাল কুঁচকে হাত নামিয়ে নেয়। অতঃপর বাম হাতের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে হালকা কুঁচকে যাওয়া কপালের পাশে, এলোমেলো চুলের মাঝে স্লাইড করতে লাগল।
তার নজর সম্পূর্ণ আনায়ার দিকে। হালকা গোলগাল চেহেরা, কেঁদে কেটে ফর্সা ত্বক পুরো লাল বানিয়ে ফেলেছে। চোখজোড়া একদম ফোলা ফোলা হয়ে গিয়েছে। চোখ গাল সহ পুরো চেহেরায় চোখের পানির সিক্ততায় পরিপূর্ণ। চুলগুলো কেমন এলোমেলো। এতসব কিছু পর্যবেক্ষণের পর কেনীথের মেজাজ আচমকাই বিগড়ে গেল। কপাল থেকে হাত নামিয়ে গাম্ভীর্যের সাথে নিরেট কন্ঠে বলে উঠল,
“কাহিনি কি? এভাবে কাঁদছিস কেনো? তোকে মে”রেছি আমি? নাকি তোকে মে’রে ফেলতে এখানে নিয়ে এসেছি?”
আচমকা এহেন গম্ভীর কণ্ঠে, স্তব্ধ ধমকে আনায়া কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠল। এই লোককে সে মোটেও ঠিকঠাক চেনে না। যদিও তার পরিবারের সাথে এবং তার সাথে অনেক পুরোনো একটা সম্পর্ক রয়েছে—তবুও সবকিছু আনায়ার কাছে পরিষ্কার নয়। লোকটি তার ভালো চায় নাকি মন্দ কিংবা আদতে চাইছে টা কি, তা নিয়েও তো আনায়া নিশ্চিত নয়। আর এটা ঠিক কোন জায়গা তাও তো আনায়ার অজানা। আনায়া কিছু না বলে উল্টো অনবরত কেঁদে চলেছে দেখে, কেনীথ আরো বেশি বিরক্ত হলো। অনেকটা জোরে ধমকে বলে উঠল,
“হোয়াট দ্য হেল! স্টপ ক্রাইং রাইট নাও, ড্যাম ইট!”
আনায়া পুনোরায় কেঁপে উঠে,একদম ঠোঁট উল্টে কেঁদে উঠল। সঙ্গে ওর কান্নার আওয়াজের প্রকোপও বেড়ে গেল। কেনীথ আরো বিরক্ত হয়। এবার নুইয়ে কাঁদতে থাকা আনায়ার দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থাতেই, চিৎকার করে জোর গলায় ডাকতে লাগল,
“পাভেল!পাভেল!…পাভেল!”
কেনীথের ডাক শোনা মাত্রই ড্রইং রুম থেকে পাভেল তড়িঘড়ি করে ছুটে এলো। দরজা খোলাই ছিলো বিধায় বেশি বেগ পেতে হয়নি। পাভেল রুমে ঢুকতেই কেনীথের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো,
“কি হয়েছে ব্রো? সব কিছু ঠিকঠাক…”
তড়িঘড়িতে পাভেলের কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই তার নজর আনায়ার উপর পড়ায় কথা থেমে গেল। কিছুটা অবাক সুরে ধীর আওয়াজে বলে উঠল,
“ব্রো! ও তো কাঁদছে… তুমি কিছু করেছো…”
এবারও পাভেলের কথা শেষ হবার পূর্বেই, কেনীথ গরম চোখে শক্ত মুখে পাভেলের দিকে ফিরে তাকালে—কেনীথের চাহনিতে পাভেল খানিকটা ভড়কে গিয়ে বলল,
“সরি… কিন্তু হয়েছে টা কি?”
কেনীথ গম্ভীর্যের সাথে শক্ত গলায় বলল,
“ওকেই জিজ্ঞেস কর। তুই না বলেছিলি ও এইচএসসি দিয়েছে। তবে এতো বড় হয়েও এমন ন্যাকা বাচ্চার মতো কাঁদছে কেনো?আমি কি ওকে মে”রেছি?
পাভেল কেনীথের এহেন কথায় কি বলবে বুঝে উঠতে পারল না। অন্যদিকে কেনীথের কথা শুনে আনায়া আরো বেশি কাঁদতে শুরু করে। মুখ তুলে আশেপাশে দেখল না ঠিকই, তবে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলতে লাগল,
“বাড়ি যাবো আমি। আমায় বাড়ি যেতে দিন প্লিজ।”
এবার কেনীথ পাভেলের দিক থেকে নজর সরিয়ে, আনায়ার দিকে তাকিয়ে জোরে ধমক দিয়ে বলে,
“চুপ!একদম চুপ! কিছু করলামই না তাতেই ন্যাকা কান্না জুড়ে দিয়েছে। আরেকবার কাঁদলে সোজা জঙ্গলের রা”স্তায় ছুঁড়ে ফেলে আসব। তবে গিয়ে তোদের বাপ মেয়ের শিক্ষা হবে,অসহ্যকর!”
—“ভাই এসব কি করছো? ও এমনিতেই ভয় পেয়ে বসে আছে। আর তুমিও যদি এখন এমন রাগারাগি করো তবে কিভাবে কি হবে? আমাদের সব প্ল্যান তো বিগড়ে যাবে।”
কেনীথ ক্ষে”পে গিয়েছে বিধায় পাভেল কেনীথকে এবার থামায়। অন্যদিকে আবার আনায়ার পুরো হেঁচকি উঠে গিয়েছে। ফর্সা চেহেরা, নাকের পাটা, ঠোঁট-গাল সব ফুলে লালচে হয়ে উঠেছে । যদিও খুব বেশি জোড়ে কাঁদছে না তবুও একটু পর পর ওর হেঁচকি ওঠা দেখে কেনীথ যেন আরো বেশি বিরক্ত৷ পাভেল বিষয়টা বুঝতে পেরে আনায়ার উদ্দেশ্যে বলতে লাগল,
“আচ্ছা তুমি কাঁদছো কেনো? ভয় নেই,আমরা তোমার কিচ্ছু করব না। ব্রো আমার অনেক ভালো।”
—“পাভেল!”
আচমকা কেনীথের শান্ত গম্ভীর কন্ঠস্বরে, পাভেল নিজের কথা থামিয়ে কেনীথের দিকে তাকায়। কেনীথ অদ্ভুতভাবে আনায়ার দিকে স্তব্ধ শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। ভাবগতিক ঠিক পরিষ্কার নয়। পাভেল খানিকটা ইতস্ততভাবেই বলে উঠল,
“হ্যাঁ…ভাই।”
—“কাজি ডাক।”
কেনীথের স্পষ্ট কথাটাও যেন পাভেলের কাছে অস্পষ্ট লাগল। কিছুটা তব্দা খেয়ে বলল,
“কি বললে ভাই?”
কেনীথ এবার আনায়ার দিকে তাকিয়ে থাকা অবস্থাতেই, নিজের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ করে বলল,
“কাজি ডাকতে বলেছি।”
—“কাজি? বিয়ে পড়ায় যে সেই কাজি? কিন্তু তাকে দিয়ে এখন কি হবে?”
কেনীথ কিছুটা রাগের সাথেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল। অন্যদিকে আনায়ার কান্না কিছুটা ক্ষীণ হয়ে এসেছে। হয়তো সে পাভেল ও কেনীথের কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করছে। কেনীথ বিষয়টা ভালোই বুঝতে পারে। কিঞ্চিৎ মুচকি বাঁকা হেসে পুনোরায় শক্ত গলায় বলে উঠল,
“কাজি ডাক, বিয়ে করে আজই বাসর সারবো।”
এহেন কথা শুনে,আনায়ার সাথে সাথে পাভেলও সোজা হতভম্ব হয়ে যায়। পরক্ষণেই বুঝতে পারে,কেনীথ হয়তো আনায়াকে ভয় দেখানোর জন্য এমন মজা করছে। নয়তো এরচেয়ে বেশি কারন তো সে খুঁজে পাচ্ছে না।
আনায়া ভয়ের চোটে নিজেকে আরো বেশি গুটিয়ে নেয়। সেদিন তাদের বাড়িতে এই কোঁকড়ানো চুলের লোকটাকে সে দেখেছিলো। কিন্তু কেনীথকে ঠিকমতো দেখার সুযোগ হয়নি। যথারীতি পাভেলকে সে কিছুটা সুবিধার ভেবে,করুন চোখে তাকায়। পাভেল বিষয়টা বুঝতে পেরে,কেনীথকে সামলানোর জন্য তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
“ভাই,বাদ দাও না। শুধু শুধু মেয়েটাকে ভয় দেখাচ্ছো। তুমি বাহিরে যাও। ও তোমাকে দেখেই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে।”
পাভেলের অভিব্যক্তিতে সে তার দিকে ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে তাকায়। পরক্ষণেই ভারী শ্বাস ফেলে,একবার আনায়াকে দেখে নিয়ে সোজা রুম থেকে বেড়িয়ে যায়। কেনীথ রুম থেকে চলে যেতেই পাভেল আনায়ার কাছে এগিয়ে এসে, ধীর স্বরে আওড়ায়,
“শোনো,তুমি একদম ভয় পেও না। আমরা তোমার কিচ্ছু করব না।”
আনায়া ঠোঁট চেপে নিজের কান্না থামিয়ে বলে,
“আমি বাড়ি যাবো। আমাকে প্লিজ বাড়ি পাঠিয়ে দিন।”
পাভেল হতাশ হয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে।
—“বললাম তো তোমার কিছুই হবে না। আর তোমাকে আমরা অবশ্যই তোমার বাড়িতে পাঠিয়ে দেবো। শুধু একবার আমাদের কাজটা হয়ে যাক।”
পাভেল আর কথা বাড়ায় না। এই বলেই রুম থেকে বেড়িয়ে যায়। অন্যদিকে আনায়া চুপচাপ বসে থেকে,নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে। শুরুতে সেই গম্ভীর ব্যক্তিটাকে তার সুবিধার লাগেনি। কিন্তু এই কোঁকড়া চুলের লোকটা হয়তো ভালো। আবার এরা কেমন ভালো তা-ও বুঝে আসছে না। ওদিকে বাড়িতে হয়তো সবাই দুশ্চিন্তা করছে। তাকে হয়তো তন্নতন্ন করে খুঁজে চলেছে। অথচ সে এখানে হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে। আনায়া নিজেকে শান্ত করতে চেয়েও আর পারে না। পরক্ষণেই ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।
রাত এখন বেশ গভীর। আনায়া বদ্ধ রুমে বিছানার উপর এখনোও চুপচাপ বসে রয়েছে। পরনে বিয়ের সেই গহনা-লেহেঙ্গা। মাঝেমধ্যে কেঁদেছে তো, মাঝেমধ্যে ক্ষণিকের জন্য থেমেছে। কিন্তু এখনও স্বাভাবিক হতে পারেনি। তবে সে ইচ্ছে করেই, শরীরের অবস্থা খারা’পও করতে চাইছে না। শ্বাসকষ্ট উঠে গেলে তখন আর চেয়েও কিছু করতে পারবে না। একে তো হাতের কাছে ইনহেলার নেই,তার উপর মাথাতেও আসছে না—এখান থেকে পালাবে কি করে!
রুমে এখন পুরোদমে আলো জ্বালানো। অনেকক্ষণ আগে পাভেল এসেছিল,তাকে কিছু জামাকাপড় এবং খাবার দিয়ে গিয়েছে। এবং বিছানায় অকারণে সাজিয়ে রাখা ফুলের পাপড়িগুলোও সব ঝেড়ে ফেলে, পরিষ্কার করে গিয়েছে। সাথে আনায়ার অনুরোধে রুমের লাইটগুলোও জ্বালিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আনায়ার মাঝে খাবার খাওয়া কিংবা পোশাক পরিবর্তনের কোনো ভাবনাই নেই। সে নিজের চিন্তায় মগ্ন।
আনায়া বিছানা হতে এবার উঠে দাঁড়ায়। বারান্দার দিকে এগিয়ে যায় ধীরপায়ে। কিন্তু অন্ধকার বারান্দায় আর প্রবেশ করে না। ভেতর থেকেই আশেপাশে একবার নজর বুলিয়ে নেয়। বাহিরে আবারও গুড়িগুড়ি বৃষ্টি নেমেছে। এই আগস্ট মাসের শুরু হতেই আবহাওয়ার এমন অবস্থায়, আনায়া বেশ হতাশ। তার বৃষ্টি প্রিয় হলেও,এই বৃষ্টি যেন তার জীবনের জন্য মারা*ত্মক ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আনায়া এই আশংকা করেই,পুনরায় দীর্ঘ শ্বাস ফেলল।
এটা জঙ্গলের মাঝে বা রাস্তার পাশ ঘেঁষে অবস্থিত একটি বড়সড় পুরোনো গেস্ট হাউজ। অন্ধকারে খুব বেশি একটা অনুমান করতে পারে না আনায়া। তবে এইটুকু বোঝে, কেউ হয়তো অনেক দিন এদিকে তেমন আসেনি। তাই এটাকে পরিত্যক্তও বলা চলে।তবে বাড়ির ভেতরের সবকিছুই একদম পরিষ্কার।
আনায়া আবারও ভারী শ্বাস ফেলল। সে বর্তমানে দোতলায় হলেও,বাড়ির ডিজাইন অনুযায়ী মাটি হতে দোতলা বেশ উঁচু। এখান থেকে লাফ দেওয়া মানে,সোজা উপরে চলে যাওয়া।
—“এখনও চেঞ্জ করিসনি?”
পেছন হতে আচমকা এক গম্ভীর কন্ঠস্বরে আনায়া সম্পূর্ণ চমকে ওঠে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয় নিমিষেই। সে ত্বরিত পেছনে ঘুরে তাকিয়ে দেখে, কেনীথ বেশ গম্ভীরমুখো ভঙ্গিতে, তার থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে। বর্তমানে পাঞ্জাবির পরিবর্তে গায়ে কালো রঙের হুডি আর প্যান্ট। একইসাথে মাথার ঝাঁকড়া চুলগুলো দেখতে আরো বেশি এলোমেলো লাগছে। আনায়ার কাছে সবচেয়ে অদ্ভুত লেগেছে,এই লোকের চোখজোড়া ও চাহনি। শুরুতে ভেবেছিল,বেশি রাগের কারণেই হয়তো চোখ এমন লাল দেখায়। কিন্তু পরে টের পেলো,তার চোখের আইরিশই ওমন লালচে।
তবে আনায়ার আপাতত এসব নিয়ে ভাবার সময় নেই। সে নুইয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই,আচমকা কেনীথ টি-টেবিলে রাখা খাবারের প্লেটটা একপলক দেখে নিয়ে, তার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।নিমিষেই আনায়া ঘাবড়ে গিয়ে, কয়েক পা পেছনে চলে যায়।
—“ড্রেস চেঞ্জ করিসনি,আবার এখন অব্দি কিছু খাসওনি। রাত কত হয়েছে, হুঁশ আছে তোর?”
আনায়া আর কিছুই বলে না। তার নীরবতায় কেনীথ আবারও তার দিকে পা বাড়ালে,আনায়া চমকে তড়িঘড়ি করে আওড়ায়,
“প্লিজ,ওখানেই থাকুন। কাছে আসবেন না। আমি আপনার সব কথা শুনছি।”
এই বলেই আনায়া দ্রুত জামাকাপড় গুলো হাতে নিয়ে,ওয়াশরুমে ছুটে যায়।একপ্রকার আতংকিত ভঙ্গিতেই দরজাটা ঠাস করে লাগিয়ে দেয়। ওর এহেন হাবভাবে কেনীথ বিরক্তিতে ভারী শ্বাস ফেলে।
ব্ল্যাক-ব্রাউন রঙের লং গাউন, সাথে মাথা ও গায়ে ওড়না জড়িয়ে আনায়া ওয়াশরুম থেকে বের হয়। ভেতরে তোয়ালে সহ বাদবাকি সবকিছুই সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখা আছে। আর ঘুম বেশি ভালো লাগছিলো না বিধায়,আনায়া সরাসরি গোসল সেরে নিয়েছে।
কিন্তু রুমে প্রবেশ করে, কেনীথকে এখনো এখানে দেখতে পেয়ে, আনায়া তীব্র অস্বস্তিতে পড়ে যায়। এই লোক এখনো এখানে কি করছে?
এদিকে আবার,কেনীথ এতক্ষণ সোফায় বসে বসে একটি পেপারব্যাক বই হাতে নিয়ে, বেশ মনযোগ সহাকারে পড়ছিল।একটু আগে দুটো সিগারেট শেষ করেছে। জার্মানিতে ট্রেজারার ল্যাক্সারি ব্ল্যাক এডিশনের মতো ব্যয়বহুল গোল্ডেন-ব্ল্যাক মোড়কের সিগারেট খাওয়া হলেও,এখানে আপতত বেনসন দিয়েই কাজ চালাতে হচ্ছে।
আপাতত আনায়া যেন তার আরেক নেশাদ্রবতে পরিণত হয়েছে। তার উপস্থিতি টের পেয়ে সে মাথা তুলে, তার দিকে তাকাতেই যেন—তার নজরের সম্পূর্ণটাই যেন আনায়াতে আঁটকে যায়। কাঁন্নার তোপে লালচে হয়ে যাওয়া ফোলা ফোলা চোখ-গাল কিংবা নাক—সবটাই সে তার তীক্ষ্ণ নজরে পরখ করে। এতে আনায়া আরো বেশি অস্বস্তিতে পড়ে যায়। তবে কেনীথ বিষয়টা বুঝতেই,কিঞ্চিৎ ঢোক গিলে নিজের নজর সরিয়ে নেয়।
—“দ্রুত খাবার খেয়ে নিয়ে,সোজা ঘুমিয়ে পড়।”
এই বলেই সে পুনরায়, বইয়ের দিকে মনোযোগ দেয়। কেনীথের সামনের টি-টেবিলে খাবারের প্লেটটা রাখা। আনায়া খানিকটা সঙ্কোচনের সহিত কেনীথের দিকে এগিয়ে যায়। উদ্দেশ্য তার প্লেটটা এখান থেকে নিয়ে,দূরে গিয়ে বসা। কিন্তু সে প্লেটটা তুলে নিয়ে যাওয়ার আগেই, কেনীথ বইয়ের পাতায় নজর রেখেই গম্ভীর স্বরে আওড়ায়,
“চুপচাপ এখানে বসে খাবি।”
আনায়া ওড়নার ঘোমটার আড়াল হতে আড় চোখে কেনীথকে একপলক দেখে। পরক্ষণেই ভারী শ্বাস ফেলে,সোফার কোণায় ঠেসেঠুসে চিপকে বসে, খুব অল্প পরিমানে খাবার খেয়ে নেয়। এরিমধ্যে কেনীথ বই হতে নজর সরিয়ে আনায়াকে দেখে। আনায়ার ভাবগতিক এমন যেন,তার খাবার খাওয়া এখানেই শেষে। অথচ প্লেটের এক তৃতীয়াংশও সে খায়নি।
নিমিষেই কেনীথ কপাল কুঁচকে গম্ভীর স্বরে বলল,
“কাহিনি কি? পুরোটা শেষ না করে কোথায় যাচ্ছিস।”
হুটহাট আচমকাই কেনীথের এহেন গম্ভীর কন্ঠস্বরে আনায়া প্রতিবার চমকে উঠছে। এবারও নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে, ইতস্তত স্বরে আওড়ায়,
“আমি এতো বেশি খেতে পারি না।”
কেনীথ আনায়ার নুইয়ে থাকা মুখটার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে,পরক্ষণেই ভারী শ্বাস ফেলে বলল,
“এবারের মতো ছেড়ে দিলাম। এরপর হতে যা দেবো,যতটুকু দেবো,পুরটাই শেষ করবি।”
আনায়া আর কথা বাড়ায় না। কেনীথ পুনরায় বইয়ের মাঝে নজর ফিরিয়েছে দেখে, সে চুপচাপ উঠে গিয়ে বিছানায় বসে। তবে কেনীথ রুম থেকে যাচ্ছে না দেখে,ঘুমাবে কিনা এই নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে। আনায়ার এমন ভাবনাচিন্তার মাঝেই,কেনীথ আচমকা উঠে দাঁড়ায়। অতঃপর রুম হতে বেড়িয়ে যাওয়ার পূর্বে,লাইটগুলো অফ করতে নিলে—আনায়া চমকে আতংকিত স্বরে বলে,
“প্লিজ,লাইট অফ করবেন না।”
আনায়ার কথা শুনে,কেনীথ ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে ফিরে তাকায়। বিছানার কোণায় ভয়ে গুটিয়ে বসে থাকা আনায়াকে দেখে,তার কপাল খানিকটা কুঁচকে যায়। তবে পরক্ষণেই সে নিজেকে স্বাভাবিক রেখে, রুমের বাহিরে যায়। কিন্তু পেছন হতে রুমের দরজাটা লাগাতে গেলে,আবারও আনায়া বলে ওঠে,
“দরজাটা লক্ করবেন না প্লিজ।”
এবার কেনীথের চোয়াল শক্ত হয়। কিছু একটা ভেবে নিয়ে,আচমকা সে পুনরায় রুমের ভেতরে প্রবেশ করে। এবং তৎক্ষনাৎ দরজটা এবার ভেতর হতে লক্ করে দেয়। কেনীথের এহেন কাজে আনায়ার কলিজা শুঁকিয়ে আসে। এই লোক আদতে কি করতে চাইছে। সে প্রচন্ড ঘাবড়ে—কিছু একটা করতে নেবে,তার আগেই কেনীথ গিয়ে নির্বিকারে সোফায় বসে পড়ে।অতঃপর নিস্পৃহে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে,একহাত মাথার পেছনে রেখে অন্যহাতে বইটা খুলে মুখের সামনে ধরে। ভাবভঙ্গি এমন যেন আশেপাশে কেউই নেই।
এদিকে আনায়া এখনো ইতস্তত ভঙ্গিতে কেনীথের ভাবগতিক পর্যবেক্ষণ করছে। বলা নেই কওয়া নেই,এভাবে দরজা বন্ধ করে এখানেই কেনো শুয়ে পড়ল?
ততক্ষণে কেনীথ বইয়ের পাতা হতে মনোযোগ সরিয়ে,আনায়ার উদ্দেশ্যে শীতল-গম্ভীর্য কন্ঠের সহিত আওড়ায়,
“এখন চুপচাপ ঘুমিয়ে যা। নয়তো আমার চেয়ে খা’রাপ কেউ হবে না।”
আনায়া আর কথা বাড়ায় না। দ্রুত গায়ে চাদর টেনে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ে।এদিকে কেনীথ নির্বিকার ভঙ্গিতে এখনো তার বইয়ে পাতায় মনোযোগী। কিন্তু প্রায় বেশ খানিকটা সময় পর, তার মনোযোগ হঠাৎ সরে যায়। কিঞ্চিৎ কপাল কুঁচকে বইয়ের আড়াল হতে, সম্মূখের দিকে তাকাতেই দেখে আনায়া চুপচাপ শুয়ে থেকেই নড়চড় করছে। এর মানে সে এখনোও ঘুমায়নি।
কেনীথ কি যেন ভেবে নিয়ে, আচমকাই বলে ওঠে,
“আনায়া!”
আনায়া কোনো জবাব দেয় না। সে সত্যিই এখনো জেগে রয়েছে। কেনীথের উপস্থিতিতে,একদমই ঘুম আসছে না।
আনায়ার কোনো সাড়া শব্দ না পেয়ে,কেনীথ নিঃশব্দে রুক্ষ হাসে। এবং নিজ হতেই আবারও আনায়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“ব্লা’ড! ডু ইউ নো হোয়াট…এই বইটার কাহিনি কি?”
কেনীথ জানে আনায়া এবারও কিছু বলবে না। চাদর দিয়ে মাথা মুড়িয়ে শুধু চুপচাপ শুনছে। যথারীতি কেনীথ আবারও নিজের মতো বলতে লাগল,
“বইটার নাম টিয়ার্স অফ টেস। ইট’স অলসো অ্যা ডার্ক রোম্যান্স বাই পেপার উইন্টার। এটা মনস্টার ইন দ্য ডার্ক সিরিজের প্রথম বই। তবে কাহিনিটা বেশ ইন্টারেস্টিং। তুই জেগে থাকলে,আশা করি এটা শুনতে তোর ভালো লাগবে।
যাই হোক,বইয়ের মেইন ক্যারেক্টার হলো টেস। শী ইজ অ্যা বিউটিফুল গার্ল,যাস্ট লাইক ইউ। কাহিনির শুরুতে ওর একটা চমৎকার বয়ফ্রেন্ডও থাকে। কিন্তু কাহিনিতে টুইস্ট আসে যখন ওরা ভ্যাকশনে মেক্সিকোতে যায়। কেননা ওখানের যাওয়ার পরই, টেসকে অপহরণ করে বিক্রি করে দেওয়া হয়। ফলে সে দাসত্ব ও মারাত্মক সে-ক্সুয়াল অ্যাবিউসের মতো কঠিন পরিস্থিতির শিকার হয়। এবং যার কাছে সে বিক্রি হয়, সেই মিস্টার কিউ তাকে একজন দাসী হিসেবেই ট্রিট করে। আই হোপ, ইউ আন্ডারস্যান্ড হোয়াট আই মিন…!”
সিরিজের পুরো ঘটনা যথেষ্ট বিস্তৃত। তবে কেনীথ এইটুকু বলেই থেমে যায়। কারণ তার ভাবনা অনুযায়ী এইটুকুতেই কাজ হয়ে যাওয়ার কথা। যথারীতি কেনীথের প্রত্যাশাসরূপ আনায়ার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এসেছে। শ্বাস-প্রশ্বাস থমকে গিয়েছে।
না! তার এসব কালো-সাদা রোমান্সের বইটই নিয়ে কোনো বিশেষ ধারণা নেই। জীবনের পুরোটা সময় সে একাডেমিক বইয়ের মাঝেই কাটিয়েছে। কিছুটা বড় হওয়ার পর পুরো সময়টা কেটেছে, গনিত আর ফিজিক্সের প্যাচালো সব ম্যাথ করতে গিয়ে। তবে কেনীথের এইসব কাহিনি শোনানোর মানে ঠিক কি হতে পারে—এটা সে ভালোই বুঝতে পারছে।যথারীতি আনায়া নিজেকে যতটা পারল, আলগোছে গুটিয়ে নিয়ে চুপটি করে শুয়ে রইল।চোখদুটো খিঁচে বন্ধ করে,ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ঘুমানোর চেষ্টা করে।এদিকে না চাইতেই কেনীথের ঠোঁটের কোণায় তির্যক হাসি ফুটে ওঠে।
ভোর প্রায় হতেই চলল। তবুও কেনীথ তার বইয়ে ডুবে আছে। প্রথমত আলোর মাঝে সে ঘুমাতে পারে না। দ্বিতীয়ত চিন্তায় তার এখনো ঘুম আসছে না। তারেক যেভাবে প্রেসে সরাসরি তার আর ভাহিদের উপর অভিযোগ তুলেছে,তাতে এসব খবর এতক্ষণে ভাহিদের কাছে নিশ্চিত পৌঁছে গিয়েছে। কিন্তু প্রেস যেভাবে বলে বেড়াচ্ছে সে সদ্য রাজনীতিতে জড়ানো এক ব্যক্তি—এটা বেশ বিরক্তিকর কিংবা হাস্যকর। দুদিন হলো দেশে এলো না, আর তাকে সোজা রাজনীতির সাথে পেঁচিয়ে দিয়েছে।
আর তার চাচা কিংবা বাবা ঠিক কতটা জটিল স্বভাবের মানুষ,তাও সে ভালো করেই জানে। যথারীতি নিজেকে সে যতই স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করুন না কেনো, চিন্তা তার ঠিকই হচ্ছে।
কেনীথ ভারী শ্বাস ফেলে, আধশোয়া হতে বসে পড়ে। অতঃপর টেবিলের উপর বইটা রেখে, আনায়ার দিকে এগিয়ে যায়। আনায়া এখন বেশ গভীর ঘুমে বিভোর। কেনীথ তার মাথার পাশে দাঁড়িয়ে থেকে, নিষ্পলক চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। চাদর-ওড়নার আড়ালে মুখটা কিঞ্চিৎ পরিমানে দৃশ্যমান।
এরিমধ্যে কেনীথের হাত অজান্তেই আনায়ার গাল স্পর্শ করে। তার ফোলাফোলা ফর্সা গালের ত্বকে,হাতের আঙ্গুলের উল্টো পিঠ দিয়ে,স্বযত্নে আলতোভাবে বুলিয়ে দেয়। নিমিষেই কাত হয়ে শুয়ে থাকা আনায়া, মৃদু কম্পনে নড়ে ওঠে। তবুও কেনীথ তার হাত সরায় না। এভাবেই আরো বেশ কিছুটা সময় অতিক্রম হবার পর, কেনীথ কিঞ্চিৎ কপাল কুঁচকে আনায়ার গা হতে চাদরটা খানিক সরিয়ে নিচে নামিয়ে দেয়। এবং তৎক্ষনাৎ খেয়াল করে দেখে,আনায়া ভেপসা গরমের ঘেমে একাকার।
ওর এহেন অবস্থা দেখে কেনীথ ফ্যানের পাওয়ারটা খানিক বাড়িয়ে দেয়। একইসাথে বিড়বিড়িয়ে মৃদু হেসে আওড়ায়,
“পাগলী!”
কেনীথ এই বলে চলে যেতেই নিয়েছিল, তবে কি যেন ভেবে পুনরায় আনায়ার মাথার ওড়না সরিয়ে চুলে হাত বুলাতে গিয়ে দেখে—চুল এখনো ভিজে। নিমিষেই তার কপাল কুঁচকে যায়। আনায়ার খাওয়ার সময় বিষয়টা খেয়াল করলেও,মাথায় ছিল না।
তৎক্ষনাৎ আনায়ার এহেন বেখেয়ালিপনায়, তার চোখেমুখে বিরক্তির স্পষ্ট ছাপ ফুটে ওঠে। দ্রুত আনায়ার বাহুজোড়া আলগোছে ধরে,তাকে ঠিকমতো শুইয়ে দেয়। অতঃপর তার পাশেই একটা টুল টেনে নিয়ে এসে বসে,আনায়ার চুলগুলো আলগোছে একত্রে বের করে ধীরে ধীরে সাদা রঙের তোয়ালে দিয়ে জড়িয়ে মুছে দিতে লাগল। একইসাথে কিছুটা রাগ ও হতাশার সহিত আওড়ায়,
“শুধু সাইজেই বড় হয়েছে,বোধবুদ্ধি সেই একই রয়ে গিয়েছে। অথচ এখনই এর বাপ একে—বিয়ে দিতে গিয়েছিল কোন আক্কেলে?”
পরদিন বিকেল বেলা। সারাদিন আনায়ার এভাবেই একা একা কেটে গেল। কেনীথকেও খুব একটা তার আশেপাশে আসতে দেখেনি। খাবারের সময় শুধু রুমে খাবার দিয়ে চলে গিয়েছে। মাঝেমধ্যে খোঁজ-খবর নিয়েছে এই যা। এদিকে আনায়ার এভাবে খুব বেশি অসুবিধা হচ্ছে না,তবে এর মানে এই না যে—এই অচেনা লোকগুলোর সাথে সে একা এই বাড়িতে থাকবে। আনায়া বারান্দা-জানালা হতে আশেপাশের জঙ্গল কিংবা দোতলা হতে নিচ তলার দূরত্ব সবটাই আন্দাজ করে নেয়। কিছু তো একটা করতেই হবে। আবার হঠাৎ তার পেটেও ব্যাথা শুরু হয়েছে। বুঝতে পারছে না, আদতে তার কি করা উচিত।
আনায়া দুপুরের গোসল আর খাওয়া-দাওয়া দুটোই করে নিয়েছে। আপাতত বাহিরে আবারও গুড়িগুড়ি বৃষ্টি নেমেছে। আনায়া কেন যেন বি’রক্ত হয়ে, কিছুক্ষণ একা একা বদ্ধ ঘরের মাঝে পায়চারী করল। অতঃপর টি-টেবিলে পড়ে থাকা কেনীথের দুই-একটা বই হাতে নিয়ে উলোটপালোট করতে দেখতে লাগল। যথারীতি রাতের কথা মনে পরতেই,সে টিয়ার্স অফ টেস বইটা নিয়ে পড়তে শুরু করে। আগ্রহবশত দেখার ইচ্ছে, রাতে কেনীথ যা যা বলতো তা আদৌও সত্যি কিনা!
যথারীতি মাঝের সহ কিছুটা পেইজ উলোটপালোট করতে পড়তে পড়তেই,আনায়া চোখ-মুখ খিঁচে বিরক্তির সাথে বইটা রেখে দিল। কি সব লেখা এতে। কিছু অংশ পড়ে তার যেন গা গুলিয়ে এলো। মনে মনে বিরক্তির সহিত আওড়ায়,
“ভালো রুচিসম্পন্ন মানুষজন এমন বাজে বই কখনোই পড়তে পারে না। চালচলন, হাবভাব যেমন শয়তানের মতো, তেমনি রুচিও তার এক।”
আনায়া শুরুতে খেয়াল হারিয়ে এসব কথা বললেও,পরক্ষণেই ভাবতে লাগল—যদি সত্যি সত্যি এই বইয়ের মতো, তার সাথেও এমন কিছু করার নিয়ত থাকে? এরা যদি সত্যিই তাকে কোনো অন্ধকার দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেয়?তখন সে কি করবে?
আনায়া কিঞ্চিৎ ঢোক গিলে নিজেকে সামলায়। দুজনের একজনকেও সকাল হতে তেমন দেখছে না। বিশেষ করে সেই কোঁকড়ানো চুলের লোকটাকে তো রাত থেকেই দেখছে না। আনায়া এবার গভীর ভাবে কিছু ভাবতে শুরু করলো। না, কিছু না করে চুপচাপ এখানে বসে থাকা সম্ভব না।
তারেক এহসান বেশ তোরজোর শুরু করে দিয়েছে,মেয়েকে খুঁজে বের করার। অন্যদিকে ভাহিদও দেশে ফেরার জন্য পারলে ছটফট শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু ডার্ক শ্যাটার্স তথা কেনীথের সবগুলো বন্ধুই যতটা পারছে,যেভাবে পারছে তাদের প্ল্যান অনুযায়ী চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কেনীথ এখানে থাকলেও,বাদবাকি বেশ কিছু বিষয় সামাল দিতে গিয়ে পাভেল রাতে এখান থেকে চলে গিয়েছে। এখন তারা যেখানে এসেছে তা শহর থেকে বেশ কিছুটা দূরে।একইসাথে পাভেলও এই এরিয়াতে রয়েছে। এবং সকালেও একবার বাড়িতে এসে কেনীথের সাথে আলাপআলোচনা করে গিয়েছে।
অন্যদিকে কেনীথ ইচ্ছে করেই আনায়ার আশেপাশে তেমন যায়নি। তার পরিকল্পনায় কিছুটা পরিবর্তন করতে হয়েছে। এবার জিততে হলে,খেলার আসল গুটি আনায়াকেই বানাতে হবে। যেহেতু এবার তার নিয়ত সৎ,তাই কোনোমতেই সে তার বাবা কিংবা চাচার কাছে হারতে রাজি নয়।
ড্রইং রুমে বসে কেনীথ এসবই ভাবনাচিন্তা করছিল। কিন্তু আচমকা ভেতরের কক্ষ হতে আনায়ার গোঙ্গানির মৃদু আওয়াজে তার টনক নড়ে। কপাল কুঁচকে রুমে প্রবেশ করে দেখে,আনায়া বিছানার এককোণায় শুয়ে,পেটে হাত চেপে কুঁকড়ে আছে। আচমকা কি হলো তা বোঝার জন্য,কেনীথ কপাল কুঁচকে তার দিকে এগিয়ে যায়।এবং বেশ উদ্বিগ্নতার স্বরে আওড়ায়,
“কি হয়েছে তোর? এমন করছিস কেনো?”
আনায়া কিছু বলে না। শুধু কেনীথের দিকে ঠোঁট চেপে করুন নজরে তাকিয়ে থাকে। বাদবাকি কেনীথ যা বোঝার তা যেন নিমিষেই বুঝে যায়। সে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব না করেই,নির্বিকারে আওড়ায়,
“প্যাড লাগবে?”
নিমিষেই আনায়া বেশম খায়। আবার তৎক্ষনাৎ নিজেকে সামলে নেয়। এছাড়া আর উপায়ও নেই। সে মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ-সূচক সম্মতি জানায়। কেনীথও আর দেরি না করে, পাভেলকে ফোন দেওয়ার জন্য উদ্বিগ্ন হয়। তবে আনায়া তৎক্ষনাৎ তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,
“প্লিজ, ওনাকে এই বিষয়ে কিছু বলবেন না।”
আনায়া বেশ ইতস্তত ভঙ্গিতে এহেন কথা বলেই,পেটে রাখা হাতটা আরেকটু শক্ত করে চেপে ধরে। এবং চোখ-মুখ খিঁচে শুয়ে, কুঁকড়ে যায়। কেনীথ আনায়ার বিষয়টা বুঝতে পেরে, ভারী শ্বাস ফেলে। অতঃপর উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
“আরেকটু কষ্ট কর। আমি এখনই নিয়ে আসছি।”
এই বলেই কেনীথ রুম থেকে বেরিয়ে যায়। এবং যাওয়ার আগে এই রুম সহ বাদবাকি দরজাও আঁটকে দিয়ে যায়। এদিকে সে বাড়ির সীমানা ছাড়িয়েছে,তা বোঝামাত্রই আনায়া একদম স্বাভাবিক হয়ে উঠে দাঁড়ায়। যদিও পেটে হালকা ব্যাথা করছে,তবে একটু আগে যা করল—তা তার অভিনয় ছাড়া কিছুই নয়। কেননা তার পরিকল্পনাও সাজানো রয়েছে। যথারীতি বেডের নিচ থেকে সে বড়সড় এক কাপড়ের দলা বের বের করে। এসব মূলত, তাকে পড়ার জন্য দেওয়া সবগুলো জামাকাপড়—বিশেষ করে ওড়নার গিট্টু বাঁধা রশ্নির মতো। এগুলো সে আগেই বানিয়ে রেখে দিয়েছে।
আনায়া দ্রুত সেসব নিয়ে বারান্দায় যায়। এবং একটুও দেরি না করে, বারান্দার রেলিং-এ কাপড়ের একটা অংশ বেঁধে বাদবাকিটা নিচে ঝুলিয়ে দেয়। অতঃপর নিচের দিকে একবার তাকিয়ে দেখে,নিজেকে সাহস জোগায়। এবং মনে মনে আওড়ায়,
“এদের হাতে ম’রার চেয়ে,এখান থেকে নিচে পড়ে ম’রা অনেক ভালো।”
এরপর আর কোনোকিছু না ভেবেই,সোজা কাপড়ের রশ্নি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করে। শুরুতে কিছুটা কষ্ট ও ভয় হলেও, শেষ অব্দি ঠিকঠাক নিচে নামতে সক্ষম হয়। আনায়া আশেপাশে তাকিয়ে একপলক দেখে নেয়। মেইনগেইটটা যথেষ্ট বড়। এই লোহার গেইট টপাকতে গেলে বেশি কষ্ট হবে। কিন্তু দেয়াল টপকাতে হয়তো বেশি একটা কষ্ট হবে না। আনায়া এই ভাবনায় আশপাশে কিছু খুঁজতে শুরু করে। কোনোকিছুর সাহায্য ছাড়া এমনি এমনি দেয়াল পার করা সম্ভব না।
যথারীতি সে বাড়ির পেছনের দিকটায় খোজাখুজি শুরু করল। কিন্তু কাজের মতো কোনো জিনিস না পেয়ে,নিমিষেই অস্থির হয়ে উঠল। এখন যদি সেই গম্ভীরমুখোটা চলে আসে,তাহলে?…সর্বনাশ হয়ে যাবে। আনায়ার এমন ভাবনাচিন্তার মাঝেই,আচমকা পেছন হতে কেউ বিদ্রুপ সরূপ কন্ঠে ডেকে ওঠে,
“তারা মাই ব্লা’ড!”
নিমিষেই যেন আনায়ার অস্থি অব্দি কেঁপে ওঠে। তৎক্ষনাৎ পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে,কেনীথ তীব্র গম্ভীর্যের সহিত—তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তার একহাতের আঙ্গুলের ফাঁকে,বেনসনের আগাটা ধোঁয়াযুক্ত আগুনের কুন্ডলীর ন্যায় জ্বলজ্বল করছে।কালো হুডি,প্যান্ট পড়া এক শান্ত-হিংস্র শিকারীর মতোই তার নিস্তব্ধ ভাবগম্ভীর্য।
মহামায়া পর্ব ৮
অজান্তেই আনায়ার ঘাম ছুটে যায়। শুষ্ক গলায় ঢোক গিলে,কয়েক’পা পিছিয়ে যায়। কেনীথের ঠোঁটের কোণে দৃশ্যমান তির্যক হাসি তাকে আরো বেশি ঘাবড়ে দেয়। আনায়া কাঁদো কাঁদো স্বরে শুধু এইটুকুই আওড়ায়,
“প্লিজ আমায় বাড়ি যেতে দিন।”
