Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ১০

মহামায়া পর্ব ১০

মহামায়া পর্ব ১০
তুশকন্যা

“প্লিজ আমায় বাড়ি যেতে দিন।”
আনায়ার কথা শেষ হতে না হতেই, কেনীথ তার হাতে থাকা সিগারেটটা নিচে ফেলে দেয়। অতঃপর তা শক্ত কালো রঙের জুতোর নিচে পিষে,আনায়ার দিকে এগিয়ে আসে। ঠোঁটের কোণে এখনোও অদ্ভুত তাচ্ছিল্যময় মৃদু হাসি। যেন সে খুব ভালো করেই জানতো,এমন কিছুই হবে। ফলে সে আর আনায়ার জন্য কোথাও না গিয়ে,তার চোখের আড়ালে বাড়ির একপাশেই লুকিয়ে ছিলো। যেমনি দেখল, সে যা ভেবেছে ঘটনা তাই—ওমনি আড়াল হতে বেড়িয়ে আসে।
কেনীথকে নিজের কাছে এগোতে দেখে,আনায়ার প্রচন্ড ঘাবড়ে যায়। সে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। তীব্র অসহায়ত্বে সহিত আওড়ায়,

“প্লিজ, আমায় যেতে দিন।!
—“আনায়া,এদিকে আয়।”
আনায়া কেনীথের দিকে না এগিয়ে,উল্টো পেছাতে শুরু করে।
—“না,আমি যাবো না। প্লিজ আমাকে বাড়ি যেতে দিন।”
কেনীথ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মৃদু হেসে বলল,
“আমার মেজাজ খারাপ করিস না। এদিকে আয় বলছি।”
আনায়া কেনীথের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতেই, কিঞ্চিৎ ঢোক গিলে।এবং আশেপাশে একপলক চেয়ে দেখে,সোজা ছুটে পালানোর জন্য দৌড়ে যায়। তবে কেনীথ তাকে বেশিদূর যাওয়ার আগেই খপ করে ধরে ফেলে।
“আমি কিন্তু চিৎকার…”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আনায়া ক্ষিপ্ততায় নিজের কথা শেষ করার পূর্বেই, কেনীথ তার মুখ চেপে ধরে। দাঁতে দাঁত চেপে, নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে। অতঃপর কোনোকিছু না ভেবেই,আনায়ার গায়ের ওড়নাটা পেছন হতে টান মেরে খুলে ফেলে। এবং তা দিয়ে, পেছন হতে তার মুখ ও ওড়নার অন্যপ্রান্ত দিয়ে একইসাথে হাতজোড়াও বেঁধে ফেলে।
কেনীথ পেছন হতে আনায়ার চুলের মুঠি টেনে ধরে, কানের কাছে মুখ নিয়ে,দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে আওড়ায়,
“এতোটাও দুঃসাহস দেখানো তোর মোটেও উচিত হয়নি, তার মাই ব্লাড!”
ব্যাথায় আনায়ার চোখের কার্নিশ বেয়ে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। সে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলেও,তা কেনীথের মাঝে প্রভাব ফেলল না। উল্টো সে আনায়াকে কাঁধে তুলে নিয়ে, সোজা বাড়ির ভেতরের দিকে প্রবেশ করল। আনায়া ভীষণ ছটফট করলেও,কেনীথ হাত থেকে তার আর বাঁচা সম্ভব হয়না।

আনায়াকে রুমে এনে সোজা বিছানার ছুঁড়ে ফেলল কেনীথ। আনায়া দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলায়। হালকা শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। ঠিকমতো কাঁদতে পারছে না। জোরে জোরে অনবরত শ্বাস ফেলছে। অন্যদিকে কেনীথ আনায়ার কাছে এগিয়ে যেতেই,আনায়া ভয়ে বিছানা হতে উঠে দাঁড়ায়। পুনরায় রুম হতে ছুটে বেরিয়ে যেতে চাইলে, কেনীথ দাঁতে দাঁত চেপে—পেছনে বাঁধা হাতের বাহু ধরে টেনে, সোজা দেয়ালে আঁচড়ে ফেলে।
বলা নেই, কওয়া নেই,সোজা গলা চেপে দেয়ালের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে। এতোটাই দৃঢ়ভাবে যে,আনায়ার শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম।

—“এতো জেদ কেনো তোর,হ্যাঁ?”
কেনীথের চাপা স্বরে বলা কথাটুকু আনায়া শুনতে পেলো কিনা, জানা নেই। তার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসছে। পা দুটো শূন্য হতে কিছুটা উপরে। অথচ কেনীথের শান্ত হওয়ার নাম নেই। একহাতে আনায়ার গলা, ও অন্যহাতে তার বাহু চেপে ধরে আছে।
যখন শ্বাস নেওয়ার জন্য, আনায়ার শ্বাসপ্রশ্বাস একদমই বেড়ে যায়—তখন গিয়ে কেনীথের কিছুটা হুঁশ ফেরে। তবে সে পুরোপুরি হুঁশের মাঝে রয়েছে,তাও নয়। তার সহজে রেগে যাওয়া অভ্যাস নেই। কারণ সে নিজেও চায় না, হুটহাট রেগে যাক। কেননা,এমনটা হওয়া মানে তার নিজের পাশাপাশি আশেপাশের সবকিছুর তীব্র ক্ষতি হওয়ার সম্ভবনা।

যথারীতি কেনীথ এই অবস্থাতেও,অদ্ভুত এক উম্মাদের ন্যায় আচরণ করছে। সে আনায়ার অবস্থা যেমন নিজ চোখে পরখ করছে,তেমনি বেশ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে আনায়ার নিখুঁত চোখজোড়া ও অধরের দিকে চেয়ে রয়েছে। কিছু একটা তো খুঁজছে সে তার মাঝে। যার কারণে তাকে তার বর্তমান আচরণে কোনো উম্মাদ সাইকো বলেও বিবেচিত করা যায়।
এরিমধ্যে কেনীথ অকস্মাৎই এক কাজ করে বসে। আনায়ার গলা হতে হাতটা সরিয়ে, তা সোজা তার মাথার পেছনে শ’ক্ত হাতে চুলের মাঝে আঁকড়ে ধরে। এবং আনায়াকে সম্পূর্ণ হতভম্ব করে, গোলাপের কোমল পাপড়ির ন্যায় আনায়ার অধরোষ্ঠ আকড়ে ধরে। আনায়া যেন এতে সম্পূর্ণ রূপে স্তব্ধ হয়ে যায়। তার চোখজোড়া বড় বড় হয় বিস্ময়ে। একইসাথে হয়ে যায় সম্পূর্ণ নিস্তেজ।

অথচ কেনীথ তাকে ছাড়ে না। আনায়া কেনীথকে সরানোর জন্য শুধু ছটফটই করে যায়। কেননা তার হাতজোড় এখনো পেছন হতে সম্পূর্ণরূপে বাঁধা। কিন্তু কেনীথ নিজের উন্মাদনায় হারিয়েছে। আক্রোশে নয় বরং আফিমের চেয়েও ভয়ংকর নেশায় মত্ত হয়েছে। চেয়েও যেন আনায়াকে ছাড়তে পারছে না।
অন্যদিকে আনায়া ততক্ষণে সম্পূর্ণরূপে নিস্তেজ হয়ে কেনীথের কাঁধের কাছে ঢলে পড়ে। নিমিষেই কেনীথের হুঁশ ফেরে।সে তাকে স্বাভাবিক ভাবে নিজের সাথে আঁকড়ে ধরে। হতভম্বের ন্যায় আনায়ার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতেই,নিজের প্রতি তীব্র রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। দাঁতে দাঁত চেপে,হাত মুঠো করে, অনিমেষেই দেওয়ালে সজোড়ে আঘাত করে—অস্ফুটস্বরে আওড়ায়,
“আঃ শিট!…গাধাআআআ!”

রাত আটটার দিকে পাভেল বাড়িতে এলো। বাহিরের অবস্থা বেশ খারা’প। তারেক এহসান পারছে না শুধু, পুরো দুনিয়া উলোটপালোট করে ফেলতে। তবে অবাক করার বিষয়,সে তার মেয়েকে খোঁজার চেয়েও বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে আছে কেনীথকে খুঁজে পেতে। যেন একবার হাতের নাগালে পেলে, এক নিমিষেই শেষ করে ফেলবে।
অন্যদিকে ভাহিদ গলাকাটা মুরগীর মতো ছটফট করছে দেশে আসার জন্য। নিজের প্রতি তার তীব্র আফসোস জমেছে—না জানি কোন কুক্ষণে, ছেলেকে সে দেশে টেনে নিয়ে এসেছিল।
অন্যদিকে কেনীথের অবস্থাও যে খুব একটা ভালো, তা নয়। আনায়া ঘুমাচ্ছে। সে ড্রইং রুমে, মাথা ঝুঁকিয়ে সোফায় বসে আছে বেশ খানিকটা সময় ধরে। পরনে কালো রঙের একটা টিশার্ট আর টাউজার। ঝাঁকড়া চুলগুলো প্রচন্ড এলোমেলো। দূর হতে তার হাবভাবও বেশ অদ্ভুত লাগছে।
এদিকে পাভেল বাড়িতে প্রবেশ করে তার এই অবস্থা দেখে বেশ অবাক হলো। নিমিষেই সে চোখমুখ কুঁচকে, কেনীথের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলল,

“ব্রো! কি হয়েছে…তুমি এভাবে বসে…”
পাভেলের কন্ঠস্বরে কেনীথ মুখ তুলে তাকায়। তাকে দেখে পাভেল আরেক দফায় চমকায়। চোখ-মুখ এমন লাল হয়ে গিয়েছে। লালচে চোখজোড়া খানিক ভেজাও মনে হচ্ছে। সে বিস্ময়ের সহিত কেনীথের উদ্দেশ্যে বলল,
“ভাই! তুমি কি কাঁদছো নাকি?”
পাভেলের অভিব্যক্তিতে কেনীথ নিমিষেই ক্ষিপ্ত স্বরে ধমকে আওড়ায়,
“যাস্ট শাট-আপ! কি বলতে এসেছিস, তা বল।”
পাভেল ধমক খেয়ে নিজেকে সামলায়। সবকিছু সুবিধার ঠেকছে না। চোখজোড়া তার খুঁজছে আনায়াকে। মেয়েটাকে আশেপাশে না দেখে বেশ চিন্তাও হচ্ছে। কৌতুহল বশত শেষমেশ সে বলেই ফেলে,
“ব্রো! আনায়া কোথায়?”

—“ঘরে, ঘুমাচ্ছে।”
—“ওহ,আচ্ছা।”
—“তুই কি কিছু বলতে এসেছিস, নাকি এটা দেখতে এসেছিস—আমি আনায়াকে মে’রে ফেলেছি নাকি বাঁচিয়ে রেখেছি।”
কেনীথের তীক্ষ্ণ অভিব্যক্তিতে পাভেল অপ্রস্তুত হয়ে হাসে।
—“আ…তা না। তোমার বন্ধুরা তো জিজ্ঞেস করছে, তোমাদের বা’সরের কি হলো। তোমায় লাইনে না পেয়ে, সবার আর কৌতুহলও মিটছে না। অথচ আনায়াকে তুলে আনার আসল কারণ তো শুধু আমিই জানি।”
কেনীথ ভ্রু উঁচিয়ে, তার উদ্দেশ্যে তীক্ষ্ণতার সহিত আওড়ায়,
“কি জানিস তুই?”

—“এই যে, তারেক এহসানের কাছ থেকে প্রোপার্টির সমস্যা গুলো মিটিয়ে,তাকে শায়েস্তা করা।”
পাভেলের সাধাসিধা কথা শুনে কেনীথ না চাইতেও হেসে ফেলে। তার হাসিতে পাভেলের কপাল খানিকটা কুঁচকে যায়। অন্যদিকে কেনীথ তার উদ্দেশ্যে তাচ্ছিল্যের সহিত তির্যক হেসে বলে,
“আমার এতোও দুর্দিন আসেনি যে,এহসানদের দুই টাকার সম্পত্তির জন্য—এসব ফালতু রিস্ক নিয়ে মন্ত্রীর মেয়েকে তুলে আনতে যাবো।”

—“তাহলে তুমি আনায়াকে কিসের জন্য এনেছো?, পাভেল বিস্ময়ের সাথে বলল।
কেনীথ তার অভিব্যক্তিতে পুনরায় তির্যক হাসে। সোফায় গা এগিয়ে,পায়ের উপর পা তুলে শুয়ে পড়ে। মাথার পেছনে এক হাত রেখে,চোখবুঁজে নিয়ে মৃদু হেসে আওড়ায়,
“হার লিপ্‌স আর সো টেন্ডার। আই জাস্ট ওয়ান্ট টু বাইট দেম।”
পাভেল হতভম্বের ন্যায় তার কথা শুনল। এরিমধ্যে কেনীথ চোখজোড়া খুলে,পাশে মুখ ফিরিয়ে তার উদ্দেশ্যে আবারও বলল,

“ইউ নো হোয়াট? আই’ভ অলরেডি টেস্টেড দেম। ইট’স জাস্ট মাইন্ড-ব্লোইং, ম্যান!”
কেনীথের এহেন কথায় পাভেলের মুখ আপনা-আপনি হা হয়ে যায়। সে ধপ করে ফ্লোরে বসে পড়ে। বিস্ময়ে তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়েছে। শেষমেশ কাঁদো কাঁদো স্বরে, সে কেনীথের উদ্দেশ্যে বলল,
“ভাই! এসবের মানে কি?”
কেনীথ স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দেয়,
“বিয়ে তো করেছিলাম। আগে বউয়ের প্রয়োজন মনে হয়নি—এখন হচ্ছে।”
পাভেল কিছুক্ষণের ন্যায় স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে। পরক্ষণেই ঢোক গিলে,নিজেকে কোনেমতে সামলে নিয়ে বলে,
“তুমি মজা করছো আমার সাথে,তাই না?”

—“মোটেও না।”
—“আর ইউ সিরিয়াস? সেদিন না বললে,সাজেকের মেয়েটাকে পছন্দ হয়েছে। এখন হুট করে আবার…”
—“ওটা আনায়াই ছিলো!”
—“কিহ্! তুমি কি করে জানলে?”
কেনীথ নির্বিকারে জবাব দেয়,
“ঐ যে, পছন্দ হলো। তোর কি মনে হয়,আমি এরপরও চুপচাপ বসে থাকবো?”
পাভেল গভীর ভাবনায় ডুবে যায়।নতুন সংশয়ে তার জান যায় যায়। কোনোমতে খানিক ঢোক গিলে,পরক্ষণেই তীব্র অনুনয়ের সাথে বলতে শুরু করে,

“আল্লাহর দোহাই লাগে! এই অকাম তুমি কইরো না। এসবের কোনো মানে হয়? আমি আগে জানলে জীবনেও তোমার কথায় রাজি হতাম না। তুমি মিথ্যে বলেছো!…আমি ওতো কিছু জানি না, আমাকে তুমি আবার জার্মানিতে পাঠানোর ব্যবস্তা করো। তোমার কসম, আমি আর জীবনেও এই দেশে আসবো না। ইমুুউউউউউ! বইনডা বাঁচা আমারে।”
ফ্লোরের মধ্যে গড়াগড়ি করে, এসব উলোটপালোট বকতে থাকা পাভেলকে সে, বিরক্তির দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে চেয়ে দেখে। পরক্ষনেই ভারী শ্বাস ফেলে, মনে মনে আওড়ায়,
“নো ম্যাটার হোয়াট! তারা উইল বি মাইন।”

সন্ধ্যা নেমে এসেছে। একটু আগেই ব্লাডেনের হেডঅফিস হতে ফিরেছে নায়রা। ফ্রেশ হয়ে, ড্রইংরুমের সোফায় গা এলিয়ে বসে আছে। চোখ-মুখে মৃদু ক্লান্তির ছাপ। তার কোল ঘেঁষে বসে আছে, জিঞ্জার কালারের ছোট্ট বিড়াল নুযা। হ্যাজেল রঙের চোখজোড়া দিয়ে, নায়রার দিকে বেশ উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে।
নায়রার অন্যপাশে গম্ভীর ভঙ্গিতে বসে আছে কেনেল। আশেপাশে কি হচ্ছে তাতে তার কোনো ভাবনা নেই। নায়রারও এদের নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা হয়না। দুদিন আগে কেনীথের আরেকটা কুকুর ক্লারাও এসেছে। ও বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ থাকায়, কেয়ার সেন্টারে রাখা হয়েছিল। তার সাথে অবশ্য নায়রার বন্ধু স্বরূপ এক সুন্দরী নারীও এসেছে। নাম তার ন্যান্সি।

আপাতত নায়রা যখন বাড়িতে থাকছে না, তখন ন্যান্সি কেনেল,ক্লারা আর নুযা সহ বাড়ির সব খেয়াল রাখছে। দীর্ঘ এতো বছরের সময়ে,এই প্রথম তাদের ট্রিও গ্রুপটার দুজনেই নেই। বাড়িটাও যেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে,তেমনি নায়রার জীবনটও কেমন যেন শূন্য হয়ে গিয়েছে।
কিন্তু এর জন্য নায়রা যে খুব বেশি হাহুতাশ করছে, বিষয়টা তা নয়। বরং তার বেশ শান্তিও অনুভূত হচ্ছে। একইসাথে হচ্ছে খানিকটা দুশ্চিন্তা। দেশে ফেরার পর, কেনীথ আর পাভেলের সাথে তার একবারই কথা হয়েছিল। এরপর আর দুটোর কোনো খোঁজ খবরও নেই। এইসব ভাবনা-চিন্তাতেই সে ভারী শ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে আওড়ায়,
“না জানি, বদমাশ দুটো কোথায় কোন ঝামেলা পাকাচ্ছে।”
এরিমধ্যে আচমকা তার ফোন বেজে ওঠে। অপরিচিত নাম্বার হতে ফোন আসায়, সে কিছুটা কপাল কুঁচকে ফোনটা রিসিভ করে। এবং প্রায় বেশ কিছুক্ষণ সময় ধরে,ফোনের অপর প্রান্তের ব্যক্তির কথাবার্তা গুলো চুপচাপ শুনতে থাকে। একইসাথে তার চোখমুখও বেশ দৃঢ় হয়।

নায়রা ফোনটা পাশে রেখে দিয়ে,জোর গলায় ন্যান্সিকে ডাকে। নিমিষেই সাদা গাউন পরিহিত এক রমণী,ক্লারাকে সাথে করে নিয়েই ড্রইং রুমে হাজির হয়। নায়রা অতিরিক্ত কথা না বাড়িয়ে, সরাসরি তার উদ্দেশ্যে বলল,
“ন্যান্সি! তুমি এদের খেয়াল রেখো। আমাকে একটা জায়গায় যেতে হবে। হয়তো একটু রাত হবে,তবে চিন্তা করো না। আমি সময়মতো ফিরে আসবো।”
এই বলেই সে, তৈরি হতে দোতলার দিকে চলে যায়। অন্যদিকে ন্যান্সিরও আগ বাড়িয়ে তাকে কিছু জিজ্ঞেস করার মতো সাহস যোগায় না।

নীলাভ অন্ধকারে নিমজ্জিত মিউনিখের গোপন উপকণ্ঠ। ধোঁয়া ও ধাতব শব্দে গঠিত এক সুরঙ্গতল নগরী। সেই সুনসান শূন্যতাকে ছেদ করে মার্সিডিজ ব্ল্যাক ফায়ার সিরিজের ম্যাট কালো গাড়িটি দৃঢ় গতিতে ভেতরে প্রবেশ করে। গাড়ির হেডলাইটের ছায়াগুলো মৃদু ছন্দে কেঁপে ওঠে।
নির্জন এই অন্ধকার রাতে,আকাশ জুরে তুষার ঝড়ছে। নায়রা দরজা খুলে দৃঢ় ভঙ্গিতে বেরিয়ে আসে। পরনে ম্যাক কুইনের কালো উল-ট্রেঞ্চ কোট। ভিতরে রক্তিম ও ধূরস রঙের মিশেলের হার্মেসের সিল্ক শার্ট। কালো কোমরে ব্লাডেন বেল্ট, পায়ে ক্রিস্টিয়ান লুবিউটানের স্টিলেটো হিল। এছাড়া হাতে কালোর মাঝে প্লেইন গোল্ডেন ডিজাইনের ‘ভি’ লেটার বসানো ব্লাডেনের পার্স কিংবা চোখে কালো গ্লাসেস—কোনোটাই বাদ রাখেনি সে। পরিস্থিতি যাই হোক না কেনো,নায়রা ইমানি সর্বদা নায়রা ইমানিই!

নায়রা আশেপাশে না তাকিয়ে দৃঢ় পায়ে, আন্ডারগ্রাউন্ড টানেলের দিকে এগিয়ে যায়। দূরে কালো কোট পড়া তিনজন লোকের ছায়া অবয়ব স্পষ্ট। মাঝের একজন শিঁড়দাড়া সোজা করে দাঁড়িয়ে,সিগারেট টানছে। সিগারেটের আগায় জ্বলজ্বল করতে থাকা, মৃদু আলোও বেশ স্পষ্ট হয়ে নায়রায় চোখে ধরা দিলো। হঠাৎ এখানে ডাকার কারণ যে সুবিধার নয়, তা সে খুব ভালো করেই জানে৷কিন্তু তার ভাবভঙ্গিও একদমই নির্বিকার।
নায়রা তাদের কাছে যেতেই, চোখ হতে নিজরে গ্লাসেসটা খুলে ফেলে। গলায় মোড়ানো ডার্ক ওয়াইন রেড মাফলারটা খানিক অতিরঞ্জিত ভঙ্গিতে, কিছুটা ঠিক করে তির্যক হেসে আওড়ায়,

“লেট ফর বিজনেস,জ্যান্টালমেন?”
লোকগুলো তার কথায় মৃদু স্বরে হাসে। তার দিকে কয়েক পা এগিয়ে এসে বলে,
“ইট’স ওকে, মিস ইমানি! তুমি যে এক ডাকেই চলে এসেছো,তাতেই আমরা খুশি।”
নায়রা ভ্রু উঁচিয়ে ভারী শ্বাস ফেলে, আবছা আলোয় কালো-সোনালী রঙের ঘড়িতে সময়টা একবার দেখে নিয়ে,রুক্ষ স্বরে আওড়ায়,
“হাতে সময় কম। হঠাৎ এখানে কেনো ডেকেছেন তাই বলুন।”

—“আপনার সাথে এস.বি. গ্রুপের কি সম্পর্ক,মিস ইমানি?”, মাঝের একজন ব্যক্তি তীক্ষ্ণ কন্ঠে এহেন কথা বলতেই,নায়রার কপাল খানিকটা কুঁচকে যায়। তবুও সে নির্বিকার স্বরে বলে,
“এই এস.বি. গ্রুপ আবার কারা?”
—“তা তো আপনিই ভালো জানেন।”
—“আপনারা কি আমাকে এখানে ডেকেছেন, মজা করার জন্য?”
—“মজা তো আমাদের সাথে আপনি করছেন,ম্যাম। খুব ভালো খেলেন আপনি।”
নায়রায় চোয়াল শক্ত হয়। কিছুক্ষণের জন্য থেমে,পরক্ষণেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলতে শুরু করে,
“আমাদের তো ডিল হয়েছিল,তাহলে এখন আমাকে এখানে ডেকে এনে,এসব কি তামাশা করা হচ্ছে?”
—“তামাশা আপনি করছেন। পিঠপিছে আমাদের শেষ করার জন্য, ঐ এস.বি. গ্রুপের সাথে হাত মিলিয়েছেন।”
—“আরে,ইডিয়ট! কারা এই এস.বি. গ্রুপ। আমি চিনি না এদের।”
এই বলেই, নায়রা পেছনে ফিরে বেশ বিরক্তির সাথে চলে আসতে নেয়। তবে তৎক্ষনাৎ লোকগুলো তাকে থামাতে বলে ওঠে,

“কথা শেষ না করে কোথায় যাচ্ছেন আপনি?”
নায়রা চোয়াল শক্ত করে, পেছনে ফিরে তাকিয়ে বলল,
“এসব ফালতু আলাপ শোনার জন্য আমি নিজের সময় নষ্ট করতে ইচ্ছুক নই। আর হ্যাঁ,আপনাদের সাথে যা ডিল হয়েছিল তা সব বাদ।”
—“বাদ মানে, আপনি আমাদের ফাঁসিয়ে দিচ্ছেন। এর ফল কিন্তু… ”
—“হুমকি দিচ্ছেন?”

নায়রার পাশাপাশি সেই তিনজনও বেশ ক্ষিপ্ত হয়ে রয়েছে। কিন্তু চারজনই নিজেদের যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। নায়রার তীক্ষ্ণ কথায়, মাঝের ব্যক্তিতে ঠোঁট হতে সিগারেট সরিয়ে,গম্ভীর স্বরে মৃদু হেসে বলে,
“ইমানি ম্যাম! নিয়ম বদলছে।”
ব্যক্তিটির কথার উদ্দেশ্য নায়রা ঠিকই বুঝতে পারে। এখানে আর বেশিক্ষণ থাকার কোনো মানে নেই। ভেতরের ঘটনা কি তা নায়রা এখনো ঠিক বুঝতে পারেনি, কিন্তু কেনীথ আর পাভেল যে এখন দেশে নেই এটা হয়তো এরা খুব ভালো ভাবেই জেনে গিয়েছে। আর এই সুযোগে একটা চাল চেলে দেওয়ার ভাবনায় রয়েছে।
নায়রা বিষয়গুলো মাথায় রেখেই,নিজেকে শান্ত করে। তবুও লোকটির কথায় জবাবে তীক্ষ্ণ কন্ঠে দাঁতে দাঁত পিষে আওড়ায়,

—“যারা নিয়ম বদলায়, আমি তাতের বদলে দেই।”
এই বলেই সে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। কিন্তু একজনের চোখের ইশারায়, আচমকাই তিনজন লোক নিজেদের কোটের পকেট হতে শান্ত ভঙ্গিতে পিস্তল বের করে। এবং তা শুরুতেই টের পাওয়ায়, নায়রার এক মূহুর্তও দেরি হয়না নিজের পার্স থেকে ক্রোম প্লেটের পিস্তল বের করতে। এটা সে আগেই লোডেড করে রেখেছিল। কিন্তু সে লোকগুলোর চেয়ে একধাপ এগিয়ে,তাদের সম্পূর্ণ হতভম্ব করে দিয়ে—কোনো প্রকার সংকেতবিহীন একের পর এক তিনটি শর্টে তিনজনের বুক চিঁড়ে দেয়। খুব আশ্চর্যজনকভাবেই, লোকগুলোর সামান্য সুযোগও হয়না নায়রাকে অন্তত একটিবার আঘাত করার। অবশ্য তাদের নির্দেশও দেওয়া রয়েছিল,শুরুতেই যেন কোনো পদক্ষেপ না নেয়। কিন্তু নায়রার এহেন পদক্ষেপ, তাদের জন্য একদমই অপ্রকাশিত।

তিনজনে নিচে পড়ে যেতেই, নায়রা আলগোছে পিস্তলটা পার্সে ভরে নেয়। এবং দৃঢ় পায়ে তিনটি অর্ধচেতন দেহের দিকে এগিয়ে যায়। খানিকটা মৃদু হেসে, মাঝের লোকটির দিয়ে চেয়ে থাকে। এবং এক হাঁটু গেড়ে,নিচে বসে লোকটির পাশ হতে পড়ে থাকা সিগারেটটা তুলে নেয়। সিগারেটের আগায় হালকা আগুনের কুন্ডলী জ্বলজ্বল করছে। তা নিভে যাওয়ার আগেই,সে নির্বিকার ভঙ্গিতে তা তুলে নিয়ে তার লিপস্টিকের প্রলেপে মোড়ানো ঠোঁটে চেপে টান দিয়ে,ধোঁয়া ছাড়ে। নিমিষেই লোকটি খানিকটা কেঁপে ওঠে। অথচ নায়রা নির্বিকার ভঙ্গিতে বলতে লাগল,
“আমি খুব ভালো করেই জানি,তোরা কার লোক। বেঁচে থাকলে,উনাকে গিয়ে বলে দিস—ইমানিকে ধরা এতোটাও সহজ নয়।”

এই বলেই সে উঠে দাঁড়ায়। হাত থেকে সিগারেটটা ফেলে দিয়ে,হিলের আগা দিয়ে পিষে ফেলে। এবং সেখান থেকে চলে আসতে নেবে,এমন মূহুর্তে পাশের একজন পিস্তল হাতে নিয়ে তাকে লক্ষ করে শুট করবে—ঠিক তৎক্ষনাৎ তা তার নজরে পড়তেই,সরু হিলের গোড়া দিয়ে হাতের মধ্যে চেপে ধরে। লোকটি ব্যাথায় চেঁচালেও,তাতে নায়রার মাঝে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া হয়না। সে লাথি দিয়ে হাত থেকে পিস্তলটা সরিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলে। এবং সরাসরি বুকের উপর পা তোলে। তীব্র দৃঢ়তার সহিত হাই-হিল দিয়ে বুকের উপরটা পিষে,চোয়াল শক্ত করে বলে,

“সো ন্যাস্টি!”
এই বলেই সে পা নামিয়ে নেয়। এবং সেখান হতে চলে যেতে যেতে আওড়ায়,
“নেগোশিয়েশন কমপ্লিট।আই যাস্ট ফা-ক দিস হুরেন-জোন।”
পরক্ষণেই সে উল্টো ঘুরে, পার্স থেকে নিজের ডার্ক ওয়াইন রেড লিপস্টিকটা বের করে—নিখুঁত ভঙ্গিতে হাঁটতে হাঁটতেই আরো এক প্রলেপ ঠোঁটে লাগিয়ে, তা পুনরায় পার্সে রেখে দেয়। এবং চুলগুলো হালকা ফ্লিপ করে পেছনের দিকে ঝেড়ে—চোখে কালো রঙের গ্লাসেস পড়ে নিয়ে, নাটুকে ভঙ্গিতে বিরক্তির সাথে, তির্যক হেসে আওড়ায়,
“সো ন্যাস্টি!”

কেনীথ ধীর পায়ে রুমে প্রবেশ করে।আনায়া বিছানার এককোণায় এখনো গা ঢেকে চুপটি করে ঘুমিয়ে আছে। সে ভারী শ্বাস ফেলে,দরজাটা খানিক চাপিয়ে দেয়।
আনায়ার কাছে গিয়ে নিঃশব্দে তার পাশে দাঁড়ায়। অতঃপর ফ্লোরে হাঁটু গেড়ে তার মুখোমুখি হয়ে বসে। আনায়া ধীরে ধীরে শ্বাস নিচ্ছে। ফর্সা মুখটা ফ্যাকাশে দেখাচ্ছে।
কেনীথ আলতোভাবে তার গালে হাত ছোঁয়ায়। অর্ধমুঠো আঙ্গুলগুলোর পিঠ দিয়ে,গালে আলতোভাবে বুলিয়ে দেয়। আনায়া ঘুমের মাঝেই কিঞ্চিৎ ফুঁপিয়ে নড়ে ওঠে। পুনরায় হারিয়ে যায় ঘুমের ঘোরে।
গাল থেকে হাত সরিয়ে ,কেনীথ তার গলার দিকে নজর দেয়। তার শক্ত হাতের আঙ্গুলের ছাপ স্পষ্টভাবে ফুটে রয়েছে। অনিমেষেই কেনীথ মৃদু মলিন হাসে। গালজুড়ে তার বড়সড় হাতটা একপাশে তীব্র নমনীয়তা সহিত আগলে ধরে,আনায়ার কপালে আলতোভাবে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। পরক্ষণেই বিড়বিড় করে করুন স্বরে আওড়ায়,

“সরি।”
কেনীথ আর সময় নষ্ট করে না। আনায়া জেগে গেলে সমস্যা। তবে আনায়ার শারীরিক অবস্থার এতো দুর্বলতায় সে বেশ অবাক হয়েছে।তার কাছে,মেয়েটা একটু বেশিই দূর্বল ঠেকছে।
কেনীথ ভারী শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ায়। আনায়া হতে সরে আনতে নেবে,এমন মূহুর্তে আচমকা তার নজর পড়ে আনায়ার হাতে। যেখানে যেখানে ছুঁইয়েছিল, সব জায়গায় কেমন লালচে-কালচে দাগ পড়ে গিয়েছে। কেনীথ না চেয়েও কিঞ্চিৎ ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলে। একইসাথে সে আনায়ার মুখের দিকে আবারও তাকিয়ে, মৃদু হেসে আওড়ায়,
“ঠিকমতো ধরার আগেই এই অবস্থা! সামালতে বেশ কষ্ট হবে।”

রাত প্রায় সারে এগারোটা বাজে। শহরে আবারও গোলামাল হয়েছে। তারেক এহসানের লোক এই শহর অব্দিও চলে এসেছে। যথারীতি পাভেল আর উপায় না পেয়ে,আবারও বাড়ি ছেড়েছে।
এদিকে আনায়ার পাশাপাশি, কেনীথও সোফায় নির্দ্বিধায় ঘুমাচ্ছে। অবশ্য রাতও এখন বেশ গভীর। কিন্তু আচমকাই কেনীথের ঘুম ভেঙে যায়,কারো মৃদু গোঙ্গানির স্বরে।
কেনীথ কপাল কুঁচকে, চমকে আনায়ার দিকে ফিরে তাকায়। আচমকা হঠাৎ আনায়ার কি হলো?
কেনীথ দ্রুত উঠে আসে। আনায়া চোখ-মুখ খিঁচে, কুঁকড়ে রয়েছে। তখনকার মতো পেটে শ’ক্তভাবে হাত দুটো চেপে রেখেছে। আর অদ্ভুত ভাবে গোঙ্গানির স্বরে আওড়াচ্ছে,

“মা..মা..আ…মার…কষ্ট হচ্ছে। অনেক, ব্যাথা কর…ছে।”
বিড়বিড় করে আওড়াচ্ছে,আর চোখ-মুখ ক্রমশই বারংবার খিঁচে ফেলছে। কেনীথ তার পাশে বসে,তাকে ঠিকমতো বসাতে চাইলে আনায়া উল্টো আরো বেশি কুঁকড়ে যায়। কেনীথ নিজেও চোখ-মুখ কুঁচকে বলে ফেলে,
“আনায়া কি হয়েছে তোর? দেখ,এখন নিশিরাত। তুই ড্রামা করলে কিন্তু খুব খা’রাপ হয়ে যাবে।”
কেনীথের কথা আনায়া শুনতে পায়না কিনা জানা নেই। তবে কিছুক্ষণের মাঝে কেনীথ ঠিকই বুঝতে পারে,আনায়া অভিনয় করছে না। নিমিষেই সে নিজেও কিছুটা ঘাবড়ে যায়। এমন কি হলো যে,আনায়া এমন করছে!
কেনীথ আনায়াকে নিজের সাথে আগলে নিয়ে, বসানোর চেষ্টা করে। যদিও তাতে খুব একটা কাজ হয়না। আনায়া তার বুকের একপাশের টিশার্ট শক্তহাতে খিঁচে ধরেছে। অন্যহাত কেনীথের কব্জি বরাবর। এমনভাবে শক্তকরে আঁকড়ে ধরেছে যে,তার নখগুলো কেনীথের হাতের মাংসে ডেবে যাচ্ছে।

কেনীথ তাতে ভ্রুক্ষেপহীন রয়ে,হাত দিয়ে আনায়ার গাল আঁকড়ে, তাকে নিজের দিকে মুখ তুলে তাকানোর চেষ্টা করে। তবে আনায়া এখনো একইভাবে চোখ খিঁচে থাকে। এবং শুধু বিড়বিড় করে আওড়ায়,
“মা,ব্যাথা করছে। মা…”
—“তারা,এতো রাতে আবারও ড্রামা করছিস। এবার কিন্তু সত্যিই…”
কেনীথ বলতে বলতেই থেমে যায়। তীক্ষ্ণ নজরে আনায়াকে পরখ করে দেখে। কিছু একটা ভাবতে ভাবতেই তার নজর পড়ে —বিছানার চাদরে ও আনায়ার জামায়। লালচে লাগ দেখে, সে যা বোঝার তা নিমিষেই বুঝে যায়। কিন্তু এখানে তো প্রয়োজনীয় তেমন কিছুই নেই। আনায়ার যা অবস্থা তাতে তো হট ওয়াটার ব্যাগও প্রয়োজন। কিন্তু এখানে এসবের কিচ্ছু নেই।
কেনীথ আনায়াকে শ’ক্ত করে, নিজের সাথে আঁকড়ে ধরে,দ্রুত পাভেলকে ফোন করে। কিন্তু কয়েকবার চেষ্টা করেও,তার কোনো রেসপন্স পাওয়া যায় না। নিমিষেই তার কপাল কিছুটা কুঁচকে যায়। সে দ্রুত তার এক বন্ধুকে কল দিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“এই শহরে পাভেল ছাড়া তোদের মধ্যে কেউ আছে?”
—“না তো,ওখানে তো শুধু পাভলেই আছে। আর একটা কথা—শুনলাম, ওখানে সিচুয়েশন নাকি খুব খারা’প। আজ রাতভোর পুলিশ আর তোর চাচার লোকজন ঐ শহরে খোঁজ চালাবে।এরপর নাকি তোদের বাড়ির এলাকার দিকে চলে যাবে। তুই সাবধানে থাকিস। ভুলেও বাড়ির বাহিরে বের হইস না।”
নিমিষেই কেনীথের মেজাজ খা’রাপ হয়ে যায়। কোনো উত্তর না দিয়েই,সে ফোনটা কেটে দেয়। এখন আনায়ার জন্য জিনিসগুলো আনতে যাবে কে! একে তো এভাবে ফেলে রেখে যাওয়াও সম্ভব না।
কিন্তু সে আর উপায়ও পেলো না। পাভেলকে আরো দুবার ফোন করেও কোনো লাভ হলো না। শেষমেশ তিক্ত হয়ে, আনায়াকে দু’হাতে জড়িয়ে আঁকড়ে ধরে,তীব্র সংশয়ের সাথে আওড়ায়,

“তারা, আমার কথা শুনছিস? প্লিজ একটু আমার কথা শুন। আমি যাস্ট একটু সময়ের জন্য বাহিরে যাবো। তুই প্লিজ নিজেকে একটু সামলে নে। একদম চিন্তা করবি না,আমি এক্ষুনি চলে আসবো,আই প্রমিজ।”
কেনীথ আর সময় নষ্ট করে না। আনায়া হিতাহিতজ্ঞানশূন্যের ন্যায় আচরণ করছে। সে শুধু তার মা-কেই ডেকে যাচ্ছে। গা-টাও বেশ গরম। আনায়াকে বিছানার শুইয়ে দিয়ে, সে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে পড়ে। যাওয়ার পূর্বে, আনায়াকে আরো একপলক দেখে নেয়। কিন্তু আর কিছুই করার নেই। তাকেই যেতে হবে।
সে দ্রুত বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পড়ে। পাভেল বাইক নিয়ে গিয়েছে,আর এইমূহূর্তে গাড়ি বের করা অসম্ভব। তবে সে এখানকার রাস্তা টুকটাক চেনে। আপাতত এই সময় কাছেই কোনো ফার্মেসি পেয়ে গেলেই হলো।

কোনোমতে অল্প কিছু সময়ের মাঝেই সে জঙ্গলের সর্টকার্ট রাস্তা ধরে বাজারের কাছ অব্দি চলে আসে। এবং শুরুতেই ফার্মেসির দেখা পেয়েই স্বস্তিতে ভারী শ্বাস ফেলে। কিন্তু একইসাথে সে কিছুটা আশ্চর্যও হয়, চারপাশের আবহ বুঝতে পারে। পুলিশ ইউনিফর্মে দুই-একজন আশেপাশে ঘুরাঘুরি করলেও,সে খুব ভালো করেই বুঝতে পারে এখানে পুলিশ ইউনিফর্ম ব্যতীত সিভিল ড্রেসে তারেক এহসানের অনেক লোকজন রয়েছে। এরমধ্যে পুলিশের থাকাটাও অস্বাভাবিক কিছু না।
কেনীথ নিজের হুডির টুপিটা আরো বেশ খানিকটা টেনে নেয়। কাছের ফার্মেসিতে গিয়ে, প্রয়োজন অনুযায়ী জিনিসগুলো দ্রুত নিয়ে নেয়। তবে যে চলে আসবে,ঠিক তৎক্ষনাৎ তার পাশে ক্রেতা হিসেবে একজন লোক এসে দাঁড়ায়। যদিও কেনীথ বুঝে গিয়েছে,এ কোনো ক্রেতা নয়। কিন্তু তাতে তার কি! আপাতত এখান থেকে যেতে পারলেই হলো।
কিন্তু তার যাওয়ার পথেই লোকটি তার উদ্দেশ্যে বলল,

“কি ভাই, এতো রাতে এসব?”
কেনীথ হুডির টুপির আড়ালে, মৃদু রুক্ষ হেসে আওড়ায়,
“বউয়ের জন্য।”
তার কথায় লোকটি খানিকটা হেসে ফেলল। মাথা ঝুঁকিয়ে টাকা পরিশোধ করতে থাকা কেনীথকে—আড় চোখে পরখ করে তিনি আবারও বলে,
“এগুলো তো আগে থেকেই রাখা দরকার। রাত-বিরাতে একসাথে এতোকিছু…”
—“নতুন বিয়ে। অনেক কিছুই শেখার বাকি। দোয়া রাখবেন।”
কেনীথ গম্ভীর স্বরে এইটুকু বলেই,জিনিসগুলো নিয়ে দোকান হতে বেরিয়ে পড়ে। সেই লোকটিও পেছন ঘুরে,সন্দিহান নজরে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই আওড়ায়,
“জ্বী অবশ্যই!”

কেনীথ তড়িঘড়ি করে কোনোমতে বাড়িতে এলো। আশেপাশে না তাকিয়ে সোজা রুমে প্রবেশ করতেই দেখে,আনায়া বিছানায় নেই। সে আশ্চর্য হয়ে চারপাশে নজর ফেরাতেই,আনায়ার গোঙানির আওয়াজ শুনতে পায়। সে দ্রুত এগিয়ে যেতেই দেখে,আনায়াকে বিছানার যে পাশে রেখে গিয়েছিল, ঠিক তার নিচেই ফ্লোরে পড়ে রয়েছে। একইসাথে ব্যাথার চোটে গোঙাচ্ছে।
কেনীথ এসব দেখে,ক্ষণিকের ন্যায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। দাঁতে দাঁত চেপে, নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে ভারী শ্বাস ফেলে। অতঃপর জিনিসগুলো বিছানার একপাশে রেখে—সোজা আনায়ার কাছে এগিয়ে গিয়ে তাকে টেনে বসায়।
আনায়ার অবস্থা সেই একই রয়ে গিয়েছে। ঠিকমতো তাকাচ্ছেও না। তবুও কেনীথ নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বলল,

“প্লিজ একটু চেঞ্জ করে আয়। এভাবে পড়ে থাকলে আরো বেশি অসুস্থ হয়ে যাবি।”
কেনীথ আনায়াকে বুকে আগলে নিয়ে,মাথা উঁচু করে কিছু একটা খোঁজে। মাথা তার নিজেরও এখন ঠিকমতো চলছে না। বিছানার পাশে রাখা ব্যাগ খুলে, সেখান থেকে একটা ছোট প্যাডের প্যাকেট বের করে টেবিলের উপর রাখে। সংশয়ে মৃদু কম্পনে হাত কাঁপছে তার—এমন সময়েও নিজের অজান্তে সে আনায়ার কপালের চুলগুলো,আলগোছে সরিয়ে দেয়।

“তারা, ধীরে ধীরে ওঠার চেষ্টা কর। চিন্তা নেই,আমি ধরে আছি।”
আনায়ার ঠোঁট নড়ে, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোয় না। কেনীথ দু’হাতে তাকে তুলে বসায়। মেয়েটির গা এতটাই দুর্বল যে, সে প্রায় অচেতন। কেনীথ একহাতে তার পিঠে ভর দিয়ে, অন্য হাতে তার চুল সরিয়ে দেয়, যেন মুখে বাতাস লাগে।
মুহূর্ত কয়েক পরে, আনায়া নিঃশব্দে বলে ওঠে,

“আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে। আমি আর সহ্য করতে…আমি…”
—“আমি জানি। কিন্তু একটু দাঁড়ানোর চেষ্টা কর, তারপর বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আয়। আমি দরজার বাইরে থাকবো, ভয় পাবি না, ঠিক আছে?”
কেনীথের কণ্ঠ নরম, তবুও দৃঢ়।সে ধীরে ধীরে আনায়াকে দাঁড়াতে সাহায্য করে। আনায়া কাঁপতে কাঁপতে কয়েক পা এগোয়। পরক্ষণেই প্রায় হোঁচট খায়। কেনীথ তৎক্ষণাৎ এগিয়ে গিয়ে তাকে ধরে ফেলে। কিন্তু হাতের স্পর্শও যেন সতর্কতা ও শ্রদ্ধায় ভরা, অপরাধবোধে মোড়া।

—“ডোন্ট ওয়ারি,আমি আছি…।”
আনায়া কোনোভাবে বাথরুম পর্যন্ত পৌঁছায়। দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দ হয়। বাইরে দাঁড়িয়ে কেনীথ গভীর নিঃশ্বাস ফেলে।বুকের ভার যেন একটু হালকা হলো, আবার ভারীও।
তবে সে পরক্ষণেই গিয়ে বাদবাকি কাজগুলো সেরে ফেলে। শুরুতে কিচেনে গিয়ে গরম পানির ব্যবস্তা করে। অতঃপর দ্রুতই আবার রুমে ফিরে আসে। চাদর নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সে দ্রুত সেগুলো তুলে ফেলে। কাভার্ড খুলে নতুন চাদর বিছানায় বিছিয়ে দেয়।

নিজের পরনের হুডি-প্যান্ট চেঞ্জ করে নতুন, একজোড়া কালো রঙের প্যান্ট আর টিশার্ট পড়ে নেয়। মাঝেমধ্যে কাজের ফাঁকে খেয়াল রাখে,ভেতরে সব ঠিক আছে কিনা। জানে আনায়া উত্তর দেবে না।তাই সে পানির পড়াী শব্দ ও বাদবাকি আওয়াজেই আনায়ার উপস্থিতি নিশ্চিত করে, নিজেকে আশ্বস্ত করে।
এদিকে হটব্যাগে গরম পানি ঢালতে গিয়ে কেনীথ আরেক গড়বড় করে ফেলে। জার্মানিতে রান্না বেশিরভাগ সময় নায়রাই করতো। মাঝেমধ্যে পাভেলও তাকে সাহায্য করতো। কিন্তু সে এসবের ধারেকাছেও যেতো না। এখন না যাওয়ার ফল হারে হারে টের পাচ্ছে। সামান্য গরম পানি তুলতেই,হাতের উপর গরম পানি ফেলে হাত পুরিয়ে ফেলল।

কেনীথ পারলো না শুধু, রাগের চোটে সবটুকু গরম পানি নিজের মাথায় ঢালতে।দাঁতে দাঁত চেপে কোনোমতে নিজেকে শান্ত রেখে, হাতে খানিকক্ষণ ঠান্ডা পানি ঢেলে—হটব্যাগটা নিয়ে রুমে যায়।
মিনিট ত্রিশেক পর, বাথরুমের দরজা ধীরে খুলে যায়। আনায়া পরিষ্কার কাপড়ে, ক্লান্ত কিন্তু কিছুটা স্থির হয়ে বেরিয়ে আসে। তার মুখে তবুও ফ্যাকাশে রঙ, চোখদুটো অবসন্ন। হাত-পা কাঁপছে অনবরত। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার মতো শক্তি আর তার হলো না।
কেনীথ এগিয়ে তার কাছে যেতেই, সে তার উপর একপ্রকার সবটুকু ভর ছেড়ে দেয়। কেনীথের বুকের টিশার্ট খাঁমচে ধরে। বুকের একপাশে মুখ গুঁজে, অস্ফুটস্বরে আওড়ায়,

“মা…মা…”
আনায়া ধীরে ধীরে শ্বাস নেয়। এবং শুধুমাত্র একটি শব্দই আওড়ায়। অন্যদিকে কেনীথ যেন সবকিছু বুঝতে পেরেও চুপ। সে তার নিজের বিবেকের খেলাতেই হেরে যাচ্ছে।
কেনীথ আনায়াকে সোজা কোলে তুলে নেয়। আলগোছে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে,তার পাশেই আধশোয়া হয়ে বসে পড়ে। সাইড টেবিলের উপর থেকে,হটব্যাগটা তুলে নিয়ে আনায়ার তলপেটের উপর আলতোভাবে রাখে।
আনায়া পুনরায় কুঁকড়ে যেতেই, সে তাকে জড়িয়ে নিজের সাথে শক্তভাবে আগলে নেয়। যেন এই গুটিয়ে থাকা ছোট্ট দেহটাকে সে, নিজের বুকে ভেতরে প্রবেশ করিয়ে ফেলবে।
কেনীথ গায়ে চাদর টেনে দিয়ে,আনায়ার চুলে হাত বুলিয়ে দেয়। তার কপালে আলতোভাবে ঠোঁট ছুঁইয়ে, চোখ বুঁজে অস্ফুটস্বরে আওড়ায়,
“সরি!”

সূর্যের তীক্ষ্ণ আলোয় আনায়ার ঘুম ভেঙে যায়। আড়মোড়া ভেঙে ঘুম থেকে উঠতেই, তার কপাল কুঁচকে যায়। চারপাশটা খানিক অদ্ভুত লাগছে। সে ভালোভাবে তাকিয়ে দেখল,না ঠিকই আছে। গতকাল মা’র খেয়ে ঘুমিয়েছিল,কিন্তু এরপর? আনায়া কিছু মনে করতে চেয়েও, গোলকধাঁধায় হারিয়ে গেল।
নিজের দিকে তাকাতেই,আরো কিছুটা অবাক হলো। গায়ে চাদর টেনে ঘুমিয়েছে সে। পেটের কাছে হটব্যাগ। মাথার কাছে স্যানেটারি ন্যাপকিনের প্যাকেট। আনায়া সবকিছু দেখে কিছুটা অবাক হলো। তার নিজের জামাটাও পরিবর্তন। সে চোখ-মুখ খিঁচেও তেমন কিছুই মনে করতে পারল না।
শেষে হতাশ হয়ে বিছানা হতে উঠে দাঁড়ায়। পেটে তেমন ব্যাথা নেই। অথচ প্রতিবার এই সময়ে তার ম’রার দশা হয়। আনায়া ফ্রেশ হয়ে, রুম থেকে বের হয়। আশ্চর্যজনক ভাবে পুরো বাড়িতে কেউ নেই। সে কিছুটা সন্ধিহান নজরেই চারপাশে নজর বুলিয়ে নেয়। কাউকে আশেপাশে না পেয়ে,আচমকাই সে কিছুটা খুশি হয়। কিন্তু দরজাটা কাছে গিয়ে,আবারও মুখটা মিইয়ে যায়।

অবশ্য তারই ভুল,গাধার মতো ভেবে বসেছে দরজা হয়তো খোলা থাকবে। আনায়া ভারী শ্বাস ফেলে,বাড়ির আর রুম গুলোতে একবার ঘুরে আসে। ঐ একটা রুম ব্যতীত, তার আর কোথাও ঘুরে দেখার সুযোগ হয়নি।
আশেপাশে রুমগুলো পরিষ্কার। সাধারণ ফার্নিচার ব্যতীত তেমন কিছুই নেই। আনায়া কৌতুহল বশত, বাড়ির পেছন পাশের, বারান্দার দিকে এগিয়ে যায়। সেখানে গিয়েই সে কিছুটা চমকে ওঠে।
বাড়ির সীমানা পেরিয়ে,দূরদূরান্তর অব্দি জঙ্গল ব্যতীত আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তার নজর পড়েছে ভিন্ন কোথাও। আনায়া চুপচাপ নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে। বাড়ির পেছন পাশের জায়গাটুকুতে সকাল সকাল ভালো রোদ পড়েছে। আর সেখানেই তার টানিয়ে, কাপড় নাড়ছে কেনীথ।

যেখানে বিছানার চাদর হতে আনায়ার গতকাল পড়া কাপড়-চোপড় সবই রয়েছে। আনায়া বেশ অবাক হয়েই, এই অদ্ভুত লোকটা কাজকর্ম দেখতে থাকে।
কেনীথকে দেখে মনে হচ্ছে, সে সদ্য গোসল সেরেছে। পরনে কালো প্যান্ট আর একটি টিশার্ট। নতুনত্ব বলতে তেমন কিছুই নেই। কিন্তু সূর্যের আলোয় তার ফর্সা গা যেন একটু বেশিই চিকচিক করছে। না চাইতেও,কেনীথের পেশিবহুল হাতজোড় আনায়ার কাছে একটু বেশিই নজর কাড়ে।
কেনীথ উল্টোদিকে ছিলো বিধায়,সে আনায়াকে দেখতে পায়নি। কিন্তু যেই পেছন ঘুরতে নিয়েছে,ওমনি আনায়া নিজের ধ্যান থেকে বেরিয়ে এসে, তৎক্ষনাৎ নিজেকে তটস্থ করে। কেনীথের নজরে ধরা পরার আগেই,কিঞ্চিৎ ঢোক গিলে বারান্দা থেকে দ্রুত রুমে চলে আসে।

সকালের খাবার কেনীথ নিজে দাঁড়িয়ে থেকে,আনায়াকে খাইয়ে দিয়ে গিয়েছে। একইসাথে তার ব্যাথা আচমকা কিছুটা বেড়ে যাওয়ায়, সে তাকে পেইন কিলারও খাইয়ে দিয়েছে।
আপাতত আনায়া বিছানার এককোণে চুপটি করে বসে আছে। সে কোনো এক বিশেষ ভাবনায় মগ্ন। এই লোকটার নাম এখনো জানা হয়নি। আবার লোকটার চালচলনও বেশ অদ্ভুত। গতকাল এই লোকটা যখন মে’রেছিল,তখন তাকে খুব খা’রাপ মনে করছিলো আনায়া। কিন্তু আজ আবার ভিন্ন কিছু মনে হচ্ছে। আনায়া এসব ভাবনাতেও আনমনেই বলে ফেলে,

“সন্ত্রাস, কিডনাপাররাও এতো সুন্দর হয়?”
নিজের কথায় আনায়া নিজেই বেশম খায়। পরক্ষণেই তার অকস্মাৎ মনে পড়ে,গতকাল মা’র খেয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার আগমুহূর্ত। নিমিষেই তার হাত আপনা-আপনি নিজের ঠোঁটে চলে যায়। সে বিস্ময়ের সাথে আওড়ায়,
“ওই লোকটা না আমায় তখন…ওটা কি সত্যি ছিলো নাকি এটাও…ধুর। এটা কেমন মাথা। অর্ধেক জিনিসই ঝাপ্সা মনে হচ্ছে।”
আনায়া আবারও স্বাভাবিক হয়। বাস্তবতা আর ভাবনাকে সে গুলিয়ে ফেলছে। সে আবারও কপালটা খানিক কুঁচকে বলতে থাকে,

“ওনাকে আমার চেনা চেনা লাগছে কেনো,তাই তো বুঝতে পারছি না। কোথাও তো একটা দেখেছি। না, দেখেছি কিন্তু মনে হচ্ছে সে কোথাও না কোথাও আমার খুব কাছেই ছিলো। খুব কাছে,খুব কাছে…আ…গলার কন্ঠস্বর…আ…কিছু তো একটা…”
আনায়া হিসেবটা মেতালে চেয়েও মেলাতে পারছে না। আচমকাই তার রাঙ্গামাটি ট্রিপের কথা মনে পড়ে। সেখানেই কি তবে…? আনায়ার ভাবনার হিসেব পরিপূর্ণ হবার আগেই,রুমের ভেতর কেনীথ প্রবেশ করে।
তাকে এভাবে অদ্ভুত ভঙ্গিতে,কিছু একটা ভাবনাচিন্তা করতে দেখে তার কপাল কিছুটা কুঁচকে যায়। আনায়াও তাকে দেখে নিজেকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক করে ফেলে। অন্যদিকে কেনীথ আনমনে তার কাছে হেঁটে যায়।আনায়ার দিকে একটা বড়সড় বক্স এগিয়ে দেয়। আনায়া কিছু না বলে,তার দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। কেনীথ ভারী শ্বাস ফেলে,নির্বিকারে আওড়ায়,

“ডার্ক চকলেট—আরো লাগলে জানিয়ে দিস।”
আনায়া নজর ফিরিয়ে বক্সটার দিকে তাকায়। এতোগুলা চকলেট? তাও আবার বলছে, আরো লাগলে জানিসে দিস৷ কিন্তু কথা হলো,সে যে ডার্ক চকলেট পছন্দ করে তা ইনি কি করে জানলো? নাকি এমনিতেই এনেছে?
যাই হোক না কেনো,এরা আসলে চায়টা কি! তার জন্য এতো যত্ন-আত্তি আর খরচই কেনো করছে? কোনো বড়মাপের কারো কাছে তাকে বেঁচে দিবে? বিশেষ পাচার করবে? নাকি অন্যকিছু?
—“অহেতুক এতো ভাবনা চিন্তা বাদ দে। আমি না চাইলে ম’রে গেলেও, তুই আমার থেকে দূরে সরতে পারবি না।”
অকস্মাৎ কেনীথের অভিব্যক্তিতে আনায়া খানিকটা চমকায়। নিজেকে সামলে নিয়ে, ধীর স্বরে আওড়ায়,
“আপনারা কি চান?”

কেনীথ তার দিকে তাকিয়ে খানিকটা কপাল কুঁচকে বলল,
“আমরা কি চাই মানে?জিজ্ঞেস কর, আমি কি চাই।”
আনায়া কিছুটা ইতস্তত ভঙ্গিতে, কেনীথ গম্ভীর মুখটার দিকে তাকায়৷ পরক্ষণেই নজর সরিয়ে বলে,
“আপনি কি চান?”
—“জানাটা কি খুব জরুরী?”
আনায়া উত্তর দেয় না। কেনীথ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকার পর বলল,
“কি খাবি বল? মিক্স ফ্রুটস খাবি?”
আনায়া মাথা নাড়িয়ে আওড়ায়,
“খাবো না আমি কিছু।”

কেনীথ চোয়াল শক্ত করে তার দিকে তাকায়। পরক্ষণেই ভারী শ্বাস ফেলে শান্ত হয়। নিজ হতেই, একটা প্লেটে দুটো আপেল,ছুরি আর কিছু কমলা এনে আনায়ার মুখোমুখি হয়ে, এক পা ঝুলিয়ে বিছানায় বসে। এতে আনায়া নিজেকে কিছুটা গুটিয়ে, মাথা নুইয়ে ফেলে।
অন্যদিকে কেনীথ বেশ মনোযোগের সহিত, ছুরি দিয়ে আপেলের খোসা ছাড়ানোর চেষ্টা করে। আনায়া শুধু বসে বসে,আঁড়চোখে তার কাজকর্ম দেখে যায়। এমন নয় যে সে খুব পরিপক্ব ভাবে,আপেলের খোসাটা ছাড়াতে পারছে। বরং তা ছিলতে গিয়ে কখনো আপলের চেহেরা এবড়োখেবড়ো হচ্ছে,তো কখনো বিরক্তিতে কেনীথের মুখের ভাবভঙ্গি বিগড়ে যাচ্ছে।

আনায়া তার ভাবগাম্ভীর্যে কিছুটা অবাকই হলো। তবুও আগ বাড়িতে কিছু বলার ইচ্ছে তার নেই। একইসাথে এটাও খেয়াল করলো,কেনীথের বাম হাতের একপাশটা কেমন ফোস্কা পড়ে লাল হয়ে রয়েছে। এটা কিভাবে হলো,তা জানার ইচ্ছে জাগলেও আনায়া কিছুই বললো না।
অন্যদিকে কেনীথ আপেলের খোসাটা কোনোমতে ছাড়িয়ে নিয়ে,তা হতে একফালি কেটে নেয়। তাতে ছুরির সরু মাথাটা খচ করে ঢুকিয়ে,অকস্মাৎ আনায়ার মুখের সামনের ধরে।
তার এমন আচরণে অল্পের জন্য, আনায়ার বুকটা ধক উঠেও থেমে যায়। খানিকটা ইতস্ততের সহিতই,নির্বিকার ভঙ্গিতে বসে থাকা কেনীথকে একবার দেখে নিয়ে, আপেলের টুকরোটা মুখে তোলে।
কেনীথ পুনরায় নির্বিকারে নিজের মাথা ঝুকিয়ে, পরের টুকরোগুলোও কাটতে লাগল। একইসাথে আনায়ার উদ্দেশ্যে গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল,

“তো কি জানতে চাইছিলি বল। তোকে কি করা হবে, তাই তো?”
আনায়া জবাবে শুধু মাথা ঝাকায়। কেনীথ ভারী শ্বাস ফেলে,আরো একটি আপেল টুকরো তার মুখের সামনে ধরে বলল,
“তো তোর কি মনে হয়,তাই বল।”
আনায়া খানিকটা ঢোক গিলে,আপেলের টুকরো মুখে তুলে,বেশ ইতস্তত ভঙ্গিতে বলতে লাগল,
“আপনি আমায় বিক্রি করে দেবেন।”
আনায়ার কথা শুনে কেনীথ ভ্রু উঁচিয়ে তার দিকে তাকায়। খানিকটা তাচ্ছিল্যের সহিত তির্যক হেসে বলে,
“তোকে বিক্রি করে আমার লাভ কি?টাকা পাবো? হাহ্! বাপ-চাচার এতো টাকা থাকার পরও, তোর শরীরের যা হাল! এ দিয়ে কিছুই হবে না।”

আনায়া আর কিছু চেয়েও বলতে পারে না৷ ভারী শ্বাস ফেলে চুপ করে বসে থাকে। অন্যদিকে কেনীথ নিজ হতেই, পুনরায় তাকে জিজ্ঞেস করে,
“হঠাৎ বিক্রি করে দেওয়ার কথা মাথায় এলো কেনো?”
আনায়া ইতস্তত ভঙ্গিতে তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আপনিই না সেদিন ঐ গল্পটা শোনালেন৷ সেখানে মেয়েটাকে বিক্রি করে…”
“টেসের কথা বলছিস?”, আনায়ার কথা শেষ হবার আগেই কেনীথ বলে। আনায়া আলতোভাবে মাথা ঝাকায়। কেনীথ কি যেন ভেবে, তাচ্ছিল্যের সহিত চাপা হেসে আওড়ায়,
“তো আমিও তোকে বিক্রি করে দেবো,তাই তো? এরপর একটা বই লিখবো। নাম দেবো টিয়ার্স অফ তারা। তারপর বেস্টসেলার হয়ে ট্রিলিওনিয়ার হবো,রাইট?”

কেনীথ যে মশকরা করছে তা আনায়া ভালোই বুঝতে পারল। আর কথা বাড়ানোর ইচ্ছে নেই। সে চুপচাপ পুরো আপেলটা খেয়ে নেয়। অন্যদিকে কেনীথ এবার কোমলার খোসা ছাড়াতে লাগে। একইসাথে আনায়াকে কিছুটা অবাক করে দিয়ে,সে বেশ মনোযোগ দিয়ে প্রতিটি কোয়ারও খোসা ছাড়িয়ে,আনায়ার মুখের সামনে নির্বিকারে ধরে।
আনায়া তা নিস্পৃহে মুখে নিলেও,কিছুটা সন্ধিহান নজরে তার দিকে আঁড়চোখে তাকায়। কেনীথ পুনরায় আনায়াকে খোসা ছাড়ানো কোমলার কোয়ার অর্ধেকটা খাইয়ে দিয়ে, আচমকা বাদবাকিটা নিজে খেয়ে নেয়। নিমিষেই আনায়া চমকে পিটপিট করে কেনীথের দিকে তাকিয়ে থাকে। যদিও কেনীথের ভাবভঙ্গি একদমই স্বাভাবিক। কিন্তু তার এইসব কাজকর্মে সে অনেক বেশি অবাক হলো।
শেষে আনায়া আর নিজের কৌতুহল থামাতে না পেরে,অনিমেষেই বলে ওঠে,
“একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”
কেনীথ মাথা নিচু করে, কোমলার খোসা ছাড়াতে ব্যস্ত।আনায়ার কথায়, বেশ গম্ভীর স্বরে আওড়ায়,
“হু!”

—“আমি কি আপনাকে চিনি?”
—“তা আমায় কেনো জিজ্ঞেস করছিস,এটা তো তোর ভালো জানার কথা।”
আনায়া কিছুক্ষণের জন্য থেমে,পরক্ষণেই কন্ঠস্বর দৃঢ় করে আওড়ায়,
“আমার পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কে আপনি কি করে জানেন? বিশেষ করে,এই যে আপেল কিংবা কোমলার কোয়ার খোসা ছাড়ানোর ব্যাপারটা—আমি যে এভাবেই খাই,তা আপনি কি করে জানলেন?”
কেনীথ খোসা ছাড়িয়ে আনায়ার দিকে হাত এগিয়ে দিতে নিয়েছিল।কিন্তু আচমকা তার প্রশ্নে সে নিজেও থমকায়। হাতের দিকে তাকিয়ে দেখে,সে সত্যি সত্যিই এই কাজটা করছে।নিমিষেই কেনীথের কপাল খানিক কুঁচকে যায়। তবে নিজের ভাবনায় মত্ত হওয়ার আগেই,আনায়ার উৎসুক চাহনিতে নিজেকে তটস্থ করে। পরক্ষণেই শান্ত-গম্ভীর স্বরে আওড়ায়,

“আমিও এভাবেই খাই।”
কেনীথ এই বলেই উঠে যেতে নিলে,আনায়া আবারও কপাল কুঁচকে বলে,
“আর আমার নাম! আমার নাম যে ‘তারা’, তা কি করে জেনেছেন?”
কেনীথ যাওয়ার পথে থেমে গিয়ে,পেছনে ফিরে তাকায়। নির্বিকার ভঙ্গিতে উৎসুক আনায়াকে একপলক দেখে নিয়ে বলে,
“তোকে কিডন্যাপ যেহেতু করেছি—সেক্ষেত্রে সব খোঁজ খবর নিয়েই তো করব,তাই না?
কেনীথ আর কথা বাড়ায় না। রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে আনায়ার উদ্দেশ্যে আবারও বলে,
“বাদবাকিটুকু নিজেই খেয়ে নিস। খাবার যেন নষ্ট হয়না।”

বিকেলের দিকে পুনরায় পাভেল বাড়িতে এলো। তবে এবার ভিন্ন কোনো খবর নিয়ে। কেনীথ আর সে আপাতত এই বিষয়েই,বেশ চিন্তাভাবনা করে আলাপ-আলোচনা করে যাচ্ছে। আবার আনায়ার শরীরের অবস্থা নিয়েও তারা ভাবছে।
—“আনায়ার এখন কি অবস্থা? তুমি বলছিলে ও অনেক বেশি অসুস্থ।”
—“হুম,ওর হেল্থ কন্ডিশন একদমই বাজে। যা আমার কল্পনারও বাহিরে।”
এই বলেই কেনীথ ভারী শ্বাস ফেলতেই,পাভেল কিছু একটা ভেবে নিয়ে বলে,
“এসব কি ঐ কারণেই?”
কেনীথ মুখ তুলে উৎসুক পাভেলের দিকে তাকায়। কিছুক্ষণ সময় নিয়ে,শুধু হালকাভাবে মাথা ঝাঁকায়।
—“হয়তো।”
পাভেল তার কথায় ভারী শ্বাস ফেলে। পরক্ষণে সে নিজেও বলতে লাগল,

“ভাই,ওদিকের অবস্থাও তেমন একটা ভালো না। এবার এইখান থেকে সরতে হবে। তারেক এহসান আরো বেশি পাগলামি শুরু করেছে। ফুপা দেশে আসার জন্য জানপ্রাণ লাগিয়ে দিচ্ছে। গত কয়েকদিন থেকে আমাদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছে। যদিও সব জায়গায় বলা হয়েছে,আমরা কাউকে না জানিয়ে ট্যুরে এসেছি। কিন্তু তারা এটা মানছে না। অন্তত এবার আমাদের সরাসরি তাদের মুখোমুখি হতে হবে।

আর তোমার চাচা এবার চট্টগ্রামে আসতে চাচ্ছে। একে তো ফুপাও দেশে নেই। তারেক এহসান নিজেই না জানি, কি কাহিনি করে বসে। আবার তুমি যা ভাবছো,তা-ও আমি কখনো কল্পনা করিনি। তোমার ফ্রেন্ডদের সবাই জানে,তুমি আনায়াকে বউ হিসেবে চাও—তাই তুলে নিয়ে এসেছো। আর তারাও ঠিক এই কারণে তোমায় সাহায্য করেছে। অথচ আমাকে বলেছিলে,ভিন্ন কিছু। কিন্তু এখন তো দেখছি, তুমি আমাকেই মিথ্যে বলেছো। সে যাই হোক,এখন কি করতে চাইছো বা কি করবে তা অন্তত বলো। তোমাকে ফেলে তো আর আমি,একা একা জার্মানিতেও ফিরতে পারবো না।”
কোঁকড়ানো চুলগুলো দু’হাতে টেনে পেছনে ঢেলে দেয় পাভেল। কেনীথের আসল উদ্দেশ্যে জানার পর থেকে,নিজেরই মাথা ঘুরছে। সে যা চাইছে,তা কেউ মানবে না। কিন্তু এভাবে লুকিয়েই বা আর কতদিন। কেনীথ নিজে কি পরিকল্পনা করে রেখেছে,তা-ও ঠিকঠাক বলছে না।

অন্যদিকে কেনীথ তার সব কথা শুনে,দীর্ঘ ভারী শ্বাস ফেলে। খানিকটা ভেবেচিন্তে নিয়ে বলে,
“তো ঠিক আছে,আজ রাতেই এখান থেকে সরাসরি আমরা এহসান মঞ্জিলে ফিরবো।”
কেনীথের কথায় পাভেল, কিছুটা সন্দিহান স্বরে আওড়ায়,
“তারপর? বাড়ির সবাইকে গিয়ে কি বলবে? আমরা এতোদিন ট্যুরে ছিলাম? এই জন্য যোগাযোগ করতে পারিনি?”
—“মিথ্যে কেনো বলবো?”
“তো সত্যিটা বলে দেবে?”,পাভেল বিস্ময়ের সাথে আওড়ায়। কেনীথের নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
“হুম।”

পাভেল কিছু একটা ভেবে নিয়ে আবারও বলে,
“তাহলে আনায়াকে কি করবে? ওকে কোথায় রেখে যাবো?”
পাভেলের অভিব্যক্তিত্বে কেনীথ কিছুটা বিরক্ত হলো। রুক্ষ স্বরে সে বলতে লাগল,
“তুই এতো গাধা কেন? আমরা বাড়ি ফিরলে,অবশ্যই আনায়াও আমাদের সাথেই যাবে। ওকে আবার কোথায় রেখে যাবো?”
এবার যেন পাভেল ভালোভাবেই বেশম খেলো। খানিকটা ভড়কে যাওয়ার ভঙ্গিতে বলে ওঠে,

“মানে কি? তুমি কি ভাবো আর কি বলো,তাতে তোমার কোনো হুঁশ আছে? ফুপা এখন দেশে নেই, ঠিক আছে। আনায়াকে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে,বাকিদের না হয় বুঝিয়ে-সুঝিয়ে সত্যিটা বলে ম্যানেজ করে নেবে। কিন্তু এরপর? একটু আগেই না বললাম,তারেক এহসান লোকজন সাথে নিয়ে নিজে এবার চট্টগ্রাম আসছে। কেনো আসছে,বুঝতে পারছো না? ওরা অবশ্যই এহসান মঞ্জিলেও আসবে। আর ওখানে গিয়ে আনায়াকে পেলে,আর কারো সাধ্য আছে আমাদেরকে বাঁচানোর?”

মহামায়া পর্ব ৯

পাভেলের উদ্বিগ্নতায় কেনীথ মৃদু তির্যক হাসে। তার হাসিতে পাভেলের কপাল কুঁচকে যায়। তবে কেনীথ বরাবরের মতোই নির্বিকার ভঙ্গিতে দৃঢ় কন্ঠে আওড়ায়,
“সিংহের খেলা পিঠপিছে নয়, তপ্ত মাটিতে চোখে চোখ রেখে হয়; কারণ গোপনে আঘাত কেবল কাপুরুষের ধর্ম।”

মহামায়া পর্ব ১১