মহামায়া পর্ব ১১
তুশকন্যা
রাত বারোটা বাজতে না বাজতেই, কেনীথ আর পাভেল আনায়াকে নিয়ে গেস্ট হাউজ ছেড়ে এহসান মঞ্জিলের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে। কেনীথ বেশ গম্ভীর্যের সাথে ড্রাইভিং করছে,আর তার পাশে চুপটি করে ভীতু হয়ে বসে আছে আনায়া। পেছনের সিটে পাভেল হিসেব মেলাতে ব্যস্ত।
আনায়ার বেশ ভয় হচ্ছে, এরা তাকে এবার কোথায় নিয়ে যাচ্ছে,কে জানে। হাবভাবও বেশ সুবিধার নয়। কিছু জিজ্ঞেস করতে চেয়েও,ভয়ে আর সাহস হচ্ছে না। তবে আনায়া সংশয়ে-অস্বস্তিতে খানিকটা উসখুস করছে বিধায়—কেনীথ তা টের পেয়ে,রুক্ষ স্বরে বলল,
“এতো নড়াচড়া করছিস কেনো?রাত হয়েছে,ঘুম পেলে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়।”
কেনীথের কথায় আনায়া হতাশ হলো। অন্যদিকে পেছন হতে পাভেল,বিরক্তি ও তাচ্ছিল্যের সহিত আওড়ায়,
“হ্যাহ্,ঘুমিয়ে পড়! জান হাতে নিয়ে ঘুরতে হচ্ছে, এই পরিস্থিতিতে কার ঘুম আসবে।”
কেনীথ পাভেলের কথা শুনতে পেলেও,উত্তরে কিছুই বলল না৷অন্যদিকে আনায়ার কাছে পাভেলকে শুরু থেকেই কিছুটা ভালো মনে হয়। ফলে সে খানিক দ্বিধা নিয়েই,পাভেলের উদ্দেশ্যে বলল,
“আমরা এখন কোথায় যাচ্ছি।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
—“জাহান্নামে।”,পাভেলের উত্তর দেওয়ার আগেই,কেনীথ বলল। পাভেল অনিমেষনেত্রে একঝলক কেনীথকে দেখে নিয়ে,আনায়ার উদ্দেশ্যে ভারী শ্বাস ফেলে বলে,
“চিন্তা করো না, আমরা ভালো জায়গাতেই যাচ্ছি। ওখানে গিয়ে দেখবে অনেক অনেক ভালো মানুষ আছে।”
পাভেলের আদতে কি বলা উচিত তা সে নিজেও জানে না। মাথাটা ঘুরছে কেবল। অন্যদিকে আনায়ার মাঝে আবারও ভয় ঢুকেছে। অনেক অনেক ভালো মানুষ বলতে কি বোঝালো? তার মতো আরো অনেককেই এরা ধরে নিয়ে কোথাও রেখেছে, আর তাকে-ও ঠিক সেখানেই নিয়ে যাচ্ছে?
রাত বাজে প্রায় সাড়ে তিনটা। এহসান মঞ্জিলের সকলেই এখন ঘুমে আচ্ছন্ন। কিন্তু কাশফিয়ার চোখে ঘুম নেই। সে শত চেষ্টা করেও,গত কয়েকদিন হতে ঠিকঠাক ঘুমাতে পারছে না। ছেলেদের চিন্তাভাবনায় সে নিজেও এখন পাগলপ্রায়। এরিমধ্য আচমকা বাড়ির ভেতরে গাড়ির আগমনের আওয়াজে, তার ধ্যান ভাঙলো।
কে এসেছে তা দেখতে, বারান্দায় না গিয়ে সোজা রুম থেকে বেরিয়ে এলো। ততক্ষণে আগুন্তকঃ দরজায় কড়া নাড়তেই,সে সরাসরি দরজা খুলে দেয়। চোখের সামনে কেনীথ আর পাভেলকে এই অবস্থায় দেখে,কাশফিয়ার কপাল খানিক কুঁচকে যায়। অন্যদিকে তারা দুজনও আশা করেনি, এই সময় কাশফিয়াকে পাবে।
—“মা,তুমি এখনো ঘুমাওনি?”
কেনীথের কথায়, কাশফিয়া রুক্ষ স্বরে জবাব দেয়,
“আমার কথা বাদ। ক’দিন হতে কোথায় ছিলি তোরা?আর তোর নামে ওসব কি ছড়িয়েছে? জানিস তোর বাবা কেমন পাগলামি করছে। আর কত অশান্তি করবি, বল তো?”
শুরুতেই কাফশিয়ার ক্ষিপ্ততায় পাভেল ভড়কায়। কেনীথ নিজেকে শান্ত রেখে, অদ্ভুত স্বরে আওড়ায়,
“মা!”
তার এই একটি শব্দই কাশফিয়ার মনে অজানা সংশয় জাগায়। সে বেশ সন্দিহান দৃষ্টিতে কেনীথের দিকে তাকাতেই,কেনীথ আলগোছে দরজা হতে সরে দাঁড়ায়। ওমনি কাশফিয়ার নজরে দৃশ্যমান হয় আনায়া।
আনায়া কিছুই বুঝতে পারছে না। তবে দুজনের কথোপকথনে এইটুকু তো বুঝেছে, এটা কোনো খা’রাপ জায়গা নয়—বরং এইলোকগুলোর পরিবার। কিন্তু কাশফিয়ার বিস্মিত নজর যেন আর কোনোমতেই স্বাভাবিক হয়না।
সে আনায়া হতে কোনোমতে নজর সরিয়ে, কেনীথের দিকে সংশয়ের নজরে তাকায়। কেনীথ ঠোঁট ভিজিয়ে, তার দিকে এগিয়ে যেতে ধরে। কিন্তু তৎক্ষনাৎ কাশফিয়া তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,
“এক সেকেন্ড, এটা কে?”
—“হ্যাঁ,মা। আমি বলছি…”
—“চুপ করো তুমি,কাছে আসবে না। আগে বলো এই মেয়ে কে?”
কাশফিয়ার সংশয় কেনীথের কাছে স্পষ্ট। সে ভারী শ্বাস ফেলে, চাপা স্বরে আওড়ায়,
“মা,ও আনায়া।”
কেনীথ জানে এরচেয়ে বেশি কিছু বলার আর প্রয়োজন নেই। যথারীতি কাশফিয়া মুখ ফিরিয়ে আনায়ার দিকে বিস্ময়ের নজরে তাকিয়ে থাকে। পরক্ষণেই হতভম্বের নায় কেনীথ আর পাভেলের দিকে তাকিয়ে,করুন স্বরে আওড়ায়,
“আব্বা!”
কাশফিয়ার চোখমুখ শুকিয়ে গিয়েছে। নিজেও জানে না কি বলবে। অন্যদিকে কেনীথ কিছু বলছে না দেখে,সে পাভেলের দিকে তাকায়। পাভেল তার ভাবগম্ভীর্য বুঝতে পেরে, কিছুটা তাচ্ছিল্যের সহিত বলে,
“আমার দিকে তাকিয়ে আর কি লাভ। তোমার ছেলেকেই জিজ্ঞেস করো।”
কাশফিয়া প্রচন্ড হতাশ হয়ে, কেনীথের দিকে পুনরায় ফিরে তাকায়। চিন্তায় তার ঘাম ছুটে গেছে। অন্যদিকে কেনীথ ততক্ষণে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, মায়ের কাছে এসে আলতোভাবে দু’হাতে আগলে জড়িয়ে ধরে। এবং তৎক্ষনাৎ সে তার মায়ের কানের কাছে, মুখ এনে ধীর স্বরে বলতে লাগল,
“মা, প্লিজ হেল্প করো।…বিশ্বাস করো,এবার আমি কোনো খা’রাপ কিছু করিনি। তুমি যদি এই মূহুর্তে তোমার ছেলেকে সাহায্য না করো, তবে আর কে সাহায্য করবে, বলো তো?”
কেনীথ মুখ তুলে মায়ের দিকে তাকায়। কাশফিয়ার নজর তখন মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আনায়ার দিকে। কাশফিয়া ভারী শ্বাস ফেলে,কেনীথের দিকে তাকিয়ে ধীর স্বরে বলে,
“ও সব জেনে-বুঝেই এসেছে তো?”
কাশফিয়ার প্রশ্নের উত্তরে, তৎক্ষনাৎ জবাব দিতে গিয়ে, কেনীথ কিছুটা থমকায়। পরক্ষণেই তটস্থ হয়ে, মাথা নাড়িয়ে বলল,
“না, কিছুই জানে না। এমনকি আমি কে কিংবা তোমাদের কাউকেই হয়তো ও চিনবেও না।”
—“তার মানে তুই ওকে সত্যি তুলে নিয়ে এসেছিস?নিউজে যা ছড়িয়েছে তার সবটাই সত্যি?”,কাশফিয়া বিস্ময়ের স্বরে বলে। কেনীথ মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দেয়,
“হুম।”
—“কেনো করলি এটা?”
কেনীথের বোঝা হয়ে গিয়েছে,কাফশিয়া সহজে গলবে না। তবে সে-ও নাছোড়বান্দা। এই মূহুর্তে তার মা যদি তার হাতছাড়া হয়ে যায়, তাহলে তার বাবাকে বুঝিয়ে সামলানোর মতো আর কেউ থাকবে না। যথারীতি কেনীথ আবারও নরম স্বরে আওড়ায়,
“মা! যত যাই হোক,বিয়েটা তো হয়েছিল, তাই না? তো কি করবো বলো,আমারই বউ তো! চোখের সামনে অন্য কোথায় বিয়ে হচ্ছে—এটা কিভাবে সহ্য করতাম?”
—“এবার একটু বেশিই হয়ে গেল না? এখন কোন মুখে বউ বউ করছো?”
—“মা প্লিজ,তুমি অন্তত এমন করো না।”
—“তো আর কি করবো?তুমি জানো, তোমার বাবা পাগল হয়ে গিয়েছে দেশে আসার জন্য। একবার এসে এসব দেখলে,ধারণা আছে তোমার—কি হতে পারে?এতোবছর পর আবারও সেই অশান্তি। জানি না কপালে কি আছে।”
—“আহ্,তুমি এসব নিয়ে টেনশন করো না৷ তুমি যাস্ট বলো,তুমি আমার সাথে আছো।বাদবাকিটা আমি সামলে নেবো।”
কেনীথ দৃঢ় গলায় এহেন কথা বলে থামে। আপাতত কাশফিয়ার উত্তর জানতে উৎসুক সে। তবে কাফশিয়া তিনজনকে একনজরে পরখ করে,কেনীথের উদ্দেশ্যে বলল,
“যাও, এখন ঘরে যাও। অনেক রাত হয়েছে।”
কেনীথ তার মায়ের অভিব্যক্তিতে আশ্বস্ত হয়।এবং তৎক্ষনাৎ আনায়ার হাত ধরে, দোতলার দিকে পা বাড়াতে নিলে—কাশফিয়া ধমকের স্বরে বলল,
“ওকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছো?”
—“কেনো, রুমে যাচ্ছি। অনেকটা পথ জার্নি করে এসেছে,ঠিকমতো ঘুম হয়নি তো ওর।”
—“আব্বা, আমি তা জানি। তাই ওকে রেখে, নিজে চুপচাপ নিজের রুমে গিয়ে ঘুমাও।”,দাঁতে দাঁত পিষে কাশফিয়া বলল।
—“কিন্তু মা…”
—“যাস্ট শাট আপ! যাও এখান থেকে।”
অকস্মাৎ কাফশিয়ার এহেন অভিব্যক্তিতে কেনীথ খানিকটা হতভম্ব হলো। দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে তটস্থ করে আওড়ায়,
“আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি একাই যাচ্ছি।”
এই বলেই কেনীথ আনায়াকে রেখে পা বাড়ায়। একইসাথে বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়,
“এমনিতেও আমি তেমন কিছুই করতাম না।”
ছেলের এহেন কথা শুনতে পেয়ে, কাশফিয়া বেশ বিরক্তির সাথে আওড়ায়,
“বদমাশ।”
তবে কেনীথকে পুনরায় তার কাছে ফিরে আসতে দেখে,সে আবারও কিছুটা অবাক হলো। অন্যদিকে কেনীথ তার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলে,
“মা!”
—“আবার কি হলো?”
—“আগে এক্টু শোনো। ওর না মা’ন্থলি চলছে। রাতের বেলায় ঘুমের মাঝে পেটে অনেক বেশি ব্যাথা করে। তুমি ওর একটু খেয়াল রেখো। আর হ্যাঁ,এখনই ওকে আমাদের বিষয়ে কিছু বলার প্রয়োজন নেই। সময় হলে,আমিই বলবো। কিন্তু প্লিজ তুমি কিছু বলবে না।”
কেনীথ এই বলেই,কাশফিয়ার মাথার একপাশে হাত রেখে,তার কপালের মধ্যিখানে টুপ করে চুমু খায়। এবং তৎক্ষনাৎ তাকে ছেড়ে দিয়ে, চুপচাপ ঘুরে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় চলে যায়। অন্যদিকে কাশফিয়া তাকে পেছন হতে তাকিয়ে থেকে দেখে,ভাবতে লাগল—‘ছেলেকে কি তার একটু বেশিই অদ্ভুত লাগছে না? নাহ্,বেশ কিছুটা তো অদ্ভুত বটেই!”
কেনীথ চলে যেতেই,কাশফিয়া স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আনায়ার দিকে এগিয়ে আসে। তবে পাশেই পাভেলকে এখনো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে,কিছুটা রুক্ষ স্বরে বলল,
“তুমি এখনো এখানে দাঁড়িয়ে কি করছো? যাও,নিজের ঘরে যাও।”
—“মামুনি! রাগ করছো? বিশ্বাস করো,আমার কোনো দোষ নেই। তোমার ছেলে আমাকে মিথ্যে বলে ফাঁসিয়েছে।”
পাভেলের নমনীয়তা ও করুন স্বরে কাশফিয়া গলে না। ভারী শ্বাস ফেলে বলে,
“হ্যাঁ,তোমার তো কখনোই কোনো দোষ থাকে না। খালি ভাইয়ের সঙ্গটাই ভালো মতো দিতে পারো। কোথায় ওকে উল্টোপাল্টা কাজ করতে বাঁধা দিবে…,উল্টো নিজেই ওর সঙ্গ ধরে বসে থাকো।…আমার মাথা খারা’প না করে, এখন উপরে যাও।”
পাভেল আর কথায় বাড়ায় না। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে চলে যেতে পা বাড়ায়। তবে তখন তখনই আচমকা কাশফিয়ার মাথায় টুপ করে চুমু খেয়ে, ছুটে পালিয়ে আওড়ায়,
“লাভ ইউ মামুনি।”
কাশফিয়ার আরেকদফায় অবাক চোখে,চলে যেতে থাকা পাভেলকে দেখে। সবগুলোর ভাবভঙ্গি পরিবর্তন! এমন ভাব করছে যেন, কোনো অসাধ্য সাধন করে এহসানদের নাম উজ্জ্বল করে এসেছে।
কাশফিয়া তীব্র হতাশায় ভারী শ্বাস ফেলল। আনায়ার দিকে ফিরে তাকিয়ে দেখে,মেয়েটা এখনো মাথা নুইয়ে তাকিয়ে রয়েছে। কাশফিয়া গিয়ে দরজাটা শক্তভাবে লাগিয়ে দেয়। এবং আনায়াকে বেশ খানিকক্ষণ অদ্ভুত নজরে পরখ করে। কত্ত বড় হয়ে গিয়েছে মেয়েটা! শেষবার যখন দেখেছিল তখন…কাশফিয়া সেসব ভাবতে গিয়েই থমকে যায়। পুরোনো কথা ভাবতে নিলে, অসময়ে অশ্রুজল ঝড়া ব্যতীত আর কিছুই ঘটবে না। সাথে অবশ্য সকলের হাহাকারের স্মৃতিগুলোই ভেসে উঠবে।
—“ভোর হতে অনেকটা দেরি। তুমি আমার সাথে এসো। হালকা একটু ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে যাও। কথাবার্তা না হয় সকালেই হবে।”
আনায়া মাথা তুলে একপলক কাশফিয়াকে দেখে। মৃদু আলোয় তার চেহেরাটা খুব স্পষ্ট ভাবে দেখতে না পেলেও,নারীটিকে তার কেন যেন বিদেশিনী মনে হলো। তবে সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য হয় নারীটির চোখের কোণায়, সামান্য জলবিন্দু চিকচিক করতে দেখে। অথচ চোখ-মুখে তার কাঠিন্যের তীব্রতা স্পষ্ট। আনায়া বিষয়টা বুঝতে না পারলেও,চুপচাপ কাশফিয়ার সাথে সাথে এগিয়ে যায়।
আজ ভোর বেলাতেই আনায়ার ঘুম ভেঙেছে। যথারীতি সকাল সকালই সে কাশফিয়ার কথামতো গোসল সেরে নিয়েছে। এদিকে রুমে প্রবেশ করতেই দেখে,কাশফিয়া তার জন্য,মিষ্টি রঙের শাড়ি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আনায়াকে দেখে সে মৃদু হেসে বলে,
“এই বাড়িতে তোমার বয়সী আরো একটা মেয়ে আছে। ওর নাম রোজ। কিন্তু মেয়েটা খাওয়াদাওয়ার প্রতি একটুও যত্নশীল না। শরীরও দিনে দিনে শুকিয়ে কঙ্কালসাড় হচ্ছে। তাই ওর গাউন তোমার গায়ে ঠিকঠাক হবে না। হলেও, তা পড়ে থাকতে তোমার কিছুটা কষ্ট হবে। তার চেয়ে তুমি বরং, শাড়ি পড়ো।…শাড়ি পড়তে পারো তো?”
আনায়া কাশফিয়ার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শোনে। শেষাংশের প্রশ্নের জবাবে, মাথা নাড়িয়ে আওড়ায়,
“না।”
কাশফিয়া তার দিকে চেয়ে থেকে মৃদু হাসে।
—“সমস্যা নেই,তবে আমি পড়িয়ে দিচ্ছি।”
কথামতো কাশফিয়া আনায়াকে নিজ হাতেই বেশ ভালো করে সাজিয়ে-গুছিয়ে শাড়িটা পড়িয়ে দিতে লাগল। শেষে কুঁচি ঠিক করতে গিয়ে, সে নিস্পৃহে আনায়ার উদ্দেশ্যে বলে,
“তুমি আমাদের কাউকেই চেনো না, তাই না?”
আনায়া খানিকক্ষণ চুপ থেকে আওড়ায়,
“আ…নাহ।”
কাশফিয়া ভারী শ্বাস ফেলে। আনায়াকে একবার পরখ করে, মৃদু হেসে বলে,
“যাদের সাথে এসেছো,তাদেরকেও চেনো না, তাই তো?”
—“হুম…তবে আপনি হয়তো ওনাদের মা। এইটুকু বুঝেছি।”
আনায়ার ইতস্তত অভিব্যক্তিতে, কাশফিয়া নিঃশব্দে হেসে বলল,
“ঠিকই ধরেছো, আমি ওদের মা। ঐ যে গম্ভীরমুখো একটা বদমাশ ছেলেকে দেখেছো না? সে আমার গর্ভের সন্তান। আর ঐ যে পাখির বাসার মতো কোঁকড়া চুলের বাদরটা—ওটা আমার ভাইয়ের ছেলে। কিন্তু ছোট থেকে আমার কাছেই মানুষ হয়েছে। তাই ও-ইও আমার ছেলে। ওদের মতো এই বাড়িতে আরো দুজন রয়েছে।আর আমার কাছে,তারা সবাই আমার সন্তান।”
কাশফিয়ার অমায়িক ব্যবহারে আনায়া মুগ্ধ হয়। এই নারীকে তার বেশ ভালো লেগেছে। কোনো বিশেষ কারণ নেই। অনেকটা তার মায়ের মতোই লাগছে। এদিকে কাফশিয়া আবারও তার উদ্দেশ্যে নির্বিকারে বলে ফেলে,
“তুমি চাইলে আমাকে তোমার মায়ের মতোই ভাবতে পারো। আমি কিন্তু এতে বেশ খুশি হবো।”
তার সোজাসাপ্টা কথায় আনায়া খানিক ভড়কায়৷ ঐ একটা লোক বাদে মোটামুটি সবাই ভালো। কিন্তু এদের কাউকেই তো চেনে না। ঐদিকে তার পরিবার তার জন্য হয়তো পাগলপ্রায়। আর সে কিনা এখানে বসে বসে, এমন অচেনা-অজানা মানুষজনের সাথে এতো সখ্যতা গড়বে? সবকিছু একটু বেশিই দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে না?
আনায়া মনে মনে এসব ভাবতে লাগল। কাশফিয়া যেন তার মনের বিষয়টা ধরতে পেরে,খানিক মৃদু হাসলো। তার নিজের মনেও অনেক কথা ঘুরপাক খাচ্ছে। ইচ্ছে হচ্ছে, নিজের সম্পূর্ণ আবেগটুকু আনায়ার উপর ঢেলে দিতে। তবুও ছেলের কথা আর পরিস্থিতির বিবেচনায় নিজেকে আঁটকে, সামলে রাখছে।
কাশফিয়া গোছ-গাছ করতে মুখ ফিরিয়েছে।আর ওমনি অকস্মাৎ পেছন হতে আনায়া একপ্রকার মুখ ফস্কে বলে ওঠে,
“বড়-আম্মু বলে ডাকতে পারি?”
আনায়ার এহেন কথায়, কাশফিয়া বেশ চমকে ওঠে তার দিকে ফিরে তাকায়। তার ভাবভঙ্গিতে আনায়া নিজেও ভড়কায়। কি বলতে চেয়ে, কি বলে ফেলল! না জানি,ইনি এখন তাকে কি ভাববে? অথচ আনায়াকে আশ্বস্ত করে, কাশফিয়া বিস্তৃত মুচকি হেসে বলে,
“হ্যাঁ,অবশ্যই। তোমার যা ভালো লাগে,তুমি তাই বলতে পারো।”
দুজনের কথার মাঝে,আচমকা রোজ ঘরের ভেতর প্রবেশ করে। সে ঘুম থেকে উঠে,কাশফিয়াকেই খুঁজছিল। কিন্তু কাশফিয়ার রুমের কাছে এসে,হঠাৎ অপরিচিত কন্ঠস্বর শুনতে পাওয়ায় তার কপাল খানিকটা কুঁচকে যায়। কাশফিয়া সকাল সকাল কার সাথে কথা বলছে?
—“মামুনি তুমি কার সাথে…”
রোজের কথা সম্পূর্ণ হয়না। হঠাৎ এই অজ্ঞাত মেয়েকে এই রূপে দেখে সে বেশ অবাক হয়। এটা আবার কে? দেখতে তো চমৎকার সুন্দর। কিন্তু ভাবনার বিষয় হলো, মেয়েটির পরণের শাড়িটা। এটা কি সেই শাড়িটাই না… যা ছেলের বউ হিসেবে,কাশফিয়া রোজের জন্য রেখে দিয়েছিল। সে তো এমনটাই জানতো। তবে আপাতত এসব ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে,সে কাশফিয়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“মামুনি উনি…”
কাশফিয়া তাকে দেখে বিস্তৃত হেসে বলে,
“ওখানে দাঁড়িয়ে কেনো,ভেতরে আয়। আর ওকে উনি বলার প্রয়োজন নেই। ও তোর চেয়ে বয়সে কিছুটা ছোটই।”
রোজ তটস্থ হয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। ছোট-বড় বিষয় না। কিন্তু এটা কে,তাই তো কথা। সে আবারও উৎসুক দৃষ্টিতে কাশফিয়ার দিকে তাকায়। কাশফিয়া তার বিষয়টা বুঝতে পেরে,তটস্থ হয়ে ভারী শ্বাস ফেলে বলে,
“ও আনায়া…চিনেছিস?”
আনায়ার দিকে মুখ ফিরিয়ে, রোজের কপালে কিঞ্চিৎ ভাজ পড়ে। আনায়া মানে,কোন আনায়া? যেই আনায়াকে নিয়ে নিউজ-মিডিয়া তোলপাড় হচ্ছে? রোজ বিস্ময়ের নজরে আনায়াকে দেখে, পরক্ষণেই কাশফিয়ার দিকে তাকায়। কাশফিয়া নির্বিকারে বলে,
“ঘটনা সত্য,মাঝরাতে তোর দুইভাই বাড়ি ফিরেছে। সাথে ওকেও নিয়ে এসেছে।”
রোজের বিস্ময়ের ঘোর তখনও কাটেনা৷ কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
“বড়-বাবা জানে?”
—“ধুর,তোর বড়-বাপে কি জানবে। তোর দাদি-মাই তো এখনো জানে না। পাপড়িও তো ওকে এখনো দেখেনি।”
রোজ আর কিছু বলে না। তার মানে তার ভিভান ভাই আনায়াকে সত্যিই নিজ হতে তুলে নিয়ে এসেছে। অথচ সে এটা কোনো মতেই মানতে পারছে না। কিভাবে মানবে সে! এতোবছর পর আনায়া কি করে তার জায়গায় চলে এলো?কিভাবে? ভিভিয়ানের বউ তো তার হওয়ার কথা ছিল,তাই না? কাশফিয়ার শাড়ি কিংবা নূরজাহানের গহনা—এহসান বাড়ির ছেলের ভবিষ্যৎ বউ হিসেবে সবটাই কি তার প্রাপ্য ছিল না? হ্যাঁ,এই বাড়ির কেউই বিষয়টা কখনো খোলাখুলি আলোচনা করেনি। কিন্তু সবাই এতোদিন যা আকারে-ইঙ্গিতে বুঝিয়েছে,তা কি সব মিথ্যে? আর যদি সত্যিই হয়ে থাকে, তবে কাশফিয়া কি করে পারলো এই শাড়িটা আনায়াকে পড়িয়ে দিতে?
রোজের মাঝে উথাল-পাতাল ঝড় বইছে। সামলাতে পারছে না সে নিজেকে। হিংসে নয়, কষ্ট হচ্ছে তার। তীব্র কষ্ট। শাড়ি-গহনার প্রয়োজন নেই। কিন্তু তার এতো বছরের অনুভূতিতে সাজানো জগতে,ভিভিয়ানকে যে বিশেষ স্থানে মর্যাদা দিয়েছে—তা কি করে ভুলে যাবে? ভিভিয়ানকে না পেলে সে কিভাবে বাঁচবে? রোজ এসব ভাবতে ভাবতেই,নিজের গাউনের একপাশটা আড়ালে শক্তভাবে চেপে ধরে।
অন্যদিকে আনায়া রোজের দিকে তাকিয়ে থেকে বেশ অবাক হয়। মেয়েটা কত সুন্দর। একদম রূপকথার রাজকুমারীর মতো। বিশেষ করে লালচে চুল আর চোখজোড়া। আনায়া খেয়াল করে দেখল,এই বাড়িতে এখন অব্দি যাদেরকে সে দেখেছে—সেই দুইজন ব্যক্তি সহ সবাইকেই কিছুটা ভিনদেশীদের মতো দেখতে। অথচ কথাবার্তার ধরনে, একদম স্পষ্ট বাঙ্গালী। বিষয়টা অদ্ভুত লাগলেও,সে এ-ও খেয়াল করে দেখে, কোনো এক অজ্ঞাত কারণে এদের সকলকেই তার কেনো জানি পূর্বপরিচিত ঠেকছে। এটা কি করে সম্ভব? এদের কাউকেই তো সে কখনো দেখেনি। অথচ এই বাড়ির মানুষজন হতে চারপাশ—এমনকি ঘরের প্রতিটি কোণাও যেন তার চিরপরিচিত। আনায়া এসব ভাবতে ভাবতেই, নিজের প্রতি হতাশ হয়। আর যে কতপ্রকার রোগ বাঁধানো বাকি আছে তার, কে জানে!
কাশফিয়ার সাথে সাথে আনায়া বাড়ির ড্রইং রুম অব্দি আসে। তবে রুম হতে বাহির হওয়া মাত্রই,সে নিজ হতেই শাড়ির আঁচল টেনে মাথায় ঘোমটা দেয়। বাড়ি হোক বা যে কোনো স্থান,মাথা ঘোমটা টেনে থাকা অভ্যাস তার বেশ পুরোনো।
কিন্তু বিষয়টা কাশফিয়ার নজরে পড়তেই,সে খানিক কপাল কুঁচকে মুগ্ধ নজরে তার দিকে আড় চোখে তাকিয়ে থাকে। অদ্ভুত ঠেকলেও,সদ্য বিবাহিত নতুন বউয়ের মতো মাধুর্য ছড়িয়েছে তার। ছোট বেলার সেই ডানপিটে চঞ্চল ছোট্ট আনায়াটা কতই না বড় হয়ে গিয়েছে! এতোটা শান্ত,এতোটা নম্র—সত্যিই বেশ আশ্চর্যজনক। তবে সেই মিষ্টি, স্নিগ্ধতায় পরিপূর্ণ, মনোমুগ্ধকর আনায়া যেন, আজও একই রয়ে গিয়েছে।
এদিকে বাড়িতে হঠাৎ অজ্ঞাত সুন্দরী মেয়েকে দেখে পাপড়ি কিংবা নূরজাহান দুজনেরই রীতিমতো আশ্চর্য। আর যখন জানতে পারে,এটা আনায়া আর তাকে গতরাতে তাদের বাড়ির আদরের ছেলেরা নিয়ে এসেছে—এতেই যেন তারা সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে যায়। পাপড়ি না চিনলেও,নূরজাহান আনায়াকে খুব ভালো মতোই চেনে। যত যাই হোক,সম্পর্কে তো তারই নাতনী৷
কিন্তু তার প্রাণের নাতী তার নাতনীকে এভাবে মাঝরাতে বাড়িতে এনে তুলেছে—এরমানে আনায়াকে শুধু নাতনী ভাবলে তো ভুল হয়ে যায়। যথারীতি সে খুশিতে দিশেহারা হয়ে কি করবে না করবে,তাই বুঝতে পারে না। একবার কাশফিয়াকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,আনায়াকে নাতনী ডাকবে নাকি নাত বউ। তবে কাশফিয়া ঘটনার কিছুটা তাকে বুঝিয়ে বলে। যেন এখনই এসব নিয়ে তেমন মাতামাতি না করে। কেননা তার প্রাণের নাতী এখনো স্পষ্টভাবে কিছু বলে যায়নি। অথচ ভোর হতে না হতেই,কাউকে না জানিয়ে সে বাড়ি ছেড়েছে। সবমিলিয়ে কাশফিয়ার বেশ চিন্তাই হচ্ছে।
কিন্তু নূরজাহানের সেসবে কোনো ভাবনাচিন্তা নেই। আনায়ার গায়ে কোনো অলংকারের ছোয়া না দেখে,সে ব্যতিব্যস্ত হয়ে, নিজের হাতের সোনার বালা দুটো খুলে আনায়াকে পড়িয়ে দেয়। সিন্ধুক হতে তাড়াহুড়ো করে, মোটাসোটা ভারী সোনার চেইন ও কানের ঝুমকো বের করে আনায়াকে জোরপূর্বক পড়ায়। অথচ আনায়ার মাথায় এসবের কিছুই ঢুকছে না। বাড়িতে এনে রেখেছে, নতুন শাড়ি পড়িয়ে সাজিয়ে-গুছিয়ে দিয়েছে—সব মানা যায়। কিন্তু এতো সব গহনা তাকে কেনো পড়াচ্ছে। এরা আসলে চায়-টা কি? সবাই শুধু নিজেদেই মতোই খুশিতে দিশেহারা হচ্ছে, অথচ এতো খুশির কারণটাই আর কেউ বলছে না।
—“রোজ আপাই দেখো,ভাইজানের বউটা কত্ত সুন্দর। আল্লাহ্গো,আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না,এটা নাকি আমাগোর বড় ভাইজানের বউ।”
রোজের পাশে দাঁড়িয়ে, আনায়াকে দূর হতে চেয়ে দেখতে দেখতেই পাপড়ি একের পর এক মন্তব্য করে যাচ্ছে। অন্যদিকে রোজ তার কথায় শুধু মৃদুভাবে মলিন হাসছে। সেও সবকিছুই চুপচাপ দেখতে থাকে। তার ঠোঁটের কোণায় মৃদু হাসি। চোখের কোণায় জল চিকচিক করছে। নিজের প্রতি বেশ তাচ্ছিল্যের হাসি জমেছে। কি এক বোকার দুনিয়ায় বাস করছিল সে। যেখানে তার অস্ত্বিত বলতে আদতে কিছুই নেই। অন্তত আজ এইটুকু তো বুঝে গেল, আশ্চর্যজনক হলেও ভিভিয়ান ও এই এহসান মঞ্জিলের বউ হিসেবে শুধু আনায়ার স্থানই রয়েছে। সে আর কখনোই এই জায়গাটা নিজের করতে পারবে না।
সবাই সকলের ব্রেকফাস্ট করতে ব্যস্ত। আনায়াও সবার সাথে চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে। তবে কাশফিয়ার মুখে মৃদু হাসি রইলেও,ভেতরে ভেতরে চিন্তায় সে দিশেহারা। এরিমধ্যে খাবারের প্রায় শেষ পর্যায়ে হঠাৎ ভাহিদের ফোন আসে। কাশফিয়া খাবার রেখেই,ফোনটা রিসিভ করে—সকলের থেকে কিছুটা দূরে সরে যায়।
—“কাশফি তোমার ছেলে ফিরেছে?”
শুরুতেই রুক্ষ ও অস্থির কন্ঠস্বরে, কাশফিয়া নিজেকে তটস্থ করে ভারী শ্বাস ফেলে বলে,
“হুম।”
—“এই দুইদিন কোথায় ছিলো ও, কিছু বলেছে?”
—“বন্ধুদের সাথে ছিলো।”
—“তা তো জানি, কিন্তু বন্ধুদের সাথে কোথায় আর কি করতে বাড়ি থেকে গায়েব হয়েছিল,তা কি বলেছে?”
—“কি আশ্চর্য, ও কি বাচ্চা নাকি। ও ওর বন্ধুদের সাথে কোথায় আর কি করতে গিয়েছিল,তা আমায় কেন বলতে যাবে?”
—“নাটক করো না কাশফি,সত্যি করে বলো। এমন কিছু নেই তো, যা তুমি আমার কাছ থেকে লুকাচ্ছো?মাথায় রেখো,তোমার ছেলেদের জন্য একটা মেয়ে ও আমার পুরো ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে৷ ও যদি আবারও কিছু করে থাকে,তাহলে অন্তত আমার লাইফ-ক্যারিয়ার বরবাদ হতে আর কেউ ঠেকাতে পারবে না। আর আনায়াকে আমি ঐ জানোয়ারের চেয়ে হাজার গুণ বেশি ভালোবাসি। আমি মরে গেলেও কখনো চাইবো না, ঐ জানোয়ারটার জন্য মেয়েটার জীবন কোনো ভাবে নষ্ট হয়ে যাক।”
কথাখানি বেশ রাগান্বিত স্বরে ভাহিদ বলল। অন্যদিকে কাশফিয়া বরাবরের মতোই দৃঢ় গলায় জবাব দেয়,
“আমার লুকানোর কিছু নেই। আর বারবার জানোয়ার কাকে বলছো? ও তোমার নিজের র’ক্ত। আমি কোনো জানোয়ারকে গর্ভে রাখিনি যে,আমার ছেলেকে তুমি এখনও জানোয়ার বলে সম্মোধন করবে। এতোই যখন নিজের ছেলেকে মানতে তোমার বিবেকবুদ্ধিতে সমস্যা হয়—তবে এখনো কেনো ওকে ছেড়ে দিয়ে রেখেছো? যখন অঘটন ঘটিয়েছিল,তখন ওকে সোজা মে’রে ফেলতে পারোনি?দেশে আইনকানুনের অভাব পড়েছিল? পাঠিয়ে দিতে জেলে।বছরের পর বছর,ওখানেই পড়ে থেকে, পঁচে পঁচে ম’রে যেত। ওর কর্মফল যা হওয়ার কথা ছিল,সবশেষে না হয় তাই পেত। এই নিয়ে অন্তত আমি কখনো কাউকে অভিযোগ করতাম না। সোজা মেরেই ফেলতে,তাহলেও হয়তো আজও তোমাদের ঘৃনমনোভাবাপন্ন কথাবার্তা গুলো আমায় সহ্য করতে হতো না।”
কাশফিয়ার তীক্ষ্ণ অভিব্যক্তিতে, ভাহিদ ভারী শ্বাস ফেলে। বউ রেগেছে, কিন্তু তার নিজের মেজাজও এখন ঠিক নেই। তবুও নিজেকে খানিক স্বাভাবিক করে বলল,
“কাশফি… বোঝার চেষ্টা করো বিষয়টা। আমি ঐভাবে মিন করে কিছু বলতে চাইনি।”
কাশফিয়া তাচ্ছিল্যের সহিত মৃদু হাসে। একইসাথে চাপা স্বরে বলতে লাগল,
“বলতে চাওনি,তবে সত্যিটা বলেই ফেলেছো। যা তুমি বরাবরই বলে থাকো। ভালো! ভালো! সদা সত্য বলা সর্বদাই ভালো। কিন্তু আমি কি করবো বলো? আমি তো মা, তাই না? তুমি যাকে দিনে-দুপুরে জানোয়ার বলো,সে জানোয়ার আমারই সন্তান। একটু হলেও তো আমার কষ্ট হয়।
কিন্তু সবচেয়ে বড় কষ্টের বিষয়টা কি জানো? লোকে আমার ছেলেকে খা’রাপ বলে,তাতে আমার খুব একটা কষ্ট হয়না। কিন্তু যখন মনে হয়,আমার গর্ভের এই সন্তানই একসময় সত্যিই জানো’য়ারের চেয়ে নিকৃ’ষ্ট কাজ করেছিল—তখন সত্যিই কষ্ট হয়, জানো তো?
বিশ্বাস করো,ওকে যদি সেদিন তোমরা মে’রে ফেলতে—হয়তো আমার একটুও কষ্ট হতো না। আমার ছেলে তার কর্মফল পেয়েছে—এই ভেবেই আমি নিজেকে সামলে নিতাম। কিন্তু খারাপ তো তখন লাগে, যখন এই সময়ে এসেও…যেখানে এতো বছরে আমার ছেলে ধীরে ধীরে নিজেকে প্রতিনিয়ত শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করেছে—তাকেও সেই পুরোনো অতীত টেনে এনে কথা শোনানো হয়।জানি, অতীত কখনো মুছে যায় না, কিন্তু এসবও তো ওর প্রাপ্য নয়। এরচেয়ে কি ওর সেইসময় ম’রে যাওয়াটাই ভালো ছিল না? হিসেবে তো, ওকে ছেড়ে দিয়েই তোমরা ওকে ওর সবচেয়ে বড় শাস্তিটা দিয়েছো। তাহলে আজও কেনো তোমাদের মনের এই তিষটা নেভে না?কেনো,কারণটা বলবে কি?”
—“তুমি বুঝতে পারছো না,তুমি একদমই বুঝতে পারছো না। আমি জানি তুমি অন্যায়কে সাপোর্ট করো না, কিন্তু ছেলের প্রতি তোমার এই দরদও কখনো কমবে না।”
—“পাগলের মতো কথা বলছো,ছেলের প্রতি দরদ দেখাবো না তো তোমার প্রতি দেখাবো?”
—“আহ্,কাশফি! আগে আমার কথা শেষ করতে দেও। এমনিতেই মাথা কাজ করছে না,আর তুমি…যাই হোক,ছেলেদের প্রতি তোমার দরদ-মায়া যেটাই থাকুক—জানি তা একদমই স্বাভাবিক। কিন্তু এখন শুধু একটা কথাই বলবো,আমি যে অন্যায়কে সমর্থন না করা কাশফিকে চিনি…দেশে ফিরে তাকে যেন আমি ঠিক তেমনটাই পাই। জানি না কেনো,তবে আমার খুব করে মনে হচ্ছে—তুমি আমার কাছ থেকে কিছু একটা লুকাচ্ছ।
তা যেটাই হোক,আবারও একটা কথাই বলবো—তোমার গর্ভের ছেলেই হোক বা রাস্তার জন্ত-জানোয়ার, তুমি যদি কারো পক্ষপাতিত্ব করে অন্যায়কে সাপোর্ট করো তাহলে তোমার আমার সম্পর্ক ওখানেই শেষ হবে,মাথায় রেখো। এখন তুমি কি করবে,তোমার ব্যাপার।”
ভাহিদ এই বলেই ফোনটা আচমকা কেটে দেয়। অন্যদিকে কাশফিয়া দাঁতে দাঁত চেপে আওড়ায়,
“আসছে জ্ঞান দিতে!”
তবে পরক্ষণেই তার কপালের দুশ্চিন্তার ভাজ পড়ে। সব না হয় ঠিক আছে, কিন্তু কাউকে না জানিয়ে ছেলে তার কোথায় গায়েব হয়েছে? পাভেলও বাড়িতে, অথচ তার কোনো নাম-নিশানও নেই।
ঠিক দুপুরের দিকে কেনীথ তড়িঘড়ি করে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে। তাকে দেখেই,ড্রইং রুমে থাকা কাশফিয়া আর পাভেল খানিক ভড়কে যায়। হঠাৎ তার মাঝে এতো অস্থিরতা, কোথায় হতে উদয় হলো?
—“কোথায় ছিলি তুই?”
কাশফিয়ার কথা শুনে,কেনীথ অকস্মাৎ কিছু একটা ভেবে থেমে যায়। এবং দ্রুত তার কাছে এগিয়ে গিয়ে বলে ,
“আনায়া কোথায়?”
—“আনায়া হয়তো তোর ঘরে। কেনো কি হয়েছে?”
—“আ…বলছি, আগে বলো বাকিরা কোথায়?”,কেনীথ কপালে আঙ্গুল ঘষে আওড়ায়। তার কথায় কাশফিয়া খানিক সন্দিহান স্বরে কিছু বলতে যাবে,ঠিক তৎক্ষনাৎ ভেতর হতে নূরজাহান এলো। এবং কেনীথকে এই অবস্থায় দেখে,সে-ও কপাল কুঁচকে বলল,
“দাদুভাই,তোমারে এমন দেখা যায় কেন? কি হয়েছে?”
কেনীথ কোনো জবাব দেয় না। সে সরাসরি জিজ্ঞেস করে,
“রোজ আর পাপড়ি কোথায়? ওদের একটু ডেকে দাও।”
কেনীথের অস্থিরতায় কাশফিয়া বিষয়টাকে বেশ গুরুত্ব দিয়ে, চুপচাপ রোজ আর পাপড়িকে ডাকে। তারা দুজন এলেই,কেনীথ ভারী শ্বাস ফেলে,কড়া স্বরে বলতে শুরু করে,
“শোনা সবাই, বাড়িতে পুলিশ আসবে।”
কেনীথের কথা শুরু হওয়ার আগেই,চারপাশের সকলে চমকে উঠল। কাশফিয়ার কপাল কুঁচকে গেল,অন্যদিকে পাভেল বেশ তাচ্ছিল্যের সহিত বলল,
“হাহ্! এইজন্য তোমার এতো কাহিনি? এটা তো জানাই ছিলো। ভালো হয়েছে, খুব খুশি হয়েছি। এখন বসে বসে সব মা’রা খাও।”
পাভেলের এহেন কথায়, কেনীথের চোয়াল শক্ত হয়। ইচ্ছে করল,হতচ্ছাড়াটাকে ধরে, চৌদ্দ তলা হতে নিচে আছড়ে ফেলতে। তবে সে কিছু বলার আগেই আবার, নূরজাহান বেশ তীব্র সংশয়ে বলে ওঠে,
“হঠাৎ এই বাড়িতে পুলিশ? পুলিশ কেন আসবে হার্টবিট?”
—“হাহ্,তুমি তাকে হার্টবিট বলো কোন আক্কেলে? তার আসল নাম তো হার্ট অ্যাটাক হওয়া উচিত ছিলো। দেখবে,একদিন সবাইকে এই বান্দা হার্ট অ্যাটাক করিয়ে ছাড়বে।”
—“পাভেল তুই তোর মুখটা বন্ধ রাখবি?”
—“আমার মুখ বন্ধ করিয়ে আর কোনো লাভ আছে? ওতো কিছু জানিনা, আমি যেখানে ছিলাম আমাকে সেখানেই পাঠিয়ে দাও। আমি তোমার আশেপাশেও আর থাকতে চাই না।”
কেনীথ আর পাভেলের কথা মেতে সময় নষ্ট করতে চায় না। নিজেকে তটস্থ করে, বাকিদের উদ্দেশ্যে দৃঢ় গলায় বলে,
“বাড়িতে পুলিশ নিয়ে তারেক এহসান আসছে। বাড়ি সার্চ করবে,তোমাদের টুকটাক কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করবে। কিন্তু তোমরা ভুলেও কেউ,আনায়ার বিষয়ে কিচ্ছু বলবে না। খবরদার, ওর ব্যাপারে যেন একটা শব্দও কারো মুখে না শুনি।”
কেনীথের কথায় সবচেয়ে বেশি অবাক হলো নূরজাহান। তারেক আসবে এই বাড়িতে—এতোবছর পর? তবে আনায়াকে নিয়ে সে যা ভেবেছিল তেমন কিছুই কি হচ্ছে না? ঘুরেফিরে সেই পুরোনো ঝামেলা আবার নতুন করে তরতাজা হচ্ছে? কিন্তু কাশফিয়া তো সেভাবে তেমন কিছু বলেনি তাকে।
নূরজাহান সন্দিহান দৃষ্টিতে কাশফিয়ার দিকে তাকায়। সে তাকে চোখের ইশারায় আশ্বস্ত করে—ঘটনা যা মিডিয়াতে ছড়িয়েছে তাই সত্য। আনায়াকে তার নাতী তুলেই এনেছে।নিমিষেই নূরজাহানও গভীর দুশ্চিন্তায় মগ্ন হয়।
অন্যদিকে কেনীথ আর কথা না বাড়িয়ে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ায়। কিন্তু আচমকাই সিঁড়ির মাঝপথে গিয়ে,সে পেছনে মুখ ফিরিয়ে সরাসরি পাপড়ির উদ্দেশ্যে বলল,
“আর পাপড়ি তুমি…! তোমাকে যত যাই জিজ্ঞেস করা হোক না কেনো, তুমি কিচ্ছু বলবে না। একটা শব্দও বলার প্রয়োজন নেই। আপাতত তোমার চুপ থাকাটাই মাচ বেটার।”
কেনীথের কথায় পাপড়ি ইতস্তত ভঙ্গিতে হেসে বলে,
“ভাইজান আপনি ভুল বুঝতেছেন। হ্যাঁ,আমি কথা একটু বেশি কই কিন্তু আমি কখনো কাজের কথা কই না। বেশিরভাগ সময় অকাজের কথাই কই। তাই আপনি চিন্তা কইরেন না।”
পাপড়ির কথায় উদ্দেশ্যে বুঝতে পেরে,কেনীথ আশ্বস্ত হলো।
—“দ্যাটস্ গুড। আমি উপরে যাচ্ছি। যা বলেছি তা যেন মাথায় থাকে। নয়তো সবগুলোকে শেষ করে ফেলবো।”
কেনীথ বেশ ধমকের স্বরে এহেন কথা বলেই,উপরে চলে যায়। অন্যদিকে ছেলের এমন বিহেভিয়ারে, কাশফিয়া কপাল কুঁচকে বিরক্তির স্বরে আওড়ায়,
“বাপের মতোই হয়েছে।”
আনায়া কেনীথের রুমের বারান্দায় চুপচাপ বসে রয়েছে। তার হাতে সাদা রঙের ছোট্ট একটা সফট টয় খরগোশ। এটা সে রোজের রুম থেকে নিয়ে এসেছে। বলতে গেলে রোজই তাকে দিয়েছে। তার রুমে অনেকগুলো টেডি ছিল,আর আনায়ার নজর ঘুরেফিরে এই খরগোশের দিকেই যাচ্ছিল। বিষয়টা হয়তো রোজ খেয়াল করে। ফলে কি যেন ভেবে নিজ হতেই,সে আনায়াকে এটা দিয়ে বাড়ির চারপাশটা ঘুরিয়ে শেষমেশ কেনীথের রুমে নিয়ে আসে।
আনায়া সবটা দেখছে আর নিজে নিজেই নানান হিসেব কষছে। আশ্চর্যজনক ভাবে তার চারপাশের সবকিছু পরিচিত মনে হচ্ছে। স্পষ্ট কোনো অনুভূতি না রইলেও,এইটুকু বারবারই মনে হচ্ছে যে—এখানকার সবকিছুই সে কোনো এক সময় দেখেছে। অথচ তার স্মৃতিতে তেমন কোনো ঘটনাই নেই।
আনায়া মুখ ফিরিয়ে এদিক-সেদিক দেখে। বাড়ির সবগুলো ঘরের চেয়ে, এই ঘরটা যেন একটু বেশিই ক্লাসি-ফ্যান্সি। বিশেষ করে বারান্দাটাও কত্তবড় আর সুন্দর। সবচেয়ে বেশি চোখে লাগার বিষয়টা হলো, বারান্দার কোণায় টবে লাগানো একটা গোলাপ আর বেলী ফুলের গাছ। দুটোই নতুন চারা মনে হচ্ছে। ছোট বেলীফুলের গাছটায় কয়েকটা সাদা বেলীফুল ফুটে রয়েছে। সেসবের মৃদু সুগন্ধিও আনায়ার মনে ভিন্নরূপে নাড়া দেয়। একইসাথে গোপাল গাছে ফুটে থাকা গাঢ় র’ক্তলাল রঙের গোলাপটাও বেশ আকর্ষণীয়। সবকিছুই সুন্দর তবে কিছু একটা গোলমালে ব্যাপার আছে। যেটাই মূলত আনায়া ঠিকমতো ধরতে পারছে না।
এদিকে আনায়া হতাশ হয়ে তুলোর খরগোশটার দিকে ফিরে তাকায়। লম্বা কান দুটো আলতোভাবে নাড়াচাড়া করে। বানিকে খুব মনে পড়ছে।বাড়ির বাহিরে খুব একটা তার থাকা হয়নি। যথারীতি বানি থেকেও সে তেমন দূরে থাকেনি। অথচ এই একমাসে একবার ট্রিপের কারণে দূরে থাকতে হলো,আর এখন এই পরিস্থিতির জন্য।
তবে এইমূহূর্তে সবকিছু ছাড়িয়ে সে ভিন্ন কিছু ভাবছে। যেই গম্ভীরমুখো লোকটা তাকে এখানে নিয়ে এসেছে,তার নাম ভিভিয়ান এহসান। বাড়ির লোকজন হয়তো ভিভান বলেও ডাকে। সেসব তো ঠিক আছে, কিন্তু আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো—এনারাও এহসান বংশের আবার তারাও। এটা আশ্চর্যজনক হতো না যদি, এই ভিভিয়ান আর পাভেল সেদিন তাদের বাড়িতে না যেত। যতদূর বুঝেছিল,এই দুজনকে তার বাবা চেনে। তাহলে এরা কি তাদের পূর্বপরিচিত? শুধু কি সেই চিনতে পারছে না দেখে, এতো কনফিউশান?
আনায়া আবারও ভাবনায় ডুবে যায়। কিন্তু এখন তো আরেক চিন্তা এসে মাথায় ঢুকেছে। লোকদুটো তাকে তুলে এনেছে ঠিকই তবে বিক্রি কিংবা পাচার করে দেওয়ার কোনো উদ্দেশ্য যে নেই—তাতে সে একদম নিশ্চিত। কিন্তু তাহলে এরা চায় টা কি?
এরিমধ্যে আচমকা আনায়ার একটা বিষয় মনে পড়লো। সে কপাল কুঁচকে বিড়বিড় করে আওড়ায়,
“ভাহিদ এহসান নামের কারো সাথে না বাবার ঝামেলা চলছিল? এমন কিছু তো প্রায় বেশ কিছুদিন থেকেই শুনে আসছি।…আ…তবে কি,ভাহিদ এহসানের ছেলেই ভিভিয়ান এহসান? তারমানে এরা আমাকে তুলে এনেছে,বাবাকে ব্ল্যাকমেইল করে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করতে। কিন্তু এভাবে শাড়ি-গহনা পড়িয়ে দেওয়ার মানে কি? ঐ বয়স্ক দাদীটাও কিসব উল্টোপাল্টা কথা বলছি। আমি কেনো তার নাতবউ…”
এইসব ভাবতে না ভাবতেই,আনায়া চমকে বিস্ময়ের সাথে বলে ওঠে,
“ও খোদা, কত বড় গাধা আমি। নাতনী অব্দি ঠিক ছিল,কিন্তু নাতবউ বলতে উনি কি বুঝিয়েছেন? দেখতে সুদর্শন, তো তাতে কি হয়েছে, ঐ গম্ভীরমুখো পেঁচাটার বউ—তাও আমি? এরা আমায় কি বানাতে চাইছে? খোদা তুমি আমার উপর রহম করো।”
আনায়া নিজের ধ্যানে হারিয়েছে। অন্যদিকে তড়িঘড়ি করে কেনীথ রুমে প্রবেশ করে। আশেপাশে আনায়াকে না দেখে,তাকে ডাকবে—ঠিক তৎক্ষনাৎ তার নজর বারান্দায় পড়ে। ফিসফিসিয়ে আওড়ানো কন্ঠস্বর শুনতে পেয়ে সে নিজেকে আশ্বস্ত করে। তবে সরাসরি সেদিকে না গিয়ে,সে টেবিলের উপর থেকে গ্লাস নিয়ে তাতে পানি ঢালতে লাগল। একইসাথে আনমনেই আনায়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“তারা, এই দিকে আয় তো একটু।”
যাকে নিয়ে এতোসব ভাবতে বসেছিল,আচমকা তারই কন্ঠস্বর শুনতে পেয়ে আনায়া খানিকটা চমকে ওঠে। তবে নিজেকে তটস্থ করে, মাথায় ঘোমটা টেনে—বারান্দা হতে বেরিয়ে, রুমে প্রবেশ করে। তার আগমনে কেনীথ মুখ ফিরিয়ে তাকাতেই— ক্ষণিকের জন্য থমকে যায়।
বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। শুধু চোখজোড়া তার আনায়ার অবয়বে নিবদ্ধ। নিমিষের মাঝেই হাত-পা তার শিথিল হয়। আনায়াও তার এই অদ্ভুত চাহনিতে,কপাল খানিক কুঁচকে ফেলে। বোকার মতো চেয়ে থাকে,কেনীথের দিকে। কেননা, ততক্ষণে তার নজর একবার কেনীথ আর গ্লাস উপচে পড়তে থাকা পানির মাঝে ঘুরপাক খাচ্ছে। মনে মনে একবার প্রশ্নও জেগে ওঠে,‘এই লোকটা কি পাগল?’
পানি যখন টেবিল হতে গড়িয়ে, তার পায়ের উপর পড়ল—ঠিক তখন গিয়ে কেনীথের হুঁশ ফেরে। তৎক্ষনাৎ মুখ ফিরিয়ে নিয়ে,বিরক্তিতে চোখমুখ খিঁচে নেয় সে৷ ভীষণ বিরক্তি নিয়ে সে বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়,‘আঃ ফা’কিং গ্রোস!’
কেনীথ জগটা টি-টেবিলের উপর রেখে,ভারী শ্বাস ফেলে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়ায়।অতঃপর গ্লাসটা হাতে নিয়ে, আনায়ার দিকে এগিয়ে আসে। আনমনেও না চাইতেও বলে ফেলে,
“ইউ আর লুকিং সো প্রিটি।”
এই বলেই পুনরায় সে আনায়ার স্নিগ্ধতায় থমকায়। আনায়া আবারও বোকার মতো চেয়ে চেয়ে তার হাবভাব পরখ করে। ততক্ষণে কেনীথ পুনরায় হুঁশে ফিরে,চোখমুখ খানিকটা কুঁচকে নেয়। এবং আনায়াকে আবারও হতভম্ব করে দিয়ে,অকস্মাৎ জোর গলায় বলে ওঠে,
“এমন নতুন বউয়ের মতো সেজেগুজে আছিস কেনো? এভাবে কে সাজিয়েছে তোকে?”
আনায়া বোকার মতো ইতস্তত স্বরে আওড়ায়,
“আ…আমি জানি না। ওনারা সাজিয়েছেন।”
—“ওনারা কা’রা?”
—“আ…আপনার মা আর হয়তো ঐটা আপনার দাদী।”
—“তুই নিষেধ করিসনি কেনো?”
আনায়া বুঝতে পারছে না কি বলবে। কেমন অস্বস্তি হচ্ছে। আসলেই তো,চেনে না জানে না এভাবে কারো বাড়িতে এসে তাদের জিনিসপত্র গায়ে জড়িয়ে চুপচাপ বসে আছে সে। আনায়া আনমনেই ঘোমটার নিচে মাথা নুইয়ে ফেলে। এদিকে সুযোগ বুঝে, কেনীথ তার পকেট থেকে কিছু একটা বের করে আলগোছে পানি ভর্তি গ্লাসে ফেলে দেয়। এবং ক্রমশেই তা পানির সাথে মিশে যায়।
এদিকে গম্ভীর্যের মাঝেও মৃদু হাসে। আনায়া কিছু বলছে না দেখে,সে পুনরায় ধমকের স্বরে বলল,
“কিছু বলছিস না কেনো?”
আমায়া ধমকে চমকে ওঠে। মাথা তুলে কেনীথের দিকে তাকায়। কপালের উপর পড়া চুলগুলো, আলগোছে আঙ্গুল দিয়ে কানের পেছনে ঠেলে দেয়। কেনীথের ভাবভঙ্গি এখনও সম্পূর্ণ স্থির। চোখমুখের ভাবগাম্ভীর্য কঠোর, অথচ নজর আর মন-মস্তিষ্কে তো তার ভিন্ন কিছুই ঘুরপাক খাচ্ছে। এদিকে আনায়া নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে বলে,
“আমি বলার সুযোগ পাইনি৷ আপনি বললে,এগুলো আমি এখনই খুলে ওনাদের দিয়ে আসছি।”
—“না,ঠিক আছে। ওসবের আর প্রয়োজন নেই।এটা খেয়ে নে আগে।”
কেনীথ আনায়ার কাছে আরো দু’পা এগিয়ে যায়।গ্লাসটা তার সামনের ধরে এগিয়ে দেয়। আনায়া কিছুটা সন্দিহান দৃষ্টিতেই গ্লাস ও তার দিকে তাকিয়ে থাকে। যদিও সে আনমনে হারিয়ে থাকায়, কেনীথের পানিতে কিছু মেশানোর বিষয়টা খেয়াল করেনি। তবে কেন জানি খটকা লাগছে। সরাসরি মানা করবে কি না বুঝতে পারছে না, তবুও সংশয়ে বলে ফেলল,
“এটা কি?”
—“কি মনে হয়?”
প্রশ্নের জবাবে আবারও প্রশ্ন! আনায়ার সন্দেহ অকারণেই দৃঢ় হলো। সে আবারও তার সম্মূখে দাড়িয়ে থাকা গম্ভীর মানুষটার চোখে চোখ মিলিয়ে বলল,
“আমি খাবো না এটা।”
—“চিন্তা নেই, বিষ দেই নি।”
আনায়া দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে যায়। সে গ্লাসটা হাতে নিতে চেয়েও, আর নেয় না। বরং কেনীথের উদ্দেশ্যে বলল,
“আচ্ছা, বলুন না। আপনি আমাকে এখানে কেনো নিয়ে এসেছেন?”
আনায়ার উৎসুক দৃষ্টিতে নজর মিলিয়ে,কেনীথ নিস্পৃহে বলল,
“বিশেষ কেনো কারণ নেই। ইচ্ছে হয়েছে,তাই নিয়ে এসেছি। কেনো, তোর এখানে ভালো লাগছে না?”
আনায়া আবারও চুপ হয়ে যায়।এদিকে এতক্ষণ পর কেনীথের নজর তার হাতের দিকে পড়ে। আনায়ার শাড়ির আড়ালে কিছু একটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে। কেনীথ কপাল কুঁচকে বলল,
“তোর হাতে কি ওটা?”
আনায়া স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, খরগোশটা বের করে আনে। যা দেখে কেনীথের কিছু একটা মনে পড়তেই, সে বলে ওঠে,
“ওই! তুই এখনো ঐ খচ্চরটাকে পালিস, তাই না?”
আনায়া খানিক চোখ-মুখ কুঁচকে বলল,
“খচ্চর আবার কে?”
—“ঐ যে,তোকে তুলে আনতে গিয়ে যে দেখেছিলাম…একটা জ্যান্ত খরগোশের সাথে কথা বলছিলি হয়তো।”
—“তো ওটাকে খচ্চর কেনো বলছেন? ও খরগোশই। আর ওর একটা নামও আছেন।”
আনায়া বেশ রুক্ষ স্বরে এহেন কথা বলতেই,কেনীথ তাচ্ছিল্যের সহিত বলে ওঠে,
“বাপরে,বানির জন্য এতো পসেসিসভনেস?
কেনীথের কথায় প্রতিত্তোরে আনায়া কিছু বলতে গিয়েও থমকে যায়। সে কপাল কুঁচকে সন্দিহান স্বরে বলল,
“ওর নাম যে বানি, তা আপনি কি করে জানলেন?”
আনায়ার অভিব্যক্তিতে কেনীথ চোখমুখ খিঁচে, তাতে দাঁত চেপে নিজেকে সামলায়। সকাল থেকে, কাজের চেয়ে বেশি অকাজই যেন বেশি হচ্ছে।
—“আ’ম নট সিওর, বাট বাচ্চারা তো এসব পেট খরগোশদের বানি-টানি কিছু একটা বলে। তো…”
কেনীথ তার কথা অসমাপ্তই রাখে। অন্যদিকে আনায়ার কাছে কথাটা বেশ গায়ে লাগল। সে মুখ গুমরো করে আওড়ায়,
“শুধু বাচ্চারা নয়, খরগোশ পালার অধিকার বড়দেরও আছে।”
—“তা থাকতে পারে, কিন্তু তোকে কোনোদিক থেকে…আইমিন,সাইজেই শুধু বড় মনে হয়। কিন্তু বোধবুদ্ধি সব…”
—“কি বোঝাতে চাইছেন আপনি?”
আনায়া কপাল কুঁচকে, শাসিয়ে কথাটা বলতেই কেনীথ পুনরায় নিজের গম্ভীর রূপে ফিরে, তার দিকে গ্লাসটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“দ্রুত পানিটা খেয়ে নে। আমার হাতে সময় নেই।”
মিনিটে মিনিটে এই লোকের রূপ বদলের কাহিনি দেখে,আনায়ার মেজাজ বিগড়ে গেল। সেও রুক্ষ স্বরে বলে উঠল,
“খাবো না আমি।”
—“তারা,আমার হাতে সময় নেই। প্লিজ,মেজাজ খারাপ করিস না।”
এবার কেনীথের শান্ত-গম্ভীর চাপা ধমকে,আনা খানিকটা নড়েচড়ে বসে। ইচ্ছে না থাকতেও,কেনীথের তির্যক চাহনির প্রভাবে সে অনিমেষেই গ্লাসটা হাতে নেয়। দেখতে তো পানি মনে হচ্ছে। কিন্তু আনায়ার মন বলছে,নিশ্চিত এতে কোনো ঘাবলা রয়েছে। তবুও কোনো এক বিশ্বাসে নিজেকে আশ্বস্ত করে,সম্পূর্ণ পানিটুকু এক নিমিষেই খেয়ে নেয়।
কেনীথ নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকে চেয়ে চেয়ে দেখে। খাওয়া শেষ হতেই,আনায়া তাকে গ্লাসটা দেয়। কেনীথ তা পাশে রেখে দিয়ে,পুনরায় তার দিকে ফিরে তাকায়। অন্যদিকে আনায়ার দিন-দুনিয়া যেন ততক্ষণে ঘুরতে শুরু করেছে। যা আশংকা করেছিল তাই যেন ঘটছে।
আনায়া বিস্ময়ের নজরে কেনীথের দিকে তাকিয়ে, কিছু একটা বলার চেষ্টা করে। কিন্তু ততক্ষণে সে গা ঢলে অবচেতনের ন্যায় নিস্তেজ হয়ে যায়। এবং নিচে পড়ার আগেই,কেনীথ তাকে নিজের সাথে আগলে ধরে সামলায়।আনায়ার ঘোমটটা খুলে নিচে পরে যায়।সে নিভু নিভু চাহনিতে, কিছু বলার জন্য ঠোঁট নাড়ায়। অথচ কেনীথ তখন,তাচ্ছিল্য সরূপ মৃদু হেসে—ইনোসেন্ট ভঙ্গিতে তার কপালের আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো,আলগোছে কানের পিছে ঠেলে দিয়ে আওড়ায়,
“Sohneya, yoon tera sharmana
meri jaan naa lele____
Kaan ke peeche zulf chhupana
meri Jaan, kya kehne_____
Zaalima, tauba tera nakhra…’
মহামায়া পর্ব ১০
আনায়া সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে পড়তেই,কেনীথ গানের লাইনটুকু অসামপ্ত রেখে ভারী শ্বাস ফেলে। এবং আচমকাই আনায়ার কপালে আলতোভাবে ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়।ফর্সা গালে তার বিস্তৃত হাত রেখে,ওষ্ঠে বুড়ো আঙুল ছুঁইয়ে নিস্পৃহে আওড়ায়,
“জানি না, তুই কোন মহামায়ার মন্ত্রে আমার সত্তাকে আবিষ্ট করেছিস; তবে আমি শুধু এইটুকুই জানি—আমার জীবনের অবশিষ্টাংশে তোকে নিজের করে না পেলে,আমি অনন্ত বিনাশের প্রান্তে নিঃশেষ হবো।”
