Home মহামায়া মহামায়া পর্ব ১২

মহামায়া পর্ব ১২

মহামায়া পর্ব ১২
তুশকন্যা

গতকাল থেকে তারেক আর বাড়ি ফেরেনি। লোকজন নিয়ে বাহিরে বাহিরেই ছুটে বেড়াচ্ছে। হিংস্র শিকারীর ন্যায়, আনায়াকে সে খুঁজে চলেছে। অথচ অনিমা খুব ভালো করেই জানে, এই লোকটার ভেতরে এখন ঠিক কি চলছে। মেয়ের জন্য সে সম্পূর্ণ উম্মাদ হয়ে গিয়েছে। অথচ মেয়ের কোনো খবরই নেই।
অনিমারও খাওয়া-দাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তার ভিভান কিছু করেছে কিনা, তা নিয়ে অনিমা নিশ্চিত নয়। কিন্তু যদি আনায়া ভিভানের কাছে থেকেও থাকে,তবুও কেনো যেন সে নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকতে পারছে না। যত যাই অতীত কি করে ভুলবে৷ যদি মেয়ের কিছু হয়ে যায়? এবার কি করে বাঁচবে সে? এখন আর কাউকেই পুরোপুরি বিশ্বাস হয়না, কাউকেই না!

অনিমা এইসকল চিন্তায় দিশেহারা, অন্যদিকে ইনায়া চুপচাপ দূর হতে তার মায়ের দিকে—নির্বিকার ভঙ্গিতে তাকিয়ে রয়েছে। কাঁধে কাছে বসে থাকা অস্কার, মাঝেমধ্যে হালকা নড়াচড়া করছে। তবে ইনায়ার হাবভাব বোঝাটা বেশ মুশকিল হয়ে যাচ্ছে। ওর মাথায় আদতে কি ঘুরপাক খাচ্ছে, তা হয়তো একমাত্র সেই জানে। প্রায় বেশ খানিকটা সময় এভাবেই,নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে থাকার পর সে আনমনেই তির্যক হেসে, বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে আওড়ায়,
“আই নো,বাবা আপুকে নিয়েই আসবে।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

ঠিক কতগুলো বছর পর এহসান মঞ্জিলে তারেকের পা পড়ল,তা সে নিজেও হয়তো জানে না। সময় কত দ্রুত চলে যায় তাই না? এই তো সেদিনরই কথা। সবাই মিলে ঠিক এই এহসান মঞ্জিলের বাগানে বসে আড্ডায় মেতেছিল।সকল অনুষ্ঠান-আয়োজনে সবাই কত মিলেমিশে মজা করতো, আনন্দ করতো। অথচ সবই এখন অতীত। এই অতীতের বয়সকাল এতোই দীর্ঘ হয়েছে যে,তা এখন বছরের পর বছর ফুরিয়ে যুগ পেরিয়েছে।
তারেক ভারী শ্বাস ফেলে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে। একগাদা পুলিশ ইউনিফর্মের লোকজন সাথে নিয়েই, এই গম্ভীরমুখো সাদা পাঞ্জাবি পরনের লোকটি বাড়ির সদর দরজা পেরোয়। সর্বপ্রথমই তার নজর পড়ে কাশফিয়ার দিকে। সে দৃঢ় পায়ে তার দিকে এগিয়ে যায়। নিজের গম্ভীর্যতা ছাড়িয়ে,আচমকাই বিস্তৃত মুচকি হেসে বলে,

“আসসালামু আলাইকুম,ভাবী। ভালো আছেন আশা করি?”
কাশফিয়াও না চেয়েও, জোরপূর্বক মৃদু হাসে। কতগুলো বছর পর আবারও তারা সামনা-সামনি। বেশ অদ্ভুতই লাগছে বটে। কাশফিয়া নিজেকে তটস্থ করে বলল,
“জ্বী,আলহামদুলিল্লাহ আমি ভালোই আছি।”
তার কথায় তারেক অদ্ভুত ভাবে হাসে। পরক্ষণেই খানিকটা রুক্ষ স্বরে বলে,
“জিজ্ঞেস করলেন ভাবী, আমি কেমন আছি?”

তারেকের কন্ঠস্বর প্রচন্ড অদ্ভুত লাগল তার কাছে। যেন তীব্র অসহায়ত্বের সাথেই,সে এই কথাটা বললো। কাশফিয়া আর তেমন কিছুই বলে না। এদিকে তারেক আবারও তাচ্ছিল্যের সহিত হেসে বলল,
“আপনার গুনধর ছেলে এসেছে—অনেকদিনই তো হলো। তাকে নিয়ে আপনারা ভালো থাকবেন,এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমি তো ভালো থাকতে পারছি না,ভাবী। আমাকে ভালো থাকতে দেওয়া হচ্ছে না।আমার মেয়েটার বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। অথচ তাকে বিয়ের আসর থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জানেন কি, এটা কারা করেছে? কতগুলো জানোয়ার, নর্দমার কীট-পতঙ্গের চেয়েও নিকৃষ্ট সেই পিশাচগুলোই এটা করেছে।

দেশে আমার রেপুটেশন ঠিক কোন পর্যায়ে রয়েছে,তা কিছুটা হলেও জানেন আশা করি৷ আপনার স্বামীও ক্ষেত্রেও কিন্তু বিষয়টা তাই৷ তবে আমি কিন্তু মোটেও নিজের এইসব রেপুটেশন নিয়ে ভাবছি না,আর না ভাবতে চাই৷ আমার শুধু আমার মেয়েটাকে চাই। বিশ্বাস করেন,ওর সামান্য কিছু হলে এই বাপটা ম’রে যাবে। একদম শেষ হয়ে যাবে।”
অকস্মাৎ তারেকের চোখের কোণে পানি ঝলঝল করতে দেখে—কাশফিয়া হতভম্ব হয়ে যায়।অথচ শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়িয়ে থাকা, শক্তপোক্ত লম্বাচওড়া মানুষটার চোয়াল এখনো শক্ত। কাশফিয়াও অজান্তেই, খানিক দূর্বল হয়ে যায়। তবুও নিজেকে যথাসাধ্য সামলে রাখে। অন্যদিকে তারেক নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়েছে। ভারী শ্বাস ফেলে,কাশফিয়ার উদ্দেশ্যে দৃঢ় গলায় বলল,
“ভাবী, আনায়া কোথায়?”

—“জানি না।”
কাশফিয়ার সহজ স্বীকারোক্তিতে, তারেক তাচ্ছিল্যের সহিত মৃদু হাসে। কি যেন ভেবে,আনমনেই বলে ওঠে,
“আপনিও অনেক পরিবর্তন হয়ে গিয়েছেন। অবশ্য হওয়াটাই স্বাভাবিক। যাই হোক, আপনার ছেলে তো বাড়িতে আছে? তাকে পেলেই হবে।”
—“কি করতে চাও ওর সাথে?”
আচমকা কাশফিয়ার পেছন হতে, নূরজাহান তাদের দিকে এগিয়ে এলো। তাকে দেখেই,তারেক বিস্ময়ের ভঙ্গিতে মৃদু হেসে এগিয়ে যায়।
“আসসালামু আলাইকুম আম্মা। ভালো আছেন আপনি?”
—“আল্লাহর দয়ায় ভালোই আছি। তা হঠাৎ এতো বছর পর এই বাড়িতে এলে কি প্রয়োজনে? সাথে তো দেখছি মেহমানও নিয়ে আসছো।”

—“তা যা বলেছেন,মেহমানই বটে।”,পেছনে ফিরে পুলিশদের একপলক দেখে নিয়ে আওড়ায়। অন্যদিকে নূরজাহান ততক্ষণে তীক্ষ্ণ স্বরে আবারও বলে ওঠে,
“তা ওনাদের জন্য কি খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্তা করবো?”
—“অন ডিউটিতে আছে তো,তাই আর খাওয়াদাওয়া নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। আমরা শুধু আপনার গুনধর নাতীর সাথে দেখা করবো,এই যা।”
নূরজাহান তারেকের হাসিখুশি মুখটার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল,
“তারেক, যাই করো না কেনো ভেবে চিন্তে কইরো। অতীতকে বর্তমানের সাথে মিলাইতে যাইও না।”
—“জানি তো আম্মা। কিন্তু অতীত তো অতীতই। অতীত ভুলতে চাইলে তো আপনাদেরকেও ভুলতে হবে। কিন্তু এটা কি কখনো সম্ভব? আমাকে গর্ভধারণ করা মায়ের আদর আমি তেমন পাইনি। যা পেয়েছি সব আপনার কাছেই। মা বলতে দুনিয়ায় আপনিই এখন আছেন। যত যাই হোক,আপনাদের তো আমি ভুলতে পারবো না। তেমনি অতীতও ভুলতে পারবো না।

কিন্তু একটা বিষয়ে নিশ্চিন্তে থাকুন। আহমদ এহসানের র’ক্ত আছে আমার গায়ে। তাই অকারণে কাউকে অসম্মান আমি করবো না। একইসাথে, এইবার আর অন্যায়কেও ছাড় দিতে পারবো না।”
এই বলেই সে পেছনে ফিরে, পুলিশ অফিসারের উদ্দেশ্যে বলল,
“আপনারা নিজেদের কাজে লেগে পড়ুন। সবার আগে দোতলায় যান। নবাব শাহজাদা হয়তো ওখানেই আছে। আর বাড়ির বেসমেন্টেও চেক্ দিবেন।”
এই বলেই সে পুনরায়,কাশফিয়া আর নূর জাহানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আমিও দেখা করে আসি তবে।”

একদল পুলিশের লোকজন দোতলা সহ চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। ততক্ষণে পুলিশ অফিসার সহ আরো দুজন সদস্য গিয়ে কেনীথের রুমে প্রবেশ করে।
কেনীথ বারান্দায় বসে, নির্বিকারে ভঙ্গিতে গানের সুরকে গুনগুনিয়ে শিশ বাজাচ্ছে। অকস্মাৎ হঠাৎ কারো আগমনের শব্দে, সে বারান্দা হতে বেরিয়ে আসে। তাকে দেখে,পুলিশ অফিসার বলে ওঠে,
“আপনি ভিভিয়ান এহসান?”
কেনীথ নির্বিকারে কফির মগে ঠোঁট ছুঁইয়ে বলে,
“হুম।”

পুলিশ অফিসারটি আর কিছুই বলে না। আশ্চর্যজনক ভাবে সে মৃদু হেসে, বাকি পুলিশদের ইশারা করে। তারা চারপাশটায় বেশ জোড়তোড় করে সার্চ করে। আশেপাশে তেমন কিছু না পেলেও,কাভার্ডের একপাশটা খুলতেই পুলিশ কনস্টেবল চমকে ওঠে। সে আলগোছে আলমারির পাশটা সামান্য ফাঁক রেখে ভিড়িয়ে দেয়—যেভাবে শুরুতেই রাখা ছিল। অতঃপর বিস্ময়ের নজরে পুলিশ অফিসারের দিকে তাকায়। অফিসার একপলক নির্লিপ্ত কেনীথের দিকে চেয়ে, পরক্ষণেই তাদের উদ্দেশ্যে বলল,
“আপনারা যেতে পারেন। জিজ্ঞেস করলে বলবেন,এখানে তেমন কিছুই পাওয়া যায়নি।”
কনস্টেবল দুজন আর কথা বাড়ায় না। রুম থেকে বেরিয়ে যায়। ততক্ষণে রুমের ভেতরে শুভ্র পাঞ্জাবি পরনের তারেক এহসান প্রবেশ করে। কনস্টেবলদের চলে যেতে দেখে,সে অফিসারের উদ্দেশ্যে কপাল কুঁচকে বলল,

“কি হলো? এখানেও কি কিছুই নেই?”
অফিসার নির্লিপ্ত স্বরে জবাব দেয়,
“জ্বী না,স্যার।”
নিমিষেই তারেকের চোয়াল শক্ত হয়। তার নজর পড়ে সরাসরি কেনীথের দিকে। কথা না বাড়িয়ে সে দৃঢ় পায়ে তার দিকে এগিয়ে যায়। একদম মুখোমুখি হয়ে তার সম্মূখে দাঁড়ায়। চোয়াল শক্ত করে, কেনীথের নির্লিপ্ততা পরখ করে।
—“আমার মেয়ে কোথায়?”
তারেকের চাপা হুমকিস্বরূপ কন্ঠস্বরে, কেনীথ আড়চোখে একপলক কেবিনেটের দিকে চেয়ে দেখে। পরক্ষণেই তারেকের নজরে নজর মিলিয়ে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
“তা কি আমার জানার বিষয়?”

—“ভালোই ভালোই বলে দাও, এবারও ছেড়ে দেবো। কিন্তু আমার মেয়ের কিছু করলে…জ্যান্ত মাটিতে গেঁড়ে রাখব।”
তারেকের হিংস্র চাহনিতে নজর মিলিয়ে,কেনীথ অনিমেষেই তির্যক হাসে। সে কেনো হাসছে তার কারণ তারেকের জানা নেই। তবে তারেক আবারও চাপা স্বরে বলে,
“আমার মেয়ের পরিবর্তে কি চাও? ঐ জমিজমার ঝামেলা মেটাতে চাইছো তো? ঠিক আছে,আমি রাজি। আমার মেয়েকে দিয়ে দাও আমি ইহকালে আর ফিরে এহসানদের সম্পত্তিতে নজর দেবো না। ওয়াদা করছি।”

—“এসব দুই টাকার সম্পত্তির প্রয়োজন নেই। আপনি বললে, এই এহসান মঞ্জিলও আপনার নামে করে দেওয়ার ব্যবস্তা করতে পারি। কিন্তু পারলে অবশ্যই আগে মিথ্যে অভিযোগ গুলো তুলে ফেলুন। এই দেশের রাজনীতির সাথে আমার কোনো কানেকশন নেই। বাবা রাজনীতিতে জড়িত তা আপনিও জানে না। তাই আপনার এই সব মিথ্যে অভিযোগে আমার কোনো ক্ষতি হচ্ছে না বরং বাবার ক্ষতি হচ্ছে।”
তারেক চোয়াল শক্ত করে বলল,
“তার মানে সহজ কথায় কাজ হবে না, তাই তো?… তবুও বারবার সুযোগ দিচ্ছি,বলে দাও আনায়া কোথায়। নয়তো তোমার বাবার পলিটিক্যাল ইমেজ আমি সারাজীবনের মতো ধ্বংস করে দেবো।”

—“আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে, এসবের সাথে বাবার কোনো কানেকশন নেই। তাই নিজের ব্যক্তিগত আক্রোশ তার উপর ঝাড়বেন না।”
—“নেই বলছো? তাহলে দেশে এতোকিছু হয়ে যাওয়ার পরও,সে কিসের বাহানা দিয়ে বিদেশে পড়ে আছে। সে কি গা ঢাকা দিতে চাইছে? এতোই সহজ?”
কেনীথ ঠোঁট চেপে তারেকের ক্ষিপ্ত মুখটার দিকে খানিকক্ষণ চেয়ে থেকে,নির্বিকার স্বরে বলল,
“দেখেন যা ভালো বোঝেন।”
তার এই একটি বাক্যে তারেক শেষমেশ নিজের রাগ আর নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হলো। অকস্মাৎ কেনীথের কালো টিশার্টের কলার দু’হাতে চেপে ধরে হিসহিসিয়ে আওড়ায়,

“মে’রে ফেলবো জানোয়ার! আমার মেয়ের গায়ে সামান্য দাগও যদি তোর কারণে লাগে—তবে তোকে আমি নিজ হাতে শেষ করে ফেলবো।”
কেনীথ নিঃশব্দে তারেকের চোখে চোখ মিলিয়ে, দৃঢ় পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে।তাদের পেছনে থাকা, পুলিশ অফিসার নিজেও কিছুটা ঘাবড়ে যায়। তবুও নিজেকে তটস্থ করে জোর গলায় বলল,
“স্যার, প্লিজ! এখন এসব করবেন না।”
ব্যক্তিটির কথায় তারেক নিজেকে সামলায়। কেনীথের টিশার্ট ছেড়ে দিয়ে এক’পা পিছিয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে কেনীথ নির্বিকার ভঙ্গিতে নিজের গা ঝাড়ে; ঘাড়ের পেছনে হাত রেখে মাথাটা খানিক এপাশ-ওপাশ করতেই—অস্থি ভেঙে মড়মড় শব্দে প্রতিধ্বনিত হয়। আর ততই যেন তারেকের রাগটা আরো তিরতির করে বেড়ে ওঠে।
কেনীথ হাতে থাকা কফির মগটার দিকে একপলক চেয়ে দেখে। কফির অবশিষ্টাংশ মুখে দিতেই,চোখ-মুখ অতিরঞ্জিত ভঙ্গিতে খিঁচে নেয়। ব্লাক কফিটুকু সম্পূর্ণ ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। খেতে যা নিত্যান্তই বিশ্রি ঠেকল। তবুও সে কিঞ্চিৎ ঠোঁট কামড়ে, তারেকের দিকে চেয়ে তাচ্ছিল্যসরূপ তির্যক হেসে আওড়ায়,
“আপনার যা ভলো মনে হয়,আপনি তাই করুন।”

পুলিশসহ তারেক, এহসান মঞ্জিল ছেড়েছে,প্রায় বেশ অনেকক্ষণ হলোই। এদিকে তারা যেতেই, কেনীথ সর্বপ্রথমে রুমের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে—কেবিনেটটা খুলে ফেলে। ঘুমন্ত অস্তিত্বের ন্যায় অচেতন আনায়া বিস্তৃত জায়গাটুকুর একপাশে শুয়ে আছে। কেবিনেটের একটা পার্ট শুরু থেকেই খোলা রেখেছিল। কেনীথ তার গালে-কপালে হাত ছুঁইয়ে,আশ্বস্ত হয়—না,সব ঠিকঠাকই আছে।
আনায়াকে কোলে তুলে নিয়ে, কেনীথ আলগোছে বিছানায় শুইয়ে দেয়।খানিকটা দূরত্ব বজায় রেখে, অজান্তেই সে আনায়ার উপর শুয়ে—তার দু’পাশে দু’হাত ঠেকায়। আনায়ার মুখের উপর ছড়িয়ে থাকা ছোট্ট ছোট্ট চুলগুলো আলতোভাবে আঙুল দিয়ে সরিয়ে দেয়। আনায়ার ফোলা-ফোলা ফর্সা গলাদুটোর দিকে চেয়ে,মুচকি হাসে।হাতের পিঠের আঙুলজোড়া দিয়ে, আলতোভাবে স্পর্শ করে ঘষে দেয়। পরক্ষণেই টুপ করেই গালে চুমু খেয়ে নেয়। অতঃপর তার নজর চলে যায় আনায়ার অধরে। খানিকক্ষণ সেদিকে চেয়ে থাকার পর,বৃদ্ধা আঙুলখানি আলতোভাবে আনায়ার ওষ্ঠের কোণে ছোঁয়ায়।

অদ্ভুত এক আকর্ষণে সে যেন, আনায়ার মাঝে ক্রমশই হারিয়ে যাচ্ছে। একইসাথে তাকে হারিয়ে ফেলার ক্ষীণ এক সংশয়ও জেগেছে মনে৷ হঠাৎ এই আশংকা কেনো জন্মালো তা কেনীথের কাছে অজানা। সবকিছু তো ঠিকমতোই হচ্ছে। আর মাত্র কিছুটা পথ। তারপর তো আনায়া সম্পূর্ণ তারই। তাহলে কেনো এই অহেতুক সংশয়?
কেনীথ নিজেই নিজের প্রশ্নে হারায়। এক প্রশ্নের উত্তর পেতে না পেতেই,পুনরায় আরেক প্রশ্ন এসে মাথায় চড়ে বসলো। আনায়াকে নিয়ে তার নূন্যতম আগ্রহ ছিল না। না আগে আর না এই কিছুদিন পূর্বেও। অথচ হঠাৎ এমন কি হলো তার? আনায়ার প্রতি এতো বেশি অবসেসড সে কিভাবে হলো? এখন তো তার নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করতে হচ্ছে, সে আদৌও পাগল কিনা।

আরো বেশ কিছুটা সময় নিজের সাথে এহেন সব তর্কবিতর্কের প্রশ্নের উত্তরের জন্য লড়াইয়ের পর, সে ক্ষ্যান্ত হয়। নিজেই নিজেকে দৃঢ়ভাবে বোঝায়—‘এতো ভাববার কিছু নেই।আনায়াকে তার যেকোনো মূল্যেই নিজের জন্য প্রয়োজন। আনায়া আগেও তার ছিল, এখনও তারই থাকবে। আর সবচেয়ে বড় বিষয়,সে চায় আনায়া তার সাথে থাকুক। আনায়া আজীবন শুধুমাত্র তারই থাকুক।”
মাথা হতে সব অহেতুক ভাবনাচিন্তা সরিয়ে, কেনীথ পুনরায় অচেতন আনায়ার দিকে নজর দেয়। ঠোঁটে ছুঁয়ে থাকা আঙুলের স্পর্শ আরো দৃঢ় হয়। কেনীথ আবারও তার মাঝে হারায়। অজান্তেই আরো একধাপ এগিয়ে কিছু করতে যাবে—ঠিক তৎক্ষনাৎ সে নিজেকে থামিয়ে দেয়। কপাল কুঁচকে দাঁতে দাঁত চেপে আওড়ায়,
“কন্ট্রোল!কন্ট্রোল! ভিকে, যাস্ট কন্ট্রোল ইউর সেল্ফ।”

এই বলতে না বলতেই সে দ্রুত আনায়া হতে সরে—তৎক্ষনাৎ তার পাশেই শুয়ে পড়ে। অকারণেই আনায়াকে একবার তীব্রভাবে জড়িয়ে ধরার ইচ্ছে ছিল,তবে আপাতত সেই ইচ্ছেকে মনের অজান্তেই চাপা দিয়ে সে দ্রুত ফোনটা বের করে। এবং তার সংসদ সদস্য বন্ধু তথা ইলহামকে ফোন করে৷
—“ওনারা বাড়িতে গিয়েছিলেন? সবকিছু ঠিকঠাক হয়েছে? অফিসার কোনো গড়বড় করেনি তো?”
ইলহামের খানিক চিন্তিত কন্ঠস্বরে,কেনীথ ভারী শ্বাস ফেলে বলল,
“না, সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল।”

কেনীথের অভিব্যক্তিতে ইলহাম আশ্বস্ত হয়৷ কেনীথের কথা মতো, সে খোঁজখবর নিয়েছিল। অতঃপর তারেকের সাথে যে পুলিশ অফিসারের যাওয়ার কথা ছিল—তার সাথে যোগাযোগ করে। এরপর তারা যেমনটা চেয়েছিল ঠিক তাই হয়। পুলিশ অফিসার শুরুতেই ভিভিয়ান এহসানকে খুঁজে আশ্বস্ত হয়। এবং নিজের সাথে রাখা বাকি দুজন কনস্টেবলকেও আগে হতেই এইসব বিষয়ে জানান দিয়ে রাখে। ফলে আনায়াকে কাভার্ডে পেয়েও তারা কোনো প্রতিক্রিয়া না করে, চুপ রয়ে যায়।
কেনীথ খানিকটা সময় নিয়ে বলে,
“থাংকস্! তোরা হেল্প না করলে,সবকিছু এতো ইজিলি হ্যান্ডেল করা পসিবল হতো না।”
তার কথায় ইলহাম মৃদু হেসে বলল,
“না,ঠিক আছে। বন্ধুত্বে এসব ধন্যবাদ-সরির কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমার একটা বিষয়ে খানিক খটকা লাগছে। আ…তুই সত্যি করে বলতো,আনায়াকে কি তুই ভালোবাসিস বলেই এতো কিছু করছিস নাকি এর পেছনেও ভিন্ন কোনো কারণ আছে?”
ইলহামের প্রশ্নের জবাব, কেনীথ তৎক্ষনাৎ দিতে পারে না। বেশ কিছুটা সময় নিয়ে,শীতল-গম্ভীর্যের সহিত আওড়ায়,
“আই ডোন্ট নো। বাট আই ওয়ান্ট হার ব্যাডলি। বিকজ শী ইজ ওনলি মাইন।”
কেনীথের অভিব্যক্তিতে ইলহাম আনমনেই হেসে ফেলে।

—“পাগলা!”
হঠাৎ এমন সম্মোধনে কেনীথের কপাল কিঞ্চিৎ কুঁচকে যায়। পরক্ষণেই বিষয়টাকে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে বলল,
“বাদবাকি যা করতে বলেছিলাম,মনে আছে তো?”
—“হুম অবশ্যই, তুই শুধু সময়মতো সমুদ্র বন্দর অব্দি পৌঁছে যা। বাদবাকি আমার লোকজন ম্যানেজ করে নেবে। কখন বের হবি, ঠিক করেছিস?”
—“হুম,সন্ধ্যা নামুক। তারপর ওকে নিয়ে বেরিয়ে পড়বো।”
দুজনের সংলাপে কিছুটা নীরবতা জমে। খানিকক্ষণ বাদে ইলহাম ভারী শ্বাস ফেলে বলল,
“জানি না, তোর মাথায় ঠিক কি চলছে। তবে মন থেকে চাইবো,তুই সফল হো।… আর হ্যাঁ, যত যাই হোক,কাজটা যেহেতু আজ রাতেই করতে হবে তাই সর্বচ্চ সতর্ক থাক। ভুলেও মেইন রোডের দিকে এগোবি না।
শুনলাম,তোর বাড়ি থেকে নাকি তারেক এহসান সরাসরি শহর ছেড়ে ঢাকায় ফিরছে। যদিও আশা অনুযায়ী এটাই হওয়ার কথা ছিল,কিন্তু কোনো কিছুরই বিশ্বাস নেই। সে না থাকুক,তার গোপনীয় লোকজন এখানে থাকতেই পারে। এতো সহজে তো হার মানবে না।”

কেনীথ আনায়াকে জাগিয়ে তোলে। আনায়া জেগে উঠে, নিজের পাশে কেনীথকে পেয়ে চমকায়। দ্রুত নিজের দিকে তাকিয়ে দেখে,সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা। নাহ! সব তো ঠিকই আছে।
এদিকে তার ভাবভঙ্গি দেখে কেনীথের ভ্রু জোড়া অনিমেষেই কুঁচকে যায়। সে সন্দিহান স্বরে আনায়ার উদ্দেশ্যে বলে,
“এসব কি করছিস তুই? তোর কি মনে হয়,আমি তোকে সেন্সলেস করে ঐসব করতে চাইবো?”
আনায়া তার দিকে কপাল কুঁচকে ফিরে তাকায়। অতঃপর রক্ষ স্বরে বলল,
“আপনি আমায় কি খাইয়েছিলেন? অজ্ঞান কেনো করলেন আমায়?”
কেনীথ খানিক তির্যক হেসে বলে,
“অজ্ঞান হয়েছিলি নাকি? জানতাম না।”

—“মশকরা করবেন না। আপনি কি চান স্পষ্ট করে বলুন তো!”
—“যা চাই, তা বললে কি দিবি আমায়?”
কেনীথের অদ্ভুত কন্ঠস্বরে আনায়া বোকা বনে যায়। কি বলবে বুঝে উঠতে পারে না। তবুও মাথা নাড়িয়ে বলল,
“হু,যদি সম্ভব হয় তাহলে…।”
আনায়ার ইতস্তত ভঙ্গিতে, কেনীথ তির্যক হেসে বলে,
“আমার শুধু তোকে চাই।”

কেনীথের একটি বাক্যে আনায়া সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়। এই লোক কি বোঝাতে চাইছে? বিস্ময়ে তার ঠোঁটজোড়া খানিক ফাঁক হয়ে যায়। তার ভাবভঙ্গিতে কেনীথ তাচ্ছিল্যের সহিত তির্যক হাসে। আচমকা আনায়ার মাথায় আলতোভাবে বৃদ্ধা ও তর্জনী আঙুল একত্রিত করে টোকা দিয়ে, খানিক কর্তৃত্বসরূপ দৃঢ় কন্ঠে বলল,
“বুদ্দু! যা গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে আয়। বিকেল হয়ে এসেছে, অথচ এখনো দুপুরের খাবার খাসনি।”
আনায়া পাশে ফিরে দেখে,টেবিলে খাবারের প্লেট রাখা। সেও আর কথা না বাড়িয়ে,উঠে ওয়াশরুমে চলে যায়। এদিকে কেনীথ আনমনেই বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়,
“আগের মতোই বিচ্ছু আছে। কিন্তু আরেকটু শক্তপোক্ত হলে হয়তো ভালো হতো।”
আনায়ার শক্ত-পোক্ত হওয়া বলতে কি বোঝালো, তা হয়তো সে নিজেই ভালো জানে। কিন্তু শেষমেশ কিঞ্চিৎ ঠোঁট কামড়ে তির্যক হেসে ফেলার বিষয়টা, খানিক সন্দেহজনকই বটে।

আনায়া ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে ফিরতেই দেখে,কেনীথ খাবারের লোকমা বানিয়ে বসে আছে। আর তাকে দেখামাত্রই তড়িঘড়ি করে বলে ওঠে,
“দ্রুত এদিকে আয়।”
আনায়া তার দিকে এগিয়ে যেতে যেতেই আওড়ায়,
“আমি নিজ হাতেই খাবো।”
—“বেশি কথা না বলে,এদিকে এসে বস। আমি খাইয়ে দেবো,চুপচাপ খাবি। হাতে সময় কম, আমাদের যেতে হবে।”
কেনীথের দৃঢ় অভিব্যক্তিতে আনায়া আর কিছুই বলতে পারে না। সে চুপচাপ কেনীথের সামনে গিয়ে বিছানায় বসে পড়ে। কেনীথ নির্বিকার ভঙ্গিতে তার মুখের সামনে খাবার তুলে ধরে। আনায়ার বেশ সংকোচ বোধ হলেও,সে চুপচাপ খাবার মুখে নেয়। অন্যদিকে কেনীথ কোনো কথা না বাড়িয়ে, স্বাভাবিক ভাবেই তাকে খাইয়ে দিতে লাগে।
এদিকে আনায়া খাবার চিবোতে চিবোতেই বলতে লাগল,
“আমরা কি আবার কোথাও যাবো?”

—“হুম।”
কেনীথের স্পষ্ট গম্ভীর অভিব্যক্তিতে, আনায়া খানিক সময় নিয়ে কিছু একটা ভাবে। পরক্ষণেই ইতস্তত স্বরে মিনমিনে গলায় বলল,
“আমি আর কোথাও যেতে চাই না।”
কেনীথ তার দিকে মুখ তুলে, ভ্রু উঁচিয়ে বলে,
“এখানেই থাকতে চাস?”
আনায়া মাথা নাড়িয়ে বোঝায়,’হ্যাঁ’
কেনীথ কিছুটা সময় নিয়ে,তার খাবার ভর্তি ফোলা ফোলা গালদুটোর দিকে আনমনে তাকিয়ে থাকে। অতঃপর ভারী শ্বাস ফেলে বলে,
“খাওয়া শেষ কর আগে।”

—“আগে বলুন, আর কোথাও নিয়ে যাবেন না আমায়। হয় বাড়ি পাঠিয়ে দিন,নয়তো এখানেই রাখুন।”
—“এখন না। আগে সবকিছু স্বাভাবিক হোক। তারপর আবার এখানে এসে থাকবি।”
—“কিন্তু আমি…”
—“বেশি পাকনামি করিস কেন? যখন যা বলল তাই শুনবি,আমার মুখের উপর আবারও কথা বললে—মে’রে সোজা তক্তা বানিয়ে দেবো।”
হুটহাট স্বাভাবিক থেকে এমন রুক্ষ ব্যবহার করতে দেখে, আনায়ার মন-মেজাজ নিমিষেই খা’রাপ হলো। এটা কেমন বিহেভিয়ার? আনায়া বেশ বিরক্ত হয়ে,কেনীথকে আঁড়চোখে তাকিয়ে দেখে আওড়ায়,
“অসভ্য পেঁচা!”

আনায়া কাথাটা মনে মনে বললেও,কেনীথ আকস্মিকভাবে তৎক্ষনাৎ বলে ওঠে,
“খবরদার আমায় গালি দিবি না।”
আচমকাই কেনীথের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকানো ও রুক্ষস্বরের অভিব্যক্তিতে—আনায়া বেশম খেল। কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে,খাবার চিবিয়ে আওড়ায়,
“আমি গালি দেই না।”
—“হ্যাঁ,আমি খুব ভালো করেই জানি, তুই কতটা ভালো।”
আনায়া তার কথায় খানিক কপাল কুঁচকে ফেলে। কেনীথ নিজের মতো প্লেটের দিকে নজর দিয়ে,খাবার মাখাচ্ছে। অন্যদিকে আনায়া বিরক্তির ভঙ্গিতে মনে মনে আওড়ায়,
“ভাবটা এমন করে যেন,আমার সম্পর্কে সব জানে। বেটা গোমড়ামুখো পেঁচা কোথাকার!”

পাপড়ির মন ছটফট করছে। চোখের সামনে এখন শুধু এক সুদর্শনের অবয়বই ভেসে উঠছে। কিন্তু কোনোমতেই তাকে ছুঁতে পারছে না। এই তো, কিছু ঘন্টাখানেক আগের কথা। বাড়িতে পুলিশ গুলোর সাথে একজন সাদা পাঞ্জাবি পড়ুয়া গম্ভীর লোক এলো। তার নাম নাকি তারেক এহসান। যতদূর বুঝেছে,তার সাথে এই এহসান মঞ্জিলের বেশ দৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু তাতে তার কি? তার ভাবনার মূখ্য বিষয় হলো,তারেক এহসানের সাথে আসা আরো এক সুদর্শন ব্যক্তিকে ঘিরে। যাকে তারেক বেটা বেশ গম্ভীর স্বরে ডেকেছিল,‘সাফিন’ নামটা ধরেই।
হ্যাঁ,সেই সুদর্শনের নাম তবে সাফিনই বটে। কিন্তু বেটা যত সুদর্শনই হোক না কেনো,পাপড়ির সাথে প্রথম সাক্ষাৎ-এই সে বড়সড় এক অন্যায় করে গিয়েছে।
সাফিস পুলিশ অফিসারদের নিয়ে, বাড়ির বেসমেন্ট খুঁজতে পাপড়িকে ডাক দেয়। আশেপাশে যেহেতু সেই ছিল,তাই হয়তো। অবশ্য বিশেষ কোনো কারণ থাকার কথা নয়। কেননা তখনও সাফিনের চোখে মেয়েটা বাড়ির কোনো ছোট্ট সদস্য তথা পিচ্চি। অথচ প্রথমবার ঠিক করে সাফিনকে দেখেই, পাপড়ির দিন-দুনিয়া ঘুরে যায়। মনে মনে বিস্ময়ের সাথে আওড়ায়,

“আল্লাহ গো! এটা মানুষ না পরীর বেটা জিন। এতো সুন্দর কেন?”
এদিকে প্রথম ডাকে সাড়া না পেয়ে,সাফিন আবারও তার উদ্দেশ্যে বলল,
“এই যে পিচ্চি,এদিকে এসো তো একটু। বাড়ির বেসমেন্টে যাওয়ার পথটা কোন দিকে,একটু দেখিয়ে দাও তো।”
পাপড়ির কপাল নিমিষেই কুঁচকে যায়। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সাফিনকে পরখ করে। পরনে তার কালো প্যান্ট,সাদা শার্ট। মাথা ভর্তি গাঢ় বাদামী রঙের সিল্কি চুলগুলো বেশ গোছানো। বেশভূষায় সবমিলিয়ে প্রচন্ড পরিপাটি। দেখতেও তো বেশ সুন্দর। বয়স আর কতই হবে,পঁচিশ-ছাব্বিশ?
তাহলে এই বেটা তাকে পিচ্চি বলে কোন আক্কেলে? পাপড়ি একঝলক নিজের দিকে চেয়ে দেখে,পরক্ষণেই স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। এবং সাফিনের দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,
“আপনি আমাকে পিচ্চি বললেন কেনো?”

সাফিন কিছু জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিল,কিন্তু উল্টো এই মেয়েটার প্রশ্নে সে খানিক ইতস্তত ভঙ্গিতে হেসে বলে,
“আ’ম সরি যদি এতে তুমি কিছু মনে করে থাকো। আমি তোমার যথেষ্ট বড়ই হবো। আর তুমিও বেশ ছোটই। আর তোমার নাম যেহেতু জানি না তাই ডেকে ফেলেছি। যাই হোক, বলছিলাম বাড়ির বেসমেন্ট…”
—“থামুন,আগে আমাকে বলতে দিন। আমি মোটেও ছোট না। আমার যথেষ্ট বয়স হয়েছে। বিয়ে করলে বাচ্চার আম্মার হওয়ার ক্ষমতা আছে। তাহলে আপনি আমাকে কোন হিসেবে পিচ্চি বললেন? ভদ্রতা নাই আপনার?”
পাপড়ির কথাবার্তা হুট করে বেশ শুদ্ধ হয়ে গিয়েছে। মেয়েটা রেগেছে তা বিষয় নয়। তবে সাফিন বেশ ভড়কে গিয়েছে। সে ব্যক্তি হিসেবে খানিক নম্র স্বভাবের। একইসাথে অহেতুক ঝামেলা তার পছন্দ নয়। বেশিরভাগ সময় আগ বাড়ি হলেও,নিজের ভুল ত্রুটি স্বীকার করে ঝামেলা মিটিয়ে সরে আসে। যথারীতি পাপড়িকেও সে তেমন গুরুত্ব না দিয়ে, নিজের কাজে মনোযোগী হতে চেয়েছিল। কিন্তু এই মেয়ে যেভাবে রিয়েক্ট করছে,তাতে সে কি বলবে নিজেও জানে না।
এদিকে পাপড়ি আবারও তার উদ্দেশ্যে বলল,
“কি হলো,এখন কথা বলেন না কেনো?”

—“আচ্ছা ঠিক আছে,আমি সরি বললাম তো। এবার প্লিজ বলো,বাড়ির বেসমেন্ট…”
—“থামেন আপনি, আপনার সাথে কথা বলার মুড নাই আমার। যান দূরে গিয়া মরেন।”
যেমন কথা তেমন কাজ। পাপড়ি একটা কথাও না বাড়িয়ে,নিজের কোমড় অব্দি ছড়ানো বেণীটা সজোরে পেছনের দিকে ঢেলে দিয়ে, তরতর করে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। এদিকে পেছন হতে সাফিন আনমনে ভেবে যায়,
“কি আশ্চর্য, এই মেয়েটা এমন কেনো। যতদূর দেখলাম এই বাড়ির সকলেই যথেষ্ট অমায়িক। মেয়েটাও তো দেখতে বাকিদের মতোই ভিনদেশী মনে হলো। হবে হয়তো এই বাড়িরই সদস্য। তবে এ কেনো এমন…যাই হোক,পিচ্চি বলেই এই অবস্থা। না জানি বড় হয়ে এসব কি হবে।”

তখনকার মতো ঘটনা তো মিটে গিয়েছে। কিন্তু এখন পাপড়ির বেশ আফসোস হচ্ছে। সাফিনের ভাবনা মাথা থেকে সরছেই না। চোখ বুজলেও সে,চোখ খুললেও সে। কিন্তু এইমূহূর্তে কি করবে সে,তাই তে বুঝতে পারছে না।
পাপড়ি খেয়াল করে দেখে, তার বুকের বা-পাশটা খানিক ব্যাথা করছে। সে আরো বেশি চিন্তিত হয়ে পড়ে। এ কোন অনুভূতি? সে কি ঐ লোকটার জন্য এখন পাগলই হয়ে যাবে? বুকে ব্যাথাও হচ্ছে, আবারও ভালোও লাগছে। ভালো লাগায় মাঝেমধ্যে মিটমিট করেও হাসছে। আগে তো কখনো এমন হয় নাই। তাহলে এখন কেনো এমন হচ্ছে? কেনো? কেনো? কেনো?
পাপড়ি আনমনে একের পর এক প্রশ্নে নিজেকে হারিয়ে,শেষমেশ খানিক স্বাভাবিক হলো। প্রশান্তিতে দীর্ঘ শ্বাস টেনে, বুকের বা পাশে হাত রেখে আওড়ায়,

‘Ek pardesi mera
dil le gaya______
Jaate jaate mithha Mithha
gham de gaya______’
পাপড়ির গান গাওয়া থেমে যায়। এই সন্ধ্যা বেলায় তার বড়ভাইজান আর এই নতুন বউটা যাচ্ছে কোথায়? সে দ্রুত পায়ে ভেতরের দিকে গিয়ে, কাশফিয়া আর নূরজাহানকে ডাকে। তাদের সাথে রোজ ছিল বিধায়,খবর পেয়ে সেও আসে।
আনায়া শাড়ি ছেড়ে গায়ে লালচে কালো রঙের গাউন জড়িয়েছে। এটা আজই নতুন কিনে এনে, কেনীথই তাকে পড়তে দিয়েছে। যেখানে যাচ্ছে, সেই পথটুকু অতিক্রমের জন্য এটাই ঠিকঠাক। শাড়ি পড়ে গেলে,বেশ অসুবিধা হবে—যেহেতু আনায়া শাড়িতে অভ্যস্ত নয়।

কেনীথ অভ্যন্তরীণ বিষয়বস্তুর পাশাপাশি বাহ্যিক বিষয়েও ধ্যান রেখেছে। যা করতে চলেছে, তাতে কতটুকু সফল হবে, তা সে জানে না। তবে আশা রাখছে শেষ অব্দি, সে যেমনটা চাইছে আপতত তেমন কিছুই হবে। কিন্তু হাতেও তো সময় নেই। এদিকে আগেভাগেই বাড়ির সদস্যরা এগিয়ে এসেছে দেখে,কেনীথ স্বস্তিই পেল।
—“কিরে, এই সময় কোথায় যাচ্ছিস তুই?”
কেনীথের পরনে কালো রঙের টিশার্ট আর প্যান্ট। টিশার্টের উপরে অবশ্য কালো রঙের এক লেদার জ্যাকেটেও জড়ানো। তবে ঝাঁকড়া চুলগুলো বরাবরের মতোই এলোমেলো হয়ে আছে। একইসাথে চোখে-মুখে অজানা চিন্তার ছাপ। এদিকে কাশফিয়ার প্রশ্নে, কেনীথ নিরেট স্বরে বলে,

“একটু দরকার আছে। দোয়া করো,কিছুদিনের মধ্যেই ফিরে আসবো।”
কেনীথের অভিব্যক্তিতে কাশফিয়ার কপাল কুঁচকে যায়। সে সন্দিহান স্বরে বলল,
“কিছুদিন মানে?কোথায় যাচ্ছিস তুই? আর তুই নিজে যাচ্ছিস ভালো কথা,ওকে কেনো সাথে নিচ্ছিস?”
কেনীথ আর কথা বাড়াতে চায় না। তড়িঘড়ি ভাবগতিক তার মাঝে স্পষ্ট। সে আনায়ার হাতটা ছেড়ে দিয়ে, মায়ের কাছে আসে। কাশফিয়াকে একহাতে আগলে জড়িয়ে,কানের কাছে ধীর স্বরে আওড়ায়,
“আমার কাছে সময় নেই। বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করো। আর বাবা হয়তো ফিরে আসছে। বুঝতেই পারছো,সে ফিরলে পরিস্থিতি আরো খাপছাড়া হবে।”
কেনীথের ভাবভঙ্গিতে কাশফিয়ার মনে অকস্মাৎ তীব্র সংশয় জাগে। কেনীথ মুখে বলছে না কিছুই,অথচ সে তার চোখে ভিন্ন কিছুই অনুভব করছে। কাশফিয়া নিজেকে সামলে,কেনীথের দৃষ্টিতে নজর মিলিয়ে বলল,

“ঘটনা কি? এবার কি করতে চাচ্ছো?”
কেনীথ ঠোঁট চেপে কাশফিয়ার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। যেন নিজেও দ্বিধাদ্বন্দে পড়েছে, আদৌও সবটা বলা উচিত কিনা। তবে শেষমেশ সে বিষয়গুলো কাটিয়ে গিয়ে,কাশফিয়ার উদ্দেশ্যে বলল,
“বাবা এলে, তাকে একটু সামলে নিও। আর আনায়ার জন্য চিন্তা করো না। তোমাকে ছুঁয়ে বলছি, এবার আমি ওর কোনো ক্ষতি হতে দেবো না।”
কেনীথ এই বলেই,কাশফিয়াকে ছেড়ে নূরজাহানের কাছে এগিয়ে যায়। তাকে দুহাতে আগলে জড়িয়ে ধরে বলে,

“বেপি,আসছি তবে। ভালো থেকো। তোমার নাতনীকে নিয়ে আবার আসবো।”
নূরজাহানকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই,সে তার মাথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে দেয়। এবং সরাসরি ফিরে আনায়ার কাছে এগিয়ে যায়। আনায়া আদৌও বুঝতে পারছে না, এখানে হচ্ছেটা কি! এই লোকটা এমন ধোঁয়াশার মতো কেনো? তার পরিবারের কাছেও এই লোকের কোনো নিশ্চয়তা নেই।
আনায়া বরাবরের মতো চুপচাপ থেকে যায়। কেনীথ তার হাত ধরে বাড়ি হতে বেরিয়ে যাবে, তৎক্ষনাৎ অজান্তেই পেছন হতে কাশফিয়া ডাকে। কেনীথ মুখ ফিরিয়ে তাকায়। কাশফিয়া খানিকক্ষণ স্তব্ধ মূর্তির ন্যায় চুপ থাকার পর, অনিমেষেই আওড়ায়,

“আব্বা! নিজের খেয়াল রাখিস।”
কাশফিয়ার চোখজোড়া যেন ভিন্ন কিছু বলছিল। কেনীথ তা খানিক টের পেলেও,আর সময় নষ্ট করতে চাইল না৷ চোখের ইশারায় কাশফিয়াকে আশ্বস্ত করে আওড়ায়,‘হু।’

ফুল স্পিডে গাড়ি চলছে। কেনীথের মাঝে তীব্র অস্থিরতা। আনায়া নিজেও ভিতু হয়ে তার পাশে বসে রয়েছে।মার্সিডিজের কালো রঙের জি-ওয়াগনটা, উঁচু-নিচু কাঁচা রাস্তা বেয়ে এদিক-সেদিক ছুটছে। রাতের বেলায় গাড়ির ভেতরের গাঢ় লাল-কালো ইন্টেরিয়রের মাঝে,আনায়ার কেনো যেন ভয়ই লাগছে। পাশে এক উম্মাদ সাইকো নিজের কার্যকলাপ করছে,আর চারপাশে অন্ধকার জঙ্গলের ভীতিকর ছায়া। বিপদ-ভয় সবই যেন তাকে ঘিরে ধরেছে। অথচ আনায়া বুঝতে পারছে না হঠাৎ হলোটা কি! একটু আগেও তো সব ঠিকঠাক ছিল। তারা তো পাকা রাস্তা দিয়েই শহর ছাড়ছিল,তবে হঠাৎ এই রাস্তাতেই বা কেনো?
আনায়ার মনে নানান প্রশ্ন এলেও, সে এই পরিস্থিতিতে কেনীথকে বলার মতো তেমন সাহস পাচ্ছে না। শুধু একটু পরপর খেয়াল করছে,কেনীথ বারবার সাইড মিররে পেছনের দিকটা নজরে রাখছে। আনায়াও আগ্রহ নিয়ে কয়েকবার পেছনে তাকায়। এতোক্ষণ তেমন কিছু দেখতে না পেলেও,এবার খেয়াল করলো কয়েকটা গাড়ি এগিয়ে আসছে। তবে কি এই গোমড়ামুখো পেঁচাটা এই নিয়েই হঠাৎ এতোটা চিন্তিত হয়ে পড়েছে? তাহলে ঐ লোকগুলোই বা আবার কারা?

আনায়া নজর ফিরিয়ে সামনে তাকায়। তারা কাঁচা রাস্তাতেই রয়েছে,তবে এখনো জঙ্গলের ভেতরে প্রবেশ করেনি। কিন্তু কেনীথের ভাবভঙ্গি যা, তাতে মনে হচ্ছে সে ঐদিকেই যাওয়ার নিয়ত রাখছে। আনায়া রাস্তা হতে নজর সরিয়ে,আঁড়চোখে কেনীথের দিকে তাকায়। কেনীথের মাথায় হাজারও সংশয় ঘুরপাক খেলেও,আনায়ার আপাতত তেমন কোনো চিন্তা নেই। সে বর্তমানে কেনীথকে দেখতেই ব্যস্ত। যাকে খুটিয়ে দেখতে দেখতেই নানান সময়ে তার মুখ অবয়বের নানান পরিবর্তন ঘটে। কখনো ভাবুক ভঙ্গিতে ঠোঁট কামড়ে ধরে,কখনো বা গা ফুলিয়ে কিছু একটা ভাবে। একইসাথে মনে মনে নিস্পৃহে আওড়ায়,
“পেঁচাটা গোঁমড়ামুখো হলেও সুন্দর আছে। না, শুধু সুন্দর নয়৷ অনেক বেশিই সুন্দর। চিন্তায় কপালে কেমন ভাজ পড়েছে,ভ্রু জোড়াও কুঁচকে রেখেছে। তবুও সুন্দর লাগছে। কি অদ্ভুত!

লোকটার সবকিছুতেই লাল-কালো…খানিক ভুতুরে লাগলেও, এই বিষয়টাও বেশ মানিয়েছে। সবকিছুই তো পারফেক্ট। বাই সেপ, সিক্সপ্যাক সবটাই আছে। নিয়মিত জিম করে নিশ্চয়। হাবভাবও যেন কোনো ইন্টারন্যাশনাল এ্যাকশন ফিল্মের হিরোর মতো। দেখতেও তো আবার বিদেশীদের মতো। পুরোপুরি বাঙালী তো মনে হয় না। আচ্ছা উনি কি সত্যিই কোনো নায়ক-টায়ক নয়তো আবার? কি জানি,না আগে কখনো এদেশে দেখেছি, আর না কখনো টিভি-মুভিতে। অবশ্য টিভি-মুভিতে দেখবো কোন দুঃখে? এই বয়সে এসেও কার্টুন দেখে ভাত খেয়ে, জীবন পাড় করছি।”

এই পর্যায়ে এসে, আনায়ার চোখ-মুখ নিজের প্রতি বিরক্তিতে খানিক কুঁচকে যায়। সে অজান্তেই কোনো কারণে হতাশ হয়ে ভারী শ্বাস ফেলে। পুনরায় আবার আঁড়চোখে পাশে ফিরে কেনীথকে দেখে। এবার নজর পড়ে, কেনীথের কালচে গাঢ় বাদামী রঙের ঝাঁকড়া চুলে। আনায়া আনমনে আবারও আওড়ায়,
“চুলগুলোও তো মারাত্মক! ছেলেদের চুল এমনটা হওয়া কি জরুরী? নাহ্,মোটেও না৷ নিজে মেয়ে হয়েও কেমন হিংসে হচ্ছে। অবশ্য হওয়াটাও স্বাভাবিক। মা দেখলে বলতো,‘আনায়া শেখ কিছু। এই ছেলের কাছ থেকে তোর বহুকিছু শেখা বাকি৷’ কিন্তু এতো চমৎকার ঝাঁকড়া চুলগুলো পাখির বাসা বানিয়ে রাখাটা কেমন ব্যাপার? এটাও কি কোনো স্টাইল? তার নিজস্ব স্টাইল? হবে হয়তো কিছু একটা।”
আনায়া আবারও কিছু সময়ের জন্য থামে। পরক্ষণেই ভারী শ্বাস ফেলে তাচ্ছিল্যের সহিত হেসে,বিদ্রুপের ভঙ্গিতে আওড়ায়,

“হাহ্!…পেঁচাটার হুটহাট গিরগিটির মতো রূপ পাল্টে, ধমক দেওয়ার ব্যাপারটা বিরক্তিকর। নিত্যন্তই বিরক্তর। অথচ তবুও দেখো,আমি তার কত প্রশংসা করে যাচ্ছি। এই ব্যাপারটা কি হাস্যকর নয়? হতেই পারে। তবে সুন্দরকে সুন্দর বলা জায়েজ আছে। আর এই বেটা তো মারাত্মক সুদর্শন!”
আনায়া হয়তো নিজেও জানে না, সে ভাবতে ভাবতে কতদূর পৌঁছে গিয়েছে। অথচ এদিকে কেনীথের মাথায় যেন চিন্তার পাহাড় নেমে এসেছে। তার মাঝে রাগ-চিন্তা-সংশয়ের মিশ্র প্রতিক্রিয়া ঘটছে। এবার সে নিজের চেপে রাখা ঠোঁটজোড়া খানিক দৃঢ়ভাবে কামড়ে ধরে। একইসাথে কপালের ভাজটাও খানিক দৃঢ় হয়। তবে আনায়ার নজর এতে পড়া মাত্রই সে যেন চমকে উঠল। আপনা-আপনি নিজেই ঠোঁট চেপে, কপাল কুঁচকে মনে মনে আওড়ায়,

“উফ,কি সর্বনাশ! চিন্তায় ভ্রু-কপাল কুঁচকেছে—এটাই যথেষ্ট নয় কি? এভাবে ঠোঁট কামড়ানোর কি প্রয়োজন?…ইশ! ব্যাথা লাগবে না?”
কথার তালে হারিয়ে,আনায়া নিজেও কিঞ্চিৎ ঠোঁট কামড়ে ধরে। তবে পরক্ষণেই তার হুঁশ ফেরে। তবুও এতক্ষণ পর! নিমিষেই সে নিজের ভাবনাচিন্তাকে স্মরনে পুনরাবৃত্তি করে, হতভম্ব হয়ে যায়। বিস্ময়ের সাথে বিড়বিড় করে আওড়ায়,
“আস্তাগফিরুল্লাহ! আমার চিন্তাভাবনা এতো বাজে? ছিহ্!”
কেনীথ শুরুটা না শুনলেও,আনায়ার উচ্চস্বরে বলা ’ছিহ্!’ বেশ স্পষ্ট ভাবেই শুনতে পায়। এবং তৎক্ষনাৎ সে নিজের ধ্যান থেকে বেরিয়ে,কপাল কুঁচকে আনায়ার দিকে ফিরে তাকায়। আচমকা তার তীক্ষ্ণ চাহনিতে, আনায়ার দৃষ্টি মিলে গেলেই,সে একপ্রকার আঁতকে ওঠে। তৎক্ষনাৎ গিয়ে সিটের সাথে খিঁচে বসে পড়ে।কেনীথ তার হাবভাবে খানিক অবাক হয়। মনে মনে ভাবে,এর আবার কি হলো?

—“কি হয়েছে তোর? এমন করছিস কেন?”
গাড়ির ভেতরটা ভারী নীরবতায় ঠাসা। বাইরে বাতাস চূর্ণ হচ্ছে ফুল স্পিডে ছুটে চলা গাড়ির জানালায়। আর তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে গাছগুলো পিছিয়ে যাচ্ছে বিদ্যুৎগতিতে। আনায়া খেয়াল করে—গাড়ি ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে। কেনীথের দু’হাত শক্ত করে স্টিয়ারিংয়ে চেপে ধরা, শিরাগুলো ফুলে উঠেছে। তার দৃষ্টি সম্পূর্ণ তার দিকেই, অথচ গাড়িটাও বেশ সুদক্ষভাবে চালিয়ে যাচ্ছে। আনায়া খানিক নজর ফেরাতেই বোঝে,তারা এখন সরাসরি জঙ্গলের আঁকাবাঁকা পথে ঢুকে পড়েছে।
এরিমধ্যে এক উঁচু ঢালে এসে, গাড়ি খানিক লাফিয়ে উঠতেই আনায়া তীব্র ঝাঁকুনি খায়। ভারসাম্য ফিরে পেতে না পেতেই, তার চোখ হঠাৎ স্থির হয়ে যায় কেনীথের গলার। ঠিক কণ্ঠনালীর মাঝ বরাবর দৃশ্যমান সেই দৃঢ়, স্পন্দিত অ্যাডম’স অ্যাপেলে।

কেনো যেন বুকের ভেতর কাঁপন ধরে যায়।অচেতনভাবে সে ঢোক গিলে ফেলে। পরক্ষণেই নিজের আচরণে চমকে ওঠে। দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার তীব্র চেষ্টায় অস্থির হয়ে ওঠে,তবে পারে না। বরং তার এমন উদ্ভট আচরণে কেনীথের কপাল আরো খানিকটা কুঁচকে যায়। এবং সেই নজরে আনায়ার নজর মিলে যেতেই, সে আরো বেশি ভড়কায়।
এবার অবশ্য হাত-পা খিঁচে হলেও,সে মিনমিন করে আওড়ায়,
“কিছু না,কিছু না, আপনি প্লিজ ঠিকমতো গাড়ি…”
আনায়ার কথা সম্পূর্ণ হয়না। বরং তার পূর্বেই গাড়িটি গিয়ে সরাসরি এক বড়সড় গাছের সাথে ক্র্যাশ করতেই,কেনীথ দ্রুত সম্মূখে নজর ফিরিয়ে—স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে পথ বেয়ে যেতে চেয়েও অসমক্ষ হয়। এবং অসাবধানতায় অকস্মাৎ-ই গাড়িটি আরেকটা গাছের সাথে সরোজে ধাক্কা লাগতেই থেমে যায়। কেনীথ তৎক্ষনাৎ ইঞ্জিন স্টার্ট করার চেষ্টা করে,কিন্তু কাজ হয়না। ইঞ্চিনে সমস্যা হয়েছে,তা বোঝামাত্রই চোখমুখ তীব্র আক্রোশে খিঁচে বলে ওঠে,

“হলি শী-ট!”
তার বিরক্তিসূচক অভিব্যক্তিতে,আনায়া পাশ থেকে উৎসুক কন্ঠে বলে ওঠে,
“কি হলো? এটা কি আর সামনে এগোবে না?”
কেনীথ দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে। এই মূহুর্তে মাথা গরম করে লাভ নেই। সে আনায়ার উদ্দেশ্যে ধমকের স্বরে বলল,
“গাড়ি থেকে নাম।”
তার ধমকে আনায়ার কপাল কুঁচকায়। সে খানিক ভীতু স্বরে বলে,
“এমন করছেন কেন? একা একা এই জঙ্গলে আমি কি করবো?”
আনায়ার এমন বোকার মতো কথাবার্তা শুনে,কেনীথের মেজাজ আরো বেশি খারাপ হলো।
—“গাধা,তুই একা না, আমিও নামছি।”

এই বলেই সে গাড়ি হতে বেরিয়ে পড়ে। অন্যদিকে আনায়াও নিচে নামে,কিন্তু দরজাটা লাগতে গিয়ে বিপত্তিতে পড়ে যায়। সাধারণত এইসকল SUV-র দরজাগুলো বেশ শক্তপোক্ত হয়। যে কারণে খোলা বা লাগানোর সময় খানিক বেশিই জোর দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এটা বন্ধ করার মতো আনায়ার আর শক্তিতে কুলায় না। সে বিরক্তির সাথে চাপা স্বরে বলে,
“এটা কি, লাগে না কেন?”
তার কথা শেষ হতে না হতেই,পেছন থেকে কেনীথ এসে সজোরে বল প্রয়োগে, ঠাস করে দরজটা লাগিয়ে দিয়ে বলে,

“ঠিকমতো তো খাওয়া-দাওয়া করবি না! শরীরের যা হাল তাতে এটা লাগানোর স্বপ্ন দেখিস কোন দুঃখে।”
কেনীথ এই বলেই,আনায়াকে একপলক বিরক্তির চাহনিতে দেখে নিয়ে পাশে ফিরে, খানিক দূরে সরে যায়।এবং দ্রুত ফোনটা বের করে, কাউকে কল দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এদিকে বারবার শরীর নিয়ে খোঁটা দেওয়ার ব্যাপারটা আনায়ার ভালোই গায়ে লাগছে। একইসাথে দীর্ঘ সময় ধরে যার প্রসংশা করতে করতে গাড়ি অব্দি এক্সিডেন্ট হলো,এখন সেই ব্যক্তিটির প্রতিই তার প্রচন্ড বিরক্তি এলো।
এদিকে ফোনের ওপর প্রান্তের ব্যক্তিটি কল রিসিভ করা মাত্রই, কেনীথ একপ্রকার হিংস্র হায়’নার ন্যায় ক্ষিপ্ততায় বলে উঠল,

“হোয়াট দ্য ফা’কিং হেল ইজ দিস! তোদের কতবার বলেছিলাম,এদেশে আমি তেমন কিছুই করতে পারবো না। এখানে আমার বাপ-চাচাই সব। তবুও তোদের ভরসায় এই গাধামিটা করেছি। শুধু একটাবার এখান থেকে বের হতে পারলেই,আমি বাদবাকি ইজিলি ম্যানেজ করে নিতাম। কিন্তু এখন আমি কি করবো বল?”
কেনীথ রাগের মাথায় কি বকছে তা ফোনের অপর প্রান্তে থাকা ফারহান কিংবা ইলহাম কেউই ঠিক বুঝতে পারল না। ইলহাম তবুও খানিক জোর গলায় বলে,
“কি হয়েছেটা কি? সেটা তো আগে বল।”
কেনীথ আক্রোশে ভারী শ্বাস ফেলে। নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে চাপা স্বরে বলল,

“পুরো প্ল্যান বিগড়ে দিয়েছে। গত আধঘন্টা হতে আমাদের পেছনে কয়েকটা গাড়ি লাগাদার ফলো করছে। এরা কোথায় থেকে এলো? তুই বলেছিলি এই রাস্তা সম্পূর্ণ ফাঁকা থাকবে। এহসানদের কোনো চ্যালাপ্যালা এদিকে আসবে না। অথচ এমন কিছুই হয়নি। শহর ছাড়ার আগেই,মেইনরোড থেকে এরা পিছু নিয়েছে।”
—“বলিস কি! তুই এখন কোথায় আছিস? যেভাবেই পারিস, ওদের থেকে আড়ালে চলে যা। তোর চাচা একবার তোকে ধরতে পারলে সর্বনাশ। বেটা যে পরিমাণে ক্ষেপে আছে, সবগুলোকে শেষ করে ফেলবে। আবার আরেকটা দুঃসংবাদও আছে, তোর বাপও দেশে চলে আসছে। পাভেল বলল,সে নাকি এখন তোকে স্বচক্ষে দেখার জন্য পাগল হয়ে উঠছে।”

ফারহানের অভিব্যক্তিতে,কেনীথের যেন আর কিছুই বলার নেই। নৈরাশ্যে ঠোঁটের কোণে আঙুল ঘষে, তীব্র বিদ্রুপময় চাপা স্বরে বলে ওঠে,
“হাহ্,এটাই বাকি ছিল। সবগুলো রোডেই তারেক এহসানের লোকজন। এতক্ষণ ধরে যেদিকেই গিয়েছি,সেদিক থেকেই চার-পাঁচটা গাড়ি পিছু নিয়েছে। আর এখন অন্ধকার জঙ্গলের মধ্যে হাত-পা গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছি।”
—“মানে? এই সিচুয়েশনে তুই জঙ্গলে কেনো…”
—“তো আর কি করবো? গাড়ি নষ্ট হয়ে জঙ্গলে পড়ে আছে।”
সবকিছু শোনার পর, দুজনের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। ফারহান বিস্ময়ের সাথে বলে উঠল,
“খোদা তুমি রহম করো। এবার কি করবি? শেষ, তুই শেষ। তোর বাপ-চাচা তোর সাথে সাথে আমাদেরকেও শেষ করে ফেলবে।”

—“যাস্ট শাট আপ। আজ আমি আমার পরিকল্পনায় সফল না হলে, আমি নিজেই তোদের শেষ করে ফেলব। শেষ বারের মতো একটা কাজ দিয়েছিলাম, সেটাও ঠিক মতো করতে পারিসনি। বারবার করে বলেছিলাম,খোঁজ নিয়ে দেখ পরিস্থিতি এখন কোন পর্যায়ে। প্রয়োজনে আমি আনায়াকে নিয়ে বাড়িতেই থাকতাম, তবুও তোদের উপর ভরসা করে এভাবে ফাঁসতে হতো না।”
এই পর্যায়ে কেনীথের অভিব্যক্তিতে,ইলহাম কিছু একটা ভাবতে লাগল। যতদূর তাদের ভিভিয়ানকে চেনে—সে এমনটা নয়। রাগ কিংবা তীব্র ক্ষোভেও সে এমন আচরণ করবে না। তবে কি কোনো অজানা সংশয়েই তার এমন অভিব্যক্তি?
ইলহাম খানিক জোর গলায় বলে,

“ভিভিয়ান, তুই কি একটু বেশিই প্যানিক করছিস না? আনায়া কোথায়,ও ঠিক আছে?’
ইলহামের কথার ভঙ্গিতে ক্ষণিকের জন্য থমকে যায় কেনীথ। গভীর ভাবনায় কি ভাবতে বসে,তা সে নিজেই জানে। একপলক পাশে ফিরে তাকিয়ে দেখে,আনায়া তার থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে—তারই দিকে উৎসুক চাহনিতে। যদিও আনায়া তার কথাগুলো স্পষ্টত শুনতে পারছে না। কিন্তু কেনীথ যে কারো সাথে বেশ রাগারাগি করছে,তা একদম স্পষ্ট।
সে আনায়া হতে নজর সরিয়ে নেয়। কন্ঠে খানিক হিং”স্রতা মিশিয়ে,রাগ ও সংশয়ের মিশ্র কম্পনে চাপা স্বরে হিসহিসিয়ে বলে,

“আমার আনায়া যদি আমার না হয় না…তাহলে তোদের সবাইকে আমি চিবিয়ে খাবো।”
কেনীথ থেমে যেতেই ইলহাম ভারী শ্বাস ফেলে বলল,
“বুঝেছি তোর কি হয়েছে। আনায়াকে হারানোর সংশয়ে আছিস, তাই তো? চিন্তা করিস না, ও আজীবন তোরই থাকবে যদি এখন তুই চাস। কেননা তোর কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে, তুই এখন পুরো উম্মাদ হয়ে আছিস। এই মূহুর্তে পাগলামি করলে ওকে পাবি কি করে গাধা?

যাই হোক,বরাবরের মতো ঠান্ডা মাথায় ভাব। হ্যাঁ,আমি সরি বলছি।কারণ আমার আরো বেশি সর্তক থাকার প্রয়োজন ছিলো। হয়তো আজ তোকে এভাবে বিপদে পড়তে হলো আমার কারণেই। কিন্তু এখন এসব ভেবে কাজ হবে না। মনে রাখিস, তোর কিছু হওয়া মানে আমরা সকলেই শেষ। তোর এই পরিকল্পনার সাথে আমরা অত্যপ্রত্য ভাবে জড়িত। যদি বলিস নিজ সার্থের কথা,তবে সেক্ষেত্রেও আমরা কখনো চাইবো না তোর কিছু হোক।
তাই বলছি এভাবে মাথা গরম না করে,দেখ কিছু করতে পারিস কিনা। অন্তত গাড়িটা স্টার্ট করতে পারিস কিনা, তা দেখ। আমি এদিক থেকে সর্বচ্চ চেষ্টা করছি—আমার লোকজন পাঠিয়ে দিচ্ছি,একটা না একটা উপায় বের হয়েই যাবে। কিন্তু তুই অন্তত জঙ্গল ছাড়ার ব্যবস্তা কর। নয়তো বড় ফাঁসান ফেঁসে যাবি। আর শোন,ওদিকে একটা…”

কেনীথ নিজেকে শান্ত করায় প্রচেষ্টায়। সে চুপচাপ ইলহামের কথা শুনছিল,তবে আচমকাই কানেকশন ডিজেবল হওয়ায়,তার চোখ-মুখ কুঁচকে যায়। ফোন চেক করতেই দেখে,নেটওয়ার্ক নেই। নিমিষেই একই রাগ তরতর করে বেড়ে যায়। আক্রোশে ফোনটা ছুঁড়ে ফেলবে,এই মূহুর্তে পেছন আচমকা আনায়া দৌড়ে এসে তার হাত ধরে থামায়।
—“কি করছেন এসব? ফোন ভেঙে কোনো লাভ আছে? এটাও নষ্ট হলে,এই অন্ধকার জঙ্গলে কি ছেড়ে কি করবো?”
আনায়ার কথায় কেনীথ অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকে একপলক দেখে। পরক্ষণেই ঘাড় ঘুরিয়ে, কিছু একটা ভাবতে লাগল। এরিমধ্য দূরে গাড়ির মৃদু শব্দ কানে আসতেই,কেনীথ আনায়ার হাতটা শক্ত করে ধরে,নিরেট কন্ঠে বলল,

“চল।”
আনায়া তার ভাবভঙ্গিতে, অবাক স্বরে বলে,
“কোথাও যাবো?”
কেনীথ তার প্রশ্নের উত্তর দেয়না। সে দ্রুত আনায়াকে নিয়ে জঙ্গলের পথ ধরেই এগোতে থাকে। আনায়াও উপায় না পেয়ে তার সাথে সাথে এগিয়ে যায়। কিন্তু পাশে থাকা এই উদ্ভট মানুষটার তীব্র অস্থিরতায় সে বেশ অবাক হয়। হঠাৎ এমন কি হলো যে,তাদের জঙ্গলে আসতে হলো,আবার এভাবে ছুটতেও হচ্ছে।
—“আপনার কি হয়েছে,বলবেন প্লিজ? এভাবে হঠাৎ এতো অস্থির হয়ে উঠছেন কেনো?”
এবারও কেনীথ কোনো জবাব দেয় না। যেন কোনোকিছু তার কানেই যাচ্ছে না। অন্যদিকে আনায়া কিছুটা বিরক্তির স্বরে বলল,

“সমস্যা কি, কিছু বললে উত্তর দেন না…আহ!”
অকস্মাৎ আনায়ার কথা থেমে যায়। গাছের সরু ডালের ঘর্ষণে, কনুইয়ের একপাশটা সামান্য ছিঁলে যায়। তার ব্যাথাতুর অভিব্যক্তিতে,কেনীথ থেমে গিয়ে তার দিকে ফিরে তাকায়। কপাল কুঁচকে, আনায়ার বাহু চেপে নিজের সাথে আঁকড়ে, বেপরোয়া স্বরে বলে ওঠে,
“কি হয়েছে?”
কেনীথের এলোমেলো কন্ঠস্বরে, আনায়া ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল,
“না, তেমন কিছু না। হয়তো একটু… ”
—“দেখে শুনে চলতে পারিস না গাধী!”
এই বলতে না বলতেই, কেনীথ নিজের কালোর রঙের লেদার জ্যাকেটটা খুলে আনায়ার গায়ে জড়িয়ে দেয়। এবং আনায়াকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই, আবারও তার হাত ধরে এগোতে থাকে। তবে এরিমধ্যে আচমকা এক বিকট শব্দে দুজনেই থমকে যায়।

গুলির শব্দ? তাও এই নিস্তব্ধ জঙ্গলের মাঝে? আনায়ার চোখ-মুখ শুঁকিয়ে আসে। সে কেনীথের দিকে বিস্ময়ের চাহনিতে তাকায়। কেনীথ তার বিষয়টা বুঝতে পেরে,আশ্বস্ত করে বলল,
“চিন্তা নেই,কিচ্ছু হবে। আমি তোর কিচ্ছু হতে দেবো না।”
তার কথা শেষ হতে না হতেই,আবারও গুলির আওয়াজে নিস্তব্ধ জঙ্গল যেন গর্জে ওঠে। আনায়া অজান্তেই গিয়ে,কেনীথের বাহুর আড়ালে আশ্রয় খুঁজে নেয়। কেনীথ তাকে শক্তভাবে আঁকড়ে, সম্মূখের দিকে এগিয়ে যায়। আর সময় নষ্ট করা যাবে না। এই পর্যায়ে সে আনায়াকে নিয়ে ছুটতে শুরু করল।
এরিমধ্যে আবার আকাশ ছেয়ে মেঘের গর্জন শুরু হয়। এই মূহুর্তে বৃষ্টি হলে,আরো ভোগান্তিতে পড়ে যাবে। একসাথে এসব কি শুরু হলো? চারপাশের পাশাপাশি এখন মাথার উপর থেকেও বিপদ এসে হাজির! কেনীথ বিরক্তিতে ভারী শ্বাস ফেলে। না জানে আজ কপালে কি আছে। কিন্তু যত যাই হোক না কেন,আনায়াকে হারাতে পারবে না। কোনোমতেই না।

কেনীথ এই আত্মবিশ্বাসেই আনায়াকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিল। সাথে ভাবছিল,সর্টকার্টে ঠিক কতদূর কি করা যেতে পেরে। একটা সময় শহর-জঙ্গলের সর্বত্রে রাজ করা ব্যক্তিটাও এখন পথ খুঁজে না পেয়ে দিশেহারা। বাকিসব চিন্তার চেয়ে যেন,আনায়াকে হারানোর চিন্তাটাই বেশি পিড়া দিচ্ছে তাকে।
এরিমধ্যে তার আনমনে ভাবনা ও অসাবধানতায়—অকস্মাৎ গাছের কোনো খাঁচ ডালের সাথে তার বাহুর উপরিভাগে সজোরে আঘাত লাগে।যা একদম ফর্সা চামড়া চিঁড়ে, সোজা মাংসে গেঁথে—র’ক্ত বেরিয়ে আসে। কেনীথ এতে শুধুমাত্র চোখমুখ খিঁচে ফেললেও,আনায়া বিস্ময়ে চমকে ওঠে। সে কাঁপা কাঁপা স্বরে কেনীথের উদ্দেশ্যে বলে,
“এ…এটা,আপনার…”
—“কিচ্ছু হয়নি আমার।”

তরতাজা র’ক্ত হাত চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে।অথচ কেনীথ নির্বিকার গলায় বলছে কিনা, কিচ্ছু হয়নি। আনায়া এই লোকের পাগলামিতে আবারও অবাক হলো। এটা কেমন পাগল। কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তরও দেয় না আবার…
—“আপনি বেশি বোঝা বন্ধ করুন। দেখুন তো কি হয়ে গেল এটা। এখনই র’ক্ত পড়া বন্ধ না করলে…”
আনায়া কথা বলার মাঝেই,নিজের ওড়নার একটা অংশ ছিঁড়তে নিলে—কেনীথ অকস্মাৎ তাকে বাঁধা দেয়। এবং আনায়াকে প্রচন্ড অবাক করে দিয়ে, গাছের সাথে দু’হাতে চেপে ধরে। তার হাবভাবে আনায়া হতভম্ব হয়ে যায়। এদিকে বারংবার মেঘের গর্জনে যেন সমগ্র জঙ্গল কেঁপে উঠছে। এদিকে কেনীথ উম্মাদের মতো আচরণ করছে। তবুও আনায়া এই অন্ধকারের মাঝে, তার সম্মূখের অদ্ভুত লোকটার ভীতিগ্রস্ত চোখজোড়ার মাঝে হারিয়েছে। এই ক’দিনে তাকে যতটুকু চিনেছে,তাতে সে জানে এইলোক ভয় পায়না। না, কোনোকিছুতেই ভয় পায় না সে। তবে আজ কিসের ভয়-সংশয়ের দেখা মিলছে?

আনায়া কিছু বলে না। সে শুধু নিঃশব্দে কেনীথের এই এলোমেলো হৃদকম্পনকে অনুভব করে।অন্যদিকে কেনীথ একবার মাথা তুলে গর্জনরত আকাশের দিকে চেয়ে—পরক্ষণেই আনায়ার দিকে ফিরে তাকায়। এবং প্রচন্ড কাতর স্বরে আনায়ার উদ্দেশ্যে আওড়ায়,
“তারা!”
আনায়া কোনো উত্তর দেয়না। লোকটার উন্মাদনায় বাকরুদ্ধ সে। কেনীথের দৃঢ় বন্ধনে, হাতে খানিক ব্যাথা অনুভূত হলেও,সে তা উপলব্ধি করতে পারে না।
এরিমধ্যে কেনীথ আনায়ার বাহু-জোড়া ছেড়ে দিয়ে, তার গালদুটো নিজের হাতজোড়ায় আঁকড়ে ধরে। এবং পুনরায় ঠোঁট ভিজিয়ে,কাতর স্বরে বলে,

“তারা! তোর কাছে আমার শুধু একটাই অনুরোধ—প্লিজ আমায় ছেড়ে যাস না। জানি না, এই অল্পদিনের মাঝে তুই আমায় কি করেছিস—তবে আমি তোকে ছাড়া বাঁচবো না রে। একদম শেষ হয়ে যাবো। এটা মায়া নাকি মোহমায়া, তা জানি না। তবে তুই আমার একমাত্র মহমায়া।
জানিস,আমার মৃত্যু নিয়ে কখনোই কোনো ভয় ছিল না। আমি জানতাম,আমি বহু আগেই মরে গিয়েছি। কিন্তু নতুন করে আবারও তোকে দেখার পর বুঝেছি—আমি এখনো বেঁচে আছি। হয়তো শুধু তোর জন্যই। তোর এই একটুখানি উপস্থিতি, আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ানক শা’স্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুই যদি চলে যাস, আমি নিজের ভেতরটাকে সহ্য করতে পারব না।”

আনায়া বুঝতে পারছে না সে কি বলবে। এই লোক তো আগে কখনো এমন করেনি। তবে এখন হঠাৎ…
—“কথা দে আমায়—ছেড়ে যাবি না।তুই আমার অস্তিত্বের একমাত্র কারণ। তুই পাশে থাকলে আমি পুরো দুনিয়া সামলে নেবো। আমি সমস্ত ঝড়,সমস্ত নৈরাশ্য বিনষ্ট করতে দেব। সমস্ত অন্ধকারকেও জয় করব শুধু তোর জন্য।…তোর জন্য আমি সব হারাতেও রাজি,কিন্তু তোকে হারাতে পারব না।”
কেনীথের কাতরতায় আনায়া স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। মনের মাঝে হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেলেও,উৎসুক চাহনিতে, মুখে শুধু এইটুকুই বলল,
“কে আপনি?”
আনায়ার এহেন অভিব্যক্তিতে কেনীথ বিদ্রুপ সরূপ মৃদু হাসে। আনায়ার গাল-গ্রীবায় নিজের হাতের দৃঢ় স্পর্শ রেখে আওড়ায়,

“আমি? আমি তোর মহামায়ার অন্তরালবাসী এক অভিশপ্ত প্রাণ। তুই আমার দেহের নয়, আত্মার অনিবার্য তৃষ্ণা। তোর অনুপস্থিতিতেই আমি শূন্য, তোর সান্নিধ্যেই আমি প্রলয়।”
আনায়া আবারও থমকায়। কেনীথ আর তার মাঝের দূরত্বটা খুবই ক্ষীণ। খানিকটা সময় নিয়ে, সে দৃঢ় কন্ঠে বলল,
“সত্যি করে বলুন,আপনি কে? আমি আপনাকে চিনি, তাই না? আপনি কি চান, বলুন তো?”
নিজের সংস্পর্শে আনায়াকে আরো খানিকটা মিশিয়ে নিয়ে,অদ্ভুত এক দৃঢ়তায় আনায়ার চোখে চোখ মিলিয়ে, কেনীথ অনিমেষনেত্রে বলতে লাগল,

মহামায়া পর্ব ১১

“আমি সেই প্রজ্বলিত অভিশপ্ত ছায়া, যা তোর স্পর্শেই অস্তিত্ব হারিয়েছে। তুই আমার ধ্বংস, তুই আমার পুনর্জন্ম। তোর অভিসারে আমি মুক্তি পাই, তোর অনাসক্তিতেই আমি পুড়ে ছাই। তুই পাশে থাকলে, আমি সমস্ত ঝড়, সমস্ত অন্ধকার জয় করব; তুই দূরে গেলে, আমি নিঃশেষ হয়ে যাব। আমি শুধু তোকে চাই,ব্লাড। শুধুই তোকে চাই।”

মহামায়া পর্ব ১৩