মহামায়া পর্ব ১৩
তুশকন্যা
“আমি সেই প্রজ্বলিত অভিশপ্ত ছায়া, যা তোর স্পর্শেই অস্তিত্ব হারিয়েছে। তুই আমার ধ্বংস, তুই আমার পুনর্জন্ম। তোর অভিসারে আমি মুক্তি পাই, তোর অনাসক্তিতেই আমি পুড়ে ছাই। তুই পাশে থাকলে, আমি সমস্ত ঝড়, সমস্ত অন্ধকার জয় করব; তুই দূরে গেলে, আমি নিঃশেষ হয়ে যাব। আমি শুধু তোকে চাই,ব্লাড। শুধুই তোকে চাই।”
কেনীথের কথা শেষ হতে না হতেই,অকস্মাৎ বিকট শব্দে বিদ্যুৎ চমকায়। যার ঝলকানিতে রাতের আঁধার বিদীর্ণ হয় এক নিমিষেই। আনায়া চমকে ওঠে চোখ-মুখ খিঁচে নেয়। অজান্তেই কেনীথের বাহু চেপে আঁকড়ে ধরে। অথচ কেনীথ তখন অনিমেষনেত্রে তাকে চেয়ে চেয়ে দেখছে। তার চোখ-মুখে অদ্ভুত এক শূন্যতা।
এরিমধ্যে আচমকা সে আনায়াকে অবাক করে দিয়ে,তার চোখজোড়ায় আলতোভাবে চুমু খায়। আনায়া তৎক্ষনাৎ চোখ খুলে,তার দিকে বিস্ময়ের নজরে মুখ তুলে তাকায়৷ কেনীথ নিরুদ্বেগ রইলেও,আনায়া প্রচন্ড অবাক।
কেনীথ অকস্মাৎ আনায়াকে ছেড়ে দেয়।প্রয়োজনের চেয়ে হয়তো বেশিই করে ফেলছে। কিন্তু এও সংশয় জেগেছে, আবার কখনো এসব বলা কিংবা করার সুযোগ হয় কিনা। হঠাৎ এমন চিন্তাভাবনা কেনো আসছে,তা সম্পর্কে সে নিজেও অবগত নয়।
কেনীথ কোথাও যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়, আনায়া উদ্বিগ্ন কন্ঠে, পেছন হতে বলে,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“কোথায় যাচ্ছেন?”
আনায়াকে আশ্বস্ত করে, কেনীথ শেষবারের মতো শুধু এইটুকুই বলল,
“এখানে যাস্ট পাঁচ’টা মিনিট দাঁড়া,আমি এখনই আসছি। একদম ভয় পাবি না৷ একটুও নড়চড় করবি না। ফিরে এসে যেন,তোকে এখানেই পাই।”
পাঁচ মিনিট পূর্ণ হওয়ার আগেই , কেনীথ ফিরে আসে। চারপাশ আকাশসম গাছপালায় পরিপূর্ণ। এরিমধ্যে আবার বৃষ্টিও শুরু হয়েছে। কি করবে না করবে তা পরের বিষয়, কিন্তু রাতের অন্ধকারে আনায়া ভয় পাবে বিধায় সে আবারও ফিরে এসেছে।
কেনীথের গা ভিজতে শুরু করেছে। কাঁধ অব্দি ঝাঁকড়া চুলগুলো বৃষ্টির দরূন ভিজে…কপাল বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা জলবিন্দু ঝড়ছে। তবে সে ফিরে আসতেই,সম্পূর্ণ স্তব্ধ মূর্তির ন্যায় থমকে যায়।আশেপাশে কোথাও আনায়া নেই। কেনীথের হৃৎস্পন্দনের তীব্রতা বাড়ে না বরং,তা একপ্রকার থেমে যায়। সে আশেপাশে ফিরে তাকায়। নেই,কোথাও তার আনায়া নেই৷ শুধু চারপাশে ক্রমশই বেড়ে চলা, বৃষ্টির তীব্রতা অনুভব করা যায়।
কেনীথ এই পর্যায়ে অদ্ভুত আচরণ করে বসে। সে হিতাহিতজ্ঞানশূন্যের ন্যায়, বিদ্রূপের সহিত তির্যক হেসে ডাকে,
“তারা! তুই আমার সাথে মজা করছিস? দেখ আমার মাথা কিন্তু ঠিক নেই। প্লিজ এমন মজা করিস না।”
না! তার কথায় কারো কোনো সাড়াশব্দ মেলে না। কেনীথের চোয়াল শক্ত হয়। চোখ-মুখে অসহায়ত্বের স্পষ্ট ছাপ ফুটে ওঠে। সে আবারও করুন তবে দৃঢ় স্বরে বলে,
“হেই ব্লাড! কোথায় তুই? দেখ,এমন ফালতু মজা করিস না। আমার ভিপি বেড়ে যাচ্ছে।”
এই পর্যায়ে কেনীথের হুঁশ ফেরে। আনায়া মজা করছে না বরং সে এখানে সত্যি নেই। নিমিষেই চোয়াল শক্ত হয় তার। সে চারপাশ খুঁজতে শুরু করে। বারংবার উচ্চস্বরে আনায়ার নাম ধরে ডাকতে থাকে। কিন্তু কোনো সাড়া পায়না। একটা সময় কেনীথ ভিজে টইটম্বুর হয়ে যায়। হাতের ক্ষতের সাথে বৃষ্টির পানি মিশে যায়। র’ক্ত-পানি মিশে সারা-গা ছড়ায়। তবুও কেনীথ এসবে সম্পূর্ণ নির্বিকার হয়ে যায়।
সে এগোতে এগোতে নিচের দিকে তাকিয়ে খেয়াল করে—এদিক হতে সামনে একটা সরু রাস্তা এগিয়ে গিয়েছে। জায়গাটুকুতে বেশ কিছুটা কাঁদা-মাটির পায়ের ছাপও স্পষ্ট। কেনীথ আর দাঁড়িয়ে থেকে সময় নষ্ট করল না। সে হতভম্ব হয়ে এই পথ ধরেই এগিয়ে যেতে লাগল। মনে মনে একটাই আশংকা জন্মে—আনায়ার যেন কিছু না হয়। নয়তো সে নিজেকে আর কখনোই ক্ষমা করতে পারবে না।
প্রায় অনেকটা পথ পেরোনোর পর, কেনীথ খেয়াল করে দেখে—এই পথ এলাকার কাঁচা রাস্তার কাছে গিয়ে ঠেকেছে। এর মানে আনায়া গেলে নিশ্চয় এদিকেই গিয়েছে। কিন্তু তার একার পক্ষে এই পথ চেনা সম্ভব নয়। নিশ্চিত ওকে কেউ নিয়ে গিয়েছে। একইসাথে এটাও বুঝতে বাকি নেই যে,তারা দুজন যখন একত্রে জঙ্গলে অবস্থান করছিল,তখন তারা ব্যতীত খুব নিকটে আরো কেউ আশেপাশেই ছিল। নয়তো মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে, কেউ এই রাস্তা দিয়ে এসে,আবার আনায়াকে সাথে নিয়ে যেতে পারবে না।
কেনীথের এই পর্যায়ে তীব্র আফসোস হচ্ছে। নিজের উপর রাগ তিরতির করে বাড়ছে। কেনো করলো সে এমন? অন্তত আনায়ার কাছ থেকে দূরে সরারই বা কি প্রয়োজন ছিল!
সহস্র রাগ-সংশয় নিয়েই, সে কাঁচা রাস্তার দিকের এগিয়ে যায়। রাস্তার মাঝবরাবর এসে, উন্মাদী হয়ে জোরে জোরে চিল্লিয়ে আনায়াকে ডাকে।
—“আনায়া! প্লিজ তুই সাড়া দে। এভাবে আর পাগল করিস না আমায়। আনায়া তুই…”
—“তুমি আনায়াকে কেনো খুঁজছো?”
অকস্মাৎ কেনীথ থমকে যায়—পেছন হতে কোনো এক পরিচিত কন্ঠস্বর শুনতে পেয়ে। বৃষ্টির তোপ ক্রমশই বেড়ে চলে। সম্পূর্ণ গা ভিজে একাকার হয়। ক্ষণিকের নীরাবতায়, চারপাশে ঝরঝর বৃষ্টির আওয়াজ ব্যতীত আর তেমন কিছুই শোনা যায়না।
কেনীথ বিস্ময়ে পেছনে ফিরে তাকায়। সম্মূখে চেয়ে যা দেখে,তা যেন সে এই মূহুর্তে কখনোই আশা করেনি। তার থেকে প্রায় বেশ খানিকটা দূরে রাস্তার মাঝে কয়েকটা গাড়ি দৃশ্যমান। তার সামনে দশ-বারোজন ব্যক্তি, কালো রঙের ছাতা হাতে দাঁড়িয়ে। তবে সবাইকে ছাড়িয়ে, কেনীথের নজর পড়ে সকলের মধ্যিখানে অবস্থানরত, সাদা পাঞ্জাবি পরনের লম্বাচওড়া মানুষটাকে। গাড়ির হেডলাইট জ্বলে উঠতেই,ব্যক্তিটির অবয়ব আরো স্পষ্ট হয়। কেনীথের বুঝতে বাকি নেই,এটা কে!
নিমিষেই তার চোয়াল শক্ত হয়। আক্রোশে হাত মুঠো করতেই,মাংসপেশি ফুলে ওঠে। বাহুর ক্ষত পুনরায় তরতাজা হয়। কিন্তু তাতে নূন্যতম ভ্রুক্ষেপ না করে,কন্ঠে তীব্র হিংস্রতা মিশিয়ে উচ্চস্বরে বলে ওঠে,
“আমার তারা কোথায়?”
কেনীথের এহেন কথায় তারেক ক্ষণিকের জন্য থমকায়। পরক্ষণেই বিদ্রূপের ভঙ্গিতে ফিঁচকে হেসে বলল,
“তোমার তারা? সে কোথায় থাকে,আকাশে? কিন্তু আজ তো বৃষ্টি হচ্ছে। সম্পূর্ণ আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছে। দুঃখীত,তোমার তারার দেখা পেলাম না আমি।”
তারেক ছাতার নিচ থেকে মুখ তুলে,অতিরঞ্জিত ভঙ্গিতে একপলক আকাশটা দেখে নেয়। এদিকে কেনীথ আক্রোশে আরো বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। দৃঢ় পায়ে এগিয়ে যায়। তাকে এগিয়ে আসতে দেখে তারেক তাচ্ছিল্যের সহিত মৃদু হেসে বলে,
“যেখানেই আছো,সেখানেই থেমে যাও।”
তারেকের অভিব্যক্তিতে কেনীথ থামে। দাঁতে দাঁত চেপে, ঘাড় বাকায়। নিজেকে শান্ত রাখার তীব্র চেষ্টা রইলেও,ইচ্ছে তো করছে গিয়ে তারেকের মুখে সজোরে ঘুষি মে’রে জানে মে’রে ফেলতে।
তবুও কেনীথ নিজের আক্রোশ থামিয়ে, দাঁতে দাঁত পিষে আওড়ায়,
“থেমেছি, এবার বলুন আমার আনায়া কোথায়?”
কেনীথের অভিব্যক্তিতে তারেক যেন আকাশ হতে পড়ল। তার অতিরঞ্জিত নাটুকপনায় তাই বোঝা গেল।
—“তোমার আনায়া? আনায়া আবার তোমার কবে হলো?”
—“দেখুন, আপনার সাথে মশকরা করার মতো পরিস্থিতিতে আমি নেই। ভালো করে বলছি,আমার আনায়াকে দিয়ে দিন আপনি। এর জন্য, আপনি যা চাইবেন আমি সব দিতে রাজি। কিন্তু আমি আমার আনায়াকে চাই।”
তারেক হেসে ফেলে তার কথায়। একইসাথে তার আশেপাশের লোকগুলোও হাসে। তারেক খানিকটা সময় নিয়ে,কেনীথের উদ্দেশ্যে বলল,
“বাপ! এই তারেক এহসান এমনি এমনি মন্ত্রী হয়নি। এদেশের পলিটিক্স নিয়ে তোমার কিছুটা ধারণা রাখা প্রয়োজন ছিলো। এখানে নিজের রাস্তা সুপ্রসন্ন করতে হলে,হাত নোংরা করতে হয়। তবে নিজেকে সর্বদা লোকের সামনে সচ্ছ দেখানোটাও আবশ্যক।
যাই হোক,খেলোয়াড় তুমি বেশ পুরোনো—তা আমি ভালোই জানি। বহুদিন পর খেলতে এসে,বেশ ভালোই খেলেছো
—প্রসংশা না করেও পারছি না। কিন্তু কি করব বলো,তোমার মতো চুনোপুঁটি রাঘব-বোয়ালের কাছে হেরে গেলে, সমাজে কি আমার মানসম্মান আর থাকবে?”
কেনীথ দাঁতে দাঁত চেপে তারেকের কথা গুলো শোনে। এসব বলার উদ্দেশ্য কি তা ভালোই বুঝতে পারছে। তবে সে-ও থেমে থাকার মতো লোক না। তারেক থামতেই,সে-ও তাচ্ছিল্যসরূপ চাপা স্বরে বলে,
“চুনোপুঁটিও বলছেন,আবার রাঘববোয়ালও…?হোয়াট এভার, আপনার অহেতুক ড্রামা দেখার জন্য আমি এখানে দাঁড়িয়ে নেই। আনায়াকে দিয়ে দিন,আমি চলে যাচ্ছি।”
—“তো আমিও কোনো জা’নোয়ারের মুখে, বারবার আমার মেয়ের নাম শুনতে চাচ্ছি না;তাকে নিজ থেকে দিয়ে দেওয়া তো অসাধ্য ব্যাপার৷ এমন আশা রাখছো কি করে? অন্তত এই তারেকের জীবন থাকতে তো,এটা কখনো সম্ভব নয়।”
—“আপনার আমাকে যা ইচ্ছে বলার বলুন। কিন্তু আমি কোনোমতেই আনায়াকে না নিয়ে যাবো না। নিজে যখন দিতে পারবেন না, তবে বলুন ওকে কোথায় রেখেছেন? আমি নিজেই না হয় খুঁজে নেব।”
এই বলতে না বলতেই,কেনীথ আক্রোশে পায়ের কাছে পড়ে থাকা শক্ত-পোক্ত মোটা গাছের ডালটা হাতে তুলে নেয়। এবং একপ্রকার তেড়ে সামনে এগিয়ে যায়। তার ভাবভঙ্গিতে তারেক তার আশেপাশের লোকজনকে ইশারা করলে, কয়েকজন ব্যতীত বাদবাকি সকলে তাকে ঘিরে ধরে। এতক্ষণ অন্ধকারে খেয়াল না করলেও,কেনীথ এবার তাদের হাতে থাকা শক্ত লাঠি,রড কিংবা হকিস্টিকগুলো স্পষ্টভাবেই দেখতে পায়। তবে এতে সে অদ্ভুতভাবে তাচ্ছিল্যের সহিত হেসে বলে,
“তো এই ব্যাপার?”
তারেকও শিরদাঁড়া সোজা করে,বুক টান-টান করে আওড়ায়,
“কিছুই করার নেই,বাপ! নিজের ম’রণ নিজে টেনে এনেছো। বাড়াবাড়ি করলে, ঝরে তো পড়বেই।”
কেনীথ ক্ষণিকের জন্য থামে। সরাসরি কাউকে আ’ক্রমণ না করে, মাথা নুইয়ে ভারী শ্বাস ফেলে কিছু একটা ভাবে। পরক্ষণেই মাথা তুলে, গম্ভীর স্বরে বলল,
“আপনি কি চান?”
—“হা,হা, আমি কি চাই? আমার যা চাওয়া বা নেওয়ার, তা আমি নিজেই ব্যবস্তা করে নিয়ে নেবো। ও নিয়ে তোমার চিন্তা করতে হবে না। তবে আপাতত তোমার কাছে একটাই চাওয়া—এতো বছর যেভাবে আমার পরিবার থেকে দূরে ছিলে, ঠিক সেভাবেই বাদবাকি জীবনটুকুও—তুমি এবং তোমার পরিবার আমাদের থেকে দূরে থাকবে।”
—“ঠিক আছে,আমি রাজি। কিন্তু আমার আনায়াকে চাই। আপনি ওকে দিয়ে দিন।আমি ওকে নিয়ে সবার থেকে দূরে চলে যাবো।”
কেনীথের ভাবভঙ্গি পাল্টেছে। কেমন ক্ষেপাটে-উন্মাদের মতো খাপছাড়া কথাবার্তা বলছে।তার কথায় তারেকও খানিক অবাক হলো। ভ্রু জোড়া খানিক কুঁচকে যায় নিমিষেই। এ ছেলে বলে কি!
—“তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? আমি বলছি, আমার পরিবার থেকে চিরতরে দূরে সরতে, আর তুমি বলছো আমি যেন তোমায় আনায়াকে দিয়ে দেই?”
কেনীথ আবারও উন্মাদের মতো,ক্ষেপাটে স্বরে বলে ওঠে,
“জ্বী,আমিও আর কোনো ঝামেলা করতে চাই না। আপনি ওকে দিয়ে দিন,আমি চলে যাবো।”
এই পর্যায়ে তারেকের খানিকটা খটকা লাগে। সে এই ছেলের সম্পর্কে ভালোমতোই জানে। এতো বছর পরও, তার এমন উন্মাদের মতো ব্যবহারে সে মোটেও অবাক হচ্ছে না। কিন্তু খটকা লাগছে—সে এভাবে আনায়াকেই বা কেনো চাইছে? কথাবার্তার ভঙ্গিও তো বেশ আলাদা। বারবার ‘আমার আনায়া’,‘আমার আনায়া’ বলে কি বোঝাতে চাচ্ছে?
—“তুমি আসলে কি চাও বলতো? তুমি এভাবে আনায়াকে কেনো চাচ্ছো?”
—“কারণ আমি ওকে ভালোবাসি। আই যাস্ট ওয়ান্ট হার, এনি ফা’কিং ওয়ে।”
কেনীথের নির্বিকার অভিব্যক্তিতে, তারেকের মাথায় যেন বাজ পড়ে। এই ছেলে এতো বছর পর এসে এসব কি বলছে? সে যতদূর আন্দাজে ভেবেছিল—আনায়াকে কিডনাপ করার উদ্দেশ্য হয়তো তার সাথে প্রতিশোধ নেওয়া। সেটাও জমিজমা কিংবা বাকিসব বিষয়বস্তুর জন্য। কিন্তু এখন যা শুনছে,তা তো কল্পনাতেও ভাবেনি।
তারেক দাঁতে দাঁত পিষে বলে ওঠে,
“তুমি কি আমার মাথাকে সার্কাসের কারখানা বানাতে চাইছো? আনায়াকে ভালোবাসো মানে? এসব কথার মানে কি?”
—“সহজ ভাবেই বলেছি,বুঝতে না পারলে তা আপনার ব্যর্থতা।”
তারেক আরো কিছুক্ষণ বিস্ময়ের নজরে কেনীথকে দেখে। পরক্ষণেই তীব্র আক্রোশে চিল্লিয়ে বলে,
“চোখের সামনে থেকে সরাও এটাকে!”
তারেক এই বলেই পেছনে ফেরে। শেষের গাড়িতে আনায়া রয়েছে। যথারীতি এতো তীব্র বৃষ্টির আওয়াজে সে এখানকার কোনোকিছুই হয়তো শুনতে পাচ্ছে না। তবে এই অসভ্যটার সামনে আর দুদণ্ড দাঁড়ানোর নূন্যতম ইচ্ছে তারেকের নেই। কোন সাহসে আজ এসে বলছে,সে তার মেয়েকে চায়! আবার নাকি ভালোওবাসে! কত বড় রিডিকিলাস।
তারেক এই ভাবনায় পা বাড়ায়। অন্যদিকে তার কথা মতো, তার লোকজন কেনীথকে ধরতে যায় গাড়িতে তোলার জন্য। কেননা তারেক মোটেও এবার,এতো সহজে এদের ছাড়বে না। তার পূর্ব নিয়ত রয়েছে,এই সুযোগে যেভাবেই হোক—ভাহিদ এহসানের পুরো পরিবারের ধ্বং”স দেখবে সে।
কিন্তু কেনীথকেই বা-কি, এতো সহজে দমানো যায়? কয়েকজন এগিয়ে এলে,সে অনিমিষেই তাদের কয়েকটা আঘাত করেই দূরে সরিয়ে দেয়। কারো নাক-মুখ ফাটে,কিংবা কারো ধার মটকায়। অথচ তার ধ্যান ঠিক অন্যকোথাও। কয়েকজনকে দক্ষহাতে আহত করে,সে যতটা সম্ভব তারেকের দিকে এগিয়ে যায়। এবং হুঙ্কার দিয়ে বলে ওঠে,
“আপনাকে শেষবারের মতো বলছি। বলে দিন আনায়া কোথায়?”
এই পর্যায়ে তারেক থেমে যায়। পেছনে ফিরে কেনীথকে দেখে। এবং পা বাড়িয়ে তার দিকে খানিক এগিয়ে আসে। তবুও দুজনের মাঝে ব্যাপক ব্যবধান। কেনীথ অনবরত ভিজছে, আর তারেক নির্বিকার ভঙ্গিতে ছাতার নিচে দাড়িয়ে।
—“তুমি কি জানো,তুমি কে?”
অকস্মাৎ তারেকের এহেন কথায়, কেনীথ থমকায়। তারেক আদতে কি বোঝাতে চাইছে?…কেনীথ চুপ রয়েছে বিধায়,তারেক তার উদ্দেশ্যে আবারও খানিক বিদ্রুপের স্বরে বলল,
“ভুলে গিয়েছো তাই না? আশা করি,নিজের অতীতও ভুলে গিয়েছো।…তোমার মতো অপদার্থের এসব মনে থাকবে না, সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু আমি তো কিছু ভুলিনি। মৃত্যুর আগ অব্দিও ভুলবো না। তাই এই যে সব কাহিনি করছো…জানি না, এতোবছর পর এই ভুত তোমার মাথায় কি করে চাপলো। তবে ওকে যদি সত্যিই ভালোবেসেও থাকো, তবুও ভুলে যাও। চিরতরে ওর ভাবনা তোমার ঐ পাগলাটে মাথা থেকে সরিয়ে ফেলো।
এসবের কোনো মূল্য নেই। এই যে তুমি এখনো আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছো,গলা উঁচিয়ে দুটো কথা বলে উন্মাদনায় মেতেছো—এইসবটাই হচ্ছে আমার দয়ার উছিলায়। তোমার এই জীবনটা হলো দয়ার জীবন। সেইদিন তোমাকে ছেড়ে না দিলে,এতোদিনে তোমার লাশ কবরে মাটির সাথে মিশে যেত। তাই বলছি, অতীত ভুলো না।
যদিও এবারও তুমি কম অন্যায় করো নি! আমার মেয়ের বিয়েতে কাহিনি করে তুমি যে শুধু নিজের পাগলামি,জেদ মিটিয়েছো—তা নয় কিন্তু! তুমি আমার মানসম্মানও নষ্ট করেছো। এসবের প্রতিদান তোমাকে দিতে হবে। শুধু তোমাকে নয়,বরং তোমার পুরো পরিবারকে দিতে হবে। তারাও তোমার সঙ্গ দিয়েছে। আমায় মিথ্যে বলেছে। আমি প্রত্যেকটা হিসেব সুদে-আসলে মিটিয়ে নেবো।”
—“হ্যাঁ,মানছি আমি অন্যায় করেছি। শুধু অন্যায় না বরং পাপ করেছি। নি”কৃষ্টতর পাপ! কিন্তু আমাকে এভাবে শাস্তি দেওয়ার তো কোনো মানে হয় না। আমার প্রাপ্যটাই না হয় বুঝিয়ে দিতেন,তবুও আনায়াকে কেনো আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিচ্ছেন?”
—“আরে আহাম্মক! আনায়া তোমার নয়। সে কোনোদিনও তোমার হবে না। পুরো দুনিয়া উলোটপালোট হয়ে গেলেও,আমি কখনোই ওকে তোমার হাতে তুলে দেবো না। আমার মেয়ে কোনো ফেলনা নয় যে, কেউ ওকে যখন-তখন চাইবে, আবার ইচ্ছে হলেই ছুঁড়ে ফেলবে। ও মানুষ, কোনো জানোয়ারের ভোগের খাদ্য নয়।”
তারেকের দাঁতে দাঁত পিষে আওড়ানো অভিব্যক্তিতে, কেনীথ ক্ষণিকের জন্য আবারও থমকায়। তার মাঝে রাগ-ক্ষোভ,ক্ষিপ্ততা-উম্মাদনা একইতালে মিশ্রিত প্রতিক্রিয়া ঘটাচ্ছে। এককথায় সে তার নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ হতে, বহুবছর পর আবারও বিচ্ছিন্ন রূপে অবস্থান করছে।
—“তো বলুন! এমন কি আছে, যা করলে আপনি ওকে দিয়ে দিবেন। আই প্রমিজ,আমি তাই করবো।”
—“লাভ নেই, কোনো লাভ নেই। বাপ হয়ে অন্তত আমি—তোমার মতো একটা পাগল,অপদার্থ, জানোয়ারের কাছে নিজের মেয়েকে দিতে পারবো না। এতে তুমি যাই করো না কেনো! আর সবচেয়ে বড় বিষয়,আমার মতে তোমার এখন নিজের চিন্তা করা উচিত। মনে রেখো,তুমি যতবেশি পাগলামি করবে তা তোমার জন্য না হলেও,তোমার পরিবারের জন্য ক্ষ”তিকর। যদিও জানি না, তুমি আদৌও নিজের পরিবারের পরোয়া করো কিনা। তবুও বলছি,নিজেদের ধ্বং”স দেখতে না চাইলে, এসব তামাশা বন্ধ করো।”
—“তামাশা তো আপনারা করে রেখেছেন! আজ আমায় হাজারটা কথা শোনাচ্ছেন কারণ আমি খা’রাপ। হ্যাঁ, আমি খা’রাপ। আমি জ’ঘন্য খা”রাপ। আমি উ’ম্মাদ, আমি পাগল, আমি পৃথিবীর নিকৃ”ষ্টতম এক জানোয়ার। কিন্তু আমার এই জঘন্য বৈশিষ্ট্যের পেছনে কি আপনাদের কোনো অবদান নেই?
আজ যাকে কথায় কথায় হাজারটা নিকৃষ্ট ট্যাগ দিতে আপনাদের মুখে বাঁধে না…তার সম্পর্কে আগেই কেনো জানার প্রয়োজন মনে করেননি? শুরুতেই জেনে নিতেন,আমি কতটা খা’রাপ। তাহলে অন্তত আমার বাদবাকি জীবনটুকু বরবাদ হতো না—আর না আপনার মেয়ের! আজ এতো বুক ফুলিয়ে বাপের দায়িত্ব পালন করছেন, কই আমার বেলায় এসব কোথায় ছিল? আমার পরিবার তো আপনারও ছিলেন তাই না?
নাহ্! আজকের দিনে এসে আমি কখনই আমার খা’রাপ হওয়ার দায় আপনাদের দেবো না। আমি খা’রাপ হয়েছি,আমার নিজের দোষে।
কিন্তু আজ যেখানে, ওকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিতে, আপনাদের এতো সংশয়—তাহলে সেই সময় কোনো আমাদের বিয়েটা দিয়েছিলেন? কেনো ওকে আমার জীবনের সাথে জড়ালেন? আমি তো শুরু থেকেই নি*কৃষ্ট খারাপ। এটা তখন কেনো জানার প্রয়োজন মনে করলেন না? এন্ড দ্য মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট থিং, আপনারা তো অনেক বিচক্ষণ মানুষ। তবুও কি করে পারলেন, ঐটুকু একটা বাচ্চাকে আমার মতো অসভ্যটার সাথে বিয়ে দিতে? তখন আপনাদের এতো হুঁশ-জ্ঞান কোথায় ছিল?
তাই অতীতের সবটুকু দোষ আমার ঘাড়ে চাপানোর আগে,একবার ভেবে দেখবেন আপনারা নিজেরা কতখানি ঠিক ছিলেন। আপনাদের একটা পদক্ষেপ আমার পুরো জীবন বরবাদ করে ছেড়েছে—আমার সাথে সাথে আপনার মেয়েরও!”
—“ওহ! আজ তবে শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চাইছো?”
—“মোটেও না। আমি জানি, আমি কি করেছি। তবে তার প্রায়শ্চিত্ত না হয়, আমি আনায়ার কাছে করবো। আপনাদের কাছে নয়। আপনাদের কারো কোনো অধিকার নেই,আমাদের দুজনের মাঝে বাঁধা হয়ে দাঁড়ানোর।”
—“হাঃ! তোমার কি মনে হয়,আনায়া তোমার ব্যাপারে সবকিছু জানার পর সে আদৌও তোমার কাছে ফিরবে?”
—“…………
—“কি হলো,কথা শেষ? দম ফুরিয়ে এসেছে? যার জন্য হঠাৎ এতো পাগলামি করছো,সেই যদি তোমার হতে না চায়—তবে এসবের আর কি-বা মূল্য রইল? তুমি ভাবছো,ওকে জোর করে নিজের করবে? একটা কথা মাথায় রেখো,সত্য কখনো চাপা থাকে না। আর আমি আমার মেয়েকে যতটুকু,যেভাবেই গড়েছি—তাতে সে কখনোই স্বজ্ঞানে তোমার মতো জা”নোয়ারের কাছে ফিরবে না। সো,গিভ আপ! আর যদি আরো পাগলামি করার ইচ্ছে থাকে, তবে করো এবং মরো! তোমার পুরো পরিবারের ধ্বং”স দেখতে চাই আমি!”
—“আপনি কিন্তু আমার সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন!”
কেনীথের চোয়াল আপনা-আপনি আরো বেশি দৃঢ় হলো। চোখজোড়ায় লালচে আভাস আরো তীব্র হলো। অন্যদিকে তার এই ক্ষিপ্ত অভিব্যক্তিতে,তারেক অনিমিষেই হেসে ফেলল। পরক্ষণেই চোয়াল শক্ত করে বলে উঠল,
“ওহ তাই নাকি? আমি তোমার সহ্যের সীমা…যথেষ্ট হয়েছে,তোমার ম’রাই উচিত। তবে নিজের হাত আর বরং নোংরা না করি,কি বলো?”
তারেক তার আশেপাশে লোকজনদের, হাতের আঙুল নাড়িয়ে ইশারা করে। কেনীথের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোও, তার সামান্য ইশারায় শক্ত হয়ে উঠে দাঁড়ায়। কেনীথের ভাবভঙ্গি এখনোও অনড়। সে শান্ত-ক্ষিপ্ত হায়নার ন্যায় তীব্র হিংস্রতা মিশিয়ে বলে ওঠে,
“পারবেন না! তারা আমার! ও শুধুই আমার! ওকে আপনারা আমার কাছ থেকে কখনোই ছিনিয়ে নিতে পারবেন না! আমি আনায়াকে ভালোবাসি…!”
কেনীথ উচ্চকন্ঠস্বরের বিস্তার ঠিক এই অব্দিই এসে থমকে যায়। অকস্মাৎ শক্ত-পোক্ত লাঠির তীব্র এক আঘাত এসে, তার মাথার ঠিক পেছন বরাবর লাগল। নিমিষেই হিংস্র কেনীথের অস্তিত্ব যেন, বৃষ্টিময় ঝড়ো-হাওয়ার তালে হারিয়ে গেল।
পুরোনো ক্ষত নতুন করে জ্যা’ন্ত হলো,তাও যেন ঠিকই একই স্থানে। শক্ত-পোক্ত কেনীথের সবচেয়ে বড় দূর্বলতাও যেন, ঠিক এটাই ছিল। কেনীথ খেয়াল করে দেখে,তার হাত-পা অবশ হয়ে আসছে। চারপাশের সবকিছু ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। অদ্ভুত এক ভনভন আওয়াজ ব্যতীত, সে আর কোনোকিছুই শুনতে পারছে না। না! আশেপাশে যে বৃষ্টির প্রকট শব্দ সবকিছুকে বিদীর্ণ করছিল,সেটাও হুট করে গায়েব হয়েছে।
কেনীথের হাতে থাকা লাঠিটা আপনা-আপনি খসে, নিচে পড়ে যায়।সে জ্যান্ত মূর্তির ন্যায়, তির্যক হাসিতে মেতে ওঠা তারেকের দিকে চেয়ে থাকে। পরক্ষণেই আলতোভাবে বাম হাতটা মাথার পেছনে ছুঁইয়ে,অপলক নিজের র’ক্তে মাখা হাতটার দিকে তাকিয়ে থাকে। বৃষ্টির পানিতে র’ক্ত ধুয়ে পরিষ্কার হচ্ছে, একইসাথে সে-ও অচেনা এক গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে।
—“আপনি এটা…”
কেনীথের রুক্ষ অভিব্যক্তিটুকু অসম্পূর্ণই রয়ে যায়। ততক্ষণে আরো এক আঘাত এসে তার মাথা ও ঘাড়ের মাঝবরাবর লাগল। এইবার সে সম্পূর্ণরূপে চোখ-মুখ খিঁচে নেয়৷ অসহনীয় এক তীব্র ব্যাথা! এই ব্যাথা নতুন নয়। এটা পুরোনো,বহু পুরোনো,সর্বস্বকে দুমড়েমুচড়ে ফেলার মতোই প্রচন্ড কষ্টদায়ক!
কেনীথ আর সহ্য করতে না পেরে, অকস্মাৎ মাথা চেপে ধপ করে কাঁদা-মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। ঝিম ধরে থাকা অদ্ভুত এক আওয়াজে সে এক নিমিষেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।
এদিকে তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা, লোকগুলো এবার একত্রে তাকে আ’ক্রমনের জন্য এগিয়ে আসে। তবে তারেক তাদের না চাইতেও বাঁধা দেয়। যতই আক্রোশ থাকুক না কেনো,এ তার বংশেরই র’ক্ত। একবারে মা’রতে পারলে হয়তো ভালো হতো। তবে এভাবে মা’রধর করে হাত নোংরা করার কি দরকার?
—“যথেষ্ট হয়েছে,এখনই মে’রে ফেললে আবার ঝামেলা।”
তারেকের এহেন কথায় লোকগুলো থেমে যায়। তবে ততক্ষণে তারেকের পেছন হতে এক বিস্ময়কর কন্ঠস্বর ভেসে আসে। তারেক পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে,আনায়া অবাক চোখে চেয়ে রয়েছে কেনীথের দিকে।
—“বাবা! এসব কি? ওনাকে… ওনাকে এভাবে কেনো…”
আনায়ার কথা সম্পূর্ণ হয়না। আচমকাই তার কন্ঠস্বর ভেঙে আসে। কেনীথ যখন তাকে জঙ্গলে রেখে কোথাও চলে গেল,তখন আনায়া খানিক ভয় পেলেও চুপটি করে কেনীথের বলা স্থানেই দাঁড়িয়ে থাকে। একইসাথে কিছুটা অবাক হয় এই ভেবে যে…সে যেখানে অন্ধকারকে এতো বেশি ভয় পায়,আজ তার তেমন ভয় লাগছে না৷ মনে হচ্ছে, যত যাই হোক—সে সুরক্ষিত।
তবে মিনিট খানেক সময় যেতে না যেতেই,আচমকা কোথায় থেকে যেন মুখোশ পড়া একজন লোক আসে। আনায়া তাকে দেখে ভয়ে চমকে উঠলে,সেই ব্যক্তি তৎক্ষনাৎ তাকে আশ্বস্ত করে বলে—সে তার বাবার লোক। আনায়া শুরুতে যাওয়ার সাহস পাচ্ছিল না কারণ লোকটি অদ্ভুতভাবে বেশ তাড়াহুড়ো করছিল। তবে যখন তিনি মাস্ক খোলে, তখন আনায়া খেয়াল করে দেখে—এনাকে সে সত্যিই চেনে।তার বাবার সাথে অনেকসময়ই দেখেছিল।
যথারীতি তাই হয় যা হওয়ার ছিল। আনায়ার মনে দ্বিধা থাকলেও,শেষমেশ সেই ব্যক্তির সাথে চলে আসে। কেননা তার এই দ্বিধারও কোনো নাম নেই। সে তো কেনীথকে ঠিকমতো চেনেও না। তাহলে কিসের টানে সে তার কথামতো ওখানে থেকে যাবে?যেখানে তার বাবা নিজে লোক পাঠিয়েছে।
ব্যক্তিটির সাথে অল্প কিছুক্ষণ পথ হেঁটেই সে তার বাবার কাছে এসে পৌঁছায়। ভাবতে পারেনি,এতো দ্রুত সে তার পরিবারের কাছে ফিরতে পারবে। এছাড়া আজ সে তারেকের বিশেষ এক রূপও দেখেছে। তাকে দেখামাত্রই তারেক প্রচন্ড উদ্বিগ্নতার সাথে আবেগে আপ্লূত হয়ে যায়। সে আগে কখনো বাবার এমন রূপ দেখেনি। আনায়াও যেন বাবার সংস্পর্শে নিমিষের মাঝেই মিইয়ে যায়।
এরপর বাবার কথামতো গিয়ে চুপচাপ একদম পেছন সারির গাড়িতে গিয়ে বসে। তার বাবা বলেছিল অল্প কিছুক্ষণের মাঝে ফিরে আসবে। তাই যেন সে এই বৃষ্টির মাঝে না বের হয়। কিন্তু বেশ অনেকক্ষণ অতিক্রম হবার পরও, কারো কোনো দেখা না পেয়ে সে কৌতুহলে বেরিয়ে পড়ে।
হাতে কালো রঙের ছাতা৷ গায়ে কেনীথের সেই ম্যাট ব্ল্যাক জ্যাকেট এখনো জড়িয়ে রাখা। আনায়া এতক্ষণ বসে বসে, কেনীথকে নিয়েই ভাবছিল। লোকটাকে তার অনেক বেশি পাগলাটে মনে হয়েছে। সবচেয়ে বেশি অবাক হয়েছিল,আচমকা চোখে চুমু খাওয়ায়৷ হিসেবে তো আনায়ার অনেক রাগ হওয়ার কথা ছিল।কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে তার তেমন কিছুই হয়নি।
আনায়া মনে মনে কেনীথকে একটা চমৎকার নামও দিয়ে বসে। তা হলো রেড। মিস্টার রেড! তার পছন্দের এক কার্টুন আছে। নাম এ্যাংরি বার্ডস। বাচ্চাদের গেইম বা মুভি,কার্টুন সিরিজে এই এ্যাংরি বার্ডসদের অনেকেই দেখে থাকবে। তবে আনায়া এতো বড় হওয়ার পরও,বিশেষ এক কারণ বশত আজও তার এই কার্টুন দেখা হয়। এবং বলা চলে, এই কার্টুনের প্রতি সে প্রচন্ড আসক্ত। নিজের ঘরের দেয়ালে, বড়সড় কালো ক্যানভাসে এই ডার্ক রেড পাখিটার ছবিও টাঙানো রয়েছে।
যেখানে একটা গাঢ় লাল রঙের, কালো ভ্রু-মোটা,রাগী-গম্ভীর পাখিকে দেখা যায়। যার নামই মূলত রেড। তবে রেড প্রচন্ড পাগলাটে, রাগী,গম্ভীরের একটি পাখি। তার এই স্বভাবের জন্য অনেকেই তাকে পছন্দ করে না। কিন্তু আনায়ার বেশ ভালো লাগে। একইসাথে আনায়ার কাছে রেডকে একটা মাথামোটা ফায়ার বার্ড কিংবা আগুন পাখিই মনে হয়। যেমনটা মনে হয়েছে, এই ভিভিয়ান এহসানকে!
লোকটা কেমন গম্ভীর-রাগী হলেও, আনায়া তার ভেতর কিছু স্পেশাল অনুভব করেছে। কিছু তো একটা ব্যাপার আছে!
তবে সে যাই হোক,আজ বাবার কথায় লোকটাকে না জানিয়ে চলে এসেছে ঠিকই,তবে সে ঠিক করে নিয়েছে—আবার কখনো দেখা হলে, সে তাকে এই নামটা ধরেই ডাকবে। পেছন থেকে গিয়ে যখন আচমকা বলে উঠবে,‘হ্যালো মিস্টার রেড!” ঠিক তৎক্ষনাৎ হয়তো লোকটা,নিজের ভ্রু জোড়া কুঁচকে পেছন ফিরে তাকাবে। এরপর হয়তো গম্ভীর স্বরে কিছু একটা বলে বসবে।অনেকটা তার প্রিয় রেডের মতোই!
আনায়া একে একে এসব নানান ছেলেমানুষী কথাই ভাবনাচিন্তা করছিল। কিন্তু তার কল্পনাতেও হয়তো ছিল না যে,তার এভাবে চলে আসায় আজ ঠিক কি হতে পারে। কিংবা তার বাবা তার এই পাগলা রেডকে পাওয়া পর, ঠিক কি কি করতে পারে!
তবে এখন এসব ভাববার জন্য আর কোনো সময় নেই। অনেক বেশিই দেরি হয়ে গিয়েছে। আনায়া থমকে গিয়েছে,কেনীথের এহেন অবস্থায়। সে কাঁপাকাঁপা স্বরে তারেকের উদ্দেশ্যে আবারও বলল,
“বাবা তোমরা ওনাকে এভাবে… ”
আনায়ার কথা শেষ হবার আগেই,তারেক ধমকের স্বরে তার উদ্দেশ্যে বলল,
“তুমি এখানে এসেছো কেনো? বলেছিলাম না গাড়িতে থাকবে।”
আনায়া বিস্ময়ে ক্রন্দনরত হতবিহ্বল চাহনিতে, একপলক তারেককে দেখে। পরক্ষণেই আবার কেনীথের দিকে ফিরে তাকায়। দূর থেকে স্পষ্ট কিছু বোঝা যাচ্ছে না। কিন্তু লোকটা যে প্রচন্ড আঘাত পেয়েছে,তা ঠিকই বুঝতে পারল।
—“তুমি ওকে চেনো?”
তারেকের এহেন কথায় আনায়া কি বলবে কিছু বুঝে উঠতে পারল না। আর বলবেই বা কি? আনায়া কেবল মাথা নেড়ে আওড়ায়,
“না… ”
—“তবে, চলো এখান থেকে।”
—“কিন্তু বাবা…”
তারেক তার হাত চেপে ধরে। আনায়ার অনিচ্ছা থাকার স্বত্বেও, সে একপ্রকার জোরপূর্বক তাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল। আনায়া বারবার তাকে থামানোর জন্য কিছু বলার চেষ্টা করে, কিন্তু তারেককে আর কে থামায়।মেয়েকে এখানে দেখেই তার মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছে। সে যেতে যেতে সকলের উদ্দেশ্যে বলল,
“পুলিশকে ডাকো,বাদবাকি ব্যবস্তা পরে করছি। কিন্তু আজ রাতেই সব সাফ করবো।”
তার কথা মতোই লোকগুলো কাজে লেগে পড়ে। এদিকে আনায়া জোরপূর্বক সামনে এগোতে থাকলেও,সে পেছনে মুখ ফিরিয়ে, বারবার অসহায়ত্বের দৃষ্টিতে ফিরে তাকায়। লোকগুলো কেনীথকে ঘিরে ধরেছে—তাকে টেনেহিঁচড়ে তোলার প্রচেষ্টায়। ক্রমশই তার আর কেনীথের দূরত্ব বেড়ে বেড়ে যায় পুনরায়।
এদিকে কেনীথ অর্ধচেতন দেহে,ঝাপসা চোখে আনায়ার অবয়ব বোঝার চেষ্টা করে। ওটা যে আনায়াই ছিল তার আর বুঝতে বাকি নেই। এমন পরিস্থিতিতেও,সে বিদ্রুপসরূপ তির্যক হাসে। পরক্ষণেই চোয়াল শক্ত করে এলোমেলো শ্বাস ফেলে আওড়ায়,
“তা…রা,তুই আমার কথা রাখিসনি!”
রাত কতটা গভীর তার ধ্যান-ধারণা আপাতত কেনীথের নেই। পুলিশ স্টেশনের লকআপের এককোনায়, মাথা নুইয়ে বসে আছে সে। একটা পা ছড়ানো,অন্য-পা ভাজ করা—তারউপর ডা’নহাত বেশ নির্বিকারে ঠেস দিয়ে ফেলে রাখা।
একঝাঁক নুইয়ে থাকা, ভেজা-সিক্ত চুল হতে ক্ষণিকের ব্যবধানে টুপটাপ জলবিন্দু ঝড়ছে। সারা-গায়েও কাঁদা-পানির ছোঁয়ার তীব্রতায় সিক্ত। অথচ ভাবভঙ্গি তার সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত।
ঠোঁটের কোণা ফে’টে হালকা র’ক্ত লেগে রয়েছে। হাতের ক্ষতটা এখনও তরতাজা। প্রতিবার ভিজে সংস্পর্শের দরূন, তা আর শুঁকানোর মতো সুযোগ হয়নি। মাথাটাও এখনো ঝিম ধরে বসে আছে। ঠিকমতো মস্তিষ্ক সচল হয়েছে, বেশ অনেকক্ষণ হলো। অথচ তার পর হতেই সে একদম নিশ্চুপ। কোনো কথা নেই,বার্তা নেই;নিস্তব্ধ ভাবনায় হারিয়েছে।
এরিমধ্য পুলিশ স্টেশনে উদ্বিগ্ন রূপে প্রবেশ করে, ভাহিদ আর পাভেল। পাভেলের চোখেমুখে কেনীথকে নিয়ে তীব্র অসহায়ত্ব-দুশ্চিন্তার ছাপ। অন্যদিকে ভাহিদের উদ্বিগ্নতার ধরন ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। ছেলে এখন লক-আপে—তার খবর পেয়েছে খানিকক্ষণ আগেই। আর তা জানতেই,তড়িঘড়ি করে ছুটে এসেছে।
তাকে দেখামাত্রই স্টেশনের পুলিশ সহ,বাদবাকি লোকজন সম্মানের সাথেই সদয় ব্যবহার প্রদর্শন করে। এবং কোনো প্রকার বাঁধা না দিয়ে, কেনীথের সাথে দেখা করার অনুমতি দেয়। লক-আপের গেইট খুলে দিতেই,ভাহিদ ভেতরে প্রবেশ করল।
ছেলের এহেন অবস্থা দেখে,ভাহিদ খানিক অবাক হলো। সে বিস্ময়ের সাথে কেনীথের মুখোমুখি হয়ে,হাঁটু গেঁড়ে বসে। বেশ সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকে পরখ করে,উদ্বিগ্ন স্বরে বলে ওঠে,
“কি করেছিস তুই? আনায়া ঠিক আছে? ওর কিছু করিসনি তো?”
কেনীথ মুখ তুলে একপলক জন্য ভাহিদের দিকে তাকায়। অদ্ভুত এক বিদ্রুপের হাসি ফুটে ওঠে তার কোণে। সে পুনরায় মাথা নুইয়ে নিজের ধ্যানে হারায়। এদিকে তার ভাবভঙ্গিতে, ভাহিদ যেন খানিক রেগে যায়। সে আচমকা কেনীথের ঘাড়-মাথার কাছে শক্তকরে হাত চেপে ধরে—কেনীথের মাথা উঁচিয়ে নিজের দিকে ফেরায়।
—“কি করেছো বলো? আনায়াকে কোন সাহসে…”
—“আমার আনায়াকে লাগবে। আমার ওকেই চাই।”
কেনীথের কথার ভঙ্গি ভাহিদের কাছে স্পষ্ট। আর কেউ না জানুক,কেনীথ যে আনায়ার বিয়ের আগে তার সাথে জোর গলায় উল্টোপাল্টা বকছিল,তা সবটাই মনে আছে।
—“আরে আহাম্মাক…!”
ভাহিদ দাঁতে দাঁত চেপে, আচমকা কেনীথের চুল হতে হাত সরিয়ে, যেই না গাল বরাবর কষিয়ে চ’ড় লাগাতে যাবে—ওমনি তার হাতখানা থমকে যায়। নজর পড়ে নিজের হাতের তালুতে। জমাটবদ্ধ তরতাজা র’ক্ত লেপ্টে রয়েছে হাতে। ভাহিদ অবাক দৃষ্টিতে কেনীথের দিকে ফিরে তাকায়। কেনীথ বরাবরের মতোই নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বসে।
এদিকে পেছন হতে পাভেল বিস্ময়ের স্বরে বলে,
“ভাই,এসব র’ক্ত… কি হয়েছে তোমার?”
কেনীথ কোনো জবাব দেয় না। এবার অবশ্য ভাহিদ খানিক উদ্বিগ্নতার স্বরে বলে,
“তোমার কি হয়েছে? এসব র’ক্ত কিসের? কোথায় আঘাত পেয়েছো?”
বাবার সবগুলো প্রশ্নই যেন কেনীথের কাছে বেশ হাস্যকর লাগল। সে পুনরায় তাচ্ছিল্যসরূপ তির্যক হাসে। অন্যদিকে ভাহিদ উদ্বিগ্ন রইলেও,তা প্রকাশ করে ক্ষিপ্ত স্বরে।
—“কথা বলছো না কেনো? আর কত কাহিনি করবে তুমি? তুমি জানো,তোমার এসব খবর শুনলে তোমার মা-দাদীর কি অবস্থা হবে?আমাদের আর কত কষ্ট দেওয়া বাকি আছে তোমার? বলো, কবে গিয়ে তুমি তোমার পরিবারের মূল্য বুঝবে?”
কেনীথ এবারও নিশ্চুপ। ভাহিদ রেগে যাচ্ছে বিধায় পাভেল এগিয়ে আসে। সে ভাহিদকে শান্ত হতে বলে, কেনীথের কাছে গিয়ে বসে। বেশ ভীতিগ্রস্ত হয়েই, কেনীথের মাথার পেছনে হাত ছোঁয়ায়। যা আশংকা করেছিল,তাই হলো। নিজের র’ক্ত মাখা হাতটার দিকে তাকিয়ে,পাভেল বিস্ময়ের নজরে তার দিকে ফিরে তাকায়। কেনীথ অদ্ভুত ভাবে হাসছে।
পাভেল তৎক্ষনাৎ পেছনে ফিরে ভাহিদকে দেখে। ভাহিদও বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করে। সে কপাল কুঁচকে আওড়ায়,
“কি হয়েছে ওর?”
—“ভাইকে হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে। মাথার পেছনেই আঘাত লেগেছে।”
ভাহিদ কেনীথের দিকে ফিরে তাকায়। কিছু বলতে যাবে…তার পূর্বেই,ভেতরে একজন পুলিশ আসে।
—“ওনাকে নিয়ে যেতে হবে।”
—“কোথায় নিয়ে যাবেন?”
পাভেলের উদ্বিগ্ন কন্ঠস্বরে পুলিশটি নির্বিকারে বলল,
“তারেক এহসান ডেকেছেন। মেয়র সাহেবকেও যেতে বলেছে।”
ভাহিদ ব্যক্তিটির কথায় তটস্থ হয়। না জানে আজ কপালে কি আছে। ভাহিদ যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। এদিকে পাভেল তা দেখে,অবাক স্বরে বলল,
“এখন কিভাবে কোথায় যাবে…? আগে ভাইয়ের হসপিটালে…”
—“হসপিটালে পরে যাওয়া যাবে। এমনিতে একটা ব্যান্ডেজ করে দাও।”
ভাহিদের এমন অভিব্যক্তিতে, পাভেল বেশ অবাক হয়।
—“কিন্তু…”
পাভেল বিস্ময়ের চাহনিতে ভাহিদের দিকে তাকাতেই,সে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে কেনীথকে একপলক দেখে বলল,
“চিন্তা নেই, এতো সহজে ম’রবে না ও!”
একটি ফাঁকা রুমে আনায়া চুপচাপ চেয়ারে বসে আছে। তার সামনে রাগান্বিত ভঙ্গিতে পায়চারী করছে তারেক।আনায়া অনবরত কেঁদে চলেছে। কি করবে না করবে কিচ্ছু জানে না। অন্যদিকে তারেক তাকে এখনো ধমকে যাচ্ছে।আজ আনায়া সত্য-মিথ্যে যাই স্বীকারোক্তি দেবে, তাই তার কাজে লাগবে। তাই সে চাচ্ছে,আনায়া যেন তার কথামতোই কাজ করে। কিন্তু আনায়া কোনোভাবেই এইসব মিথ্যে বলার জন্য,নিজেকে মানাতে পারছে না।
—“তুমি এভাবে কাঁদছো কেনো? প্রেসের বিশেষ দু-তিনজন মানুষ আসবে। কিছু প্রশাসনের লোকজন আসবে। তুমি চুপচাপ নিজের স্বীকারোক্তি দেবে; পেপারস্ এ সাইন করবে। তোমার কাজ শেষ। এরপর আর তোমায় কিছুই করতে হচ্ছে না। অথচ তুমি…”
—“কিন্তু বাবা,তুমি যা বলতে বলছো, তার সবই তো মিথ্যে। হ্যাঁ,উনারা আমায় তুলে নিয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আমার তো কোনো ক্ষ’তি করেনি। আর না ঐ বাড়ির কেউ…”
আনায়ার ভীতু কন্ঠস্বরে বলা কথাবার্তায়, তারেক পুনরায় ক্ষিপ্ত হয়। রুক্ষ-চাপা স্বরে বলল,
“তুমি আমার মুখের উপর কথা বলছো কোন সাহসে? যা বলতে বলছি তাই বলবে। আর তুমি কি এই সামান্য মিথ্যে বলার জন্য কাঁদছো? দেখো আনায়া,মিথ্যে বলা ঠিক নয়, তা আমি জানি। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে সামান্য মিথ্যেও, আমাদের অনেক কাজে লেগে যেতে পারে। তাই প্লিজ তুমি এসব নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে,যা বলতে বলেছি তাই বলবে।
আর এসব তো এখনই পাবলিশড হচ্ছে না। আজ যা ঘটবে তার সবটাই গোপন থাকবে। কেউই কিছু জানবে না। যদি ওরা আমার কথা মতো কাজ না করে,তখন গিয়ে না হয়…”
আনায়া বুঝতে পারছে না, তারেকের মাথায় আদতে কি চলছে। কিন্তু সে এইটুকু বুঝতে পারছে,আজ খুব খা’রাপ কিছু ঘটবে। তার বাবা যতই যাই বলুক না কেনো, মিথ্যে কখনোই কারো জীবনে ভালোকিছু বয়ে আনতে পারে না। এটা শুধুমাত্রই ধ্বং’সের এক প্রতীক।
কেনীথ আর ভাহিদ পুলিশের সাথে নির্দিষ্ট স্থানে এসে পৌঁছায়। আর কয়েক ঘন্টার পরই হয়তো, অন্ধকার বিদীর্ণ করে ভোরের আলো ছড়াবে। অথচ আজ রাতের বৃষ্টি এখন অব্দি থামেনি। বৃষ্টির এই আগমন যেন এক আসন্ন ঝড়ের পূর্বভাস।আকাশমন্ডল আজ নীরবে শোকপত্র লিখছে। প্রতিটি ফোঁটায় যেন লুকানো আছে বিচ্ছেদের অমোঘ ইঙ্গিত।
এ বৃষ্টি হয়তো থামবে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া আভাসে থেকে যাবে, এক অনন্ত বিদায়ের ছায়া। অন্ধকার কেটে বৃষ্টির মহিমায় প্রকৃতি কাল উদ্বেলিত হলেও, ব্যক্তির জীবনে হয়তো সেই আলো আর ছড়াবে না। কারণ কিছু রাত এমনই হয়—যেখানে প্রতিটি বজ্রধ্বনি কেবল আকাশে নয়, মানুষের অন্তরালেও ফাটল ধরায়। এই রাতের ভেজা নিস্তব্ধতা, এই দীর্ঘশ্বাসময় নৈঃশব্দ্য—সবকিছু যেন ঘোষণা দিচ্ছে…ভোর আসবেই, কিন্তু আগের মতো কোনো সুপ্রসন্ন সকালের দেখা হয়তো আর মিলবে না।
ভেজা-সিক্ত শরীরেই হল রুমে প্রবেশ করে কেনীথ। তার পাশে ভাহিদ, পাভেল আর কিছু পুলিশের লোকজন। কেনীথের মাথায় সাদা রঙের ব্যান্ডেজের প্রলেপ। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, অদক্ষ হাতে কেউ তড়িঘড়ি করে বেঁধেছে। এলোমেলো একঝাঁক ভিজে চুলগুলো সেই ব্যান্ডেজের উপর দিয়ে কপালে নুইয়ে পড়েছে। পরনের ভেজা কালো টিশার্টটা একদম গায়ের সাথে লেগে রয়েছে। হাতের ক্ষততেও খানিক ব্যান্ডেজ বাঁধা।
কেনীথের ভাবভঙ্গি একদমই নির্লিপ্ত। সে চারপাশে একপলক নজর বুলিয়ে নেয়। এখনো তার চোখজোড়া সেই বিশেষ ব্যক্তিকেই খুঁজে চলেছে। শুরুতে আনায়া নজরে না এলেও,পরক্ষণেই খেয়াল করে দেখে—দূরের এককোনায় তারেকের পাশে সে চুপটি করে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখে-মুখে বিষন্নতার ছাপ। চুলগুলো খানিক এলোমেলো। পরনে তারই পছন্দ করা সেই গাঢ় লালচে-কালো গাউনটা। যার কোণায় খানিক কাদা-পানির ছিটেও লেগে আছে। সাথে গায়ে এখনো জড়ানো রয়েছে তারই কালো জ্যাকেট।
কেনীথ তার দিকে অপলকভাবে তাকিয়ে থাকে। ঠোঁটের কোণায় আনমনেই মুচকি হাসি ফুটে ওঠে। তার ভাবভঙ্গি অদ্ভুত। বেশ অগোছালো। মাথায় কি চলছে,তা কারো কাছেই বোধগম্য নয়।
এদিকে আনায়া তখনও কেনীথকে খেয়াল করেনি৷ তবে তারেক তাদের দেখমাত্রই বলে ওঠে,
“আসুন, আসুন, দেরি করে লাভ নেই। ভোর হওয়ার আগেই হিসেব মিটিয়ে নেওয়াটাই ভালো হয়।”
তারেকের কথায় কেনীথের নজর সরে না। সে এখনো আনায়ার দিকে তাকিয়ে। অন্যদিকে আনায়া মুখ তুলে সামনে তাকাতেই,কেনীথের অদ্ভুত চাহনির সাথে নিজের দৃষ্টি মিলে যায়। আকস্মিক অজানা শিহরনে মৃদু কেঁপে ওঠে সে। আনায়া ইতস্ততবোধ করলেও,কেনীথ তখনও নির্বিকারে তাকে দেখছে। না চোখের পলক পড়ছে,না সে নিজে এক পা নড়ছে।
এদিকে তারেককে দেখে ভাহিদের চোয়াল খানিক শক্ত হয়। আদতে তার রাগ তারেক নয় বরং নিজের ছেলের উপরই হচ্ছে। সে জানে,তারেক এমন কিছুরই অপেক্ষায় ছিলো। কিন্তু ছেলে যে তার এতো চমৎকার ভাবে সুযোগ করে দিবে,তা হয়তো কল্পনাও করেনি।
ভাহিদ চারপাশটা একপলক দেখে নেয়। অনেক মানুষজন রয়েছে। সবই বিশেষ বিশেষ সকল ব্যক্তিগণ। প্রশাসনের কিছু বিশেষ লোক ছাড়াও,ক্যামেরা হাতে প্রেসের দু-তিন জন সিনিয়র জার্নালিস্টের পাশাপাশি, এডভোকেট দেখে সে বেশ অবাক। তারেক আসলে কি করতে চাচ্ছে!
কেনীথের পাশে এসে ভাহিদ দাঁড়ালো।ছেলেকে বেশ সতর্ক করে, চাপা স্বরে কানের কাছে বলল,
“শোনো! যা করার করেছো। এখানে খবরদার কোনো পাগলামি করবে না। তারেক কি করতে চাচ্ছে জানি না। তবে যত যাই হোক,তুমি চুপ থাকবে। নয়তো মনে রেখো,তোমার একটা ব্যতিক্রমী পদক্ষেপে— তোমার পরিবারকে ধ্বং”স করে দেওয়ার জন্য, তারেক তার মোক্ষম সুযোগ পেয়ে যাবে।”
কেনীথ ভাহিদের কথায় কিছু বলল না। সে এখনোও আনায়াকে দেখছে। আনায়াও চেয়েও আর তার থেকে নজর ফেরাতে পারছে না। কিন্তু ঐ অদ্ভুত চোখজোড়ার দিকে—একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকাও যে সম্ভব না। শান্ত-শীতল চোখদুটোতে, আনায়া স্পষ্ট নিজের ধ্বং”স দেখতে পারছে। ক্রমশই সে নানান ভাবনায় বেশ অস্থির হয়ে ওঠে।
এদিকে তারেক ততক্ষণে লোকজনদের বলে কাজ শুরু করিয়েছে। আনায়াকেও ইশারা করে, যা বলবে ভেবে চিন্তে যেন বলে। এতোগুলা লোকের সামনে যেন কোনো উল্টোপাল্টা কথা বলে, তার সব পরিকল্পনা নষ্ট না করে।
আনায়া আরো বেশি ভীত হয়। কি করবে না করবে,তা ভাবতেই সে দিশেহারা। কিন্তু তারেকের উপর দিয়ে কথা বলার মতোও নূন্যতম সাহস তার এখন অব্দি হয়নি। যদি আজ তারেকের কথা অমান্য করে,তবে হয়তো তার লাশ বানিয়েই তারেক তাকে এখানে ফেলে রেখে চলে যাবে। সবমিলিয়ে অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্বের পর আনায়া নিজেকে তটস্থ করে।
প্রসাশনের কয়েকজন লোক এসে তাকে লাগাতার কিছু প্রশ্ন করতে শুরু করে। চারপাশের প্রেসের লোকজন ক্যামেরা নিয়ে তা রেকর্ড করছে। ওদিকে কিছু লোকজন নানান পেপারস্ সাজাতে ব্যস্ত। কেউ আবার আনায়ার জবানবন্দী নোট করছে। তারেক নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে;তারপাশে তখন সাফিন৷ অথচ ভাহিদের কাছে সবকিছুই বেশ অস্পষ্ট। তারেকের উদ্দেশ্য সে তখনও ঠিকঠাক ধরতে পারছে না। এরিমধ্যে আনায়া নিজের স্বীকারোক্তি দিতে শুরু করে। যা আর কেউ না হোক,কেনীথ কিংবা ভাহিদকে প্রচন্ড অবাক করল।
—“মিস আনায়া এহসান। আপনি কি মেয়র ভাহিদ এহসান এবং তার ছেলে ভিভিয়ান এহসানকে আগে থেকেই চিনতেন?”
আনায়া ব্যক্তির এহেন প্রশ্নে, ক্ষণিকের জন্য ভাবনাচিন্তা করছে। তার বাবা বলেছে,স্পষ্টভাবে যেন বলে দেয় সে কাউকেই চেনে না। এটা মিথ্যে নয়, আনায়া সত্যিই এদের সেভাবে চেনে না। তাই সে একপলক দূরে নিস্তব্ধে দাঁড়িয়ে থাকা কেনীথকে দেখে। পরক্ষণেই নজর ফিরিয়ে বলল,
“না। আমি ওনাদের কাউকেই চিনি না।”
ব্যক্তি আবারও তাকে জিজ্ঞেস করল,
“তো এবার বলুন। আপনাকে অপহরণ করার পর তারা আপনাকে কোথায় নিয়ে গিয়েছিল? এবং তারা সর্বমোট কতজন ছিলো?”
—“সেদিন আমার বিয়ে ছিলো। আমি সন্ধ্যারাতে চুপচাপ নিজের রুমে অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই আচমকাই ঐ লোকটা আমার ঘরে আসে…”
—“কোন লোকটা?”
আনায়া ইতস্তত ভঙ্গিতে কেনীথের দিকে ফিরে তাকায়। পরক্ষণেই কাঁপাকাঁপা হাতে কেনীথকে ইশারা করে। তৎক্ষণাৎ সকল লোকজন কেনীথের দিকে ফিরে তাকায়। অন্যদিকে ভাহিদের চোয়াল হয় শক্ত। তবে কেনীথ এখনও একই ভাবভঙ্গিতে নিস্তব্ধ। আনায়া হতে একবারের জন্যও, তার নজর সরেনি।
খানিকক্ষণ বাদেই আবারও সকলে স্বাভাবিক হয়। আনায়াকে আবারও জিজ্ঞেস করা হলো,
“এরপর! এরপর কি হয়েছিলো?”
—“উনি আমার ঘরে ঢুকেই, আমার মুখে কিছু একটা চেপে ধরে। আর আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। এরপর আর কিছু মনে নেই। যখন আমার জ্ঞান ফেরে তখন দেখি আমি একটা অন্ধকার ঘরে। আর ওখানে উনি সহ কোঁকড়া চুলের আরো একজন…ঐ যে উনি। ওনাকেও দেখতে পাই। আর এনাদের দুজনকে আমি বিয়ের দুদিন আগে আমার বাড়িতেও দেখেছিলাম। তারা হয়তো আমার বাবার সাথে, কোনো একটা বিষয়ে কথা কাটাকাটি করছিল। তো ঐ জঙ্গলের বাড়িতে দুদিন থাকার পর, ওনারা দুজন আমাকে ওনাদের বাড়িতে নিয়ে যায়।”
—“এহসান মঞ্জিলে?”
—“জ্বী।”
—“দুপুরের দিকে,আপনার বাবা যখন এহসান মঞ্জিলে যায়,তখন আপনি কোথায় ছিলেন?”
—“বাবা ওই বাড়িতে গিয়েছিল?”
আনায়া খানিক অবাক হলো। তার বাবা এহসান মঞ্জিলে গিয়েছিল?অথচ সে টেরও পায়নি।…পরক্ষণেই তার দুপুরের ঘটনা মনে পড়ে। আনায়া ভাবুক ভঙ্গিতে খানিকক্ষণ ভাবতে থাকে। তার ভাবগাম্ভীর্যে ব্যক্তিটি জিজ্ঞেস করে,
“আপনি কি কিছু বলতে চান?”
—“আ…মানে,দুপুরের দিকে উনি আমায় পানির গ্লাসে কিছু একটা খাইয়েছিলেন। এরপর আর আমার কিছুই মনে নেই৷ এবং ঘটনার কয়েক ঘন্টা পর আমি জ্ঞান ফিরে দেখি…ওনার ঘরের বিছানাতেই শুয়ে আছি।”
আনায়ার এহেন অভিব্যক্তিতে তারেকের চোয়াল শক্ত হয়। নির্লিপ্ত কেনীথের দিকে চেয়ে,দাঁতে দাঁত পিষে মনে মনে আওড়ায়,
“হা-রামজাদা একটা!”
এদিকে ততক্ষণে আনায়াকে, আবারও জিজ্ঞেস করা হয়,
“এবার বলুন তো,ওনারা আপনার সাথে কি কোনো খা’রাপ কিংবা অশোভন আচরণ করেছে? আশা করি আপনি বুঝতে পারছেন,আমি কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছি।”
এই পর্যায়ে আনায়া খানিক দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে যায়। বুঝে আসছে না, এখন সে আদতে কার কথা শুনবে। এভাবে মিথ্যে বলাটা কি আদৌও ঠিক হবে? আনায়া নজর ফিরিয়ে আঁড়চোখে একপলক নিজের বাবাকে দেখে৷ সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে তটস্থ করে। আনায়া নজর ফিরিয়ে কেনীথের দিকে তাকায়৷ সে এখনোও একই ভঙ্গিতে তাকে দেখছে। তবে এবার যেন সেও বেশ উৎসুক তার উত্তরের অপেক্ষায়। কিন্তু আনায়া তার চাহনিতে বেশিক্ষণ নিজের নজর মিলিয়ে থাকতে পারল না। তৎক্ষনাৎ মাথা নুইয়ে,কাঁপা কাঁপা স্বরে বলতে লাগল,
“ওনারা আমার সাথে খা…খা’রাপ করার চেষ্টা করেছে। অনেকবার বলেছে যেন আমি…আমি তাদের সব কথা শুনি। নয়তো আমার সাথে খারা’প কিছু করবে। আমাকে বিক্রি করে দিবে। আর যখন ওনাদের বাড়িতে নিয়ে যায় তখন ওই বাড়ির সবাই…বাড়ির সবাইও একই ভয় দেখায়। অনেক বাজে বিহেভিয়ার করে। বলে আমি চুপচাপ না থাকলে,আমাকে মে’রে ফেলবে।”
আনায়া এইটুকু বলেই থমকায়। তার অকস্মাৎ কেনো যেন প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে। সেও জানে,কেনীথ তাকে ওসব মিথ্যে ভয় দেখিয়েছে। আর তার পরিবার তাকে ভয় দেখানো তো দূরের কথা,সে কল্পনাও করেনি কোনো অপরিচিত কারো সাথে ওনারা এতো ভালো ব্যবহার করবে। অথচ এখন সে কিভাবে এতোসব মিথ্যে বলছে!
—“এহসান মঞ্জিলে ভাহিদ এহসানের মা,স্ত্রী সহ আরো দুজন থাকেন। আপনার সাথে সবচেয়ে বেশি অ’শোভন আচরণ কারা করেছে? আপনি কি কোনোভাবে তাদের চিহ্নিত করতে পারবেন?”
আনায়া পুনরায় দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে যায়। এখন কোন মিথ্যে বলবে? তার বাবার কথা মতো বলে দেবে যে, সবাই তার সাথে খারাপ বিহেভিয়ার করেছে?
—“আপনি নির্দ্বিধায় বলতে পারেন। চিন্তা করবেন না,আপনি এখন একদম সুরক্ষিত।”
সবার এমন চাপে, আনায়া শেষমেশ বলেই ফেলে,
“ও…ওনার মা, দাদী…আর যারা ছিলো… সবাই!”
—“আচ্ছা এবার বলুন,ওনাদের সাথে কি আরো কেউ ছিলো? আপনি কি কোনোভাবে তাদের চিনেন?”
—“হুম,হয়তো অনেকেই ছিলো। কিন্তু আমি তাদের চিনি না।”
আনায়ার আর মাথা তুলে আশেপাশে তাকানোর সাহস পায় না। তাকালে হয়তো, আবারও কেনীথের বিস্ময়ের ঘেরা চোখ দুটোর মুখোমুখি হতে হতো। তারেক অবশ্য বেশ খুশি। পুরোটা না হলেও, যথেষ্ট বলেছে তার মেয়ে। এতেই কাজ হয়ে যাবে।
এবার আনায়াকে একে একে আরো কিছু প্রশ্ন করা হয়। এহসান মঞ্জিলের সদস্যদের নিয়ে বেশ কিছু বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে,আনায়া বলতে বলতে অনেক সত্য-মিথ্যে বলে ফেলে। ফলাফলসরূপ এবার ভাহিদের চোয়াল শক্ত হয়। সে একবার আনায়াকে দেখছে তো একবার তির্যক হাসতে থাকা তারেককে।
তার বোঝা হয়ে গিয়েছে,এখানে ঠিক হচ্ছে। সে তার ছেলেকে ভালো করেই চেনে। যদি আনায়া কেনীথের নামে যা ইচ্ছে তাই বলতো, তবে হয়তো সে তা বিশ্বাস করে নিতো। কিন্তু নিজের মা কিংবা স্ত্রীর বিষয়ে, নানান ইঙ্গিততে বলা আনায়ার অভিযোগগুলো সে কোনোমতেই বিশ্বাস করতে পারল না। আর কেউ না জানুক,সে তো জানে—তার স্ত্রী আনায়াকে ঠিক কি পরিমাণ ভালোবাসতো। অথচ তার সম্পর্কেও এমন অভিব্যক্তি! এ যেন অবিশ্বাস্য।
আনায়ার স্বীকারোক্তি শেষে তাকে কিছু পেপারস্ এ সাইন করতে বলা হয়। সেখানেও এইসকল বিষয়ের লিখিত পত্র সাজানো। আনায়া খুব একটা সময় নেয় না—সেসবে সাক্ষর দিতে। সবকাজ শেষ হতেই, সে চুপচাপ টেবিল থেকে খানিকটা দূরে দাঁড়িয়ে পড়ে। তার আশেপাশে লোকজন নিজেদের কাজ করছে।এবার কেনীথকে ডাকা হয়।
কেনীথ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সেদিকে এগিয়ে যায়। তার ভেতর অজানা এক ক্ষোভ জন্মেছে। হয়তো বা তা আনায়া কিংবা বাকিদের ঘিরেই।
—“মিস্টার ভিভিয়ান এহসান! এতোক্ষণ উনি যা যা বললেন তা তো শুনলেনই। এবার আপনি কি এই ব্যাপারে কিছু বলতে চান?”
কেনীথ কোনো জবাব দেয়না। নজর ফিরিয়ে দৃঢ় দৃষ্টিতে একপলক আনায়াকে দেখে। আনায়া ঠোঁটে ঠোঁট চেপে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে। কেনীথ আশেপাশে আর কারো দিকে ফিরে তাকায় না। সরাসরি টেবিলের উপর থাকা পেপারস্ গুলোর কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। পেপার্সে ভেসে থাকা লেখাগুলোর দিকে তাকিয়ে, বিদ্রুপসরূপ তির্যক হাসে। এবং আশ্চর্যজনক হলেও,সে খুব সহজেই নির্দিষ্ট সকল স্থানে, সাক্ষর দিতে দিতে শুরু করে। আনায়া সহ বাকি সকলে বেশ অবাক হলেও,কেনীথ থামে না।
এরিমধ্যে আনায়া খেয়াল করে দেখে,কেনীথ সাইন করতে করতেই…তার হাত থেমে গিয়েছে এবং তা আচমকা কাঁপছে। আনায়া বেশ আশ্চর্য হয় এতে। লোকটার ভাবভঙ্গি কোনোটাই স্পষ্ট নয়। এদিকে একজন তার উদ্দেশ্যে বলল,
“মিস্টার এহসান,আপনি কি তবে স্বীকার করছেন উনি যা বললেন তা… ”
ব্যক্তির কথা শেষ হবার আগেই,কেনীথ আবারও হাতের কলমটা দৃঢ়হাতে চেপে ধরে। এবং অবশিষ্ট পেপার্সেও সাইন করে দেয়। কাজ শেষ হলে,সে কলমটা টেবিলের উপর একপ্রকার ছুঁড়ে ফেলে।
আনায়ার দিকে এগিয়ে যায় নির্বিকার ভঙ্গিতে। তার আচমকা এগিয়ে আসায়, আনায়া খানিক ভীত হয়। তবে সে বেশি ঘাবড়ায়—কেনীথের অদ্ভুত অপলক দৃষ্টি ও ঠোঁটের কোণে দৃশ্যমান তির্যক হাসিতে।
কেনীথ গিয়ে আনায়ার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। আনায়া তার চোখে চোখ মিলিয়ে তাকিয়ে থাকার সাহস পায়না৷ অন্যদিকে মেয়ের কাছে অসভ্যটাকে দেখে,তারেকের কপালে ভাজ পড়ে। সেও আক্রোশে এগিয়ে আসবে, তৎক্ষনাৎ সাফিন পাশ থেকে তার হাত চেপে বোঝায়—এই মূহুর্তে রেগে না গিয়ে,ধৈর্য ধরতে। আশেপাশে লোকজন রয়েছে।
যথারীতি ভাহিদ কিংবা তারেক দুজনেই নিজেদের অবস্থান হতে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে রইলেও,কেউ আর এগিয়ে যায় না। যদিও ভাহিদ বিশ্বাস করে নিয়েছে—এই ছেলে আজ তার মানসম্মানের যেটুকু অবশিষ্ট ছিল তাও ডুবিয়ে দিয়ে যাবে। আর শেষমেশ তার ক্ষেত্রে বিষয়টা যেন এমন কিছুই হলো।
কেনীথ আচমকাই তার হাতের পিঠের আঙুলজোড়া,আলতো করে আনায়ার গালে ছোঁয়ায়। পরম আবেশে সে তার গালে, আঙুল বুলিয়ে দেয়। তার এহেন পদক্ষেপে, আনায়া অকস্মাৎ খানিক কেঁপে উঠলেও, নিজেকে যথাযথভাবে সামলে নেয়।
তবে তার সুক্ষ্ম নড়চড়ও, কেনীথের নজরে ধরা পড়ে। সে বেশ তাচ্ছিল্যসরূপ খানিক তির্যক হেসে আওড়ায়,
“ঠিকঠাক মিথ্যে বলতেও না কলিজা লাগে!”
আনায়া কেনীথের নজরের সাথে নজর মিলিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। সে সহসাই নিজের ঠোঁট জোড়া চেপে ধরে। কেনীথের এই বিদ্রূপসরূপ হাসি,গালে ছুঁয়ে থাকা তার এই অদ্ভুত স্পর্শ কিংবা চোখের অস্পষ্ট ভাষা—সবটাই যেন তাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিচ্ছে।
এরিমধ্যে তাকে সহ আশেপাশের সকলকে চমকে দিয়ে,অকস্মাৎ কেনীথ তাকে জড়িয়ে ধরে। যাতে শুধু আনায়া নয় বরং তারেক-ভাহিদ সহ সকলেই চূড়ান্ত পর্যায়ে বিস্মিত হয়। তারেক হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে এগিয়ে আসতে চাইলে, পাশ থেকে সাফিন তাকে আবারও থামিয়ে দিয়ে বলল,
“স্যার, প্লিজ। যা হচ্ছে হতে দিন। চারপাশে ক্যামেরা আছে,সবকিছুই রেকর্ড হচ্ছে। এই মূহুর্তে আপনি কিছু করে বসলে,আমাদের সবকিছু ভেস্তে যাবে।”
সাফিনের কথায় তারেক নিজেকে সামলায়। অন্যদিকে পাভেলও ভাহিদকে আটকায়। কেনীথ যা ইচ্ছে করুন,কিন্তু সে নিজে কিছু করতে গেলেই ঘটনা আরো বিগড়ে যাবে।
এদিকে কেনীথের এই দৃঢ় স্পর্শে আনায়ার সর্বস্ব অবশ হয়ে আসছে। তার সাথে কি হচ্ছে তা বোধগম্য নয়। কিন্তু আনায়া বুঝতে পারছে,সে আর নিজের মধ্যে নেই৷ তার হৃৎস্পন্দন থমকে গিয়েছে। চোখ-মুখ শুঁকিয়ে আসছে। অন্যদিকে কেনীথ যতটা পারছে তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরছে। এতটাই দৃঢ়তায় যেন, তাকে সম্পূর্ণরূপে নিজের সাথে মিশিয়ে নেবে।
কেনীথ আনায়ার গলার ভাঁজে মুখ ডুবিয়েছে। তার গরম নিশ্বাস,ওষ্ঠদ্বয়, ভেজা-সিক্ত চুল কিংবা খোঁচা খোঁচা চাপ-দাঁড়ির সংস্পর্শে আনায়া নিমিষেই সংকুচিত হলো। তার প্রচন্ড কান্না পাচ্ছে। আবেশে চোখমুখ খিঁচে নেয় অনিমেষেই। অন্যদিকে কেনীথ বেশ খানিকক্ষণ সময় এভাবেই আনায়ার মাঝে নিজেকে বিলীন করার পর—অকস্মাৎ শীতল-শান্ত মন্থর কন্ঠস্বরে, বলতে শুরু করে,
“তুই কাঁদবি!…শুনছিস, তুই একদিন এই আমিটার জন্য অনেক কাঁদবি। আমাকে পাওয়ার জন্য ছটফট করবি। আমার একটুখানি ভালোবাসা পাবার জন্য তিলে তিলে মরবি। একদিন তুই নিজেই এই জানোয়ারটাকে ভালোবাসবি। কিন্তু পাবি না। সেদিন তুই আর কিছুই পাবি না।
তুই তোর কথা রাখিসনি,তারা! তোকে এতো অনুরোধ করার পরও তুই আমার কথা রাখিসনি। আমিও দেখতে চাই,আমাকে ছাড়া তুই ঠিক কতটা ভালো থাকিস। আজ যে মিথ্যেয় আমার পরিবারকে অব্দি অপবাদ দিয়েছিস,তার ফল তুই পাবি।
মহামায়া পর্ব ১২
প্রতি মূহুর্তে আমার অনুপস্থিতি তোকে রূদ্ধশ্বাস করে তুলবে। তোর-আমার দূরত্ব তোকে উন্মাদনায় পাগল করে ছাড়বে। তুই পালাতে চাইবি, আমাকে ঘৃণা করতে চাইবি—অথচ সেই ঘৃণার মাঝেই আমাকে খুঁজে ফিরবি। তোর পালানোর গন্তব্যের শেষ প্রান্তে, আমারই দেখা পাবি। প্রতিটি নিশীথে তোর ঘুম ভাঙবে, আমারই কল্পিত ছায়ার স্পর্শে। আমাকে না পাবার হাহাকারেই তুই ছারখার হবি।
আই রিপিট, তুই কাঁদবি। তুই আমার জন্যই কাঁদবি,উম্মাদ হয়ে কাঁদবি, এই জানো’য়ারটার জন্যই কাঁদবি! আই ওয়ান্ট টু সি ইউ ক্রাই এন্ড ক্রাই,যাস্ট ফর মি। বিকজ আই’ম ইউর ক্রেইজড সাইকোপ্যাথ।”
