মহামায়া পর্ব ১৪
তুশকন্যা
‘…আই রিপিট, তুই কাঁদবি। তুই আমার জন্যই কাঁদবি,উম্মাদ হয়ে কাঁদবি, এই জানো’য়ারটার জন্যই কাঁদবি! আই ওয়ান্ট টু সি ইউ ক্রাই এন্ড ক্রাই,যাস্ট ফর মি। বিকজ আই’ম ইউর ক্রেইজড সাইকোপ্যাথ!”
কেনীথ থামতেই আনায়া অকস্মাৎ ফুঁপিয়ে ওঠে।নিজেকে সামলাতে, ওষ্ঠদ্বয় কামড়ে ধরে। কেনীথ তৎক্ষনাৎ তার গলার ভাজ হতে মুখ তোলে না। বরং আনায়ার গলার ভাজে ফুটে থাকা ছোট্ট কালো তিল বরাবর, পরম আবেশে বেশ খানিকটা সময় নিয়ে, ঠোঁট চেপে ধরে চুমু খায়।
আনায়া বিস্ময়ে তৎক্ষনাৎ চোখমুখ খিঁচে নেয়। অথচ কেনীথ তখনও থামেনি। সে পুনরায় নিজের খোঁচা-খোঁচা দাঁড়িযুক্ত গাল ও নাকটা ঘষে দেয় তার গলার ভাজে। নিমিষেই যেন আনায়ার ভেতরটা, উথাল-পাতাল ঝড়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। যদিও এই দৃশ্যটুকু কারোরই নজরে পড়ে না। কেননা কেনীথের এলোমেলো-ঝাঁকড়া চুলের আড়ালে, তার মুখ সম্পূর্ণ আড়াল হয়ে আছে।
এবার কেনীথ মুখ তোলে। আনায়ার খিঁচে রাখা চোখজোড়ার দিকে চেয়ে মৃদু হাসে। ভেজা-সিক্ত চাহনিতে, আনায়া চোখ মেলে তাকায়। পরক্ষণেই কেনীথ আবারও তার উদ্দেশ্যে আওড়ায়,
“জানিস,তোর এই চোখজোড়া আমার খুব প্রিয়! সেদিন যখন দেখেছিলাম—বিশ্বাস কর,কিছুক্ষণের জন্য মনে হলো,আমার পুরো দুনিয়া থমকে গিয়েছে। আর আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কিছু হাসিল করে নিয়েছি।
অনেস্টলি, এভরি গেজ অব ইয়োর আইজ—আই’ম গ’না ডাই।…হাহ্! কাঁদলেও হয়তো ভালোই লাগবে—যেহেতু আমার জন্যই কাঁদবি। আর তোর গলার ভাজের ঐ ছোট্ট কালো তিলটা! ওটা শুধুমাত্র আমার। এই গলার ভাজে মুখ ডুবিয়ে,তোকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে অনুভব করার অধিকার একান্তই আমার।”
কেনীথের কন্ঠস্বর কাঁপছে। ঠোঁটের কোণায় তাচ্ছিল্যের বিস্তৃত হাসি, অথচ চোখজোড়া ভিজে৷ সে থামতেই,নিঃশব্দে আনায়ার চোখ বেয়ে পানি ঝড়ে। সে কেনো কাঁদছে, তা হয়তো নিজেও জানে না।
কেনীথ পুনরায় বিস্তৃত হেসে,আনায়াকে ছেড়ে দেয়। অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে ভ্রু-তে বুড়ো আঙুল ঘষে,ঠোঁট ভিজিয়ে আওড়ায়,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“নিজের খেয়াল রাখিস।”
এই বলেই সে পুনরায় বিস্তৃত হাসে।পরক্ষণেই আবার চোখ-মুখে কাঠিন্যের আভাস মেলে।
কেমন অদ্ভুত এক পাগলাটে ভাব। সে চোখ-মুখ শক্ত করে, আনায়ার উদ্দেশ্যে চাপা স্বরে মন্থর স্বরে আওড়ায়,
‘tere dil pe haq mera hai.
tu sanam beshak mera hai.
phir lakeeren ho ya na ho.
tu mera hai! tu mera hai!’
ছন্নছাড়া ভঙ্গিতে সে আনায়ার দিকে ফিরেই,উল্টোদিকে হেঁটে পিছিয়ে যাচ্ছে। একইসাথে এলোমেলো স্বরে গানের লাইন গুলো আওড়িয়ে যায়।
নিঃশব্দে অশ্রুজল ফেলা, আনায়া হতে প্রায় বেশ খানিকটা দূরে সরে আসার পর, কেনীথের আশেপাশে সকলের উদ্দেশ্যে উচ্চস্বরে বলে ওঠে,
“আমার কি আর কোনো কাজ আছে? এখন কি আমায় জেলে যেতে হবে? যা করবেন, দ্রুত করুন। আমি এখন বেশ ক্লান্ত।”
তার দিকে সকলে অদ্ভুত নজরে তাকিয়ে। কেউ কোনো জবাব দিচ্ছে না বিধায়,কেনীথ আবারও বলল,
“তার মানে, আমি এখন যেতে পারি? আমার ফাঁসি-টাঁসি কিছু হবে না?”
কেনীথ ভ্রু উঁচিয়ে বেশ তাচ্ছিল্যের সহিত এহেন কথা বলে,ফিঁচকে হাসে। পরক্ষণেই টেবিলের কাছে এগিয়ে যায়। পেপার্সে সাইন করার সময়, টেবিলে সিগারেটের প্যাকেট পড়ে থাকতে দেখেছে। যথারীতি সে প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে,ঠোঁটে চেপে ধরে। পাশ থেকে লাইটারটা হাতে নিয়ে,পুনরায় আনায়ার দিকে এগিয়ে আসে। তবে এবার দুজনের মাঝের দূরত্বটা বেশখানিক।
ঠোঁটে চেপে রাখা সিগারেটের আগায়,দুহাত আগলে ধরে, নির্বিকার ভঙ্গিতে লাইটার হতে আগুন জ্বালায় সে। তাতে বেশ কড়াভাবে টান দিয়ে,নাক-মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে আনায়ার দিকে তাকিয়ে—বিস্তৃত হেসে বলতে লাগল,
“জানা গেছে, বানিজ্য মন্ত্রী তারেক এহসানের মেয়ের কিছুদিন পূর্বে বিয়ে হয়েছিল, কিন্তু হঠাৎ তাকে কেউ তুলে নেওয়ার ঘটনায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। এই ঘটনায় তারেক এহসান দায় দিয়েছেন সিটি মেয়র ভাহির এহসানের ছেলে ভিভিয়ান এহসানের ওপর। এর পরবর্তী ঘটনা এখনো স্পষ্ট নয় এবং অফিসিয়াল সূত্র থেকে কোনো নিশ্চিত বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
এই বলেই কেনীথ পুনরায় বিস্তৃত হাসল। পুনরায় সিগারেটে টান দিয়ে,নাক-মুখ দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ে। আনায়া হতে নজর সরিয়ে,তারেকের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মিস্টার এহসান! একদিন এই জানোয়ারটাকেই ভালোবেসে,আপনার মেয়ের কাঙাল হওয়া দেখার সৌভাগ্য যেন সবার আগে আপনারই হয়—তার জন্য আমার অজস্র আগাম শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন রইল।”
কেনীথের কথায় স্পষ্ট পরিহাসের ছাপ। তারেককে কটাক্ষ করতেই যে তার এমন মন্তব্য, তা আর কারোরই বুঝতে বাকি নেই। তারেক ধৈর্য হারিয়ে,দাঁতে দাঁত পিষে ফেলে। চোয়াল শক্ত করে, ক্ষিপ্ত চাহনি নিক্ষেপ করে। অথচ তার ভাবগতিকে, কেনীথ পুনরায় তাচ্ছিল্যের সরূপ হেসে ফেলে। ছন্নছাড়া উন্মাদের মতো, সিগারেট টেনে ধোঁয়া উড়িয়ে আওড়ায়,
“চলি কেমন! সভ্য-জাতি…ভালো থাকুন সবাই।”
এই বলেই সে শেষবারের মতো আনায়ার দিকে ফিরে তাকায়। আনায়ার বিধ্বস্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে কেনীথ মলিন হাসে। হয়তো এটাই তাদের শেষ দেখা। কিংবা না-ও হতে পারে। তবে অল্প দিনের মাঝে এই ছোট্ট মেয়েটা যেভাবে তার জীবনে ঝড় তুলেছিল,আজ সেভাবেই সবকিছু শান্ত হয়ে গেল। অথচ চারপাশটা পুনরায় হলো লন্ডভন্ড। কেনীথের মতে আনায়া জাদু জানে। সে এক মহাজাদু। যার কবল হতে সে কখনোই বাঁচতে পারেনি। প্রতিবার শুধু বরবাদই হয়েছে।
আনায়া কেনীথের চোখ-মিলিয়ে তাকিয়ে—অজান্তেই নিজের অশ্রুজল বিসর্জন দিচ্ছে। আজ যা ঘটেছে তা সে হয়তো মৃত্যুর আগ অব্দি ভুলতে পারবে না। জীবনে স্মৃতিতে হয়তো ভয়াবহ ট্রমা হয়েই রয়ে যাবে। আনায়া জানে না সে আজকের পর আদৌও কখনো আগের পর্যায়ে ফিরতে পারবে কিনা। তবে সে এইটুকু জানে, হয়তো আর কখনোই আজকের এই মিথ্যের জন্য নিজেকে ক্ষমা করতে পারবে না। লোকটা কেনো এমন তা আনায়া জানে না। কিন্তু সে যে মিথ্যে গুলো অনায়াসে বলল,এগুলোর জন্য কি আদৌও কখনো নিজেকে মাফ করতে পারবে?
আনায়া নিজের জামার দুপাশ হাতের মুঠোয় আঁকড়ে ধরে। এটা সে ঠিক করেনি। জানে না, এই খেলা এখানেই শেষ নাকি সামনে আরো বিস্তৃত হবে—তবে সে আজ মোটেও ঠিক কাজ করেনি। পারবে না সে, এতো সহজে সবটা ভুলে যেতে।
আনায়া কেনীথের দিকে চেয়েও থাকতে পারে না, আবার নজরও সরাতে পারে না। সে শুধু নিঃশব্দে কেঁদেই যায়। একটা পর্যায়ে কেনীথ তাকে খুব ভালোভাবে পরখ করে নেওয়ার পর, দীর্ঘ শ্বাস ফেলে চোখ বুঁজে নেয়। এবং আশেপাশে না তাকিয়ে সোজা ওখান থেকে বেড়িয়ে পড়ে। একটা সময় পর, অন্ধকারের মাঝে তার ছায়াটাও শূন্যে হারিয়ে যায়।
দরজায় নক্-নক্ শব্দ হতেই, ফারহান দরজাটা খুলে দেয়। চোখের সামনে ভেজা-সিক্ত বিধ্বস্ত কেনীথকে দেখে,ফারহানের চোখমুখ শুকিয়ে যায়। তবে কেনীথ তাকে দেখামাত্রই বিস্তৃত মুচকি হাসে। অদ্ভুত এক হাসিতে তার গাল ভড়ে ওঠে। তার এমন পাগলাটে ভাবভঙ্গিতে ফারহান হয়তো ভড়কায়।সে দরজার সামনে হতে সরে দাঁড়াতেই, কেনীথ ভেতরে প্রবেশ করে।
এটা আরাভের গেস্ট হাউজ। সবাই চিন্তিত ছিল বিধায়,চট্টগ্রামের এই গেস্ট হাউজে এসেই জড়ো হয়েছে। কেনীথ ভেতরে গিয়ে দেখে,তার বন্ধুদের মাঝে কম-বেশি প্রায় সকলেই আছে। কেনীথ নির্বিকার ভঙ্গিতে গিয়ে সোফায় বসে। মাথা ঝুঁকিয়ে দুপায়ের হাঁটুতে হাতের কনুই ঠেকায়। খানিকক্ষণ সময় নিয়ে অনবরত এলোমেলো শ্বাস ফেলে।
সামনে থেকে ইলহাম এগিয়ে এসে,বেশ অনুশোচনার ভঙ্গিতে হতাশায় দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলল,
“মাফ করে দে ভাই। পারলাম না, এতো চেষ্টা করেও পারলাম না। ওরা তোদের খবর কি করে পেলো,তাই মাথায় ঢুকছে না৷ সবকিছু এতো সিক্রেট ওয়েতে করার পরও,কিভাবে জেনে গেল?”
ইলহাম হতাশ হয়ে,মাথা নুইয়ে পাশে সোফায় বসে থাকে। কেনীথ তার কথায় মৃদু হাসে। পরক্ষণেই সকলের উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,
“তোদের কাছে কিছু হবে নাকি? মাথাটা ঝিমঝিম করছে। ওখান থেকে ফেরার সময় একটা সিগারেট নিয়ে বেড়িয়েছিলাম। দশটা মিনিট যেতে না যেতেই শেষ। মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল।”
কেনীথের ভাবভঙ্গি আসলেই অদ্ভুত। সকলেই তা বেশ ভালো মতোই লক্ষ্য করল। চেহেরার কি দশা! হাতে-মাথায় ব্যান্ডেজ, গায়ে কাঁদা-র’ক্ত। অথচ ভাবভঙ্গি এমন যেন,কিছুই হয়নি।
তার এমন পাগলাটে রূপ দেখে, শান খানিক দ্বিধাদ্বন্দ নিয়েই তার দিকে দুটো সিগারেট এগিয়ে দেয়। যা দেখে, কেনীথ বিদ্রূপের সহিত তির্যক হেসে আওড়ায়,
“একটা-দুটো সিগারেটে পোষায় না আমার। এমনিতেও আজ আর এসবে কাজ হবে না মনে হয়। অন্যকিছু থাকলে দে।”
কেনীথের কথার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে, সকলেই আবারও দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে যায়। ইলহাম খানিক রুক্ষ স্বরে বলল,
“পাগলামি করছিস কেনো?”
কেনীথ তার দিকে মুখ তুলে,তাচ্ছিল্যের স্বরে আওড়ায়,
“পাগলামি? আমি পাগলামি করছি?…হাহ্,তোদের কাছে না থাকলে বল, আমি চলে যাচ্ছি।”
তার ভাবগতিক পর্যবেক্ষণ করে, ইলহাম বলল,
“থাক, যেতে হবে না কোথাও।”
এই বলেই সে আরাভকে ইশারা করে। সে তার ইশারামতো, ভেতর থেকে গিয়ে দুটো হুইস্কির কাঁচের বোতল নিয়ে আসে। তা দেখে কেনীথ মৃদু হাসে। তৎক্ষনাৎ একটা হুইস্কির বোতল হাতে তুলে নিয়ে, তা শক্ত-হাতে খোলার চেষ্টা করে। এদিকে সবার মাঝে কেনীথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ফারহানের ভাবভঙ্গি খানিক অদ্ভুত। সে কোনো বিষয়ে চিন্তিত ও ভীত। আর তা যেন কেনীথের এমন উম্মাদের মতো ভাবভঙ্গিতে আরো বেশি দৃঢ় হয়।
এরিমধ্য কেনীথ আচমকা তার উদ্দেশ্যে বলে ওঠে,
“ফারহান! তোর মেয়ে বাড়ি ফিরেছে?”
কেনীথের এহেন কথায় আশেপাশের সকলের কপাল কুঁচকে যায়। ফারহানের চোখ-মুখ আরো বেশি কুঁচকে যায়। ক্ষণিকের জন্য চারপাশ নিস্তব্ধ হতেই,কেনীথ মুখ তুলে তার দিকে ফিরে চায়। পরক্ষণেই তির্যক বাঁকা হেসে,পুনরায় বোতলের ছিপির প্যাচ খুলতে থাকে। কিন্তু তার ভাব-গতিক এমন যেন,প্রয়োজনের চেয়ে সে প্রায় অধিক জোর দিচ্ছে। ফলে সকলকে চমকে দিয়ে, আচমকা শক্তপোক্ত কাঁচের বোতলের উপরের সরু অংশটা ভেঙে যায়। এটা যেন সম্পূর্ণ তার চাপা আক্রোশের জোরেই হলো।
মূহুর্তেই ফর্সা তালুতে চূর্ণবিচূর্ণ কাঁচের টুকরো গেঁথে র’ক্ত ঝড়তে থাকে। তার উপর ঝাঁঝালো হুইস্কি ক্ষতের চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। সকলে আঁতকে উঠলেও কেনীথ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। সে তার রক্তমাখা হাত হতে মেঝেতে ঝড়তে থাকা র’ক্তের ফোঁটা গুলো নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দেখতে থাকে।
এদিকে ফারহান আতংকে সম্পূর্ণ চুপসে গিয়েছে। আবারও সবাইকে অবাক করে দিয়ে,এবার সে কেনীথের পায়ের কাছে বসে পড়ে। এবং মাথা নুইয়ে তীব্র অনুশোচনা নিয়ে বলতে লাগল,
“মাফ করে দে ভাই। আমার মেয়েটা অনেক ছোট। যখন শুনলাম ওকে কেউ কিনডাপ করেছে,তখন আর মাথা ঠিক ছিলো না। কি করবো না করবো বুঝে উঠতে পারিনি।!
সকলেই ফারহানের দিকে বিস্ময়ের নজরে তাকায়। ইলহাম বিস্ময়ের স্বরে আওড়ায়,
” এসবের মানে কি? তারমানে তুই-ই সবকিছু…ওহ,শিট! কিভাবে পারলি গাধা? অন্তত আমাদেরকে তো জানাতে পারতি। কোনো না কোনো ব্যবস্তা করেই নিতাম। তাই বলে…”
—“সরি ভাই,আমার মাথা সত্যিই কাজ করছিল না। ওরা বলেছিল,মেয়েকে বাঁচাতে চাইলে যেন চুপচাপ ওদের কথা শুনি। আনায়া আর ভিভিয়ান কোথায় আছে,সবটা যেন বলে দেই।”
—“আর তুই সব বলে দিয়েছিস,তাই তো?…তোর মেয়েকে ওরা কখন কিডনাপ করে? ও ঠিকমতো বাড়িতে ফিরেছে তো?”
—“হ্যাঁ,ও বাড়িতে ফিরেছে। হয়তো যখন আনায়াকে পায় তখনই ওকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়। আর ওকে দুপুরের দিকে তুলে নিয়ে যায়। স্কুল ছুটির পর…”
ফারহান এই বলতে বলতেই,মাথা নুইয়ে ফেলে। ইলহাম সহ সকলেই মাথায় হাত চেপে বসে। কেনীথের ভাবভঙ্গিতে বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সে এখনো নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে মৃদু তির্যক হাসছে—নিজের হাতের দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে।
অন্যদিকে ফারহান নিজেকে খানিক তটস্থ করে, কেনীথের উদ্দেশ্যে বলল,
“ভাই,আমি জানি আমি কাজটা ঠিক করিনি। কিন্তু বিশ্বাস কর,আমি এটা ইচ্ছে করে করিনি। হঠাৎ করে ওমন পরিস্থিতিতে… কি করবো…কিচ্ছু বুঝতে পারিনি।”
কেনীথ ফারহানের দিকে নজর ফিরিয়ে তাকায়। তার শান্ত-শীতল চাহনিতেই যেন,ফারহান সবচেয়ে বেশি ঘাবড়ায়। এতোটা বিধ্বস্ত ভিভিয়ানকে সে আগে কখনো দেখেনি। অথচ ঠোঁটের কোণে এখনো তির্যক হাসির রেখা দৃশ্যমান।
—“না, ঠিকই আছে। আমি বলেছিলাম,আমার জন্য তোদের কোনো ক্ষতি হবে না। সেক্ষেত্রে তোদের পরিবারের কিছু হোক,তা কখনোই চাইবো না। তবে এতো ভালো এক্টিং-এরও প্রয়োজন ছিল না।”
কেনীথ এই বলেই নিঃশব্দে হেসে ফেললেও,ফারহানের চোখমুখ শুকিয়ে যায়। হ্যাঁ,কেনীথ ভুল কিছু বলেনি। রাতে যখন তারা জঙ্গলে আটকা পড়ে,তখন ইলহামের সাথে সাথে ফারহানও তার সাথে কথা বলছিল। অথচ কতটাই না স্বাভাবিক ভঙ্গিতে!
—“যাই হোক,যা হওয়ার হয়েছে। এবার সবাই আগের জীবনে ফিরে যা। আমার ছুটি ফুরিয়ে এসেছে। শুধু শুধু দুদিনের জন্য এসে তোদের ঝামেলায় ফেলে দিলাম। তবে যা করেছিস, তা কখনো ভোলার মতো না। অ্যাস ফ্রেন্ডস, ইউ আর অল টপ-নচ। বাট আনফরচুনেটলি, আই অ্যাম নট।”
—“এভাবে বলছিস কেনো। তুই কখনোই আমাদের জন্য…”
—“আই নো,আই নো,হোয়াট ডিড আই ডু। হোয়াট এভার, আমার প্রচন্ড ঘুম পেয়েছে। এখানে ঘুমানোর কোনো ব্যবস্তা আছে?”
—“হ্যাঁ,হ্যাঁ,অবশ্যই।”,কেনীথকে আশ্বস্ত করে আরাভ বলল। অন্যদিকে শান তার উদ্দেশ্যে বলে,
“হাত থেকে তো অনেক র’ক্ত পড়ছে। ওয়েট, আমি ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছি।”
—“না থাক,প্রয়োজন নেই।”
এই বলেই সে ফারহানের দিকে তাকায়। তার চোখমুখ এখনো শুকিয়ে আছে বিধায়,সে কিছুটা তাচ্ছিল্য সরূপ হেসে বলল,
“এখনো এভাবে মুড-অফ করে বসে আছিস? যা হওয়ার হয়েছে তো। পুরোনো বিষয় ঘেঁটে কি লাভ?”
—“তাই বলে…আচ্ছা তুই এখন কি করবি?”
—“আমি আবার কি করব?”,ফারহানের চিন্তিত অভিব্যক্তিতে,কেনীথ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে, ভ্রু উঁচিয়ে তাচ্ছিল্য সরূপ মৃদু হেসে বলল।
—“না মানে…আনায়াকে কি আবার কোনোভাবে…”
কেনীথ আনমনেই হেসে ফেলে। ফারহান হতে নজর সরিয়ে, আরেকটা হুইস্কির বোতল ক্ষ’তযুক্ত হাতেই তুলে নেয়। এবং তা খুলতে গিয়ে,বোতলের গায়ে বেশ অনেকখানি র’ক্ত মেখে যায়। তবে সে এবার শান্তভাবেই তা খুলে ফেলে। এবং সোজা তাতে মুখ লাগিয়ে,দুই ঢোক গিলে বলল,
“হয়তো অনেকদিন পর খাওয়া হচ্ছে।সরি,বাট এটা আমার পুরোটাই লাগবে।”
—“তাই বলে পুরোটা…”
—“কিছুই হবে না।”,আরাভের অভিব্যক্তিতে কেনীথ তাকে আশ্বস্ত করে। অন্যদিকে ইলহাম পুনরায় তার উদ্দেশ্যে বলল,
“কি করবি বললি না তো। এখন আবার কিভাবে আনায়াকে ফিরিয়ে আনবি?”
—“ওকে আর প্রয়োজন নেই।”
কেনীথের নির্লিপ্ততায়, ইলহাম বিস্ময়ের স্বরে বলল,
“মানে?”
—“মানে আর কি, হুট করে ভালো লাগলো,মনে হলো ওকে ছাড়া আমি আর বাঁচবো না,তাই তুলে এনেছিলাম। কিন্তু বাস্তবতায়—পৃথিবীতে কেউ কাউকে ছাড়া বাঁচেনি, এমন ঘটনা অত্যন্ত বিরল। আর এইক্ষেত্রে আমার মতো জা”নোয়ারের তো এসবের…কোনো প্রশ্নই ওঠে না! ওসব সভ্য মানুষের ব্যাপার-স্যাপার।”
—“তোর কি হুঁশ আছে,তুই কি বকছিস?”
—“হয়তো বা না! থাকলেও বা কি এসে যায়?”
—“তুই জানিস, তুই একটা পাগল! সাইকো তুই,পুরো এক সাইকোপ্যাথ। কি চাস,না চাস কিচ্ছু জানিস না। তোর পুরোটা জীবন বরবাদ হচ্ছে শুধু এই কারণেই। সারাক্ষণ উম্মাদের মতো ভাবনাচিন্তা করিস,অথচ নিজের অনুভূতি সম্পর্কেই খোয়াবহীন।”
—“হতে পারে!…আমি মানুষের সংজ্ঞার বাইরে।তোরা যেটাকে উন্মাদনা বলিস, আমার কাছে সেটাই মুক্তি। ওরা ভাবে, আমি অনুভবহীন। ভুল! আমি অনুভব করি, শুধু অন্যদের মতো নয়। আমার আনন্দ আসে বিশৃ”ঙ্খলায়;আমার শান্তি জন্মায় ধ্বং’সে।”
কেনীথ এই বলেই,পুনরায় নির্বিকার ভঙ্গিতে বোতলে মুখ লাগায়। অন্যদিকে ইলহাম বেশ ক্ষি’প্ত স্বরে বলে ওঠে,
“নাহ্,আর কিচ্ছু বলার নেই। নাউ ইউ আর টোটালি অ্যা সাইকো।”
তার কথায় কেনীথ নিঃশব্দে হেসে ফেলে। সোফায় হেলান দিয়ে,দুইহাত দুদিকে ছড়িয়ে দেয়। মাথাটা পেছনের দিকে হেলিয়ে চোখদুটো বুঁজে নেয়। পরক্ষণেই শান্ত-গম্ভীর স্বরে, নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে আওড়াতে লাগল,
“হ্যাঁ,আমি স্বীকার করছি,আমি একটা সাইকোপ্যা’থ। আমার অন্তর্লোক দীর্ঘকাল ধরে নিষ্প্রাণ। অনুভূতি আমার কাছে প্রাকৃতিক নয়,বরং শাসনযোগ্য উপাদান—যাকে আমি প্রয়োগ করি প্রয়োজনভেদে। মানবতা আমার কাছে ক্ষণস্থায়ী ধারণা। নৈতিকতা? তা তো নিছকই এক সামাজিক প্রহেলিকা। আমি অনুতাপ অনুভব করি না। কারণ আমার চেতনা অপরাধবোধে কলুষিত নয়—তা নির্মল! বিশুদ্ধ! নির্লিপ্ত!
আমি সহানুভূতিহীন, কিন্তু পর্যবেক্ষণে অসীম। আমি হৃদয় দেখি, বিশ্লেষণ করি, বিচ্ছিন্ন করি;যেমন শল্যবিদ অঙ্গচ্ছেদে নিখুঁততা খোঁজে,ঠিক তেমন! আমার প্রেম র’ক্তময়—ধ্বং’সাত্নক। আমার অনুরাগ আসে অধিকারবোধ থেকে,অনুভব থেকে নয়।
আমি বিশৃঙ্খলাকে ভয় পাই না—বরং তাতেই নিজেকে সংজ্ঞায়িত করি।ধ্বংস আমার কাছে অনাচার নয়, বরং নান্দনিক পরিণতি।
এক প্রকার সৌন্দর্যের শীর্ষরূপ।যেখানে ব্যথাও রূপান্তরিত হয় শিল্পকর্মে।
আমি জানি, আমি অসুস্থ। তবু এই বিকারই আমার আত্মপরিচয়।আমার উন্মাদনা যুক্তিবদ্ধ। আমার শূন্যতা স্থির—এবং এই নির্জন, অনিকেত অন্ধকারেই আমি সম্পূর্ণ।”
কেনীথ মুহূর্তের মাঝেই অর্ধেক বোতল খালি করে ফেলেছে। কথাবার্তায় খাপছাড়া ভাব।ইলহাম একপলক তাকে পরখ করে, রুক্ষ স্বরে বলল,
“তোর মাথায় কি চলছে বল তো? তোর কি মনে হয়,এখন এসব পাগলামি করে, পরে তুই আনায়াকে পাবি? ওর বাপ ওকে দুদিন যেতে না যেতেই বিয়ে দিয়ে দেবে।”
—“তো দিক না! আমি বাঁধা দিয়েছি? মেয়ে বড় হয়েছে বাপে বিয়ে দিবে, ভালো কথা। আমার মতো অসভ্যের ওখানে কি কাজ?”
—“ভিভিয়াননন…?”
—“ইলহাম! ডোন্ট ওয়াভ রিয়েক্ট।”
—“তোর মাথা ঠিক নেই। জানি বহু বছর পেরিয়েছে, কিন্তু সাথে যে তোর পাগলামির ধরনও কিছুটা পাল্টেছে তা আর বুঝতে বাকি নেই।”
কেনীথ চট করে চোখ খুলে,পুনরায় ঠিকঠাক ভঙ্গিতে বসে পড়ে। এবং সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে, বিজ্ঞের স্বরে আওড়ায়,
“হেই রিলাক্স,যাস্ট টেক ইজি।…ইট’স যাস্ট অ্যা নাইটমেরার। আমাদের সবার জীবনেই তো দুঃস্বপ্ন আসে। এটাও ঠিক তেমন।অ্যান্ড দিস ইজ দ্যা সেকেন্ড নাইটমেয়ার অব মাই লাইফ। দেখবি খুব তাড়াতাড়িই আমি এই সবকিছু ভুলে গিয়েছি। কারণ এই অসভ্য ভিভিয়ানটা তার অতীত মনে রাখে না।”
কেনীথ এই বলতে না বলতেই,পুনরায় উন্মাদনায় বিস্তৃত হাসে। আবারও হুইস্কির বোতলে মুখ লাগায়। এবার অবশ্য বিরক্ত হয়ে, তার পাশ থেকে ইলহাম উঠে এসে—বোতলটা একপ্রকার ছিনিয়ে নেয়।
—“যথেষ্ট হয়েছে…মরবি নাকি!”
—“নাহ্,বাবা বলেছে আমার মতো অমানুষেরা, ওতো সহজে মরে না।”
কেনীথ এই বলেই,পুনরায় মলিন হাসে। ইতিমধ্যে নেশা তার মাথায় চড়ে গিয়েছে। বহুদিন এসবের আশেপাশে যায় নি।আর আজ হঠাৎ একসাথে এতোখানি খাওয়ায়,যে কারোর মতো তারও অবস্থা নাজুক।
কেনীথ দু’হাত উড়ুতে রেখে,মাথা নুইয়ে নেয়। ঝিম ধ’রা চোখে, ফ্লোরের দিকে একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকে। কি যে চলছে তার মস্তিষ্কে,তা হয়তো সে নিজেই ভালো জানে। এই প্রশ্নটা তাদের বন্ধুদের মনেও জেগেছে। এতো সহজে সবকিছু মেনে নিবে,এমন বান্দা তাদের ভিভিয়ান নয়।
এরিমধ্য আচমকা কেনীথের ফোন বেজে ওঠে। কেনীথ হাতের পিঠ দিয়ে এলোমেলো ভঙ্গিতে, মুখটা মুছে ঠোঁট ভিজিয়ে সোজা হয়ে বসে। র’ক্তমাখা ক্ষ’ত যুক্ত হাতেই,কলটা রিসিভ করে। পাভেল কল করেছে।
—“হুম বল।”
—“কোথায় তুমি?”
—“জাহান্নামের দুইশো সাইত্রিশ নম্বর বাড়িটায় আছি। এটা আরাভের বাড়ি।”
তার এমন নির্লিপ্ত-নির্বিকার অভিব্যক্তিতে,তার আশেপাশে সকল বন্ধু খানিক কেশে ওঠে। অন্যদিকে পাভেল চোখ-মুখ কুঁচকে আওড়ায়,
“এ্যাহ,মানে…এসব কি…আচ্ছা যাই হোক,বাড়িতে আসো দ্রুত।”
—“কেনো কি হয়েছে?ওরা তো বলল আমার নাকি ফাঁসি-টাসি হবে না…ভেরী ব্যাড!”
কেনীথ এই বলেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে। অন্যদিকে পাভেল তার এসব বিষয় আমলে নেওয়ার তালে নেই। সে তড়িঘড়ি করে আওড়ায়,
“তোমার চাচা শ’য়তানি শুরু করছে। আর ফুপা তাতে পাগলামি করছে। তোমাকে নিজ চোখে দেখার জন্য, তোমার নূরজান অসুস্থ হয়ে যাচ্ছে। আর মামুনীর কথা কি বলব—ফুপাকে সামলাতে না পেরে সে নিজেই স্তব্ধ। প্লিজ যেখানেই আছো না কেনো, দ্রুত বাড়িতে আসো।”
একনাগাড়ে কেনীথ সবটা শুনে,কপালটা খানিক কুঁচকে ফেলে। আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ফোনটা কেটে দেয়। ফোনের সাথে র’ক্ত মেখে যাওয়ায়, সে তা নিজের প্যান্টের গায়ে কোনোমতে ঘষে নিয়ে,পরিষ্কার করে। এবং তৎক্ষনাৎ উঠে দাঁড়ায়। মূহুর্তেই চারপাশটা ক্ষণিকের জন্য থম মে’রে যায়।
—“কি রে তুই এই অবস্থায় কোথায় যাচ্ছিস?”
আরাভের প্রশ্নে, কেনীথ নিজেকে খানিক তটস্থ করে। এলোমেলো ভঙ্গিতে দরজাটার দিকে পা বাড়িয়ে বলে,
“যেতে হবে,বাড়িতে নাকি ফ্যামিলি ড্রামা চলছে।”
এই বলে সে চলে যেতেই নিয়েছিল। তবে আচমকা কি যেন ভেবে,বেশ বিরক্তি নিয়ে পেছনে ঘুরে তাকায়। হাতটার দিকে তাকিয়ে সবার উদ্দেশ্যে বলল,
“একটা কিছু দে তো। এটাকে এখনই না বাঁধলে। পরে মেজাজ আরো খা’রাপ হবে।”
ক্ষতযুক্ত হাতটায় কোনোমতে খানিকটা ব্যান্ডেজ প্যাচানো। সাদা ব্যান্ডেজটাতেও এতক্ষণে র’ক্ত ছড়িয়ে লাল হয়ে ভিজে উঠেছে। অথচ এই হাতেই সে সারাপথ ড্রাইভ করে বাড়ি ফেরে। চারপাশটায় অন্ধকার কাটিয়ে নতুন ভোরের আলোয় ফুটে উঠছে। তবে এখনো সূর্যের কোনো দেখা নেই। যেটাই হোক না কেনো,পুরোপুরি সকাল হওয়ার আগেই তাকে বাড়ি ফিরতে হবে। এই নতুন ভোরের আলো তার কাছে অসহ্যকর। তার অন্ধকারময় জীবনটা, কখনোই এই শুভ্র আলোয় স্বচ্ছ হতে পারে না!
কেনীথ বাড়িতে পৌঁছে দেখে, ড্রইং রুমে তার বাবা নানান পেপারস্ নিয়ে বসেছে। মা তার সোফায় চিন্তিত ভঙ্গিতে স্তব্ধ মূর্তির ন্যায় বসে। পাভেলেও সেথায় নিরুপায় হয়ে দাঁড়িয়ে। কেনীথ এগিয়ে গিয়ে শুরুতেই তাদের উদ্দেশ্যে বলল,
“নূরজান ঠিক আছে?”
হঠাইৎ তার কন্ঠস্বর শুনতে পেয়ে, পাভেল তার দিকে ফিরে তাকায়। কেনীথ ফিরেছে বিধায় সে স্বস্তি পেলেও,চেহেরার হালচাল দেখে সে বেশ অবাক।লালচে চোখজোড়া যেন এক কঠিন অসুখে পুড়ছে। হাত-মাথা হতে সর্বত্র ক্ষ’ত আর র’ক্তের ছাপ। হাতের ব্যান্ডেজ ভিজে তা হতে, টুপটাপ করে র’ক্ত ঝড়ছে।
পাভেল কিছু বলার আগেই,কাশফিয়া আর ভাহিদের নজর তার দিকে পড়ল। ভাহিদ তাকে একপলক দেখে নিয়ে,পুনরায় নিজের কাজে মনোযোগী হয়। অন্যদিকে কাশফিয়া তার অবস্থা দেখে বিস্ময়ে নজর ফেরাতেপারে না। সে উঠে কেনীথের কাছে এগিয়ে আসে। একপলক তাকে পরখ করে, বিস্ময়ের স্বরে বলল,
“এসব কি?”
কেনীথ শুষ্ক হেসে আওড়ায়,
“নাথিং…সে কোথায়? এখন তার কি অবস্থা?”
কেনীথ নূরজাহানের কথা জানতে চাইছে—তা কাশফিয়া তৎক্ষনাৎ বুঝে যায়।
“তোমায় দেখার জন্য পাগলামি করছিল। ঘুমের ঔষধ খেয়ে সবেমাত্র ঘুমিয়েছে।”
কেনীথ আশ্বস্ত হয়ে ভারী শ্বাস ফেলে।পরক্ষণেই মায়ের শুকনো মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি ঠিক আছো?”
—“ঠিক আর থাকতে দিলে কই?”
কাশফিয়ার নির্লিপ্ত অভিব্যক্তিতে,কেনীথ শুষ্ক হেসে বলল,
“অনেক খা’রাপ আমি, তাই না?”
কাশফিয়া কোনো উত্তর দেয়না। তার চোখের কোণায় জল চলে এসেছে। অন্যদিকে কেনীথ তার উদ্দেশ্যে আবারও বলল,
“থাক কিছু বলতে হবে না। বাই দ্য ওয়ে,কি হচ্ছে এখানে?”
কেনীথের এলোমেলো ভাবভঙ্গি-অভিব্যক্তিতে, কাশফিয়ার কপাল খানিক কুঁচকে যায়। সে সন্দিহান স্বরে তার উদ্দেশ্যে বলে,
“তুমি কি খেয়ে এসেছো?”
কেনীথ নিশ্চুপ। অন্যদিকে ভাহিদের নজর পুনরায় তার দিকেই পড়ে। সে কপাল কুঁচকে তার কাছে উঠে আসে। নির্লিপ্ত কেনীথকে আগাগোড়া পরখ করে, ভাহির গায়ের কাছটা জোরপূর্বক খানিক শুঁকে নেয়। পরক্ষণেই ক্ষিপ্ত ও বিস্ময়ের স্বরে বলে ওঠে,
“মদ খেয়ে এসেছো?”
কেনীথ ভারী শ্বাস ফেলে আওড়ায়,
“সামান্য হুইস্কি খেয়েছি…”
কেনীথের কথা শেষ হতে না হতেই, ভাহিদ অকস্মাৎ তার গালে সজোড়ে চ’ড় দিয়ে বসে। কেনীথ এতে কোনো প্রতিক্রিয়া না করে,দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে শান্ত রাখে।
—“বেরিয়ে যাও, এক্ষুনি বেড়িয়ে যাও এই বাড়ি থেকে। তোমার মুখ দেখতে চাই না আমি।”
ভাহিদের ক্ষিপ্ততায়, কাশফিয়া হতভম্ব। সে তাকে থামানোর চেষ্টা করতেই,ভাহিদ এবার তার উদ্দেশ্যে উচ্চস্বরে বলে উঠল,
“খবরদার, একটাও কথা বলবে না। খুব না জোর গলায় বলেছিলে,তোমার ছেলে ভালো হয়ে গিয়েছে। তাকে নিয়ে যেন একটুও উল্টোপাল্টা কথা না বলি,তা এসবই কি তোমার সুশীল ছেলের ভালো হওয়ার নমুনা?…জানো’য়ারটা বাড়িতে মদ খেয়ে ঢুকেছে। সবার সামনে আমার মান-সম্মান ধুলোয় মিশিয়েছে। আর কি বলবে বলো?”
কাশফিয়া তীব্র হতাশায় নিমজ্জিত হয়। তার যেন আর কিছুই বলার নেই। অন্যদিকে ভাহিদ কিছু সময়ের জন্য থেমে, আবারও অস্থির স্বরে তার উদ্দেশ্যে বলল,
“কাশফি,ওকে জিজ্ঞেস করো তো! ওর আর কি কি করা বাকি আছে? আর কি কি করলে,ওর এসব নিকৃষ্ট কর্মকাণ্ডগুলো থামবে? কবে এইসব অশান্তি থেকে মুক্তি দিবে আমায়? নাকি ও আমার ম’রা মুখ দেখতে চায়। আমি ম’রার পরই কি ও ক্ষ্যান্ত হবে?”
কেনীথ সবটা চুপচাপ দেখার পর, শেষমেশ শান্ত স্বরে ডাকে,
“বাবা…”
তার হয়তো আরো কিছু বলার ছিলো। কিন্তু ভাহিদ তাকে সেই সুযোগটুকুও না দিয়ে,পুনরায় ক্ষিপ্ত হয়ে বলল,
“খবরদার আমায় বাবা বলে ডাকবে না। আমি তোমার বাপ নই। তোমার মতো অমানুষ কখনোই আমার সন্তান হতে পারে না। তুমি শুধুমাত্র আমার পাপের ফল। জানি না জীবনে ঠিক কোন পাপ করেছিলাম,যার ফল হিসেবে তোমার মতো কুলাঙ্গার আমার কপালে জুটেছে।”
—“যথেষ্ট হয়েছে,ওর অবস্থা ঠিক নেই। ওকে ঘরে যেতে দাও।”
হঠাৎ কাশফিয়ার এমন জোর গলার অভিব্যক্তিতে,ভাহিদ বিস্ময়ের স্বরে বলে,
“তুমি এখনোও ওর পক্ষ… ”
—“পক্ষ-বিপক্ষের প্রশ্নই উঠছে না এখানে। আগের সব হিসেব না হয় বাদই দিলাম। সেক্ষেত্রে এটা বলো,এবার যা হয়েছে তার জন্য কি শুধু ও-ই দায়ী? মোটেও না, আমি এখানে শুধু ওর একার কোনো খা’রাপ কিছুই দেখছি না। আনায়াকে যতটুকু চিনি,তার চেয়ে বড় বিষয়—এবার আমি ওকে যেই রূপে দেখেছি,সেক্ষেত্রে আমার কখনোই মনে হয়নি, ও ওসব কথাগুলো ইচ্ছে করে বলেছে। পাভেলের কাছ থেকে তো সবটাই শুনলাম। দেখো গিয়ে, তারেকই ওকে… ”
—“কাশফি থামো তুমি। তোমার এইসব কথাবার্তার জন্যই সব বিগড়ে যাচ্ছে। আর কত অজুহাত দিবে? মানলাম ও-মেয়েকে তারেকই জোর করেছে শিখিয়ে ওসব বলিয়েছে। কিন্তু সে তো ভুল কিছু বলেনি। ওর ব্যাপারে যা বলেছিল তার সবটাই তোমার ছেলে স্বীকার করে পেপার্সে সাইন করে এসেছে। কই, একবারও ওর সাহস হয়েছিল গিয়ে গলা উঁচিয়ে ওসব স্বীকার করার? আর বাদবাকি রইল তোমাদের নিয়ে বলা কথাবার্তা গুলো…বিশ্বাস করো,কখনো কল্পনা করিনি ও তোমাদের ব্যাপারেও… যাই হোক,এখন আর কাউকেই বিশ্বাস হয়না। ঘরের শত্রু বিভীষণ হলে যা হয়।
তারেক ওর সুযোগ লুফে নিয়েছে। আমার পরিবারের ধ্বংস দেখতে চেয়েছিল,এখন তাই হবে। সব শেষ, এতো বছর ধরে আমার গড়া মান-মর্যাদা সবকিছু চুরমার।”
ভাহিদ এসব বলতে বলতেই,বেশ ক্লান্ত হয়ে যায়। আশেপাশে না তাকিয়ে পুনরায় কাগজ-কলম নিয়ে বসে। এদিকে কাশফিয়া কেনীথকে ইশারা করে নিজের ঘরে যেতে। তার নিজের মাথাটাও ঠিক নেই৷ কিসব চিন্তা-ভাবনায় হাত-পা অবশ হয়ে আসছে।
কেনীথ আর কথা বাড়ায় না। নির্বিকার ভঙ্গিতে দোতলার দিকে এগিয়ে যেতে পা বাড়ায়। এরিমধ্যে পেছন থেকে,ভাহিদ পুনরায় রুক্ষ স্বরে বলল,
“দাঁড়ায়ও!”
কেনীথ সিঁড়ি হতে পেছনের দিকে ফিরে তাকায়। ভাহিদ মুখ তুলে,তিক্ত স্বরে বলতে লাগল,
“তুমি দেশে থাকবে কি থাকবে না তা তোমার সিন্ধান্ত। তবে তোমাকে আমি শেষ একটা সুযোগই দেবো। যদি এই বাড়িতে থাকতে চাও,তোমার পিতৃপরিচয় নিয়ে বাঁচতে চাও কিংবা এই বাড়ির সদস্যদের সাথে শেষ সম্পর্কটুকু রাখতে চাও—তবে তোমার মাথায় যে বেহায়া ভুত চেপেছে, তা চিরতরে ঝেড়ে ফেলো।
কিছুটা হলেও তো তোমায় চিনেছি—তাই ওই বাড়ির মেয়ের চিন্তা, তোমার ঐ বিকৃত মস্তিষ্ক হতে উপড়ে ফেলাটাই মঙ্গলজনক। ওখানে লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে কি করেছো,তা হয়তো নিজেও জানো না। তাই বলছি,তোমার এসব বিকৃত ছেলেমানুষী, উন্মাদনায় করা কাজকর্মগুলো বন্ধ করো।
আর যদি তা না পারো, তবে ম’রে যেও। কারণ এসব করে তুমি বেঁচে থাকলে, অন্তত আমি আর বেশিদিন বাঁচবো না। আর তবুও যদি আমার কথা না শোনো,যদি সত্যই আমার ম’রা মুখ দেখার বিশেষ কোনো ইচ্ছে থাকে তোমার, তবে আজ স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছি—এই বাড়ির কোনো সদস্য যদি ম’রেও যায়, তবুও তুমি তার মুখ দেখতে পারবে না। সে অধিকার তুমি সারাজীবনের জন্য হারাবে। এককথায় তোমায় আমি তেজ্য করবো।”
কেনীথ দাঁতে দাঁত চেপে, নির্বিকারে কথাগুলো শোনে। পরক্ষণেই ভারী শ্বাস ফেলে, দোতলায় এগিয়ে যায়। নিজের উপর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ তার নেই। তবে সে এইটুকু জানে, এইমূহূর্তে রেগে গেলে প্রচন্ড বাজে কিছু হয়ে যাবে। শরীরে তীব্র ক্লান্তি এসে ভড় করেছে বিধায়, সে সরাসরি নিজের ঘরেই যায়।
এদিকে সিঁড়ির এককোণা হতে সবটাই দেখে রোজ। তার প্রচন্ড খা’রাপ লাগছে। সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগছে কেনীথের জন্য। এমন বিধ্বস্ত রূপে তাকে আবারও দেখতে হবে,তা হয়তো কল্পনাও করেনি। তবে রোজ আপাতত আর দেরি না করে,সোজা রান্নাঘরে চলে যায়। কেনীথের এই মূহুর্তে কিছু একটার প্রয়োজন। হয়তো বা এমনই ভাবনাতে।
ধীরে ধীরে হাত-পায়ের ব্যান্ডেজগুলো খুলে ফেলল। অতঃপর মাথার ব্যান্ডেজটুকু এলোমেলো ভঙ্গিতে টান দিতে গিয়ে, মাথাটা সম্পূর্ণ ধরে এলো। কেনীথ আর সহ্য করতে না পেরে,ধপ করে নিচে বসে পড়ে। বিছানার পাশে হেলান দিয়ে, মাথা চেপে ধরে। পরক্ষণেই আবার নিজেকে সামলে নেয়। আশেপাশে জিনিসপত্রের সাহায্যে, ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। একটা তোয়ালে নিয়ে, ঢুকে পড়ে বাথরুমে।
গায়ের ক্ষতস্থানগুলোতে পানির ছোঁয়া লাগতেই, তা যেন আরো তীব্র যন্ত্রনাদায়ক হয়ে,ভেতরের সর্বস্বকে দুমড়েমুচড়ে ফেলে। পানির সাথে জমাট বাধা র’ক্তগুলো, মিশে গিয়ে ধুয়ে যায় অনায়াসে।
কেনীথ দেওয়ালে দুহাত ঠেকিয়ে ভর দেয়। শাওয়ার ছেড়ে তার নিচে অনবরত ভিজতে থাকে। প্রতিবার ব্যাথার চোটে চোখ-মুখ কুঁচকে যায়। সবচেয়ে বেশি ব্যাথার কষ্টটা মাথায় হলেও, তার কাছে তা এখন খুবই নগন্য মনে হলো। কেননা বুকের বা-পাশটায় যে ব্যাথা জমেছে,তা যেন সবকিছুর চেয়েও তীব্র।
প্রায় বেশ খানিকক্ষণ সময় নিয়ে গোসল সেরে, কোমড়ে স্রেফ সাদা রঙের তোয়ালে পেঁচিয়ে, কেনীথ রুমে এলো। চুলগুলো এখনো ঠিকমতো না মোছার কারণে,ভিজে একদম টইটম্বুর। ফর্সা পিঠে পুরোনো সকল কালচে দাগগুলো যেন,পুনরায় তরতাজা হয়ে উঠেছে।
কেনীথ এলোমেলো পায়ে বিছানা অব্দি আসে। নেশায় মাথা ঘুরছে তার। না! এই অবস্থায়, ওসব ছাইপাঁশ ওতোটাও খাওয়া উচিত হয়নি। কিন্তু আফসোস করেও বা কি লাভ? যা হওয়ার তা তো হয়েই গিয়েছে। পাস্ট নিয়ে সময় নষ্ট করার মতো ব্যক্তি ভিকে নয়।
কেনীথ বিছানার একপাশে গিয়ে,মাথা ঝুকিয়ে বসে পড়ে। এরিমধ্যে আচমকা দরজায় শব্দ হয়। এক অল্প বয়সী রমণীর কাঁপা কন্ঠস্বর ভেসে আসে,
“ভাইয়া,আসবো?”
কেনীথ কপাল কুঁচকে পেছনের দিকে ফিরে তাকায়। রোজ এসেছে—হাতে গ্লাসে করে কিছু একটা নিয়ে। কেনীথ পুনরায় মুখ ফিরিয়ে বলল,
“আয়!”
রোজ ধীর পায়ে রুমে প্রবেশ করে। টেবিল ল্যাম্পের হালকা আলো জ্বলছে। বাদবাকি রুমের সব লাইটগুলো অফ করে রাখা। পুরোপুরি ভোর হয়নি বিধায়, রুমটা মোটামুটি এখনো বেশ অন্ধকার।
রোজ কেনীথের কাছে যেতেই, কেনীথের পিঠের কালশিটে দাগগুলো নজরে আসে। নিমিষেই অদ্ভুত এক করুণতায় তার ভেতরটা বিষিয়ে ওঠে। তীব্র কষ্টের দলা পাকিয়ে যায় তার শ্বাসনালীতে। কেবল মাত্র সে নিজের কান্নাটুকু আটকাতে পারে।
এদিকে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে থেকেও,কিছু বলছে না দেখে—কেনীথ তার দিকে নজর ফিরিয়ে রুক্ষ স্বরে বলল,
“কিছু বলবি?…কি এনেছিস এটা?”
রোজের ধ্যান ভাঙে। সে ইতস্তত স্বরে বলে,
“না,তেমন কিছুই না। এটা খেয়ে নাও। নেশা কেটে যাবে।”
এই বলেই সে কেনীথের দিকে লেবু-পানির গ্লাসটা এগিয়ে দেয়। কেনীথ সামান্য শুষ্ক হাসে। তার মা পাঠিয়েছে ভেবে,কেনীথ তা নির্বিকারে সম্পূর্ণটা এক নিমিষেই খেয়ে ফেলে। গ্লাসটা রোজের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
“এখন চলে যা। এসব বিষয় নিয়ে বেশি মাথা না ঘামিয়ে, ঠিকমতো পড়াশোনায় মনোযোগ দে। এমনিতেও আমি আর থাকছি না। তাই তোদের বিরক্ত হওয়ারও আর কোনো চিন্তা নেই।”
রোজ আর এই বিষয়ে কিছু চেয়েও বলতে পারে না। তার অনেক কান্না পাচ্ছে। একে তো শরীরের এই হাল। আবার বলছে চলেও যাবে। তবুও সে নিজেকে যথাসাধ্য সামলে নেয়। এদিকে কেনীথ এই অবস্থাতেও শুয়ে পড়ছে বিধায়, রোজ খানিক ঢোক গিলে,ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
“ভাইয়া,এভাবে শুয়ে পড়ছো যে? তোমার গায়ের ক্ষতগুলোর অবস্থা তো ভালো না। এখনই ব্যান্ডেজ না করলে…”
—“প্রয়োজন নেই ওসবের। তুই যা।”
—“এমন পাগলামি করছো কেনো? আরো অসুস্থ হয়ে যাবে।”
কেনীথ বিছানায় গা এলিয়ে চোখ বুঁজে নিয়েছিল। তবে আচমকা রোজের ভেজা কন্ঠস্বর শুনতে পেয়ে,সে তৎক্ষনাৎ কপাল কুঁচকে চোখ মেলে তাকায়।
“তুই কাঁদছিস কেন, গাধী। আচ্ছা যা গিয়ে ফাস্ট এইড বক্সটা নিয়ে আয়।”
রোজ নিজেকে সামলাতে পারছে না। এমনিতেও সে খুব শক্তপোক্ত স্বভাবের মেয়ে নয়। তবে প্রচন্ড অন্তর্মুখী স্বভাবের। তাই অগোচরে নিজের অনুভূতি সর্বদা লুকিয়ে রাখতে পারলেও, মাঝেমধ্যে এমন পরিস্থিতি এলে আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
সে কেনীথের কথামতো দ্রুত ফাস্ট এইড বক্সটা নিয়ে আসে। এদিকে কেনীথ পুনরায় বসে পড়েছে। রোজ নিজ হতেই, হাতের ক্ষতটা পরিষ্কার করে দিতে লাগল। কেনীথ অবশ্য কোনো বাধা দেয় না। সে আনমনে ভিন্ন কোনো চিন্তায় হারিয়েছে।
হাতের ক্ষতটুকু পরিষ্কার করতে গিয়েই,রোজের চোখ বেয়ে নিঃশব্দে অনবরত পানি ঝড়লো। পাগলের মতো হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে। তবুও নিশ্চিত কোনো কারণ বিহীন। অথচ পুরোটা সময় কেনীথের কোনো প্রতিক্রিয়াই নেই। আশেপাশে কি হচ্ছে না হচ্ছে, তাতে তার কোনো ধ্যান নেই। রোজ বাহুর ক্ষততে, এন্টি-সেফটিক লাগতে নিয়ে নিজেই আঁতকে ওঠে। অথচ কেনীথ তখনও নির্বিকার।
হাত আর বাহুতে দক্ষ-হাতে ব্যান্ডেজ করে দেবার পর, সে কেনীথের মুখের দিকে তাকায়। ঠোঁটের কোণায় খানিক ক্ষ’ত দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেই অব্দি কিছু করার মতো সাহস তার নেই। কি ছেড়ে কি করে ফেলবে,হয়তো তা নিজেও জানে না। সাহস করে যে আজ এইটুকু করতে পেরেছে, এটাই যেন তার কাছে অবিশ্বাস্য। তবে শুরুতে কেনীথের মাথায় ব্যান্ডেজ দেখেছিল বিধায়,সে শেষমেশ ভাঙা স্বরে জিজ্ঞেস করেই ফেলে,
“তুমি কি মাথাতেও ব্যাথা পেয়েছো?”
কেনীথ যেন তার কথাটা ঠিকমতো শুনতে পায়না। আনমনে শুধু আওড়ায়,‘হু’ এদিকে রোজ কি করবে বুঝে উঠতে না পেরে,শেষমেষ কেনীথের চুলে হাত ছোঁয়াতেই দেখে তা সম্পূর্ণটাই ভিজে। রোজ এতে বেশ অবাক হয়ে বলল,
“চুল তো সম্পূর্ণটাই ভিজে। এমন অবস্থায় ব্যান্ডেজ কিভাবে কি…আর চুল না শুকালে তো তোমার ঠান্ডা লেগে যাবে।”
এই পর্যায়ে কেনীথ যেন হুঁশে ফিরল। একইসাথে রুক্ষ স্বরে বলে উঠল,
“যথেষ্ট হয়েছে,এবার চলে যা।”
—“এভাবে বলছো কেনো? আমি তোমার ভালোর জন্যই বলছি।”
—“আগে বল,তুই ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদছিস কোনো? কিচ্ছু হয়নি তো আমার।”
—“আমি কোথায় কাঁদছি। আমি মোটেও কাঁদছি না।”
রোজ নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে। অন্যদিকে কেনীথ ভারী শ্বাস ফেলে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে,যা করার দ্রুত কর।”
এই বলতে না বলতেই,কেনীথের কপালে বিরক্তির ভাজ পড়ে। তার জন্য এভাবে কেউ কেনো কাঁদবে, এটা তার বুঝে আসে না। নিছকই এসব বিরক্তিকর।
এদিকে অনুমতি পেয়ে,রোজ তৎক্ষনাৎ বিছানার একপাশের কোণায় গিয়ে,হাঁটু গেঁড়ে উঠে বসে। উচ্চতায় সে বেশ খাটো। যথারীতি এমন লম্বাচওড়া মানুষটা বসে রইলেও,ঠিকমতো চুল মোছাটাও যেন খানিক কষ্টদায়ক।
কেনীথ আবারও নিজের ভাবনায় হারায়। অন্যদিকে রোজ নিজের মতো আলতোভাবে কাঁধ অব্দি ঝড়ানো চুলগুলো, মুছে দিতে লাগল। তবে এমন ঘন-ঝাকড়া চুলের মাঝে,আসল ক্ষতের স্থানটাই সে খুঁজে পায়না। পরক্ষণেই দেখে, মাথার পেছনে বেশ খানিকটা জায়গাজুড়ে, র’ক্ত জমাটের ন্যায় ক্ষতস্থানের দেখা মিলেছে। রোজ তাতেই যেন প্রচন্ড বিস্ময়ে আঁতকে ওঠে। তার সাহস হয়না, এমন জায়গায় হাত দেওয়ার। তবুও কাঁপাকাঁপা হাতে প্রচন্ড যত্নের সাথে জায়গাটা পরিষ্কার করে দেয়। মাঝেমধ্যে কেনীথের মৃদু নড়চড়ে যেন,তার চেয়ে বেশি ব্যাথা রোজ নিজে অনুভব করে। সে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে পুরোটা কাজ মনোযোগ দিকে করল। একই সাথে ব্যান্ডেজ করে দেওয়ার সময়, সতর্ক হতে কেনীথের উদ্দেশ্যে বলল,
“ব্যাথা লাগছে?”
—“হু!”
—“কোথায়,আই’ম সরি। আগে বলবে তো…”
—“এখানটায় ব্যাথা লাগছে। বুকের বা-পাশটায় অজানা যন্ত্রণায় দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে।”
আনমনে নির্লিপ্ত স্বরে বলা কেনীথের এহেন কথায়, রোজের হাতজোড়া থেমে যায়। অন্যদিকে কেনীথ পুনরায় বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়,
“ওর এমনটা করা মোটেও উচিত হয়নি। একদমই না। অন্তত একটা বারের জন্য, সুযোগ দিতো আমায়। আমিও প্রমাণ করে দিতাম,এই অমানুষ-জানো’য়ারটাও ভালোবাসতে জানে। কিন্তু নাহ্! ও ওর কথা রাখলো না।”
রোজ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে। তার অশ্রুজলও শুকিয়ে এসেছে। সে এখন বাকরূদ্ধ। অবশ্য বলবেই বা কি? তার কি বলার আছে? জেনে বুঝেও সেই মরীচিকার পেছনে ছুটছে,যার মনে হয়তো কখনোই তার জন্য বিন্দুমাত্র বিশেষ জায়গাটুকু হবে না।
খানিকক্ষণের জন্য চারপাশে পিনপতন নীরবতা জমতেই, কেনীথ ভারী শ্বাস ফেলে নিজেকে তটস্থ করে। অনেক হয়েছে তার মাতালের মতো বকবকানি। এবার একটা গভীর ঘুম দিতে হবে। তা ছাড়া আর উপায় দেখছে না। সে নিশ্চিত, এক ঘুমেই সে হয়তো সবটাই ভুলে যাবে। হ্যাঁ,সবটাই। হয়তো আনায়া নামক দুঃস্বপ্নকেও।
এই আশাতেই, কেনীথ এবার নড়েচড়ে বসে। রোজের উদ্দেশ্যে বলে,
“তোর কাজ শেষ হয়েছে?”
রোজ তৎক্ষনাৎ তটস্থ হয়ে আওড়ায়,
“হ্যাঁ,এই তো শেষ।”
ব্যান্ডেজটা ভালোমতো বেঁধে দিয়ে,সে বিছানা হতে নেমে পড়ে। কেনীথের এই অর্ধনগ্ন রূপ তার কোমল নারীমনে নানান অনুভূতি সৃষ্টি করলেও, সে নিজেকে দমিয়েছে নানান সব বাহানায়। থাক যথেষ্ট হয়েছে,এই মূহুর্তে কেনীথের তার প্রয়োজন ছিলো, সে তার দায়িত্বটুকু মিটিয়েছে। এরচেয়ে বেশি ভাবনাচিন্তা না আনাটাই ভালো। রোজ আর কথা না বাড়িয়েই,সোজা রুম হতে বেড়িয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। তবে কিছুপথ যাবার পর,হঠাৎ পেছন হতে কেনীথ বলে ওঠে,
“ঐ ছুটকি,ধন্যবাদ। যাওয়ার সময় দরজটা লাগিয়ে দিস।”
এই বলেই কেনীথ বিছানায় গা এলিয়ে দেয়। অন্যদিকে রোজ না চেয়েও এবার খানিক হেসে ফেলে। রুম থেকে বেরিয়ে, দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে, বিড়বিড়িয়ে তাচ্ছিল্যের সরূপ হেসে আওড়ায়,
“ছুটকি?”
রোজ নিজের রুমে এসে দরজাটা বন্ধ করে দেয়। এবার সে কাঁদবে। নিঃশব্দে অঝোরে কাঁদবে। এই কান্নার নেই কোনো মূল্য, নেই কোনো কারণ। কোথায় যেন শুনেছিল,কাঁদলে মন হালকা হয়। তাই হয়তো কাঁদবে। যথারীতি বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখ গুঁজে, অঝোরে কাঁদতেও তার খুব বেশি একটা সময় লাগল না। একইসাথে সে হারিয়ে গেল নিজের কল্পনার দুনিয়ায়। যেখানে একপাক্ষিক ভালোবাসাগুলো, নিজেদের কল্পিত সুখ খুঁজে নেয়।
অন্যদিকে কেনীথ বিছানার উপর
এলোমেলোভাবে হাত-পা ছড়িয়ে—উপর হয়ে শুয়ে। সে আবছা আলোয় ঝাপসা চোখে, নিজের সম্মূখে কাউকে দেখতে পায়। এই তো তার থেকেই খানিকটা দূরে, নিঃশব্দে দাড়িয়ে রয়েছে এক রমণী। কেনীথ তাকে নিমিষেই চিনে ফেলে,এবং নেশাগ্রস্ত স্বরে আওড়ায়,
“এখানেও চলে এসেছিস? তুই আসলেই জাদু জানিস।…তোর মায়া মহাময়া। আর আমি সেই মায়ায় আবারও ফেঁসে গেলাম। এভাবে না ফাঁসালেও পারতি। দেখ এক রাতেই আমার কি হাল হয়ে গিয়েছে।”
সে কিছুক্ষণের জন্য থামে, পরক্ষণেই এলোমেলো স্বরে আনায়াকে পরখ করে গায়,
“পাল পাল জীনা মুহাল মেরা তেরে বিনা,
ইয়ে ছারে নাশে বেকার, তেরি আঁখোঁ কে সিওয়া।
ঘর নাহি যায়তা মেঁ বাঁহার,রেহতা তেরা ইন্তেজার।
মেরে খোয়াবো মে আ না কারে, সোলোহ সিংগার।
মে আব কিউ হোশ মে আতা নাহি্।
সুকুন ইয়ে দিল কিউ পাতা নাহি।
কিউঁ তোরু খুদ সে যা থে ওয়াদে,
কে আব ইয়ে ইশ্ক নিব্হানা নাহি।
মেঁ মোরুঁ তুম সে যা ইয়ে চেহরা,
দোবারা নাজার মিলানা নাহি!
ইয়ে দুনিয়া জানে মেরা দার্দ,ন
তুঝে ইয়ে নাজার কিউ আতা নাহি!
সোহনেয়া ইউঁ তেরা শারমানা মেরি জান না লেলে
কান কে পীছে জুলফ ছুপানা মেরি জান ক্যা…যা ভাগ এখান থেকে। মেজাজ খারাপ করতে এসেছিস।”
এতক্ষণ মিটমিট করে হাসতে রইলেও,আচমকা তার রেগে যাওয়াটা যেন অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং সে যে এখনও নেশায় ডুবে আছে,তা আরো স্পষ্ট হয়।
কেনীথ পরক্ষণেই আবার বিস্তৃত মুচকি হাসে।চোখজোড়া আপনা-আপনিই বন্ধ হয়ে আসছে। সে তার কল্পিত আনায়াটাকে একপ্রকার অবজ্ঞা করেই, চোখজোড়া বুঁজে নেয়। এবং বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়,
“তুই কাঁদবি তারা! তুই কাঁদবি!”
সকাল হয়ে গিয়েছে, অথচ দরজা-জানালা বন্ধ করে,আনায়া ঘরে চুপচাপ বসে রয়েছে। পর্দাগুলোও টেনে রেখেছে যেন ঘরে কোনোপ্রকার আলো না প্রবেশ করে। সে চায় না এই নতুন সকাল। চায় না নতুন দিনের আলোয় পুনরায় তার দুনিয়াটা আলোকিত হোক। কেননা দিনশেষে তো জীবনটা তার অন্ধকারেই ডুবে রয়ে যায়।
সবসময় অন্ধকারে ভীত হয়ে থাকা আনায়া এখন অন্ধকারে বসে বসে নিঃশব্দে চোখের জল ফেলছে। টেবিল ল্যাম্পের হালকা মিটমিটে আলোয়, সম্মূখের দেয়ালে টাঙ্গানো বিশাল আকৃতির ক্যানভাসটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কালো ভ্রু-মোটা ডার্ক রেড পাখিটা, বেশ গম্ভীর মুখ করে,তীক্ষ্ণ নজরে তার দিকে তাকিয়ে। যার নিচে বড়সড় করে লেখা ‘I ❤️ RED’। আনায়া তার দিকে তাকিয়ে আরো তীব্রভাবে ফুঁপিয়ে ওঠে।
মাথা থেকে সরছে না। কিছুতেই সরছে না ঐ গম্ভীরমুখো উন্মাদ লোকটার কথা। ক্ষণিকের জন্য কেনো এলো সে তার জীবনে। এমন পাগলাটে মানুষটার কি প্রয়োজন ছিলো? সবকিছু লন্ডভন্ড করে দিয়ে গেল। এখন সে কিভাবে আবার স্বাভাবিক হবে? কবেই বা স্বাভাবিক হতে পারবে? কিচ্ছু জানে না, কিচ্ছু না।
আনায়া রেডের দিকে তাকিয়ে, কাঁদো কাঁদো স্বরে আওড়ায়,
“সরি মিস্টার রেড। আই’ম রিয়েলি সো সরি। আমি কখনোই চাইনি, আপনার সাথে ওমন কিছু হোক। আমি একদমই ঠিক করিনি। একদমই না।”
এই বলতেই সে,দু’হাতে একত্র করে তাতে মুখ গুঁজে কাঁদতে থাকে। খানিকক্ষণ আগে বাড়িতে এলেও,সেভাবে কারো সাথেই তার কথা হয়নি। মা-কে বলেছে,তার এখন বিশ্রামের প্রয়োজন। অথচ এখন সে নিজেকে কোনোমতো সামলাতেই পারছে না।
—“হেই ব্লাড! কাঁদছিস কেনো?”
কানের কাছে আচমকা কারো কন্ঠস্বরে আনায়া চমকে ওঠে। তৎক্ষনাৎ পাশে মুখ ফিরিয়ে দেখে, কালো রঙের হুডি-প্যান্ট পড়া এক বলিষ্ঠ দেহের ব্যাক্তি,তার পাশেই বিছানায় কাত হয়ে শুয়ে আছে। যে আর কেউ নয়, বরং তারই মিস্টার রেড তথা ভিভিয়ান এহসান।
‘Nara.. Naa.. NAaaa.Naaaa..Naaa.. Na
Na Ra Na Ra Ne Na Ra Na Na Ra Na Ra Na NanaNara Nara Nara Nara
Nara Ne…
Jhuki Teri Palkon Mein
Mil Jaaye Mujhe Panaah______
Palke Gire Aasu Bhari
Reh Jaaye Mere Nishaan______
Tute Dil Ki Mat Kar
Tu Fikar Mere Hamnawa____
Pyaar Du Tujhko Is Kadar
Reh Jaaye Mere Nishaan____
Mere Nishaan..Mere Nishaan Mere Nishaan… Mere Nishaan_______’
আনায়া বিস্ময়ের নজরে তার দিকে তাকিয়ে থাকে।অথচ সে তখন নির্বিকার ভঙ্গিতে গাইছে। আনায়া পরখ করে দেখে,লোকটার মাথায় সাদা রঙের ব্যান্ডেজ বাঁধা—চুলগুলো এবারও বরাবরের মতোই এলোমেলো। অথচ ঠোঁটের কোণে তীক্ষ্ণ এক হাসি ঝুলিয়ে, একহাতে মাথা ঠেকিয়ে শুয়ে আছে। কিন্তু উনি এখানে কেনো আর কিভাবে?”
—“আআআ…আপনি এখানে? কিভাবে এসেছেন?”
—“আমি না তোর সাথেই ছিলাম। গেলামই বা কখন?”
—“আপনি এমন করছেন কেনো?”
—“কি করছি আমি?”
—“কেনো আমায় কষ্ট দিচ্ছেন?”
—“তুই কষ্ট পাচ্ছিস? কার জন্য,আমার জন্য? তাহলে ঠিক আছে। আমার জন্য কষ্ট পাওয়া জায়েয আছে তোর।”
—“কি চান আপনি?”
—“যা চেয়েছিলাম, তা তো দিলি না।”
আনায়া তার নির্লিপ্ত অভিব্যক্তিতে, খানিকক্ষণ সময় নিয়ে, ইতস্তত স্বরে আওড়ায়,
“ভালোবাসেন আমায়?”
—“যা বলার,তা তো তখনই বলেছিলাম। এতো দ্রুত ভুলে গিয়েছিস?”
মিস্টার রেড বিস্তৃত হেসে, উঠে বসে। আনায়ার দিকে ক্রমশই এগিয়ে আসে। আনায়া ভীতু হয়না বরং খানিক সংকুচিত হলো। রেড আলতোভাবে আনায়ার গালে আঙ্গুল ছোঁয়ায়। আঙ্গুলের পিঠের উল্টো পাশ দিয়ে, তার নিজস্ব ভঙ্গিতে আনায়ার ফোলা ফোলা বা’ম গালটায়,হাত বুলিয়ে দেয়।
—“ব্লাড!”
—“হু…”
গম্ভীরমুখো রেডের নরম কন্ঠস্বরে,আনায়া সহসাই সাড়া দেয়। এবার অবশ্য সে তার চোখে-চোখ মিলিয়েছে। তবে আনায়ার চোখজোড়া ভেজা রইলেও,আনায়ার রেড সম্পূর্ণ নির্বিকার।
এদিকে রেড কথা না বাড়িয়ে,আনায়ার দিকে ক্রমশই এগিয়ে আসে। আনায়া খানিক হেলে পড়লেও,বিছানায় হাতের সাহায্য ভর দিয়ে নিজেকে সামলায়। অন্যদিকে রেড আচমকাই তার বাম পাশের গলার ভাজে মুখ ডুবিয়ে দেয়। আনায়া চোখজোড়া আবেশে বুজে নিতেই, তৎক্ষনাৎ দু’বার সে একইভাবে আনায়ার গলায় নিজের খোঁচা-খোঁচা দাড়ি-গোঁফময় গালটা ঘষে দেয়। নিমিষেই আনায়া চমকে, অজানা এক শিহরণে কেঁপে ওঠে।
আনায়া তৎক্ষনাৎ চোখজোড়া খুলতেই দেখে আশেপাশে কেউ নেই। সে নিমিষেই আঁতকে ওঠে। ছুটে গিয়ে,রুমের লাইটগুলো জ্বালিয়ে দেয়। বিস্ময়ে তার চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। এসব কি হচ্ছে তার সাথে? এরিমধ্যে পাশ থেকে আবারও একই শীতল-শান্ত কন্ঠস্বর শুনতে পেয়ে আনায়া ফিরে তাকায়।
—“এইটুকুতেই এই অবস্থা? ফিউচারে এই অসভ্যটাকে কি করে সামলাবি?”
আনায়া তাকিয়ে দেখে,তার থেকে খানিকটা দূরেই আলমারির সাথে হেলান দিয়ে,বুকে দু’হাত গুঁজে খানিক বাঁকা হয়ে—দাঁড়িয়ে আছে ভিভিয়ান এহসান। পুনরায় সে একই তির্যক হাসিতে মেতে উঠেছে। আনায়া তার উদ্দেশ্যে করুন স্বরে বলে ওঠে,
“চলে যান আপনি,প্লিজ চলে যান।”
—“চলে যাবো বলছিস?”
সে ভ্রু উঁচিয়ে এহেন কথা বলতেই,আনায়া পুনরায় থমকে যায়। পাগলের ন্যায় আচমকাই আবার মাথা নাড়িয়ে সুধায়,
“না,আপনি যাবেন না। আপনি এখানেই থাকুন।”
—“কি আশ্চর্য, একবার যেতে বলছিস তো, একবার থাকতে বলছিস। ঠিক করে বলতো, কি করবো?”
—“আপনি আমায় পাগল কেনো করছেন, তা বলুন! আমি তো আপনাকে ঠিকমতো চিনিও না।”
—“হ্যাঁ,সেটাই তো। তাহলে তুই কাঁদছিস কার জন্য? এই অচেনা আমিটার জন্য?”
—“না, আমি আপনার জন্য…না,আমি কিচ্ছু জানি না। আপনি আমার চোখের সামনে থেকে দূর হয়ে যান।”
আনায়া এই বলেই নিজের মাথাটা দু’হাতে চেপে ধরে। শ্বাসকষ্ট হচ্ছে তার। দ্রুত সে আশ’পাশটা খুঁজতে লাগল। ইনহেলার কোথায় রেখেছে মনে পড়ছে না। অথচ পাশ থেকে তার কল্পিত উন্মাদ প্রেমিকটা বলে উঠল,
“ঐ টেবিলের ড্রয়ারে দেখ।”
আনায়া পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখে,সে এখনোও নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। যথারীতি আনায়াও তার উদ্দেশ্যে বেশ রুক্ষ স্বরে বলে ওঠে,
“জানি আমি,বিরক্ত করবেন না আমায়। আমি এটাও জানি,আপনি শুধুই আমার কল্পনা। আপনি তো এটাই চাইছিলেন, তাই না? যেন আমি পাগল হয়ে যাই। আমি কষ্ট পাই,কান্না করি! নয়তো আপনি তখন আমায় ওসব কথা বলতে না। দেখুন,কি অবস্থা করেছেন আমার। অথচ আপনাকে আমি…আপনাকে…”
—“আমাকে কি?”
—“কিচ্ছু না, অসভ্য লোক! চলে যান এখান থেকে।”
আনায়ার কল্পিত মানুষরূপী পাখিটা পুনরায় বিস্তৃত হেসে ফেলে। আনায়ার উদ্দেশ্যে এবার, শেষবারের মতো আওড়ায়,
“খুব বেশি বির’ক্ত করবো না তোকে। তবে হ্যাঁ,তুই আমার জন্য ঠিকমতো কাঁদছিস কিনা তা দেখার জন্য,নিয়ম করে প্রতিবেলায় চলে আসবো।”
মহামায়া পর্ব ১৩
—“আপনার কি মনে হয়,আমি আপনার জন্য কাঁদব? না আমি কাঁদব না। আর কেনোই বা কাঁদব? কে আপনি, হ্যাঁ?”
মিস্টার রেড আর কিছুই বলে না। সে ভারী শ্বাস ফেলে,নিঃশব্দে মৃদু হেসে আওড়ায়,
“তুই কাঁদবি, আনায়া! তুই খুব করে কাঁদবি—শুধুমাত্র এই আমিটার জন্যই।”
এই বলেই, আচমকা সে উধাও হয়ে গেল। আনায়া আবারও দিশেহারা হয়ে যাচ্ছে।কয়েকবার ইনহেলারে মুখ চেপে,জোরে জোরে শ্বাস টেনে নেয়। পরক্ষণেই নিজের নিস্তেজ শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দেয়। চোখের কার্নিশ বেয়ে অনায়াসে গড়িয়ে পড়ে একফোঁটা অশ্রুজল। এবং সে মন্থর কন্ঠে বিড়বিড়িয়ে আওড়ায়,
“আমার মুক্তি চাই।”
