চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮৩
ইশরাত জাহান জেরিন
সুমন মায়ের চিঠিখানা পড়া শুরু করল। তাতে করুন করে লিখা,
আমার মানিক,
আমার কাছে খোদার যদি কোনো নিয়ামত হয় সেইটা বাজান তুই। মুরব্বিরা কইতো কি জানোস? জীবনে কোনো ভালো কাম করলে আল্লাহ তার বান্দারে নিরাশ করে না। আমি মনে হয় কোনো না কোনো ভালা কাম করছিলাম। নইলে আমার মতো পাপীর ঘরে তোর মতো বাজান কী খোদায় পাঠাইতো? খোদার শুকরিয়া করার মতো জবান আমার মতো মূর্খের নাই। জীবনে কম দুঃখ করি নাই। এত দুঃখ দেখছি যে দুঃখেরও আর দুঃখ লাগত না। তোরে পেটে নিয়া কম মাইনষের দুয়ারে দুয়ারে পেটের দায়ে ঘুরি নাই। কেউ কেউ আমার দুঃখ দেইখা কী কইতো জানোস? কইতো চিন্তা কইরেন না। বাচ্চাটা হোক, বাচ্চাটারে মানুষ করবার পারলে ভাগ্য খুলব। খোদায় লোকের কথা ফলাইয়া দিলেন। এক ঝড়ের রাতে, আমার জীবনের সব ঝড় দূর কইরা তুই আসলি।
আমার জীবনের একটা দুঃখ থাইকা যাইব জানোস তা কী? তোর বাপ আমারে ভালোবাসল না। কালো রঙের ওপর ঘৃণা জন্মাইছিল আমার। মাঝে মাঝে আয়নার সামনে দাঁড়াইয়া মনে কইছিল, শরীরের চামড়া উঠাইয়া ফেলি। এই কালো রঙের লাইগা দুনিয়া আমারে শেষ কইরা দিলো। তুই তখন আইলি, তোর লগেও যখন একই অন্যায় হইল তখন আর চুপ কইরা থাকতে পারলাম না। তোর বাপে বাইর কইরা দেওয়ার পর আমি আর বাড়িতে ফিরিনাই। একদিন কানে আইছিল তিনি নাকি বিয়া করছে। বউ অনেক সুন্দর। আমি সেদিনও তারে অভিশাপ দেই নাই, আমি তো সুখী হইবার পারলাম না, অন্তত ওই মাইয়া সুখী হোক যে আমার জায়গায় আসছে। তারপর তুই আস্তে আস্তে বড় হইলি। একদিন আমার হাত ধইরা পালোয়ান বাড়িতে নিয়া গেলি। যেই বাড়ি ছাড়ছি আমি বহুদিন আগেই। তোর বাপের নতুন বউটা মরল তার কিছুদিনের মাথায়। ওইঘরে পোলা সুমন তখন ছোট। নিজের আরেকটা পোলা মনে কইরা ওই বাচ্চাটারে বুকে জড়াইয়া নিলাম।যখন দেখতাম সৎ ভাইয়ের জন্যও তোর এত বুক পুড়ে তখন আমার পরাণ জুড়াইতো। এমন একখান সন্তানই তো আমি চাইছিলাম।
যারে কেউ ভালো না বাসলেও সে সবাইরে ভালোবাসতে পারে। সেই পোলায় তার মায়রে সুখে রাখতে গিয়া তামাম দুনিয়ার বেবাক মানুষের রহুতে চট দিয়া গেল। আমি জানি তুই বাজান আমারে কতখানি ভালোবাসোস, তাই কোনোদিন কইবার পারি নাই, তুই যেই চাদর মুখের ওপর দিয়া রাখছিলি সেইটা তো আম্মার চোখে বহু আগে উঠলেও সে বুঝবার দেয় নাই। তোর হাতে তোর আব্বার রহু গেছে, তার বউয়ের রহু গেছে তাও তোরে ঘৃণা করবার পারি নাই। তোরে আম্মায় পেটে ধরছি, তোর চোখে জল দেখবার পারুম না বাজান। আমার অনেক শখের পোলা তুই। তোর সব পাপেরে এক পাশে রাইখা আমি আমার নিষ্পাপ মানিকরে ভালোবাসছি,সবসময় বাসমু। শরীরটা আজ-কাল ভালো যাইতাছে না। আজ-কাল স্বপ্নে খালি সাদা পর্দা দেখি। কখনো কখনো তোর নানা-নানি আসে। আমারে কয়, জলদি নিয়া যাইব এই পাষাণ দুনিয়া থাইকা। তোরে মুখে তো এইসব কওয়ার সাহস হইব না। সুমনরে দিয়া তাই চিঠিখানা লেখাইয়া রাইখা গেলাম।
আমার অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু যদি হইলে যেন সে তোরে এই চিঠিখানা দেয়। তাইলেই চলব। আমার চিঠির একটাই উদ্দেশ্য যাতে তোর কোনোদিন মনে না হয়, আম্মায় তোর খালি ভালোদিকটাই জানত, ভালোদিকটারেই তাই ভালোবাসছে। নারে বাজান তুই আমার পেটের ধন। তোর ভালো,খারাপ সবই আমার। আমি আমার বাজানের ওই রূপটা কেমন কইরা পর করমু যেই রূপটা পেটের দায়ে তৈরি হইছি, গায়ের কালো রঙের কারণে তৈরি হইছে? জীবন নিয়া বাঁচার জন্য তৈরি হইছে। শেষে তোরে একটা কথাই বলতে চাই, তুই বাবা ভালো থাকিস। আম্মায় তোরে বহুত ভালা পাই বাজান।
তোর আম্মা
চিঠির শেষ লাইনটা পড়তে গিয়ে সুমনের হাত কাঁপছিল। চিঠিটা ধীরে ধীরে সোহানের হাতে তুলে দিল সে। সোহান প্রথমে নিতে চাইছিল না। তার আঙুল কাঁপছে। বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত শব্দ করছে।
শেষ পর্যন্ত সে চিঠিটা নিল। প্রথম লাইনটা পড়তেই তার চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। “আমার মানিক…”
এই দুটি শব্দ তার বুকের ভেতর জমে থাকা সব শক্তি ভেঙে দিল। সোহানের ঠোঁট কাঁপতে লাগল। সে আবার প্রতিটি লাইন দেখা শুরু করল। প্রতিটা লাইন, প্রতিটা স্মৃতি… মায়ের কষ্ট, অপমান, দুঃখ… সব হুড়মুড় করে তার সামনে দাঁড়িয়ে গেল। ঝড়ের রাত।
ক্ষুধার দিন। দুয়ারে দুয়ারে ঘোরা। কালো রঙের জন্য অপমান। সোহানের চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল কাগজের ওপর। সে বিড়বিড় করে বলল
“আম্মা… তুমি এগুলা একা সহ্য করলা…?”
তার গলা ভেঙে আসছে। চিঠির সেই জায়গায় এসে যখন পড়ল, “তোর হাতে তোর আব্বার রহু গেছে…”
হঠাৎ তার বুকের ভেতর কিছু একটা বিস্ফোরিত হলো।
তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। তার হাত কাঁপতে লাগল এতটাই যে কাগজটা প্রায় ছিঁড়ে যাচ্ছিল। চোখের পানি আর আটকানো গেল না। হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল সোহান। এটা সেই কান্না না, যেটা মানুষ লুকিয়ে কাঁদে। এটা বুক ফেটে বের হওয়া কান্না।
“আম্মা…!” তার আর্তনাদ নীরব কবরকে পুনরায় জাগিয়ে তুলল। “আম্মা তুমি আমারে ঘৃণা করলা না কেন…? আমি তো মানুষ না আম্মা… আমি পাপী…!”
সে নিজের মাথায় নিজেই আঘাত করতে লাগল।
চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল, তার মায়ের মুখ।
সেই ক্লান্ত চোখ। বুক ভরা ভালোবাসা।
“আমি তোমার যোগ্য না আম্মা… আমি না…!” সে চিঠিটা বুকে চেপে ধরল। তার শ্বাস কাঁপছে। “একবার ডাক দাও আম্মা… একবার… আমি আর কিছু চাই না…আমি আর খারাপ হমু না… শপথ… তুমি শুধু ফিইরা আসো…”
অনেকক্ষণ পরে সে নিঃশ্বাস নিতে নিতে ফিসফিস করে বলল,“তুমি আমারে এত ভালো কেমনে বাসলা আম্মা…?”
চিঠিটা বুকে চেপে ধরে সে ধীরে ধীরে মাটিতে ঝুঁকে পড়ল। শুধু একটাই শব্দ বারবার বলতে লাগল,
“আম্মা… ও আম্মা নিয়া যাও আমারে আম্মা।
মধ্যরাতে হঠাৎ কান্না আর ধস্তাধস্তির শব্দে চিত্রার ঘুম ভেঙে গেল। প্রথমে সে ঠিক বুঝতে পারছিল না স্বপ্ন নাকি সত্যি। কিন্তু পরপর দুবার কারও কান্না আর জিনিসপত্র আছড়ে পড়ার শব্দ শুনতেই তার বুক ধক করে উঠল। সে তাড়াতাড়ি ফারাজকে ঝাঁকিয়ে দিল।
“উঠেন একটু… শব্দ শুনতেছেন?”
ফারাজ বিরক্ত মুখে চোখ মেলল।
“কি হলো আবার…?” ঠিক তখনই আবার একটা চিৎকার ভেসে এল। এবার পরিষ্কার। ফারাজও এবার পুরো জেগে উঠল। সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে শুনল।
ধুপ! কিছু একটা জোরে পড়ার শব্দ। তারপর ভাঙা গলায় অনুনয়, “মেয়েটারে মাইরেন না… আল্লাহর দোহাই লাগে…”
চিত্রা তৎক্ষণাৎ উঠে বসে গেল। “এইটা তো নদী ভাবির গলার মতো লাগতেছে!” ফারাজ আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। দ্রুত দরজা খুলে বের হয়ে গেল। চিত্রাও তার পেছনে পেছনে। করিডোরটা অস্বাভাবিক নীরব। কিন্তু নদীর ঘরের কাছে যেতেই ভেতরের দৃশ্যটা প্রায় বোঝা যাচ্ছিল, কেউ চিৎকার করছে, কেউ ধমক দিচ্ছে।ফারাজ দরজার সামনে এসে থামল। ভেতর থেকে মাতাল গলার গর্জন, “তোকে বলছি চুপ কর! আমারে শেখাইতে আইছস?” চিত্রার বুক কেঁপে উঠল।
ফারাজ দরজা ঠেলে খুলতেই দৃশ্যটা দেখে মুহূর্তে তার চোখ কঠিন হয়ে গেল। রাজন পুরো নেশাগ্রস্ত। চোখ লাল, শরীর দুলছে। তার সামনে মেঝেতে পড়ে আছে নদী। চুল এলোমেলো, ঠোঁট ফেটে রক্ত বের হচ্ছে।
আর এক কোণে দাঁড়িয়ে কাঁদছে ছোট নুড়ি। নুড়ি এগিয়ে এসে মায়ের সামনে দাঁড়াতেই রাজন ঝাঁপিয়ে হাত তুলল। চড়টা সোজা গিয়ে পড়ল বাচ্চাটার গালে।
চিত্রার মুখ দিয়ে হঠাৎ বেরিয়ে গেল,
“ইয়া আল্লাহ! আপনি মানুষ নাকি জানোয়ার?”
ফারাজের শরীর শক্ত হয়ে গেল। সে এক লাফে এগিয়ে গিয়ে রাজনের হাত চেপে ধরল। “আপনি কি পাগল হয়েছেন?!” রাজন ঝাঁকুনি দিয়ে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করল। “হাত ছাড়! এইটা আমার বউ! আমার মাইয়া! তোর কি?!”
“তাই বলে মারবেন? বাচ্চার গায়েও হাত তুলবেন?” ফারাজ চিত্রাকে বলল, “তুমি নুড়ি আর নদী ভাবীকে নিয়ে এখান থেকে যাও।” নদী কাঁপতে কাঁপতে উঠে বসার চেষ্টা করছে। “ফারাজ … ওনাকে কিছু কইরো না… উনি নেশা করছে…” চিত্রা দ্রুত দৌড়ে গিয়ে নুড়িকে বুকে টেনে নিল। বাচ্চাটা কাঁপছে পুরো শরীর নিয়ে।
“চুপ… কিছু হয়নি… ছোটআম্মু আমি আছি তো…”
রাজন আবার ধাক্কা দিয়ে সামনে এগোতে চাইছে।
আর ফারাজ তার সামনে দাঁড়িয়ে এবার সত্যিই রাগে ফেটে পড়ার মতো।
ঘরের ভেতরের উত্তেজনা তখন ঘন হয়ে আছে।
নুড়িকে বুকে চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে চিত্রা। বাচ্চাটা কাঁপছে। ফারাজ শক্ত করে রাজনের হাত চেপে ধরে আছে। রাজন এখনো ধস্তাধস্তি করছে,
“হাত ছাড় বলতেছি!” সে গর্জে উঠল।
ফারাজ কঠিন গলায় বলল, “আর একবার হাত তুললে ভালো হবে না।” ঠিক তখনই চিত্রার ভেতরে জমে থাকা রাগ হঠাৎ বিস্ফোরিত হলো। সে নুড়িকে পাশে দাঁড় করিয়ে নদীর দিকে তাকাল। “ভাবী, আপনি আর কতদিন এই জানোয়ারটাকে বাঁচাইবেন?”
নদী স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। “প্রতিবার একই কাহিনি! মারে, গালি দেয়, অপমান করে… তারপর আপনি আবার ঢাল হয়ে দাঁড়ান!”
নদী কাঁপা গলায় বলল, “চিত্রা… এমন বলো না…”
“কেন বলব না?” চিত্রা এবার আরও জোরে বলল।
“আজ নুড়ির গায়েও হাত তুলছে! তাও আপনি কিছু বলতে বারণ করছেন? এই স্বামীর জন্য এত মায়া যে পরকীয়া করে বউ থাকতে?”
রাজন হঠাৎ বিকৃতভাবে হেসে উঠল।
“ওহো… দেখি তো নতুন বিচারকটা কে? এই তোরে কইছে আমি পরকীয়া করছি? রাবসা আমার বউ, বুঝলি তো সে আমার বউ। তোর এত সমস্যা ক্যান? নিজের সংসার সামলা। আমার ঘরের মধ্যে নাক গলাইস না।”
চিত্রা সোজা হয়ে দাঁড়াল। “আপনারে মানুষ বললেও লজ্জা লাগে।”
রাজনের মুখ মুহূর্তে বিকৃত হয়ে গেল। “এই মাইয়া! জিহ্বা সামলাইয়া কথা কইবি!”
চিত্রা তাচ্ছিল্যের হাসি দিল। “মাতাল মানুষকে আবার সম্মান দেওয়া লাগে নাকি?”
রাজন এবার সামনে ঝাঁপিয়ে আসতে গেল। ফারাজ ধাক্কা দিয়ে তাকে পেছনে ঠেলে দিল। “এক ইঞ্চি আগাইবেন না। আমার বউয়ের দিকে এগুলে জায়গা মতো এখানেই গেঁড়ে রাখব। আমি রাজন এলাহী না, আমি ফারাজ এলাহী। আমার বউয়ের গায়ে হাত দেওয়া তো দূরে থাক, বউকে নিয়ে অন্যের মুখে একটা কটু কথাও সহ্য করব না।”
রাজন এবার একটু পিছিয়ে গেল। রুমে তখন দৌড়ে অভ্র আর আয়েশা প্রবেশ করেছে। আয়েশা উদ্বিগ্ন গলায় ডাকল,
“কি হয়েছে?!”
তার পেছনে অভ্র। দুজনেই তাড়াহুড়ো করে তিন তলা থেকে নেমে এল। দোতলায় এসে দৃশ্যটা দেখে তারা থমকে গেল। নদীর অবস্থা এলোমেলো।
নুড়ি কাঁদছে। রাজন ধস্তাধস্তি করছে। ফারাজ দাঁড়িয়ে আছে সামনে। আয়েশার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“এসব কী…”
ফারাজ অভ্রের দিকে তাকিয়ে বলল, “দঁড়ি আন শালারে বেঁধে রাখি। ভাবীর মুখের দিকে তাকিয়ে খালি কিছু করতে পারছি না।” ঠিক তখনই চিত্রা টেবিলের ওপর থেকে ছুড়ি নিয়ে রাজনের দিকে এগিয়ে গেলে ফারাজ চিত্রার হাত ধরে চোখের দিকে তাকিয়ে ইশারা করতেই চিত্রা থেমে গেল। ফারাজ সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল, “যে যার যার রুমে যাও। নদী ভাবী আপনি আর নুড়ি আসুন। বজ্রকে বলছি সে ট্রিটমেন্ট করে দিবে।” সবাই রুম থেকে যেতেই হঠাৎ রাজন বলল, “তোর বউরে মারতে দিতি আমার গায়ে ছুড়ি। দেখতাম মুরদ কত।”
চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮২
ফারাজ বাঁকা হাসল। রাজনের কাঁধ চাপড়ে বলল,”আমার বউয়ের মুরদ দেখার যোগ্য এখনো হননি ভাই। আর সে একবার মুরদ দেখালে আজকে রাতে আপনার জানাজা পড়তে হতো। দেখেন ভাই, এত লাশের খাটিয়া বহন করার মতো এনার্জি আমার বর্তমানে নেই। যাই বাপু, বউয়ের রাগ ১০০ ডিগ্রি করে দিয়েছেন। আদর-সোহাগ দিয়ে এখন রাগ নামাতে হবে। উফ আবার এনার্জি লস। যত্তসব ছোটলোকি কারবার।”

আপু ৮৪ পর্ব কবে দিবেন