চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮৪
ইশরাত জাহান জেরিন
রাতটা যেন শেষই হচ্ছিল না। সারা রাত চোখে একফোঁটা ঘুম আসেনি চিত্রার। অন্ধকার ঘরের ভেতর শুয়ে শুয়ে সে বারবার পাশ ফিরেছে। কখনও বালিশে মুখ গুঁজে, কখনও সিলিং এর দিকে তাকিয়ে। তার ভেতরে আরেকটি প্রাণের নীরব স্পন্দন এই ভাবনাটা যতটা আনন্দ দেয়, শরীরটা ততটাই অবসন্ন করে দেয় তাকে। তিন মাস চলছে তার। পেটে অকারণ টান ধরা ব্যথা, হালকা মাথা ঘোরা, হঠাৎ হঠাৎ তীব্র খিদে আবার খেতে গেলেই অরুচি। কিছু মুখে তুললেই বমি। মনে হয় শরীরটা যেন নিজেরই বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করছে। তবু বুকের গভীরে খুশির সীমা নেই, কারণ সে মা হতে যাচ্ছে। একটা নরম আলো তার কোল জুড়ে। কিন্তু আলো থাকলেই কি অন্ধকার কমে? ভোরের দিকে হঠাৎ আবার বমি পায় চিত্রার। বিছানা ছেড়ে উঠতেই মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। ঠিক তখনই পাশ থেকে দ্রুত উঠে বসলো ফারাজ। “বউ….. আবার?” তার গলায় উৎকণ্ঠা, চোখে দিশেহারা ভয়।
চিত্রা দুর্বল হাসল, “কিছু না… ঠিক হয়ে যাবে।”
ফারাজ একটুও বিশ্বাস করল না। তাড়াতাড়ি তাকে ধরে বাথরুম পর্যন্ত নিয়ে গেল। পেছন থেকে চুলগুলো ধরে রাখল, অন্য হাতে পিঠে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল। বমি শেষে চিত্রা যখন কাঁপতে কাঁপতে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল, ফারাজ তাকে প্রায় কোলে করেই বিছানায় এনে শুইয়ে দিল।
“এভাবে ‘কিছু না’ বললে হবে?” তার গলায় বিরক্তির চেয়ে উদ্বেগই বেশি। “রাতভর তুমি ঘুমাওনি। এখন আবার পেটে ব্যথা বলছো। আমি ডাক্তারকে ফোন করছি।”
চিত্রা হাত বাড়িয়ে তার কবজি চেপে ধরল, “এখন ফোন করবেন না… একটু বসুন আমার পাশে।”
ফারাজ থেমে গেল। তার কঠিন মুখভঙ্গি মুহূর্তেই নরম হয়ে এলো। বিছানার ধারে বসে চিত্রার কপালে হাত রাখল।
“জ্বর তো নেই…” ফিসফিস করল সে।
চিত্রা চোখ বুজে বলল, “জ্বর না… শুধু ভয় লাগে। হঠাৎ যদি কিছু হয়ে যায়?”
ফারাজের চোখ গাঢ় হয়ে উঠল। “আমি থাকতে কিছু হবে না। তুমি আর আমাদের বাচ্চা তোমাদের নিয়ে আমি একচুলও ঝুঁকি নেব না।”
চিত্রা মৃদু হাসল, “আপনি এমন করে বললে… মনে হয় সত্যিই কিছু হবে না।”
ফারাজ তার হাতটা নিজের দুই হাতে নিয়ে ঠোঁটে ছোঁয়াল। “শরীর খারাপ করবে, এটা স্বাভাবিক। বজ্রও তো বলেছিল। কিন্তু তুমি না খেয়ে থাকলে চলবে না। আমি স্যুপ বানাচ্ছি। অল্প অল্প করে খাবে।”
“খেতে পারব না…” চিত্রা মুখ বাঁকাল।
“পারবে।” ফারাজ নরম গলায় বলল। “না পারলেও চেষ্টা করবে। আমার জন্য না, ওর জন্য।”
‘ও’—শব্দটা শুনে চিত্রার চোখ ভিজে উঠল। এত ছোট্ট, এত অদৃশ্য একটা অস্তিত্ব, তবু সে ইতিমধ্যেই তাদের জীবনের কেন্দ্র।
সকাল বাড়তে না বাড়তেই চিত্রার শরীর আরও খারাপ করল। মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, পেটে চাপা ব্যথা। ফারাজের ভেতরটা ততক্ষণে এলোমেলো হয়ে গেছে।
সে বারবার জিজ্ঞেস করছে, “ব্যথা বাড়ছে? কেমন লাগছে এখন? শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে?”
চিত্রা ক্লান্ত গলায় বলল, “আপনি এমন করছেন যেন আমি ভীষণ অসুস্থ…”
“তুমি অসুস্থই,” ফারাজ থামিয়ে দিল। “তুমি এখন শুধু তুমি নও। তুমি দু’জন।”
চিত্রা হাত বাড়িয়ে তার গাল ছুঁল। “আমি ঠিক আছি, ফারাজ। শুধু একটু দুর্বল। আপনি পাশে না থাকলে হয়তো ভয় পেতাম।”
ফারাজ মাথা নিচু করে তার কপালে চুমু খেল। “আমি কোথাও যাচ্ছি না। রাত জেগে বসে থাকব, তবু তোমাকে একা ছাড়ব না।”
ঘরের জানালা দিয়ে সকালের আলো ঢুকছে ধীরে ধীরে। ক্লান্ত, অবসন্ন চিত্রা অবশেষে চোখ বুজল। ফারাজ তার হাত ধরে বসে রইল। চোখে ঘুম নেই, কেবল বউয়ের জন্য অস্থিরতা।
ভোর তখন পুরোপুরি ফোটেনি। কুয়াশা ঝুলে আছে কবরস্থানের ঘাসে। প্রতিটা ঘাসের ডগায় জমে আছে অসমাপ্ত কান্না। সোহান মায়ের কবরের পাশে বসে ছিল দুই হাঁটু জড়িয়ে সারা রাত। মাটির ঢিবিটায় কপাল ঠেকিয়ে এই কান্না করছিল, এই আবোলতাবোল কথা বলছিল। সারা রাত বাড়ি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেও লাভ হয়নি। শেষে সুমন ভোরে এসে বলল, “চলেন, ভাই… ভোর হয়ে গেছে।” সোহান মাথা নাড়ল।
“আমি যামু না। আম্মা একা হইয়া যাইব।”
“একা হবে না, মৃত মানুষ একা হয় না। বেঁচে থাকা মানুষ একা হয়। আপনি চলেন ভাই।”
সোহান হঠাৎ মুখ তুলে তাকাল। “আম্মা তো আমারে ছেড়ে যায়নি কখনো… আমি কেন ছাড়ব?” সুমন উত্তর দিল না। শেষ পর্যন্ত দু’জন লোক মিলে তাকে প্রায় টেনে তুলল। সে কবরের মাটি আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করল, আঙুলে মাটি ঢুকে গেল, নখের ভেতর কাদার মতো জমে রইল শোক।
বাসায় ফিরেও সে ঠিকমতো বসতে পারেনি। চোখে ঘুম নেই, কান্না নেই, শুধু একরাশ অবশতা। হঠাৎ উঠোনে গাড়ির শব্দ। গেট খুলতেই দু’জন পুলিশ অফিসার ভেতরে ঢুকলেন। ইউনিফর্মের ভাঁজে কড়া গাম্ভীর্য।
সুমন এগিয়ে গেল, “কাকে চান?” একজন অফিসার জিজ্ঞেস করলেন, “সোহান সাহেব আছেন?”
সোহান দরজার পাশে দাঁড়িয়েই চাইল সেই পুলিশ অফিসারে দিকে। তার অবাক হওয়ার কথা। কারণ তার সামনে যে স্বয়ং দাঁড়িয়ে অফিসার অনুলিপি। সোহান তাকে জিজ্ঞেস করল, “আপনি। কী ব্যাপার?”
অফিসার একটু থামলেন। “আমরা একটা লাশের খবর দিতে এসেছি।”
ঘরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। সোহানের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল কিছু। “লাশ?” তার গলা শুকিয়ে গেল। “কার?”
অফিসার ধীরে বললেন, “আপনার খাস কর্মী… সিফাত।”
নামটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে সোহানের মুখের রঙ বদলে গেল। “সিফাত?” সে ফিসফিস করে বলল, “অসম্ভব… ”
অফিসার কথাটা শেষ করতে দিলেন না। “আজ ভোরে জঙ্গলের একটা খালি বাড়ি থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।”
“কেমনে?” সোহানের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
“খুবই নিষ্ঠুরভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে। শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন। হাত-পা বাঁধা ছিল। মনে হচ্ছে নির্যাতন করা হয়েছে।” ঘরের ভেতর একটা চাপা চিৎকার উঠল কারও মুখ থেকে। সোহান কিছু বলল না।
তার দৃষ্টি শূন্যে স্থির। যেন শব্দগুলো তার কানে পৌঁছাচ্ছে না বা পৌঁছে ভেতরে কোথাও থেমে যাচ্ছে।
সুমন ভাঙা গলায় বলল, “আপনারা নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ,” অফিসার বললেন। “তার পরিচয়পত্র ছিল মানিব্যাগে আর…” তিনি একটু থামলেন, “মোবাইলে শেষ কল লিস্টে আপনার নাম আছে।” সব চোখ একসঙ্গে সোহানের দিকে ঘুরে গেল। সোহান ধীরে বসে পড়ল চেয়ারে। হাত দুটো হাঁটুর উপর ঝুলে রইল। ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু শব্দ বেরোচ্ছে না। সিফাত… ছেলেটা ছায়ার মতো পাশে থাকত। যে তার এক ডাকে ছুটে আসত। যে গতকালও বলেছিল, “ভাই, আপনি চিন্তা করবেন না। আমি আছি।” আজ সে নেই। আর সেই না-থাকার খবর এতটা নির্মম হবে কে জানত?
অফিসার অনুলিপি বললেন, “আমাদের আপনার সঙ্গে কিছু কথা বলতে হবে।” সোহান ধীরে মাথা তুলল। চোখে জল নেই। “কে খুন করছে?” সে খুব আস্তে জিজ্ঞেস করল। কেউ উত্তর দিল না।
সোহান স্তব্ধ হয়ে বসে রইল। তার চারপাশের পৃথিবীটা একসঙ্গে দুই টুকরো হয়ে গেছে। একটা মায়ের মৃত্যুর,
আরেকটা তার সন্তানের মতো লালন পালন করা সিফাতের মৃত্যু।
মর্গের করিডোরটা অস্বাভাবিক ঠান্ডা। দেয়ালের সাদা রঙে কোনো উষ্ণতা নেই। কেবলমাত্র জীবাণুনাশকের তীব্র গন্ধ নাকে আসছে। সোহান ধীরে হাঁটছে। পায়ের শব্দ নিজেই শুনতে পাচ্ছে না৷ মাত্র ক’ঘণ্টা আগে সে মায়ের কবর ছেড়ে এসেছে। এখন আরেকটা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। একজন ওয়ার্ডবয় দরজা ঠেলে খুলল।
“ভিতরে আসুন।”
স্টিলের ট্রলির ওপর সাদা চাদর ঢাকা একটা দেহ।
অফিসার নিচু গলায় বললেন, “এইজন্যই আপনাকে আসতে বলেছিলাম।”
সোহান এগোল না। তার পা মেঝেতে আটকে গেছে।
“মিথ্যা বলতাছেন নাকি আপনি” সে ফিসফিস করল।
অফিসার উত্তর দিলেন না। শুধু চাদরের কোণটা ধরলেন।
চাদর সরতেই ঠান্ডা, নিথর মুখটা প্রকাশ পেল
সিফাতের। মুখে আঘাতের দাগ। ঠোঁট ফেটে গেছে। চোখ দুটো বন্ধ। কিন্তু কপালের ভাঁজে এখনও ভয়ের ছাপ। বুকে ক’টা বুলেট বিঁধেছে? সোহানের বুকের ভেতর কিছু একটা ছিঁড়ে গেল। সে ধীরে এগিয়ে এলো। হাত বাড়াল। কাঁপতে থাকা আঙুল সিফাতের কপালে ছুঁল। বরফের মতো ঠান্ডা। “তুই তো ঠান্ডা সহ্য করতে পারতিস না, সিফাত…” সে ফিসফিস করল। “শীত পড়লেই তো কাঁথা টেনে আমার ঘরে এসে ঘুমাতিস…”
কেউ কথা বলছে না। সোহানের চোখে হঠাৎ ভেসে উঠল ছোট্ট একটা ছেলের মুখ। যার পরনে ছিল ময়লা জামা, ভয় পাওয়া চোখ ছিল তার। সেই ছেলেটাকে নিজ হাতে মানুষ করেছে সোহান।নিজ হাতে খাইয়ে দিয়েছে। ভুল করলে বকেছে, আবার জড়িয়ে ধরেছে। নিজের সন্তানের মতোই বড় করেছে। আজ সেই ছেলেটা স্টিলের ট্রলিতে পড়ে আছে নিথর হয়ে।
“কে করল এটা?” সোহানের গলা এবার ভারী। ভেতরে জমে থাকা ঝড় ধীরে ধীরে শব্দ পাচ্ছে।
“কেন করল?”
অফিসার অনুলিপি নরম স্বরে বললেন, “আমরা তদন্ত করছি।” তবে আসলেই কী করছে? উঁহু করবে না। খুনির কেইস কে লড়ে? তার ওপর সেই খুনি যে তাকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল? সোহান তাকাল না।
তার দৃষ্টি শুধু সিফাতের মুখে। “কালকে দিনেও তো কইছিলি, পাশে আছি…” সে বিড়বিড় করল। “এখন কই তুই?”
হঠাৎ সে দু’হাতে ট্রলির ধাতব প্রান্ত চেপে ধরল। শিরা ফুলে উঠল। চোখে জল নেই। কিন্তু চোয়াল শক্ত।
মাত্রই মাকে হারিয়েছে। এখন সিফাতও।
একদিনে দু’দু’টা শূন্যতা। একটা জন্মদাত্রী, আরেকটা নিজের হাতে মানুষ করা সন্তানসম। মর্গের ঠান্ডা বাতাসে দাঁড়িয়ে সোহান বুঝল তার ভেতরের মানুষটা এইমাত্র আরেকবার মারা গেল। এটাই বুঝি খোদার দেওয়া পাপের সাজা? এই সাজার কোনো বিরতি কী খোদা দিবে? হঠাৎ পেছন থেকে একটা ছেলে এগিয়ে এলো। সে কাল থেকেই সোহানের সাথে দেখা করার জন্য সুযোগ খুঁজছিল। শেষে আজকে একটা সুযোগ পেয়েছে। কথাটা বলবে কী বলবে না বলতে বলতেও সে এবার এগিয়ে এসে বলল,”ভাই আপনার সাথে একটা কথা আছে।”
সোহান পেছনে তাকালো। ধীর গলায় বলল,”কইছিলাম না এখন কোনো কখা শুনতে চাই না।”
“ভাই জরুরী কথা ছিল।” ছেলেটি এবার কথা বলার সুযোগ না খুঁজেই বলে ফেলল, “লঞ্চে আগুন লাগছিল,চিত্রাকে তার স্বামী ফারাজ এলাহী নিয়া গেছে।”
বিকেলের আলোটা আজ অদ্ভুত মলিন। জানালার কাঁচে হালকা রোদ পড়ছে। চিত্রা সারাদিনে তিনবার বমি করেছে। দুপুরের পর থেকে পেটে টান ধরা ব্যথা একটু বেড়েছে। শরীর ভেঙে আসছে। ঠোঁট শুকিয়ে ফেটে গেছে। বিছানার এক কোণে হেলান দিয়ে বসে আছে সে কাঁথা টেনে। আর ফারাজ? ফারাজ যেন পুরো একটা হাসপাতাল হয়ে গেছে। টেবিলে ওষুধ, গরম পানির ফ্লাস্ক, লবণ-চিনি মেশানো ওরাল স্যালাইন, কাটা আপেল, খাবার সব সাজিয়ে রেখেছে। তার ফোনে গুগল খোলা “pregnancy 3 months stomach pain normal or not” পাঁচবার পড়েছে, তবু আশ্বস্ত হতে পারছে না।
“চিত্রা… ব্যথাটা ঠিক কোথায়?” সে আবারও জিজ্ঞেস করল।
চিত্রা চোখ তুলে তাকাল, ক্লান্ত হেসে বলল“একই জায়গায়। আপনি এইনিয়ে বাইশবার জিজ্ঞেস করেছেন।”
“আমি একশোবার জিজ্ঞেস করব।” ফারাজ গম্ভীর। “তুমি ঠিক আছো কিনা, সেটা জানার অধিকার আমার আছে।”
চিত্রা একটু নরম গলায় বলল, “আমি ঠিক আছি। শুধু দুর্বল লাগছে।”
ফারাজ তার পাশে এসে বসে পড়ল। কাঁথাটা ঠিক করে দিল। তারপর হাত দিয়ে তার পেটের ওপর খুব আলতো করে রাখল। “এই যে… ছোট্ট মানুষটা, মাকে এত কষ্ট দিও না।” সে ফিসফিস করে বলল।
চিত্রা অবাক হয়ে তাকাল। “আপনি ওর সঙ্গে কথা বলছেন?”
“হ্যাঁ। ও এখন থেকেই জানুক ওর বাবা ভয়ানক কড়া। মাকে কষ্ট দিলে চলবে না। বকুনি খেতে হবে।”
চিত্রা হেসে ফেলল, কিন্তু হাসিটা খুব ক্ষণস্থায়ী। হঠাৎ মুখটা কুঁচকে উঠল। “উফ… আবার টান লাগছে।”
ফারাজের মুখ মুহূর্তে ফ্যাকাসে। “কতটা? খুব বেশি?”
“না না, এতনা।” চিত্রা হাত বাড়িয়ে তাকে থামাল। “আপনি এভাবে ভয় পাবেন না।”
ফারাজ তার দুই কাঁধ ধরে নরম গলায় বলল, “শোনো, তুমি এখন সাহস দেখানোর চেষ্টা করবে না। ব্যথা হলে বলবে। কষ্ট হলে বলবে। তুমি শক্ত, আমি জানি। কিন্তু এখন তোমার শক্ত হওয়ার দরকার নেই। শক্ত হওয়ার দায়িত্বটা আমার।” কথাগুলো শুনে চিত্রার চোখ ভিজে উঠল। ফারাজ উঠে রান্নাঘরে গেল। পাঁচ মিনিট পর ফিরে এলো একবাটি হালকা গরম স্যুপ নিয়ে।
“এবার না বলার অপশন নেই।” সে চামচে তুলে সামনে ধরল।
চিত্রা মুখ ঘুরিয়ে নিল, “বমি হয়ে আসবে…”
“হলেও আমি পরিষ্কার করব।” ফারাজ শান্ত। “তুমি শুধু খাও।” এক চামচ। দুই চামচ। তৃতীয় চামচে চিত্রা মুখ কুঁচকাল। ফারাজ সঙ্গে সঙ্গে থামল। “আর না। জোর করব না।” সে বাটি সরিয়ে রাখল। “তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু করব না।” তারপর হঠাৎ হাঁটু গেড়ে বসে চিত্রার পায়ের কাছে। দু’হাতে তার পা তুলে নিজের কোলের ওপর রাখল। “এইটা কী করছেন?” চিত্রা বিস্মিত।
“সারাদিনে তুমি হাঁটছো, বাথরুমে যাচ্ছো… শরীর ফুলে যাচ্ছে ব্যথ্যায়।” সে খুব আলতো করে পায়ে ম্যাসাজ করতে লাগল। “ বজ্র বলেছিল, সার্কিউলেশন ঠিক রাখতে হবে। আর শুনো কাল তোমাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবো। আচ্ছা তোমার তো তিনমাস চলছে। পেট এখনো এত ছোট কেন? আমার বাচ্চা বড় হচ্ছে না কেন?”
চিত্রার চোখ ধীরে ধীরে নরম হয়ে এল। “আপনার না আজকে কী একটা কাজ ছিল? কাজে যাননি কেন?”
“কাজ যাক জাহান্নামে।” ফারাজ ঠান্ডা গলায় বলল। “আমার পৃথিবী এখন এই বিছানায় বসে আছে।”
বাইরে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। আলো আরও নরম হয়েছে। চিত্রা হঠাৎ বলল, “ফারাজ…”
“হুম?”
“আপনি যদি না থাকতেন, কী করে যে এত সাহস পেতাম এই সময়।”
ফারাজ থেমে গেল। মাথা তুলে তাকাল। “আমি না থাকব কেন?”
“মানে… যদি কোনোদিন…” সে বাক্য শেষ করার আগেই ফারাজ উঠে এসে তার ঠোঁটে আঙুল রাখল। “এই ধরনের কথা দ্বিতীয়বার বলবে না। তোমার কিছু হলে…” সে গলা নামিয়ে বলল, “আমি বাঁচব না। বুঝেছো? তুমি আমার স্ত্রী না শুধু। তুমি আমার শান্তি। আর এখন আমার সন্তানের মা।”
চিত্রার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। ফারাজ এগিয়ে এসে তাকে বুকের ভেতর টেনে নিল। “কিছু হবে না।” সে ধীরে ধীরে বলল। “আমি ডাক্তারকে আবার কল করব। কালই চেকআপে নিয়ে যাব। যতবার দরকার, ততবার যাব। সময়,কাজ কিছুই আমার কাছে বড় না। তুমি আর ও এই দুটো প্রাণ আমার সব।”
চিত্রা তার বুকে মুখ গুঁজে ফিসফিস করল, “আমি আপনাকে খুব ভালোবাসি।”
ফারাজ তার চুলে মুখ ডুবিয়ে বলল, “ভালোবাসা এখন প্রমাণের সময়। আমি দেখিয়ে দেব কীভাবে একজন পুরুষ তার স্ত্রীকে আগলে রাখে।”
বাইরে সন্ধ্যা নেমে এলো। ঘরের ভেতর নরম আলো জ্বলে উঠল। চিত্রা আধো ঘুমে ঢলে পড়ছে। ফারাজ তার হাত শক্ত করে ধরে বসে আছে। চোখ একবারও সরাচ্ছে না।
ফারাজ তখন বারান্দার দিকের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। চিত্রা বিছানার মাথার দিকের বালিশে হেলান দিয়ে বসে, চুপচাপ তার দিকে তাকিয়ে আছে। এমন সময় হঠাৎ ফারাজের ফোনটা বেজে উঠল। ফারাজ একবার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একটু বিস্মিত হলো, তারপর কল রিসিভ করল। “হ্যালো?… আরে পিয়াস! কেমন আছিস?”
ওপাশ থেকে কী যেন বলা হলো। ফারাজের চোখে হালকা উজ্জ্বলতা ফুটে উঠল। “সত্যি? আজই আসছিস?… নিশিতাও সাথে?… আরে বাহ! ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমরা তো আছিই। চলে আয়।”
কিছুক্ষণ হাসিমুখে কথা বলে সে ফোনটা রেখে দিল। ঘুরে চিত্রার দিকে তাকাতেই তার মুখে একরাশ কৌতূহল। “কে ছিল?” চিত্রার গলায় আগ্রহ।
ফারাজ বিছানার পাশে এসে বসে বলল, “পিয়াস। ওরা দু’জনেই আসছে। আজকে রাতের মধ্যেই চলে আসবে।”
চিত্রার চোখ এক লাফে বড় হয়ে গেল। “সত্যি? নিশিতাও আসছে?”
“হ্যাঁ, দু’জনেই।”
চিত্রার ঠোঁটে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। “আহা, কতদিন পরে! বাড়িটা জমে যাবে তাহলে।” তার কণ্ঠে শিশুসুলভ আনন্দ। ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
“ভিতরে আসো,” ফারাজ বলল।
দরজা ঠেলে নদী ভেতরে ঢুকল। তার মুখে স্বভাবসিদ্ধ কোমল হাসি। “কেমন আছো চিত্রা? শরীরটা আজ একটু ভালো?”
চিত্রা সোজা হয়ে বসে বলল, “হ্যাঁ ভাবী, আজ অনেকটাই ভালো লাগছে।”
নদী এগিয়ে এসে তার কপালে হাত ছুঁয়ে দেখল। “জ্বর আছে কী? না নেই তো। তবে বেশি নড়াচড়া করো না।”
এই সময় নদীর পিছন পিছন জমেলা ভেতরে ঢুকল।
চিত্রা উচ্ছ্বাস সামলাতে না পেরে বলে উঠল,
“জুনাইয়া দাদু, শুনেছো? পিয়াস আর নিশিতা আসছে আজ!”
জমেলার চোখে একটু চমক। “ওমা! সত্যি নাকি?”
ফারাজ মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, ফোন দিয়েছিল একটু আগে।”
চিত্রা বলল, “তুমি বাকিদেরও একটু জানিয়ে দাও না। কতদিন পরে সবাই একসাথে হবো!”
জমেলা হেসে বলল, “আচ্ছা আচ্ছা, এখনই বলে দিচ্ছি।”
হঠাৎ নদী একটু থেমে বলল, “শোনো, আমাদের ফারিহা আর নাহিয়ানকে তো কতদিন দেখি না। ওদেরও একবার আসতে বলবে? বাড়িটা এমনিতেই তো মরা মরা লাগে।”
সে চারদিকে তাকাল, তারপর মৃদু হেসে যোগ করল, “ওরা থাকলে বাড়িটা ভরা ভরা লাগে। হাসি-আড্ডায় বাড়িটা জমে ওঠে।”
“হ্যাঁ ভাবী ঠিক বলেছো। সবাই এলে কত ভালো লাগবে!”
ফারাজ একটু ভাবুক মুখে বলল, “আমি ওদেরও ফোন দিই তাহলে। আজ যদি না-ও পারে, কাল তো আসতেই পারবে। ইমারজেন্সি ফ্লাইটের ব্যবস্থা আমি করে দিবো।”
হঠাৎ চিত্রা বলে উঠল, “চলুন বাইরে যাই একটু ঘুরতে ইচ্ছে করছে।”
“না না এইসময় সম্ভব না।”
চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৮৩
“অনুনয় করছি না আদেশ দিচ্ছি।”
“ওমা কে গো আদেশ দেয় আমাকে?”
“আর কে? আপনার বউ চিত্রাঙ্গনা কায়সার।”
“তো কি হয়েছে? ফারাজ এলাহী ভয় পায় না, এমন টু মাচ ছোটলোককে।”
