চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৯
আয়াত বিনতে নূর
নিশি উপরে উঠে নিজের রুমের দিকে একবারও পা বাড়াল না। করিডোর পেরিয়ে সে সোজা রিয়ার রুমের সামনে গিয়ে থামলো। দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকতেই রিয়া যেন চমকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো।
নিশিতা কোনো কথা বললো না। নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে রিয়ার পাশে বসে পড়লো—চোখে মুখে চাপা ক্লান্তি আর অদ্ভুত এক ভারী অনুভূতি। নিশিতার এই নীরব উপস্থিতিতে রিয়াও আর কিছু বলতে পারলো না। সে ধীরে ধীরে বসে পড়লো, ঘরটা হঠাৎ করেই নীরবতায় ভরে উঠলো, যেন দু’জনের মাঝখানে না বলা অনেক কথা জমে আছে।
নিশিতা একটু ভেবে নিয়ে রিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আচ্ছা, অহনা আমাদের সাথে গেলে কেমন হয় বল তো?”
রিয়া এক মুহূর্ত দেরি না করে হালকা হাসি নিয়ে উত্তর দিল,
“হুম… ভালোই তো হবে। ওকে এখনই কল করে বলে দে, বিকালে রেডি হয়ে চলে আসতে। তারপর সবাই মিলে একসাথে যাবো। ভীষণ মজা হবে!”
এই কথা বলেই রিয়া হঠাৎ করে শিশুসুলভ উচ্ছ্বাসে,
“ইয়াহু!”
বলে চিৎকার করে উঠলো।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
রিয়ার এই কাণ্ড দেখে নিশিতা হেসে গুটিশুটি মারলো। কিছুক্ষণ পর হাসি থামিয়ে, চোখে দুষ্টু ঝিলিক নিয়ে বলল,
“বিকালে না, এখনই আসতে বলবো ওকে। আমরা সবাই মিলে শপিংয়ে যাবো।”
নিশিতার কথাটা কানে যেতেই রিয়া যেন বিশ্বাস করতে পারলো না। সে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে একটু উৎকণ্ঠা, একটু বিস্ময় মিশ্রিত কণ্ঠে বলল,
“কিহ? ভাইয়া তো পরিষ্কার করে বলেছে, আমাদের যাওয়ার দরকার নেই। উনিই নাকি সব শপিং করে পাঠিয়ে দেবে।”
রিয়ার কণ্ঠে দ্বিধা থাকলেও নিশিতার মুখে ছিল অদ্ভুত এক দৃঢ়তা। সে হালকা করে হেসে, যেন সব চিন্তাকে এক ঝটকায় উড়িয়ে দিয়ে বলল,
“বাদ দে এসব কথা। নিজের শপিং নিজেরাই করবো এটাই বেশি মজা। আর বাড়িতেও তো এখন কেউ নেই যে আমাদের আটকাবে।”
এই বলে নিশিতা রিয়ার আরও কাছে এসে বসলো। তার চোখে তখন দুষ্টু আলো, কণ্ঠে চাপা উচ্ছ্বাস।
“অহনাকে ফোন কর। আমি, তুই আর তনয়া আপু এই তিনজন মিলে বের হবো। এমন শপিং করবো যে মনে হবে পুরো শপিং মলটাই তুলে এনেছি।”
রিয়া কিছু বলার আগেই নিশিতা আর এক মুহূর্ত দেরি করলো না। সে ফোন তুলে সরাসরি অহনার নাম্বারে কল দিলো। ওপাশে অহনা তখন মনোযোগ দিয়ে পড়ছিল। হঠাৎ করে ফোন বেজে উঠতেই বিরক্তি নিয়ে ফোনের দিকে তাকালো। স্ক্রিনে ভেসে উঠলো নিশিতার নাম। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি নিয়ে সে কল রিসিভ করল।
“কেয়া হুয়া মেরি জান? হঠাৎ আমার কথা মনে পড়লো নাকি?”
দুষ্টু স্বরে বলল অহনা। তারপর এক নিশ্বাসে আরও বলল,
“আর বাই দ্য ওয়ে, তুই কাল কলেজে ছিলি না কেন? আর রিয়া আর তোর মধ্যে আবার কী হয়েছে বল তো? ঝামেলা করেছিস নাকি? আর আমি না রিয়াকে তোর আর”
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই নিশিতা হঠাৎ বলে উঠলো,
“থাম, আমার মা! সকাল সকাল পুরো দুনিয়ার খবর তোর মুখে চলে এসেছে নাকি? এত প্রশ্ন তো স্যার-ম্যাডামরাও একসাথে করে না!”
নিশিতার কথা শুনে রিয়া আর অহনা দু’জনই একসাথে হেসে ফেলল। মুহূর্তের মধ্যেই ফোনের ওপাশ আর এপাশে হাসির শব্দ ছড়িয়ে পড়লো।
নিশিতা হালকা একটা হাপ ছেড়ে দিয়ে বলল,
“আচ্ছা বাদ দে এসব। শোন, তুই এক্ষুনি রেডি হয়ে আমাদের বাড়িতে চলে আয়। আর হ্যাঁ না শুনতে চাই না আমি। এক্ষুনি আসবি মানে এক্ষুনি আসবি।”
অহনা অবাক হয়ে বলল,
“কিহ? না না, আমি যাবো না। আর শপিংয়েই বা কেন যাবো?”
নিশিতা এবার রাগের ভান করে কণ্ঠটা শক্ত করল,
“তুই যাবি না? তোর ঘাড় যাবে! তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে আসবি ৩০ মিনিটের মধ্যে। আমি আর কিছু জানি না, মানে না!”
নিশিতার হুমকিসুলভ গলায় অহনা হেসে ফেললেও শেষ চেষ্টা হিসেবে বলল,
“আচ্ছা আচ্ছা… কিন্তু যাবোটা কোথায় আমরা? আর শপিংই বা করবো নাকি?”
নিশিতা একদম সিদ্ধান্তমূলক স্বরে বলল,
“পার্টিতে তালুকদার বাড়িতে। আজকে সন্ধ্যায়। আর তুইও যাবি, কোনো কথা নেই।”
এক মুহূর্তও সময় না দিয়ে বলল,
“এখন রাখছি। তাড়াতাড়ি আয়।”
এই বলেই নিশিতা কল কেটে দিলো। রিয়া কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই ফোনের লাইন কেটে গেল।
এদিকে অহনার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই অস্থির হয়ে উঠলো। নিশিতার ফোনটা কেটে যাওয়ার পর সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো। মাথার ভেতরে হাজারটা চিন্তা একসাথে ভিড় করলো এখন সে কী করবে? এত করে ডাকলো, এত জোর দিলো… এবার যদি না যায়, তাহলে নিশিতা আর রিয়া—দু’জনেই নিশ্চয়ই রাগ করবে।
অহনা গভীর একটা শ্বাস নিল। মনে মনে নিজেকেই বোঝাতে চেষ্টা করলো।
“আগে যাই,”
নিজের সাথে নিজেই কথা বলল,
“তারপর যা হবে, দেখা যাবে।”
এই সিদ্ধান্ত নিয়েই চেয়ারটা ঠেলে উঠে দাঁড়ালো। পড়ার টেবিলের বইগুলো অগোছালো রেখেই তাড়াতাড়ি রেডি হতে চলে গেলো। তার মনে তখন এক অজানা শঙ্কা, আবার কোথাও একটা চাপা উত্তেজনাও—আজকের দিনটা যে শুধু শপিংয়েই শেষ হবে না, সেটা যেন সে অজান্তেই টের পাচ্ছিল।
এদিকে রিয়া আর নিশিতা বসে আছে নিশিতার রুমে। ঘরটায় তখন অদ্ভুত এক নীরবতা। বাইরে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও, ভেতরের বাতাসটা ভারী হয়ে আছে। হঠাৎ করেই রিয়া সেই নীরবতা ভেঙে দিল।
রিয়া নিশিতার দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
“এবার বল তো নিশি… আসল ব্যাপারটা কী হয়েছে?”
নিশিতা কিছু বুঝে ওঠার আগেই রিয়া আবার বলল ,
“দেখ, আমি কিন্তু জানি তুই ভাইয়াকে ভালোবাসিস। মিথ্যা বলতে পারবি না আমার সাথে।”
এই কথাটা শুনে নিশিতার চোখ দুটো মুহূর্তের মধ্যে ছানাবড়া হয়ে গেলো। যেন কেউ হঠাৎ করে তার বুকের ভেতরের গোপন দরজাটা খুলে দিয়েছে। সে কিছু বলল না। শুধু চুপ করে রইলো, চোখ নামিয়ে।
নিশিতার এই নীরবতা রিয়ার বুকটা আরও ভারী করে তুললো। সে আবার বলল, কণ্ঠে এবার অভিমান স্পষ্ট,
“আচ্ছা, আমি কি তোর এতটাই পর নিশি? যে আমাকে কিছু বলতে পারলি না? আমি তোকে হেল্প করতাম… কিন্তু তুই তো আমাকে বিশ্বাসই করিস না।”
এই কথাগুলো নিশিতার বুকের ভেতর কোথায় যেন আঘাত করলো। সে হঠাৎ করেই মুখ তুলে তাকালো। কণ্ঠ শক্ত করে বলল,
“কি বলছিস এসব রিয়া? আমি নাকি তোকে বিশ্বাস করি না? সত্যি?”
তার চোখে তখন চাপা কষ্ট আর ক্ষোভ।
“আমার জীবনের সব ঘটনা তুই জানিস, আর তুই বলছিস আমি তোকে বিশ্বাস করি না?”
কথা বলতে বলতে নিশিতা একটু থেমে গেলো। তারপর দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে ধীরে ধীরে বলল,
“আসলে জানিস তো… আমি ভয় পেতাম। ভয় পেতাম তুই যদি আমাকে ভুল বুঝিস। আমার থেকে দূরে চলে যাস। যদি জানতে পারিস আমি ফারিস ভাইকে ভালোবাসি, তাহলে যদি ঝামেলা হয়… এই ভেবে তোকে কিছু বলতে পারিনি।”
নিশিতার কণ্ঠে তখন অনুতাপের সুর।
“তার জন্য সরি, রিয়া।”
রিয়া কিছু বলার আগেই নিশিতা আবার বলতে শুরু করল,
“আমি জানি এগুলো তোকে অহনাই বলেছে। ওকেই সবকিছু শেয়ার করতাম। ও কোনোদিন কাউকে বলেনি। হয়তো সেদিন তোর মনের অবস্থা দেখে তোকে বলেছে।”
নিশিতা হালকা একটা হাসি দিল যেন সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে অনেক না বলা যন্ত্রণা।
“ও জানিস আমাকে কত বোঝাতো? কতবার বলেছে—ভুলে যেতে। কিন্তু আমি পারতাম না রে, রিয়া। ফারিস ভাইকে ভুলতে পারতাম না।”
তার চোখ দুটো দূরে কোথাও হারিয়ে গেলো।
“যখন উনি দেশে ছিলেন, আমাকে এড়িয়ে চলতেন। আর আমি? আমি শুধু একবার উনার দিকে তাকানোর জন্য ছটফট করতাম। তখন তো বুঝতামই না এসব ভালোবাসা, মায়া কী জিনিস।”
কথার মাঝে নিশিতার গলা একটু ভারী হয়ে এলো।
“আর যখন বুঝতে শিখলাম, যখন বুঝলাম এটা ভালোবাসা তখন উনি দেশের বাইরে চলে গেলেন।”
সে চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য।
“কিন্তু জানিস… একটা সেকেন্ডের জন্যও আমি উনাকে ভুলতে পারিনি। সবসময় উনার চেহেরাটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠতো।”
নিশিতা থামল না। যেন এতদিনের জমে থাকা কথাগুলো আজ বের হয়েই যাবে।
“আর জানিস, ফারিস ভাই যখন আবার দেশে এলেন… আমি প্রোপোজও করেছিলাম।”
এই কথার পর নিশিতার কণ্ঠ কেঁপে উঠলো। সে আর কথা শেষ করতে পারলো না।
রিয়া ধীরে ধীরে বলল,
“চড় মেরেছিলো… তাই না?”
নিশিতা কোনো কথা বলল না। শুধু মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল।হঠাৎ করেই ফারিসের আগের করা আচরণগুলো একে একে নিশিতার মনে ভেসে উঠতেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে এলো। যেন অদৃশ্য কোনো পাথর চাপা দিয়ে বসেছে বুকের ওপর। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। গলা শুকিয়ে আসছিল, কথা বলতে গেলেই শব্দগুলো আটকে যাচ্ছিল মাঝপথে। চোখ দুটো অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভিজে উঠছিল, জল জমে কাঁপছিল দৃষ্টির কিনারায়।
এই অবস্থায় রিয়া তার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল,
“শক্ত হ নিশি। এবার আমিও দেখবো—ভাইয়া তোকে ভালো না বেসে কিভাবে থাকতে পারে!”
রিয়ার কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, চোখে ছিল প্রতিজ্ঞার ঝিলিক।
“এবার আমি আর তুই মিলে সব ঠিক করবো। তুই কোনো চিন্তা করিস না, বোন আমার।”
রিয়ার কথায় নিশিতার ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ একটা হাসি ফুটে উঠলো। সে কিছু বলতে যাবে—ঠিক সেই মুহূর্তেই নিচতলা থেকে আমেনা চৌধুরীর ডাক ভেসে এলো,
“নিশিতা রিয়া!”
হঠাৎ ভাঙা মুহূর্তের মতো নিশিতা রিয়ার দিকে তাকালো। চোখের ভাষায় অনেক কথা জমে ছিল, কিন্তু মুখে কিছুই এলো না। শুধু বলল,
“চল তো… দেখি আম্মু কেন ডাকছে।”
রিয়া মাথা নাড়ালো। নিশিতা যে কথাগুলো বলতে চেয়েছিল যেগুলো বুকের ভেতরে এতক্ষণ ধরে জমে ছিল সেগুলো আর বলা হলো না। যেন সময়টা ইচ্ছে করেই থেমে গেলো মাঝপথে।
নিচে নামতে নামতে নিশিতা চোখের পানি হাতের আড়ালে মুছে নিল। নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলো। গভীর শ্বাস নিয়ে, মুখে স্বাভাবিক ভাব আনার চেষ্টা করে দাঁড়ালো আমেনা চৌধুরীর সামনে। আমেনা চৌধুরী মায়া ভরা কণ্ঠে বললেন,
“মা, তোরা দুজন একটু তনয়ার সাথে গিয়ে কথা বলবি? ওর মনটা আজকাল ভালো থাকে না। কী হয়েছে বুঝতে পারছি না আমাকে কিছুই বলে না।”
কথাগুলো বলতে বলতে মায়ের চোখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ ফুটে উঠলো।
“তোরা গিয়ে একটু কথা বলিস।”
নিশিতা মনে মনে ভাবলো—সত্যিই তো, গত কয়েক মাস ধরেই তনয়া কেমন অদ্ভুত হয়ে গেছে। আগের মতো হাসি নেই, গল্প নেই। সারাক্ষণ নিজের রুমে দরজা বন্ধ করে বসে থাকে। সবাই সামনে থাকলেও ফোনে ডুবে থাকে।
আজকাল তো কারও সামনে আসতেও চায় না।
হলোটা কী তনয়ার?
নিশিতা নরম গলায় বলল,
“আচ্ছা আম্মু। তুমি গিয়ে একটু রেস্ট করো। আমি আর রিয়া যাচ্ছি আপুর রুমে।”
আমেনা চৌধুরী মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিলেন। ধীরে ধীরে নিজের রুমের দিকে চলে গেলেন তিনি।
আজকাল আর কিছুতেই তার ভালো লাগে না। ছেলে-মেয়েরা ঠিকঠাক না থাকলে কোনো মা–বাবারই শান্তি থাকে না। বুকের ভেতরটা অকারণেই ভারী হয়ে থাকে। আমেনা চৌধুরীর ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়।
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৩৮
নিজের রুমে এসে তিনি বিছানায় শুয়ে পড়লেন। চোখ বন্ধ করলেন। সকাল থেকে কাজ করে শরীরটাও একটু বিশ্রাম চাইছে। এদিকে রিয়া আর নিশিতা একসাথে উপরের দিকে এগিয়ে গেলো। উপরের করিডোরটা নিস্তব্ধ। রাজীবের রুমের পাশের ঘরটাই তনয়ার। দু’জন এসে দাঁড়ালো দরজার সামনে।
নিশিতা হালকা করে দরজায় ধাক্কা দিতেই দরজাটা খুলে গেলো। রিয়া আর নিশিতা একসাথে ভেতরে প্রবেশ করলো। ঘরের ভেতরে কী অপেক্ষা করছে—কোন নতুন অজানা সত্য, কোন চাপা কষ্ট তা কেউই তখন জানতো না।
