চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৬০
আয়াত বিনতে নূর
রেস্টুরেন্ট থেকে সবাই অনেক আগেই বের হয়ে এসেছে।
বাইরের রাস্তাটা তখনও নিজের চিরচেনা ব্যস্ততায় ছুটে চলেছে। একের পর এক গাড়ি ছুটে যাচ্ছে, পথচারীদের ব্যস্ত পায়ে রাস্তার দুপাশ সরগরম, আশপাশের দোকানপাট থেকে ভেসে আসছে মানুষের কথাবার্তা। কোথাও গাড়ির হর্ন, কোথাও পথচারীদের কোলাহল—সব মিলিয়ে চারপাশ যেন জীবনের স্বাভাবিক গতিতেই এগিয়ে চলেছে।
অথচ সেই ব্যস্ততার মাঝেও তনয়া আর কিয়াসের চারপাশটা কেমন যেন অদ্ভুতভাবে স্তব্ধ।
দুজনের মাঝেই নেমে এসেছে এক গভীর নীরবতা। এমন নীরবতা, যেখানে মুখে কোনো কথা নেই, অথচ মনের ভেতর হাজারো প্রশ্ন একসঙ্গে চিৎকার করে বেড়াচ্ছে।
কী হবে সামনে?
এই একটি প্রশ্নই যেন বারবার ফিরে এসে তাদের দুজনের চিন্তাগুলোকে আরও ভারী করে তুলছে।
সম্পর্কগুলোর পরিণতি কোন দিকে গিয়ে দাঁড়াবে? এতদিন ধরে যেসব সম্পর্ককে তারা নিজেদের মতো করে আঁকড়ে ধরে রেখেছে, সেগুলোর শেষটা কি সত্যিই তাদের ইচ্ছেমতো হবে? নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু এমন এক দিকে মোড় নেবে, যেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো পথ থাকবে না?
ভাবনাগুলো যতবার মাথায় আসছে, ততবারই বুকের ভেতর অজানা এক অস্বস্তি জমাট বাঁধছে।
তনয়া নীরবে সামনে তাকিয়ে রইল। চারপাশের ব্যস্ততা তার চোখের সামনে থাকলেও সেসব যেন কিছুই দেখতে পাচ্ছে না সে। দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে শূন্যের দিকে, অথচ মনের ভেতরটা অস্থির হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে এক চিন্তা থেকে আরেক চিন্তায়।
কিয়াসের অবস্থাও ঠিক একই।
তার মুখে স্বাভাবিকতার কোনো ছাপ নেই। গম্ভীর হয়ে আছে পুরো মুখাবয়ব। মাঝেমধ্যে গভীরভাবে শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করলেও মনের ভেতরের অস্থিরতাটা কিছুতেই কমছে না।
কিছু কিছু মুহূর্তে মানুষ যতটা না নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় পায়, তার চেয়েও বেশি ভয় পায় প্রিয় মানুষগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে।
আর ঠিক সেই ভয়টাই যেন ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছে তনয়া আর কিয়াসকে।
তারা দুজনেই জানে—সামনে যা আসছে, তা হয়তো শুধু একটা সিদ্ধান্ত নয়।
তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেকগুলো মানুষের অনুভূতি, অনেকগুলো সম্পর্ক আর হয়তো অনেকগুলো জীবনের পরিণতি।
পাশের একটা চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে ছয়জন। অথচ এতগুলো মানুষ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকলেও জায়গাটাজুড়ে যেন কারও অস্তিত্ব নেই—কথা নেই, নড়াচড়া নেই, শুধু ভারী হয়ে থাকা এক অস্বস্তিকর নীরবতা।
পিনপতন নীরবতা।
চায়ের দোকানের পাশ দিয়ে একের পর এক গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। কোথাও রিকশার ঘণ্টা বাজছে, কোথাও মানুষের ব্যস্ত পায়ের শব্দ, দোকানদারের হাঁকডাক, রাস্তার কোলাহল—সবকিছুই স্বাভাবিক নিয়মে চলছে। অথচ ফারিসের কাছে যেন কিছুই পৌঁছাচ্ছে না। চারপাশের পৃথিবীটা কেমন জানি হঠাৎ দূরে সরে গেছে। তার মাথার ভেতর শুধু একের পর এক চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।
আজ এভাবে হুট করে এতকিছু হয়ে যাবে—এটা তার কল্পনারও বাইরে ছিল।
রাগে আর বিরক্তিতে ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠছে তার চোয়াল। দুই হাত মুঠিবদ্ধ করে রেখেছে সে। আঙুলের গাঁটগুলো পর্যন্ত টানটান হয়ে উঠেছে। নিজের রাগটাকে কোনোভাবে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে, কিন্তু যতই নিজেকে শান্ত করতে চাইছে, ভেতরের অস্বস্তিটা যেন ততই বাড়ছে।
সবচেয়ে বেশি বিরক্ত লাগছে অন্য একটা বিষয় নিয়ে।
বাড়ির দুজন মানুষ এমন একটা সম্পর্কে জড়িয়ে গেছে, অথচ বাড়ির কেউ কিছুই জানে না। বিষয়টা যদি এখন বাড়িতে জানাজানি হয়, তাহলে কী হবে—সেটাই মাথার ভেতর ঘুরছে ফারিসের। এতদিন ধরে সবকিছু নিজের মতো করে সামলে রাখা একটা পরিবারে হঠাৎ এমন ঘটনা সামনে এলে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, সেটা ভেবেই তার মাথা ভার হয়ে আসছে।
একসময় ফারিস ধীরে ধীরে চোখ তুলে সবার দিকে তাকাল।
নিশিতা তার একদম পাশেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটার মুখেও কোনো কথা নেই। তবে তার চোখেমুখে এমন একটা সতর্কতা, যেন সে খুব ভালো করেই বুঝে গেছে—এই মুহূর্তে ফারিসের সঙ্গে অপ্রয়োজনে একটা কথাও বলা মানে নিজের বিপদ নিজেই ডেকে আনা।
তাই নিশ্চুপ।
অন্যদিকে তনয়া, কিয়াস, রাজীব আর অহনাও যেন অপরাধী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কারও চোখে চোখ রাখার সাহস নেই। এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজটা তারাই করে ফেলেছে এবং এখন শাস্তি ঘোষণার অপেক্ষায়।
কিছুক্ষণ সবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকার পর ফারিস অবশেষে তনয়া আর কিয়াসের দিকে চোখ স্থির করল।
তার কণ্ঠ যখন নীরবতা ভাঙল, তখন সেই গম্ভীর স্বর শুনে আশপাশের বাতাসটাও যেন আরও ভারী হয়ে উঠল।
—“কবে থেকে স্টার্ট এগুলো? আর বাড়ির কাউকে কিছু বলিসনি কেনো?”
প্রশ্নটা খুব সাধারণভাবে করা হলেও কণ্ঠের কঠোরতা তনয়ার বুকের ভেতরটা কাঁপিয়ে দিল।
ফারিসের গম্ভীর কণ্ঠে তনয়া সত্যিই একটু কেঁপে উঠল। ঠোঁট দুটো সামান্য শুকিয়ে এলো। কীভাবে শুরু করবে, কোথা থেকে বলবে—কিছুই যেন মাথায় ঠিকঠাক সাজাতে পারছে না। এতদিনের লুকিয়ে রাখা কথাগুলো হঠাৎ করে সবার সামনে বলতে হবে, ভাবতেই বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা ভয় জমে উঠেছে।
সে ধীরে ধীরে মুখ খুলে কিছু বলতে যাবে—
তার আগেই কিয়াস তাকে থামিয়ে দিল।
তনয়ার দিকে একবার তাকিয়ে কিয়াস যেন নীরবে বুঝিয়ে দিল, আর তাকে কিছু বলতে হবে না। এরপর নিজেই এক পা এগিয়ে গেল ফারিসের কাছাকাছি।
তার চোখে ভয় ছিল, কিন্তু সেই ভয়কে ছাপিয়ে ছিল এক ধরনের দৃঢ়তা। সে ফারিসের চোখে চোখ রাখল। এবার আর এড়িয়ে যাওয়ার কোনো চেষ্টা নেই। যত প্রশ্ন, যত অভিযোগ—সবকিছুর উত্তর নিজেকেই দিতে হবে, এমন একটা মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই কিয়াস কথা বলা শুরু করল।
কিয়াস বলতে শুরু করতেই শুধু ফারিস নয়, উপস্থিত সবাই মনোযোগ দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল।
একটা একটা করে কথা শুনতে শুনতে সবার চোখেমুখের ভাব বদলে যেতে লাগল।
শুরুটা ছিল সামান্য একটা পার্টিতে পরিচয় থেকে। অথচ সেই সামান্য পরিচয় কীভাবে এতদূর এগিয়ে গেছে, সেটা শুনতে শুনতে ফারিস নিজেও অবাক হয়ে গেল। তার ধারণার চেয়েও অনেক বেশি গভীর হয়ে গেছে সম্পর্কটা।
কিয়াস শেষ পর্যন্ত ফারিসের দিকে তাকিয়েই আকুতি ভরা কণ্ঠে বলল—
—“আমি চাই না মি. চৌধুরী তনয়া সবার চোখে খারাপ হয়ে যাক। আমি চাই স্বসম্মানে ওকে নিজের বাড়ির বউ করে আনতে। সব থেকে বড় কথা হলো আমার মম, ড্যাড সব কিছুই জানে এই বিষয়ে শুধু আপনাদের সিদ্ধান্তটায় চাই আমরা। যদি বলেন আজ তাহলে আজই ওকে বিয়ে করতে রাজি আমি। শুধু রিকুয়েস্ট করবো প্লিজ ওকে আমার থেকে দূরে করে দিবেন না। সহ্য করতে পারবো না।”
শেষ কথাগুলো বলার সময় কিয়াসের গলার স্বরটা যেন আরও নরম হয়ে গেল। চোখেমুখে এমন এক আকুলতা ফুটে উঠল, যেন তনয়াকে হারানোর চিন্তাটাই তার কাছে অসহনীয়।
রাজীবের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
ছেলেটা কতটা আশা নিয়ে ফারিসের সামনে কথাগুলো বলছে! অথচ ফারিস আদৌ নিজের মত পরিবর্তন করবে কি না, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
নিশিতা এতক্ষণ চুপ করে থাকলেও কিয়াসের কথাগুলো শুনে তার মনটাও অজান্তেই নরম হয়ে গেল।
এত ভালো একজন দুলাভাই পেলে কার না ভালো লাগবে?
আর তনয়াকে কিয়াস কতটা ভালোবাসে, সেটা আলাদা করে বলারও প্রয়োজন নেই। তার প্রতিটা কথায়, প্রতিটা সিদ্ধান্তে, এমনকি তনয়ার সম্মান রক্ষা করার এই আকুতিতেও সেই ভালোবাসা স্পষ্ট হয়ে আছে।
নিশিতা ধীরে ধীরে ফারিসের দিকে তাকাল।
বরাবরের মতোই তার মুখে কোনো অনুভূতি খুঁজে পাওয়া গেল না। চোখ দুটোও যেন অদ্ভুতভাবে স্থির। পরিস্থিতি এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে ফারিসকে বোঝানোর কোনো উপায়ও নেই। এখন সে কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটার ওপরই সবকিছু নির্ভর করছে।
তনয়ার চোখে তখন পানি টলমল করছে।
চোখের পাতার কিনারায় জমে থাকা পানিটুকু যেন আর একটু হলেই গড়িয়ে পড়বে গাল বেয়ে। অথচ সে চোখের পানি আটকানোর চেষ্টাও করছে না। কারণ এই মুহূর্তে তার নিজের অনুভূতিগুলোই যেন তার কাছে নতুন।
সে জানতই না, কিয়াস তাকে এতটা ভালোবাসে।
এমনকি ফারিসের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য এভাবে আকুতি জানাবে—এটাও কখনো কল্পনা করেনি তনয়া।
এতটা ভালোবাসা কি সত্যিই সে প্রাপ্য?
কেউ একজন তাকে এত অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের জীবনের এতটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দিয়ে ফেলেছে। শুধু ভালোবাসার কথা বলেই থেমে থাকেনি, বরং তাকে নিজের বাড়ির বউ হিসেবে সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করতে চাইছে।
অথচ তনয়া তো এতকিছু কল্পনাতেও আনেনি।
টলমল চোখে সে এবার ফারিসের দিকে তাকাল।
ফারিসও তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
কিন্তু সেই দৃষ্টির অর্থ বুঝতে পারল না তনয়া।
সেখানে রাগ নেই।
গম্ভীরতাও নেই।
শুধু একটা প্রশ্ন।
তনয়া কী চায়?
সে কি এতে রাজি?
কথা না বলেও যেন ফারিসের চোখ দুটো সেই প্রশ্নটাই করছে।
কয়েক মুহূর্ত পর তনয়া ইশারাটা বুঝতে পারল।
তার অধর ধীরে ধীরে এলিয়ে গেল। চোখে পানি নিয়েই মুখে ফুটে উঠল ছোট্ট একটা হাসি।
সত্যিই কি তাহলে ফারিস রাজি?
এই মানুষটা রাজি থাকলে কেউ কোনো কিছুতেই বাধা দিতে পারবে না—এটা তনয়া জানে। বাড়ির সবাই যদি কারও ওপর সবচেয়ে বেশি ভরসা আর আস্থা রাখে, তাহলে সে হলো ফারিস। ফারিসের একটা সিদ্ধান্ত অনেক সময় পুরো পরিবারের সিদ্ধান্ত হয়ে যায়।
চোখের কোণে জমে থাকা পানিটুকু হাতের আঙুল দিয়ে মুছে ফেলল তনয়া। তারপর হালকা হেসে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
হ্যাঁ।
সে রাজি।
এই ছোট্ট মাথা নাড়াটুকুই যেন ফারিসের সব দ্বিধা মুছে দিল।
তার আর কোনো প্রশ্ন রইল না।
কারণ সে জানে ভালোবাসার কষ্ট কী।
ভালোবাসার মানুষটাকে নিজের করে পেতে কতটা যুদ্ধ করতে হয়, কতটা অপেক্ষা করতে হয়—সেটাও সে জানে।
নিজের চোখের সামনে ভালোবাসার মানুষটাকে দিনের পর দিন বড় হতে দেখেও কাছে যেতে না পারার কষ্টটা কী, সেটা ফারিস খুব ভালো করেই জানে। তাকে ছুঁতে না পারার, নিজের করে বলতে না পারার সেই অসহ্য অনুভূতিটাও তার অচেনা নয়।
বিদেশের মাটিতে বসে শুধু একবার নিশিতাকে দেখার জন্য কত রাত যে অস্থিরতায় কেটেছে, তার হিসাব শুধু ফারিসই জানে।
কত শত রাত ঘুমহীন কেটেছে।
নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পেছনেও ছিল সেই একগুঁয়ে জেদ—তার ভালোবাসাকে পাওয়ার জেদ।
সেই সময় দিনের পর দিন নিশিতার সঙ্গে ভালো করে কথা পর্যন্ত বলেনি সে। অথচ আড়ালে আড়ালে বাড়ির কেউ জেনে গেলে কী হবে, কীভাবে সবকিছু সামলাবে—এসব নিয়ে হাজারো চিন্তা তাকে গ্রাস করত।
সেই ভয়, সেই অপেক্ষা, সেই ভালোবাসাকে নিজের করে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা—সব মিলিয়ে কতটা কঠিন সময় পার করেছে সে, সেটা ফারিস ছাড়া আর কেউ জানে না।
নিজের থেকেও বেশি ভালোবেসে সেই ভালোবাসা প্রকাশ করতে না পারার কষ্টটা কেমন, সেটাও তার জানা।
আর ঠিক সেই জায়গা থেকেই তনয়া আর কিয়াসের সম্পর্কটাকে দেখল ফারিস।
হঠাৎ করেই তার ভেতরের সব রাগ, বিরক্তি আর গম্ভীরতা যেন ধীরে ধীরে সরে গেল।
সে কেন বাঁধা দেবে?
কিয়াস খারাপ ছেলে নয়। বরং বড্ড বেশি ভালো।
ভদ্রতা, সৌজন্যতা—সব দিক দিয়েই ছেলেটা পরিপূর্ণ। তনয়ার মতো একটা মেয়েকে ভালোবাসার ক্ষেত্রে তার উদ্দেশ্যেও কোনো অস্পষ্টতা নেই। বরং নিজের ভালোবাসাকে সম্মানের সঙ্গে পরিণতি দিতে চাইছে।
তাহলে না করার কোনো যুক্তিই এখানে খাটে না।
তবুও সবার সামনে ফারিস নরম হলো না।
তার মুখের গাম্ভীর্য একই রকম রইল। কণ্ঠেও প্রকাশ পেল না ভেতরের পরিবর্তনটা।
সে কিয়াসের মুখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল—
—“দেখুন মি. তালুকদার, যদি আপনি আমার বোনকে বিয়ে করেন তাহলে আমার মত দিতে কোনো প্রবলেম নেই। এমনিতেও এসবের বিষয়ে আমার কিছু বলার নেই।”
কিয়াস ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
মনের ভেতর থেকে যেন একটা ভারী পাথর নেমে গেল তার।
যাক!
তনয়াকে আর হারাতে হবে না।
অন্তত এতটুকু নিশ্চিত হতে পারল সে—তার ভালোবাসা তারই থাকবে।
কিছুক্ষণ থেমে আবার ফারিস বলল—
—“যদি বলি কাল আপনার মা বাবা কে নিয়ে আমাদের বাড়ি আসতে? পারবেন?”
ফারিসের কথা শুনে নিশিতার মুখে খুশির ছাপ ফুটে উঠলেও পরমুহূর্তেই তার চোখে বিস্ময় এসে ভর করল।
এত তাড়াতাড়ি?
সবকিছু কি সত্যিই এত দ্রুত সম্ভব?
ফারিস কি আদৌ বুঝে-শুনে বলছে সবকিছু?
অন্যদিকে কিয়াসের মুখটা যেন মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
এমন সুযোগ সে কীভাবে হাতছাড়া করবে?
উৎফুল্ল কণ্ঠে সে বলে উঠল—
—“কবুল। সব কবুল। তার বদলে যদি তনয়া আমার হয়, এতে আমার কোনো সমস্যা নেই।”
ফারিস এবার সরাসরি প্রশ্ন করল—
—“সবার সামনে বলতে পারবেন? ভালোবাসেন তনয়া?”
একটুও সময় নষ্ট করল না কিয়াস।
তার উত্তর যেন আগে থেকেই বুকের ভেতর প্রস্তুত ছিল।
—“পারবো। শুধু সবার সামনে না, পুরো দুনিয়ার সামনে পারবো। শুধু একটা সুযোগ দিন।”
কথাগুলো বলার সময় কিয়াসের চোখে কোনো দ্বিধা ছিল না। ছিল শুধু দৃঢ়তা। এমন দৃঢ়তা, যেখানে ভালোবাসার মানুষটাকে নিজের করে পাওয়ার জন্য পৃথিবীর সামনে দাঁড়ানোর সাহস থাকে।
ফারিস ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।
মনের ভেতর এবার সত্যিই একটা স্বস্তি অনুভব করল সে।
কোনো ভুল মানুষকে ভালোবাসেনি তনয়া।
বরং যোগ্য কাউকেই পেয়েছে।
ফারিসের সিদ্ধান্তে রাজীব, নিশিতা আর অহনা সবাই যেন বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে।
কিছুক্ষণ আগেও যাদের চোখেমুখে ভয় ছিল, এখন সেখানে শুধু বিস্ময়।
কীভাবে রাজি হলো ফারিস?
তারা তো ভেবেছিল আজ তুলকালাম কাণ্ড বাঁধবে। ফারিস রাগে সবাইকে একসঙ্গে ধুয়ে দেবে।
অথচ পরিস্থিতি তো সোজা বিয়ে পর্যন্ত চলে যাচ্ছে!
কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই কিয়াস আবার বলল—
—“তবে মি. চৌধুরী, আমরা কালই যেতে চাই। আপনি যদি বলেন, তবে বাড়ির সবাই বিষয়টা কীভাবে নেবে এটা বুঝতে পারছি না।”
কথাটা বলতে গিয়ে কিয়াসের কণ্ঠে এবার সামান্য ইতস্ততভাব চলে এলো। সে একটু থেমে আবার বলল—
—“যদি সবাইকে একটু বলতে আগে নিয়ে…”
কথাটা শেষ করার আগেই ফারিসও যেন বিষয়টা বুঝে ফেলল।
ঠিকই তো।
শুভ কাজে দেরি করা ঠিক হবে না।
কিয়াস যখন নিজেই সম্পর্কটাকে এবার বিয়ে পর্যন্ত নিয়ে যেতে চাইছে, তখন অযথা সময় নষ্ট করার কোনো কারণ নেই।
তাছাড়া তনয়ার সম্মতিও সে পেয়েছে।
তাহলে আর অপেক্ষা কেন?
অন্যদিকে তনয়া নিজেই যেন এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না ঘটনাগুলো সত্যিই ঘটছে।
ফারিস এত তাড়াতাড়ি রাজি হয়ে গেল?তার মাথাটা আপাতত চক্কর দিচ্ছে।
খুশি হচ্ছে সে, ভীষণ খুশি। কিন্তু সেই খুশির মাঝেও মনের একেবারে গভীরে একটা প্রশ্ন জেগেই আছে।
এত দ্রুত সবকিছু কীভাবে হয়ে যাচ্ছে?
সবাইকে আরেক দফা অবাক করে দিয়ে ফারিস এবার পকেট থেকে ফোন বের করল।
কাউকে একটা কল করল সে।নিশিতা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
তারপর যেন সবার কাছেই বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে গেল।
ফারিস বাড়িতেই ফোন করছে।
হঠাৎ এমন কাণ্ডে মুহূর্তের জন্য যেন রাস্তার সমস্ত কোলাহলও তাদের ছুঁতে পারল না। গাড়ির শব্দ, মানুষের ভিড়, দোকানের ব্যস্ততা—সবকিছু যেন দূরের কোনো জগতের আওয়াজ হয়ে গেল।
নিশিতা অবাক চোখে তনয়ার হাতটা শক্ত করে ধরে রইল।
তনয়াও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিজের চোখকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।
ফারিস কী করছে?এত তাড়াহুড়ো কেন?
ধীরে-সুস্থে, সময় নিয়ে সবকিছু করলেই তো হতো।
কিন্তু ফারিস যেন আজ আর কোনো অপেক্ষার মধ্যে থাকতে রাজি নয়।
সবকিছু কেমন অদ্ভুত দ্রুততায় ছুটে চলছে।যেন জীবনটা হঠাৎ করেই নিজের গতিটা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
আর সেই ছুটে চলা জীবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ছয়জন মানুষ শুধু নিঃশব্দে তাকিয়ে দেখছে—একটা সম্পর্ক, যেটা এতদিন লুকিয়ে ছিল, আজ হঠাৎ করেই পরিণতির দিকে ছুটে যাচ্ছে।
চৌধুরী বাড়ি—
কিছুক্ষণ আগেই বাড়ির কর্তারা বাড়িতে ফিরেছে। সারাদিনের ব্যস্ততা আর ক্লান্তি শেষে সবাই যে যার রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে এখন একসঙ্গে বসেছে। ড্রয়িংরুমজুড়ে ছড়িয়ে আছে পরিচিত এক পারিবারিক আবহ—কেউ গল্প করছে, কেউ টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে আছে, আবার কেউবা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তায় ব্যস্ত।
রিয়াও বসে আছে তাদের মাঝেই।
তবে এই স্বাভাবিক, পরিচিত পরিবেশের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এমন একটি সত্য, যেটা এই মুহূর্তে বাড়ির আর কেউ জানে না।
নিশিতা বাড়িতে নেই।
সে যে ফারিসের সঙ্গে বাইরে বেরিয়েছে, সেই খবরটা সম্পূর্ণ অজানা সবার কাছে। বাড়ির সবাই বরং ধরে নিয়েছে, মেয়েটা হয়তো নিজের ঘরে ঘুমিয়ে আছে। আমেনা চৌধুরী বেশ কয়েকবার নিশিতাকে ডেকেছেন, কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে শেষ পর্যন্ত আর বিরক্ত করেননি। ভেবেছেন, হয়তো গভীর ঘুমে আছে।
এদিকে বাড়ির গিন্নিরা সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন সন্ধ্যার নাস্তা তৈরিতে। রান্নাঘর থেকে একের পর এক বাসনপত্রের শব্দ ভেসে আসছে। আর ড্রয়িংরুমে বসে আড্ডায় মেতে উঠেছেন আরাফাত চৌধুরী আর আলতাফ চৌধুরী।
রিয়া কখনো তাদের কথার মাঝখানে দু-একটা কথা বলছে, আবার কখনো টেলিভিশনের দিকে মন দিচ্ছে। সবকিছুই যেন একেবারে স্বাভাবিক।
ঠিক সেই মুহূর্তেই—
হুট করে আলতাফ চৌধুরীর ফোনটা বেজে উঠল।
অপ্রত্যাশিত ফোনের শব্দে মুহূর্তেই সবার কথাবার্তা থেমে গেল। আচমকা এমনভাবে ফোন বেজে ওঠায় উপস্থিত সবাই একবার করে তার দিকে তাকাল। রিয়ার চোখ দুটোও কেমন বড় বড় হয়ে গেল।
আলতাফ চৌধুরী ফোনটা হাতে তুলে স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই বুকের ভেতরটা সামান্য কেঁপে উঠল।
ফারিসের কল।
এতদিন পর হঠাৎ ফারিসের ফোন—কী এমন হলো যে এই সময়ে ফোন করেছে?
অবশ্য আর কিছু না ভেবেই কলটা রিসিভ করলেন তিনি।
—হ্যালো ফারিস! কিছু হয়েছে কি? এভাবে হুট করে কল দিলে?
ওপাশ থেকে ফারিসের কণ্ঠ ভেসে এলো। আশ্চর্যজনকভাবে কণ্ঠটা বেশ স্বাভাবিক।
—তোমার কাছে কিন্তু চাই ছোট আব্বু। দিবে আমাকে?
আলতাফ চৌধুরী কিছুটা থমকে গেলেন।
ফারিসের কথার মানে যেন ঠিক বুঝতে পারলেন না তিনি। কী চাইছে ছেলে? কেনই বা এভাবে বলছে?
তবুও এতদিন পর ছেলে নিজে মুখ ফুটে কিছু চাইছে—এটাই যেন তার কাছে বড় হয়ে দাঁড়াল। সাধ্যের মধ্যে হলে ফারিস যা চাইবে, তিনি কেন দেবেন না?
মুখে হালকা একটা হাসি ফুটিয়ে তিনি বললেন—
—বলো ফারিস, তোমার কী চাই?
ওপাশ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ এলো।
তারপর ফারিস বলতে শুরু করল।
একটা একটা করে খুলে বলতে লাগল সবকিছু। কোথা থেকে এর শুরু, কীভাবে ঘটনাগুলো এগিয়েছে, আর কোথায় গিয়ে তনয়াদের সম্পর্কের সমাপ্তি হবে—সবকিছুই বলতে থাকল সে।
তার কণ্ঠে ছিল এক অদ্ভুত স্থিরতা। যেন অনেক ভেবেচিন্তেই প্রতিটি কথাকে গুছিয়ে বলছে।
ভালোবাসা অপরাধ না।
আর তনয়া যথেষ্ট বাধ্য মেয়ে।
এই কথাগুলোও ফারিস স্পষ্ট করে জানিয়ে দিল।
একসময় থেমে গেল সে।
কিন্তু ওপাশে নেমে এলো অস্বাভাবিক নীরবতা।
আলতাফ চৌধুরী যেন হঠাৎ করেই বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। ফারিসের বলা প্রতিটি কথা তার মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে।
তনয়ার মতো মেয়ে এমন কোনো কাজ করতে পারে—এটা তার কল্পনারও বাইরে ছিল।
তার বুকের ভেতরটা অদ্ভুত এক ব্যথায় চিনচিন করে উঠল।
মেয়েকে নিয়ে কত শত স্বপ্ন ছিল তার। কত আশা, কত পরিকল্পনা। অথচ সেই মেয়েই শেষ পর্যন্ত এমন একটা কাজ করবে—এটা তিনি কখনো কল্পনাতেও আনেননি।
মুহূর্তের মধ্যেই যেন চারপাশটা ভারী হয়ে এলো।
ওপাশ থেকে কোনো জবাব না পেয়ে ফারিসের কণ্ঠে এবার উদ্বেগ ফুটে উঠল—
—হ্যালো… হ্যালো ছোট আব্বু? আর ইউ ওকে?
ফারিসের কণ্ঠেই যেন আলতাফ চৌধুরীর ধ্যান ভাঙল।
কিন্তু তার মুখের আগের কোমলতা আর নেই। চোখেমুখে জমে উঠেছে কঠোরতা। ভেতরের আঘাতটা যেন মুহূর্তেই রাগে পরিণত হয়েছে।
কঠিন কণ্ঠে তিনি বলে উঠলেন—
—এখন তুমি কী চাও? আরও বেশি প্রশ্রয় দিই ওর কাজগুলোকে? বাড়ির মেয়ে সম্পর্ক করেছে বিজনেস পার্টনারের সঙ্গে, সেটা মেনে নিয়ে চুপ করে থাকব আমরা?
কথাগুলো যেন ঘরের বাতাসটাই বদলে দিল।
রিয়া তড়িৎ বেগে ঝটকা খেল।
তার চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক। কী হচ্ছে এসব?
সে ধীরে ধীরে পাশে বসে থাকা আরাফাত চৌধুরীর দিকে তাকাল।
কিন্তু আরাফাত চৌধুরীর মুখ দেখে রিয়ার নিজের কাছেই কেমন পাগল পাগল লাগতে শুরু করল।
আরাফাত চৌধুরী তো সবকিছু শুনে চুপচাপ থাকার মানুষ নন।
ফোনের ওপাশ থেকে ফারিসের কথাগুলো নিশ্চয়ই তিনিও শুনেছেন। তাহলে এভাবে নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকার মানে কী?
রিয়ার বুকের ভেতরটা অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল।
এদিকে আলতাফ চৌধুরীর রাগ যেন ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তিনি একের পর এক কথা বলে যাচ্ছেন। কণ্ঠের তীব্রতা বাড়ছে, আর প্রতিটি শব্দের সঙ্গে যেন নিজের ভেতরের আঘাত, অপমান আর ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন।
এই মুহূর্তে যেন তার নিজের মাথার ওপরই বাজ ভেঙে পড়েছে।
অন্যদিকে ফোনের ওপাশে ফারিসও বিরক্ত হয়ে উঠল।
আলতাফ চৌধুরীর চেঁচামেচি তার একদমই পছন্দ হলো না। সে তো সবকিছু বোঝানোর জন্যই ফোন করেছে। অথচ তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই এভাবে চেঁচামেচি করা হচ্ছে।
এদিকে আলতাফ চৌধুরীর চিৎকারে রান্নাঘর থেকে তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে এলেন আমেনা চৌধুরী আর আফিয়া চৌধুরী।
প্রায় দৌড়ে এসে দুজনেই ড্রয়িংরুমে দাঁড়ালেন।
দৃশ্যটা দেখে তারা কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে রইলেন।
আলতাফ চৌধুরীর কথাগুলোর কয়েকটা অংশ কানে যেতেই আর বুঝতে বাকি রইল না কী হয়েছে।
আমেনা চৌধুরীর চোখ দুটো মুহূর্তেই ভিজে উঠল।
তারপর কোনো বাধা মানল না সেই পানি।
দুই চোখ বেয়ে ধীরে ধীরে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল।
আজ, এই প্রথমবারের মতো তার মনের ভেতর একটা আফসোস জন্ম নিল—
কেন তার ছেলে হলো না?
দুটো মেয়েকে নিয়ে কতশত স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কত পরিকল্পনা, কত আশা। মেয়েদের সুখের জন্য নিজের মতো করে কত কিছুই না ভেবেছেন।
অথচ আজ সবকিছু যেন উল্টো হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মেয়ে দুটো তাদের কথা না ভেবেই নিজেদের মর্জিমতো যা খুশি করে গেছে। অথচ তারা তো মেয়েদের ঘিরেই কত শত স্বপ্ন সাজিয়েছিল।
এই বাড়িতে শান্তি হয়তো কখনোই আসবে না।
একটার পর একটা নতুন ঝামেলা যেন তাদের জীবনে এসে দাঁড়াচ্ছে।
কিছু মাস আগেই ফারিস আর নিশিতার বিষয় নিয়ে এতটা মাতামাতি হয়েছে। সেই ঝামেলা শেষ হতে না হতেই এবার তনয়াকে নিয়ে নতুন সমস্যা।
এখন এই ঝামেলার সমাধান কে দেবে?
দিন শেষে দোষটা তো আমেনা চৌধুরীর ঘাড়েই এসে পড়বে।
তিনি কেন মেয়েদের সামলে রাখতে পারেননি?
কেন ঠিকমতো শিক্ষা দিতে পারেননি?
এত প্রশ্নের উত্তর তিনি কীভাবে দেবেন?
লজ্জা, অপমান আর অসহায়তায় মনে হলো তার সম্মানটা আজ যেন মাটিতে গিয়ে ঠেকেছে।
আমেনা চৌধুরীর এমন অবস্থা দেখে আফিয়া চৌধুরী আর নিজেকে স্থির রাখতে পারলেন না। এগিয়ে এসে তাকে দুহাত দিয়ে আগলে নিলেন বাহুডোরে।
আমেনা চৌধুরী মাথা নিচু করে ফেললেন।
লজ্জা আর অপমানবোধে মুখ তুলে কারও দিকে তাকানোর শক্তিটুকুও যেন তার নেই। চোখ দুটো আজ কোনোভাবেই বাঁধ মানছে না।
রিয়া দৃশ্যটা দেখে আর এক মুহূর্তও বসে থাকতে পারল না।
একপ্রকার ছুটে গিয়ে আমেনা চৌধুরীর পাশে দাঁড়াল সে।
তার মুখেও দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।
এদিকে আলতাফ চৌধুরী তখনও একের পর এক কথা বলে যাচ্ছেন।
আর ফোনের ওপাশে ফারিস?
সে যেন ডোন্ট কেয়ার হয়ে সবকিছু শুনছে। কিংবা শুনেও না শোনার ভান করছে।
কিন্তু সময় যত গড়াতে লাগল, ফারিসের ভেতরে জমে থাকা রাগও ততই বাড়তে লাগল।
কিছু মুহূর্ত পর আর নিজের রাগ কন্ট্রোল করতে পারল না সে।
রাগের তোপে তার শরীরের শিরা-উপশিরা যেন ফুটে উঠেছে। চোয়াল শক্ত হয়ে আছে, কণ্ঠের ভেতর জমে উঠেছে প্রচণ্ড ক্ষোভ।
দৃশ্যটা যেন ফোনের ওপাশে না থেকেও উপস্থিত সবাইকে অনুভব করিয়ে দিল—
বড় কোনো ঝড় সামনে অপেক্ষা করছে।
আর সেই ঝড় হয়তো এবার সবকিছু শেষ করে দেবে।
ফারিস চিৎকার দিয়ে কিছু বলবে—
তার আগেই আচমকা আরাফাত চৌধুরী আলতাফ চৌধুরীর হাত থেকে একপ্রকার ছোঁ মেরে ফোনটা কেড়ে নিলেন।
তারপর বড় বড় চোখ করে তাকালেন আলতাফ চৌধুরীর দিকে।
সেই দৃষ্টিতে এমন কিছু ছিল যে, মুহূর্তেই থতমত খেয়ে গেলেন আলতাফ চৌধুরী।
আরাফাত চৌধুরী আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করলেন না।
হাতে ধরা ফোনটা কানে তুলে ফারিসকে উদ্দেশ্য করে বললেন—
চোখের আড়ালে ভালোবাসি পর্ব ৫৯
—ওদেরকে নিয়ে বাড়ি এসো। বাড়িতেই সব কথা হবে। আর যত পারো তাড়াতাড়ি এসো।
ব্যস।
এতোটুকুই বললেন তিনি।
তারপর কোনো কথা বাড়ানোর সুযোগ না দিয়ে ফোনটা কেটে দিলেন।
ড্রয়িংরুমজুড়ে আবার নেমে এলো ভারী এক নীরবতা।
কিন্তু সেই নীরবতার আড়ালে যেন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে আসন্ন ঝড়ের শব্দ।
