ডেসটেনি পর্ব ৪১
সুহাসিনি মিমি
বিকেলের ঝিরিঝিরি বৃষ্টিটা থামতে থামতে বেলা গড়ালো সন্ধ্যায়। টিনের চালের কার্নিশ থেকে টুপটাপ করে দু-এক ফোঁটা পানি ঝরে পড়ছে তখনো।চার বন্ধুর দুপুরে আসার কথা থাকলেও, এলো সন্ধ্যায়। রাতে এখানেই তাদের নৈশভোজ। বাড়ির হবু জামাই আসবে শোনে শেখ বাড়ির বৈঠকঘরটা সেই সকাল থেকে পরিষ্কার করেছে মেয়েরা।বেশ কিছু পুরোনো জিনিসপত্র সরিয়ে নতুনরূপে আনা হয়েছে। সোফার কভারগুলোও নতুন করে লাগানো হয়েছে।
সেখানে এসে একে একে বসল তাজধীর, সেহরোজ, অর্ণব আর ফাহিম। একটা বড় সোফার মাঝে বসেছে অর্ণব, দুইপাশে তাজধীর আর সেহরোজ। ওদের ঠিক বিপরীত দিকে রাখা সিঙ্গেল সোফাটায় আয়েশ করে বসেছে ফাহিম। চারজনের সামনে জোড়া লাগিয়ে রাখা হয়েছে ছোট ছোট তিনটে টি-টেবিল। আর সেই টেবিলগুলোর ওপর সাজানো বাহারি পদের নাস্তা।
বসার ঘরে মেহমানদের সাথে তখন উপস্থিত পুরো শেখ পরিবারের মুরুব্বিরা। পাভেল,পাভেলের বড় চাচা, মেহেরিনের বাবা, ফুফুরা এবং দাদিও আছেন উপস্থিত।পাভেলের দাদি অবশ্য আগে থেকেই তাজধীরকে চিনে।মুরুব্বিদের সবার কৌতূহলী চোখ বারেবারে গিয়ে পড়ছে তাদের হবু জামাই,সেহরোজের ওপর।মেহরিণ এর বাবার বুকটা অজানা তৃপ্তিতে ভরে গেল। মনে মনে ভাবলেন তার এই চঞ্চল, ডানপিটে, অবাধ্য মেয়েটার কপালে এত রুচিশীল আর রাজপুত্রের মতো এক বর জুটবে তা তো কখনো কল্পনাও করেনি সে! তার মেয়েটা সত্যি বড় ভাগ্যবতী!
বড় চাচাও চশমার উপর দিয়ে সেহরোজ আর তাজধীরকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলেন। পাত্র দেখে তিনি ভীষণ সন্তুষ্ট। মেহেরিনের বড় চাচা গলা খাঁকারি দিয়ে প্রথম প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন,
‘তা বাবারা আমাদের এই গ্রামীণ পরিবেশ কেমন লাগছে তোমাদের? কোনো অসুবিধা হচ্ছেনা ত এখানে?’
ওরা একযোগে বলল,
’না আংকেল!বরং শহরের যান্ত্রিক আর দমবন্ধকরে পরিবেশের থেকে এই শান্ত গ্রামটা সত্যি খুব চমৎকার। খুব ভালো লাগছে আমাদের।’
‘তা তোমরা এখন কোথায় থাকছ?’
তাজধীর সংক্ষেপে উত্তর দিল,
‘চট্টগ্রামে আংকেল!’
প্রিয়ন্তীর বড় চাচা বললেন,
‘তোমরা চারজন কি ছোট বেলা থেকেই একসঙ্গে?’
তাজধীর বলল,
‘জিহ!কাজ করছি ও একসঙ্গে!’
ফুফুরাও আড়ালে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলাবলি করছিলেন,
‘আহা! জামাইটা যা হয়েছে না! একদম যেন রাজপুত্র! আমাদের মেহরিণ এর পাশে মাশাআল্লাহ যা লাগবে না ভাবি!’
পাশ থেকে ছোট ফুপিও বললেন,
‘আমাদের প্রিয়টার জন্যও যদি এরকম একটা রাজপুত্র পেতাম!’
শেখ বাড়ির মুরুব্বিরা যখন একে একে এসে সেহরোজ আর তাজধীরকে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করছিল অর্ণব তখন পেটের ভেতর হাসি চেপে মহা আনন্দে সেটা উপভোগ করছিল। প্রতিটি গম্ভীর প্রশ্নের জবাবে সেহরোজ আর তাজধীর যেভাবে অতি-ভদ্র সাজার প্রানপন চেষ্টা করছে তা দেখে বেচারা অর্ণবের অবস্থা কাহিল।
মেহেরিনের বাবা আর পাভেলের বড় চাচা লক্ষ্য করলেন চারজনই কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে। মেহমানরা মুরুব্বিদের সামনে পুরোপুরি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ নাও করতে পারে ভেবেই মেহেরিনের বাবা বেশ অমায়িক হেসে উঠে দাঁড়ালেন,
’তোমরা নিজেদের মতো গল্পসল্প করো, কেমন? রাতে খাবারের টেবিলে একেবারে একসাথে জমিয়ে কথা হবে। নাস্তাগুলো শেষ করো এখন!’
মুরুব্বিরা হাসিমুখে একে একে ড্রয়িংরুম ছেড়ে ভেতরের দিকে চলে গেলেন। বায়োজেস্টরা যেতেই হাফ ছাড়ল অর্ণব। নুসরাত ট্রে করে জুসের গ্লাস নিয়ে হাজির হলো তখন। ট্রে-টা ওদের সামনে রাখতে রাখতে বলল,
’কী ব্যাপার দুলাভাই? আপনি তো কিছুই নিচ্ছেন না!’
’আমরাও কিন্ত খাইনি এখনো।’
অর্ণবের কথায় ফিক করে হেসে উঠল নুসরাত। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আড়ি পেতে আছে বাকি মেয়েরা। নুসরাত তাজধীর বরাবর জুসের গ্লাস এগিয়ে ধরল। বলল,
‘আপনি তো আমাদের পুরোনো আত্মীয় বেয়াই সাব! আগে তাই আপনিই নিন!’
তাজধীর ধরার আগে অর্ণবই ছো মেরে কেড়ে নিলো গ্লাসটা। শব্দ করে হেসে বলে উঠল,
‘পুরোনো আত্মীয়, পাশাপাশি ডাবল আত্মীয়!’
‘এ্যা?’
‘কিছুনা। তুমি আরেক গ্লাস ঐযে, উনাকে দাও!’
ইশারায় ফাহিম কে দেখাল অর্ণব। নুসরাত মুখটা মলিন করে পরের গ্লাসটা ফাহিম কে দিলো। তাজধীর বলল,
‘আমরা নিয়ে খেতে পারব। আপনার কষ্ট করা লাগবেনা।’
নুসরাতের মুখটা এইটুকুন হয়ে এলো। ট্রে-টা রেখেই চলে গেল। নুসরাত যেতেই তাজধীর বরাবর খানিকটা ঝুকে এলো অর্ণব। গলা নামিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
’ঘটনা কী বল তো? ওনারা এত এত খাবারের পাহাড় সাজিয়ে দিচ্ছে কেন? বাই চান্স ওনারা কি কোনোভাবে আঁচ পেয়ে গেছেন যে ড্রয়িংরুমে একটা জামাই না,দুই-দুইটা জামাই একসাথে এসে বসে আছে?’
সোফার নিচ থেকেই অর্ণবের পায়ের উপর পা চেপে ধরল তাজধীর। ব্যথায় কুঁকড়ে উঠল অর্ণব খানিকটা। নড়েচড়ে বসল, পা ছাড়াতে। কিছু হয়নি এমন ভাবেই গলা ঝেড়ে সোজা হয়ে বসল তাজধীর। তখুনি ছোট ছোট পায়ে দৌড়ে এলো একটা বাচ্চা মেয়ে। বয়স বড়োজোর দুইয়ের গড়ে হবে হয়তো।প্রিয়ন্তীর কাজিন রাশেদ, এর মেয়ে। পিচ্চি মেয়েটা টলমল পায়ে হেঁটে সোজা চলে এলো টেবিলের কাছটায়। বড় বড় গোল গোল চোখ মেলে সোফায় বসা চারজন পুরুষের দিকে তাকাল একপল। এরপর গিয়ে থামল ডানপাশে বসে থাকা তাজধীরের সামনে! ছোট ছোট হাত দুটি গুটিয়ে,গোলগোল চোখে চেয়ে থেকে ভাঙা ভাঙা মিষ্টি গলায় শুধাল,
’তুমি… তুমি কি আলমার মে হেলিন ফুপিল বল? হু ছুন্দর ফুপা?’
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বসল তাজধীর! কিছু বলার জন্য মুখ খুলবে তার আগেই মাঝখানে বসা অর্ণব সোফায় পিঠ ঠেকিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল!বন্ধুর এমন দিশেহারা মুখ দেখে আনন্দ সামলাতে না পেরে বাচ্চাটার দিকে ঝুঁকে বলল,
’রং নাম্বার ডায়াল করেছ মামণি! তোমার এই সুপ্রসিদ্ধ সুন্দর ফুফা কিন্তু এখন হোল্ডিংয়ে আছে! আসল ফুফা তো বসেছে ওই বাঁ পাশে!’
কথা শেষে অর্ণব আড়চোখে তাজধীরের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট চেপে বিড়বিড় করে যোগ করল ফির,
’যদিও এটাও তোমার লুকাইয়িত ফুপা’ই!’
চট করে ঘাড় ঘুরিয়ে অর্ণব কে চোখ রাঙালো তাজধীর। অর্ণব ভাবলেশহীন উত্তর দিল,
’কী রে ভাই? এমন করে তাকাস কেন? মিথ্যা কথা কই বললাম?’
’নুসইবা আম্মু এদিকে আসো।আংকেলদের জ্বালায় না।’
দরজার সামনে থেকে মায়ের ডাকেও পিছু পা হলোনা মেয়েটা। উল্টো অর্ণবের কথা মত সেহরোজ এর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। চকোলেট মাখা ঠোঁট দুটো চাটতে চাটতে সেহরোজকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল।আদো আদো গলায় বলল,
’তুমি আলমার ফুপা?’
এবারেও অর্ণব উত্তর দিল আগে,
’হ্যাঁ মামণি!ওইটাই তোমার ভবিষ্যৎ ফুপা!’
কাঁচা গিলে খাওয়ার মত নজড়ে বিদ্দ্ব করল সেহরোজ। নুসাইবা এবার দুই হাত ওপরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে আবদার করে বসল,
’ফুপা আমাতে কোল নাও! নাও!’
গুনে গুনে দুই তিনটে চওড়া ভাজ ফুটল বেচারা সেহরোজের কপালে!এমনিতেই অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতাপ্রবণ ছেলে কিনা! আর তার ওপর এই বাচ্চাটার দুই ঠোঁটের চারপাশে আবার থকথকে চকোলেট লেগে রয়েছে! সাদা রঙের সুতির গোল ফ্রকটায়ও চকলেটের মাখামাখি।সেহরোজ অস্বস্তিতে পড়ল বেশ। হাতখানা বাড়িয়েও আবার গুটিয়ে নিচ্ছে। দরজা থেকে বারবার মেয়েকে ডেকে যাচ্ছেন নুসাইবার মা,
‘আম্মু। তোমার গায়ে ময়লা। আংকেল তোমায় পরে কোলে নিবে। চলে এসো।’
তাজধীর সেহরোজ কে চোখে ইশারা করতেই খানিকটা নরম হলো সেহরোজ। অসস্তি চেপে দুই হাত বাড়িয়ে কোলে তুলে নিলো বাচ্চাটাকে। সেহরোজ যখন হাত বাড়িয়ে নুসাইবাকে সোফা থেকে তুলছিল, ঠিক তখনই নুসাইবার ছোট্ট পায়ের ধাক্কায় টি-টেবিলের ওপর রাখা গ্লাসভর্তি তরমুজের লাল জুসের গ্লাসটা একদম উল্টে গিয়ে পড়ল সেহরোজের পরে থাকা অফ-হোয়াইট রঙের প্যান্টের ঠিক উরুর ওপর!
’শিট!’
তরফর করে বাচ্চাটাকে কোল থেকে নামিয়ে দিলো সে। সোফা থেকে এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে ঝাড়তে লাগল।বাচ্চার কাণ্ড দেখে দূরে দাঁড়িয়ে থাকা নুসাইবার মা হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে এল ড্রয়িংরুমে!
’নুসাইবা, কি করেছো তুমি এটা?এইজন্যই তখন আসতে দেয়নি। ফাজিল মেয়ে একটা!’
বলতে বলতে মেয়েকে কোলে তুলে নিল মার্জিয়া। লজ্জিত মুখে নুসরাতের হাতে বাচ্চাটাকে দিয়ে বলল,
’নুসরাত, ওকে ভেতরে নিয়ে যা তো!’
পরপর সেহরোজের দিকে চেয়ে ভীষণ অনুতপ্তবোধ নিয়ে বললেন,
’আমি সত্যি ভীষণ দুঃখিত ভাইয়া! বাচ্চা মানুষ। বুঝতে পারেনি! আপানার ড্রেসটা একবারে নষ্ট করে দিল! ভাইয়া আপনি প্লিজ রাগ করবেন না। পাশে ওয়াশরুম আছে আসেন আমি আপনাকে ওয়াশরুমটা দেখিয়ে দিচ্ছি।একটু ওয়াশ করে নেবেন চলুন!’
সেহরোজ বলল,
’ইটস… ইটস ওকে! নো প্রবলেম!কোনো সমস্যা নেই। বাড়িতে গিয়ে চেঞ্জ করে নিব!’
‘আহারে এই কথাটা যে বেচারা কতটা কষ্টে মুখ থেকে বের করেছে, সেটা একমাত্র আল্লাহই জানে।’
অর্ণবের বিরাবিরানিতে তাজধীর মৃদু কণ্ঠে ধমকে উঠল ওকে।মার্জিয়া আবারও অনুরোধ করল,
’না না ভাইয়া।এভাবে ভিজা প্যান্ট নিয়ে তো বসে থাকা যাবে না! আসুন আমার সাথে। আমি পাশে ভেতরের গেস্ট ওয়াশরুমটা দেখিয়ে দিচ্ছি, প্যান্টটা একটু পানি দিয়ে পরিষ্কার করে নিন।আমি কাউকে দিয়ে আপনাদের বাড়ি থেকে প্যান্ট আনিয়ে দিচ্ছি!’
‘প্রয়োজন নেই। জাস্ট ক্লিন করলেই হবে।’
মার্জিয়া সেহরোজ কে নিয়ে ভিতরের দিকে এগোলো। থামল এসে কমন রুমটায় সামনে। আপাতত রুমটার ভেতরের পরিবেশ বেশ গমগম করছে। কার্পেটের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে রিমোট কার, ব্লকস আর একগাদা খেলনা। ছয়-সাতটা ছোট বাচ্চা গোল হয়ে বসে টিভিতে কার্টুন দেখতে দেখতে হুলস্থুল চিল্লাচিল্লি করছে। মার্জিয়া দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গলা উঁচু করে ডাকল,
‘এই, সবাই বের হও তো! বের হও, বের হও। রুম খালি করো। তোমরা অন্য ঘরে গিয়ে খেলো।’
বাচ্চাগুলো একসাথে বিরক্তিকর শব্দ করে একে একে উঠানের দিকে ছুটল। মার্জিয়া সেহরোজের দিকে ফিরে অমায়িক হেসে ভেতরের দিকে হাত ইশারা করে বলল,
’ভাইয়া, এই যে রুমের সাথেই ডানপাশের অ্যাটাচড ওয়াশরুমটা।’
সেহরোজ প্যান্টের লাল দাগটার দিকে তাকিয়ে অস্বস্তি চেপে জোরপূর্বক সৌজন্যমূলক হাসি ফুটিয়ে জবাব দিল,
‘জি। ধন্যবাদ।’
মার্জিয়া চলে গেল। এদিকে কমন রুম থেকে বাচ্চারা তখনও বের হচ্ছে। দুটো বাচ্চা দরজার কাছে এসে কোনো একটা বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে তর্কে জড়িয়ে পড়ল।
‘আমি আগে যাব!’
‘না, আমি আগে যাব!’
‘তুই সব সময় আগে সবকিছু করিস কেন?’
‘কারণ আমি বড়!’
দুজনের ঠেলাঠেলিতে একজনের হাত গিয়ে দরজায় লাগল।প্যাচ প্যাচ শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল সেটা।
বাচ্চা দুটো অবশ্য সেদিকে আর খেয়ালই করল না। নিজেরা ঝগড়া করতে করতে ছুটে চলে গেল উঠোনে।
‘আরেহ আরেহ দরজা লাগাইসোস কেন? ঐটা তো নষ্ট লক!’
রুম বরাবর একপাশে একটা খাট বিছানো। খাটের পিছনের দিকটায় ছোট একটা কাঠের আলমারি আছে। যাবতীয় ঔষুধপত্র ওই আলমারিতেই রাখা হয়। সেখান থেকেই খুঁজে খুঁজে একটা ব্যথার মলম হাতে নিয়ে চেচিয়ে উঠে দাঁড়াল মেহরিণ।
এই দরজাটার লকটা নস্ট। লাগালে অটোমেটিক লক হয়ে যায় বাইরে থেকে। ভিতর থেকে তখন আর খোলা যায়না। সেহরোজ ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো তখুনি।
ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দে চমকে উল্টো ঘুরল মেহরিণ। আর অমনি বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হলো মেয়েটা। একই অবস্থা সেহরোজ এর বেলাতেও। সেও হতবাক। সেহরোজ এর কুচকানো চোখ গিয়ে বিদ্দ্ব হলো মেহরিনের হাতে থাকা ব্যথানাশক ‘ভোল্টারেলিন’ মলমটায়। মেহরিণ দেখল লোকটার প্যান্ট টা ভিজা। বুঝল কারণবশত ওয়াশরুমে এসেছে হয়তো। তাই হাঁসফাঁস করতে করতে টিপে টিপে দরজার দিকে দু-পা এগোলো। ঢোক গিলে তোতলাতে তোতলাতে মিনমিন করে বলে উঠল,
‘আ… আসলে… এই দরজার লকটা একটু সমস্যা। লেগে গেলে বাইরে থেকে লক হয়ে যায়। চাবি ছাড়া খোলা যায় না।’
বলে উল্টো ঘুরল ও। চোখ মুখ খিচে ওখান থেকেই চেঁচিয়ে উঠল আবার,
‘মুয়াজ!এই মুয়াজ! আছিস এখানে? দরজাটা খুলে দে। বড় মা? কেউ শুনতাছো?’
ওপাশ থেকে এলোনা কোনো উত্তর। মেহরিণ পা টিপে টিপে আরো দু কদম এগোতে এগোতে ডাকল আবারও,
‘মার্জিয়া ভাবি?কেউ কি আছো বাইরে?দরজাটা খোলো!’
গলা ফাটিয়ে ডাকছে মেহরিণ। মেয়েটার এরূপ চেঁচামেচিতে সেহরোজের টানটান কপাল বিরক্তি আর উৎকণ্ঠায় আরও কুঁচকে এলো।একটা বিরক্তির শ্বাস ফেলে দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
’গলার আওয়াজ কমাও ইডিয়েট!’
মেহরিণ বোকার মত চেয়ে বলল,
‘না ডাকলে তো কেউ শুনবে না। তাহলে দরজা খুলব কিভাবে?’
সেহরোজ গজগজিয়ে বলল,
‘তোমার এই আকাশবাতাস কাঁপানো চিৎকার শুনে বাড়ির সবাই ছুটে আসবে। এরপর যখন লক খুলে আমাদের দুজনকে একসাথে দেখবে, তখন পরিস্থিতি কতটা মেস তৈরি করবে সেটা বোঝার মতো সামান্য বুদ্ধিশুদ্ধি কি তোমার মাথায় আছে?’
কথাটা অবশ্য ভুল নয়। সত্যিই তো। ওতো অসশত ভেবে দেখেনি। ওদের দুজনকে একত্রে দেখলে মানুষজন কানাগুশা শুরু করবে। সবচেয়ে বড় কথা ওর মা যদি জানতে পারে ওর পায়ে ব্যথা পাওয়ার কথা তাহলে আরেক পা পিটিয়ে ভাঙবে।ওর ভাবনায় মাঝেই দেখল লোকটা এগিয়ে আসছে সামনে। মেহরিণ এর বুকটা ধুকপুক করে উঠল। ও সেখান থেকে সরে দাঁড়াতে গিয়ে পায়ের ব্যথায় চোখ মুখ খিচিয়ে নিলো। তারপরও অন্যদিকটায় পা বাড়াল। ব্যথায় ব্যালান্স হারিয়ে পড়তে নিলে দুটো শক্ত পোক্ত হাত ওকে সামলে ধরল। সেই হাতের কব্জিতে ভর দিয়ে এবার মেহরিণ সোজা হয়ে দাঁড়াল। লোকটার গায়ের তীব্র, মাতাল করা সুবাস আর গায়ের তাপে মেহেরিনের চঞ্চল বুকটা দড়াস দড়াস করে কাঁপছে।
সেহরোজ কপাল টানটান করে রুক্ষ সরে আওড়াল,
‘ইডিয়েট!এতো ব্যথা পেয়েও বাঁদরামি করার অভ্যাস যায়না। তাইনা?’
অভিমানে নাক ফুলিয়ে বলল মেহরিণ,
‘আমায় একদম বকতে আসবেন না। আপনার জন্যই পেয়েছি ব্যথা!’
‘আমার জন্য?’
মেহরিণ চুপচাপ ভাবল। লোকটার জন্যই তো। নাতো এই লোকের সঙ্গে ওর বিয়ে ঠিক হতো আর নাতো ওকে ঘর বন্ধি করে রাখত। ঘর বন্ধি না থাকলে তো লুকিয়ে, দৌড়ে বৃষ্টিতে ভিজতে যেতে হতোনা।সামনের উঠোন দিয়েই যেত। তাহলে ঘুরেফিরে তো এই লোকটার জন্যই হলো সবটা। সেহরোজ মেহরিণ কে নিয়ে বসালো বিছানার উপর। হাতে থাকা ওর ব্যথার মলমটা টেনে নিয়ে নিজে হাটু গেড়ে বসল ফ্লোরে।দৃঢ় সরে বলল,
‘কোথায় ব্যথা পেয়েছো। দেখি?’
মেহরিণ তাজ্জব হয়ে চাইল। কে বলছে এই কথা? কানে ঠিক শুনল কি? ওকে এভাবে বিস্মিত হয়ে চাইতে দেখেই কপাল গুটিয়ে পুনরায় ধমকে উঠল লোকটা,
‘ইডিয়েট কোথায় পেয়েছো ব্যথা?’
মেহরিণ মিউয়ে এলো। কোথায় ব্যথা পেয়েছে এটা কিভাবে দেখাবে? দেখানো তো দূর! মুখ ফুটে ব্যথার জায়গার কথাও তো বলা দুস্কর! ও ইতস্তত হয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলো। কাচুমাচু হয়ে পা দুটো সরিয়ে নিতে চাইলেই এতক্ষনে সম্বিৎ ফিরে পায় সেহরোজ। ভ্রু কুচকিয়ে তাকায় মেয়েটার ফ্যাকাসে মুখটায়। এরপর ফট করেই উঠে দাঁড়ায় বসা থেকে।
তাজধীর ফোন স্ক্রলিং করে যাচ্ছে। অর্ণব আর ফাহিম দাদির সঙ্গে এটা সেটা নিয়ে গল্প জুড়েছে পুরোদমে। মিতালী একবার এসে সবার সঙ্গে কথাবার্তা বলে গেছে। দরজার চৌকাঠে আবারও এসে হাজির হলো মিতালী। কানে ফোন চেপে ডাকল ভাইকে,
’ভাইয়া। আম্মু তোমার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাইছে।’
বোনের কথা শেষ হতে না হতেই চট করে উঠে দাঁড়াল তাজধীর। এদিক ওদিক না চেয়েই লম্বা লম্বা কদমে বেরোলো সেখান থেকে। অর্ণব বাঁকা চোখে লক্ষ্য করল সবটা।
মিতালীর পিছন পিছনে হাটছে তাজধীর। বেশ কয়েকবার লক্ষ্য করেছে বোন তার মিটমিটি হেসে যাচ্ছে তখন থেকে। তাজধীর এবার ধমকে উঠল গুরুগম্ভীর কণ্ঠে,
‘এখানে হাসার কি হলো?’
থতমত খেয়ে বসল বেচারি। মুখ খিচিয়ে বলল,
‘কই? কিছু নাতো!’
‘তাহলে এভাবে বলদের কত হাসছিস কেন?’
‘এমনি!’
কথার মাঝেই একটা রুমের সামনে এসে থেমে দাঁড়াল মিতালী। এই রুমটা একদম শেষের কোণায়।
জায়গাটা বেশ কিছুটা নিভৃত, শান্ত। মিতালী ঘাড় ঘুরিয়ে সাবধানে ডানে-বাঁয়ে চোখ বুলাল। নিশ্চিত হয়ে নিল যে এদিকটায় কেউ আছে কিনা। সব ফাঁকা দেখে বেশ তোড়জোড় দিয়ে দরজা খুলে নিম্মসরে আওয়াজ তুলল,
’ভাইয়া! এই রুম!’
তাজধীর পকেটে দুই হাত পুরে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকে গেল। হাবভাব এমন যেন কতবারই না এসেছে এভাবে। তার পরিচিত কক্ষ। মিতালী ফুস করে শ্বাস ছাড়ল। পুনরায় ডানে বাঁয়ে চোখ ঘুরিয়ে দরজা টানতে টানতে মিনমিন করে বলল,
‘ভাইয়া খুব বেশিক্ষণ সময় দিতে পারব না কিন্ত! একটু জলদি ম্যানেজ করে নিও!’
সশব্দে টেনে দিলো দরজার সিটকিনি। তারপর দরজার পিঠ ঠেকিয়ে ফোন টিপতে লাগল।
বিকেলের দিকে একটা লম্বা ঘুম দিয়েছিলো প্রিয়ন্তী। উঠেছে এই মাত্রই।ওয়াশরুম থেকে হাতমুখ ধুয়ে বেরিয়ে এলো। ত্বকজুড়ে তাজা পানিরবিন্দু টলমল করছে। চোখের লম্বা পাপড়িগুলো ভিজে একাকার হয়ে পরস্পর লেপ্টে আছে। কপালের দুই পাশে কানের কাছে ভিজে থাকা চুলের গোছাগুলো লেপ্টে রয়েছে সযত্নে।
প্রিয়ন্তী ওয়াশরুমের দরজাটা টেনে বন্ধ করে পিছনেই ফিরতেই চারশো চল্লিশ ভোল্টের শর্ট খেল যেন। সামনে,বন্ধ কাঠের দরজাটিতে পিঠ ঠেকিয়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘদেহী পুরুষ। দু-হাত বুকের ওপর আড়াআড়ি করে ভাঁজ করা। দু-জোড়া ধারালো, গভীর কৃষ্ণবর্ণ চোখ একদম স্থির হয়ে আঠার মতো তাক করা ওর দিকে।
‘আপনি… আপনি এখানে কীভাবে এলেন? মাথা খারাপ হয়ে গেছে আপনার? কেউ দেখে ফেললে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে! বের হোন প্লিজ। এক্ষুনি বের হোন এখান থেকে!’
তাজধীর নড়ল না এক চুলও। মন্ত্রমুগ্ধের মতো একদৃষ্টে চেয়ে রইল প্রিয়ন্তীর মেকআপহীন স্নিগ্ধ মুখখানার দিকে। কৃত্রিম প্রসাধনীহীন এই সতেজ রূপ যেন কোনো ক্যানভাসের সেরা চিত্রকর্ম! ভেজা চোখের পাপড়ি,গাল বেয়ে চুইয়ে পড়া পানির ফোঁটা, আর তারচেয়েও বেশি যা তাজধীরকে তীব্রভাবে আকর্ষিত করল,তা হলো প্রিয়ন্তীর নাকের বামপাশে থাকা ছোট্ট হিরের নোজপিনটা! সেই নোজপিনের ঠিক মাঝখানে চিকচিক করছে একফোঁটা পানির বিন্দু।
তাজধীর কে গভীর ভাবে আকর্ষণ করল তা। লোকটার এই সম্মোহনী চাহনিতে বুকটা লাফিয়ে উঠল প্রিয়ন্তীর। হৃদস্পন্দন হলোদ্রুততর।প্রিয়ন্তীর বুক ভেদ করে সোজা ভেতরে গিয়ে বিধল সেই চাহুনি।
‘কি করব বলেন? আপনি তো যান নি। তাই বাধ্য হয়ে আমাই আসতে হলো। তাছাড়া আপনি যে হাড়ে আপনার শাস্তির পরিমান বাড়াচ্ছেন। ভাবলাম ছোট মানুষ। একসঙ্গে এতগুলো শাস্তি দিলে শরীরে কুলিয়ে উঠতে পারবেন না। তাই নিজে থেকে শাস্তির পরিমান কমাতে এলাম।’
দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়েছে তাজধীর।ধীরে ধীরে এগোচ্ছে মেয়েটা বরাবর। লোকটাকে এভাবে এগোতে দেখে পিছালো প্রিয়ন্তী। পিছাতে পিছাতে গিয়ে পিঠ ঠেকল ওয়াশরুমের দরজায়। কাপা কাপা সরে বলে উঠল,
‘আপনি এভাবে আগাচ্ছেন কেন?’
‘আপনি পিছাচ্ছেন কেন?’
উত্তরের বদলে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ল লোকটা। যদিও এটা আর এমন কি। সবসময় তো এমনটাই করে উনি। তাজধীর এগোতে এগোতেই হুট্ করে থেমে দাঁড়াল। মেয়েটার আপাদমস্তক মোহনীয় চোখে পরখ করে নিয়ে ঠোঁট কামড়ে বলল,
‘উম নট ব্যাড! এভাবেও খারাপ লাগছেনা দেখতে!’
প্রিয়ন্তী কি মনে করে যেন নিজের দিকে চাইল। অমনি মাথায় বাজ পড়ল ওর। আতঙ্কিত হয়ে ওড়নার কথা দিব্বি ভুলে বসেছে এতক্ষন যাবৎ!ইশ এভাবে ওড়না ছাড়া লোকটার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল ও? ভাবতেই লজ্জায় মাথা কাঁটা যাচ্ছে। তৎক্ষণাৎ দৌড়ে ছো মেরে খাট খেতে ওড়না টেনে গায়ে জোড়ালো ও। বাঁকা হাসল তাজধীর। প্রিয়ন্তী আতঙ্কিত হয়ে বলল,
‘প্লিজ চলে যান। এভাবে কেউ আমাদের একসঙ্গে দেখে ফেললে ঝামেলা হয়ে যাবে।এটা গ্রাম। মানুষজন জানতে পারলে খুব সমস্যা হবে।’
‘দেখুক!’
‘বুঝতে পারছেন না আপনি। দেখলে অনেক বড় ঝামেলা হয়ে যাবে বলছি।’
‘কি হবে? বড়োজোর দুজন কে একসঙ্গে ধরেবেঁধে বিয়ে পড়িয়ে দিবে? একবার করেছি, আবার নাহয় সবার সামনেই করলাম। তখন তো আর বউ নিয়ে এতো লুকোচুরি করতে হবেনা। সবার সামনেই প্রকাশ্যে রুমে আসতে যেতে পারব।’
‘এরকম একটা সিরিয়াস বিষয় নিয়েও আপনার ইয়ার্কি করা লাগবে?’
‘তো আপনার কি আমাকে সিরিয়াস মনে হচ্ছেনা মিসেস, সিদ্দিক?’
শেষের সম্মোধনটায় শরীরটা অবশ হয়ে এলো প্রিয়ন্তীর। তাজধীর এগিয়ে আসল। এসে দাঁড়াল ওর কাছাকাছি হয়ে। প্রিয়ন্তী আর নড়তে চড়তে পারল কই। ওই একটা সম্মোধনেই যেন আটকা পরে গেল মেয়েটা। এর মাঝেই আবিষ্কার করল লোকটা একদম ওর মুখোমুখি হয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। সাঁইত্রাস এর মিষ্টি ঘ্রানটা ওকে কাবু করে নিলো।
ওদিকে বসে থাকা ফাহিম আর অর্ণব বসে থাকতে থাকতে বোরড! একটা প্যান্ট ধুতে গিয়ে হারিয়ে গেল। আর আরেকটা মায়ের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে উদাও। সোফায় বসে বসে অর্ণব আর ফাহিম এখন পাভেলের বৃদ্ধা দাদির পান ছেঁচা দেখছে। একপর্যায়ে বাড়ি দেখার নাম করে উঠে দাঁড়াল ওরাও। মুয়াজ ছিল এদিকেই। দাদি মুয়াজ কে ডেকে বললেন,
‘মিতালী কে বল ওদের বাড়িটা একটু ঘুরে দেখাতে।’
খুঁজে খুঁজে মুয়াজ এসে হাজির হলো মিতালীর সামনে।মুয়াজ দূর থেকেই হাঁক ছাড়ল,
’ভাবি। তোমারে দাদি ডাকতাসে।মেহমানগো বাড়ি দেখাতেই বলসে।’
মিতালী ধড়ফড় করে মুয়াজকে ইশারায় থামিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
‘অ্যাঁ? দাদি ডাকছে?তুমি যাও মুয়াজ।দাদিকে বল আমি আসছি!’
‘আইচ্ছা!’
তখনই গলির মোড়ে দেখা মিলল অর্ণব আর ফাহিমের!মিতালীর যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি পেলো! হন্তদন্ত হয়ে অর্ণবকে ডেকে উঠে বলল,
’অর্ণব ভাইয়া! প্লিজ একটু এদিকে আসুন না!’
’আরেহ মিতালী। তাজধিররা ইয়ে মানে তাজধীর কোথায়?’
মিতালী ইশারায় বন্ধ দরজার পানে দেখিয়ে বলল,
‘ভিতরে!’
অর্ণব তাজ্জব হয়ে বলল,
‘এ্যা? আন্টির সঙ্গে কথা বলতে দরজা সিটকিনি দিয়েছে কেন?’
মিতালী ইতস্তত করে নিচু সরে ফিসফিসিয়ে বলল,
’না ভাইয়া। আসলে ভেতরে ভাইয়া প্রিয়ন্তীর সাথে আরকি!’
কয়েক সেকেন্ড হা করে মিতালীর মুখের দিকে চেয়ে রইল অর্ণব। চোখ কপালে তুলে বলল,
’অ্যাঁ? আমাদের শান্ত-শিষ্ট, সাধু-সন্ন্যাসী হিটলার এই বন্ধ ঘরে বউয়ের সাথে?’
‘ভাইয়া, চিল্লাবেন না! শুনতে পাবে কেউ। আপনি এখানে একটু দাঁড়ান। আমি শুনে আসছি দাদি কেন ডাকছে।’
’শুনলি ফাহিম? জীবনে নিজ চোখে না দেখলে তো বিশ্বাসই করতাম না যে আমাদের গম্ভীর হিটলার শেষমেশ বোনের এজেন্টের মারফতে সিক্রেট ডেটিং সার্ভিস চালাচ্ছে!আচ্ছা তুমি যাও। আমরা এদিকেই আছি!’
মিতালী হাফ ছেড়ে বাঁচল,
‘থ্যাঙ্ক ইউ ভাইয়া! আমি এক্ষুনি আসছি।’
মিতালী যেতেই দরজার ফাঁকফকোর খুঁজল অর্ণব। কোথাও ছিদ্র খুঁজে না পেয়ে হতাশ চিত্তে পাহারা দিতে দাঁড়াল।
ফাহিমের পকেটে থাকা ফোনটা ভাইব্রেট করে বাজছে। ফোনটা বের করে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে অবাক গলায় বলে উঠল ও,
‘ সেহরোজ কল দিচ্ছে কেন?’
অর্ণব হাত থেকে কেড়ে নিলো ফোনটা। রিসিভ করে কানে তুলল,
‘হ্যালো!অর্ণব সিকদার ইজ স্পিকিং?’
ফোনের ওপাশ থেকে অর্ণবের কণ্ঠ পেতেই চুপ হয়ে গেল সেহরোজ। মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল ওর। এই আপদটাকেই শেষে ফোন ধরতে হলো? এই ঝামেলা এড়ানোর জন্যই তো ফাহিমকে ফোন দিয়েছিলো ও। মনে মনে অর্ণবের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করে সেহরোজ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।তারপর দাঁতে দাঁত চেপে গম্ভীর কণ্ঠে শুধাল,
‘কোথায় তুই? তোকে একটা জরুরি কাজ করতে হবে।’
‘কোথায় মানে? আমি তো ভাই এখন মাল্টিটাস্কিং করছি! আপাতত ডিফেন্সের চাকরির পাশাপাশি ফ্রিল্যান্স কেয়ারটেকার আর স্পেশাল সিকিউরিটি গার্ডের দায়িত্ব পালন করছি! প্রতি মিনিট চার্জ মাত্র ৫০ ডলার! তোর কোনো সার্ভিস লাগলে নির্দ্বিধায় বলতে পারিস। ইস্পেশাল ফার্স্টক্লাস বন্ধু হিসেবে তোকে আবার ১০% ছাড় দেওয়ার বিশেষ সুবিধাও আছে!’
বিরক্তিতে দাঁত খিঁচিয়ে গর্জে উঠল সেহরোজ,
’ইডিয়ট! ফালতু বকা বন্ধ করবি? ওই বকবকানি থামিয়ে ফাহিমকে ফোনটা দে।’
অর্ণব বুঝল কেইস জটিল। তাই ফাহিম কে ফোন দিয়ে দিলো। ফাহিম কয়েক সেকেন্ড এর মত ককথা বলে কাটল ফোনটা। আসস্থ করল ওর আসছে। অর্ণব জিজ্ঞেস করতে ফাহিম সবটা খুলে বলল।
ওদিকে লোকটার একের পর এক কথার মারপ্যাচে
কোনো যুক্তি খুঁজে পাচ্ছেনা প্রিয়ন্তী। কথা বলতে বলতে এতটা কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছে যে মেয়েটার নিঃশাস আটকে আসার জোগাড় প্রায়। উপরন্তু চাচ্ছেও যেন কেমন ভাবে। হতভম্ব প্রিয়ন্তীকে আরেকটু চমকে দিয়ে আকস্মিক হাত বাড়িয়ে নিজের কাছে টেনে আনল তাজধীর। দুজনের মাঝে দূরত্ব আপাতত নেই চললেই চলে। পরপর আঙ্গুল দিয়ে প্রিয়ন্তীর গালে লেপ্টে থাকা চুলগুলো সরিয়ে কানের পিছনে গুজল। জ্বলজ্বল করা নোসপিনটার দিকে তাকিয়ে শুষ্ক ঢুক গিলও আওড়াল,
‘ক্যান আই টাচ দিজ?’
প্রিয়ন্তী মৌন রইল উত্তরে। লোকটা ওর উত্তরের অপেক্ষাতেও রইল না অবশ্য। তার আগেই শুষ্ক ঠোঁট ডাবিয়ে দিলো ডায়মন্ড এর ছোট নোসপিনটায়। থরথর করে কেঁপে উঠল প্রিয়ন্তী। ওর কণ্ঠনালী শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে যাওয়ার উপক্রম।নোজপিনের সেই পানির ফোঁটাটা শুষে নিলো লোকটা। ওতেই ক্ষান্ত হলোনা। মেয়েটাকে এভাবে ঘন ঘন শ্বাস ফেলতে দেখে কানের পাশে ঝুকে কণ্ঠ খাঁদে নামিয়ে আওড়াল,
‘আপনাকে না বলেছি এভাবে শ্বাস নিবেন না। আপনার এই এলোমেলো শ্বাস প্রশ্বাস আমায় অস্তির করে তুলে ম্যাম! আর আমায় এতোটাও অস্তির করবেন না, যেই অস্তিরতার ভার সামলাতে পারবেন না আপনি।’
বলতে বলতেই ঠোঁট ছুঁয়ে দিলো মেয়েটার কপালে। সময় নিয়ে শব্দ করে চুমু খেলো ওখানে। মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গে আবেশে দু চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো। সেই বন্ধ চোখের পাতায় অনেক্ষন তাকিয়ে রইল লোকটা। তাজধীরের পকেটে থাকা ফোনটা মৃদু শব্দ করে বেজে উঠল তখুনি। বিরক্তিতে দাঁত পিষে ফোনটা টেনে বের করে দেখল, অর্ণব। তাজধীর কেটে দিলো সেটা রিসিভ না করে। কাটতে না কাটতেই আবার কল এলো। এবার বাধ্য হয়েই রিসিভ করল ও। কানে তুলতেই শুনতে পেল,
’সুপ্রিয় দেশবাসী ও ভাইসাবগণ! আপনারা যারা ঘরের ভেতরে রোমান্সের সাগরে ডুব সাঁতার খেলছেন। আপনাদের নির্ধারিত ভালোবাসার সময় কিন্তু শেষ হয়ে এসেছে! অনুগ্রহপূর্বক নিজ দায়িত্বে কুলকুচি করিয়া ডিনারের জন্য প্রস্তুত হউন! সময় শেষ! সময় শেষ! সুপ্রিয় বন্ধুগণ!’
