চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১৮
আরোবা চৌধুরী আরু
অফিস রুমটা এখন অদ্ভুতভাবে নিস্তব্ধ।
মেহরাবের ঠোঁট ফুলে আছে, সামান্য কেটে রক্ত শুকিয়ে গেছে। মেহেরিন, রিদওয়ান, জারিন, রিশা—সবাই একসাথে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছে। পাশে নাফিসা, যার মুখ ফ্যাকাসে, চোখে এখনও ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। আর একপাশে চুপচাপ বসে আছে রিয়াদ, মাথায় মোটা ব্যান্ডেজ বাঁধা। ওর সঙ্গে থাকা ছেলেমেয়েগুলোও ভয়ে মাথা নিচু করে রেখেছে।
ঘটনার পর থেকে ক্যান্টিনে তোলপাড় বেঁধেছিল। নাফিসা অজ্ঞান হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছিল—সে দৃশ্য দেখে রিশার বুক কেঁপে উঠেছিল। এতটা ভয় পেয়ে গিয়েছিল যে কেঁদেও ফেলেছিল ও। তখনই টিচাররা ছুটে এসে পুরো ক্যান্টিন খালি করে, পরিস্থিতি সামাল দেয়।
অন্যদিকে, রিয়াদকে কয়েকজন টিচার ধরে নিয়ে গিয়েছিল স্কুলের মেডিকেল রুমে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা স্যার এসে রিয়াদের মাথার ক্ষত পরীক্ষা করেন। কয়েকটা গভীর কাটা দেখে সঙ্গে সঙ্গে সেলাই দিতে হয়েছিল। মাথা ব্যান্ডেজে ঢাকা, তবুও মুখে রাগের ছাপ স্পষ্ট।
সবকিছু সামলে প্রিন্সিপাল সবার গার্জেনকে খবর পাঠিয়েছেন।
রিশা,রিদওয়ান ও নাফিসার গার্জেন হিসেবে ফোন করা হয়েছিল সায়মানকে। যেহেতু সায়মান প্রিন্সিপালের চেনাজানা, তাই সরাসরি বাড়িতে না জানিয়ে তাকেই ডাকা হয়।
এখন, নিস্তব্ধ অফিস রুমে দরজার বাইরে শব্দ উঠল।
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
এক মুহূর্ত পর ভেতরে ঢুকলেন সায়মান।
দেখেই বোঝা যায়, তাড়াহুড়ো করে ছুটে আসতে হয়েছে। শার্টের বোতাম দুটো খোলা, চোখে ক্লান্তি, শ্বাসপ্রশ্বাস অস্থির। ভেতরে ঢুকেই চারদিকে একবার তাকালো। কিন্তু তার দৃষ্টি সবার আগে আটকে গেল নাফিসার দিকে।
মেয়েটার মুখ ফ্যাকাসে হলেও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সায়মান নিঃশব্দে এক দীর্ঘশ্বাস ফেললো। বুকের ভেতর জমে থাকা টানটা যেন এক মুহূর্তে কিছুটা হলেও হালকা হয়ে গেল।
কারণ প্রিন্সিপালের ফোনে সে শুনেছিল—“নাফিসা অজ্ঞান হয়ে গেছে।”
পুরো ঘটনা না শুনেই ছুটে এসেছিল। মনে হচ্ছিল কিছু একটা ভয়ংকর ঘটে গেছে।
আর এখন, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নাফিসাকে দেখে বুঝলো—
ভয়টা সত্যি হলেও, অন্তত মেয়েটা সুস্থ আছে।
সায়মান ঢুকতেই প্রিন্সিপাল চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন।
গম্ভীর কণ্ঠে বললেন—
— “তোমাকে খুব তাড়াহুড়ো করে আসতে হলো, এজন্য দুঃখিত। কিন্তু পরিস্থিতিটা এতটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল যে আমাকে আর দেরি করা ঠিক মনে হয়নি।”
সায়মান ভ্রু কুঁচকে একবার চারদিকে তাকালো।
প্রিন্সিপাল কাশলেন একবার, তারপর গম্ভীর ভঙ্গিতে বললেন—
— “আসলে আজকে ক্যান্টিনে যা হয়েছে সেটা ভয়ংকর ঘটনা। ওরা সবাই মিলে হট্টগোল করেছে, ঝগড়াঝাটি করেছে। এমনকি শারীরিক আঘাতও লেগেছে। রিয়াদের মাথায় কয়েকটা সেলাই পড়েছে। এরকম ঘটনা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।”
ঘরে দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চাদের মাথা আরও নিচু হয়ে গেল।
রিদওয়ান ঠোঁট কামড়াচ্ছে, নাফিসা কেঁপে কেঁপে দাঁড়িয়ে আছে মেহরিনের ধরে, রিশা ও জারিন ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । মেহরাব ঠোঁটের পাশে হাত চাপা দিয়ে আছে।
সায়মান একটু গম্ভীর সুরে জিজ্ঞেস করলো—
— “ঠিক কী হয়েছিল, স্যার?”
প্রিন্সিপাল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
— “সম্পূর্ণ ঘটনা এখনো টুকরো টুকরোভাবে জানা গেছে। কিন্তু যতটুকু শুনেছি—নাফিসা নিজের হাতে রিয়াদের মাথায় আঘাত করেছে। বাকিরা কেউ থামাতে পারেনি, উল্টে সবাই মিলে ঝামেলাটা আরও বাড়িয়েছে।”
এবার পুরো রুমে চাপা গুঞ্জন উঠল।
নাফিসা হঠাৎ চমকে মাথা তুলল, ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে বলতে চাইল—“আমি…” কিন্তু গলা শুকিয়ে যাওয়ায় কোনো শব্দ বের হলো না।
সায়মান একটু থেমে তার দিকে তাকালো। চোখে রাগ নেই, বরং ভেতরে মিশ্র কিছু—অবাক হওয়া, দুশ্চিন্তা আর অদ্ভুত এক অস্থিরতা।
নরম অথচ স্পষ্ট কণ্ঠে বললেন—
— “আমি আগে পুরো ঘটনা শুনতে চাই।”
প্রিন্সিপাল মাথা নেড়ে বললেন—
— “ঠিক আছে। তবে যাই হোক, সবার গার্ডিয়ানকে ডাকা হবে। স্কুলের নিয়ম ভাঙার জন্য ব্যবস্থা নিতেই হবে।”রকম ঘটনা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা যায় না।”
এক মুহূর্তের জন্য চারিদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল।ঘরে উপস্থিত সবাই মাথা নিচু করে ফেলল।
নাফিসা বুকের ভেতর যেন একটা ঠান্ডা পাথর অনুভব করল।
সবার দৃষ্টি তার দিকে—বন্ধুরা, টিচার, এমনকি রিয়াদও।
আর সায়মান?
চেয়ারের হাতল আঁকড়ে ধরে চুপচাপ তাকিয়ে আছে, শুধু তার চোখদুটো যেন নাফিসার বুকের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে—
কোনো উত্তর না দিয়েও সবকিছু জেনে নিতে চাইছে।
পুরো রুম নিস্তব্ধ। শুধু নাফিসার কান্নার শব্দ ভেসে আসছে।
সায়মান দীর্ঘশ্বাস ফেললো। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ চুপ রইলেন।
তারপর ধীরে ধীরে বললেন—
— “ক্যান্টিনের সিসিটিভি ক্যামেরা চেক করেছেন ।”
প্রিন্সিপাল ভ্রু কুঁচকে বললেন—
— “না, ঠিক মাথায় আসিনি এটা …”, তবে ভালো কথা বলেছেন।”
সঙ্গে সঙ্গেই কম্পিউটার চালু হলো। সবাই নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকল। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেল—ক্যান্টিনের ভেতরে রিয়াদ হঠাৎ নাফিসার হাত চেপে ধরছে, নাফিসা আতঙ্কে ছটফট করছে। এরপর হাত ছাড়ানোর চেষ্টায় পাশের জিনিস দিয়ে আঘাত করে বসে।
ফুটেজ দেখা শেষ হতেই রুমে নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
সায়মান দাঁড়িয়ে রইলো, হাত মুঠো করে রেখেছে। তারপরে চোখ তুলে রিয়াদের দিকে তাকালো। কোনো শব্দ না করে সোজা এগিয়ে গিয়ে রিয়াদের গালে ঠাস করে এক চড় মারলো।
“আহহ!”— রিয়াদের মাথা ঝাঁকিয়ে উঠল। মাথায় সেলাই, তার ওপর আবার এমন চড়—চোখ ঝাপসা হয়ে গেল ওর।শক্ত হাতে থাপ্পড় খেয়ে, মাথা ঝনঝন , এমনি তার মাথায় ব্যথা, তার ওপর এমন দাবাং মার্কা খেয়ে ওর মাথা ভব ভব করে ঘুরছে।
।
প্রিন্সিপাল আঁতকে উঠে বললেন—
— “মি. সায়মান! প্লিজ শান্ত হন, আমি বিষয়টা দেখছি।”
সায়মান গভীর শ্বাস নিয়ে পেছনে সরে এলো, কিন্তু দৃষ্টি এখনও রিয়াদের ওপর। যেন খেয়ে ফেলবেন এমন চোখ।
নাফিসা ভয়ে জমে গেছে।
অন্যদিকে রিশা, জারিন, রিদওয়ান, মেহরাব, মেহেরিন—ওদের মুখে চাপা হাসি ফুটে উঠল। সত্য প্রকাশ পাওয়ায় যেন বুক হালকা হয়েছে।
প্রিন্সিপাল এবার বললেন—
— “ওরা চাইলেই টিচারদের জানাতে পারত। সেটা না করে নিজেরা ঝামেলা করেছে। তাই যেই দোষী হোক, স্কুলের নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতেই হবে।”
সায়মান এবার গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিলেন—
— “শাস্তি দিন, সমস্যা নেই। তবে আমি কথা দিচ্ছি—এভাবে আর কোনোদিন হবে না। আমি ওদের নিজের দায়িত্বে সামলে নেব। আর যদি এমন কিছু আবার হয়…”
তারপর রিয়াদের দিকে তাকালো, কণ্ঠ কঠোর হলো—
— “নেক্সট টাইম আমি নিজে তোকে হসপিটালে পাঠাব। বুঝেছিস?”
রিয়াদ আঁতকে উঠে মাথা নিচু করে রইল। তারপর আবার ভয়ে ভয়ে সায়মানের দিকে তাকালো, রিয়াদের গার্জেন এখনো এসে পৌঁছায়নি।
প্রিন্সিপাল কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকলেন, তারপর ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। ঘরের পরিবেশ ভারী রয়ে গেল।
সায়মান এবার রিদওয়ান, রিশা আর নাফিসার দিকে তাকিয়ে বললো—
— “ব্যাগ নিয়ে এসো। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছি।”
বলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
রিশা নাফিসার হাত শক্ত করে ধরল।
সবার দিকে একবার তাকিয়ে, হালকা হাসি দিয়ে চোখে চোখে কথা বলে নিল। তারপর প্রিন্সিপালের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে দুজনে হাত ধরে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
মেহরাব ওদের চলে যাওয়ার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। চোখে একরকম অদ্ভুত ভাব—হয়তো আফসোস, হয়তো ভেতরের কোনো অস্বস্তি। বাকিরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও সে যেন স্থির দাঁড়িয়ে শুধু তাকিয়েই থাকল দরজার দিকে।
অন্যদিকে, স্কুলের বাইরে দাঁড়ানো গাড়ির সামনে রিদওয়ান থমকে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ পর সায়মান ইশারায় সবাইকে ভেতরে উঠতে বললেন।
রিশা আর নাফিসা নিঃশব্দে পিছনের সিটে গিয়ে বসে পড়ল। দুজনেরই মুখ ফ্যাকাসে, চোখ নামানো। তাদের দুজনের মাঝেই ছড়িয়ে আছে চাপা ভয় আর অস্বস্তি। সামনে বসেছে রিদওয়ান, পাশে সায়মান।
গাড়ির ভেতরটা নিস্তব্ধ। কেবল নীরবতার ভেতরে সবার নিঃশ্বাসের শব্দ মিশে আছে।
হঠাৎ সেই নীরবতা ভেঙে সায়মান কণ্ঠ শক্ত করে বললেন—
— “পরেরবার যদি এরকম কিছু হয়, সঙ্গে সঙ্গে টিচারদের জানাবি তোরা। নিজেরা গোপনে কিছু করার চেষ্টা করবি না। আমি যদি শুনি তোরা আবার ঝামেলা করেছিস—তাহলে কিন্তু তোদের খবর আছে।”
গম্ভীর, কঠোর কণ্ঠে কথা বললেও তার দৃষ্টির ছায়া বিশেষ করে নাফিসার ওপর গিয়ে পড়ল।
নাফিসা ভয়ে জড়সড় হয়ে গেল। শরীর কুঁকড়ে সিটে বসে রইল, ঠোঁট কাঁপল সামান্য। সায়মান এক ঝলক পিছনে তাকালো তার দিকে। চোখে ছিল ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা আর এক অদৃশ্য টান।
নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার সামনের দিকে ঘুরলো।
তারপর গাড়ি স্টার্ট দিল।
গাড়ির চাকা ঘুরতেই বাইরের ভিড়মুখর স্কুল মাঠ যেন পিছিয়ে যেতে লাগল—কিন্তু ভেতরের চারজনের নীরবতা আরও ভারী হয়ে উঠল।
রাস্তার ভেতর দিয়ে গাড়ি আস্তে আস্তে এগিয়ে চলছে। চারপাশে বিকেলের ব্যস্ততা—রিকশার ঘণ্টা, মানুষের কোলাহল, দোকানের ডাকাডাকি—সবকিছু মিলিয়ে বাইরের দুনিয়া যেন স্বাভাবিকই। অথচ গাড়ির ভেতরটা নিস্তব্ধ, চাপা টানটান আবহাওয়া জমে আছে।
এই নীরবতা ভাঙল রিশা। অনেকটা সাহস সঞ্চয় করে আস্তে আস্তে বলল—
— “দাভাই, আসলে দোষটা আমাদের না। ওরা-ই আগে এমনটা করেছিল।”
রিশার কণ্ঠ কেঁপে যাচ্ছিল, যেন কথা বলার সময়ও ভয় পাচ্ছে। পাশ থেকে রিদওয়ানও সুর মিলাল, মাথা নেড়ে বলল—
— “হ্যাঁ, আসলে দোষটা আগে ওদেরই ছিল। আমরা শুধু…”
ওদের কথা শেষ হওয়ার আগেই সায়মান কণ্ঠ ভারী করে বললেন—
— “হ্যাঁ, খুব ভালো করেছিস তোরা। গুন্ডি হয়ে গেছিস তোরা সব। এক একটা ছোট্ট ডন তৈরি হচ্ছিস।”
তারপর কিছুটা বিরক্ত স্বরে আবার বললো—
— “ভালোই হাতের জোর আছে তোদের। মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিস একজনের! গর্ব করার মতো ব্যাপার!”
গাড়ির ভেতর আবার নিস্তব্ধতা নেমে এলো। নাফিসা সিটে কুঁকড়ে বসে পড়ল, ঠোঁট চেপে ধরল শক্ত করে। মনে হলো ভয়ে বুকের ভেতরটা জমে যাচ্ছে।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে রিশা আর রিদওয়ান একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
রিশা বলল—
— “আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না, নাফু এরকম কিছু করবে!”
রিদওয়ানও হেসে উঠল—
— “হ্যাঁ রে, শান্তশিষ্ট নাফিসা যে একদিন কারও মাথায় মেরে মাথা ফাটিয়ে দিবে, এটা তো স্বপ্নেও ভাবিনি!”
ওরা দুজন হেসে কাহকাহ করতে থাকল।
রিশা ঠাট্টা করে বলল—
— “মনে হয় ওরা নাফুকে এতটা রাগিয়েই ফেলেছিল।”
রিদওয়ান যোগ করল—
— “নাফু রেগে গেলে আসলেই কী হতে পারে আজকে বুঝলাম।”
ওদের এই বকবক আর হাসাহাসি গাড়ির ভেতরের ভারী পরিবেশকে কিছুটা হলেও হালকা করে দিল। তবে সায়মান হাসলো না। সামনের আয়নায় চোখ সরিয়ে তিনি শুধু তাকালো—সিটে কুঁকড়ে থাকা নাফিসার দিকে। মেয়েটা এখনও ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে।
সায়মানের বুকের ভেতর কেমন যেন অদ্ভুত এক অনুভূতি ছড়িয়ে গেল—অভিমান, রাগ আর দুশ্চিন্তা সব মিলে। চোখ ফেরাল সামনের রাস্তায়, কিন্তু মনে মনে বারবার ভেসে উঠছে নাফিসার ফ্যাকাসে মুখ।
গাড়ি শেষমেশ বাড়ির সামনে এসে থামল।
সায়মান গম্ভীর কণ্ঠে বললো—
— “নেমে যা।”
রিশা, নাফিসা, রিদওয়ান একে একে নেমে পড়ল।
গাড়ির দরজা বন্ধ করার সময় রিদওয়ান বলল—
— “দাভাই, তুমি আসছ না বাসায়?”
সায়মান এক নিঃশ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বললো—
— “আমি পরে আসব। এখন কাজ আছে, আবার যেতে হবে।”
বলে ইঞ্জিন চালু করলো সায়মান ।
গাড়ি ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল, মিলিয়ে গেল মোড়ে।
ওদিকে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে রিশা আর রিদওয়ান আবার বকবক শুরু করে দিল।
— “আজকে তো দিনটাই অন্যরকম ছিল।”
— “সত্যি বলিস, নাফুর কাণ্ডটা দেখেই তো চমকে গেছিলাম।”
ওরা হেসে হেসে গল্প করতে করতে ভেতরে ঢুকে গেল।
আর নাফিসা?
চুপচাপ মাথা নিচু করে ওদের পেছনে হাঁটছিল। তার মনে হচ্ছিল, সায়মানের চোখ যেন এখনও তার ভেতরে গিয়ে বিঁধে আছে।
বাড়ির ভিতরে ঢুকেই ওরা চলে গেল নিজেদেরব রুমের দিকে। নাফিসাও ধীর পায়ে সিড়ি দিয়ে উপরে ওঠতে লাগল। ধীরে ধীরে পা রাখছে, কিন্তু মনটা এখনও হিম হিম করছে।
সিড়ির মাঝপথে হঠাৎ দেখা হলো সাবিহা খালেদের। সাবিহা নাফিসাকে দেখে থমকে গেল। মুখ কালো করে একপাশে ঘুরে দাঁড়াল—কিছু বলার আগেই নাফিসা হাপার মতো হাপাড়ি হয়ে গেল। মাথা নিচু করে চুপচাপ এগোতে থাকল। মনে হচ্ছিল, চোখ খুললেই কোনো অভিযোগ শুনতে হবে।
নিজের ঘরে ঢুকেই ব্যাগ ধীরে ধীরে রেখে দিল। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়াল। আয়নায় নিজের প্রতিফলন দেখল। চোখে ক্লান্তি, ঠোঁটে সামান্য কাঁপন। হাতের দিকে তাকাল—আজকের ঘটনার স্মৃতি মনে পড়তেই শরীর কেঁপে উঠল। নিজের সেই হাতটি যে আঘাত করেছে, ভাবতেই ভেতরে শিরশির করে ওঠে।
দৃষ্টি ঘুরিয়ে সায়মানের কথা মনে করল—“নেক্সট টাইম থেকে এমন হলে… আমি তোদের খবর রাখব।”
তার গম্ভীর ভঙ্গি, চোখের গভীর চাপে এখনও নাফিসার বুক কেঁপে উঠছে। মনে হলো, এই কথাগুলো এখনো তার হৃদয়ে শক্ত একটা ছাপ ফেলেছে।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল। নিঃশ্বাস নিয়ে হিজাব খুলল। বাথরুমে গিয়ে ধীরে ধীরে শাওয়ার নিল। ঠাণ্ডা জল ছোঁয়ায় শরীরের টানটা ধীরে ধীরে কমতে লাগল। গোসল শেষে পুরো দেহ একেবারে অজু করল।
এরপর ধীরে ধীরে জায়নামাজ বিছিয়ে বসল। হাত মুখের কাছে তুলে গভীর নিঃশ্বাস নিল। দু’হাত বুকের কাছে ভরে, ধীরে ধীরে দু’হাত নামিয়ে নামাজ শুরু করল। প্রতিটি আয়াত পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে শান্তি নেমে আসছে। ধীর গতি, মননশীল ধ্যান, এবং প্রার্থনার শব্দ—সব মিলিয়ে আজকের উত্তেজনা, চাপা ভয়, আর অস্থিরতা কিছুটা হলেও হালকা হচ্ছে।
নাফিসা বুঝতে পারল—এখন তার একা থাকা দরকার। কিছুটা সময়, কিছুটা শান্তি। ধীরে ধীরে সে নামাজ শেষ করল, চোখ বন্ধ করে বসে থাকল। মনে হলো, কিছুটা হলেও আবার নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ ফিরে এসেছে।
নাফিসা বিছানায় ধীরে শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ নিজের ঘুমের জগতে হারিয়ে গেল। কতক্ষণ কেটে গেছে, বুঝতেও পারল না। হঠাৎ ঘড়ির আওয়াজ শোনা গেল—খেয়াল হলো, অনেক বেজে গেছে।
“ওহ না! টিচার পড়াতে আসবেন এখনই,” ভেতরে ভয়ে বলল। দ্রুত ঘুম থেকে উঠল, হাত-মুখ ধুয়ে, বই-খাতা গুছিয়ে স্টাডি রুমের দিকে ছুটল।
স্টাডি রুমে ঢুকতেই দেখল রিশা আগেই বসে আছে। জানালা দিয়ে আলো আসছে, কিন্তু আকাশ এখনো পুরো উজ্জ্বল হয়নি। ধূসর রোদ ছড়িয়ে পড়ছে, বাইরের গাছের ছায়া মাটির উপর নরম দাগ ফেলে দিচ্ছে। হালকা হাওয়া জানালার ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকছে, বইয়ের পাতার মৃদু শব্দে পরিবেশ শান্ত, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মন একটু চাপা উত্তেজনায় ভরা।
নাফিসা ধীরে গিয়ে বসল। বই খুলল, খাতা বের করল। চোখে ভয়, কিন্তু মনোযোগে জোর দিয়ে পড়া শুরু করল।
রিশা পাশে বসে হালকা হাসি দিয়ে বলল—
— “এই নাফু, তোর এত পড়তে ভালো লাগে কেমন করে রে? আমার একদম ভালো লাগে না পড়তে।”
নাফিসা রিশার কথা শুনে হেসে ফেলল। চোখে সামান্য উজ্জ্বলতা ফুটল। তারপর প্রশ্ন করল—
— “রিশু আপু, তুমি বড় হয়ে কি হতে চাও?”
রিশার চোখ চকচক করে উঠল। মুখে আগ্রহের ছাপ, উচ্ছ্বাসের দৃষ্টি—
— “মা হতে চাই! আর আমার ব্ল্যাক ডায়মন্ডের সাথে মিলিয়ে একটা মিক্স কম্বিনেশনের চকলেট পয়দা করতে চাই।”
নাফিসা কিছুই বুঝতে পারল না, শুধু হেসে উঠল। মনে মনে ভেবলো, এই মেয়েটা এমন কেন জানে না , তবুও ওর প্রতি একটা অদ্ভুত টান। শুধু রিশাকে নয়, পুরো পরিবারের প্রতিটি সদস্যের প্রতি তার ভালোবাসা ভীষণ।
এদিকে আকাশও উপস্থিত হয়েছে। চেয়ার টেনে বসল, দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল—
— “দুজনেই পড়া রিভাইস দাও, একটু পড়ো, আমি দেখব।”
নাফিসা মনোযোগ দিয়ে পড়া শুরু করল। কিন্তু রিশা ঠিক যেমন মজা করতে ভালোবাসে, সে ভেংচি কাটল আকাশের দিকে তাকিয়ে । মনে মনে ভাবল—“ওহে! কোথায় কি সুন্দর প্ল্যান করছিলাম, আর এই ব্যাটা এসে ঘাটামাটা করে দিল।”
আকাশ রিশার দিকে তাকিয়ে ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল—
— “কি, পড়ছ না কেন?”
রিশা ৩২টি দাঁত বের করে হাসল, আর কণ্ঠে স্বচ্ছন্দ্য—
— “পড়ছি তো, স্যার! পড়ায় মনোযোগ দেব।”
আকাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। চোখে মিশ্র একরকম হতাশা আর আনন্দের ছাপ। কাগজ, বই, কলম আর হালকা হাওয়ার মধ্যে স্টাডি রুমটা যেন শান্তির ছোট্ট দ্বীপ হয়ে উঠল। পড়াশোনার মাঝে হালকা মজার ছটা—নাফিসা মনোযোগে, রিশা মজা করে, আর আকাশ চোখ রাখে, সামান্য হতাশা নিয়ে।
স্টাডি রুমের আবহাওয়া এখন কিছুটা শান্ত। টেবিল ভর্তি বই–খাতা, জানালা দিয়ে ভেসে আসা বিকেলের আলো, আর আকাশের গম্ভীর কণ্ঠ মিলে পড়াশোনার পরিবেশ তৈরি হয়েছে বটে। কিন্তু রিশা যে আসলেই পড়তে বসেছে, সেটা মনে হয় আকাশ ছাড়া আর কেউই বিশ্বাস করছে না।
আকাশ কড়া চোখে বলল—
— “রিশা, তুমি ঠিকঠাক পড়বা, না কি আবার ভাঁড়ামি শুরু করবে?”
রিশা মিষ্টি হাসল, আঙুল দিয়ে গাল চেপে বলল—
— “আহা স্যার, এত রাগ দেখাচ্ছেন কেন? আমি তো মনোযোগ দিয়ে পড়ছি।”
আকাশ ভ্রু উঁচু করল—
— “মনোযোগ দিয়ে নাকি বইয়ের পাতার সাথে চোখ রেখে ভাবছো, কোন রঙের নেইলপলিশ লাগালে বেশি মানাবে।”
নাফিসা হেসে ফেলল। হাসিটা ছিল চাপা, কিন্তু তবুও ধরা পড়ে গেল। রিশা তখন নাটকীয় ভঙ্গিতে বুক চেপে ধরে বলল—
— “অফফ! আপনি এত সুন্দর বুঝে ফেললেন কীভাবে?”
আকাশ মাথা নাড়ল অসহায়ের মতো, কিন্তু ঠোঁটের কোণে লুকানো হাসিটা নাফিসার চোখ এড়াল না।
নাফিসা খাতা থেকে চোখ তুলল না, কিন্তু মনটা বারবার দুলে উঠছে। যদিও চারদিকে হাসাহাসি হচ্ছে, তার বুকের ভেতর এখনও দুপুরের সেই ঘটনার চাপা ভয় জমে আছে। সব যেন মাথায় ঘুরছে।
আর সায়মানের চোখ?
সেই কঠোর অথচ দুশ্চিন্তায় ভরা চোখের দৃষ্টি যেন এখনও বুক কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
বড় ডাইনিং টেবিলে সবাই একে একে বসে গেছে। পরিবেশটা অদ্ভুত রকমের শান্ত, কেউ কোনো কথা বলছে না, শুধু টুংটাং, থালা বাসনের শব্দ ভেসে আসছে।
সাবিহা খালেদ, মঈন রাশিদ, মাহবুব রাশিদ, বিলকিস আরা—এরা সবাই চুপচাপ খেতে ব্যস্ত।
ইমা বেগম নিজের হাতে রাহিলকে খাইয়ে দিচ্ছে।
নাফিসা চুপচাপ নিজের খাবার নিয়ে বসে আছে।
অন্যদিকে রিদওয়ান, রিশা, রাইহান, রুহি আর সায়ফান একরকম উসখুস করছে, তারা খাওয়ার চেয়ে বেশি ব্যস্ত বারবার ইশারা করে আফিয়া বেগমের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে। তাদের ভঙ্গিতে বোঝা যায়, সবাই চাইছে সায়মানকে নিয়ে কিছু বলা হোক।
রাইমা একবার বিরক্তির চোখে তাদের দিকে তাকাল—চোখের দৃষ্টিতে স্পষ্ট ধমক—তারপর আবার মাথা নিচু করে খাওয়ায় মন দিল।
অবশেষে আফিয়া বেগম একটু গলা পরিষ্কার করে হালকা কেশে বললেন,
—“সায়মান, বাবা, তোরে কয়েকদিন জন্য বলছিলাম না… খুলনায় একবার ঘুরে আয়। তোর বড় মামা তো অনেকদিন ধরে তোকে দেখতে চাইতেছে। শরীরও নাকি একেবারে ভালো না। একদিনও তো সময় করিস না। বাড়ির বাকি বাচ্চাগুলারে নিয়াও একসাথে একটু ঘুরে আয়।”
সায়মান গম্ভীর মুখে খেতে খেতে শান্ত স্বরে উত্তর দিল,
—“সময় নাই। বড় মামারে বলো, এখানে চলে আসুক, ঘুরাঘুরি করুক, তাহলেই তো দেখা হয়ে যাবে।”
আফিয়া বেগমের মুখ হঠাৎ নিস্তেজ হয়ে গেল। হতাশা ভর করল চারপাশে। একসাথে রিদওয়ান, রিশা, রুহি, রাইহান আর সায়ফান মুখ মলিন করে তাকিয়ে রইল—তাদের আশা যেন মুহূর্তেই মিইয়ে গেল।
আবার আফিয়া বেগম কাতর কণ্ঠে বললেন,
—“একটু সময় করে জানা বাবা। কতদিন তো কোথাও যাস না।”
এই মুহূর্তে মুখ খুললেন মাহবুব রাশিদ। একবার সময় করে গেলে দোষের কিছু হতো না। আত্মীয়স্বজনও খুশি হতো।”
তার ইঙ্গিত খুব স্পষ্ট—এখন সায়মানেরই উত্তর দেওয়ার পালা।
টেবিলে হঠাৎ নীরবতা নেমে এলো। সবাই খাওয়া থামিয়ে সায়মানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
মাহবুর রাশিদের কথা শুনে, কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে সায়মান অবশেষে ধীর গলায় বলল,
—“আচ্ছা… যাব।”
মাহবুব রহমানের মুখে মুচকি হাসি চলে আসলো, তবুও হাসি চেপে রাখলেন তিনি।
মঈন রাশিদ ভাইয়ের হাসি ধরে ফেললেন, নিজেও হেসে দিল। সায়মানকে যে মাহাবুব রাশেদ কতটা ভালোবাসে, তা মঈন রাশিদ ভালো করে জানে।
এই উত্তর শোনার সঙ্গে সঙ্গেই রিদওয়ান, রিশা, রুহি, রাইহান আর সায়ফান একসাথে আনন্দে চিৎকার করে উঠল—
চৌদ্দের চিঠি পর্ব ১৭
—“ইয়াাআআয়!”
তাদের হাসি-চিৎকারে টেবিলের গাম্ভীর্য ভেঙে গেল।
কিন্তু মুহূর্তেই সায়মান চোখ কুঁচকে তাদের দিকে তাকাল। তার সেই গম্ভীর দৃষ্টি দেখে সবাই দমে গিয়ে আবার চুপচাপ খেতে বসল।
নাফিসা শুধু চোখ ঘুরিয়ে সবাইকে দেখছে।
খাওয়াদাওয়া শেষ হতেই একে একে সবাই যার যার ঘরে চলে গেল।
বাড়ির ছোট সদস্য গুলো এক জায়গায় বসে, রুশনা আপিকে তাড়াতাড়ি করে ফোন দিয়ে সুখবর দিল।
এবং তারা কথা বলে ডিসাইড করল, আগামীকালকেই তারা খুলনার উদ্দেশ্যে রওনা হবে।
