Home চৌদ্দের চিঠি চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৪

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৪

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৪
আরোবা চৌধুরী আরু

সকাল সাড়ে দশটা বাজে।
ঢাকার রাজকীয় বসবাসের অভিজাত ঠিকানা, গার্ডেন ভিউ গুলশান-২ এর সেই প্রাসাদতুল্য “রাশিদ ভিলা” আজ যেন একটু বেশিই চঞ্চল।আকাশ নীলচে ধোয়া রঙে রাঙানো, বাতাসে হালকা রজনীগন্ধার ঘ্রাণ, মাঝে মাঝে দুই-একটা পাখির ঝটপট ওড়াওড়ি।
আজ কোনও এক অজানা কারণে স্কুল-কলেজ সব বন্ধ। ফলে রাশিদ ভিলার ছোট-বড় সব বাচ্চারা আজ এক ছাদের নিচে। আর মহিলারাও প্রায় সবাই আজ ঘরেই।
তবে বাড়ির পুরুষদের অধিকাংশ বাইরে, রাজনীতি, পার্টি মিটিং, বা ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক ব্যস্ততা। শুধু একজন ছাড়া,সায়ফান রাশিদ।

রাশিদ ভিলার দোতলার পূর্ব পাশের দৃষ্টিনন্দন স্যুটঘরে একটা বিশাল বেডের উপর উপোর হয়ে পড়ে আছে সে।
ঘরটা এসির ঠান্ডায় জমে আছে। দেয়ালে বড় এলইডি টিভি, পাশে একটা বুকশেল্ফ, সোফা সেট, আর জানালার কাছে মেরুন পর্দা আধা টেনে রাখা।
ঘর যত বড়, ঠিক ততটাই এলোমেলো,হাতের কাছে পড়ে থাকা গিটার, দুটো জুতা উল্টো-পাল্টা, এক কোণে পড়ে থাকা বই, মোজা, আর বিছানায় ছড়ানো জামা কাপড়ের স্তুপ !
এক হাত মাথার নিচে, অন্য হাতে বালিশ চেপে কানে। মুখে বিরক্তির ছায়া, চোখ আধখোলা, চুলগুলো এলোমেলো। এসির রিমোটটা বালিশের পাশে। এসির মাত্রা ২৬ থেকে নামিয়ে ২০ তে এনেছে নিজেকে সর্দি লাগানোর চেষ্টা করছে যেন।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

তার গায়ে একটা বব্ল্যাঙ্কেট মাঝা পর্যন্ত । খোঁচা খোঁচা দাড়ি, কপালের ঠিক পাশে সামান্য ঘুমঘুম রাগ। সে ফর্সা, নিখুঁত ফিচারস, একরকম সিনেম্যাটিক লুক।
সবাই বলে, সায়ফান আর সায়মান দুজনে রাশিদ পরিবারের সবচেয়ে সুদর্শন, কিন্তু সৌন্দর্যের ধরন একদম ভিন্ন। কিন্তু দুই ভাইয়ের হাইট সেম সেমি প্রায় ৬ ফিট এর কাছে দুই ভাইয়ের হাইট।
সায়মান শ্যামলা রঙের, গম্ভীর ও তীক্ষ্ণ চেহারা, চোখে ঝলকানো দৃঢ়তা। সায়মান দেখতে একদম বাবার মত।
আর সায়ফান যেন এক কবিতার চরিত্র ছেলে হিসেবে একটু বেশিই ফর্সা, চোখ, আর একটু বেশিই আলসেমি। তার মা আফিয়া বেগমের মতো দেখতে সবাই বলে।

তখনই,
টক টক টক!
বাইরে থেকে দরজায় ঘন ঘন বারি পড়ছে।
সায়ফান বালিশটা কানের উপর চেপে ধরে গড়িয়ে পড়ল।
“কে রে বাল… সাত সকালে চিল্লাইতেছিস ক্যান?! দরজা খুললে পশ্চাৎ দেশে লাথি দিব!”
দরজার ওপাশে কেউ কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে।
রিশা। মুখে বিরক্তির ছায়া, চোখে রাগ।
“এখন সাত সকাল না ভাইজান, সাড়ে দশটা বাজে। বড় আম্মু ডাকতেছে, নিচে যেতে বলছে! না গেলে খবর আছে তোমার!”

“ধুর বাল, ঘুমের বারোটা বাজাইলি শুটকি একটা!”
“এই তুমি আবার আমাকে শুটকি বললে আমি বড় আম্মুকে বলে দেব ধলা বিড়াল কোথাকার! ” বলে মুখ ভেংচি দিয়ে নিচে চলে গেল?
৷ হেলে দুলে উঠে বেড ছেড়ে নেমে পড়লো সে। পরনে শুধু একটা থ্রি কোয়াটার প্যান্ট যা দেখে মনে হচ্ছে আর কিছুক্ষণ পর বিপদ সীমা অতিক্রম করবে।
ঘুমটুম ঝেড়ে বাথরুমে ঢুকল, ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে গায়ে চাপাল একটা হালকা গ্রে কালারের শার্ট।
শার্টের প্রথম তিনটা বোতাম খোলা, ভেতর থেকে সাদা গেঞ্জির একটু দেখা যায়। সাথে কালো ডেনিম আর ম্যাচিং করে স্নিকারস।

চুল এলোমেলো করেই জেল ছাড়াই ঝটপট এক সাইডে ঢেলে স্টাইল করল।
নিজেকে একবার আয়নায় দেখে হালকা চুমুক দিয়ে বলল,
“ওহহ বাবা, এই জন্মে আমি যদি নিজে নিজের প্রেমে না পড়ি তাহলে আর কে পড়বে!” আমার সতীন ও আমার দেখে প্রেমে পড়ে যাবে।
একদম প্যাকেট করে নেমে এল নিচে।
ডাইনিং টেবিলের পাশে ঢুকেই গলা ফাটিয়ে বলে উঠল,
“আম্মু! নাস্তা দাও তো তাড়াতাড়ি! ক্ষুধায় পেট পেছনে ঢুকে গেছে।”
সেখানেই বসে আছে রাশিদ ভিলার মহিলারা,
বিলকিস আরা রাশিদ (দাদি), একহাতে রাহিলকে কোলে নিয়ে বসা।
আফিয়া বেগম (সায়মানের মা), কিচেন থেকে এসে ছেলের সামনে প্লেট রাখলেন।
ইমা বেগম (ছোট আম্মু) সোফাই বসে আছেন, হাতে কফির মগ।
রুহি, রিশা, সবার যার যার মতো মোবাইল, পত্রিকা বা ফ্রুট সালাদ নিয়ে ব্যস্ত।
আর ওর ফুপিরা সবাই চট্টগ্রাম গেছে।

রাহিল — ছোট্ট দুষ্টু ছেলে, দাদির কোলের উপর হেলান দিয়ে বসে আছে। টেবিলের দিকে এগিয়ে না গিয়ে সোফার উপর বসে থাকা রিশার ঘাড় টা ধরে নিচু করে কান টেনে ধরল। এই শুটকি সাইরা কি বলে এলি তুই বল এবার আমার সামনে, খুব বার বেড়েছিস তাই না ওই চশমার সাথে মিশে।
রিশা গলা ফাটিয়ে চিল্লিয়ে উঠলো, বড় আম্মু ও বড় আম্মু বাঁচাও আমাকে।
বাবা ছেড়ে দে ওকে বাচ্চা মেয়ে ওর সাথে অমন করিস না। সায়ফান রিশাকে ছেড়ে দিল ওকে ঘাটালো না আর ছোট আম্মুর দিকে তাকিয়ে বলল ছোট আম্মু তোমার মেয়ে অনেক বাচাল হয়ে গেছে আজ কাল যার তার সাথে মিশে।
ইমা বেগমের কোন ভাব অন্তর নেই সব সময় এরা এমন করতেই থাকে মানা করলেও শুনেনা।

রিশা ঘাড়ে এক হাত দিয়ে মাসাজ করছে তো অন্য হাত দিয়ে কান। আর বিড়বিড় করে বলছে ধলা বিলাই কোথাকার আমি কার সাথে মিশবো না মিশবো তোর বলতে হবে বড় আব্বুকে বলবো আমি এখানে কেউ আমার কথা শোনে না। বলে বড় বোনের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে পড়লো।
সায়ফান এক হাত দিয়ে নিজের চুল ব্রাশ করতে করতে খাবার টেবিলে গিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসলো।
আফিয়া বেগম মাথায় হাত রেখে বললেন,
“তাড়াতাড়ি খা বাবা। তারপর একটু কাজটা করে দে না আমার তোকে না বললে কাকে বলব,, তোর আব্বু”
“আরে আম্মু, শুরু করলে আবার! মাথায় হাত বুলিয়ে আমার দিয়ে সব করাইয়ে নাও! শুধু আমি উপকার করে যাই সবার,
এইটা কিন্তু চলবে না!”

আফিয়া বেগম মুচকি হেসে ছেলের মাথায় আবারও হাত বুলিয়ে দিলেন। বললেন,
“আব্বু, রাহিলকে এখনো খৎনা করানো হয়নি। তুই একটু নিয়ে যা না হসপিটালে। তোর আব্বুর তো কেউই সময় পায় না, তোর ছোট চাচাও না।” আর ও বাড়ির কারো ছাড়া একা যাবে না বাড়ির একটা ছেলে না হলে হয়।
সায়ফান মুখে হাত দিয়ে বলল,
“আর কোনো কাজ পাইলে না আম্মু ! এখন এসবেও আমি যাব?”
পাশ থেকে ইমা বেগম পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন,
“বাবা যা না একটু। দোয়া লাগবে।”

“ধুর! তোমরা শুধু ইমোশনালি ব্ল্যাকমেইল করো! আমার উইক পয়েন্টটা জানো বলেই সবাই আমাকে দিয়ে কাজ আদায় করো। ঠিক আছে, মা মানুষদের কথার অবাধ্য হতে পারি না। নিয়ে যাব। একটু পরে।”
সেই মুহূর্তে চোখে পড়ল ছোট্ট রাহিলকে,
সে দাদির গায়ে মুখ গুঁজে বসে আছে। পা দুল ঝুলছে, মুখে খুনসুটি হাসি।
সায়ফান হালকা হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে ওর পাশে বসে পড়ল। ঠোঁটে শয়তানি হাসি, কিরে তোর নাকি সব থেকে মূল্যবান সম্পদ কে কেটে দেবে,, কেটে দেবে বলে ওর গাল টিপে দিল তারপর রিশার দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই শুটকি ! আমার গিটারটা নিয়ে আয় তো! ওর সম্পদ কেটে দেওয়ার আগে একটা গান শোনানো তো যাক!”
রিশা ভেংচি কেটে গিটার নিয়ে আসতে গেল।

ইমা বেগমের কোলে মাথা রেখে সোফায় শুয়ে পড়লো সায়ফান পা দুটো তুলে রুহির কোলের ওপর দিল আর আদেশ করল পা দুটো টিপে দে তো।
ইমা বেগম ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো আর রুহি ওর পা টিপে দিতে লাগলো দুই বোনের সাথে ঝগড়া হয় কিন্তু রিশার সাথে ঝগড়া বেশি হয়। কিন্তু দুই বোন ভালোবাসে ভাইদের অনেক। ওদের ভাই বোনদের মধ্যে অনেক মিল।

রিশা ইতিমধ্যে চলে এসেছে গিটার নিয়ে,
আমার পা দুটো আস্তে করে নিচে নামিয়ে দে তো, রুহিকে আদেশ করলো সায়ফান।
রুহি মুচকি হেসে ওর পায়ে চিমটি কেটে দিল।
উই মা…..বেয়াদব বেডি। দুই বোন মিলে খালি ষড়যন্ত্র করিস আমার নিয়ে।
রিশা আর রহি দুইজন হাইফাই দিল।
ওদের দিকে তাকিয়ে মুখ ভাঙ্গিয়ে বললো আমার গিটারটা দে তো! রাহিলের সম্পদ কাটা হচ্ছে এজীবনের মতো, তবু অন্যের জন্য … এখন একটু গান তো শোনাই!”
বলেই গিটারটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিলো সায়ফান।

তার চোখে সেই পুরনো দুষ্টু ঝিলিক, ঠোঁটের কোণে একটুকরো বাঁকা হাসি।
হালকা ঝাঁকি দিয়ে সুরে ভরাল প্রথম কর্ডটা,
চোখ বন্ধ করে একটু ঝুঁকে গেয়ে উঠল…
সময় কাটে,
কথা কাটে,

আকাশে থাকা ঘুড়ির সুতো কাটে।
অপেক্ষা করে মানুষের জীবন কাটে,
আর কসাই কাটে মাংস।
রাস্তায় আমি হাঁটতাছিলাম,
দেখলাম ওই সুন্দরী রে,
সঙ্গে আমার পোলা দেখা,
সুন্দরী কয়, “আমি কে?”
প্রেমিকা মন কান্দে রে,
রিকশায় তার ওড়না পেঁচায়।
স্টিমারে চোড়সি আমি,
ঈদ করমু পাখির খাঁচায়।
খাঁচায়, খাঁচায়, খাঁচাই… চিল্লাইয়ে!
কেটে দিয়েছে তোর সম্পদ,
এবার খালি দেখবি বিপদ!
কেটে দিয়েছে তোর সম্পদ…
ব্যথা, ব্যথা, ব্যথা… চিল্লাইয়ে।
পিচ্চি তোমায় কেটে দিছে,
কেটে দিছে ওই ইয়ে…
কেটে দিছে, কেটে গেছে,
বলে চিল্লালো…!

একটু বাউন্স করে, রাহিলের গালে টান দিল। রাহিল হাত তুলতে তুলতে হেসে উঠল,
“সাইফান ভাইয়া গান গাইছে! হুররে!”
একটু পর তোর হুররে বের হবে জায়গায় নিয়ে গেলে বুঝতে পারবি।
রিশা, রুহি, দুই বোনও মিলে টুকটুক করে গানের তালে হাত নাড়াতে লাগল আর ক্রমাগত হাসছে।
ইমা বেগম আর আফিয়া বেগম নিজেদের দিকে তাকিয়ে পেটে হাত দিয়ে হাসতে লাগলেন।
বিলকিস আরা হাঁ করে চেয়ে আছেন নাচতে থাকা নাতিদের দিকে তিনিও শব্দ করে হেসে ফেলল।
রাহিল হঠাৎ হোঁচট খেয়ে দাদির কোলে গিয়ে মুখ গুঁজে বলল,

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৩

“দাদু, সাইফান ভাইয়া গাইলে পাখি নাচে! ভয় লাগে…”
বড়রা হেসে গড়িয়ে পড়ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে,
“টান!”
বাড়ির প্রধান দরজাটা খুলল, ভেতরে ঢুকল সায়মান রাশিদ।
আর তার পাশে দাঁড়িয়ে এক শান্ত, লজ্জা-লুকানো মুখ,নাফিসা।

চৌদ্দের চিঠি পর্ব ৫