Home জাহানারা জাহানারা পর্ব ৩৯

জাহানারা পর্ব ৩৯

জাহানারা পর্ব ৩৯
জান্নাত মুন

জুই আর ইতি দুজনেই গাউন জামা পড়ে রেডি হয়ে নিচে দাঁড়িয়ে আছে। ইতি জুইকে বলেছিল এই গ্রাম টা যদি একবার ঘুরে দেখতে পারতো।জুই সেই কথা জিতু ভাইয়াকে বলতেই তিনি বলেন, রেডি হয়ে তাড়াতাড়ি নিচে আসতে।ইতি আর জুই খুশিতে ঝটপট রেডি হয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।জিতু ভাইয়া গাড়ি বাইরে বের করে আনলো।অতঃপর ওদের কে গাড়িতে উঠে বসতে বললো।জুই আর ইতি লাফিয়ে গিয়ে উঠে বসে পড়লো।জিতু ভাইয়া ফ্রন্ট মিররে ইতির হাসি মুখ দেখে মুচকি হাসলো।তিনি গাড়ি স্টার্ট দেওয়ার সাথে সাথেই পেছন থেকে একটি মেয়েলি কন্ঠ স্বর শুনতে পেলো।জিতু ভাইয়ের বুঝতে বাকি নেই এটা কে হতে পারে।তবে তিনি গাড়ি থামালেন না।পিছন থেকে নোহা চেচিয়ে ডাকছে,

–জিতু বেইবি স্টপ দ্যা কার।আমাকে নিয়ে যাও।আমিও তোমাদের সাথে যাবো।
নোহার ডাক কানে তুললেন না তিনি।এদিকে জুই আর ইতিও ভাইয়াকে বলছে নোহা ডাকছে।ইতি বললো,
–ভাইয়া আমার নোহাপু ডাকছে।আপুও রেডি হয়ে এসেছে আমাদের সাথে যাবে বলে।
জিতু ভাইয়া গাড়ির স্টিয়ারিং এ হাত চালাতে চালাতে বললো,”ওর যাওয়ার দরকার নেই। ”

ছোট্ট ইতি এই কথার পিছে আর কিছু বলতে পারলো না।সে গাড়ির উইন্ডো দিয়ে দেখলো নোহা দৌড়ে ওদের গাড়ি কে ধরতে চাইছে। ইতি সবচেয়ে আশ্চর্য হলো নোহাকে গাউন পড়ে সম্পূর্ণ শরীর ঢেকে রাখতে দেখে।কারণ এর আগে কখনো নোহা ওয়েস্টার্ন ছাড়া আর কিছু পড়েনি।আজ নোহা আমার দেওয়া গাউনটা পড়ে আছে।গলায় জরজেট ওড়না জড়িয়ে রেখেছে।সামনের শর্টকাট চুলগুলো কপালে পড়ে আছে।দৌঁড়ানোর সাথে সাথে ওর পিট পর্যন্ত পড়া সিল্কি চুলগুলো দুপাশে দোল খাচ্ছে।ভিষণ সুন্দর আর স্নিগ্ধ লাগছে নোহাকে।সে দেখতে বরাবরই পুতুলের মতো মিষ্টি। আজ যেন বাঙালি পোষাকে আরও আবেদনময়ী লাগছে।কিন্তু এই সাজ যার জন্য সে একবারো ফিরেও দেখলো না।বরং গাড়িটা দ্বিগুণ গতি নিয়ে নোহার চোখের আড়াল হয়ে গেলো।মেয়েটা ডাকতে ডাকতে অনেকটা পথ দৌঁড়াল।তবুও ওকে সাথে নিলো না।অবশেষে মেয়েটা রাস্তায় পড়ে থাকা একটা ইটের টুকরোর সাথে বেজে হোঁচট খেয়ে পড়লো।নোহা সাথে সাথে হু হু করে কেঁদে দিলো।মাথাটা সামনে তুলে গাড়িটা চলে যাওয়ার পথে তাকালো।নোহার চোখদুটো জলে টইটম্বুর।সে নাক টেনে কাঁদতে কাঁদতে ঠোঁট উল্টালো।

নোহার হাত ছিলে গেছে। পায়ের হাঁটুও হয়তো কিছুটা ছিলে গেছে। তাই পাজামা রক্ততে ভিজে লাল হয়ে উঠেছে।নোহা নিজের রক্তাক্ত হাত দুটো চোখের সামনে ধরে বেশ কিছুক্ষণ ব্যথাতুর দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো।অতঃপর অচেনা কারো পুরুষালী কন্ঠ কানে আসে।সে সামনে তাকাতেই দেখলো দুটো ছেলে ওর দিকে হাত বাড়িয়ে রেখেছে। একটা কালো ছেলে বললো,
–আপু এভাবে রাস্তায় পড়ে আছেন কেন?যে কোনো সময় গাড়ি আসতে পারে।
আরেকটা শ্যামলা, মুখে ব্রুনে ভরা ছেলে বললো,
–আরে আপু আপনার হাত তো দেখছি ছিলে গেছে।একা উঠতে পারবেন?না পড়লে আমার হাতটা ধরুন।
নোহা হাতের উল্টো পিট দিয়ে চোখের পানিটা মুচে ফেললো।অতঃপর সামনে ওর দু’হাত বাড়িয়ে দিতেই ছেলে দু’টো ওর দুহাতে ধরে টেনে দাঁড় করালো।নোহা নাক টেনে ঠোঁট হালকা প্রসারিত করে বললো,

–থ্যাঙ্ক ইউ লিটিল বয়েজ।
ছেলে দু’টো একে অপরের দিকে চোখাচোখি করলো।মানে নোহার কথা তারা বুঝে নি।বুঝবেই বা কিভাবে?কোনোদিন কি বই কলম ছুঁইয়ে দেখেছে নাকি?ছেলে দুটোকে দেখে মনে হচ্ছে আঠারো কি উনিশ হবে।তবে মনে তো হচ্ছে নোহার জুনিয়রই হবে।ছেলে দুটো হেসে বললো,
–আপু এলাকায় নতুন নাকি?না মানে আর কোনোদিন আপনাকে দেখিনি তো তাই।
নোহা মন খারাপ করে রেখেই বললো,

–হ্যা তো।আমি এই এরিয়ায় লাইফের ফাস্ট টাইম এসেছি।এই প্লেইসটা সো বিউটিফুল। বাট বেইবি আমাকে না নিয়েই ঘুরতে চলে গেলো।
নোহার কথায় ছেলে দু’টো দুঃখ প্রকাশ করলো।অতঃপর বললো সামনের চা দোকানটায় বসে এক কাপ চা খেলে মনটা ভালো হয়ে যাবে।নোহা ছেলে দু’টোর সাথে চা দোকানে গিয়ে বসলো।সেখানে আরও তিনজন ছেলে আগে থেকেই বসে চা খাচ্ছে।নোহাকে দেখে ছেলেগুলো ভদ্রতা দেখিয়ে আরেকটা বেঞ্চে গিয়ে বসলো।বয়স্ক চা ওয়ালা নোহাকেও এক কাপ চা দিলো।নোহা চা খেতে খেতে ছেলেদের সাথে গল্প জময়ি দিলো।ছেলেগুলো নোহার সাথে ভদ্রভাবে কথা বলছে। অন্যদিকে নিজেদের মধ্যে চোখাচোখি করে ঠোঁট টিপে হাসলো।

আমি চোখ গরম করে ইফানের দিকে তাকিয়ে আছি।ইফান আমার দিকে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে হাসছে।আমার শাড়ির আচল ইফানের হাতে।সে নাকি এখন ঘুমাবে!!অথচ আমাকে রুম থেকে যেতে দিচ্ছে না।আমাকেও নাকি এখন তার সাথে ঘুমাতে হবে।ইফানের প্রতি রাগে দুঃখে নিজের চুল টেনে ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে।নিজের মা বাপের সামনে সারাক্ষণ জামাই নিয়ে ঘরে থাকাটা কতটা লজ্জাজনক এটা এই শয়তানকে কে বুঝাবে।আমি শাড়ির আচল নিজের দিকে টানতে টানতে রাগে রিরি করতে করতে বললাম,
–ইফান ভালো হচ্ছে না।শাড়ির আচল ছাড় নিচে যাব।
–ওকে,,,,

আমার কথায় ইফান সত্যিই ছেড়ে দিলো।আমি আশ্চর্য হলাম।এত সহজে আমাকে ছেড়ে দিলো?আমি ওর দিকে তাকিয়ে আঁচলটা কাঁধে তুলবো তক্ষুনি ইফান নিজের দুই পা আমার কোমরে পেচিয়ে নিজের উপর বিছানায় ফেলে দিলো।আমি “আহ্” করে উঠলাম।ইফান আমার আচলটা একপাশে ফেলে বুকে মুখ গুঁজলো।পরপর বুকের ভাজে শব্দ করে চুমু খেয়ে নাক ঘষতে লাগলো।আমি ওর খালি গায়ে হাত রেখে উঠতে নিলে পিছলে পড়লাম।ফলে আমার ঠোঁট ওর ঠোঁটে লেগে যায়।আমি তৎক্ষনাৎ ইফানের চোখের দিকে তাকালাম।ইফানের চোখে হাসি খেলছে।ঝটপট আমার ঠোঁট ওর ঠোঁট থেকে সরিয়ে নিতে নিলে, ইফান আমার পিটে এক হাত আর মাথায় এক হাত রেখে ওর সাথে চেপে ধরে। ফলে আমি চাইলেও নিজেকে ওর থেকে সরিয়ে নিতে পারছি না।ইফান আমার ওষ্ঠভাজে ডুব দেয়।আমি নড়াচড়া করলেই দাঁত বসিয়ে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর আমার ঠোঁট ছেড়ে দিলো।আমি হা করে হাঁপাতে হাঁপাতে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলাম। ইফান জিহ্ব দিয়ে নিজের ঠোঁট ভিজিয়ে নিতে নিতে আমার এলোমেলো হওয়া চুলগুলো মুখ থেকে সরিয়ে দিতে লাগলো।

–অসভ্য, শয়তান,বদমাইস,,,,
আমি চোয়াল শক্ত করে চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম।ইফান ঠোঁট বাকিয়ে হেসে আমার কন্ঠনালিতে গভীর চুম্বন এঁকে দিলো।অতঃপর আমার মাথায় রাখা হাতটাতে চাপ বসিয়ে ওর কপালের সাথে আামর কপাল ঠেকালো।তারপর হিসহিসিয়ে বললো,
–কি সব বল সব সময়?মাঝেমধ্যে তো একটু ইউনিক নামেও ডাকতে পার।এই যেমন :জান, হানি,বেইবি আ,,,,,
বাকি কথা আর বলতে দিলাম না।তার আগেই ওর বুকে কিল বসালাম।ইফান হেসে দিলো আমার এমন কাজে।আমি নিজের রাগ কিছুটা কন্ট্রোলে আনতে চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিলাম।অতঃপর শীতল কন্ঠে বললাম,
–কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যা হয়ে যাবে। আমাকে ছাড় নিচে যেতে হবে।
ইফান আমাকে বালিশে শুইয়ে দিলো।তারপর ব্লাউজের দুটো বোতাম খুলে সেখানে মুখে ডুবিয়ে মাদকীয় কন্ঠে বললো,

–ঠিক আছে,আমি ঘুমিয়ে পড়লে চলে যেও।
–তাহলে তুমি ঘুমাও, আমাকে যেতে দাও।আমি থেকে কি করবো?
ইফান একটু নড়েচড়ে আমাকে আরও তার সাথে চেপে ধরলো।অতঃপর বুকে মুখ ডুবিয়ে রেখেই সেখানে দাঁত বসিয়ে দিলো।আমি দাঁতে দাঁত চেপে চোখ বন্ধ করে সহ্য করে নিলাম।ইফান দাঁত বসানো জায়গায় নাক ঘষতে ঘষতে হাস্কি স্বরে বললো,
–বউ আমার খালি মন চায় তোমার ভেতর ঢুকে যেতে।
আমি দাঁতে দাঁত চেপে বললাম__❝আমারও খালি মন চায়,,,,,,❞
ইফান আমাকে তার সাথে আরও চেপে ধরলো।তারপর আহ্লাদি স্বরে জিজ্ঞেস করলো__❝কি?❞
আমি দাঁত কিরমির করতে করতে বললাম__❝তর বালডা ছিঁড়ে ফেলতে।❞

জিতু ভাইয়া ইতি আর জুইকে নিয়ে গ্রামের আশেপাশের কিছু জায়গা ঘুরিয়ে দেখালো।এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশটা অসম্ভব সুন্দর। আমাদের বাড়ি থেকে বেশ কিছুটা দূরে গেলে দেখতে পাওয়া যায় রাস্তার দু পাশে পাট ক্ষেত আর ধনচে ক্ষেত।ঐদিকটায় লোকালয় নেই।বেশ কয়েক একর জমি জুড়ে কৃষকরা পাট আর ধনচে চাষ করেছে।তাই ক্ষেতের দিকে তাকালে যতটুকু দেখা যায় সবটায় সবুজে সবুজে ভরপুর। জুই আর ইতি দুজনেই অনেক খুশি একটু ঘোরাঘুরি করতে পেরে।ইতি তো শহরের মেয়ে। তাই তার আগে কখনো এমন সুন্দর গ্রাম দেখার সৌভাগ্য হয় নি।এদিকে জুই আমার বিয়ের পর থেকে ঘর কোণ হয়ে আছে।বাড়ির বাহিরে ও নিজেও বের হয় না, আবার আমার পরিবারও একা বের হতে দেয় না।
প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এসেছে।তাই জিতু ভাইয়া ওদের গাড়ি ঘুড়িয়ে বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দিলো।উনার আবার সন্ধ্যার পর ভিষণ দরকারি একটা কাজে বেরতে হবে।

গাড়ি বাড়ির গেইটের ভেতর ঢুকতেই জিতু ভাইয়া ওদের নামিয়ে দিলো।ইতি তারাহুরো করে নামতে গিয়ে ওর ওড়না গাড়ির ডোরে আটকে যায়।সে ওড়না ধরে টানাটানি করার সময় পিছন থেকে জিতু ভাইয়া এসে ওড়না টা ছাড়িয়ে দেয়।ইতি বেশ লজ্জা পেল।তাই বাড়ির দিকে আস্তে আস্তে দু পা এগিয়ে এক ছুটে ভেতরে চলে গেলো।জিতু ভাইয়া ইতির ছেলে মানুষি দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসলো।অতঃপর বাড়িতে না ঢুকেই গাড়ি নিয়ে কাজে বেড়িয়ে গেলে।
আজ ইতি আর জুই যে যে জায়গা গুলোতে ঘুরেছে,সবখানেই দু-জনে সেলফি তুলেছে।আর জিতু ভাইয়াও ওদের অনেক ছবি তুলে দিয়েছে।ইতি বাড়িতে এসেই নোহাকে খুঁজতে লাগলো পিকগুলো দেখাবে বলে।ইতি যখন ডাকছিল তখন রান্নাঘর থেকে আম্মু বেরিয়ে আসে।তিনি বলেন নোহা জুইদের সাথে ঘুরতে যাবে বলে বেড়িয়েছিলো, এখনো আসে নি।জুই আর ইতি আম্মু কে বললো, তাদের সাথে নোহা যায় নি।মূহুর্তেই সকলে চিন্তায় পড়ে গেছে। এদিকে জিতু ভাইয়া, আব্বু আর বড় আব্বুও বাসায় নেই। আর ইনান আলাল দুলালও বড় আব্বুর সাথে বাজারে বেড়িয়েছে।এই ভর সন্ধ্যায় কে খুঁজতে যাবে।ইতি নোহার জন্য কেঁদে দেয় দেয় অবস্থা। উপয়ান্তর না পেয়ে আম্মু বললো আমাকে গিয়ে কথাটা বলতে।ইতি আর জুই এক মূহুর্ত আর দাঁড়ালো না।এক ছুটে আমার রুমের উদ্দেশ্য রওনা দিলো।

দরজার সামনে এসে ইতি ডাকতে লাগলো,”ভাবিজান তাড়াতাড়ি একটু আস।” ইফানের সাথে শুইয়ে থাকতে থাকতে কখন যে চোখ লেগে গেছে ঠাহর করতে পারলাম না।ইতি আর জুইয়ের গলা শুনে আমি চোখ মেলে তাকালাম। ইফান এখনো আমার বুকে মুখ গুঁজে ঘুমাচ্ছে। এদিকে ইতি আবার ডেকে উঠলো,
–ওও ভাবি রুমের দরজা একটু খোল জরুরি দরকার আছে।
ইতির কথায় জুই লজ্জায় পড়ে গেলো।কারণ সে জানে ইফান রুমে আছে।জুই ইতিকে বললো আস্তে ডাকতে।ইতি জুইয়ের দিকে চেয়ে রইলো।এরই মাঝে রুম থেকে আমার কন্ঠ ভেসে আসলো,

–তোরা নিচে যা আমি আসছি।
ইতি আরও কিছু বলতো কিন্তু জুই ওকে টেনে নিয়ে নিচে চলে যায়।এদিকে আমি নিজের থেকে ইফান কে সরাতে পারছি না।ওকে সরাতে নিলেই ঘুমের ঘোরে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরছে।আমি দীর্ঘ শ্বাস ছেড়ে ওকে আস্তে আস্তে ডাকলাম,
–ইতি ডাকছে।নিচে যেতে হবে ছাড়ুন।
ইফান বিরক্তিতে চ বর্গীয় শব্দ উচ্চারণ করে বালিশের উপর মুখ ডুবিয়ে চিত হয়ে শুয়ে পড়লো।আমি এতক্ষণে ওর থেকে ছাড়া পেয়ে স্বস্তিতে নিশ্বাস নিলাম।অতপর ব্লাউজের বোতামগুলো লাগিয়ে বুকে শাড়ির আচলটা টেনে নিলাম।এরপর চুলগুলো আলগোছে খোঁপা করতে করতে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলাম।

ধরণী অন্ধকারে তলিয়ে গেছে। নিচে বড় আম্মু, আম্মু, জুই আর ইতি আমার অপেক্ষায় পায়চারি করছে।তাদের চেহারায় চিন্তার ছাপ।আমাকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখেই ইতি কাঁদতে কাঁদতে ছুটে আসলো।আমাকে জড়িয়ে ধরে হেঁচকি তুলে বলতে লাগলো,
–ভাবি নোহাপুকে খুঁজে পাচ্ছি না কোথাও।বড় আন্টি প্রতিবেশীদের বাড়িতে খোঁজ নিয়েছে।নোহাপু কারো বাড়িতে যায় নি।আমার নোহাপু কোথায় চলে গেলো?
আমি আশ্চর্য হলাম ইতির কথা শুনে।নোহা আবার কোথয় চলে যাবে?ও কিছুক্ষণ আগেই আমার থেকে একটা জামা নিয়ে গেলো।আমি আম্মু কে বললাম,

–মেয়েটা কোথায় গেছে তোমাদের কিছু বলে যায় নি?
–মেয়েটাকে দেখেছিলাম তোর একটা নতুন জামা পড়ে হেলেদুলে নিচে নামতে।আমি জিজ্ঞেস করলেই বললো জিতু আব্বা নাকি ওদের নিয়ে ঘুরতে যাবে।
আমি জুইদের দিকে সরু চোখে তাকাতেই জুই সবটা খুলে বললো।ওদের কথা শুনে আমারও টেনশন হচ্ছে।এই অন্ধকারে কোথায় গিয়ে খুঁজবো যেখানে বড় আম্মু বলছে এদিকে কারো বাসায় নেই। এরই মাঝে জিয়াদ ক্লান্ত শরীর নিয়ে সদর দরজা ডিঙ্গিয়ে বাড়ির ভেতর আসলো।আমাদের এভাবে চিন্তিত দেখে কাঁধের ব্যাগটা সোফায় রাখতে রাখতে জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে?আমি সবটা বলতেই সবাই কে একটা ঝারি মারলো,
–আশ্চর্যের কথাবার্তা বলছ তোমরা।বাড়িতে মেহমান আসছে।তাদের দেখে শুনে রাখবে, তা না করে এখন বলছ নোহা আপুটা নাকি নিখোঁজ,অদ্ভুত।।।
বড় আম্মু জিয়াদের সামনে এক গ্লাস পানি ধরে ছেলেকে শান্ত করার চেষ্টা করলো।ইদানীং জিয়াদ অনেক খিটখিটে হয়ে গেছে। আমি না থাকায় আরও বেশি অবনতি হয়েছে।জিয়াদ পানি না খেয়েই বাসা থেকে বেড়িয়ে গেলো আশপাশটা একটু দেখতে।কেউ যদি নোহার বিষয়ে কোনো খবর দিতে পারে তাহলে মেয়েটাকে খুঁজে পেতে সুবিধা হয়।
জিয়াদ বেরিয়ে যেতেই আম্মু আমাকে বললো,

–জাহান তোর ভাইকে বিষয়টা জানা।যদি ও কিছু জানে।
জুই বললো,”না আম্মু ভাইয়া নোহা আপুর সম্পর্কে কিছু জানে না।কারণ উনি নোহা আপুর সাথে কথাই বলতে চান না।তাই তো আমাদের দিয়ে বাইরে থেকেই চলে গেছে। ”
আমিও ভাবলাম নোহা যদি আসেপাশেই থাকে তাহলে তো ভাইয়াকে বিরক্ত করা হবে।আর ভাইয়ার সাথে সকালে কথা হয়েছে। ইদানীং কি কেইস নিয়ে ভীষণ ব্যাস্ত।
কিছুক্ষণের মধ্যেই জিয়াদ ছুটে আসলো।এসেই হাঁপাতে হাঁপাতে বলতে লাগলো,
–জাহানাপু নোহা আপুকে আসেপাশে কোথাও পেলাম না।তবে মিরাশ নানার চায়ের দোকানে গিয়ে উনাকে জিজ্ঞেস করতেই উনি বললো,মাগরিবের আযান অব্দি নাকি তার দোকানেই বসে ছিলো।আর আমি জিগ্যেস করলাম তার সাথে কেউ কি ছিলো কিনা?তিনি বললো,পশ্চিম পাড়ার মিন্টু আর তার চার বন্ধু নাকি চা খাচ্ছিল।নোহা আপু নাকি ওদের সাথেই হেসে হেসে কথাবার্তা বলছিলো।
জিয়াদের কথা শুনে আমি সহ সকলের আত্মা শুকিয়ে যাওয়ার অবস্থা হয়েছে।কারণ সবাই বলে পশ্চিম পাড়ার মানুষ নাকি সুবিধার না।ইতির সাথে এখন আম্মুরাও হুহু করে কেঁদে দিলো।এটা দেখে জিয়াদের মাথা আরও গরম হয়ে গেলো।সে ধমকে উঠলো,

–এখন এত নাটক করছ কেন?তখন মনে ছিলো না বাড়ি তে পরের বাড়ির মেয়ে আছে।আর তাদের দেখেশুনে রাখতে হবে?
জিয়াদের কথায় কেউ কিছু বলার সাহস পেল না।আমি আর এখানে দাঁড়ালাম না।এক দৌঁড়ে সোজা নিজের রুমে আসলাম।ইফান এখনো আগের ন্যায় বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। বেশ কয়েক রাত ধরে ওর ঘুম হয় না।তাই আজ সব ঘুম তাকে জেঁকে ধরেছে।আমি ছুটে বিছানায় গিয়ে বসলাম।
–ইফান, এই ইফান উঠ না তাড়াতাড়ি,,,,,
লোকটার কান অব্ধি আমার ডাক হয়তো পৌঁছালো না।আমি ওর বাহুতে হালকা থাপড়ে আবারও অধিক উত্তেজিত হয়ে ডাকতে লাগলাম,

–এই শুন না। নোহাকে তখন থেকে পাওয়া যাচ্ছে না,,,,
ঘুমের মাঝে ইফান বিরক্তি তে চোখমুখ কুচকে ফেললো।আমি আবার ওর বাহুতে হালকা থাপড়ে ডাকতে লাগলাম,
–ইফান, এই ইফান তাড়াতাড়ি উঠ,,,
–হুমম,,,,
ঘুমের মধ্যে নড়েচড়ে সংক্ষিপ্ত উত্তর করলো।আমি ওর হাতে ধরে টানতে টানতে বললাম,
–হুম না, উঠ। নোহাকে পাওয়া যাচ্ছে না।এই জায়গাটা এত ভালো না। মেয়েটা কোনো বিপদে পড়তে পারে।
ইফান ঘুমের মধ্যে বিরক্তি নিয়ে বললো,
–কি সমস্যা?
–কি সমস্যা মানে?নোহাকে পাওয়া যাচ্ছে না,,,
–তোমার ভাই কোথায়?
ইফানের কথা শুনে আমার চোয়াল শক্ত হয়ে আসলো।আমি দাঁত কটমট করে বললাম,

–জিতু ভাই কোথায় মানে?
এদিকে ইফান আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি ওর উত্তরের আশায় কয়েক মূহুর্ত অপেক্ষা করলাম।তারপর আমি আবার ওর হাত ধরে টানতে লাগলাম,
–ইফান,,,
ঘুমের মধ্যে বারবার ব্যাঘাত ঘটায় বেশ বিরক্ত হচ্ছে ইফান।কারণটা আমি হওয়ায় কিছু বলতেও পারছে না।অন্য কেউ হলে হয়তো কিছু একটা অঘটন ঘটিয়ে দিতো।ইফান বিরক্তি নিয়ে বললো,
–ইশশ, গিয়ে দেখ কোন পাট ক্ষেতের চিপায় শালা-শালি লীলাখেলা করছে।
ইফানের উত্তরে আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো,
–নোহার কিন্তু কিছু হয়ে যেতে পারে।
–জাহান্নামে যাক,তাতে আমার কি।।
ইফান গা ছাড়া ভাব নিয়ে উত্তর করে আবার ঘুমিয়ে পড়েছে। আমিও বুঝলাম এখানে এভাবে বসে থাকলে চলবে না।তাই আমি তাড়াতাড়ি রুম থেকে বেড়িয়ে যেতে নিয়েও কিছু একটা ভেবে থেমে গেলাম।অতঃপর আমার পুড়নো স্কুল ব্যাগটা গেটে কাঙ্ক্ষিত জিনিস টা বের করে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলাম।

নির্জন কাঁচা মাটির রাস্তা দিয়ে দুর্বল শরীরটাকে নিয়ে প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে নোহা।চেঁচিয়ে কাউকে ডাকবে তার শক্তিটাও আর নেই।মেয়েটার চোখ বারবার বন্ধ হয়ে আসছে তবুও থামছে না।এখন থামলেই হয়তো আর কোনোদিন পৃথিবীর আলো দেখা হবে না।মেয়েটার পায়ের তালা ক্ষত বিক্ষত।নোহার হিল জুতা গুলো কোথায় ফেলে এসেছে সে আর বলতে পারবে না।তার জরজেট ওড়নাটাও হয়তো কোথাও অবহেলায় পড়ে আছে।এদিকে ওর পেছনে চারজন ছেলে দৌড়াচ্ছে।একজনের হাতে ফোনের ফ্ল্যাশ জ্বালানো।আরেক জনের হাতে ধারালো অ*স্ত্র।নোহা যে আঁকাবাকা রাস্তা দিয়ে ছুটছে, ছেলেগুলোও তাকে অনুসরণ করে পিছনে ছুটছে।মন্টু ছেলেটা বললো,

–মা*গীর তেজ ভালা আছে দেখা যায়।দুইটা ঘুমের বড়ি খাওয়ালাম তবুও কাবু হইলো না।
পাশের ছেলেটা বললো,
–শা*লিরে একবার ধরবার পারলে সা*উ*য়ায় মরিচ দিমু।
নোহা আর দৌড়াতে পারছে না।তার পা বারবার থেমে আসছে।এই কঠিন পরিস্থিতিতে নোহার খালি মনে পড়ছে তার বাবার কথা।এই ছেলেগুলো যদি একবার জানতে পারতো নোহা কার মেয়ে, তাহলে হইতো ওর দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস কেউ দেখাতো না।নোহার কানে বারবার আসছে তার বাবার আদুরে ডাক,

জাহানারা পর্ব ৩৮

❝ওহ্ মাই ডিয়ার প্রিন্সেস,,,, ❞
নোহার পা থেমে গেছে।মূহুর্তেই ছেলেগুলো ওকে ধরে ফেললো।নোহার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে।তার চোখ দুটো সম্পূর্ণ ভাবে বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত অস্পষ্ট ভাবে বারবার বলতে লাগলো,
–পাপা সেইভ মি,ইফান বেইবি সেইভ মি,প্রিটি গার্ল সেইভ মি,জিতু বেইবি সে,,,,,,,,
বাকিটা বলার আগেই সম্পূর্ণ নিস্তেজ হয়ে ঢলে পড়ে নোহা।নোহাকে জ্ঞান হারাতে দেখে ছেলেগুলো উল্লাসে ফেটে পড়লো।

জাহানারা পর্ব ৪০