Home জোড়া পাতার দিনলিপি জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১৩

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১৩

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১৩
তোনিমা খান

ছলনা, বিশ্বাসঘাতকতা, মিথ্যাচার, করাপশন, ন্যায়- অন্যায় এর বিষবাষ্পে চারপাশের পরিবেশ তখন গুমোট, ছমছমে। মাহির চৌধুরী তার সহজাত শান্ত মেজাজ ততক্ষণে হারিয়ে ফেলেছেন। এত বছরের অপরাধজীবনে কেউ কখনো তার পরিবারকে পেশার মাঝে টেনে আনার সাহস পায়নি। সেখানে কোন সাহসে কেউ তার বংশের একমাত্র উজ্জ্বল নক্ষত্রটিকে এই অন্ধকূপে টেনে আনল?
কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, পরক্ষণেই মাহির চৌধুরীর ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সামান্য আগের আতঙ্ক মুহূর্তেই রূপ নিল পৈশাচিক উল্লাসে। নিজের দুর্বলতাকেই তিনি অস্ত্র বানিয়ে নিলেন।
স্ক্রিনের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন,

‘আপনি তো আমার ক্ষতি করতে গিয়ে উল্টো মস্ত বড় উপকার করে ফেললেন, অফিসার!’
পরমুহূর্তেই তার চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে উঠল। গলার স্বর খাদে নামিয়ে হিসহিসিয়ে বললেন,
‘মাত্র একটা ফোনকল… আর আপনার পুরো ক্যারিয়ার ধুলোয় মিশে যাবে, অফিসার। আমার ভাতিজিকে বিনা দোষে অপহরণ করার মতো জঘন্য অপরাধ করেছেন আপনি। একজন সরকারি গোয়েন্দা অফিসার হয়ে এই কাজ? এই এক অপরাধের জোরে আমি আপনাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে ছাড়ব!’
তালহারের মুখশ্রীতে বরাবরের মতোই এক ধরনের শীতলতা। সে অত্যন্ত ঠান্ডা স্বরে বলল,
‘একজন আন্তর্জাতিক অপরাধীকে আইনের আওতায় আনার জন্য আমি যেকোনো পর্যায়ে যেতে পারি, চৌধুরী সাহেব। কে ফাঁসির দড়িতে ঝুলবে, তা আইন ঠিক করবে। আপনার সময় শেষ।’
মাহির চৌধুরী মৃদু হাসলেন।
‘আপনি আমায় গ্রেপ্তার করবেন? হাস্যকর কথা বলবেন না। কীসের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করবেন শুনি? আগামী দশ মিনিটের মধ্যে আমি আপনার গায়ের এই উর্দি আর পদমর্যাদা দুই-ই কেড়ে নেব।’
‘আর আমি আগামী পাঁচ মিনিটের মধ্যে আপনার ল্যাপটপ থেকে উদ্ধার করা সমস্ত গোপন তথ্য পাবলিক করে দেব।’

মাহির চৌধুরী এবার থমকালেন। কণ্ঠে শঙ্কার আভাস গোপন করে চড়া গলায় শুধালেন,
‘আমার ল্যাপটপ থেকে উদ্ধারকৃত তথ্য মানে? আপনার কাছে আমার ল্যাপটপ আসবে কী করে? অফিসার, মুখ সামলে কথা বলুন! ভুলে যাবেন না, আপনার স্ত্রী এখন আমার কাছে।’
তালহার স্মিত হেসে জানালার বাইরে মেঘের দিকে তাকাল। পরক্ষণেই মাহির চৌধুরীর দিশেহারা মুখের দিকে চোখ ফিরিয়ে বলল,
‘আমার ব্যক্তিগত জজ একটা কথা বলে জানেন! প্রত্যেক জটিল সমস্যারই একটা সহজ সমাধান থাকে। আগে আমি এটা মানতাম না। কিন্তু জীবন যখনই আমার অহংকার কেড়ে নিতে চায়, প্রতিবার সে আমার ‘জীবন’ হয়েই ফিরে আসে। আমার কাছে মাহির চৌধুরী নামক এই জটিল সমস্যার সহজ সমাধান হয়ে এসেছে ‘মেঘ’। ও আমার খুব ভালো বন্ধু।’
মেঘের ঝাপসা হয়ে আসা চোখ বেয়ে টুপ করে এক ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ল। মাহির চৌধুরীর কণ্ঠ আর দৃষ্টির তেজ ততক্ষণে স্তিমিত হয়ে এসেছে। তিনি চরম বিস্ময়ে মেঘের নত মস্তকের দিকে তাকালেন। অস্ফুট স্বরে বললেন,

‘তুমি বাবাকে শেষ করে দিলে, মেঘ। এটা কী করে করতে পারলে?’
মেঘ অনুভূতিহীন এক পুতুলের মতো মাথা নিচু করে নিলো। মাহির চৌধুরীর চোখে এবার বেদনার্ত স্নেহ ভর করল। তিনি ক্ষীণ স্বরে বললেন,
‘আমার মেঘ বড্ড সরল, অফিসার। আর আপনি ওর সেই সরলতার সুযোগ নিয়েছেন। কাজটা আপনি ঠিক করেননি। আমার মেঘকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করার দুঃসাহস আপনার হয় কী করে?’
হঠাৎ করেই তিনি গর্জে উঠলেন। তালহারের বরফশীতল চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘ওকে এই মুহূর্তে যেখান থেকে এনেছেন, সেখানে সসম্মানে রেখে আসুন। অন্যথায় আপনার স্ত্রীর কপাল বরাবর ঠিক এই মুহূর্তে গুলি চলবে, অফিসার!’
তালহার প্রত্যুত্তরে পকেট থেকে একটা কালো কুচকুচে রিভলবার বের করে ঠিক মেঘের সামনের টেবিলে রাখল। শান্ত গলায় বলল,
‘আপনি ওখানে একটা গুলি চালাবেন; আর আমি এখানে দুটো গুলি চালাব, চৌধুরী সাহেব। সিদ্ধান্ত আপনার।’

তার সেই শান্ত কণ্ঠস্বরের গভীরে সুপ্ত ছিল এক ভয়ানক হিংস্রতা। মেঘ অবিশ্বাস্য চোখে একবার টেবিলের ওপর রাখা অস্ত্রটি দেখল, আর একবার দেখল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চিরচেনা অথচ কঠোর সেই মুখটিকে। সর্বদা পাখির মতো কিচিরমিচির করা মেয়েটির বাকশক্তি ততক্ষণে কেড়ে নিয়েছে তালহারের এই নিখুঁত পরিবর্তন। এই তালহার তার স্ত্রীর জন্য সবকিছু ধ্বংস করে দিতে পারে। এই তালহার একজন আপসহীন গোয়েন্দা কর্মকর্তা। এই তালহারকে সে চেনে না। এ তো সেই মানুষটা নয়, যে একসময় মলিন মুখে বলত ‘আমরা খুব ভালো বন্ধু’।
মাহির চৌধুরী চারদিক থেকে অবরুদ্ধ হয়ে পড়লেন। তিনি মেঘের স্তব্ধ, নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকালেন। জীবনে তিনি অজস্র অপরাধ করলেও এতটা নিকৃষ্ট এখনো হতে পারেননি যে, নিজের হাতে লালন-পালন করা মেয়েটিকে চোখের সামনে বলি দেবেন। আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা তালহার মুজাহিদও এমন কোনো কাঁচা খেলোয়াড় নয় যে ভয় পেয়ে হাল ছেড়ে দেবে।
অবশেষে চৌধুরীর চোখেমুখে পরাজয়ের নম্রতা ভিড় করল। তিনি অনুনয়ের স্বরে বললেন,
‘ওকে ছেড়ে দিন, অফিসার। ও কখনো এমন দমবন্ধ পরিবেশে থাকেনি। ও ভয় পাচ্ছে।’
‘নিজেকে স্যারেন্ডার করুন এবং আমার স্ত্রীকে সুস্থ-সবল অবস্থায় ফিরিয়ে দিন।’
তালহারের কণ্ঠে একরোখা জেদ।
মাহির চৌধুরী থমথমে মুখে বললেন,

‘আমায় আটকে আপনি কিছুই করতে পারবেন না। আপনার কী মনে হয়, এত বছরের গড়ে তোলা সাম্রাজ্য আপনি এক মুহূর্তে ধ্বংস করে দেবেন? সবকিছু আগের মতোই চলবে। আমি কিচ্ছু না।’
তালহারের ঠোঁটের কোণে এবার তীব্র এক ব্যঙ্গাত্মক হাসি ফুটে উঠল। সে মাথা নেড়ে বলল,
‘এক মুহূর্ত? আই ওয়েস্টেড মাই ফোর মান্থস! আই ওয়েস্টেড মাই প্রাইভেট লাইফ, আই রিস্কড মাই হোম ফর দিস সাকসেস, চৌধুরী সাহেব! ভ্রম থেকে এবার বেরিয়ে আসুন। আপনাকে আর আপনার পেছনের গডফাদার মিস্টার জিন্নাহকে জনসমক্ষে টেনে আনার সব প্রস্তুতি আমি সম্পন্ন করেছি।”
জিন্নাহ নামটি শুনতেই মাহির চৌধুরীর দেহ হীম হয়ে আসল। যেই নাম এত বছরে কেউ জানেনি সেই নাম পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে তালহার মুজাহিদ। মাহির চৌধুরী বুঝে গেলেন শেষ চেষ্টা করা বোকামি হবে। কিন্তু তবুও তিনি শেষবারের মতো গলাটা সামান্য নরম করে বললেন,
“আমরা একটা সমঝোতায় আসতে পারি, অফিসার। তাতে আপনারও লাভ হবে, আমাদেরও লাভ হবে।”
তালহারের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
‘কেমন সমঝোতা?’

তালহারের কণ্ঠে সুপ্ত নমনীয়তার আভাস পেতেই মাহির চৌধুরীর নুইয়ে পড়া অন্তঃস্থল উজ্জ্বীবিত হতে লাগলো। উন্মুক্ত কণ্ঠে বললেন,
‘যত চান তত টাকা দেয়া হবে। পদোন্নতি সহ রাজনৈতিক সুযোগ সুবিধা সব পাবেন। রাজার হালে থাকবেন।’
মেঘ আরো একদফা আশ্চর্য নয়নে নিজের চাচাকে পরোখ করল। এই স্নেহভরা মুখটির পেছনে এত অন্ধকার লুকিয়ে আছে তার একটুও ধারণা ছিল না।
তালহার থুতনি চুলকালো। আড়চোখে চেয়ে চাপা স্বরে বলল,
‘আপনার কথার গ্যারান্টি কী?’
মাহির চৌধুরীর ভেতর থেকে নিশ্চিন্তের এক নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসল। সে চেয়ারে ধপ করে বসে পড়ল। প্রেশার হাই হয়ে গিয়েছে বোধহয়। ঘাড় ডলতে ডলতে শান্ত স্বরে বলল,
‘আমার ভাতিজিকে দিয়ে যান আর নিজের রাজ্য ও রানীকে নিয়ে যান। আমি কথায় না কাজে গ্যারান্টি দেই।’
তালহার সরু দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,
‘যতক্ষণ না আমি আমার স্ত্রী সহিসালামত আমার হাতে পাচ্ছি ততক্ষণ আপনার ভাতিজি আমার হেফাজতে থাকবে।’
মাহির চৌধুরী দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,

‘আচ্ছা, আপনি আসুন এবং নিজের হিসাব বুঝে নিন। যা চান তাই পাবেন।’
ফোনটি কেটে গেল। কক্ষের এক কিনারার চেয়ারে বসে থাকা মেহমেদ চোখ তুলে তাকালো মেঘের মুখপানে। তালহার ও পিসি থেকে দৃষ্টি সরিয়ে চেয়ার সমেত ঘুরলো মেঘের দিকে। মেঘ চোখ তুলে তাকায়। চোখে চোখ মিলতেই পুনরায় এক ফোঁটা অশ্রু গড়ায়।
তালহার চোখ সরিয়ে নেয়। হঠাৎ অনুভব হলো বুকের ভেতর চিন চিন ব্যথা করছে।
সে মিহি স্বরে বলল,
‘থ্যাংক ইউ ফর কামিং হিয়ার, মেঘ।’
মেঘ তার আটকে আসা কণ্ঠের উপর জোর করে। ক্ষীণ স্বরে জিজ্ঞেস করে,
‘তুমি বিবাহিত?’
তালহারের মলিন মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। মেয়েটির পানে চেয়ে উদাসীন কণ্ঠে বলল,
‘বিবাহিত? আমি আমার হারিয়ে যাওয়া দু দুটো পুতুলের বাবাও।’
নিজেকে কারোর বাবা বলার সময় তার চোখেমুখে অদ্ভুত স্নেহ আর আফসোস ফুটে উঠল। মেঘ স্তব্ধ চোখে দেখল একজন পরিপূর্ণ ফ্যামিলি ম্যানকে।
আর মেহমেদ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ‘বসের বউ’ বলে অহংকার করা মেয়েটির অহংকার চূর্ণ বিচূর্ণ হতে দেখছে।
মেঘের চোখ বেয়ে অনবরত পানি পড়তে লাগল। তালহার দীর্ঘশ্বাস ফেলে চেয়ারটা টেনে আরেকটু এগিয়ে নিলো। আঁকড়ে ধরল মেঘের হাত। নম্র স্বরে বলল,

‘আমি কী কখনো বলেছি যে ‘আমি তোমায় ভালোবাসি’?’
মেঘ রক্তিম চোখে চেয়ে বলল,
‘কিন্তু তুমি সবসময় আমার খুব যত্ন করতে, খেয়াল রাখতে, সম্মান করতে।’
তালহার মলিন হেসে বলল,
‘এটা আমি সব নারীদের ক্ষেত্রে করি। আমারা দ্বারা আজ পর্যন্ত কোনো নারী অসম্মানিত হয়নি। তোমার কাছে ভালোবাসা মানে কী এগুলোই?’
মেঘ কোলের মাঝে গুটিয়ে রাখা হাত দুটো কচলাতে কচলাতে শিশুসুলভ টলটলে চাহনিতে তাকালো। ক্ষীণ স্বরে বলল,
‘যত্ন করা, খেয়াল রাখা, সম্মান করা, কষ্ট না দেয়া এটাই ভালোবাসা।’
চেয়ার পিঠ এলিয়ে দিয়ে তালহার উদাসীন চিত্তে হাসল। বলল,
‘উহু, ভালোবাসা ব্যক্তি সাপেক্ষে ভিন্ন এক অনুভূতি। যেটা তোমার কাছে ভালোবাসা ওটা আমার কাছে দায়িত্ব। ভালোবাসা কেমন হয় শুনবে?’

ছোটবেলা থেকে আমি মেয়েদের প্রতি খুব অনাগ্রহী ছিলাম। তেমনি মেয়েরাও আমার প্রতি খুব একটা আগ্রহ পেত না। কিন্তু একদিন একটা মেয়ে আসল আমার জীবনে। পারিবারিক আয়োজনে আমি সেদিন প্রথমবার একটা মেয়েকে দেখতে গিয়েছিলাম। যে কি-না প্রচুর আগ্রহ কৌতুহল নিয়ে আমার দিকে উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে ছিল। সেই মেয়েটিকে নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার জন্য অতটুকুই কারণ ছিল।
বিয়ের পর এক মাসেও তার সাথে আমার কোনোরকম যোগাযোগ হয়নি। একমাস পর হঠাৎ একদিন আমার মনে হলো, আমার সাথে কেউ একজন জুড়ে আছে। আমি তাকে ঢাকায় নিয়ে আসি। ঠিক সেদিন থেকেই আমার জীবনটা বদলে যায়।
সে আমার দিকে সবসময় কেমন যেন উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে থাকত। গম্ভীর এই আমিটার ছোট ছোট কাজে মুগ্ধ হতো। আমি তার জন্য সামান্য কিছু জিনিসপত্র কিনেছিলাম যেগুলো আমার দায়িত্বের কাতারে পড়ত। কিন্তু সেগুলোকেই সে ভালোবাসা মেনে নিলো।
একদিন গভীর রাতে বাড়ি ফিরে দেখলাম আমার এলোমেলো ব্যাচেলর ঘরটির পরিবর্তে একটা গোছালো পরিপাটি ঘর। আর সেখানে কেউ আমার জন্য না খেয়ে খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছে।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘সে কেন এত রাত অব্দি না খেয়ে অপেক্ষা করেছে?’
জবাবে সে বলেছিল,

‘আপনি তো খাননি। তাই অপেক্ষা করছিলাম একসাথে খাব বলে।’
সেদিন আমি বাইরে থেকে খেয়ে এসেছিলাম। কিন্তু তারপরেও আমি তাকে উপেক্ষা করতে পারিনি। তার সাথে আবারও খাবার খেয়েছিলাম। তাতে তার খুশির ইয়ত্তা ছিল না।
এর পরের দিন থেকে আমার প্রতিটা কাজে অবচেতন ভাবেই অদ্ভুত তাড়াহুড়ো থাকত। আমায় বাড়ি ফিরতে হবে তাড়াতাড়ি। কেউ আমার জন্য না খেয়ে অপেক্ষায় থাকবে এই এক তাড়া আমায় তাড়িয়ে বেড়াত।
বিয়ের পর থেকে সে কখনো তেমন শাড়ি পরত না। একদিন সে শাড়ি পরল। আমি সেদিন অনুভব করলাম শাড়ির থেকে সুন্দর পোশাক আর নেই। কারণ সেটি আমার স্ত্রীর দেহে শোভা পেয়েছিল। এরপর থেকে শাড়ি কেনা আর অযথাই শাড়ির দোকানে ঘুরঘুর করা আমার প্রিয় দুটি কাজ হয়ে গেল। কিন্তু সবচেয়ে চমৎকার বিষয় কী জানো? এরপর থেকে আমার স্ত্রী আর কখনোই শাড়ি ব্যতীত কোনো পোশাক পরেনি আমার সামনে।
একদিন ফুলের দোকানে লিলি ফুল দেখে সে খুব খুশি হয়ে গিয়েছিল। তার লিলি ফুল খুব পছন্দের ছিল। এরপর থেকে যখনি লিলিফুল দেখতাম, আমার পা দু’টো অজান্তেই থমকে যেতো। লিলি ফুল না কিনে ওখান থেকে কোনোভাবেই ফিরে আসতে পারতাম না আমি।

তুমি জানো, সে তেমন রান্না করতে পারত না। কিন্তু আমার জন্য সে রান্না করা শেখে। এরপর থেকে আমি আর কখনো বাইরের খাবার মুখে তুলতে পারতাম না। মনে হতো, তার সকল কষ্টকে তুচ্ছ করা হচ্ছে। এবং আজ তিন বছর যাবৎ আমি না পারতে কখনো বাইরের খাবার মুখে তুলিনি।’
এতটুকু বলে তালহার দম ফেলে। তার চোখে অদ্ভুত কিছুর আনাগোনা ছিল। সে স্মিত হেসে বলল,
‘ তুমি বলো, ওই মানুষটাকে আমি কী করে না ভালোবেসে থাকি যে কি-না আমার জন্য বাঁচে? সে এমন একজন মানুষ যাকে উপেক্ষা করার কোনো ক্ষমতা আমার নেই। যাকে হারানোর ক্ষমতা আমার নেই। যাকে না ভালোবেসে থাকার ক্ষমতা আমার নেই। তার থেকে দৃষ্টি সরানোর ক্ষমতা আমার নেই, অন্য কারোর দিকে কী করে দৃষ্টি দেব? শি ইজ মাই ওয়াইফ এন্ড শি ইজ মাই হোম।’
মেঘ স্তব্ধ চোখে দেখছিল স্ত্রীর প্রতি বাজেভাবে মুগ্ধ এক পুরুষকে। স্ত্রীর কথা বলতে গিয়েও যার চোখ চিকচিক করছে। সে এতটাই গভীরভাবে ডুবে আছে তার স্ত্রীর মাঝে।
মেঘের চোখের সামনে ভেসে ওঠে মেরুন রঙা শাড়ি পরিহিত একটি মার্জিত পরিপাটি নারীর অবয়ব। নারীটি আহামরি সুন্দর নয় কিন্তু তার মাঝে ভালোবাসা পাওয়ার সব ক্ষমতা আছে। যা মেঘের নেই।
তিরতির ঠোঁট মেয়েটি ঠোঁট কামড়ে ধরে মেঘ। ভেজা কণ্ঠে বলল,

‘তোমার স্ত্রীর কিছু হবে না। আমি বাবার সাথে কথা বলব।’
তালহার স্মিত হেসে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
‘আমার স্ত্রীর কেউ কিছু করতেও পারবে না।’
‘আমি যখন বিয়ের কথা বললাম তখন তুমি কেন কিছু বললে না?’
‘এক ঘন্টা আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি কাউকে এটা জানানোর জন্য প্রস্তুত ছিলাম না যে—আমি বিবাহিত। তখন তুমি কেবল রাজী হয়েছিলে আমায় সাহায্য করার জন্য।’
‘আর তাই তুমি সবটা জানিয়ে আমার মন ভাঙতে চাওনি, তাই না?’
মেঘ অশ্রুসিক্ত নয়নে চেয়ে কথা কাটল। তালহার নিরুত্তর উষ্ণ নিঃশ্বাস ফেলল। মেঘ তার জবাবহীনতায় মলিন হেসে বলল,
‘তুমি কখনো আমার মন ভাঙতে চাওনি, কষ্ট দিতে চাওনি। অথচ সবচেয়ে বাজেভাবে তুমি-ই আমায় ভাঙলে। তুমি যদি আমায় সবটা বলতে আমি এমনিই তোমায় সাহায্য করতাম। তুমি তো জানতে, আমি তোমার কথা কখনো ফেলতে পারি না। আমি কখনো জানতাম না বাবা খারাপ কাজ করে। জানলে অনেক আগেই তোমায় সাহায্য করতাম। এতকিছুর প্রয়োজন ছিল না, তালহার।’
কান্না চেপে রাখতে রাখতে মেঘের চোখমুখ রক্তিম, ফুলে উঠেছে। তালহার উদাসীন নেত্রে চেয়ে বলল,
‘ক্ষমা করে দেয়া যায় না এই বন্ধুটিকে?’

‘আমি কখনো তোমার কথা ফেলতে পারি না, তালহার। যাই আজ ও ফেলতে পারব না। তুমি কী জানো, আমায় কষ্ট দেয়া খুব কঠিন। আমি একটুও কষ্ট পাইনি। কিন্তু আজ আমার অযথাই কান্না আসছে। আমার একটুও অভিযোগ নেই তোমার উপর।’
মেঘ অশ্রু সজল চোখে চেয়ে বলল। তালহারের মুখে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। সে মেঘের মাথায় আলতো হাত রেখে বলল,
‘স্যরি, মেঘ। কিন্তু এই মানুষটা সত্যিই তোমাকে খুব ভালো বন্ধু মনে করে।’
মেঘ অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রগাঢ় হাসল। বলল,
‘আমি সবসময় তোমার বন্ধু হয়েই থাকব।’
তালহারের মুখেও হাসি ফুটে উঠল। সে আরো কয়েকদফা ধন্যবাদ জানিয়ে মেহমেদকে ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
‘মেহমেদ চলুন। আমাদের যেতে হবে।’
মেহমেদ নড়েচড়ে উঠল। ক্ষীণ স্বরে বলল,
‘স্যার আপনি এগিয়ে যান। আমি আসছি।’
তালহার ছুটে বেরিয়ে গেল। তার গতিতে বড্ডো তাড়া। মেয়েটি যে অসুস্থ!
তালহার গেলেও মেহমেদ নিজের জায়গা ছেড়ে উঠল। অলস কদমে গিয়ে দাঁড়াল নতমুখে চুপটি করে বসে থাকা চঞ্চল মেয়েটির দিকে। মলিন কণ্ঠে ডেকে উঠল,

‘মেঘ?’
মেঘ আর নিজেকে আটকাতে পারল না। এতক্ষণের চেপে রাখা কান্না অবমুক্ত করে দিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। মেহমেদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেয়েটির মাথায় হাত রাখল। ক্ষীণ স্বরে বলল,
‘ডোন্ট ক্রাই। ইউ আর অ্যান এঞ্জেল! আপনার কারণে পুরো দেশ উপকৃত হয়েছে। আপনার নিজের উপর গর্বিত হওয়া উচিত। আপনি দেশের জন্য নিজের চাচার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন।’
কিন্তু মেঘ কোনোভাবেই নিজেকে থামাতে পারল না। যেই মেয়েটিকে সহজে কষ্ট দেয়া যেত না সেই মেয়েটি আজ কষ্টের কুলকিনারা খুঁজে পাচ্ছে না। মেহমেদ শুকনো ঢোক গিলে সদ্য দরজা খুলে উঁকি দেয়া বাবার দিকে তাকালো। খিলজি মাহমুদ তাকে ইশারায় যেতে বললেন। আর নিজে গিয়ে মেঘকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন,
‘মেঘ, আম্মি তুমি কী জানো তুমি একজন চমৎকার শক্তিশালী মানুষ? তুমি কঠোর তালহার মুজাহিদকে নয় বরং তার থেকেও চমৎকার একজন মানুষ ডিজার্ভ করো। যে তোমায় বুঝবে, আগলে রাখবে, ভালোবাসবে।’
আজ আর মনভুলানো কথায় ভুলল না মেঘ। আজ তার কষ্টের কোনো সুরাহা নেই। কেননা তার কষ্টের কারণ সে নিজেই।

বিশালাকৃতির সরকারি দালানে সরকারি কর্মকর্তারা অপরাধ করে। তালহার দালানটি দেখতে দেখতে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। মেহমেদ তার পিছু পিছু চলতে চলতে বলল,
‘স্যার আপনি কোনো রিভলবার আনেননি।’
‘আপনার কী মনে হয় তারা রিভলবার নিয়ে ঢুকতে দেবে?’
তালহারের গম্ভীর কণ্ঠে মেহমেদের টনক নড়লো। সত্যিই সদর দরজায় দাঁড়তেই তাদের চেক করল কালো পোশাক পরিহিত গার্ডরা। যাদের প্রত্যেকের হাতে একটা করে রিভলবার।
বিশালাকৃতির হলরুমে গার্ডদের ছড়াছড়ি। তালহার ঢুকতেই তার মাথায় রক্ত চড়ে গেল। বিন্দুর জ্ঞান ফিরেছে। কিন্তু তার কাঁধ গলিয়ে ঠিক বিউটিবোনের উপর একটি গার্ড হাত। বিন্দুর মুখ ঘৃণায়, রাগে টলটলে হয়ে আছে।
তালহার এদিক ওদিক তাকালো না। নিজের পাশে থাকা গার্ডের হাত থেকে ক্ষিপ্র বেগে রিভলবার ছিনিয়ে নিয়ে গর্জে উঠে বলল,

‘তুই ওর গায়ে হাত দিয়ে রেখেছিস কেন? তোর বাপের সম্পত্তি পেয়েছিস?’
ঠাস ঠাস দু’টো গুলি ছোঁড়ার শব্দে উপস্থিত সকলে সহ মাহির চৌধুরী চমকে উঠলেন। বিন্দুর গায়ে হাত দিয়ে রাখা গার্ডটির দুই বাহু ঠিকরে রক্তের ফোয়ারা বের হচ্ছে। মেহমেদ অবাক হলো। সে শুধু শুধুই নিজের রিভলবার টা হারিয়েছে। স্যারের কী বুদ্ধি! ওদের রিভলবার দিয়ে ওদেরকেই মেরেছে।
তালহারের রাগ তখনো কমলো না। সে লম্বা লম্বা কদমে এগিয়ে রিভলবার দিয়ে ধুপধাপ দু’টো বারি মারল গার্ডটির মাথায়। লোকটির দেহ মুহুর্তেই রক্তে ভিজে উঠল। সে মাটিতে পড়ে কাতরাতে লাগল।
মাহির চৌধুরী কঠোর গলায় বললেন,
‘অফিসার, বাড়াবাড়ি করবেন না একদম।’
‘আপনার গার্ডদের বলুন নিজেদের সীমা লঙ্ঘন না করতে।’
তালহার পাল্টা কঠিন স্বরে বলে বিন্দুর মুখ থেকে টেপ খুলে ফেলল। তার ক্ষিপ্ততা মিলিয়ে যায় মেয়েটির অশ্রুসিক্ত দূর্বল চোখে চোখ পড়তেই।
বিন্দুর ছলছল চোখে মুক্তির আশা। তার প্রেগন্যান্সি এমনিতেই রিস্কি। তার বাচ্চাটা এতটুকু ধকল সহ্য করতে পারবে তো? মায়ের সঙ্গ ছেড়ে চলে যাবে না তো? সে অনুরোধ করে বলল,
‘তালহার এখান থেকে আমায় দ্রুত নিয়ে চলুন না! লোকগুলো অনেক হিংস্র!’
সে স্মিত হেসে মেয়েটির গালে হাতের উল্টোপিঠ ছুঁইয়ে দিল। ক্ষীণ স্বরে বলল,
‘কষ্ট হচ্ছে? আর দশ মিনিট। এরপরেই এখান থেকে চলে যাব আমরা।’
সে বিন্দুর হাত পা খুলতে নিতেই মাহির চৌধুরী বাঁধা দিলেন।

‘অফিসার আগে আমরা কথার কাজ সম্পন্ন করি। তারপর আপনি আপনার স্ত্রীকে নিতে পারবেন।’
তালহার ভ্রুক্ষেপহীন বিন্দুর হাত পা খুলে দিয়ে কোলে তুলে নিলো। গনগনে স্বরে বলল,
‘আগে ওকে গাড়িতে রেখে আসি, চৌধুরী সাহেব। তারপর আপনার সাথে কথা হবে। আপনার সাথে কথা বলার জন্যই এসেছি।’
তালহার বিন্দুকে নিয়ে গাড়িতে রাখল। গাড়িতে রাখতেই বিন্দুর দূর্বল দেহ নেতিয়ে পড়ল। তালহার তাকে দ্রুত বুকে জড়িয়ে নিলো। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল,
‘হেই বিন্দু? খুব কষ্ট হচ্ছে? আর কিছুক্ষণ আমি যাব আর আসব।’
বিন্দু চোখ বন্ধ করে বলল,
‘আপনি যান।’
তালহার দ্রুত বেরিয়ে গেল। মেহমেদ শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে ছুটতে থাকা এক উন্মাদ স্বামীকে। তার ঠোঁটের কোনে বিষাদের হাসি।
একে অপরের সামনে পা তুলে বসল মাহির চৌধুরী এবং তালহার। মাহির চৌধুরী কিছু পেপারস আর ব্ল্যাঙ্ক চেক এগিয়ে দিল।

‘যত এমাউন্ট চাই তত বসাতে পারেন। এই সপ্তাহের মাঝে আপনার প্রোমোশন আর বনানীতে দশ তলা লাক্সারিয়াস দালান, গাড়ি তৈরি থাকবে।’
তালহার সেগুলো দেখে বলল,
‘পরিবর্তে আমায় কী করতে হবে?’
‘আমায় এবং জিন্নাহকে ভুলে যাবেন।’
‘সোজা কথা আমায় এই কেস হারতে বলছেন, তাই তো?’
‘হ্যাঁ।’
মাহির চৌধুরী তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে বললেন। তালহার চেক আর পেপারগুলো পুনরায় টেবিলে রেখে দিল। মাহির চৌধুরীর চোখে চোখ রেখে বলল,
‘এগুলো কাস্টিডিতে গিয়ে নিজের প্রসিকিউটরকে দেয়ার জন্য তৈরি রাখুন। কাজে লাগবে।’
মাহির চৌধুরীর চোখদুটো শঙ্কিত হয়ে উঠল। তিনি অলসতা ভেঙে সতর্ক কণ্ঠে বলল,
‘কী বলছেন আপনি?’
তালহার মৃদু হেসে বলল,
‘টিভি আছে এখানে? অন করুন।’
মাহির চৌধুরীর দেহ হীম হয়ে আসল। তিনি সতর্কতার সাথে টিভি অন করতেই সংবাদ মাধ্যমে নিজের বিস্মিত মুখটি ভেসে উঠল। টিভিতে ঠিক বর্তমানে তাদের দু’জনের লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে। সে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল,

‘আপনি….
‘আপনাকে কাস্টিডিতে নেয়ার মতো যথেষ্ট প্রমাণ আমার কাছে আগেই ছিল। আজকের কাজটা করে সেই প্রমাণ গুলোকে আরো জোরদার করে দিয়েছেন।
টর্চার সেলে দেখা হচ্ছে, চৌধুরী সাহেব।’
‘আপনাকে আমি মেরে ফেলব!’
মাহির চৌধুরী রীতিমতো হুঁশ হারিয়ে চেঁচিয়ে উঠে রিভলবার হাতে নিলো। উপস্থিত সকল গার্ড ও সাথে সাথে তালহারের দিকে রিভলবার তাক করল।
তালহার স্মিত হেসে তার কানের কাছে মুখ এগিয়ে নিয়ে গেল। ফিসফিসিয়ে বলল,
‘আগেও বলেছি আপনি এখানে একটা গুলি চালাবেন ওখানে আপনার ভাতিজির মাথায় দু’টো গুলি চলবে, চৌধুরী সাহেব। বি কেয়ারফুল!’
এর মাঝেই হেলিকপ্টার সহ পুলিশের গাড়ির সাইরেনে ভারী হয়ে উঠল চারিদিকের পরিবেশ। নিরাপত্তা বাহিনী মাইকের সাহায্যে মাহির চৌধুরীকে সাবধান করছেন।
মাহির চৌধুরী ধপ করে চেয়ারে বসে পড়লেন। সে দরদর ঘেমে উঠেছে। দূর্ভাগ্যবশত সে জিন্নাহ এর নাম ও উচ্চারণ করে ফেলেছে। তারমানে এখন আর তার কোনো নিস্তার নেই। আর না আছে মিথ্যা বলার উপায়।
তালহার ঠোঁটের কোনে বিজয়ের হাসি নিয়ে গটগট করে বেরিয়ে আসল।
গাড়িতে ঢুকতেই দেখল বিন্দুর শরীর অস্বাভাবিক ভাবে দূর্বল হয়ে পড়েছে।
সে মেয়েটির গাল চাপড়ে বিচলিত কণ্ঠে বলল,

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১২

‘বিন্দু? বিন্দু ঠিক আছো? কোথায় কষ্ট হচ্ছে আমায় বলো?’
বিন্দু ক্ষীণ স্বরে বলল,
‘বাসায় নিয়ে চলুন।’
‘হ্যাঁ, এখুনি যাচ্ছি।’
মেহমেদ নারীটিকে পর্যবেক্ষণ করতে করতে বলল,
‘স্যার, আমরা কী হসপিটালের দিকে যাব?’
তালহার মেয়েটির মাথা বুকে চেপে ধরে ব্যস্ত কণ্ঠে বলল,
‘আমায় একটু বাড়িতে দিয়ে আসুন, মেহমেদ।’
‘ইয়েস স্যার।’
মেহমেদ বিনম্র কণ্ঠে বলেই গাড়ি স্টার্ট দিলো। কিন্তু ততক্ষণে বিন্দু আবারো জ্ঞান হারালো।

জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here