জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৬
তোনিমা খান
বাইরে আষাঢ় মাসের ঝুম বৃষ্টি। ধরণী একদম যান্ত্রিকতা থেকে মুক্ত, নিস্তব্ধ। মানুষের আনাগোনা একদম নেই। চার দেয়ালের মাঝে ঝুম বৃষ্টির হীম করা শীতলতা আর জলাবদ্ধ নোংরা পানির গন্ধের আধিপত্য। একটা লাইটের আলোয় ঘরটি মৃদু আলোকিত ছিল। সেই রুমটিতে চারটা দেয়াল ব্যতীত আরকিছুই ছিল না ঘর বলে অ্যাখ্যায়িত করার জন্য। কিন্তু তালহারের মনে হচ্ছিল ওটা একটা সুখে সুখে সমৃদ্ধ ঘর। কেননা যেখানেই বিন্দু, সেখানেই ঘর, সেখানেই সুখ।
বিন্দু ঝাঁপসা নেত্রে টালমাটাল পায়ে দাঁড়িয়ে আছে। দরজার হাতল ধরে সে দূর্বল শরীরের ভারসাম্য রক্ষা করছে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ব্যাগের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে থাকা দু’টো লিলিফুলের দিকে।
“কী চাই আপনার?”
বিন্দু অজস্রবারের মতো জিজ্ঞেস করল। কর্ণকুহরে তখন আরো তীব্রভাবে কষাঘাত করে যাচ্ছে মালার বলা কথাগুলো।
“আপনি যাইতেই ঘরে মাইয়্যা মানুষ আনা শুরু করছে, ভাইজান।”
বিন্দু চোখ বন্ধ করে নিয়ে নিজের ঘৃণা, অসহায়ত্ব, ক্রোধ গলাধঃকরণ করে নিলো। পুনরায় বলল,
“আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি তালহার।”
তার টলটলে দৃষ্টি স্থির হয় ওই চিরচেনা নির্লিপ্ত মুখপানে। যে কি-না পি-ক্যাপ আর সানগ্লাস হাতে নিয়ে লাগাতার হাঁচি দিয়ে যাচ্ছে। এই ঝড়ের রাতে কে ক্যাপ আর সানগ্লাস পড়ে চলাফেরা করে? এই প্রশ্নটি এই মুহুর্তে বিন্দুর মাথায় আসল না। কিংবা সেই পরিস্থিতি ছিল না। সে শুধু তালহার মুজাহিদ নামক যন্ত্রণা আর ঘৃণ্য অনুভূতি দূর করতে চাইছে নিজের থেকে।
তালহার হাঁচি দিতে দিতে বলল,
“আপাতত টিস্যু দাও।”
“বাড়িতে যান টিস্যু, ওষুধ সব পাবেন। এত বিরক্ত হতে হবে না।”
“বাড়িতেই তো আছি।”
“আপনার সাথে রসিকতা করার পরিস্থিতিতে আমি নেই, তালহার। আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নেবেন না।”
বিন্দু কঠোর গলায় বলল। তালহার শেষ হাঁচিটা দিয়ে মুখের ওপর থেকে হাত সরালো। চোখমুখ ইতিমধ্যেই লাল হয়ে উঠেছে। সে দুই কদম এগিয়ে এসে দাঁড়ায় ঢিলেঢালা থ্রি পিস পরিহিত স্ত্রীর সামনে। নির্বিকার নারীটির ওড়না টেনে নিয়ে মাথা নুইয়ে নাক মুখ মুছলো। ভাঙা কণ্ঠে বলল,
“জ্বর কতদিন ধরে আছে? মা বলল, দু’দিন ধরে নাকি জ্বর? কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে আরো আগে থেকে জ্বর ছিল। চার দিনের বেশি হলে ব্লাড টেস্ট করাতে হবে।”
বিন্দু আর নিতে পারল না তার দায়িত্ববান স্বামীর ন্যায় আচরণ। সে চোয়াল শক্ত করে তালহারকে দূরে সরিয়ে দিলো। টলটলে নেত্রে চেয়ে রাগান্বিত স্বরে বলল,
“কেন এমন করছেন? আপনার কী একটুও দয়া হচ্ছে না আমার উপর? আপনি কী জানেন একটা মেয়ে ঠিক কতটা যন্ত্রনা, কষ্ট অনুভব করলে তার স্বামী সংসার ছেঁড়ে দিতে বাধ্য হয়? তালহার আমার জীবনের ওই পনেরো দিন কতটা বিভৎস ছিল আমি আপনাকে বর্ণনা করতে পারব না। আমার স্বামী অন্য এক নারীকে ভালোবেসে, তার সাথে সম্পর্কে রয়েছে, তারা বিয়ের আলোচনা করছে। এরপর যখন সে বাড়ি ফিরে আমার সাথে একজন দায়িত্ববান স্বামীর ন্যায় আচরণ করত, আমায় স্পর্শ করত তখন আমার মনে হতো কেউ আমায় জীবন্ত জবাই করছে তালহার। আমি ওই যন্ত্রণা নিতে পারছিলাম না। তাই বেরিয়ে এসেছি সব মায়া ছেড়ে। তবে কেন আপনি আমার যন্ত্রণা বাড়াচ্ছেন? আমার কোনো সম্পর্ক নেই আপনার সাথে। শুনেছেন? ডিভোর্স পেপার কখন দেবেন?”
মেয়েটির চোখ বেয়ে অবাধে জল গড়াচ্ছে। জ্বরের কারণে তার মুখশ্রী বিবর্ণ হয়ে আছে। ঠোঁট ফেটে চৌচির হয়ে আছে। কোমর ছাপানো খোলা চুলগুলো রুক্ষ শুষ্ক হয়ে উড়ছে সমানতালে। দূর্বল হাতের একটা ধাক্কা তালহারকে একটুও দূরে সরাতে পারেনি মেয়েটির থেকে। তালহার নীরবে তাকিয়ে রইল বিধ্বস্ত মেয়েটির দিকে। কিয়ৎকাল বাদ মেয়েটির দিকে হাত বাড়াতেই বিন্দু ঝাড়া মেরে সেই হাত দূরে দিল। শক্ত কণ্ঠে বলল,
“ছোঁবেন না একদম। এই হাত অন্য এক নারীকে স্পর্শ করে।”
ঠিক এতটুকু বাক্য যেন পুরুষটির হাতের গতিকে আরো জেদ ঢেলে দিল। তালহার নির্বিকার আবার এগিয়ে গিয়ে মেয়েটির কাঁধ গলিয়ে এলোমেলো চুলগুলো দু’টো শক্তপোক্ত হাতের আজলায় নিয়ে নিলো। বিন্দু ফুঁসে উঠল। কিন্তু তালহারের হাতের কাছে তা নিছকই তুচ্ছ জেদ ছিল। সে দক্ষ হাতে এলোমেলো চুলগুলো হাত খোঁপা করতে করতে ধিমি কণ্ঠে বলল,
“এই হাত কখনো কোনো নারীকে এমনভাবে স্পর্শ করেনি যেমনটা বিন্দুকে করেছে।”
বিন্দুর চুল বাঁধার মতো অতটুকু শক্তি পাচ্ছিল না। সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তথাকথিত স্বামীর গম্ভীর মুখপানে। এই মুখে সে হাসি খুব কম দেখেছে। সে তাচ্ছিল্য ভরা চাহনি ফেলে বলল,
“কিন্তু এই বুকে আমার মতো অন্য কেউ ও মাথা রাখে, তাই না?”
তালহার চোখ নামায় মেয়েটির চোখে। চোখে চোখ রেখেই বলল,
“উঁহু, এই বুকে কেউ বিন্দুর মতো করে মাথা রাখার অধিকার রাখে না।”
সহসা টুপ করে বিন্দুর চোখ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু গড়ালো। ফিসফিসিয়ে বলল,
“মিথ্যা! সত্যটা জানার পরে প্রিয় জনের মুখ থেকে শোনা মিথ্যা কতটা যন্ত্রণা দেয় আপনি জানেন তালহার? সে খুব সুন্দর হাসিমুখে আপনার বুকে মাথা রেখে দাঁড়িয়ে ছিল। আপনাদের একসাথে খুব সুন্দর লাগছিল তালহার।”
তালহার একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল স্নিগ্ধ মুখপানে। সে উজ্জ্বল শ্যামলা বরণের এক নারী ছিল। কিন্তু তার গঠনে ছিল অদ্ভুত মায়া। আচ্ছা, নারীটি কী জানে, চোখে চোখ রেখে মিথ্যা বলা যায় না? সে ভীষণ অলসতার সাথে মেয়েটির ললাটে থাকা এলোমেলো চুলগুলো গুছিয়ে কানের পিঠে গুঁজে দিল। জিজ্ঞেস করল,
“আমাদের বিয়ের বয়স কত?”
এই মুহূর্তে এর থেকে অহেতুক প্রশ্ন আর কিছু হতেই পারে না। বিন্দু এমন অহেতুক প্রশ্নের জবাব দিল না। তালহার পুনরায় শুধালো।
“আমাদের বিয়ের বয়স কত বছর?”
“তিন।”, অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছোট্ট করে বলল বিন্দু।
“তিন বছর। হিউজ টাইম! তুমি জানো, আমি কখনো ভাবিনি আমার সাথে কোনো মেয়ে লং টাইম থাকতে পারবে। কারণ একটা মেয়ে তার পার্টনারের থেকে যা চায় আমার মধ্যে সেই গুণগুলো একদম নেই। আমি কাউকে মাথায় তুলে প্যাম্পার করতে জানি না। ভালোবাসি, ভালোবাসি বলে রব তুলতে পারি না। কিন্তু একটা সময় আমার জীবনে একটা মেয়ে আসল। আশ্চর্যের বিষয় কী জানো, সে আমার মধ্যে থাকা ভীষণ স্বাভাবিক কিছু কাজে, অভ্যাসে ভালোবাসা খুঁজে নিতো। আমি প্রথমবার তার জন্য সামান্য কিছু জিনিসপত্র কিনেছিলাম সে তাতেই মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। খুশিতে আত্মহারা হয়ে গিয়ে মনেপ্রাণে আমার সংসার আঁকড়ে ধরেছিল। সে আমার থেকে কখনো ভালোবাসি শুনতে চায়নি। সে আমার ছোট ছোট বিষয়ে ভালোবাসা খুঁজে নিতো। আমি অবাক হতাম। একটাসময় বিশ্বাস করে নিলাম আমার সাথে লং টাইম স্টে করার মতো মেয়ে আছে। যে সামান্য কিছুতে ভালোবাসা খুঁজে পায়, সে ভালোবাসি না বললেও কখনো আমার সঙ্গ ছাড়বে না। কিন্তু একটা দীর্ঘ সময় পর এসে আমার বিশ্বাস ভেঙে গেল। সে আমায়, আমার গোটা সংসার ছেড়ে দশ মিনিটের ব্যবধানে বেরিয়ে গেল। এমনকি একটা সিঙ্গেল কৈফিয়ত পর্যন্ত ও চায়নি।”
বলতে বলতেই তালহারের মুখশ্রী অস্বাভাবিক গম্ভীর হয়ে উঠল। তার উষ্ণ নিঃশ্বাস আরো তপ্ত করে তুললো ঠিক চার আঙুল নিচে থাকা স্তব্ধ মুখটিকে।
ক্ষীণ স্বরে বলল,
“চিটিং ইজ আ চয়েজ তালহার, নট আ মিস্টেক যে আমি আপনার কাছে সেই ভুলের কৈফিয়ত চাইব। আপনি স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্বের একজন মানুষ। আমার কোনো অধিকার নেই আপনার চয়েজের উপর প্রশ্ন তোলার। আপনি যাকে ইচ্ছা তাকে নিয়ে জীবন কাটানোর অধিকার রাখেন। কিন্তু কারোর জীবন ধ্বংস করার অধিকার একদম রাখেন না।”
তালহার স্মিত হাসল। ফোলা ফোলা গালে নিজের শীতল হাতের উল্টোপিঠ ছুঁইয়ে দিয়ে বলল,
“চিটিং তো আমি করেছি। কিন্তু তিন বছর আগে নিজের সাথে। কখনো বিয়েতে আগ্রহী না থাকা ছেলেটা এক দেখায় আচেনা একটা মেয়েকে বিয়ে করে নিলো।”
“আফসোস হচ্ছে?”
“প্রচুর।”
“তাই আজ তিন বছর পর নিজের পছন্দ বেছে নিয়েছেন?”
বিন্দুর কণ্ঠ আর চাহনি বড্ডো নিথর।
তালহার আচমকাই মাথা নামিয়ে নিলো। বিন্দুর কর্ণকুহরে আন্দোলিত হয় বড্ডো ক্ষীণ স্বর।
“আমি তো প্রতিবার এক টুকরো চন্দন কাঠকেই বেছে নেই। এন্ড ইউ শ্যুড রেসপেক্ট মাই চয়েজ।”
গলার বাম পাশের সৌন্দর্য বর্ধনকারী হাড়টিতে সদ্য লেপ্টে যাওয়া দুটি উত্তপ্ত ওষ্ঠের ছোঁয়া অনুভব হতেই বিন্দু শক্ত করে নিজের পোশাক খামচে ধরলো। তার চোখের সামনে সবটা ঝাঁপসা হয়ে আসে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার ফলে তার মনে হচ্ছে ভেতর থেকে সব উগড়ে বেরিয়ে আসবে।
কিন্তু নিজে থেকে মিথ্যা ভালোবাসা বুঝে নিতে নিতে আজ সে ভীষণ ক্লান্ত। এখন আর মিথ্যা ভালোবাসা বুঝে নিতে চায় না সে। সে তখনো লোকটির সকল স্বীকারোক্তি ছাপিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে আছে তার পাওয়া যন্ত্রণাদায়ক দুনিয়ার মাঝে। যেখানে তার স্বামীর বুকে অন্য এক নারীর আধিপত্য, যেখানে তার স্বামীর সাথে অন্য নারীর সম্পর্ক, যেখানে তার অবর্তমানে তার স্বামী অন্য নারীকে তার সংসারে জায়গা দিয়েছে।
তিরতির করে কেঁপে ওঠা ঠোঁট কামড়ে ধরল বিন্দু। থমথমে মুখে বলল,
“আমি আপনাকে আর আপনার সংসার ছেড়ে বহু আগেই চলে এসেছি তালহার। আপনি যাকে ইচ্ছা তাকে বেছে নিতে পারেন। তাতে আমার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই বিশ্বাস করুন। কিন্তু আপনি আমার জীবনে আর একচুল যন্ত্রণা বাড়াতে পারবেন না।
আপনি যদি ভেবে থাকেন ঘরে স্ত্রী, বাইরে গার্লফ্রেন্ড রাখবেন। আর আমি আপনার কথায় ম্যানুপুলেট হয়ে আবার সংসার করতে শুরু করব তবে আপনি ভুল। আপনি নিশ্চয়ই মায়ের বলার কারণে দায়িত্ব পালন করতে এসেছেন? তাকে ম্যানেজ করা আমার জন্য কোনো বিষয় না। কিন্তু আপনাকে সহ্য করা অনেক কষ্টকর আমার জন্য। আপনি এই মুহূর্তে বের হয়ে যাবেন এখান থেকে।
বিন্দু টালমাটাল পায়ে দুই কদম দূরে সরে গিয়ে ক্রুব্ধ কণ্ঠে বলল। তালহার ঠিক তার কথামতো দূরে সরে গেল। এমনিতেই সে অনেকটা স্বভাব বহির্ভূত আচরণ করে ফেলেছে।
পুরোটা ভেজা জবজবে দেহে তালহারকে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে বিন্দুর কঠিন চোয়াল হালকা হয়ে এলো। বাইরে তখনো মেঘ গর্জনের বিকট আওয়াজ সহ ঝড়ের আভাস স্পষ্ট। লোকটার তো ঠান্ডার কত বাজে সমস্যা রয়েছে। প্রায় সবসময়ই ওষুধের উপর থাকতে হয়। মস্তিষ্ক সায় না দিলেও মনের সাথে পেরে উঠল না বিন্দু। সে পিছু ডাকল।
“শুনুন, বৃষ্টি কমলে চলে যাবেন। আপাতত জামা কাপড় খুলে শুকিয়ে নিন। নয়তো জ্বর এসে যাবে।”
তালহার পিছু ফিরে তাকালো। নির্বিকার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“দরজা আটকাতে যাচ্ছি মিসেস। জ্বরে মাথাটা কাজ করছে না বুঝতে পারছি। বিছানায় গিয়ে শুয়ে থাকুন।”
বলেই তালহার ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দিলো। বিন্দু স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল লোকটির দিকে। দড়িতে ঝুলিয়ে রাখা গামছা টেনে নিয়ে তালহার নিজের পোশাক খুলতে লাগল। আর এক মুহুর্ত এই ভেজা পোশাকে থাকলে জ্বরগ্রস্থ বিন্দুর তাকেই সেবাযত্ন করতে হবে।
বিন্দু নিজের শোবার ঘরের কপাট আঁকড়ে দাঁড়ালো। লোকটা পরবে কী এখন? থমথমে মুখে জিজ্ঞেস করল,
“আপনার গাড়ি কোথায়? ভিজে এসেছেন কেন? এখন পরবেন কী?”
তালহার জবাব দিল না। বিন্দু এবার নিরুপায় হয়ে এদিক ওদিক তাকালো। দড়িতে শুকাতে দেয়া একটা কালো লেডিস ব্যাগি প্যান্ট ছাড়া আর কিছুই চোখে বাঁধল না। সে বলল,
“ওটা পরবেন? এটা ব্যতীত আপাতত আর কিছু নেই।”
তালহার লেডিস প্যান্টটি থেকে চোখ সরিয়ে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে তাকালো নারীটির দিকে। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“কিছু না পরে থাকলেও সমস্যা হবে না। তুমি অভ্যস্ত!”
বিন্দু থমথমে মুখে চাইলো। চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,
“আমি যদি খুব ভুল না হই তবে এটা একটা ট্রিক্স ছিল তাই তো?”
তালহার প্যান্ট খুলতে খুলতে মুচকি হাসল। বিন্দু ক্রোধে টলটলে নেত্রে চেয়ে রুমে ঢুকে গেল। দরজার ছিটকিনি লাগাতে গেলে অসহায়ত্ব অনুভব হলো। ওই দরজার ছিটকিনি ভাঙা। কোনোভাবেই দরজাটা লাগাতে পারল না সে। ওদিকে দাঁড়িয়ে থাকাও কষ্টকর হয়ে পড়েছে। অগত্যা দরজা চাপিয়ে রেখে সে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।
কোমরে গামছা পেঁচিয়ে তালহার অবুঝপানে এদিকে ওদিক তাকাতে তাকাতে তার ঘরে ঢুকলো। একটা প্লাস্টিকের বাস্কেট, একটা পড়ার টেবিল আর মেঝেতে পাতা একটা বিছানা। এইতো বিন্দুর ব্যাচেলর সংসার। তালহার কিছুটা আশ্চর্যের সাথে সবটা ঘুরে ঘুরে দেখল। এই কঠোর স্ত্রী তার অচেনা। যে কি-না শুধুমাত্র একজন চরিত্রহীন ব্যক্তির সাথে থাকবে না বলে অচেনা শহরে সব ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে। তার ভাবনায় আসে, এখানে যদি ইন্টেলিজেন্স অফিসার তালহার মুজাহিদ না থেকে কোনো চরিত্রহীন ব্যক্তি থাকত তবে কী হতো?
খুব বাজে হতো। কিন্তু সে এটা খুব উপভোগ করছে। তার স্ত্রী তার সকল ট্রিক্স বুঝে যায় কিন্তু শুধু একটা জিনিস বলে বোঝাতে হবে।
“অদ্ভুত নারী!”
টেবিলে থাকা ওষুধগুলো তুলে তুলে দেখতে দেখতে আওড়ালো তালহার। ঠোঁটের কোনে বাঁকা হাসি। কাঁথা মুড়ি দিয়ে থাকা নারীটির পানে বাঁকা দৃষ্টি ফেলে বলল,
“ডিভোর্স চেয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এসেছ; অথচ বেবি কনসিভ করার জন্য ডাক্তার যে ওষুধগুলো দিয়েছিল তা এখনো খাচ্ছো। এর ব্যাখ্যা কী?”
প্রেক্ষিতে বিন্দুর কোনো নড়চড় না দেখা গেলেও কণ্ঠ শোনাগেল।
“আজ না হোক কাল আল্লাহ আমার গর্ভে ঠিক রহমত পাঠাবেন। তার জন্য হলেও নিজেকে সুস্থ সবল করে রাখতে হবে আমায়। কিন্তু আমি মা হলেও এটা জরুরী নয় যে— বাবা আপনি-ই হবেন।”
সহসা তালহারের মনে হলো কেউ সপাটে তার গালে একটা জুতা মেরেছে। সে চোয়াল শক্ত করে কঠিন চোখে তাকালো কাঁথার মুড়ি দিয়ে থাকা নারীটির পানে। ঘাড় মর্দন করতে করতে হিসহিসিয়ে বলল,
“বাহ্! অনেকদূর ফিউচার প্লান করে ফেলেছো দেখছি। কিন্তু আফসোস তা বাস্তবায়িত হবে না।”
তালহার কোনোমতে নিজের রাগ দমন করার চেষ্টা করে। চাপা স্বরে বিড়বিড় করে বলল,
“কে বাবা হবে তা দেখে নেবো।”
বিন্দু প্রতিক্রিয়াহীন মৃদু কাতরাচ্ছে। তালহার খোলা জানালা আঁটকে থমথমে মুখে বলল,
“রাতের খাবার খেয়েছ?”
“নাহ, কিছু খেতে পারছি না।”
“হানি চিকেন এনেছি। খেয়ে নাও।”
তালহার হানি চিকেন একটা প্লেটে বেড়ে দিয়ে তার মাথার কাছে রাখল। সহসা বিন্দু ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকালো। প্রচুর জ্বর, অসুস্থতার মাঝেও সে যদি কিছু খেতে পারে, তবে সেটা স্যুপ আর এই হানি চিকেন। কিন্তু আজ এগুলোও তার মাঝে ভীষণ তীক্ত স্বাদের জন্ম দিচ্ছে।
তালহার গমগমে স্বরে বলল,
“খেয়ে ওষুধ খেতে হবে।”
কিন্তু বিন্দু অনড়। অগত্যা তালহার নিজেই তার মুখের ওপর থেকে কাঁথা উঠিয়ে ফেলল। আর প্লেট হাতে নিয়ে বিন্দুর পাশে পা গুটিয়ে বসে নিরুদ্বেগ তার মুখের সামনে চিকেন এগিয়ে দিল। বিন্দু ঝাঁপসা চোখে তাকে দেখছে। তালহার জোরপূর্বক তার মুখে চিকেন ঢুকিয়ে দিল। বিন্দু খেলো। তালহার ও তার সাথে সাথে খেতে লাগল। কিন্তু চার পাঁচ পিস খেতেই বিন্দু আচমকা হড়বড়িয়ে উঠে বসল আর গলগল করে বমি করে দিল।
তালহার হতভম্ব হয়ে নিজের গামছার দিকে তাকালো। যেটা বমিতে পুরো মেখে গিয়েছে। বিন্দুর দেহ ততক্ষণে নেতিয়ে পড়েছে। তালহার হতভম্ব হয়ে বলল,
“তুমি কী আমাকে ওই লেডিস প্যান্ট পরিয়ে ছাড়বে? আশ্চর্য! পাশে বমি করা যেতো না?”
বিন্দু পানি পান করে চোখের উপর হাত দিয়ে শুয়ে আছে। তালহার ফুঁসতে ফুঁসতে উঠে দাঁড়াল। এখন কী করবে?
“আমি ওই লেডিস প্যান্ট কোনোভাবেই পরব না।”
“তবে বেরিয়ে যান এখান থেকে। আপনাকে এখানে বসে এইসব নাটক করতেই বা বলেছে কে?”
তালহার রাগে গজগজ করতে করতে এবার মেয়েটির গলার ওড়না ছিনিয়ে নিলো। বিন্দু সরব চোখ খুলে বলল,
“এটা কোন ধরণের বেয়াদবি?”
তালহার ততক্ষণে ওড়না নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গিয়েছে। বের হলো কোমরে বিন্দুর ওড়না পেঁচিয়ে। কী দূর্যোগ! তার চোখেমুখের বেহাল দশা। সে সদ্য ধুয়ে আনা ভেজা গামছাটা বিন্দুর মাথার উপর ছড়িয়ে দিলো। একটু স্বস্তি পেল বিন্দু। তালহার বলল,
“স্যুপ বানাচ্ছি। তাই খেয়ে ওষুধ খেয়ে নিয়ে নেবে।”
“কোনো প্রয়োজন নেই তালহার। এগুলো কেন করছেন?”
বিন্দু বদ্ধ নেত্রে বিরোধ করল।
“যেন আগামী দিনে আমার সেবা করতে পারো, তাই।”
“মেঘ কী এখনো আসেনি আপনার সেবা করার জন্য?”
বিন্দু টলটলে নেত্র খুলে বলল। তালহার বিরক্তিতে ‘চ’ বর্গীয় শব্দ করে বেরিয়ে গেল রুম থেকে। সাথে করে আনা ইনস্ট্যান্ট স্যুপের প্যাকেট আর চিকেন কিউব নিয়ে অদক্ষ হাতে পাতিল নেড়েচেড়ে দেখল। এগুলো বানায় কী করে? সে প্যাকেটের গায়ে থাকা নির্দেশনা অনুযায়ী স্যুপটা বানাতে সক্ষম হলো। খুব একটা খারাপ হয়নি। লেমন গ্রাস আর লেবু স্যুপের স্বাদ আর ঘ্রাণ একটু বাড়িয়ে দিয়েছে।
সে স্যুপ এনে আবার মেয়েটির পাশে বসল। বিন্দু তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সে ডেকে মেয়েটিকে স্যুপ খাওয়ালো আর ওষুধ খাওয়ালো।। এবার আর বমি করল না বিন্দু। বিন্দু নিভু নিভু চোখে চেয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার যত্নবান স্বামীর দিকে। সে জানে না এই লোকটি আদৌও তার স্বামী আছে কি-না, কিংবা হয়তো কিছু সময়ের ব্যবধানে সে অন্য কারোর হয়ে যাবে। তবে এগুলো কেন?
সে ধিমি কণ্ঠে বলল,
“বৃষ্টি কী কমেনি?”
তালহার নিজের বানানো স্যুপ নিজেই মুখ ভ্যাটকাতে ভ্যাটকাতে খাচ্ছিল। এত বাজে খাবার হয়? বিন্দুর কথায় ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। ঝুম বৃষ্টি তখনো পড়ছিল। আজ রাতে আর বৃষ্টি থামবে না। বলল,
“কমলেও বা কী?”
“ঘর থেকে বের হবেন। বাড়ি ওয়ালা জানতে পারলে বাজে ঘটনা ঘটবে।”
“হ্যাঁ, আমি তো তোমার প্রেমিক। যে কি-না অবৈধভাবে তোমার সাথে দেখা করতে এসেছি।”
তালহার দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
বিন্দু মলিন হেসে বলল,
“আমাদের বৈবাহিক সম্পর্কের পবিত্রতা সেদিন-ই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, যেদিন আপনি অন্য নারীকে বুকে জায়গা দিয়েছিলেন। কিন্তু দেখুন এতকিছুর পরেও আপনি কতটা নির্লিপ্ত!”
বিন্দুর কণ্ঠে অবসাদ, বিস্ময়। কারোর জীবন ওলোটপালোট করে দিয়ে কেউ কী করে এতটা নির্লিপ্ত থাকতে পারে?
তালহার তখনো নীরবে খেয়ে যাচ্ছিল আর হাঁচি দিয়ে যাচ্ছিল। দশ মিনিট বাদ রুমের লাইট নিভে যেতেই বিন্দু দূর্বল নেত্র খুলে এদিক ওদিক তাকালো। তালহার চলে গিয়েছে কী?
অন্তঃস্থলে প্রশ্নটি জাগতে পারল না তার আগেই প্র্যত্যুত্তরে দুটি শক্তপোক্ত হাত এক ঝটকায় তাকে বুকে তুলে নিলো।
বিন্দুর ম্যাট্রিসটা সিঙ্গেল ছিল। একজন ই ঘুমাতে পারত। তালহারের মতো একজন সুঠামদেহী পুরুষ ঘুমানোর পর আর বিন্দুমাত্র জায়গার অবশিষ্ট নেই। তাই আজকের জন্য ওই চিরচেনা বুকটাই ছিল বিন্দুর সবচেয়ে আরামদায়ক বিছানা। বিন্দুর মাথাটা ধরে নিজের ঘাড়ে গুঁজে দিয়ে তালহার নিজেদের পুরোটা কাঁথা দিয়ে ঢেকে নিলো। অতঃপর মেয়েটির ঘাড়ে আলতো স্পর্শে হাত বুলাতে বুলাতে আদেশের সুরে বলল,
“ঘুমাও, আমি মাথা টিপে দিচ্ছি।”
বিন্দুর চেপে রাখা কান্না, আবেগ, অভিযোগরা ঠিকরে বেরিয়ে আসল। আজ আর সে প্রিয় মানুষটিকে জড়িয়ে ধরার অধিকার খুঁজে পাচ্ছে না। ঘুমের বদলে নারীটি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠতেই তালহার বিতৃষ্ণা ভরা নিঃশ্বাস ফেলল। বিন্দু ফুপাতে ফুপাতে আলতো করে আঁকড়ে ধরল তালহারের পিঠ। তার হাতটি কাঁপছে। সে খুব করে চাইছে মানুষটাকে আঁটকে রাখতে কিন্তু একটা জলজ্যান্ত মানুষ কী করে আঁটকে রাখা যায়?
সে ফিসফিসিয়ে বলে উঠল,
জোড়া পাতার দিনলিপি পর্ব ৫
“মেঘ কে, তালহার?”
“কেউ না।”, তালহার তার চুলের গোছায় চুমু দিয়ে ছোট্ট করে জবাব দিল। কিন্তু বিন্দু জানত, মেঘ তালহারের জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কেউ। সে বিগত তিন বছরের মতো এখনো মিছে ভালোবাসা খুঁজে বেড়াচ্ছে এই কঠিন ব্যক্তিত্বের মানুষটির মাঝে।
