আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮০
ইসরাত জাহান দ্যুতি
-‘তারপর কী হলো, কাকু?’ ইয়াসিফ মন্ত্রমুগ্ধ সুরে জিজ্ঞেস করল।
-‘তারপর আবার কী? ওর কান্নাকাটি দেখার সময় ছিল না আমার। বাড়ির লোককে যা বলার বলে চলে আসি আমি ঢাকা। খুব একটা খুশি তো ছিল না তারা। আমার মেজাজের ভয়েই ওকে মেনে নিতে বাধ্য হয় আরকি।’
কেউ যেন গলার টুঁটি চেপে ধরে রেখেছে তাওসিফের। এই মাতাল অবস্থায় সোহাইল সাহেবের ভয়াবহ স্বীকারোক্তিগুলো শুধু তাকেই স্তম্ভিত করেছে। কিন্তু ইয়াসিফ আরও আরাম করে সোফায় গা এলিয়ে বসল। রসিয়ে রসিয়ে জিজ্ঞাসা করে গল্পটা পুরোপুরি শুনেই ছাড়ল সে সোহাইলের থেকে। যার মূল গল্প হলো – রেজার মৃত্যুর বছর দুই পরই ঝুমুর সোহাইল সাহেবের আহ্বানে সাড়া দেন। কিন্তু বিয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধায় পড়েছিলেন তিনি। কারণটা ছিল দীধিতি।
সে সময় কিরণের বোঝার মতো মানসিকতা না থাকলেও বারো বছরের দীধিতির মাঝে ভালোই পরিপক্কতা এসেছিল৷ সোহাইল সাহেব যুবক বয়সে ছিলেন ভীষণ বেপরোয়া স্বভাবের। যখন তখন বাড়িতে এসে হাজির হতেন তিনি। সেটা দীধিতি অন্যরকম চোখে দেখতেও আরম্ভ করেছিল। তাতে অবশ্য সোহাইলের কিছু যায় আসে না। কিন্তু ঝুমুর না পারছিলেন স্বার্থপর, বিবেকহীনের মতো দীধিতিকে পরিত্যাগ করতে, আবার না পারছিলেন মৃত স্বামীর প্রেমিকার ওই সন্তানের পরিপূর্ণ দায়িত্ব নিতে৷ এক মানসিক টানাপোড়েনের মাঝে আরও একটি বছর কাটিয়ে দেন তিনি সোহাইলকে কোনে সিদ্ধান্ত না জানিয়ে। তাদের সম্পর্কের তিন বছর পূর্ণ হতেই সোহাইল বিয়েটা করে ফেলের আচমকাই। সে সময় কিরণ আট বছরের। মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের বিষয়টি আর দীধিতিকে দূরে কোথাও পাঠিয়ে দেওয়া হলে তা কিরণের মনে কতটা বিরূপভাব জন্ম দেবে, সেটা ঝুমুর নানান কৌশলে মেয়ের সাথে কথা বলে বুঝতে পারেন৷ অর্থাৎ রেজা বাদে মাকে অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে থাকতে দেখতে তার ভালো লাগবে না আর বড়ো বোনকে দূরে চলে গেলেও তা মেনে নিতে পারবে না সে। শুধু কিরণের মানসিক সুস্থতার কথা ভেবেই সোহাইলকে তিনি জানিয়ে দেন, ও প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া অবধি তিনি বিয়ের কথা জানাতে পারবেন না ওকে।
কিন্তু উগ্র মেজাজি, বেপরোয়া সোহাইল তা চুপচাপ মেনে নেওয়ার মতো মানুষই ছিলেন না। বাবা হওয়ার পরিকল্পনা করেন তিনি। কিন্তু কোনো কারণবশত ঝুমুর গর্ভবতী হচ্ছিলেন না৷ আর সেই কারণটা তিনি উদ্ঘাটনও করে ফেলেন– জন্মনিরোধক বড়ি। যে কারণে তুমুল ঝগড়া বাঁধিয়ে বেশ কয়েক বছর ঢাকায় এসে পড়ে থাকেন তিনি। মাহতাব সাহেব আর জাকির শেখের সঙ্গে থেকে রাজনীতিতে পুরোদস্তুর চৌকস হয়ে ওঠেন। এর মাঝে বহু নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কেও জড়িয়েছিলেন ঝুমুরের প্রতি রাগ আর ক্ষোভ থেকে৷ যশোর ফিরলেও কোনো যোগাযোগ বা দেখা-সাক্ষাৎ করতেন না৷ সম্পর্কটা থেকেও না থাকার মতোই হয়ে গিয়েছিল তাদের। তাই ভেতরে ভেতরে দারুণ মুষড়ে পড়েছিলেন ঝুমুর। স্রেফ কিরণের চিন্তা করেই শক্ত রাখতে পেরেছিলেন নিজেকে। সন্তানের পাশাপাশি নিজের যত্নেরও তাই কোনো কমতি রাখেননি।
দীধিতি যখন কলেজ জীবন শেষ করবে, ঠিক সে সময় সোহাইল ফিরে আসেন ঝুমুরের জীবনে। বলা ভালো, আসার চেষ্টা করেন। কিন্তু মাঝের কয়েকটা বছরের দূরত্ব ঝুমুরকে এতটাই জেদি করে তুলেছিল যে, সোহাইলকে ঠান্ডা মাথায় তালাকের কথা জানিয়ে দেন তিনি। গোপনে বিয়েটার সমাপ্তি গোপনেই সেড়ে ফেলার আদেশ দেন সোহাইলকে। রীতিমতো তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন তাতে। তার সেই ক্ষুব্ধতার প্রথম শিকার হয় দীধিতি৷ ভেবেছিলেন, দীধিতির সর্বনাশ ঘটলে ঝুমুর আতঙ্কিত হয়ে পড়বেন কিরণের নিরাপত্তা নিয়েও। এতে এক ঢিলে দুই পাখি মরবে। দীধিতির ঝামেলাও ঘাড় থেকে নামবে আর ঝুমুরও সে সময় নিজের আর কিরণের পাশে ক্ষমতাবান মানুষ হিসেবে তাকেই ভরসা করতে বাধ্য হবেন। যদিও পরিকল্পনা তার পুরোপুরি সফল না হলেও মূল সমস্যার সমাধান হয়ে গিয়েছিল। ঝুমুর সত্যিই কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন দুই মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে।
মূলত ঝুমুরের কাছে সোহাইল সাহেবের ফিরে আসার কারণ কেবল প্রেমই ছিল না। ঢাকায় থাকাকালীন একবার বাইক অ্যাক্সিডেন্টে ভয়াবহ আহত হয়েছিলেন তিনি। সে সময় তার বন্ধ্যাত্ব সম্পর্কেও ডাক্তার অবগত করেছিল তাকে। যা আর কোনোকালেই সেরে ওঠার নয়। প্রচণ্ড হতাশা আর দুঃখে ঝুমুরের কথায় তাকে ভাবিয়েছিল বারবার। অথচ নিজের কষ্টের ভাগ তিনি দিতে পারলেন না ঝুমুরকে। যে দূরত্ব তিনি সৃষ্টি করেছিলেন, তা বছরের পর বছর বজায় রেখেছিলেন ঝুমুর৷ যার ফলে ঠিক আবারও একই অন্যায় তিনি কিরণের সঙ্গেও করেন ভিন্ন উপায়ে। পরিকল্পনাটা তখন আর ভেস্তে যায়নি। ঝুমুরের ভরসা আর কোমলতা সে সময়ই জিতে নেন আবার৷
সুযোগ বুঝে সমস্ত কথার রেকর্ডিং করে নিয়েছে ইয়াসিফ। আর তাওসিফ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে শুধু ভাবতে থাকে চার বছর আগে নাওফিলের সেই অনুমান শক্তির কথা৷ কতটা কাছাকাছি চিন্তা করে ফেলেছিল তখন নাওফিল! যা আজ প্রায় সবটাই মিলে গেছে। সামনাসামনি না হলেও মনেমনে কতবার যে ছোটো ভাইয়ের ধারাল বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করে ফেলেছে সে, তা হিসাবহীন।
ভিডিয়ো রেকর্ডিং ইয়াসিফ নির্দ্বিধায় নাওফিল, দীধিতি, কিরণ আর সৌরভকেও ডেকে শোনায় সে রাতেই। এবং প্রস্তুত থাকে নাওফিল বা দীধিতির আদেশের। শুধু একবার ওরা মুখ ফুটে আইনি পদক্ষেপ নিতে বললে মুহূর্তেই সোহাইল সাহেবকে জেলে পুরে আরও গোটা কয়েক মামলা ঠুকে দেবে সে। অধিকাংশ মামলাগুলো হত অবশ্যই সত্য কিছু। জীবনে কম বেআইনী কাজ তো করেননি তিনি৷ যার সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহ করা ইয়াসিফের জন্য কোনো কষ্টেরই হত না। কিন্তু অভাবনীয়ভাবে তখন বাঁধ সাধে দীধিতি। নিস্পৃহ কণ্ঠে জানায় সে ইয়াসিফকে, ‘আমি তো আমার অতীতকে বহুদূরে ফেলে এসেছি, ভাই। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আজ আমি আপনাদের সহযোগিতা আর দোয়ায় নিজের মজবুত স্থান গড়েছি।
একদিক থেকে আমার অস্তিত্ব টিকে থাকার পিছে আম্মুর ভূমিকাও কিন্তু কম না। আপনারা আমার সাথে হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে চাইছেন। কিন্তু পাশাপাশি আম্মুর বাকি জীবনটাকেও দূর্বিষহ করে তুলবেন তাতে। সে তো সেই শুরু থেকেই প্রকৃত সুখ থেকে বঞ্চিত হয়ে এসেছে, তাই না? আব্বু মানে রেজাউল হক আমার জন্য দায়বদ্ধতা থেকে তাকে বিয়ে করলেন। সংসারও করলেন কেবল দায়িত্ববোধ থেকে। বেঁচে থাকাকালীন তিনি তো আসল সুখটাই দিলেন না আম্মুকে। কোন নারী স্বামীর প্রেমিকার সন্তানকে বুকে আগলে নিতে পারবে নিঃসঙ্কোচে, বিনা অভিযোগে? আম্মু কিন্তু একটা পর্যায়ে এসে সেটাই করে দেখিয়েছে, সেটা যেমন করেই হোক। আমাকে কি চাইলে কোনো অনাথাশ্রমে ফেলে আসতে পারত না সে? আজকে প্রায় শেষ বয়সে এসে সোহাইল কাকুর সঙ্গে খুব ভালো আছে আম্মু। তাহলে তার সুখকে আমার কি কেঁড়ে নেওয়া উচিত হবে? অকৃতজ্ঞ হয়ে যাব না আমি? তেরোটা বছর সে আমার মাথার ওপর অভিভাবকের ছায়া হিসেবে সব দায়িত্ব পালন করেছে। ঢাকায় এসে পড়াশোনা করতে চেয়েছি, তা-ই করিয়েছে৷ চাইলে কি পারত না এইচএসসির পরই বিয়ে দিয়ে আমার বোঝা থেকে মুক্ত হতে? কী ঠেকা ছিল তার আমাকে প্রতিষ্ঠিত করবার? আব্বু আমার জন্য যে অর্থ রেখে গেছেন, চাইলে সেটাও কি আত্মসাৎ করে নিতে পারত না?’
কথা শেষে ঘরে উপস্থিত সবার মুখের দিকে একবার করে তাকাল দীধিতি। নাওফিলের শান্ত চেহারাতে কঠিন গম্ভীরতা দেখে বুঝতে বাকি নেই, মোটেও ওর কথাকে গ্রাহ্য করছে না সে। সৌরভ, তাওসিফে মুখভঙ্গিও কঠিন। আর কিরণের চেহারায় বিস্ময়। মেয়েটা আশা করেনি বোধহয়, এত কিছু হওয়ার পরও ঝুমুরের ভালো থাকার চিন্তা করবে ও। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইয়াসিফের নির্বিকার মুখপানে চেয়ে বলল, ‘স্যরি, ভাই, আমি তোমাদের অসন্তুষ্ট করলাম। এমনিতেই আম্মুর জীবনের মূল্যবান সময়গুলোতে তার কষ্টের কারণ হয়েছি আমি। এরপর আর সম্ভব নয় আমার পক্ষে তার দুঃখের কারণ হওয়ার। আমি আমার মতামত জানালাম। সৌরভ আর কিরণ যদি নিজেদের সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের জন্য কোনো স্টেপ নিতে চায়, সেটা ওদের ব্যাপার৷ কিন্তু ওদের খেয়াল রাখতে হবে, সেখানে যেন আমি বা আমার বিষয় কোনোভাবেই জড়িত না হয়। আমার তরফ থেকে সোহাইল শেখের শাস্তির ভারটা আমার উপরওয়ালার ওপরই ছেড়ে দিলাম।’
আচমকা নাটকীয় কায়দায় হাত তালি দিয়ে ওঠে সৌরভ। ‘ব্রাভো!’ রাগের চোটে কথা বলতেই যেন অসুবিধা হয় তার। ‘তোর মতো হাই মাইন্ডেড মেয়ে ঘরে ঘরে পয়দা হোক।’ দীধিতিকে কটাক্ষ করেই সে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। তাওসিফ তখন দীধিতির মতবিরোধ করে কিছু বলতে উদ্যত হলে কিরণ সহসা ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেলে। আর সে কান্না তিন ভাইকে বুঝিয়ে দেয়, তার মায়ের অবহেলায় বড়ো হয়ে ওঠা বোনের উদারহৃদয়ের পরিচয় পেয়ে প্রচণ্ড অপরাধবোধ দৃঢ় হয়ে জেগেছে তার মনে। পারলে মায়ের হয়ে সে-ই হয়ত অতীতের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিতো বোনের থেকে। তার কান্না এও বুঝিয়ে দেয় ওদেরকে, দীধিতির মতো সেও চাইছে না মায়ের সংসার জীবনটা আবার তছনছ হোক। অতীতে সোহাইল শেখ তাদের সঙ্গে অন্যায় করেছেন বটে। কিন্তু এখন তিনি ঝুমুরকে সত্যিই মাথায় তুলে রাখেন। যে জন্য মায়ের চেহারায় সব সময় এখন সুখের জৌলুস দেখতে পায় সবাই।
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭৯
অপরিহার্যভাবে ঠোঁট টিপে থাকতে হলো তখন তিন ভাইকে। তবে নাওফিলের থেকে কোনো বিশেষ প্রতিক্রিয়া না পেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যায় দীধিতি৷ কারণ, ইয়াসিফ আর তাওসিফের মতো সেও জানে যে, এই মানুষটি তার শান্ত শীতল চেহারার আড়ালেই বহুবার আতঙ্কজনক পরিকল্পনা গোপন রেখে গেছে। এবং তা নির্দিষ্ট সময়ে নীরবেই সম্পন্ন করেছে। এবার কি হাত গুটিয়ে বসে থাকবে সে?
