আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮১
ইসরাত জাহান দ্যুতি
বুকের দেওয়ালের সঙ্গে হৃৎপিণ্ডটা যেভাবে ধাক্কা খাচ্ছে, দীধিতির ধারণা ওর কোমর জড়িয়ে ধরে সটান দাঁড়িয়ে থাকা নাওফিল স্পষ্টই সে শব্দ শুনতে পাচ্ছে। ভয়ঙ্কর উত্তেজনায় শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁট চেটে নিয়ে দরজা থেকে চোখ ফিরিয়ে তাকাল সে নাওফিলের দিকে। কোনো ভাবাবেগ নেই ছেলেটার চেহারায়৷ ফোনে অনবরত কী যেন করে যাচ্ছে চুপচাপ। পেছনেই ক্লান্ত ভঙ্গিমায় কিরণ তাওসিফের বুকের সঙ্গে সেঁটে আছে আর তাওসিফ তখন লন সাইডটা মুগ্ধতা নিয়ে দেখতে ব্যস্ত। প্রায় পাঁচ বছর আগে এসেছিল সে জেরিন ইসলামের এই বাড়িতে। তখন বাগানটা ছিল ছোটো পরিসরে। এখন সেটা পুরো লন জুড়ে করা হয়েছে। বাগানের মাঝখানে ধবধবে সাদা গোল টেবিল আর চারটে চেয়ার। স্বচ্ছ কৃত্রিম আলোয় দেখা যাচ্ছে বারোমাসি ফুলগাছের সমারোহ।
কর্ট ইয়ার্ডের এক পাশে দেখা গেল ইয়াসিফ আর মাভিশাকে নিজেদের মাঝে কথা বলতে। ওদের চেহারাতেও ক্লান্তি ভর করেছে ঠিকই৷ কিন্তু কেউ কিরণের মতো নেতিয়ে পড়েনি৷
ওরা এখন সিডনি। জেরিন ইসলামের বাড়িতে প্রবেশ করেছে সবে। তবে বাসার ভেতরে যাওয়ার সুযোগ হয়নি এখনও। কী যেন এক কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা রয়েছে। যার জন্য কোথাও কোনো সিকিউরিটি গার্ডের প্রয়োজন নেই৷ বিগত পাঁচ মিনিট হলো অপেক্ষা করছে ওরা কর্ট ইয়ার্ডে দাঁড়িয়ে। তবে দীধিতি খেয়াল করেছে, দরজার পাশেই এক বিশেষ অত্যাধুনিক মেশিন রয়েছে। যার সামনে নাওফিল দাঁড়াতেই ওর মুখসহ রেটিনা স্ক্যান করে নিলো যন্ত্রটা। কয়েক সেকেন্ডের মাঝে যন্ত্রটা নাওফিলের ব্যক্তিগত ডোশিয়ে চেক করে জানতে পেরেছে এ বাসায় অনুপ্রবেশের অধিকার রয়েছে ওর৷ একই কাজ তাওসিফ আর ইয়াসিফের ক্ষেত্রেও ঘটল। কিন্তু দীধিতি, কিরণ আর মাভিশার কোনো ডোশিয়ে মেশিনে সংরক্ষিত নেই বলে ওরা কোনোভাবেই ঢুকতে পারবে না। এমনকি ভাঙচুর করেও সম্ভব হবে না মূল ফটক খুলে ভেতরে যাওয়ার৷ উলটে পুলিশের কাছে ওদের ছবিসব রিপোর্ট চলে যাবে ত্রিশ সেকেন্ডের ভেতর। সে সব ব্যবস্থায় করে রাখা আছে। অস্ট্রেলিয়ার সিমকার্ডটা ফোনে ব্যবহার করছে এখন নাওফিল। বোধহয় যোগাযোগ করার চেষ্টা চালাচ্ছে জেরিন ইসলাম অথবা বাসার কেয়ারটেকারের সঙ্গে। ফোনটা হাত থেকে নামিয়ে পকেটে পুরল ও। সবাইকে একবার দেখে নিয়ে জানাল, ‘অপেক্ষা শেষ হচ্ছে।’ ইয়াসিফ আর মাভিশা কথা থামিয়ে দুজন তখন এগিয়ে এসে দাঁড়াল তাওসিফদের কাছে।
মিনিট তিনেক পর দরজাটা খুলতেই ওদের সামনে এসে দাঁড়ালেন নাইট স্যুট পরিহিত ছয় ফিটের বেশি উচ্চতার এক সুঠামদেহী শেতাঙ্গ পুরুষ। তার চেহারা দেখে নাওফিল ছাড়া বাকিরা বয়সটা অনুমান করল চল্লিশের আশেপাশে৷ ভদ্রলোকের চেহারায় যতখানি না জেন্টেলম্যানের ছাপ, তার চেয়েও বেশি রাশভারী, কাঠিন্যতা। কিন্তু হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে বৃহৎ এক হাসি টানলেন মুখে৷ আসতে দেখা গেল নাওফিলের দিকে। ‘নোওফিল! ইউ টোটালি সারপ্রাইজড মি, ইয়াংম্যান।’ ওকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। একদম মুসলিম রীতিতে মুলাকাত করলেন যেন।
-‘ভালো তো, ডেভিডসন?’ জড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই জিজ্ঞেস করল নাওফিল।
-‘খুব ভালো। জেরিন তো ভাববে স্বপ্নে দেখছে তোমাকে।’
হাসল নাওফিল। খোশমেজাজে সবার পরিচয় দিতে দিতে ভেতরে এলো ডেভিডসনের সঙ্গে। জেরিন এবং জেরিনের বাসার সবকিছুতে তদারকি করেন বর্তমান তিনিই। তার সঙ্গে মায়ের সম্পর্কটা কী, তা নাওফিল দীধিতিকে অবগত করতে কিছুটা অস্বস্তিবোধই করল৷ শরীরে অস্ট্রেলিয়ান বাবার রক্ত বইলেও হৃদয়ে তো দীধিতি বঙ্গললনায়৷ তবে বউটা বুদ্ধিমতী ওর। চোখের দিকে চেয়েই টের পেলো, ডেভিডসনের ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে সে। তাতে বিশেষ কোনো পরিবর্তন হলো না চেহারায়।
গত চার বছরে জেরিন ইসলামের জীবনেও এক বিরাট পরিবর্তন ঘটেছে৷ আজীবন একাকী থাকার যে পণ করেছিলেন তিনি, তা পঞ্চাশ বছর বয়সী সুদর্শন ডেভিডসনের হাত ধরেই ভঙ্গ করেছেন৷ এর অধিকাংশ কৃতিত্ব অবশ্য পুলিশে থাকা এই বড়ো কর্মকর্তা লোকটিরই।
জেরিনের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার উত্তেজনায় দীধিতির ডেভিডসনকে কোনো চিন্তাভাবনা কাজ করছে না এ মুহূর্তে৷ লিভিংরুমে সকলে বসতেই লোকটা হারিয়ে গেলেন ডাইনিংরুমের দিকে। নাওফিলও তাকে লক্ষ করে যেতে উদ্যত হচ্ছিল, অমনি ওর কব্জি চেপে ধরে দীধিতি বিস্ময়-বিহ্বল চোখে দেখতে থাকল মাস্টার বেডরুম থেকে বেরিয়ে আসা নারীটিকে দেখে। পাঁচ ফিট পাঁচ ইঞ্চির মতো উচ্চতা, দুধসাদা গায়ের বর্ণ, গোলাকার সুন্দর এক মিষ্টি মুখ আর সরল দুটি কালো চোখ তার। বয়সের ছাপ হিসেবে কাঁধ অবধি থাকা কালো রেশমি চুলগুলোর মাঝে একটা, দুটো সাদা চুল দেখা যাচ্ছে৷ আরও কাছাকাছি আসলে তার মসৃণ ত্বকে আবছা বলিরেখাও বোঝা গেল কিছুটা৷ পরনে মার্জিত রাতের পোশাক।
কিরণের দেহ থেকেও যেন সমস্ত ক্লান্তি উবে গেছে৷ অবাক চোখে জেরিন ইসলামকে দেখতে দেখতে কখন যেন দাঁড়িয়েই পড়েছে সে। দীধিতির ধরে রাখা হাতটির জন্য নাওফিল উজ্জ্বল হাসি নিয়ে এগিয়ে যেতে পারল না স্নেহময় নারীটির কাছে। তিনিই এলেন, প্রাণবন্ত হাসি ঠোঁটে ধরে কী কী যেন বলে নাওফিলের মাথায়, গালে, বুকে হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর জড়িয়ে ধরলেন৷ তবে তার ঠাঁই হলো নাওফিলের বুকের মাঝখানে৷
বিমূঢ় দীধিতি এক আচ্ছন্নতার মাঝে আটকা পড়েছে যেন। নাওফিল আর জেরিন একে অপরের সাথে কী কথা বিনিময় করেছে, কিছুই শুনতে পায়নি সে৷ মূলত কথা কানে পৌঁছলেও মস্তিষ্কে তা ধারণ করেনি ওর। চোখের কার্নিশ থেকে নোনাপানি কখন ঝরে পড়তে শুরু করেছে, টের পায়নি তাও।
দীধিতির কাছে ঝুঁকে ওর চিবুক ধরে জেরিন আরও কতকিছু বলছেন! সবটাই বলছেন তিনি নাওফিলের বউ ভেবে। প্রায় পাঁচ থেকে ছয় বছর আগে দীধিতির ছবি দেখেছিলেন নাওফিলের কাছে৷ তা ভোলেননি৷ তাই নাওফিল ওর পরিচয় দেওয়ার আগেই তিনি আদরের ঝুলি খুলে নিয়ে বসলেন।
-‘ইস! কাঁদছ কেন, সোনা? মাথা ধরেছে নিশ্চয়ই?’
এতক্ষণে জেরিনের বলা মাত্র এই কথাটিই কানে পৌঁছলো দীধিতির। অপ্রতিরোধ্য আবেগপূর্ণ কান্না সামলাতে গিয়ে ঠোঁট আর চিবুক কাঁপতে থাকল ওর। জেরিন ওকে এক দেখাতেই না চিনতে পারলেও দীধিতির ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ঠিকই সঙ্কেত দিয়েছে ওকে, ওর ঘ্রাণেন্দ্রিয় মায়ের শরীরের গন্ধকে চিনিয়ে দিয়েছে অনায়াসেই।
-‘মনি, আসার আগে তোমাকে সারপ্রাইজের কথা বলেছিলাম আমি।’ নাওফিল পাশ থেকে বলল জেরিনকে। ওর দিকে একবার সস্নেহে তাকিয়ে দীধিতির পাশে বসে জবাব দিলেন তিনি, ‘আর আমি আমার সারপ্রাইজকে পেয়েও গিয়েছি, নাওফিল। তোমাকে বলে দিতে হবে না।’ বলে তিনি তাওসিফ, ইয়াসিফ, ওদের সবার দিকে তাকিয়েই হাসলেন৷ কিরণকেও কাছে টেনে বসিয়ে দিলেন নিজের পাশে।
নাওফিল কিছু বলল না এরপর। হঠাৎ দীধিতির সোলডার ব্যাগের চেইন খুলে ভেতরে হাত গলিয়ে দিলো। একটা ডকুমেন্টস ফাইল বের করে হাতে আনতেই সবার কৌতূহলী দৃষ্টি পড়ল ওর দিকে৷ বলা উচিত, কৌতূহলটা জেরিন আর মাভিশার চোখে শুধু৷ বাকিরা অবগত ফাইলটার ব্যাপারে। তবে তাওসিফ বলতে চাইলো, ‘সবাই রেস্ট করার পর ধীরেসুস্থে জানানো যেত।’ কিন্তু দীধিতির মুখটা দেখে নাওফিলের সিদ্ধান্তকেই সমর্থন করতে হলো।
-‘কী ওটা, নাওফিল?’ জিজ্ঞেস করলেন জেরিন।
এর মাঝে ডেভিডসন এসে পড়লেন। তিনি নাইট স্যুট ছেড়ে তখনই কিচেনে রওনা দিয়েছিলেন। আধা ঘণ্টার মাঝে ওদের সকলের জন্য খাবারের আয়োজন করে ফিরেও এলেন। ‘ইয়াংম্যান?’ ডেকে বললেন নাওফিলকে, ‘চলো, তোমাদের রুমে পৌঁছে দিই। চট করে হট শাওয়ার নিয়ে ডিনার শুরু করে দেবে। সব রেডি।’
মৃদু হাসল নাওফিল। ‘যাচ্ছি, আঙ্কেল। পাঁচটা মিনিট বসুন প্লিজ।’
আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮০
-‘কী ডাকলে আমাকে? আঙ্কল? একটু আগেও তো ঠিক ছিল। হঠাৎ কী হলো?’ বলতে বলতে ওর পাশে এসেই বসলেন।
জবাবে কিছু বলল না নাওফিল। ডিএনএ রিপোর্টটা জেরিনের হাতে তুলে দিলো নীরবে। তারপর বলল ডেভিডসনকে, ‘টু বি ফাদার ইন ল-কে নাম ধরে ডাকতে অকওয়ার্ড শোনাবে, ম্যান। মনে করছি তাই এখন থেকেই অভ্যেসটা করা দরকার।’
