অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ২৭
রুপা
আর্যর এগারোটার ফ্লাইটে যাওয়ার কথা থাকলেও কিছু কারণবশত ফ্লাইট একদিন পিছিয়ে যায়। সেটা অ্যাসিস্ট্যান্ট জানালে আর্য কিছু বলে না, সে অফিসে চলে যায়। যাওয়ার সময় পুষ্পকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে যায়। আর্য অফিসে ম্যানেজমেন্টের স্টাফদের নিয়ে মিটিং শেষ করে। তাদের বিজনেস বিল্ডিং নির্মাণের ক্লায়েন্টের ইনস্ট্রাকশন অনুযায়ী ডিজাইনার আর ইঞ্জিনিয়ার মিলে ডিজাইন করে, বাকি কাজ শ্রমিকরা করে। এখন যে প্রজেক্ট শুরু হয়েছে, সবাইকে সেটা ভালোভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে কারণ আগামী সাত দিন সে থাকবে না। আর্য মিটিং শেষ করে নিজের কেবিনে এসে বসতেই সেখানে প্রবেশ করে তার অ্যাসিস্ট্যান্ট।
পুষ্প কলেজ শেষ করে বাড়িতে এসে প্রতিদিনের মতো গোসল শেষে শেহনাজ সরকারের সাথে গল্প করে। সবার সাথে দুপুরের খাবার খেয়ে একটা ভাতঘুম দেয়। ঘুম থেকে উঠে ছয়টা বাজে। ফ্রেশ হয়ে নিচে নামতেই সোফায় নতুন কিছু মুখ দেখে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে নামতে থাকে। সোফায় বসে আছে ইভানের মা-বাবা, তাদের পাশে বসা ইভান। পুষ্পকে দেখে ইভানের মুখে খুশি উপচে পড়ে, যেটা চোখ এড়ায় না নিশির। সেদিন ও খেয়াল করেছিল ইভান কাউকে খুঁজছিল তারপর পুষ্প কে নিচে নামতে দেখে আর্যর তাকে টেনে রুমে নিয়ে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দেওয়া। সব মনে পড়তেই নিশির মনে এবার কুটিল বুদ্ধি হানা দেয়। সে মিনারা বেগমের কানে কানে কিছু একটা বলে উঠে দাঁড়ায়। কাজের মেয়ে চা-নাশতা টেবিলে রাখছিল, এমন সময় মিনারা বেগম ‘না দেখার ভান’ করে উঠতে গেলে চায়ের কাপ ইভানের ওপর পড়ে যায়। সাথে কাজের মেয়ের হাত থেকে ট্রে-টাও পড়ে যায়। ইভান ‘আহ’ করে উঠল।
সবাই হকচকিয়ে ওঠে। নিশি ইচ্ছে করে ভালো সেজে কাজের মেয়েকে ধমক দিয়ে কাজ করতে বলে। পুষ্পকে বলল ইভানকে গেস্ট রুমে নিয়ে যেতে, যাতে চা পড়ার জায়গাটা ধুয়ে নিতে পারে। ইভানের গায়ে গরম চা পড়ায় বেশ জ্বলছে, কাজের মেয়ের পায়েও পড়েছে। তাই শেহনাজ সরকার পুষ্পকে বললেন—
– “পুষ্প, যা তো, ইভানকে গেস্ট রুমের ওয়াশরুমটা দেখিয়ে দে।”
পুষ্পও বাধ্য মেয়ের মতো ইভানকে নিয়ে যেতে লাগল। ইভান তো মহা খুশি! সে ভাবতেই পারেনি পুষ্পকে সরকার বাড়িতে দেখবে। আর্য তো বলেছিল পুষ্প চলে গেছে, তবে এই মুহূর্তে এত কিছু সে ভাবল না। খুশি মনে পুষ্পর সাথে যেতে লাগল। তাদের পেছনে পেছনে যেতে লাগলেন মিনারা বেগম আর নিশি। শেহনাজ সরকার কাজের মেয়েকে গিয়ে পোড়া পায়ে ওষুধ লাগিয়ে নিতে বলে অন্য আরেকজনকে দিয়ে আবার নাশতা পাঠাতে বললেন এবং মেঝে পরিষ্কার করতে বললেন। কাজের মেয়েটা মাথা নেড়ে চলে যায়, ইভানের মা-বাবা শেহনাজ সরকারের সাথে টুকটাক কথা সারতে থাকেন।
পুষ্প আর ইভান পাশাপাশি করিডোর দিয়ে হাঁটছে। এমন সময় হঠাৎ মিনারা বেগম হেঁটে যাওয়ার সময় পড়ে যাওয়ার মতো করে পুষ্পকে ধাক্কা দেয়। পুষ্প পড়ে যেতে নিলে ইভান পুষ্পর কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে সামলে নেয়। পুষ্প ভয়ে ইভানের শার্টের কলার খামচে ধরে এবং চোখ দুটো খিঁচে বন্ধ করে নেয়। এদিকে দূর থেকে নিশি ঝটপট এভাবেই কিছু ছবি তুলে নিল। মিনারা বেগম এবার অসহায় সেজে বলল—
– “মাফ করিস মেয়ে, দেখতে পাইনি আমি। গরম চা আমার পায়েও কিছুটা পড়েছে, জ্বলছে খুব। তাই হাঁটতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছিলাম।”
মিনারা বেগমের কথা শুনে পুষ্প চোখ খুলে ইভানের এত কাছে নিজেকে আবিষ্কার করে তড়িঘড়ি করে সরে যায়। মিনারা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল—
– “সমস্যা নেই দাদি, তোমার কি বেশি জ্বলছে?”
মিনারা বেগম কিছু বললেন না, সেখানে নিশি এসে মিনারা বেগমকে নিয়ে যায়। আর পুষ্প ইভানকে গেস্ট রুম দেখিয়ে দিয়ে নিচে চলে আসে।
এদিকে মিনারা বেগম আর নিশি তাদের জন্য বরাদ্দকৃত গেস্ট রুমে ঢুকে পুষ্প আর ইভানের তোলা ছবিগুলো আর্যর কাছে পাঠিয়ে দিল।
পুষ্প নিচে নেমে আসতেই শেহনাজ সরকার তাকে নিজের পাশে বসালেন। পুষ্পকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার আগেই কাজের মেয়ে নাশতা নিয়ে এল। শেহনাজ সরকার তাদের দিকে চায়ের কাপ এগিয়ে দিতে লাগলেন, আর ইভানের মা পুষ্পকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন। এতে পুষ্প কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল, তবে কিছুই বলল না।
শেহনাজ সরকার এবার ইভানের বাবা-মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন—
– “ভাবী, আপনি যেন কী বলবেন বলছিলেন?”
শেহনাজ সরকারের কথায় ইভানের মা মুচকি হেসে বললেন—
– “হ্যাঁ ভাবী, তা তো অবশ্যই বলব!”
তিনি এবার এক পলক পুষ্পর দিকে তাকিয়ে আবার শেহনাজ সরকারের দিকে তাকালেন। বিষয়টি খেয়াল করে শেহনাজ সরকার এবার পুষ্পকে বললেন—
– “পুষ্প মা, আর্যর আলমারিতে একটা বাম রাখা আছে, সেটা একটু নিয়ে আয় তো, যা!”
পুষ্প কোনো প্রশ্ন ছাড়াই উঠে চলে গেল। পুষ্প যেতেই ইভানের মা গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন—
– “দেখুন ভাবী, আমি ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কিছু বলতে চাই না। আপনার ভাইয়ের মেয়েকে আমাদের ইভান পছন্দ করে। সত্যি বলতে, সামনে থেকে দেখে আমারও খুব পছন্দ হয়েছে। আমি আমার ইভানের জন্য আপনার ভাইয়ের মেয়ের হাত চাইতে এসেছি!”
ইভানের মায়ের কথা শুনে অবাক হলেন শেহনাজ সরকার, তবে তিনি তা প্রকাশ করলেন না। তিনি মুখের আদল শান্ত রেখেই গভীর ভাবনায় পড়লেন। ওনার বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে তারা পুষ্পর কথাই বলছেন, কারণ ইভানের সাথে তিনি পুষ্পকে ভাইয়ের মেয়ে হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তবে এখন বিষয়টি বেশ অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে—যতই হোক পুষ্প ওনার ছেলের বউ, আর শাশুড়ির কাছে ছেলের বউয়ের হাত চাইছেন! যদিও তারা না জেনেই চাইছেন, তবুও অস্বস্তিকর। শেহনাজ সরকার যেই না কিছু বলবেন, অমনি পেছন থেকে বিকট শব্দে সবাই পেছন ফিরে তাকাল। আর্য দাঁড়িয়ে আছে, পাশে কাচের ফুলের টব ভেঙে পড়ে আছে। চোখ দুটো টকটকে লাল, কপালের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে—দেখে বোঝা যাচ্ছে কোনো কারণে সে বেশ রেগে আছে।
শেহনাজ সরকার ছেলের অভিব্যক্তি দেখে বুঝতে পারলেন ইভানের মায়ের সব কথাই তাঁর ছেলে শুনেছে। তিনি দেখতে চাইলেন ছেলে কী বলে। তবে আর্যকে কিছু না বলতে দেখে গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন—
– “আর্য, তুমি কখন এলে?”
আর্য কোনো জবাব দিল না। একবার তীক্ষ্ণ চিল-নজরে পুরো ড্রয়িং রুমে চোখ বুলিয়ে নিল। সে এবার নিজের রাগ সামলে গটগট পায়ে ওপরে চলে গেল। সেদিকে তাকিয়ে শেহনাজ সরকার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওনার ঘাড়ত্যাড়া ছেলে কিছুই স্বীকার করছে না! পুষ্প তার বউ, ওনি বেশ আশাহত— সত্যি সত্যি কি আর্য পুষ্পকে কোনোদিন মেনে নেবে না? আর কতদিন সময় লাগবে আর্যর পুষ্পকে মেনে নিতে? আদৌ কি মেনে নিতে পারবে?
আর্য রাগে চোয়াল শক্ত করে করিডোর দিয়ে হেঁটে নিজের রুমের দিকে যাচ্ছে। এমন সময় গেস্ট রুম থেকে ইভান বেরিয়ে আসে। আর্যকে দেখে ইভান এগিয়ে এসে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল—
– “কিরে আর্য, কী অবস্থা তোর? আজকাল তো তোর দেখা পাওয়া মুশকিল!”
আর্যর এমনিতেই রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে, ইভানকে দেখে রাগ যেন থরথরিয়ে বাড়ছে। চোখের সামনে ভেসে উঠছে ফোনে আসা আননোন নাম্বার থেকে পাওয়া ছবিগুলো—ইভানের হাত তার ফ্লাওয়ারের কোমরে! আর্য আর কিছু না ভেবেই ইভানের মুখ বরাবর মারল এক ঘুষি। মুহূর্তেই কী হয়ে গেল, কিছু বুঝতে পারল না ইভান। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আর্য ধুম করে আরেক ঘুষি মেরে দিল। সাথে সাথে ইভানের নাক ফেটে, ঠোঁট কেটে রক্ত বেরোতে লাগল। আর্য আবার মারতে গেলে ইভান এবার আর্যর হাত ধরে ফেলল। তবে পাল্টা আক্রমণ করল না, সে শান্তভাবেই জিজ্ঞেস করল—
– “কেন মারছিস? কারণটা বল, তারপর আবার মারিস। কোন দোষে মারছিস কারণটা জানলে ব্যথা কম পেতাম, এমনিতে বিনা দোষে আমি এত মার খেতে পারব না।”
আর্য ঝটকা মেরে ইভানের হাত থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিয়ে ইভানের কলার চেপে ধরলো। দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠল—
– “আমি তোকে বলেছিলাম না বাড়িতে না আসতে? কেন এসেছিস? আর এসেছিস যখন, আমার ফ্লাওয়ারকে কোন সাহসে টাচ করেছিস? বল!”
আর্যর কথার কিছুই বুঝতে পারল না ইভান। সে আবার কোন ফুলকে হাত লাগাল?
– “আর্য, কী বলছিস? মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর? আমি কোনো ‘ফুল’কে ছুঁইনি, শুধু শুধু বিনা দোষে মারছিস!”
আর্য ইভানকে যেই না আবারো মারতে যাবে, অমনি পেছন থেকে ভেসে এল শেহনাজ সরকারের গম্ভীর কণ্ঠস্বর—
– “কী হচ্ছে এখানে?”
আর্য কিছু বলল না। তার মাথায় আগুন জ্বলছে। এই মুহূর্তে সে একবার ইভানের দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল। এদিকে শেহনাজ সরকার ইভানের নাক-ঠোঁট থেকে রক্ত বের হতে দেখে বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, আর্য ইভানের গায়ে হাত তুলেছে। ওনার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। আর্য যে নিচে কিছু না বলে নিজের রাগ ইভানের ওপর ঝেড়েছে, তা বুঝতে সময় লাগল না। তিনি ইভানকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না, তাকে নিয়ে নিজের রুমে গেলেন ওষুধ লাগিয়ে দিতে।
এদিকে নিশি সবকিছু দেখে পৈশাচিক আনন্দে মেতে উঠল। এবার ওই পুষ্পর পালা! আর্য রেগে গেলে তার হুঁশ থাকে না। আর্য এখন বেশ রেগে আছে, তার পাঠানো ছবিগুলো নিশ্চয়ই দেখেছে। আর যে ব্যক্তি নিজের ছোঁয়া—এমনকি টিস্যু পর্যন্ত কাউকে ছুঁতে দেয় না, সে নিজের বউকে আরেকজনের বুকে দেখে রিঅ্যাকশনটা যে এরকমই হবে, সেটা নিশির ধারণাতেই ছিল। এখন দেখা যাক তার ধারণা মতো সবকিছু হয় কি না!
পুষ্প আলমারিতে বামের কৌটা খুঁজতে খুঁজতে হঠাৎ তার হাত লেগে একটা ডায়েরি পড়ে গেল। পুষ্প কিছু না ভেবে ডায়েরিটা হাতে নিতেই আর্য রেগে রুমে প্রবেশ করে। নিজের বন্ধুর ডায়েরি পুষ্পর হাতে দেখে মুহূর্তেই আর্যর মনে পড়ল অতীতের সেই ক্ষত এই বেইমান নারীর জন্য তার বন্ধুর আহাযারি আর এখন পুষ্প ও ইভানের দৃশ্য—সব মনে পড়তেই আর্যর আবারো মনে হলো সব নারী এক মুহুর্তেই রাগ যেন সব একসাথে ফেটে পড়ল। এগিয়ে গিয়ে এক ঝটকায় পুষ্পর হাত থেকে ডায়েরিটা কেড়ে নিল সে। পুষ্প কিছু বুঝে ওঠার আগেই—
ঠাসস!
পুষ্পর নরম গালে আছড়ে পড়ল আর্যর পুরুষালি শক্ত হাতের চড়। আর্যর চড়ের তীব্রতায় পুষ্পর মুখ অন্যদিকে ঘুরে গেল!
আর্যর শক্ত হাতের চড় গালে পড়তেই ব্যথায় টনটন করে উঠল। পাঁচ আঙুলের ছাপ বসে গালটা লাল হয়ে গেছে, চোখ ফেটে উপচে পড়ছে অবাধ্য অশ্রুকণা। পুষ্প বুঝতে পারছে না তার কোন অপরাধে এই চড় পড়ল গালে! মুহূর্তেই সে মনে মনে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল—তার গায়ে মার পড়ার জন্য কি কোনো দোষের প্রয়োজন পড়ে? নাকি শুরু থেকেই তার গায়ে মার পড়েছে বিনাদোষে? চাচির হোক বা চাচাতো বোনের, কিংবা সরকার সাহেবের—এই কয়দিনের ভালো ব্যবহারে সে হয়তো ভুলে বসে ছিল আগের সেই আর্যকে। পুষ্পর ভাবনার মাঝেই আর্য পুষ্পর চোয়াল চেপে ধরে হুংকার ছাড়ল—
– “এই মেয়ে, কোন সাহসে তুমি আলমারিতে হাত দিয়েছ? বলেছিলাম না আলমারিতে হাত না দিতে! বলো, বলেছিলাম না?”
পুষ্প কিছু বলল না। হ্যাঁ, আর্য বলেছিল। বিয়ের দশ দিনের মাথায় শেহনাজ সরকারের কথায় যখন পুষ্প নিজের কাপড় আলমারিতে রেখেছিল, সেদিনই প্রথম আর্য চড় মেরেছিল তাকে। সে কীভাবে এত সহজে ভুলে গেল! পুষ্পকে কিছু বলতে না দেখে আর্য এবার হাতের চাপ আরো বাড়াল। আবার দাঁতে দাঁত চেপে বলল—
– “এই, আমার কথা কানে যায় না? কথার উত্তর দিচ্ছিস না কেন? নাকি আমাকে চোখে পড়ছে না? ইভানকে পছন্দ হয়েছে? এই স্টুপিড, বলছিস না কেন ইভানকে পছন্দ হয়েছে?”
এত কিছু বলার পরেও পুষ্পকে চুপ করে থাকতে দেখে আর্য রাগে ও হতাশায় তাচ্ছিল্য করে বলল—
– “তুইও অন্য সব মেয়েদের মতো? তোকে সবার থেকে আলাদা ভেবেছিলাম। নারীদের প্রতি তীব্র ঘৃণাকে একপাশে রেখে তোকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম, কিন্তু তোরও একটা ছেলেকে দিয়ে হয় না! তুইও অন্য মেয়েদের মতো। যেই না বুঝলি আমি তোর প্রতি দুর্বল হচ্ছি, অমনি আরেক ছেলের বুকে চলে গেলি!”
বলতে বলতে শেষের কথাগুলোর দিকে আর্যর গলা ধরে এল। ভীষণ দুর্বল ও অসহায় শোনাল তার কণ্ঠ। সে ভুল করেছে এই মেয়ের প্রতি দুর্বল হয়ে; এই মেয়েও ওই বেইমান নারীর মতো—যেভাবে তার বন্ধুকে ছেড়েছিল, তাকেও ছেড়ে দেবে! মুহূর্তেই আর্যর চোখ আবারো হিংস্র হয়ে উঠল। নাহ, সে তার বন্ধুর মতো বোকামি করবে না। সে এই মেয়েকে নিজের কাছেই রাখবে, যে কোনো মূল্যে। এই মেয়ে থাকতে না চাইলেও জোর করে রাখবে, আটকে রাখবে—তবুও তার সাথেই রাখবে! লাল টকটকে চোখগুলো পুষ্পর দিকে তাক করে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল—
– “কী ভেবেছিস, এত সহজে ছেড়ে দেব? কোনো দিন না! তুই বেইমানি করবি, সেই বেইমানির শাস্তি পাবি!”
আর্যর এত কথা শুনেও পুষ্প একদম নিশ্চুপ, বাকরুদ্ধ। অনুভূতিহীন, নিস্তেজ চোখে তাকিয়ে আছে সে। তার কানে বাজছে একটা কথা—‘তোরও একটা ছেলেকে দিয়ে হয় না’। আর্য তার চরিত্রে আঙুল তুলছে! হ্যাঁ, সে ছোট হতে পারে, কিন্তু এটা বুঝতে তার অসুবিধা হলো না যে আর্য তার চরিত্রের ওপর কালিমা লেপন করছে। সে এতদিন অপমান, অবহেলা, গায়ে হাত তোলা—সব সহ্য করেছে এই আশায় যে, কোনোদিন আর্য এই সম্পর্ক মেনে নেবে। কারণ তার জানা মতে বিয়ে একবারই হয়, সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্বামী। কিন্তু যেখানে শুরু থেকেই সে সহ্য করেছে সবকিছু, আর কত সহ্য করবে? এর থেকে তার চাচার বাড়িতে থাকা ভালো ছিল; অন্তত কেউ তার চরিত্রের দিকে আঙুল তোলে না। সে তো কোনো ছেলের দিকে ফিরেও তাকায়নি কোনোদিন, তাহলে কেন আজ তার চরিত্রের দিকে আঙুল তুলছে?
অবেলায় ফোঁটা পুষ্প পর্ব ২৬ (২)
পুষ্পকে এরকম নিশ্চুপ থাকতে দেখে আর্য এবার রাগে পুষ্পর চোয়াল এক ঝটকায় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। পুষ্প পেছাতে গিয়ে আলমারির দরজার হাতলে বাড়ি খায়। মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে ক্ষীণ ব্যথার আর্তনাদ। ঠিক সেই মুহূর্তে পুষ্পর কানে এল শেহনাজ সরকারের বজ্রকণ্ঠ—
– “আর্য, তোমার সাহস কী করে হলো পুষ্পর গায়ে হাত দেওয়ার!”
