Home আমি অভিশাপ পৃথ্বীর আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭৯

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭৯

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭৯
ইসরাত জাহান দ্যুতি

প্রথমবার আকাশপথের জার্নিটা একসঙ্গে দুজনের। যেটা হওয়া উচিত ছিল ভীষণ রোমাঞ্চকর। মধুচন্দ্রিমা কিনা! অথচ একটা রাতের ব্যবধানে সব আনন্দ হয়ে গেল ম্লান। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাওসিফ ক্লান্ত, শ্রান্ত, ঘুমন্ত কিরণের মুখটা থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলো। পাশ ফিরে তাকাল নাওফিল আর দীধিতিকে দেখার উদ্দেশ্যে। একবার মনে হলো দুজনেই ঘুমিয়ে। কিন্তু নাওফিলের মৃদু নড়াচড়া টের পাওয়া যাচ্ছে। তবে দীধিতি যেন ঘুমাচ্ছে খুব নিশ্চিন্তে। আশ্চর্য এক মেয়ে হয়ে উঠছে ও দিনদিন। গতরাতের পর সব থেকে বেশি ভেঙে পড়ার কথা ছিল তো ওরই। সেখানে কিরণ হাপুসনয়নে কেঁদে অস্থির হলো আর ওকে দেখা গেল পুরোপুরি নির্লিপ্ত। চারটা বছরে ওর নার্ভ যেন ইস্পাতের মতো কঠিন হয়ে গেছে। নাওফিলের বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত আসলেই বৃথা যায়নি।

একদম পেছন সারিতে ইয়াসিফ আর মাভিশা। ওদের দুজনকে পেছন মুড়ে দেখার আর ইচ্ছা হলো না তাওসিফের। কেননা না দেখেও সে বলে দিতে পারবে, তার জমজ ভাইয়ের মানসিক অবস্থা এই মুহূর্তে কেমন। মারিহামের কাছে পৌঁছতে আরও তিনদিন দেরি হবে৷ এই তিনদিনে ইয়াসিফ কতটা ছটফটাবে, তা যেন দিব্যদৃষ্টি দিয়ে দেখতে পাচ্ছে সে। এই যেমন এখনই দেখতে পাচ্ছে, মাভিশা বেঘোরে ঘুমাচ্ছে আর তার ভাই একের পর এক পরিকল্পনা করে চলেছে মোকাবেলাটা কেমন হবে মারিহামের সঙ্গে।
আর তার নিজের অবস্থাটা যে কী, তা সে বুঝতেই পারছে না। ছোট্ট বউটাকে মানসিক শক্তি যোগাতে গিয়ে সে নিজেই কেমন স্তব্ধ হয়ে পড়েছে। সোহাইল শেখের সঙ্গে গতরাতে হওয়া ওদের দু ভাইয়ের আলোচনাটা মনে পড়লেই লোকটার মাথা থেঁতলে ফেলতে মন চাচ্ছে তার।

মাহতাব সাহেব পার্টির শেষ অবধি থাকেননি গতকাল৷ বিশেষ বিশেষ ব্যক্তিবর্গ বিদায় গ্রহণ করলে তিনি নাওফিলকে নিয়ে পার্কিংলটে এসে দাঁড়ান৷ একেবারেই ফাঁকা চারপাশ। তিনিও ফিরে যাবেন বাসায়। ইশারায় হঠাৎ নাওফিলকে গাড়িতে বসতে বলে ড্রাইভার আর দেহরক্ষীদের দূরে গিয়ে দাঁড়াতে বলেন।
দাদাকে ভেতরে বসতে সহযোগিতা করে নাওফিল এসে বসল তার পাশে। দরজাটা আটকে দিতেই তিনি স্বভাবসুলভ গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, ‘সিদ্ধান্তটা কি চূড়ান্ত তোমার?’ পাথর দৃষ্টি তখন সম্মুখে তার। নাওফিল নির্বিকার। প্রসঙ্গটা বুঝেও ভান ধরল, ‘কী ব্যাপারে, দাদা?’
-‘স্মরণের ব্যাপারে।’
-‘ওহ’, খানিকটা থেমে জবাব দিলো নাওফিল, ‘সে তো বিয়ের সিদ্ধান্ত নেবার পর থেকেই চূড়ান্ত ছিল।’
-‘আমি বোধহয় প্রত্যাশাটা বেশি করে ফেলেছিলাম তোমার থেকে।’ হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে সিটে মাথা এলিয়ে দিলেন তিনি।

‘তুমি’ সম্বোধন অব্যাহত থাকায় নাওফিল বুঝল, রাগ নয়। দাদার কণ্ঠে কষ্ট আর অভিমান। ভণিতা এড়িয়ে তাই নতশিরে বলল সে নরম গলায়, ‘আমি আপনার প্রত্যাশা পূরণের যোগ্য ছিলাম না, দাদা। এটা আমার ব্যর্থতা। গত চার বছরে আমি প্রতিদিনই চেষ্টা করে গিয়েছি। কিন্তু আমার মনের ওপর জটিল চাপ সৃষ্টি হত। নিজের সঙ্গে নিজের লড়াইটা খুব নিষ্ঠুর ব্যাপার। আমি তা বোঝাতে পারিনি আপনাকে।’
-‘তুমি ব্যর্থ হওনি। আমি যা দেখতে চেয়েছি তোমার মধ্যে, তা তুমি দেখিয়েছ করে। ভেবো না আমি এখন আফসোস করছি তার জন্য। অর্থ আর ক্ষমতা তুমি নিজের বুদ্ধিকৌশল দিয়ে আদায় করে নিয়েছ। তার জন্য আমি সারাজীবনই গর্বিত অনুভব করব। এই স্থানে এক সময় জায়িনকে দেখতে চাইতাম। তা তুমি অর্জন করে নিয়েছ বলে আমি সন্তুষ্ট।’
-‘আপনি আমাকে গাইড না করলে আমার পক্ষে এতদূর পৌঁছনো সম্ভব হত না, দাদা।’ একটু অস্বস্তির সঙ্গেই জবাব রাখল নাওফিল। সাধারণত এভাবে সরাসরি দাদার কাছে প্রশংসাবাণী পেয়ে অভ্যস্ত না। আজই প্রথম ঘটল এটা, যে মাহতাব সাহেব নির্দ্বিধায় প্রিয় নাতির স্তুতি গাইছেন।

-‘তাহলে স্মরণের ব্যাপারে আমার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করতে পারলে না কেন?’
-‘মনের ওপর জোরজবরি করা সম্ভব হয়নি। আমি জানি, আপনার বনেদি পরিবারের নৈতিক শিক্ষা কিংবা আপনার নৈতিকতায় স্মরণকে মেনে নেওয়া কঠিন। ওর জন্মগ্রহণের গল্পটা হয়ত সমাজের সবার কাছেই নাক সিটকানোর মতো। কিন্তু আমার জন্মের ইতিহাসটাও শোনালে খুব একটা শ্রুতিমধুর লাগবে না কারও, দাদা। পার্থক্য শুধু এখানেই যে, কাগজে আব্বু আম্মুর সম্পর্কটা বৈধ ছিল।’ শেষ কথাটুকু বলেই নাওফিল চোখদুটো বুজে ফেলল দুরূহ কষ্ট আর লজ্জায়। দাদার কাছে নিজের বাবা মায়ের সম্পর্কটার দিকেও আজ এভাবে আঙুল তুলতে হলো! এর চেয়ে যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতি আর কী হতে পারে? আর এছাড়া কী করেই বা নিজের বউয়ের জন্য প্রতিবাদ জানানো যেত, যে প্রতিবাদ পাশের কঠিন ধাতুর মানুষটিকে স্তম্ভিত করে দিতে পারে!
সত্যিই বিমূঢ় হয়ে পড়লেন মাহতাব সাহেব। সাইকোপ্যাথ ছেলেবউয়ের সঙ্গে তার ছেলের বৈবাহিক সম্পর্কটা কেমন ছিল তা তিনি ভালোই জানেন। কিন্তু তবুও নাওফিলের বৈধতা বা অবৈধতা নিয়ে তো আর কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবে না। আর আয়মান মানুষ হিসেবে যেমনই হোক, সে মুসলিম এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান ছিল। সেখানে দীধিতির শরীরে ভিন্নধর্মী বাবার রক্ত। সেই পুরুষের পাপের ফসল ও। এ তিনি ইহজনমেও ভুলতে পারবেন না। সম্ভব নয় কোনোদিনই। কিন্তু তাতে তার নাতির কি কিছু এসে যায়? নাহ! বরং তার নাতিই ব্যাকুল ওই মেয়েটির জন্য৷ কম চেষ্টা তো করলেন না ফেরানোর। এবার পরাজয়ই স্বীকার করে নেবেন। জীবনের শেষ ধাপে চলে এসেছেন৷ ছেলে, নাতি নিয়ে মানসিক বা শারীরিক যুদ্ধ করার ইচ্ছা বা মনোবলটুকু আর কোনোটাই নেই তার। জায়িনকে ফেরাতে পারেননি, নাওফিলকেও পারলেন না৷ এ ব্যর্থতা নিয়েই মরবেন না হয়।

-‘অলরাইট। বড়ো হয়েছ। বিচক্ষণতাও এসেছে। সারাজীবনের ভালো-মন্দের বিচার করার বুদ্ধিও হয়েছে। ভালো থাকো, আমার এটাই চাওয়া। তবে এবার একটা আলাদা ব্যাপারে আমার শেষ সিদ্ধান্ত জানাচ্ছি, জাদ। সেটা খারাপ লাগলেও বিবেক দিয়ে বিচার করার চেষ্টা করবে আশা করছি।’
-‘নিশ্চয়ই, দাদা। কেবল স্মরণের বিষয়টা না হলে আমার কোনো আপত্তি নেই।’
-‘মিহাদ আর নিহাদের সঙ্গে ঝুট-ঝামেলা মিটিয়ে নিয়ো নিজ উদ্যোগে। একটা সময় ওদের দু ভাইয়ের অবাধ্যতার জন্য প্রচণ্ড কঠোর হয়েছি। শাস্তিও ছোটোখাটো দিইনি। কিন্তু ওদেরকেও আমি তোমার থেকে কোনো অংশে কম দেখি না। প্রপার্টির যে উইল করেছিলাম, সেটা আমি পরিবর্তন করেছি৷ তোমার সিগনেচারের দরকার হবে তাতে৷’

নাওফিল আড়ালে মুচকি হাসল৷ সে তো জানতই, এ সময়টা আসবেই। রাগের বশে আদরের আরও দুই নাতির সঙ্গে মাহতাব শেখ অন্যায় করেছিলেন ঠিকই। কিন্তু তা যে তাকে এক দণ্ডও শান্তি দেয়নি, তা নাওফিল দাদীর কাছে গিয়ে বসলেই শুনতে পেতো৷ বুড়িটা গুনগুনিয়ে কাঁদতেন আর বলতেন, দাদা রাতে ঘুমাতে গিয়ে রোজ তাওসিফ আর ইয়াসিফের সঙ্গে হওয়া দূরত্ব নিয়ে কষ্ট প্রকাশ করেন। তবে এ কথা নাওফিল ওদের দু ভাইকে জানায়নি কখনো। দাদার কাছ থেকেই সারপ্রাইজটা পাক ওরা৷ সেদিনটার অপেক্ষা এবার।
বিদায় জানিয়ে নাওফিল যখন কটেজে ফিরল তখন বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে দীধিতির কাছে পৌঁছনো সম্ভব হলো না। কর্মব্যস্ততায় বন্ধুদের সঙ্গেও বহুদিন আড্ডা দেওয়া হয় না৷ নিরিবিলিতে বসে ও যখন আড্ডায় মগ্ন হলো, তখন সোহাইল শেখ ঝুমুরের চোখ ফাঁকি দিয়ে বহুদিন বাদে গলা অবধি মদ ঢেলে টালমাটাল অবস্থা। সঙ্গে ছিল ইয়াসিফ। নিজের মনের অশান্তি দূর করতে আকণ্ঠ মদ গিলছিল সে। সে সময়ই সোহাইল সাহেব এসে যোগ দেন ওর সঙ্গে৷ নিজের ভাবনায় মত্ত থাকায় খেয়ালই করতে পারেননি তাকে। ঝুমুর নিজের বাবার বাড়ির মানুষগুলোকে নিয়ে ব্যস্ত। দীধিতি আর কিরণও সেখানেই৷ এ সুযোগেই তাওসিফ আসে ইয়াসিফের কাছে। এসে সোহাইল সাহেবের পরিণতি দেখে চোখ কপালে তুলতেই তিনি মুচকি হাসতে হাসতে তাওসিফকে হাতছানি দেন৷

-‘কী কাম সেরেছেন, কাকু? আপনার শ্বশুরবাড়ির মানুষের চোখে পড়লে কী ভাববে বলুন তো! মেয়ের বিয়েতে বাপ ফূর্তির চোটে মাতাল হয়ে পড়েছে।’
-‘দরজাটা আটকে দে তো, বাপ। আজই শেষ। আর কি এ সুযোগ পাবো, বল? জানতে দিস না কাউকে।’
-‘এই, কানা’, ইয়াসিফকে মৃদু বেগে লাথি দিলো তাওসিফ, ‘তুই থামাতে পারিসনি কাকুকে?’
-‘আরে আমি কি খেয়াল করেছি?’ বলে ইয়াসিফ সোহাইল সাহেবের সামনে থেকে বোতল আর গ্লাস সরিয়ে নিতে উদ্যত হলো৷ মুহূর্তেই আহাজারি করে উঠলেন তিনি, ‘বাপ রে, আজকে একটু খেতে দে। কসম, আর খাবো না। খাবো কী, খাওয়ার সুযোগই তো পাবো না। শালার বউ দূরে ছিল, তখনই ভালো ছিল৷ ঘরে আসতেই আমার কপাল পুড়ল।’

-‘নারী প্রেমিকা হিসেবেই বেশি ভালো, তাই না কাকু?’ হাসতে হাসতে তাওসিফ টিটকারি করল।
-‘কী জানি!’ ইয়াসিফের হাত থেকে কাড়াকাড়ি করে বোতল, গ্লাস নিয়ে নিলেন সোহাইল৷ গ্লাসে মদ ঢালতে ঢালতে বললেন, ‘প্রেম করার সুযোগ কি দিয়েছিলাম? প্রথম চান্সেই তো বিয়ের পিড়িতে বসিয়ে দিলাম। ভুল করেছিরে। দরকার ছিল পাঁচটা বছর প্রেম করার। তাহলে প্রেমিকা আর বউয়ের পার্থক্যটা বোঝা যেত৷’
কথা পরিষ্কার বলতে পারলেও কণ্ঠ জড়িয়ে গেছে সোহাইল সাহেবের। পুরোদস্তুর মাতাল তিনি৷ তাই তাওসিফ তেমন গুরুত্ব না দিলেও ইয়াসিফ ভুরু কুঁচকে ফেলল। সোহাইল সাহেবের মুখপানে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে কৌতুক সুরে জিজ্ঞেস করল, ‘তাহলে কাকু প্রেম করার সুযোগ দেননি আন্টিকে? এক চান্সেই বিয়ে করে নিয়েছিলেন?’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৭৮

-‘তবে আর কী? একে তো তোর চাচির ছিল প্রচুর দেমাক। যখন পটে গেল তখন আবার দেখি ঘাড়ত্যাড়া। মেজাজ ঠিক রাখায় তো মুশকিল হত আমার। তার ভেতরে উটকো ঝামেলা জুটল ওর হাসপাতালের এক সার্জন। ওকে বিয়ে করার জন্য রাতদিন বিরক্ত করতে আরম্ভ করল হারামিটা। আমি তখন ঢাকায় তোর দাদা আর জাকির ভাইয়ের সঙ্গে নির্বাচনের কাজে ব্যস্ত। বিরোধী দলের সঙ্গে চলছিল তখন ভয়াবহ হাঙ্গামা। তার মধ্যে এই খবর কানে আসতেই এমন গরম হলো মাথা! এক রাতের জন্য যশোর ফিরলাম সেদিনই। তোদের চাচির রাতে ছিল দু্টো অপারেশন৷ চেম্বার থেকে ক্লিনিকে যাবার পথে গাড়িতে উঠিয়ে নিলাম জোর করেই। কোনো কথা শুনলাম না। এক ধমকে ডিরেক্ট বাড়ি নিয়ে গিয়ে তুললাম ওকে। ওই সময়েই কাজী ডেকেডুকে কবুল পড়িয়ে নিলাম।’

আমি অভিশাপ পৃথ্বীর পর্ব ৮০

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here