Home ডাকপ্রিয়র চিঠি ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩৬

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩৬

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩৬
রিক্তা ইসলাম মায়া

রাতের শেষ প্রহর। ভোর ৩:৪৫ মিনিট। সৈয়দ বাড়িতে হুলুস্থুল আয়োজন সবার মাঝে। সালাম, শান্তা, মুনিয়া, ফাতিমা হুলুস্থুল করে বাড়ির বাচ্চাদের ডাকাডাকি করছে গাড়িতে গিয়ে বসতে। সালমা, শান্তা রান্নাঘরে টিফিন বক্সে খাবার গোছাচ্ছে। কাজের মেয়ে রেণু, রোজিনাকে দিয়ে খাবারের বক্সগুলো দ্রুত দ্রুত গাড়িতে উঠাচ্ছে। মুনিয়া নিজের যমজ সন্তানদের রেডি করিয়ে নিচে নেমে আসলো। রাদ, রাতুল লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়িবেয়ে নিচে নামে। মারিদের শ্বশুরবাড়িতে যাবে সবাই, সেই আনন্দ রাদ, রাতুলের মাঝে স্পষ্ট। সৈয়দ শাহ এতদূর মারিদের শ্বশুরবাড়িতে যাবেন না, উনার লং জার্নি করা ডাক্তারের নিষেধ। মাহবুব, মকবুল, খালেদ গ্যারেজ থেকে গাড়িগুলো বের করছে। তক্ষুনি গেট দিয়ে ঢুকে রাদিলের সাদা গাড়িটা। মারিদের শ্বশুরবাড়িতে রাদিল, হীরা চৌধুরীও যাবে।

মা ছেলে দুজনকে ইতিমধ্যে শতাধিক ফোন করে ফেলেছে সালমা সৈয়দ। মাহবুব আলম রাদিলকে বারবার কল করে তাড়া দিচ্ছিল আসতে। রাদিল রাতের ডিউটি শেষ করে দ্রুত বাসায় ফিরে গোসল করে সবেমাত্র মাকে নিয়ে সৈয়দ বাড়িতে এসেছে। রাদিলের চোখেমুখে ঘুম। থানচিতে দুদিন থাকতে হবে বলে সকলেই নিজেদের কাপড়ের ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছে। রাদিল বাকি সব গাড়ির সঙ্গে নিজের গাড়ি পার্কিং করে, গাড়ি থেকে নেমে মামাদের সাথে যোগ হয়। হীরা চৌধুরী মাহবুব, মকবুল, খালেদের সঙ্গে কথা বলে বাড়ির ভিতরে যান সালমা সৈয়দের সঙ্গে দেখা করতে। বাড়ির ভিতরে ঢুকে অবাক। সালমা চিল্লাচিল্লি করে আফিয়া, সুফিয়া, সুখকে ডাকছেন নিচে নামতে। গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার সময় হয়েছে অথচ মেয়েগুলোর এখনো সাজ শেষ হয়নি। মারিদ সাদা প্যান্ট সঙ্গে আকাশী রঙের শার্ট পরেছে। রিফাতও মারিদের মতো করে সাদা প্যান্টের সঙ্গে কালো শার্ট পরেছে।

মারিদ সবাইকে দ্রুত রেডি হতে বলে সে বাইরে যায়। রিফাত আজ রাতে মারিদের ঘরেই থেকেছে। মারিদ রাখতে চায়নি তারপরও জোর করে থেকেছে তার কারণ হলো তনিমা। কাল বৃহস্পতিবার ছিল। কথা মতো সৈয়দ বংশের গোষ্ঠীর সকলে কাল তনিমাকে দেখতে যায়। ছোট থেকে বড় আত্মীয়-স্বজনরা কেউ বাদ যায়নি রিফাতের শ্বশুরবাড়িতে যেতে। শুধু রিফাত, মারিদই যায়নি নয়তো রাদিলকেও সঙ্গে করে নিয়ে গেছেন হীরা চৌধুরী। সবাই দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করে সন্ধ্যার দিকে তনিমার বাবাকে বলে তনিমাকে নিজেদের সঙ্গে করে নিয়ে আসে তারা। কাল মারিদের শ্বশুরবাড়িতে যাবে সবাই। রিফাতের বউ না গেলে কেমন দেখায়? আত্মীয়-স্বজনরা সবাই যাবে তাহলে নতুন বউ কেন বাদ যাবে? নতুন আত্মীয় হিসাবে তনিমার বাবা-মাকেও বলা হয়েছিল উনাদের সঙ্গে মারিদের শ্বশুরবাড়িতে যেতে, কিন্তু উনারা লোকলজ্জায় যেতে না করেন। বলেন, যখন মারিদের বউ আনুষ্ঠানিকভাবে উঠিয়ে আনা হবে তখন না-হয় উনারা যাবেন, কিন্তু এখন না। তবে তনিমা ঐ বাড়ির ছেলের বউ, তাই জাবেদ শেখ তনিমাকে যেতে দিলেন, নিষেধ করেননি। রিফাত মারিদের সঙ্গে মধ্যরাতে সৈয়দ বাড়িতে ফিরেই শুনেছে রিফাতের নতুন বউ নিয়ে এসেছে তারা। যদিও রিফাত তনিমা দুজনের দেখা হয়নি। শান্তা বলেছে গেস্ট রুমে নতুন বউ একা আছে, রিফাত সেখানে গিয়ে ঘুমাতে। অথচ রিফাত মায়ের কথা অবজ্ঞা করে বড় বড় পায়ে সোজা মারিদের রুমে, মারিদের বিছানায় ঘাপটি মেরে শুয়ে পড়ে। তার বাড়ির মানুষ রিফাতের জন্য এত বড় বিপদ ঘরে এনে রেখেছে সে তো জানতোই না।

মারিদ সবার সাথে পার্কিং এরিয়াতে দাঁড়ায়। মাহবুব, মকবুল, খালেদ গাড়িতে মারিদের বউয়ের জন্য কেনা কাপড়চোপড়ের লাগেজ উঠাচ্ছে। রেণু, রোজিনা দৌড়াদৌড়ি করে সবার কাপড়ের ব্যাগ, খাবারের বক্স দিয়ে যাচ্ছে। রাদিল, মারিদ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কথা বলছে। এর মাঝে রিফাত ঢুকে নিজের গায়ের কালো শার্টটা টেনে রাদিলকে দেখাতে দেখাতে বলল….
‘ রাদিল দেখ তো আমাকে সুন্দর লাগছে না? আমার নূরজান আমাকে পছন্দ করবে না?
মারিদ ঠাস করে চেতে যায়। রিফাত নূরজাহানকে সংক্ষেপে নূরজান বলে ডাকছে। রাদিল মারিদকে টেনে ধরে বলে…
‘ আরে ও মজা করছে মারিদ। রাগিস না।
রিফাত মারিদকে আরও ক্ষেপিয়ে বলে…
‘ তওবা তওবা! রাদিল কি-সব বলিস তুই? নাউজুবিল্লাহর কথাবার্তা। আমার নূরজানকে নিয়ে কোনো মজা নয়। বি সিরিয়াস।
মারিদ ক্ষেপে গিয়ে রিফাতের শার্টের কলার চেপে ধরে বলে…

‘ একবার না বলছি তোকে নূরজাহানকে নিয়ে উল্টাপাল্টা কথা বলবি না? কথা কানে যায়না হারামি? আবার নূরজান ডাকলে তোর জবান ছিঁড়ে ফেলব আমি শালা।
‘ হায় হায় মারিদ, কী হয়েছে তোদের মাঝে, মারামারি করছিস কেন?
শান্তা হৈ হৈ করে দ্রুত পায়ে মারিদ, রাদিল, রিফাতের দিকে দৌড়ে আসে। শান্তার চিৎকারে মাহবুব, মকবুল, খালেদ, সালমা, ফাতেমা, মুনিয়া সকলেই দৌড়ে আসে। সবাই মনে করে রিফাত, মারিদ মারামারি করছে। বাড়ির সবাইকে আতঙ্কিত দেখে মারিদ রিফাতের কলার ছেড়ে দেয়। বিরক্তির চোখে সবাইকে দেখে চলে যায়। রিফাত দুষ্টু হাসছে। সে ব্যাপারটা বেশ এনজয় করছে। রাদিল সবাইকে আশ্বস্ত করে বলে…
‘ ওরা মারামারি করছে না ফুফু। আপনারা শান্ত হোন। এমনিই রিফাত দুষ্টামি করছে।
রিফাতের হাসি দেখে সবাই চলে যায়। শান্তা রিফাতকে রেগে বলে….
‘ তোর দুষ্টামি করার সময় আছে অথচ নতুন বউটাকে একবার দেখার সময় নাই? এতবার বলার পরও কাল আমাদের সঙ্গে তোর শ্বশুরবাড়িতে গেলি না কেন? ঐ বাড়ির সবাই জামাই কই জামাই কই বলে তোর কথা জিজ্ঞাসা করছিল। নতুন বউটার মুখটাও তোর জন্য ছোট হয়ে গেল। তুই আর কত জাউরামি করবি? এবার কি একটু দায়িত্বশীল হতে পারিস না?

আফিয়া, সুফিয়া, সুখের সঙ্গে তনিমাও দাঁড়িয়ে ছিল। শান্তা রিফাতকে শাসন করছে সেটা তনিমা অবাক চোখে দেখছে। রিফাত, রাদিল দুজনই তনিমাদের স্যার। ক্যাম্পাসে তাদের গম্ভীর, শান্তশিষ্ট আর শৃঙ্খলার চলাফেরা দেখেছে। কখনো মজা করা কিংবা হাসিঠাট্টার মতো কাউকে দেখেনি। আজ প্রথম রিফাতকে চঞ্চল দেখছে তনিমা। রিফাত বিরক্তি নিয়ে শান্তার কথার উত্তর দেওয়ার আগে পিছনে তনিমাকে নীল কাতান শাড়িতে মাথায় ঘোমটা দিয়ে বউদের মতো করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে চুপ করে যায়। দুজনের চোখাচোখি হয়। বৈদ্যুতিক লাইটের আলোয় তনিমার সুন্দর মুখটা দেখা গেল। শরীরে মোটা মোটা স্বর্ণের গয়নাগাটিতে মুড়িয়ে রেখেছে তনিমাকে। দু হাত ভরতি সোনার চুড়ি, গলায় সীতাহার, নেকলেস, বড় কানের দুল, নাকে নাকফুল। এতসব গয়নাগাটি নিশ্চয়ই রিফাতের মা শান্তা পরিয়েছে তনিমাকে? নতুন বউকে গয়নাগাটি না পরালে সৌন্দর্য বাড়ে না, এটা শান্তার চিন্তাভাবনা। রিফাত তনিমাকে একপলক দেখে সে চুপচাপ চলে যায় মারিদের কাছে। রাদিল সবার সাথে সুখকে দেখে সাদা পাকিস্তানি একটা জামা পরে দাঁড়িয়ে। মুখে হালকা সাজগোজ। চুলগুলো সব পিঠে ছেড়ে দেওয়া। রাদিলের সঙ্গে সুখের চোখাচোখি হতেই সুখ তৎক্ষণাৎ দৃষ্টি সরিয়ে মায়ের পিছনে গিয়ে দাঁড়ায়। সাতটা গাড়ি বের হবে সৈয়দ বাড়ি থেকে। সৈয়দ শাহ আর উনার মেজো ছেলে রবিউল আপাতত থানচিতে যাচ্ছেন না। রবিউল চাইলেও চাকরি থেকে হুটহাট ছুটি কাটাতে পারেন না, সেজন্য উনার সকল দাওয়াতে যাওয়াও হয় না। তিনি সৈয়দ শাহ সঙ্গে বাড়িতে থাকবেন কাজের মানুষদের নিয়ে। রেণু রোজিনা দু’জন সৈয়দ শাহর খেয়াল রাখবে। তবে রবিউল বলে দিয়েছেন সবার সাথে করে যেন মারিদের বউকে নিয়ে আসেন। কয়েকদিন ঢাকা বেড়িয়ে তারপর না-হয় মারিদ আবার দিয়ে আসবে নূরজাহানকে।

হৈচৈ করে সকলে গাড়িতে উঠে বসে। মারিদ, রাদিল, রিফাত যে গাড়িতে যাবে সেই গাড়িতে দুটো সিট খালি আছে। মারিদ সুখকে ডেকে নিজেদের গাড়িতে উঠতে বলে। সালমা, শান্তা সুখের সঙ্গে তনিমাকেও যেতে বলেন। নতুন বউ স্বামীর সঙ্গে গেলে, আনন্দ করতে পারবে। উনারা মুরুব্বি মানুষ। নতুন বউ উনাদের সঙ্গে গেলে লজ্জা কিংবা সংকোচ বোধের জন্য নিজের সুবিধা-অসুবিধার কথা বলতে পারবে না। রিফাত তনিমাকে ছোট করতে চায় না বলে সে চুপচাপ গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ে। গাড়ি সে চালাবে। পিছনে তনিমা থাকায় মারিদ পিছনে বসতে রাজি না। সে রিফাতের সঙ্গে সামনের সিটে বসে পড়ে। বাকি রাদিলের পিছনের সিটে বসতে সমস্যা নেই। সমস্যা হচ্ছে সুখের। সে রাদিলের সঙ্গে পিছনের সিটে বসবে না। তনিমা জানালার পাশে বসেছে। সুখ মাঝে। রাদিল সুখের সঙ্গে বসবে। রাদিল রিফাতের বউয়ের সঙ্গে বসলে বিষয়টা বাজে দেখায় বলে সুখকে মাঝে বসানো হয়। অথচ রাদিল গাড়ির দরজা টেনে খুলতেই সুখ তনিমার পাশের দরজা খোলা তৎক্ষনাৎ তনিমার উপর দিয়েই ডেঙিয়ে বেরিয়ে যায় গাড়ি থেকে। বিষয়টা কী হয়েছে বুঝতেই রাদিল কপাল কুঁচকায় সুখের দিকে তাকিয়ে। মারিদ, রিফাত গাড়ির সামনে বসে সুখকে ধমকাচ্ছে কেন সুখ আবারও গাড়ি থেকে বের হলো। মারিদ ধমকের স্বরে বলে….

‘ আবার গাড়ি থেকে বের হলি কেন?
‘ আমি তোমাদের সঙ্গে যাব না ভাই।
সুখের কাটকাট উত্তর। মারিদ বিরক্তিতে বলে…
‘ কেন? গেলে কি সমস্যা?
‘ আমার পেটে ব্যথা করছে। আমি আম্মুর সাথে যাব।
সুখের মিথ্যা অজুহাত।
মারিদ কিছু বলবে, রিফাত ড্রাইভিং সিট হতে মারিদের উপর দিয়ে জানালায় উঁকি মেরে বলে…
‘ তোর পেটে ব্যথা মামির কাছে গেলে ভালো হবে না, বরং আমাদের কাছে থাকলে ভালো হবে গাঁধি। এই গাড়িতে আমি, রাদিল দুইটা ডাক্তার বসে আছি। তোর পেটে ব্যথা এমনিই ভালো হয়ে যাবে। উঠ গাড়িতে তাড়াতাড়ি। গাড়ি ছাড়তে হবে। আয়।
জেদি সুখ যাবে না মানে সে যাবেই না, যে গাড়িতে রাদিল আছে। সুখ জেদি গলায় চলে যেতে যেতে বলে…

‘ আমি তোমাদের গাড়িতে যাব না রিফাত ভাই। আমি আম্মুর সাথেই যাব।
কথাটা বলে সুখ মাহবুবের গাড়িতে গিয়ে উঠে বসে। বাবার পাশের সিটে বসে জানায় সে বাবার সঙ্গে যাবে। শান্তা সুফিয়াকে পাঠায় সুখের জায়গায় মারিদের গাড়িতে যেতে। সুখের ঐভাবে চলে যাওয়ার ব্যাপারটা সকলেই স্বাভাবিকভাবে নিয়েছে। শুধু রাদিল বাদে। রাদিল বুঝতে পেরেছে সুখ রাদিলের সঙ্গে যেতে চায় না বলেই ঐভাবে গাড়ি থেকে নেমে গিয়েছে। যে সুখ সবসময় রাদিলের আশেপাশে থাকার সুযোগ খুঁজতো, সেই সুখ কি এখন রাদিলকে ইগনোর করছে? কিন্তু কেন? কী কারণে?
সৈয়দ বাড়ি থেকে সাতটা গাড়ি ছাড়া হয় ভোর ৪:১০ মিনিটে। সকলেই গাড়িতে শুয়ে-বসে কথাবার্তা বলছে। রাদ, রাতুল, সুখ কতক্ষণ হৈচৈ করে গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়েছে। সুখ মাহবুবের কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। ঢাকা থেকে থানচিতে পৌঁছাতে মিনিমাম দশ-বারো ঘণ্টা সময় প্রয়োজন। লম্বা জার্নি হওয়ায় সকলেই ঘুমানোর চেষ্টা করছে।

আজ শুক্রবার। সিকদার বাড়িতে বিশাল আয়োজন। নূরজাহানের শ্বশুরবাড়ি থেকে এই প্রথম মানুষজন আসবে। মাজিদ, সাজিদ, আহাদ তিন ভাই আজ বাড়িতে। হাসান আহাদকে আরও দুদিন আগেই ঢাকা থেকে আনিয়ে রেখেছেন। আহাদ নূরজাহানের বিয়ের কথা শুনে ছুটে এসেছে। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। সেজন্য বেশ একটা গ্রামে আসা হয় না ওর। গ্রামে না আসার আরও একটা প্রধান কারণ হচ্ছে গ্রামের পরিবেশ ভালো না। সওদাগর পরিবারের দাপট, মানিক সওদাগরের উত্তাল, গ্রামের মানুষের ওদের নিয়ে গুঞ্জন—সবকিছু আহাদকে বিষিয়ে তোলে, সেজন্য সে ছুটি পেলেও গ্রামে আসতে চায় না। তবে এবার হাসান জরুরি তলবে ডেকে এনেছে ওকে। আহাদ আশনূরের কাছে শুনেছে কীভাবে তাদের মা শাহানা নূরজাহানকে রাতের অন্ধকারে ডাকাতের হাতে তুলে দেয়। নূরজাহানের বদনাম, বিয়ে, নূরজাহানের শশুর বাড়ির মানুষজনের আন্তরিকতা—সবকিছু আহাদকে আশনূরই জানায়। শাহানা-র সঙ্গে আশনূর, হাসান দুজনই কথা বলে না। হাসান শাহানার হাতের কোনো কিছু খায়ও না। হাসানের খাবার বেড়ে দেয় আশনূর, নূরজাহান কিংবা মাজিদের বউ নদী। হাসান শাহানা দুজনকে এক ঘরে থাকতে পর্যন্ত দেখা যায় না। হাসান আয়েশার থাকার ঘরটাতে গিয়ে ঘুমায়। শাহানা এতে আরও ক্ষিপ্ত হয়, কিন্তু প্রকাশ করে না। একবার শাহানা এসবের বিরুদ্ধতা করতে চেয়েছিল কিন্তু কারও কাছে ঠাঁই পায়নি এবাট।

যে তারানূর সবসময় শাহানাকে বড় বউয়ের মর্যাদা দিতে গিয়ে নূরজাহানের উপর অবিচার করতো, তিনিও সেদিনের ঘটনায় শাহানার উপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। শাহানার পক্ষে কথা বলেন না। শাহানার কর্মফলই যেন শাহানাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে নিচ্ছে। সাজিদ কখনোই নূরজাহানের ভালো চেয়ে আজ বাড়িতে উপস্থিত থাকতো না। সাজিদকে হাসান বলেওনি আজ নূরজাহানের শ্বশুরবাড়ি থেকে মানুষ আসবে তুমি বাড়িতে থাকো। সাজিদ নিজের ইচ্ছায় আজ বাড়িতে থাকছে। সে মারিদের পরিবার সম্পর্কে বেশ খোঁজখবর নিয়ে জেনেছে তারা বেশ উচ্চ বংশের লোক। বলতে গেলে শিল্পপতি। সওদাগর বংশের মতো মানুষদের এখনো জেলে ভরে রেখেছে মানে আসলেই তাদের ক্ষমতা বিশাল হবে। সাজিদ মারিদের সঙ্গে আজ আন্তরিকতা বজায় রাখলে সেও ভবিষ্যতে উপকার পাবে মারিদের থেকে। সেই চিন্তায় সাজিদ আজ নিজ থেকেই বাড়িতে থাকছে, নূরজাহানের জন্য না।

আহাদ মিশুক টাইপের ছেলে। চঞ্চল বেশ। হাসানদের থাকার ঘরটা বাদে যে তিনটে ঘর আছে সবগুলো ঘরের বিছানাগুলো কাজের লোক দিয়ে পরিষ্কার করে রেখেছে হাসান। এতগুলো মানুষকে ভালো থাকার জায়গা দিতে হবে। আহাদের মুখে মারিদের পরিবারের টাকা-পয়সা, নামডাক, বড় বংশধর তারা—এসব শুনেছে। হাসান আহাদকে দিয়ে কিছুদিন আগে মারিদের পরিবারের খোঁজ নিয়েছিলেন মনের সংকোচে। মারিদ নিজের ঠিকানা, অফিসের অ্যাড্রেস সবকিছু হাসানকে দিয়ে গিয়েছিল। হাসান সেসব অ্যাড্রেস আহাদকে দিয়ে মারিদের খোঁজ নিয়েছেন। আহাদ মারিদের সম্পর্কে বেশ ভালো ভালো রিপোর্ট দেওয়ায় তিনি বেশ খুশি নূরজাহানের জন্য। অবশেষে উনার নূরজাহান ভালো থাকবে। আল্লাহ উনার নূরজাহানের জীবনে উত্তম কিছু পাঠিয়েছেন এবার। হাসানের মুখে হাসি সরছেই না যেন। বিষয়টা বাড়ির সকলেই খেয়াল করেছে। শাহানা জেদ নিয়ে ঘরে শুয়ে, তিনি নূরজাহানের বিয়ের কোনো কিছুতে শামিল হবেন না। এতে বাড়ির কেউ মাথা ঘামায়নি। শাহানাকে শাহানার মতো করে থাকতে দিয়েছে। আজ আলেহা রান্নাঘরে নূরজাহানের শ্বশুরবাড়ির মানুষদের জন্য রান্নাবান্না করছে। নদী, আশনূর, শেফালী হাতে হাতে কাজ এগিয়ে দিচ্ছে। নূরজাহান মিষ্টি দই ফ্রিজে তুলে রাখছে। সে নিজেও ঘরের কাজ করছে। তারানূর উঠান থেকে ঘরে আসেন। কাঠফাটা রোদে ওঠায় বড্ড তৃষ্ণা পেয়েছে। ভাতঘরে এসে তিনি দেখেন নূরজাহান ফ্রিজে দইয়ের গ্লাস তুলে রাখছে। নূরজাহানকে এখনো কাজ করতে দেখে তিনি ক্ষেপে গিয়ে হাতের লাঠি দিয়ে নূরজাহানের পিঠে বারি দিয়ে বলেন…

‘ এই ছেড়ি বেলা কয়টা হইছে খেয়াল আছে? এহনো গোসল কইরা তৈয়ার হওনের হুশ নাই ক্যান? জামাইর বাড়ির মানুস আইলে হেগো সামনে দিয়া গোসল করতে যাইবি? বেলা কতলা হইছে এই ছেড়ি এহনো গোসল করবার যায় না ক্যান আলেহা?
আলেহা রান্নাঘরে ছিল। তারানূর বেগমের চিল্লাচিল্লি শুনে পাকঘর হতে নূরজাহানকে ডেকে বলে….
‘ নূরজাহান যা-তো, তোর আর কাজ করা লাগবে না। তুই গিয়ে গোসল করে তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নে। ওরা হয়তো কিছুক্ষণের মধ্যে চলে আসবে।
তারানূর ক্ষেপা গলায় বলে..
‘ কিছুক্ষণের মধ্যে আইব কি? হেগো গাড়ি আমাগো শহরে আইয়া পরছে। মাজিদ ফোন দিছিল হেরা কইছে আর বিশ তিরিশ মিনিট লাগবে হেগো পৌঁছাইতে। এই ছেড়ি আরও আগে ক্যান তৈয়ার হইলো না তোরা আমাকে জবাব দে। এই ছেড়ি কি চায়? কপালের ভাত পুইছা ফালাইতে? আমাগো সাতকপালের ভাগ্য এই ছেড়ির লাইগা এমন রাজপুত্রের লাহান জামাই পাইছি। নইলে এই ছেড়িরে কে বিয়া করবার চাইতো? এই ছেড়ি যে জামাইর লগে কথা কয় না। জামাইর বাড়ির মানুস আইব শুইনাও তৈয়ার হয় না ক্যান এগুলির জবাব তোরা আমারে দে। এই ছেড়ি আমার পোলারে না মাইরা শান্তি হইব না।
আলেহা অসন্তোষ্টি গলায় তারানূরকে থামতে বলে…

‘ আম্মা তুমি থামো তো। নূরজাহান তুই যা। গিয়ে তাড়াতাড়ি গোসল করে একটা ভালো জামা পরে নে। যাহ।
তারানূর ফের ক্ষেপে গিয়ে বলেন….
‘ এই ছেড়ি জামা পরব ক্যান? এই ছেড়ি কি আইজ বেড়াইতে যাইতেছে যে জামা পরব? এই ছেড়িরে ক ভালা দেইখা একহান শাড়ি পইরা সাইজা বইয়া থাকতে জলদি জলদি।
আলেহা তারানূরের কথায় আশনূরকে বলে….
‘ যা তো আশনূর, নূরজাহানকে তাড়াতাড়ি একটা শাড়ি পরিয়ে একটু সাজিয়ে দে। যাহ।
‘ আচ্ছা ফুফু। নূরজাহান যাহ আগে গোসল করে আয় তাড়াতাড়ি।
বিষণ্ণ ভগ্নহৃদয়ে নূরজাহান চুপচাপ সবার কথা মতো গোসল করতে যায়। জামা-কাপড় নিয়ে আজ পুকুরঘাটে যায়নি। হাসান সাইড দেয়াল দিয়ে মেয়েদের জন্য একখানা আধুনিক গোসলখানা বানিয়েছে। নূরজাহান তাতে ঢোকে। কাপড়গুলো হ্যাঙ্গারে রেখে, পানির ট্যাপ ছেড়ে বালতিতে পানি পড়ছে। নূরজাহান ফ্লোরে বসে দু হাতে মুখ চেপে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। অনেকক্ষণ যাবত এই কান্নাটা নিজের মধ্যে চেপে রেখেছিল। কারো সামনে কাঁদার সাহস হয়নি। নূরজাহান বিড়বিড় করে বলে…

‘ আমি আপনার অভাবে কাঙাল। আমি বিবাহিত, অন্য কারও সঙ্গী, এটা জেনেও মন পুড়ছে আপনার বিচ্ছেদে। এ কেমন অভাব আমার, ব্যবসায়ীক সাহেব?
‘ আমি আপনাকে হারাতে চাইনি, তারপরও হারিয়ে ফেললাম। আপনার বিরহ আমার প্রাণে সয় না ব্যবসায়ীক সাহেব। আপনি আমাকে কখনো ক্ষমা করবেন না। আমি কথা দিয়ে কথা রাখতে পারলাম না। আপনার হবো বলেও অন্য কারও হয়ে গেলাম।

নূরজাহানকে গোলাপি রঙের একটা শাড়ি পরানো হয়েছে। শাড়িটা মাজিদের বউ নদীর বৌভাতের শাড়ি এটা। নূরজাহানের কোনো শাড়ি নেই। কখনো কেউ কিনে দেয়নি। আশনূরের দুই-তিনটা শাড়ি আছে তবে সেগুলো বেশ কয়েকবার করে পরাই পুরাতন হয়ে গেছে। আবার সে-সব শাড়িগুলো দামীও না। মেহমান আসবে সেই হৈচৈয়ে কারও এটা মাথায় আসেনি নূরজাহানের জন্য একটা ভালো শাড়ি কিনে আনবে। যখন নূরজাহানকে শাড়ি পরাতে গেল তখন সবার মাঝে একটা আফসোস দেখা গেল কেন নূরজাহানের জন্য একটা শাড়ি কিনে আনা হলো না সেটা নিয়ে। তারানূর বাড়ির সবাইকে বকাঝকা করছেন। মেহমানরা চলে এসেছে অথচ নূরজাহানের জন্য ভালো শাড়ি নেই। মাজিদের বউয়ের বৌভাতের শাড়িটা ভালো তাই নূরজাহানকে পরানো হয়েছে। পুরাতন শাড়িতেও যেন নূরজাহানকে সাক্ষাৎ পরী লাগছে। আশনূর নিজে শাড়ি পরিয়ে নূরজাহানের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে। নূরজাহানের রূপে মানুষ এমনিই পাগল হয় না, নূরজাহানের রূপ মানুষকে পাগল করার মতোই আল্লাহ তালা দিয়েছে। নূরজাহানের চেয়ে লম্বা চুল গুলো মাটি ছুঁই পরে। লম্বা চুলগুলো ভেজা থাকায় আশনূর বারবার গামছা দিয়ে নূরজাহানের চুল মুছে দিচ্ছে। নূরজাহান এমনিই সুন্দর তারপরও তারানূর বারবার আশনূরকে বলছেন নূরজাহানের মুখে পাউডার, লিপস্টিক দিয়ে সাজিয়ে দিতে। নূরজাহান পুতুলের ন্যায় বসে থাকে। সে পরিবারের কারও বিরুদ্ধে যেতে চায় না। সবাই যখন নূরজাহানের বিয়েটা নিয়ে খুশি, তখন নূরজাহানের মনে থাকা ব্যবসায়ীক সাহেবকে কবর দিয়ে এই বিয়েটা মেনে নেবে। কিন্তু এই মুহূর্তে হয়তো মারিদকে স্বামী হিসাবে মেনে নেওয়া নূরজাহানের পক্ষে সম্ভব না। নূরজাহানের একটু সময় চাই। নূরজাহান চুপচাপ বসে। আশনূর নিজের মেকআপের প্রসাধনী থেকে নূরজাহানকে অল্পস্বল্প সাজিয়ে দিল। নূরজাহানের ঠোঁটে লাল লিপস্টিক, চোখে একটু কাজল— ব্যস অল্পতে নূরজাহানকে সাক্ষাৎ পরী লাগছে। নদী, আলেহা, তারানূর সবাই নূরজাহানকে দেখে মুগ্ধ। নূরজাহানের চেহারা সুন্দর, স্নিগ্ধ, পবিত্র দেখাচ্ছে। আলেহা এগিয়ে এসে নূরজাহানের কপালে চুমু খেয়ে বলে….

‘ আল্লাহ তোকে দুনিয়ার সব সুখ দিক।
আলেহা নূরজাহানের মাথায় শাড়ির আঁচল টেনে দেয়। তক্ষুনি শোনা যায় হাসান, মাজিদ, সাজিদ, আহাদের ডাকাডাকি। মেহমানরা সবাই চলে এসেছে। বাইরে চিল্লাচিল্লি শুনে আলেহা জলদি জলদি নদী, আশনূরকে নিয়ে বেরিয়ে যায় মেহমানদের জন্য শরবত রেডি করতে। তারানূর বেগম চলে যেতে গিয়েও নূরজাহানকে কাটকাট গলায় আদেশ করে যান….
‘ শোন ছেড়ি, জামাইর বাড়ির মানুস আইছে, শ্বশুর শ্বশুর হগলের পাওয়ে ধইরা সালাম করবি যাতে মুরুব্বি কেউ বাদ না যায়।

নূরজাহান মাথা নাড়ায়। তারানূর চলে যান। সাতটা কার, নয়টা ভ্যান গাড়ি করে ফল, মিষ্টি নিয়ে সিকদার বাড়ি থেকে বিশ কদম দূরে বটগাছের নিচে নামে সবাই। সাজিদ, মাজিদ, হাসান, আহাদ, মান্না সবাই অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে। উনারা মানুষজনকে দেখে নয় বরং নয়টা ভ্যানভর্তি ফল, মিষ্টি দেখে অবাক হয়েছেন। সৈয়দ বংশের নামডাক আছে, সৈয়দ বংশের পাল যেদিকে যাবে সেদিকে হৈচৈ ফেলে দেয়। পরপর এতগুলো গাড়ি, এতসব ফল মিষ্টির মাল নিয়ে হাসান মেম্বারের বাড়িতে কারা এসেছে সেসব গুঞ্জন গ্রামের মানুষের মধ্যে ইতিমধ্যে দেখা গেল। মারিদের গাড়ি যখন থানচির গ্রামের বাজারে ঢোকে তখনই গ্রামের মানুষের মাঝে কৌতূহল দেখা যায় এইসব গাড়িতে কারা এসেছে সেটা জানতে। বাচ্চাদের নিয়ে সালমা, শান্তা, ফাতেমা, মুনিয়া এগিয়ে যায়। সুফিয়া তনিমাকে নিয়ে আসছে। সুখ গাড়ি থেকে নেমে একটা ট্রলি ব্যাগ টানছে। রাদিল বিষয়টা লক্ষ করে এগিয়ে আসে সুখকে সাহায্য করতে, কিন্তু সুখ রাদিলকে দেখে ট্রলি ব্যাগ ফেলে হীরা চৌধুরীর পিছনে চলে যায়। রাদিল ফের দাঁড়িয়ে যায়। সুখের দিকে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে এক দৃষ্টিতে।

মূলত রাদিলের মাথায় ঢুকছে না সুখ তার সাথে এমন অদ্ভুত ব্যবহার কেন করছে। আর এতে রাদিলই বা কেন ডিস্টার্ব হচ্ছে? সুখ ইগনোর করলে রাদিলের কী?
মারিদের বউয়ের রূপে মুগ্ধ সবাই। মাশাল্লাহ, মাশাল্লাহ, মাশাল্লাহ বলতে বলতে একেক জনের মুখে ফেনা তুলে ফেলছে। সুফিয়া, আফিয়া, সুখ, রাদ, রাতুল একজনের পর একজন নূরজাহানকে ভাবি ভাবি ডেকে জড়িয়ে ধরছে। রাদ, রাতুল তো রীতিমতো লাফালাফি শুরু করে দিয়েছে নূরজাহানকে পেয়ে। বসার ঘরে সবাইকে বসতে দেওয়া হয়েছে। সবাই ঠাণ্ডা পানির শরবত পান করছে। নূরজাহান পায়ে হাত দিয়ে একে একে সালমা, শান্তা, ফাতেমা, মুনিয়া, হীরা চৌধুরী সকলকে সালাম করে। ছেলেরা সবাই বাইরে। তক্ষুনি মাহবুব নূরজাহানকে ডাকতে ডাকতে বসার ঘরে ঢুকে। নূরজাহান বসার ঘর থেকে উঠে মাহবুবকে সালাম করলে মাহবুব নূরজাহানের মাথায় স্নেহের হাত বুলান। নূরজাহান উঠে দাঁড়াতে ঘরে মকবুল, খালেদ ঢুকে। নূরজাহান ফের বসে মকবুল, খালেদকে সালাম করতে নূরজাহানের সামনে আরও দুটো পা এসে দাঁড়ায়। নূরজাহান এই পা দুটো মুরুব্বি কারও হবে ভেবে মকবুল, খালেদের সঙ্গে মারিদকেও সালাম করে ফেলে। মারিদ কপাল কুঁচকে ঘোমটা টেনে তাকে সালাম করা নূরজাহানের দিকে তাকায়। রাদ শরবতের গ্লাস হাতে সোফায় বসে হেসে কুটি কুটি হয়ে নূরজাহানকে ডেকে বলে….

‘ সুন্দর ভাবি, ওইটা মারিদ ভাইয়ার পা ছিল, তুমি ভাইয়াকে সালাম করে ফেলেছ।
রাদ হাসলে মুনিয়া রাদকে শুধিয়ে বলে….
‘ তোমার ভাবি তোমার মারিদ ভাইয়াকেও সালাম করতে পারবে। এটা নিয়ম আছে।
রাদ মাথা কাত করে মায়ের কথায় সম্মতি দেয়। অথচ নূরজাহান মারিদকে সালাম করে ফেলেছে শুনে ওহ শক্ত কাঠ হয়ে মারিদের পায়ের সামনেই বসে রইল, নড়ছে না। মারিদ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। এর মাঝে রিফাত হৈ হৈ করে পিছন থেকে মারিদকে ঠেলে নিজে মারিদের জায়গায় নূরজাহানের সামনে দাঁড়িয়ে বলে…
‘ মারিদ সর সর! আমার জানকে দেখতে দে।

মারিদ সবার সামনে ক্ষেপে যায়। চোখ গরম করে রিফাতের দিকে তাকাতে হাসান উঠান থেকে মারিদকে ডাকেন যেতে। মারিদ যেতে যেতে রেগেমেগে রিফাতকেও টেনে নিজের সাথে নিয়ে যায়। রিফাত যেতে চায়নি। সে নূরজাহানকে দেখবে বলে বারবার মারিদকে খোঁচাচ্ছে আর মারিদ রেগে যাচ্ছে।
আলেহা, আশনূর, নদী সবাইকে নিয়ে কলপাড়ে যায়। সবাই হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হবে। লং জার্নি করে এসেছে সবাই, হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হওয়া জরুরি। নূরজাহান ফের বসার ঘরে এসেছিল হাসানের খোঁজে, মাথায় লম্বা ঘোমটা টেনে। দরজা ধরে নূরজাহান বাইরে উঁকি মারতে মারিদকে দেখল এদিকটায় আসছে। দশ-বারো কদমের দূরত্বে দুজনে। নূরজাহান দ্রুত পালাতে চেয়ে কাঠের দরজার পিছনে লুকালো তৎপর করে। মারিদ ঘরে ঢুকে আশেপাশে নূরজাহানের খোঁজ করে। মাত্র দেখেছে নূরজাহান দরজা ধরে বাইরে উঁকি দিয়েছে, কয়েক সেকেন্ডে মাঝে যাবে কই মেয়েটা? মারিদ নূরজাহানের পিছন পিছন তৎক্ষনাৎ এই ঘরে ঢুকেছে, নূরজাহানের এই ঘর থেকে দৌড়ে চলে গেলেও সেটা মারিদের চোখে পড়ার কথা। মারিদ খালি ঘরটায় চোখ বুলিয়ে দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে গিয়েও ফের ঘরে ঢুকে। দরজার নিচের ফাঁকে বেশ অনেকটা দেখা যাচ্ছে নূরজাহানের শাড়ির অংশ। মারিদ থেকে বাঁচতে নূরজাহান দরজার পিছনে লুকাবে সেটা মারিদের ধারণাতে ছিল না। হাসান ঘরে ঢুকে মারিদকে দরজার সামনে দেখে বলেন…

‘ আপনে এইহানে ক্যান বাজান? চলেন হাত-মুখ ধুইয়া কিছু খাইবেন।
‘ আঙ্কেল একটু দাঁড়ান, আপনার সঙ্গে কিছু কথা ছিল আমার।
‘ জি কন বাজান, কি কইবেন।
মারিদের হাসানের সঙ্গে তেমন কোনো কথা ছিল না। সে নূরজাহানকে জ্বালাতে মূলত হাসানকে এখানে আটকে রাখতে ইচ্ছাকৃতভাবে হসপিটালের প্রসঙ্গে কথা তোলে হাসানের সঙ্গে। নূরজাহান দরজার আড়ালে লুকিয়ে ঘামছে। এমনিতেই গরম, তার উপর মোটা শাড়ি পড়ে দরজার পিছনে লুকানোতে শরীর ঘেমে যাচ্ছে মুহূর্তে। নূরজাহান অস্বস্তিতে পড়ে বের হতে পারছে না। অপেক্ষা করছে মারিদের চলে যাওয়ার। মারিদ নূরজাহানকে বুঝতে দেয়নি সে দেখেছে নূরজাহান লুকিয়েছে দরজার আড়ালে। মারিদ হাসানের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের শরীরের ভর দরজার উপর ছেড়ে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়ায় দরজার সঙ্গে। দরজার চাপে নূরজাহানের জান বেরিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা।

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩৫

অথচ মারিদ দরজা থেকে সরছে না। মিনিট দশেক পর মারিদ হাসানের সঙ্গে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায়। নূরজাহান দরজার আড়াল থেকে নাক ঘষতে ঘষতে বেরিয়ে আসে। সুন্দর মুখটা ঘেমে লাল হয়ে গেছে। নূরজাহানের নাকের ডগা এরচেয়ে বেশি রক্তিম লাল হয়ে গেছে মারিদের দরজার চাপে। রাদ, রাতুল হাত-মুখ ধুয়ে লাফাতে লাফাতে ঘরে ঢুকে নূরজাহানের লাল নাক দেখে চিৎকার করে লাফাতে লাফাতে বলে….
‘ আল্লাহ! সুন্দর ভাবীর নাক কাটা। মারিদ ভাইয়ের বউ নাক কাটা! নাক কাটা।

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here